📄 সবরের পরিচয় এবং সবর সম্পর্কে বিজ্ঞজনদের বাণী
الصَّبْرُ শব্দটির শাব্দিক অর্থ: আটকে রাখা, বাধা দেওয়া বা বিরত রাখা। যখন কাউকে কোথায় বন্দি করে আটকে রেখে হত্যা করা হয়, তখন এই অর্থের প্রতি লক্ষ করেই তার ব্যাপারে বলা হয় قُتِلَ فُلَانٌ صَبْرًا )অমুককে আটকে রেখে হত্যা করা হয়েছে)। এই অর্থে সবরের ব্যবহার কুরআনেও পাওয়া যায়; যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُوْنَ رَبَّهُم بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ "আপনি নিজেকে তাদের সাথে আবদ্ধ রাখুন, যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের পালনকর্তার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে তাঁকে ডাকে।"[৪৫৩]
এখানে اِصْبِرْ نَفْسَكَ অর্থ হলো নিজেকে তাদের সাথে আবদ্ধ করে রাখুন।
সুতরাং সবর অর্থ হলো : অন্তরকে অসন্তোষ হওয়া থেকে, জবানকে অভিযোগ করা থেকে আর অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি থেকে বিরত রাখা।
জুনাইদ বাগদাদি বলেছেন, 'মুমিনের জন্য দুনিয়া ছেড়ে আখিরাতের পথে চলা কষ্টহীন ও সহজসাধ্য। আল্লাহ তাআলার জন্য সৃষ্টিজগৎকে পরিত্যাগ করা এর চেয়ে একটু কঠিন। নফসের চাহিদা থেকে আল্লাহর প্রতি ধাবিত হওয়া আরেকটু কঠিন। আর আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সামনে রেখে সবর করা সবচেয়ে কঠিন।'[৪৫৪]
যুন-নূন মিসরি বলেছেন, 'সবর হলো বিরোধিতা করা থেকে দূরে থাকা।'[৪৫৫]
কেউ বলেছেন, 'সবর হলো বিপদের সময় উত্তম শিষ্টাচার দেখানো।'
কেউ বলেছেন, 'সবর হলো নিজেকে প্রকাশ না করে, অভিযোগ না করে বিপদের সময় মিশে যাওয়া।'
কেউ বলেছেন, 'নফসকে কষ্টকর কাজে অগ্রসর হতে অভ্যস্ত করে তোলা।'
কেউ বলেছেন, 'সুস্থতার সময় যেমন উত্তমভাবে অবস্থান করি, বিপদের সময়ও তেমনি অবস্থান করা।'[৪৫৬]
খাওয়াস বলেছেন, 'সবর হলো কুরআন ও সুন্নাহর হুকুম-আহকামে দৃঢ় থাকা।'[৪৫৭]
বলা হয়েছে, 'সবরকারীদের স্তর হলো পাঁচটি: ১. সাবির, ২. মুসতাবির, ৩. মুতাসাব্বির, ৪. সাবুর আর ৫. সাব্বার।
সাবির হলো: ব্যাপক, এটি সমস্ত সবরকারীদের শামিল করে। মুসতাবির হলো: যে ব্যক্তি কষ্ট করে সবরের গুণ অর্জন করে নিয়েছে এবং তাতে পূর্ণতা অর্জন করেছে। মুতাসাব্বির হলো : যে ব্যক্তি সবরের গুণে গুণান্বিত হওয়ার জন্য কঠোর পরিশ্রম করে এবং নিজের নফসকে সবরের ওপর উঠানোর চেষ্টায় মগ্ন থাকে। সাবুর হলো: গুণে ও পরিমাণে সবচেয়ে বড়ো সবরের অধিকারী, যার সবর অন্যান্যদের তুলনায় অনেক উচ্চমানের ও বেশ কঠিন। আর সাব্বার হলো: পরিমাণের দিক দিয়ে অনেক বেশি সবরের অধিকারী, এই ব্যক্তির সবরও বেশ কঠিন ও কষ্টসাধ্য।'
আলি ইবনু আবী তালিব বলেছেন, 'সবর এমন এক বাহন, যা কখনো হোঁচট খায় না।'[৪৫৮]
আবূ আলি দাক্কাক বলেছেন, 'সবর অবলম্বনকারীরা দুনিয়া-আখিরাত উভয় জগতেই ইজ্জত ও সম্মানের অধিকারী। কারণ তারা আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করে থাকে। কেননা আল্লাহ সবরকারীদের সঙ্গে থাকেন।'[৪৫৯]
আল্লাহ তাআলার এই বাণী- اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا
"তোমরা সবর করো, শত্রুদের মোকাবিলায় দৃঢ়তা দেখাও এবং যুদ্ধের জন্য সবসময় তৎপর থাকো।” [৪৬০]
এই আয়াত সম্পর্কে অনেকেই বলেছেন, এখানে নিম্ন স্তর থেকে উচ্চ স্তরের দিকে এগিয়ে যাওয়া হয়েছে। সুতরাং اَلصَّبْرُ (ধৈর্য ধরা) হলো : الْمُصَابَرَ ةُ(শত্রুর মোকাবিলায় দৃঢ়তা দেখানো)-এর চেয়ে নিম্ন স্তরের। আবার الْمُصَائِرَةُ হলো الْمُرَابَطَةُ (যুদ্ধের জন্য সবসময় তৎপর থাকা)-এর চেয়ে নিম্ন স্তরের। الْمُرَابَطَةُ হলো اَلرَّبْطُ থেকে বাবে মুফাআলার সীগাহ; যার অর্থ: বেঁধে রাখা। 'মুরাবিত'কে এ কারণেই মুরাবিত বলা হয় যে, সে তাঁর ঘোড়াকে বেঁধে রেখে জিহাদের ডাক আসার অপেক্ষা করতে থাকে। এরপর নেককাজের জন্য নিজেকে-বেঁধে-রাখা-প্রত্যেক অপেক্ষাকারীকেই মুরাবিত বলা হয়। এই অর্থ নবি -এর একটি হাদীসেও লক্ষ করা যায়। তিনি বলেছেন,
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِمَا يَمْحُو اللَّهُ بِهِ الخَطَايَا وَيَرْفَعُ بِهِ الدَّرَجَاتِ؟ إِسْبَاغُ الْوُضُوْءِ عَلَى الْمَكَارِهِ وَكَثرَة الخُطى إِلَى الْمَسَاجِدِ وَانْتِظَارُ الصَّلَاةِ فَذَلِكُمُ الرِّبَاطُ فَذُلِكُمُ الرِّبَاطُ
"আমি কি তোমাদেরকে এমন বস্তু সম্পর্কে জানিয়ে দেবো না, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেবেন এবং মর্যাদার স্তর বাড়িয়ে দেবেন? (তা হলো) কষ্টের সময় পরিপূর্ণরূপে ওজু করা, মাসজিদের দিকে বেশি বেশি কদম উঠানো এবং সালাতের জন্য অপেক্ষা করা; আর এটিই হলো 'রিবাত', আর এটিই হলো 'রিবাত' (অর্থাৎ সীমান্ত প্রহরায় নিজেকে আবদ্ধ রাখার ন্যায় সাওয়াবের আমল।)” [৪৬১]
সুতরাং সবর হলো আপনার নিজের নফসের সাথে, মুসাবারাহ হলো আপনার ও আপনার শত্রুর মধ্যে আর মুরাবাতাহ হলো মজবুতভাবে লেগে থাকা, শক্তি ও পাথেয় প্রস্তুত করা। যেমন রিবাত হলো সীমান্ত প্রহরায় সবসময় সতর্ক থাকা, যাতে শত্রুপক্ষ কোনো দিক দিয়ে আক্রমণ করে না বসে; ঠিক তেমনি মুরাবাতাহ হলো অন্তরের সীমানা পাহারা দেওয়ায় সবসময় নিযুক্ত থাকা, যাতে অন্তরের ওপর শয়তান আক্রমণ করে না বসে, ফলে সে অন্তরের মালিক হয়ে যাবে বা অন্তর বরবাদ করে দেবে বা অন্তরের সবকিছু বিশৃঙ্খল করে দেবে।
টিকাঃ
[৪৫৩] সূরা কাহফ, ১৮ : ২৮।
[৪৫৪] তাজুদ্দীন ইবনুস সুবকি, তবাকাতুশ শাফিয়িয়্যাতিল কুবরা, ২/২৬৪।
[৪৫৫] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ১/৩২৩।
[৪৫৬] আবদুল কাদীর জীলানি, আল-গুনইয়া লি-তালিবী তরীকিল হাক, ২/৩২৮।
[৪৫৭] শাতিবি, আল-ই'তিসাম, ২/১৬৭।
[৪৫৮] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ১/৩২৪।
[৪৫৯] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ১/৩২৫।
[৪৬০] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ২০০।
[৪৬১] মুসলিম, ২৫১।
📄 গুনাহের সাথে সম্পৃক্ততার বিচারে সবরের প্রকারভেদ
সবর তিন প্রকার : ১. নেক আমলের ওপর অবিচল থাকার যে কষ্ট, তার ওপর সবর করা, ২. আল্লাহর নাফরমানি থেকে বেঁচে থাকার যে কষ্ট, তার ওপর সবর করা এবং ৩. আল্লাহর দেওয়া পরীক্ষা অর্থাৎ বিভিন্ন বিপদাপদের যে কষ্ট, তার ওপর সবর করা।
প্রথম দুটি হলো: বান্দার কাজকর্মের সাথে সম্পর্কিত বিষয়াদির ওপর সবর। আর তৃতীয়টি হলো: এমন বিষয়ের ওপর সবর, বান্দার কাজকর্মের সাথে যার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
আমি শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা -কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, 'মিশরের বাদশাহর স্ত্রীর খারাপ প্ররোচনার ওপর ইউসুফ যে সবর করেছিলেন, তা সেই সবরের তুলনায় অনেক বেশি পরিপূর্ণ ছিল, যে সবর তিনি করেছিলেন তার ভাইয়েরা তাকে কূপে নিক্ষেপ করার সময়, এরপর তাকে বিক্রয় করা ও তার পিতা থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করার সময়। কারণ এই সবগুলো হয়েছিল তার অনিচ্ছায়, সেখানে তার কিছুই করার ছিল না, এ রকম পরিস্থিতিতে বান্দার ধৈর্য ধরা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।
কিন্তু ফাহিশা বা খারাপ কাজটিতে জড়িয়ে পড়া থেকে তার সবর করা ছিল স্বেচ্ছায়, সন্তুষ্টচিত্তে এবং নফসের সাথে যুদ্ধ করার সবর। বিশেষ করে এমন সব উপকরণ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও, যা ছিল ওই পাপ কাজে লিপ্ত হওয়ার শক্তিশালী কারণ। যেমন তিনি ছিলেন যুবক; এ সময়টায় যৌবনের তাড়না থাকে যথেষ্ট প্রবল। তিনি ছিলেন অবিবাহিত; ফলে জৈবিক চাহিদা ও কামবাসনা পূরণের বিকল্প কোনো পথও ছিল না। তিনি ছিলেন প্রবাসী; আর প্রবাসীরা অপরিচিতদের ভিড়ে কোনো কাজ করতে তেমন লজ্জা অনুভব করে না, যেমনটি অনুভব করে নিজ দেশে পরিচিত ও আপনজনদের মাঝে থাকাবস্থায়। তিনি ছিলেন গোলাম; আর গোলামের কাজে স্বাধীন মানুষের মতো তেমন বেশি প্রতিবন্ধকতা থাকে না। নারীটিও ছিল বেশ সুন্দরী, উঁচু বংশের, তার মনিব, আবার সেখানে কোনো পর্যবেক্ষণকারীও ছিল না, সেই নারী নিজেই তাকে সে কাজে আহ্বান করেছে, সে ব্যাপারে ওই নারী ছিল প্রচণ্ড আগ্রহী, এতকিছু সত্ত্বেও তিনি যদি সে পাপ কাজে সাড়া না দেন, তাহলে তাকে বন্দি করা ও লাঞ্ছিত করার হুমকি দিয়েছিল বাদশাহর সেই স্ত্রী। কিন্তু ইউসুফ এত সব আয়োজন থাকা সত্ত্বেও নিজ ইচ্ছায় এবং আল্লাহর নিকট যা আছে, সেগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। এই সবরের সাথে তার সেই সবরের কী কোনো তুলনা হয়, যা তিনি কূপে নিক্ষিপ্ত হবার সময় করেছিলেন, যাতে তার কোনো অন্য উপায় ছিল না?!'
তিনি আরও বলেছেন, 'নেককাজ আদায় করার যে কষ্ট, তার ওপর সবর করা, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার যে কষ্ট, তার ওপর সবর করার চেয়ে অধিক পরিপূর্ণ ও উত্তম। কারণ নেককাজ করার উপকারিতা, গুনাহ পরিত্যাগ করার উপকারিতার তুলনায় শারীআত প্রণেতার নিকট অধিক প্রিয়। এমনিভাবে গুনাহে লিপ্ত হওয়ার ক্ষতির তুলনায় নেককাজ না করার ক্ষতি তাঁর নিকট বেশি অপছন্দনীয়।'
📄 আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ততার বিচারে সবরের প্রকারভেদ
এ ক্ষেত্রেও সবর তিন প্রকার:
১. আল্লাহর তাওফীকে সবর, ২. আল্লাহর জন্য সবর এবং ৩. আল্লাহর সাথে সবর।
১. আল্লাহর তাওফীকে সবর: এটি হলো আল্লাহ তাআলার নিকট সবরের প্রার্থনা করা এবং এই দৃষ্টিভঙ্গি রাখা যে, আল্লাহ তাআলাই সবর দানকারী এবং বান্দার সবর কেবল তাঁরই দান, এতে তার নিজের কোনো অর্জন নেই। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَاصْبِرْ وَمَا صَبْرُكَ إِلَّا بِاللَّهِ “সবর অবলম্বন করো আর তোমার এ সবর কেবল আল্লাহরই দান।” [৪৬২]
অর্থাৎ আল্লাহ যদি সবরের তাওফীক না দিতেন, তা হলে আপনি সবরের গুণে গুণান্বিত হতে পারতেন না।
২. আল্লাহর জন্য সবর: এ ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণের উদ্দেশ্য হবে আল্লাহ তাআলার মহব্বত, সন্তুষ্টি ও নৈকট্যলাভ। নিজের নফসের শক্তি প্রকাশ, মানুষের প্রশংসা লাভ বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য নয়।
৩. আল্লাহর সাথে সবর : বান্দা দ্বীনের ক্ষেত্রে কেবল আল্লাহ তাআলার চাওয়া ও তাঁর হুকুম-আহকামের সাথেই আবর্তিত হবে। তা তাকে সবর করতে বললে সে সবর করবে, চলতে বললে চলবে, থামতে বললে থামবে, যেদিকে নিয়ে যাবে সেদিকেই যাবে আর যেখানে অবতরণ করাবে সেখানেই অবতরণ করবে।
সুতরাং এটিই হলো 'আল্লাহর সাথে সবর করা'র অর্থ। অর্থাৎ বান্দা নিজেকে আল্লাহ তাআলার হুকুম ও মহব্বতের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে রাখবে। এটি সবরের সবচেয়ে কষ্টসাধ্য ও কঠিন প্রকার। এটি হলো সিদ্দীকের মর্যাদায় উত্তীর্ণ ব্যক্তিদের সবর।
সঠিক অভিমত হলো: আল্লাহর জন্য সবর হলো আল্লাহর তাওফীকে সবরের তুলনায় শ্রেষ্ঠ ও বেশি মর্যাদাপূর্ণ। এর একটি কারণ হচ্ছে, আল্লাহর জন্য সবর হলো: তাঁর ইলাহিয়্যাত বা ইবাদাতসংক্রান্ত বিষয়াদির সাথে সম্পর্কিত এবং আল্লাহর তাওফীকে সবর হলো: তাঁর রুবুবিয়্যাত বা পরিচালনাগত বিষয়াদির সাথে সম্পর্কিত। আর তাঁর ইলাহিয়্যাতের সাথে সম্পর্কিত বিষয়াদি তাঁর রুবুবিয়্যাতের সাথে সম্পর্কিত বিষয়াদির তুলনায় অধিক পরিপূর্ণ ও মহত্তর।
আরেকটি কারণ : আল্লাহর জন্য সবর করা হলো ইবাদাত আর আল্লাহর তাওফীকে সবর করা হলো সাহায্য প্রার্থনা। ইবাদাত হলো উদ্দেশ্য আর সাহায্য প্রার্থনা করা হলো মাধ্যম। সুতরাং মাধ্যমের তুলনায় উদ্দেশ্যই হয় প্রত্যাশিত ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আরেকটি কারণ : আল্লাহর তাওফীকে সবর করা এতে মুমিন-কাফির, সৎ-অসৎ সবাই অন্তর্ভুক্ত। আসলে যে-ই গভীরভাবে আল্লাহ তাআলার সৃষ্টিজগতের প্রকৃত অবস্থা প্রত্যক্ষ করে, সে-ই আল্লাহর নিকট সবরের তাওফীক চায়। আর আল্লাহর জন্য সবর হলো নবি, রাসূল, সিদ্দীক এবং إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর গুণে গুণান্বিত ব্যক্তির মানযিল।
আরেকটি কারণ: আল্লাহর জন্য সবর কেবল সেসব ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে; যা আল্লাহর হক, পছন্দনীয় এবং সন্তুষ্টিজনক। পক্ষান্তরে আল্লাহর তাওফীকে সবর কখনো তাঁর পছন্দনীয় ক্ষেত্রে হয়ে থাকে আবার কখনো তার অপছন্দনীয় ও ঘৃণিত ক্ষেত্রেও হয়ে থাকে। এ জন্য এই সবর দুইয়ের মধ্যে রয়েছে অনেক ব্যবধান!
এ কারণে নূহ, ইবরাহীম, মূসা ও ঈসা আল্লাহ তাআলার দ্বীনের জন্য স্বেচ্ছায় ও স্বপ্রণোদিত হয়ে যে সবর করেছিলেন, তা আইয়্যুব -এর সবরের চেয়ে পরিপূর্ণ ছিল। কারণ আইয়্যুব যে কষ্ট ও বিপদাপদের মধ্যে পড়েছিলেন, তা তার ইচ্ছাধীন ছিল না এবং তাতে তার কর্মেরও কোনো প্রভাব ছিল না।
এমনিভাবে ইসমাঈল যবীহ ও তাঁর পিতা ইবরাহীম আল্লাহর তাআলার হুকুম বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যে সবর করেছিলেন, তা ইয়া'কূব তাঁর ছেলে ইউসুফ -কে হারিয়ে যে সবর করেছিলেন তার তুলনায় পূর্ণাঙ্গ ছিল।
ওপরের আলোচনার মাধ্যমে আপনি জানতে পারলেন যে, আল্লাহর জন্য সবর করা, আল্লাহর তাওফীকে সবরের চেয়ে পরিপূর্ণ। এমনিভাবে আল্লাহর আনুগত্য করা ও তাঁর অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকার ওপর সবর করা, আল্লাহর তাকদীরি ফায়সালা ও পরীক্ষার ওপর সবর করার চেয়ে পরিপূর্ণ। আল্লাহ তাআলাই সাহায্য-লাভের একমাত্র উৎস, ভরসা করতে হবে কেবল তাঁরই ওপর, মহামহিম আল্লাহ ছাড়া না আছে কারও কোনো শক্তি, আর না আছে কোনো সামর্থ্য।
টিকাঃ
[৪৬২] সূরা নাহল, ১৬: ১২৭।
📄 আল্লাহর নিকট অভিযোগ করা সবর-পরিপন্থি নয়
আল্লাহ তাআলার নিকট অভিযোগ করা সবরের পরিপন্থি কিছু নয়। কারণ ইয়া'কূব উত্তম সবর (الصَّبْرُ الجَمِيلُ)-এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আর নবিগণ কোনো প্রতিশ্রুতি দিলে তা ভঙ্গ করেন না, এরপরেও তিনি বলেছিলেন,
إِنَّمَا أَشْكُوْ بَنِي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ "আমি আমার অসহ্য যন্ত্রণা ও দুঃখের ব্যাপারে কেবল আল্লাহর নিকটই ফরিয়াদ করছি।”[৪৬৩]
এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা আইয়্যুব -এর ব্যাপারে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি তাকে ধৈর্যশীল পেয়েছেন। এ সত্ত্বেও আইয়্যুব বলেছিলেন,
أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنْتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ "আমি রোগাক্রান্ত হয়েছি; অথচ তুমি করুণাকারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ করুণাকারী। ” [৪৬৪]
আসলে সবর-পরিপন্থি হলো আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা এবং আল্লাহর নামে অভিযোগ করা। আল্লাহর কাছে অভিযোগ করা নয়। যেমন পূর্ববর্তী মনীষীদের কেউ এক ব্যক্তিকে দেখলেন, নিজের অভাব-অনটনের ব্যাপারে আরেকজনের কাছে অভিযোগ করছে। তখন তিনি তাকে বললেন, 'হে অমুক, যে তোমার ওপর দয়া- অনুগ্রহ করে, তাঁর নামে এমন ব্যক্তির কাছে অভিযোগ করছো, যে তোমার ওপর সামান্যতম দয়া-অনুগ্রহও করে না? এরপর তিনি আবৃত্তি করেন,
وَإِذَا عَرَتْكَ بَلِيَّةٌ فَاصْبِرْ لَهَا ... صَبْرَ الْكَرِيمِ فَإِنَّهُ بِكَ أَعْلَمُ وَإِذَا شَكَوْتَ إِلَى ابْنِ آدَمَ إِنَّمَا ... تَشْكُو الرَّحِيمَ إِلَى الَّذِينَ لَا يَرْحَمُ
তোমার কাছে বিপদাপদ এলে সবর কোরো ভদ্রমতো; কারণ তোমার ব্যাপারে আল্লাহ আছেন অধিক জ্ঞাত। তুমি আদম-সন্তানের কাছে অভিযোগ করছো—এর অর্থ যে দয়া করে না তার কাছে দয়ালুর নামে নালিশ অবিরত।
টিকাঃ
[৪৬৩] সূরা ইউসুফ, ১২: ৮৬।
[৪৬৪] সূরা আম্বিয়া, ২১:৮৩।