📄 দ্বীনের মাকামসমূহের ভিত্তি হলো সন্তুষ্টি
আব্বাস ইবনু আবদিল মুত্তালিব থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন,
ذَاقَ طَعْمَ الْإِيْمَانِ مَنْ رَضِيَ بِاللهِ رَبًّا وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا وَبِمُحَمَّدٍ رَّسُوْلًا “সেই ব্যক্তি ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করেছে, যে আল্লাহকে রব হিসাবে, ইসলামকে দ্বীন হিসাবে এবং মুহাম্মাদ -কে রাসূল হিসাবে পেয়ে সন্তুষ্ট।”[৪৬৮]
সা'দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল বলেছেন, “যে ব্যক্তি মুআযযিনকে (অর্থাৎ আযান) শুনে বলে,
أَشْهَدُ أَنْ لَّا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ وَ(أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ، رَضِيْتُ بِاللهِ رَبًّا وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا وَبِمُحَمَّدٍ رَسُوْلًا 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, যিনি একক, যার কোনো শরীক নেই এবং মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল। আমি আল্লাহকে রব হিসাবে, ইসলামকে দ্বীন হিসাবে এবং মুহাম্মাদ-কে রাসূল হিসাবে পেয়ে সন্তুষ্ট।' তার গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।” [৪৬৯]
উপরিউক্ত দুটি হাদীসের ওপরই দ্বীনের সমস্ত মাকামের ভিত্তি এবং এ দুটি অর্জন করাই হলো সেগুলোর চূড়ান্ত গন্তব্য। এ দুটি হাদীস ১. আল্লাহ তাআলার রুবুবিয়্যাতের প্রতি সন্তুষ্টি, ২. তাঁর ইলাহিয়্য্যাতের প্রতি সন্তুষ্টি, ৩. তাঁর রাসূলের প্রতি সন্তুষ্টি ও আনুগত্য এবং ৪. তাঁর দ্বীনের প্রতি সন্তুষ্টি ও তা নির্দ্বিধায় মেনে নেওয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে।
এই চারটি বিষয় যার মধ্যে একত্রিত হয় সে-ই প্রকৃত সিদ্দীক। এগুলো মুখে মুখে বলা ও দাবি করা খুব সহজ; কিন্তু বাস্তবতা ও পরীক্ষার সময় তা মেনে চলা অত্যন্ত কঠিন; বিশেষ করে যখন এমন বিষয় সামনে আসে, যা প্রবৃত্তির বিপরীত এবং নিজস্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক। সেই সময় স্পষ্ট হয়ে যায় যে, সন্তুষ্টির দাবি ছিল মৌখিক আর বাস্তব অবস্থা ছিল এর থেকে আলাদা।
(উপরিউক্ত চারটি বিষয়ের বর্ণনা:)
আল্লাহ তাআলার ইলাহিয়্যাতের প্রতি সন্তুষ্টি: এটি আল্লাহর মহাব্বত, ভয়, আশা, তাঁর অভিমুখী হওয়া, সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তাঁর প্রতি মনোযোগী হওয়া, ইচ্ছা ও ভালোবাসার সবটুকুই তাঁর প্রতি নিবেদিত করা ইত্যাদিকে শামিল করে। যে ব্যক্তি আল্লাহকে ইলাহ্ হিসাবে মেনে নিয়ে সন্তুষ্ট হয়, সে তাঁর ইবাদাতে তৃপ্তি পায় এবং তাতে একনিষ্ঠ ও আন্তরিক হয়।
আল্লাহ তাআলার রুবুবিয়্যাতের প্রতি সন্তুষ্টি: এটি হলো আল্লাহ তাআলা বান্দাদের জন্য যে ফায়সালা ও সিদ্ধান্ত নেন, তাতে সন্তুষ্ট হওয়া। এমনিভাবে এটি একমাত্র আল্লাহ তাআলার ওপর তাওয়াক্কুল করা, তাঁর কাছেই সাহায্য চাওয়া, তাঁর প্রতি আস্থা রাখা, তাঁর ওপর নির্ভর করা এবং তিনি তার বান্দার ব্যাপারে যা কিছু করেন, তাতে রাজি-খুশি থাকাকেও শামিল করে।
প্রথমটা আল্লাহ তাআলার আদেশ-নিষেধের ক্ষেত্রে আর দ্বিতীয়টা আল্লাহ তাআলার তাকদীরি ফায়সালার ক্ষেত্রে সন্তুষ্ট হওয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে।
তাঁর নবিকে রাসূল হিসাবে পেয়ে সন্তুষ্ট হওয়া: এটি তাঁর প্রতি পরিপূর্ণ আনুগত্য এবং আত্মসমর্পণ করাকে আবশ্যক করে। এ ক্ষেত্রে বান্দা নিজের জীবন থেকেও রাসূল -কে বেশি মহাব্বত করবে। ফলে তাঁর দেখানো পথ ছাড়া আর কোনো পথের অনুসরণ করবে না, কেবল তাঁর নিকটেই সমাধান চাইবে, তাঁকেই বিচারক বানাবে, তাঁকে বাদ দিয়ে আর কারও হুকুম মানবে না এবং তাতে সন্তুষ্টও হবে না, আল্লাহ তাআলার কোনো একটি নাম, সিফাত বা কাজের ক্ষেত্রে, এমনিভাবে ঈমান ও ইসলামের যেকোনো বিষয়ে প্রকাশ্য হোক কিংবা অপ্রকাশ্য তাঁর হুকুম ব্যতীত অন্য কারও হুকুমে সন্তুষ্ট হবে না, সবক্ষেত্রে কেবল তাঁর হুকুমই মেনে নিয়ে সন্তুষ্ট হবে। তবে এতে যদি সে অক্ষম হয়, তা হলে অন্যকে বিচারক বানানোর ব্যাপারটি হবে মৃত্যুর-মুখে-পতিত অসহায় ব্যক্তির মৃত বস্তু ও রক্ত খাওয়ার বিধানের মতো। অথবা তার অবস্থা হবে মাটির মতো; যখন পবিত্র পানি দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করতে অক্ষম হবে, কেবল তখনই মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করার হুকুম প্রযোজ্য হবে।
দ্বীনের ব্যাপারে সন্তুষ্টি: ইসলাম যে কথা বলে, যে হুকুম দেয়, যা করতে বলে বা যা করতে নিষেধ করে, বান্দা পরিপূর্ণ সন্তুষ্টির সাথে সেগুলো মেনে চলবে এবং পালন করবে, কোনো হুকুমের ব্যাপারে অন্তরে সামান্যতমও দ্বিধাদ্বন্দ্ব বা সংকীর্ণতাকে প্রশ্রয় দেবে না; নিজের স্বার্থ ও চাহিদার বিরুদ্ধে গেলেও অথবা নিজের দল, শাইখ বা আদর্শের বিপরীত হলেও।
এখানে এসে সমস্ত মানুষ মনে হয় আপনাকে একাকিত্বের মধ্যে ফেলে দেবে। পৃথিবীতে নিজেকে আপনার একা মনে হবে। এই দলে আপনি খুব অল্পসংখ্যক মানুষ পাবেন। তবে এই গুরাবা বা অপরিচিত অবস্থা দেখে বিষণ্ণ হওয়ার কোনো কারণ নেই। আল্লাহর শপথ! এটিই হলো খাঁটি সম্মানের বিষয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সান্নিধ্যলাভ, এতেই রয়েছে প্রাণবন্ত ঘনিষ্ঠতা, আল্লাহকে রব হিসাবে, মুহাম্মাদ -কে রাসূল হিসাবে আর ইসলামকে দ্বীন হিসাবে পাওয়ার সন্তুষ্টি।
বরং সত্যবাদী ব্যক্তি যখনই একাকিত্ব-অপরিচিতির ছোঁয়া স্পর্শ করে, এর স্বাদ পায় এবং এর দ্বারা তার রূহ উৎফুল্ল হয়, তখন সে দুআ করতে থাকে, 'হে আল্লাহ, আমার এই অপরিচিতি আরও বৃদ্ধি করে দিন, মানুষজন থেকে দূরে রাখুন এবং আপনার সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে দিন।' আর যখনই সে একাকিত্বের এই স্বাদ আস্বাদন করে, তখনই সে দেখতে পায়—মানুষের সাথে দূরত্ব অবলম্বন করাই হলো তাদের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টির মাধ্যম, আর এ পথে অপমান-লাঞ্ছনাই হলো খাঁটি ইজ্জত-সম্মান, মানুষের বিষয়াদি থেকে অজ্ঞ থাকাই হলো তাদের চিন্তাভাবনা ও যুক্তির সাথে একমত পোষণ করা, আর বিচ্ছিন্ন থাকাই হলো প্রকৃতপক্ষে তাদের রসম-রেওয়াজের সাথে যুক্ত থাকা। ফলে যে একবার এর স্বাদ পায়, সে কখনো আল্লাহর ওপর সৃষ্টিজগতের কাউকে প্রাধান্য দেয় না, আল্লাহর পক্ষ থেকে তার যে অংশ, তা মানুষের সাথে মেলামেশা করে বিক্রি করে না, তাদের সাথে একমত হওয়াতে তো কেবল বঞ্চনাই জোটে। এই পথ অবলম্বন করার শেষ পরিণতি হলো—দুনিয়ার জীবনে মানুষের ভালোবাসা পাওয়া আর যেদিন সমস্ত সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে,
সব বস্তুর প্রকৃত অবস্থা উন্মোচিত হবে, কবরে যা কিছু রয়েছে সব প্রকাশিত হয়ে পড়বে, অন্তরে যা আছে সব জানা যাবে, যখন সকল রহস্য ফাঁস হবে, যেদিন সত্যিকারের মাওলা ব্যতীত কোনো শক্তি ও সাহায্যকারী থাকবে না, সেদিন তার সামনে লাভ-ক্ষতির হিসাব সুস্পষ্ট হবে এবং দাঁড়িপাল্লা ভারী হবে নাকি হালকা হবে; তা সে দেখতে পাবে! আল্লাহ তাআলাই একমাত্র সাহায্য লাভের উৎস আর ভরসা করতে হবে কেবল তাঁরই ওপর।
টিকাঃ
[৪৬৮] মুসলিম, ৩৬।
[৪৬৯] মুসলিম, ৩৮৬; আবূ দাউদ, ৫২৫।
📄 সন্তুষ্টি অভিভাবক বানালো
আল্লাহকে রব হিসাবে পেয়ে সন্তুষ্ট হওয়ার অর্থ: আল্লাহ তাআলাকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে রব না বানানো; যার কাছে বান্দা নিজের কাজকর্ম ও প্রয়োজন পূরণের জন্য প্রার্থনা করবে এবং যার কাছে নিজেকে সমর্পণ করবে।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
قُلْ أَغَيْرَ اللَّهِ أَبْغِي رَبًّا وَهُوَ رَبُّ كُلِّ شَيْءٍ
"বলুন, আমি কি আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো রবের সন্ধান করব, অথচ তিনিই সবকিছুর রব?” [৪৭০]
ইবনু আব্বাস ﷴ বলেছেন, 'ইবাদাত পাওয়ার যোগ্য ও অভিভাবক হিসেবে আমি অন্য কাউকে সন্ধান করব?' অর্থাৎ আমি কীভাবে তাঁকে বাদ দিয়ে অন্যকে রব হিসাবে খুঁজব, অথচ তিনিই সবকিছুর রব?!
এই সূরারই শুরুর দিকে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
قُلْ أَغَيْرَ اللَّهِ أَتَّخِذُ وَلِيًّا فَاطِرِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ
"বলুন, আমি কি আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে নিজের অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করব, (সেই আল্লাহকে বাদ দিয়ে,) যিনি মহাকাশ ও পৃথিবীর স্রষ্টা?”[৪৭১]
অর্থাৎ ইবাদাত লাভের সত্তা, বন্ধু, সাহায্যকারী ও আশ্রয়দাতা হিসাবে (আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে গ্রহণ করব?)। ওপরের আয়াতে উল্লেখিত শব্দটি এসেছে الْوَلَاءُ (বন্ধুত্ব করা)-থেকে; যা মহাব্বত ও আনুগত্যকে অন্তর্ভুক্ত করে।
ওই সূরার মাঝামাঝিতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
أَفَغَيْرَ اللَّهِ أَبْتَغِي حَكَمًا وَهُوَ الَّذِي أَنْزَلَ إِلَيْكُمُ الْكِتَابَ مُفَصَّلًا
“আমি কি আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো মীমাংসাকারীর সন্ধান করব, অথচ তিনি তোমাদের প্রতি বিস্তারিত বিবরণসহ কিতাব নাযিল করেছেন?"[৪৭২]
অর্থাৎ আমি কি আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন কাউকে সন্ধান করব, যিনি আমার মাঝে ও তোমাদের মাঝে মীমাংসা করে দেবে? ফলে আমরা যে বিষয়ে বিরোধ করছি, সে বিষয়ে অন্য কাউকে মীমাংসাকারী বানাব? অথচ আল্লাহর এই কিতাব সমস্ত মীমাংসাকারীদের সর্দার! সুতরাং কীভাবে আমরা তাঁর কিতাব ব্যতীত বিচার-মীমাংসার জন্য অন্য কারও দ্বারস্থ হব, অথচ তিনি বিস্তারিত, সুস্পষ্ট, পূর্ণাঙ্গ ও উপযোগী করে কিতাব অবতীর্ণ করেছেন?
আপনি যদি উপরিউক্ত তিনটি আয়াত নিয়ে যথাযথভাবে চিন্তাভাবনা করেন, তা হলে দেখতে পাবেন যে, এই আয়াতগুলো সরাসরি আল্লাহকে রব হিসাবে, মুহাম্মাদ -কে রাসূল হিসাবে আর ইসলামকে দ্বীন হিসাবে পেয়ে সন্তুষ্ট হওয়া (র বিষয়টিকে স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।) আর সেই হাদীসটিকে পাবেন এই আয়াতগুলোর ব্যাখ্যাকারী হিসেবে এবং এটা উপলব্ধি করবেন যে, সেই হাদীসটির উৎস হলো এই আয়াতগুলোই।
অনেক মানুষ এমন আছে যারা আল্লাহকে রব হিসাবে মেনে নিয়ে সন্তুষ্ট, তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো রবের সন্ধানও করে না; কিন্তু তাঁকে এককভাবে অভিভাবক ও সাহায্যকারী হিসাবে মেনে নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারে না; বরং তাঁকে ছাড়াও আরও অনেক নেককার ব্যক্তিদেরকে অভিভাবক ও সাহায্যকারী হিসেবে গ্রহণ করে থাকে, এই ভেবে যে, তারা তাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী বানিয়ে দেবে, আল্লাহর প্রিয় পাত্র বানাবে। তাদেরকে অভিভাবক ও সাহায্যকারী হিসাবে গ্রহণ করার বিষয়টি হলো রাজা-বাদশাহদের কাছের ও বিশেষ ব্যক্তিদেরকে অভিভাবক ও সাহায্যকারী হিসেবে গ্রহণ করার ন্যায়। আসলে এটিই হলো শির্ক।
এ ক্ষেত্রে তাওহীদ হলো: আল্লাহকে ছেড়ে আর কাউকে অভিভাবক ও সাহায্যকারী না বানানো। কুরআনে অনেকবার মুশরিকদের এই স্বভাব ও চরিত্রের বর্ণনা এসেছে যে, তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে আরও অনেককে অভিভাবক ও সাহায্যকারী হিসাবে গ্রহণ করে।
মুশরিকদের অভিভাবকগ্রহণ আর নবি-রাসূল ও মুমিন বান্দাদের পরস্পরের বন্ধুত্ব ও অভিভাবকগ্রহণ করা এক নয়। কারণ এটি হলো ঈমানের ও আল্লাহর সাথে বন্ধুত্বের পরিপূরক। আসলে আল্লাহর ওলিদের বন্ধুত্বের মাঝে রয়েছে একটি রং আর আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করার মাঝে রয়েছে ভিন্ন আরেকটি রং। যারা এ দুটি রঙের মাঝে পার্থক্য করতে পারে না, তারা যেন তাদের তাওহীদের মূল অনুসন্ধান করে। কারণ এই মাসআলাটি হলো তাওহীদের মূল ভিত্তি ও বুনিয়াদ।
আবার অনেক মানুষ এমনও রয়েছে, যারা আল্লাহকে ছাড়া বিচারক-মীমাংসাকারী হিসাবে অন্যকে খোঁজে, তার কাছেই মীমাংসা চায়, বিচার-ফায়সালার জন্য তার কাছেই যায় এবং তার বিচারেই সন্তুষ্ট থাকে। এই তিনটি মাকামই হলো তাওহীদের রোকন বা ভিত্তি; অর্থাৎ: ১. আল্লাহকে ব্যতীত কাউকে রব হিসাবে গ্রহণ না করা, ২. আল্লাহকে ব্যতীত কাউকে ইলাহ্ হিসাবে গ্রহণ না করা ও ৩. আল্লাহকে ব্যতীত কাউকে মীমাংসাকারী হিসাবে গ্রহণ না করা।
আল্লাহকে রব হিসাবে পেয়ে সন্তুষ্ট হওয়ার ব্যাখ্যা হলো: আল্লাহকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদাত করতে সে অসন্তুষ্ট হবে। আর এটি হলো আল্লাহকে ইলাহ হিসাবে পেয়ে সন্তুষ্ট হওয়া। আবার এটি (অর্থাৎ আল্লাহকে ইলাহ্ হিসাবে পেয়ে সন্তুষ্ট হওয়া) আল্লাহকে রব হিসাবে পেয়ে সন্তুষ্ট হওয়াকে পূর্ণতা দান করে। সুতরাং যে ব্যক্তি যথাযথভাবে আল্লাহকে রব হিসাবে মেনে নিয়ে সন্তুষ্ট হবে, অবশ্যই সে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদাত করতে অসন্তোষ প্রকাশ করবে। কারণ রব হিসাবে যে একজনকে মানবে, ইলাহ্ হিসাবেও সে কেবল একজনকে মানতে বাধ্য; যেমন যে ব্যক্তি জানে তার রব একজন, সে আবশ্যকীয়ভাবে এটাও জানবে যে, তার ইলাহ্ও একজন।
টিকাঃ
[৪৭০] সূরা আনআম, ৬: ১৬৪।
[৪৭১] সূরা আনআম, ৬: ১৪।
[৪৭২] সূরা আনআম, ৬ : ১১৪।
📄 সন্তুষ্টির গুণ অর্জনযোগ্য নাকি আল্লাহ-প্রদত্ত?
কুশাইরি [৪৭০] বলেছেন, 'এ দুটির মাঝে সমন্বয় করা সম্ভব। তা এভাবে যে, সন্তুষ্টির সূচনা হলো বান্দার উপার্জিত। এটি হলো সমস্ত মাকামের মতোই একটি মাকাম। আর এর শেষ হলো 'হাল' বা বিশেষ অবস্থার অন্তর্ভুক্ত; যা বান্দার জন্য অর্জনযোগ্য নয়। সুতরাং সন্তুষ্টির সূচনা হলো মাকাম আর এর শেষ হলো হাল।'
তবে সঠিক অভিমত হলো: রিযা বা সন্তুষ্টি কারণ-উপকরণের দিক বিবেচনায় অর্জনযোগ্য। আর প্রকৃত অবস্থা বিবেচনায় তা আল্লাহ-প্রদত্ত। সুতরাং বান্দা যদি সঠিক উপকরণ অবলম্বন করে এবং এর গাছ রোপণ করে, তা হলে সে এর থেকে সন্তুষ্টির ফল লাভ করবে। কারণ তাওয়াক্কুলের শেষ ধাপই হলো রিযা বা সন্তুষ্টি।
সুতরাং যে ব্যক্তির পা তাওয়াক্কুল, তাসলীম ও তাফবীযের মানযিলে স্থির হবে, নিশ্চিতভাবেই তার সন্তুষ্টির মাকাম হাসিল হবে।
কিন্তু এর অর্জন অনেক কষ্ট ও পরিশ্রমসাধ্য হওয়ার কারণে, অধিকাংশ মানুষের এতে সাড়া দেওয়ার প্রবণতা না থাকার কারণে এবং তাদের জন্য এটি অনেক কঠিন হওয়ার কারণে আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর তা ওয়াজিব করে দেননি; বান্দার প্রতি তাঁর অসীম দয়ার কারণে এবং তাদের ওপর সহজ করার জন্য। তবে এটিকে তিনি তাদের জন্য পছন্দনীয় আমল হিসাবে সাব্যস্ত করেছেন এবং যারা এর গুণে গুণান্বিত হয় তাদের প্রশংসা করেছেন। এই সংবাদও দিয়েছেন যে, বান্দার ওপর আল্লাহর সন্তুষ্টি জান্নাত ও জান্নাতের মধ্যে যা কিছু রয়েছে, তার চেয়েও অনেক বড়ো, মর্যাদাপূর্ণ ও উত্তম।
যে ব্যক্তি তার রবের ওপর সন্তুষ্ট হয়, আল্লাহও তার ওপর সন্তুষ্ট হন। বরং বলা যায় আল্লাহর প্রতি বান্দার সন্তুষ্টি, বান্দার প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টিরই ফল। আসলে বান্দার সন্তুষ্টি আল্লাহর দুটি সন্তুষ্টি দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে: একটি সন্তুষ্টি এর পূর্বে; যা বান্দাকে তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হতে উদ্বুদ্ধ করে, আরেকটি সন্তুষ্টি এর পরে; আর তা হলো বান্দার প্রতি তাঁর সন্তুষ্টির ফল। এ কারণেই সন্তুষ্টি হলো আল্লাহ তাআলার সবচেয়ে প্রশস্ত দরজা, দুনিয়ার জান্নাত, আল্লাহর মা'রিফাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের তৃপ্তির স্থান, মহাব্বতকারীদের জীবন, ইবাদাতকারীদের প্রফুল্লতা আর আল্লাহর প্রতি আগ্রহীদের চোখের শীতলতা।
আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে বড়ো একটি উপকরণ হলো: আল্লাহ তাআলা যে কাজগুলোর মধ্যে তাঁর সন্তুষ্টি নিহিত রেখেছেন, তা আঁকড়ে ধরা। কারণ নিশ্চিতভাবে এটি তাকে সন্তুষ্টির মানযিলে পৌঁছিয়ে দেবে।
ইয়াহইয়া ইবনু মুআয-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, বান্দা কখন সন্তুষ্টির মাকামে পৌঁছতে পারে? এর জবাবে তিনি বলেছিলেন, 'বান্দা যখন তার রবের ব্যাপারে নিজেকে চারটি নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখবে। (আর তা হলো,) সে বলবে,
১. 'আপনি যদি আমাকে দান করেন, আমি গ্রহণ করব;
২. যদি আমাকে দান করা থেকে বিরত থাকেন, আমি সন্তুষ্ট থাকব;
৩. যদি আমাকে পরিত্যাগ করেন, তবুও আমি আপনার ইবাদাত করতে থাকব; আর
৪. যদি আমাকে ডাকেন, তা হলে আমি সাড়া দেবো। [৪৭৪]
টিকাঃ
[৪৭৩] 'আর-রিসালাহ' গ্রন্থের লেখক। যা আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা নামে প্রসিদ্ধ।
[৪৭৪] দেখুন-আবূ নুআইম, হিলইয়া, ১০/৬৬।
📄 অন্তরে ব্যথা-বেদনা অনুভব করা সন্তুষ্টির পরিপন্থি নয়
সন্তুষ্টির জন্য এটা শর্ত নয় যে, অন্তরে ব্যথা-বেদনা, কষ্ট ও দুঃখও অনুভব করবে না। বরং এ ক্ষেত্রে শর্ত হলো: আল্লাহর কোনো বিধানে আপত্তি না করা এবং ক্রোধান্বিত না হওয়া। এই বিষয়টি না বোঝার কারণে কিছু কিছু মানুষ প্রশ্ন করে যে, কষ্টকর ও অপছন্দনীয় বিষয়ে সন্তুষ্টি কীভাবে আসে? তারা এ বিষয়টিকে মানতে নারাজ। তারা বলে, এ ক্ষেত্রে সন্তুষ্টি প্রকৃতি ও স্বভাববিরুদ্ধ। এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলো সবর বা ধৈর্যধারণ করা। আর কীভাবেই-বা সন্তুষ্টি ও অপছন্দ একত্রিত হবে, যখন এ দুটি পরস্পর বিপরীতমুখী বিষয়!?
সঠিক অভিমত হলো: এ দুটির মাঝে কোনো বৈপরিত্য ও বিরোধ নেই। ব্যথা-বেদনা অনুভব করা আর নফস কোনো বিষয়কে অপছন্দ করা সন্তুষ্টির বিপরীত নয়। যেমন অসুস্থ ব্যক্তি তিক্ত ও অপছন্দনীয় ওষুধ সেবনে সন্তুষ্ট থাকে, সাওম পালনকারী ব্যক্তি কষ্টকর ও কঠিন গরম দিনেও ক্ষুধা-তৃষ্ণায় সন্তুষ্ট থাকে, এমনিভাবে আল্লাহর রাস্তার মুজাহিদ আঘাত ও যন্ত্রণা সহ্য করেও সন্তুষ্ট থাকে। এ রকম আরও উদাহরণ রয়েছে। (সুতরাং বোঝা গেল, কষ্টকর ও অপছন্দনীয় বিষয়েও সন্তুষ্ট হওয়া যায়।)
সন্তুষ্টির পথ সংক্ষিপ্ত পথ, বেশ নিকটবর্তী; যা একটি মহান গন্তব্যে পৌঁছিয়ে দেয়। তবে এ পথে বেশ কষ্ট ও পরিশ্রম রয়েছে। এ সত্ত্বেও এর কষ্ট, মুজাহাদা বা চেষ্টা-সাধনা করার কষ্টের চেয়ে কম এবং মুজাহাদার পথের মতো এখানে বেশি ঘাঁটি ও তেমন জটিলতা নেই। সন্তুষ্টির ঘাঁটির জন্য প্রয়োজন কেবল সুউচ্চ মনোবল, দৃঢ় সংকল্প, নফসের পবিত্রতা আর আল্লাহর পক্ষ থেকে যে সমস্ত আদেশ-নিষেধ আরোপিত হয়, তাতে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া।
বান্দার জন্য এটি অর্জন করা সহজ করে দেয় যে বিষয়টি তা হলো: বান্দার নিজের দোষত্রুটি এবং আল্লাহ তাআলার ক্ষমতা ও বান্দার প্রতি তাঁর দয়া-অনুগ্রহ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান রাখা। যখন কেউ এই উভয় দিক প্রত্যক্ষ করেও আল্লাহর সামনে নিজেকে অর্পণ করে না, তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয় না এবং তাঁর প্রতি মহাব্বতের টান অনুভব করে না; তখন তার জেনে রাখা উচিত, তার নফস হলো আল্লাহর কাছ থেকে বিতাড়িত নফস, তার অবস্থান আল্লাহ থেকে অনেক দূরে, সে আল্লাহর বন্ধুত্ব ও নৈকট্যলাভের যোগ্য নয়; অথবা বিভিন্ন বিপদাপদ ও বালা-মুসিবত দিয়ে আল্লাহ তাকে পরীক্ষা করছেন।
সন্তুষ্টি ও মহাব্বতের পথ বান্দাকে ভ্রমণ করাতে থাকে, যদিও সে তার বিছানায় শুয়ে থাকে, ফলে সে আল্লাহর পথের অন্যান্য অভিযাত্রীদের চেয়ে সামনে এগিয়ে যায় এবং তাদেরকে ছাড়িয়ে যায়।