📄 আল্লাহর নিকট অভিযোগ করা সবর-পরিপন্থি নয়
আল্লাহ তাআলার নিকট অভিযোগ করা সবরের পরিপন্থি কিছু নয়। কারণ ইয়া'কূব উত্তম সবর (الصَّبْرُ الجَمِيلُ)-এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আর নবিগণ কোনো প্রতিশ্রুতি দিলে তা ভঙ্গ করেন না, এরপরেও তিনি বলেছিলেন,
إِنَّمَا أَشْكُوْ بَنِي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ "আমি আমার অসহ্য যন্ত্রণা ও দুঃখের ব্যাপারে কেবল আল্লাহর নিকটই ফরিয়াদ করছি।”[৪৬৩]
এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা আইয়্যুব -এর ব্যাপারে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি তাকে ধৈর্যশীল পেয়েছেন। এ সত্ত্বেও আইয়্যুব বলেছিলেন,
أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنْتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ "আমি রোগাক্রান্ত হয়েছি; অথচ তুমি করুণাকারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ করুণাকারী। ” [৪৬৪]
আসলে সবর-পরিপন্থি হলো আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা এবং আল্লাহর নামে অভিযোগ করা। আল্লাহর কাছে অভিযোগ করা নয়। যেমন পূর্ববর্তী মনীষীদের কেউ এক ব্যক্তিকে দেখলেন, নিজের অভাব-অনটনের ব্যাপারে আরেকজনের কাছে অভিযোগ করছে। তখন তিনি তাকে বললেন, 'হে অমুক, যে তোমার ওপর দয়া- অনুগ্রহ করে, তাঁর নামে এমন ব্যক্তির কাছে অভিযোগ করছো, যে তোমার ওপর সামান্যতম দয়া-অনুগ্রহও করে না? এরপর তিনি আবৃত্তি করেন,
وَإِذَا عَرَتْكَ بَلِيَّةٌ فَاصْبِرْ لَهَا ... صَبْرَ الْكَرِيمِ فَإِنَّهُ بِكَ أَعْلَمُ وَإِذَا شَكَوْتَ إِلَى ابْنِ آدَمَ إِنَّمَا ... تَشْكُو الرَّحِيمَ إِلَى الَّذِينَ لَا يَرْحَمُ
তোমার কাছে বিপদাপদ এলে সবর কোরো ভদ্রমতো; কারণ তোমার ব্যাপারে আল্লাহ আছেন অধিক জ্ঞাত। তুমি আদম-সন্তানের কাছে অভিযোগ করছো—এর অর্থ যে দয়া করে না তার কাছে দয়ালুর নামে নালিশ অবিরত।
টিকাঃ
[৪৬৩] সূরা ইউসুফ, ১২: ৮৬।
[৪৬৪] সূরা আম্বিয়া, ২১:৮৩।
📄 সবর এবং মহাব্বত
মহাব্বত বা আল্লাহকে ভালোবাসার পথে সবর হলো সবচেয়ে শক্তিশালী ও কার্যকরী মানযিল। মহাব্বতকারীরা একেই আঁকড়ে ধরে। তারা অন্য সব মানযিলের চেয়ে এর প্রতি বেশি মুখাপেক্ষী থাকে। এটি হলো তাওহীদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রজ্ঞাময় ও সুস্পষ্ট মানযিল। মহাব্বতকারীর জন্য এর প্রয়োজনীয়তা অত্যাবশ্যক।
যদি প্রশ্ন করা হয় : মহাব্বতকারীদের জন্য কীভাবে সবরের প্রয়োজন অনেক বেশি?
উত্তরে বলা হবে : সবরই হলো সেই রহস্য, যার কারণে এটি মহাব্বতের পথে সবচেয়ে শক্তিশালী মানযিল। সবরের মাধ্যমেই মহাব্বতের বিষয়ে খাঁটি ও ভেজালের মধ্যে পার্থক্য রচিত হবে, জানা যাবে কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা। কারণ প্রিয় মানুষের পছন্দ ও অপছন্দের ক্ষেত্রে কষ্টকর বিষয়ে সবর করার শক্তির মাধ্যমেই প্রমাণ হবে মহাব্বতের বিশুদ্ধতা।
এখানে এসেই বোঝা যায় যে, অধিকাংশ মানুষের মহাব্বত মিথ্যা ছিল। কারণ প্রত্যেকেই আল্লাহর মহাব্বতের দাবি করে, কিন্তু কষ্টকর কোনো বিপদাপদ দিয়ে পরীক্ষা করার সময় তারা প্রকৃত মহাব্বত থেকে বেরিয়ে যায়। তখন তাতে কেবল ধৈর্যশীল ব্যক্তিরাই টিকে থাকে। যদি দুঃখ-কষ্ট ও ব্যথা-বেদনার মধ্য দিয়ে যেতে না হতো, তা হলে তাদের মহাব্বতের বিশুদ্ধতা প্রমাণিত হতো না। এগুলোর দ্বারাই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, সেই ব্যক্তিই মহাব্বতের দাবিতে সবচেয়ে খাঁটি, যার সবর থাকে সবচেয়ে কঠিন।
এ কারণেই আল্লাহ তাআলা তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ও বিশেষ বিশেষ বান্দাদের সবরের গুণে গুণান্বিত করেছেন। তিনি তাঁর পছন্দনীয় বান্দা আইয়্যুব সম্পর্কে বলেছেন,
إِنَّا وَجَدْنَاهُ صَابِرًا "আমি তাঁকে ধৈর্যশীল পেয়েছি।”[৪৬৫]
এরপর তাঁর প্রশংসা করে বলেছেন,
نِعْمَ الْعَبْدُ إِنَّهُ أَوَّابٌ "উত্তম বান্দা ছিল সে, নিজের রবের অভিমুখী।”[৪৬৬]
আল্লাহ তাআলা সবরের মাহাত্ম্যের কারণে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বান্দাদের সবর করার আদেশ দিয়েছেন। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাদের সবর হলো আল্লাহর তাওফীকেই এবং তাঁরই সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে। তিনি সবরকারীদের উত্তম প্রশংসা করেছেন। অন্য আমলকারীদের সাওয়াব করেছেন গণনাযোগ্য আর সবরকারীদের সাওয়াব করেছেন বেহিসাব। সবরকে ইসলাম, ঈমান, ইহসান ইত্যাদির সাথে যুক্ত করেছেন; যেমন পূর্বে এর আলোচনা অতিবাহিত হয়েছে। ফলে তিনি সবরকে তাওয়াক্কুল, ইয়াকীন, ঈমান, আমল ও তাকওয়ার নিকটবর্তী করেছেন।
টিকাঃ
[৪৬৫] সূরা সাদ, ৩৮: ৪৪।
[৪৬৬] সূরা সাদ, ৩৮:৪৪।