📄 মানযিল : নির্দ্বিধায় মেনে নেওয়া (اَلتَّسْلِيمُ)
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ-এর আরেকটি মানযিল হলো-নির্দ্বিধায় মেনে নেওয়ার মানযিল।
এটি দুই প্রকার : ১. আল্লাহর আদেশসূচক দ্বীনি ফায়সালা মেনে নেওয়া এবং ২. মহাবিশ্বসংক্রান্ত আল্লাহর তাকদীরি ফায়সালা মেনে নেওয়া।
প্রথম প্রকারটি হলো: মুমিন ও আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞানী ব্যক্তিদের তাসলীম বা মেনে নেওয়া। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا )
“না, আপনার রবের কসম, এরা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ-না এদের পারস্পরিক মতবিরোধের ক্ষেত্রে এরা আপনাকে ফায়সালাকারী হিসেবে মেনে নেবে, অতঃপর আপনার ফায়সালা সম্পর্কে নিজেদের মনে কোনো প্রকার দ্বিধা ও জটিলতা খুঁজে পাবে না, বরং নির্দ্বিধায় তা মেনে নেবে।” [৪২৭]
এই তিনটি স্তরকে বিবেচনা করা জরুরি: ১. (নবিজিকে) বিচারক বানানো, ২. দ্বিধা ও সংকীর্ণতা ঝেড়ে ফেলে বক্ষকে প্রশস্ত করা এবং ३. মনেপ্রাণে মেনে নেওয়া।
মহাবিশ্বসংক্রান্ত আল্লাহর তাকদীরি ফায়সালা মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে অধিকাংশ মানুষের পদস্খলন ঘটে। এ বিষয়টি তাদেরকে পেরেশান করে তোলে এবং ঝগড়ায় লিপ্ত করে। সেটি হলো 'রিযা বিল কাযা' বা তাকদীরে সন্তুষ্ট থাকার মাসআলা। পূর্বে এর যথেষ্ট আলোচনা অতিবাহিত হয়েছে। আমরা বলেছি, ফায়সালা মেনে নেওয়া তখনই প্রশংসনীয়, যখন বান্দাকে সে ব্যাপারে চেষ্টা-তাদবীর ও প্রতিরোধ করার হুকুম দেওয়া না হয়, এবং সে ওই ব্যাপারে সক্ষমও নয়; যেমন বিপদাপদে আক্রান্ত হওয়া; যা প্রতিহত করা বা দমিয়ে রাখার ক্ষমতা বান্দার নেই।
পক্ষান্তরে যে বিষয়ে প্রতিরোধ ও চেষ্টা করার আদেশ দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে কিছুই না করে শুধু মেনে নেওয়া জায়িয নয়। বরং সেই বিষয়গুলোকে (আল্লাহ তাআলার) অন্য হুকুম দ্বারা প্রতিহত করার মাধ্যমে আল্লাহর দাসত্ব করা আল্লাহর নিকট বেশি পছন্দনীয়।
জেনে রাখবেন, তাসলীম বা মেনে নেওয়া হলো: শারঈ বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো সন্দেহ করা থেকে বিরত থাকা, আল্লাহর আদেশের সাথে সাংঘর্ষিক কামনা করা থেকে বিরত থাকা, ইখলাসের বিপরীত ইচ্ছা করা থেকে এবং শরীআত ও তাকদীরের ওপর আপত্তি করা থেকে বিরত থাকা। এই সব গুণের অধিকারী ব্যক্তিই হলো সেই অন্তরের অধিকারী ব্যক্তি, কিয়ামাতের দিন যেই অন্তর নিয়ে না এলে কেউ নাজাত পাবে না। কারণ তাসলীম হলো বিরোধিতায় লিপ্ত হওয়ার বিপরীত।
বিরোধিতা করা বা মেনে না নেওয়া সৃষ্টি হয় এমন ভ্রান্ত সন্দেহের কারণে, যা আল্লাহ তাআলা নিজ সত্তা ও গুণাবলি সম্পর্কে যে সংবাদ দিয়েছেন, তার সাথে সাংঘর্ষিক; অথবা তিনি আখিরাতের জগৎ সম্পর্কে যে খবর জানিয়েছেন, তার বিপরীত অথবা এ রকম অন্যান্য বিষয়ে। সুতরাং এগুলোর ক্ষেত্রে তাসলীম হলো: মুতাকাল্লিমীন বা দার্শনিকদের বিভ্রান্ত চিন্তাচেতনার কারণে নিজে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও সংশয়ে জড়িয়ে না পড়া।
অথবা (বিরোধিতা করা বা মেনে না নেওয়া সৃষ্টি হয়) এমন কামনার কারণে, যা আল্লাহ তাআলার আদেশের সাথে সাংঘর্ষিক। সুতরাং আল্লাহর আদেশের ক্ষেত্রে তাসলীম বা মেনে নেওয়া হলো: অসংযত ও বেপরোয়া কামনা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা।
অথবা (বিরোধিতা করা বা মেনে না নেওয়া সৃষ্টি হয়) এমন ইচ্ছার কারণে, যা বান্দার নিকট আল্লাহ যা চান, তার সাথে সাংঘর্ষিক। এর ফলে আল্লাহর নিকট বান্দার চাওয়ার মধ্যেও বৈপরিত্যের সৃষ্টি হয়। এ ক্ষেত্রে তাসলীম হলো: এগুলো থেকে মুক্ত থাকা।
অথবা (বিরোধিতা করা বা মেনে না নেওয়া সৃষ্টি হয়) এমন আপত্তি করার কারণে, যা সৃষ্টিজগৎ ও আদেশের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার হিকমতের বিপরীত। এমন ধারণা করা যে, শারীআত ও তাকদীরি ফায়সালা হলো যুক্তি ও প্রজ্ঞার পরিপন্থি। এ ধরনের সমস্ত বিবাদ ও বিরোধিতা থেকে বেঁচে থাকা ও মুক্ত থাকার নামই তাসলীম বা নির্দ্বিধায় মেনে নেওয়া।
উপরিউক্ত আলোচনা দ্বারা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, তাসলীম হলো ঈমানের মাকামসমূহের মধ্যে সর্বোচ্চ মাকাম ও মানযিল। বিশেষ ব্যক্তিদের বিশেষ পথ। তাসলীম হলো খাঁটি সত্যবাদিতার মানযিল; যার মর্যাদা নুবুওয়াতের মর্যাদার পরেই। যে ব্যক্তির তাসলীম বা মেনে নেওয়ার গুণটি পরিপূর্ণ হবে, তার সত্যবাদিতাও পরিপূর্ণ হবে।
টিকাঃ
[৪২৭] সূরা নিসা, ৪: ৬৫।
📄 মানযিল : বিনয় (اَلتَّوَاضُعُ)
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো-বিনয়ের মানযিল।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا
"রহমানের বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে।”[৫৭৩]
অর্থাৎ স্থিরতা, গাম্ভীর্য ও বিনয়ের সাথে পথ চলে। দাম্ভিকতা, অহংকার ও গর্বের সাথে নয়। হাসান বাসরী বলছেন, 'তারা হলেন জ্ঞানী ও সহনশীল সম্প্রদায়।' মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়্যা বলেছেন, 'গাম্ভীর্যপূর্ণ ও পবিত্র ব্যক্তিগণ, যারা মূর্খতাসুলভ আচরণ থেকে দূরে থাকেন। আর তাদের সাথে কোনো অশোভনীয় আচরণ করা হলে, তারা তা সহ্য করেন।'
'সহীহ মুসলিম'-এ এসেছে, ইয়ায ইবনু হিমার থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ বলেছেন, إِنَّ اللَّهَ أَوْحَى إِلَى أَنْ تَوَاضَعُوا حَتَّى لَا يَفْخَرَ أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ وَّلَا يَبْغِيَ أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ
"আল্লাহ তাআলা আমার নিকট ওহি পাঠিয়েছেন যে, তোমরা বিনয়ী হও, কেউ যেন কারও ওপর গর্ব না করে এবং কেউ যেন কারও প্রতি অবিচার না করে।” [৫৭৪]
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল বলেছেন,
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِّنْ كِبْرٍ
"যার অন্তরে বিন্দু পরিমাণও অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।"[৫৭৫]
'সহীহাইন'-এর বর্ণনায় এসেছে, নবি বলেছেন,
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ النَّارِ كُلُّ عُتُلٍ جَوَّاظٍ مُسْتَكْبِرٍ
"আমি কি তোমাদেরকে জাহান্নামবাসীর পরিচয় জানাব না? তারা হবে প্রত্যেক নিষ্ঠুর, দাম্ভিক ও অহংকারী লোক।”[৫৭৬]
আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ জান্নাত-জাহান্নামের তর্কবিতর্ক সম্পর্কে বলেছেন, "জাহান্নাম বলবে,
مَا لِي لَا يَدْخُلُنِي إِلَّا الْجَبَّارُوْنَ وَالْمُتَكَبِّرُونَ
'আমার কী হলো, আমার মধ্যে কেবল দাম্ভিক ও অহংকারীরাই প্রবেশ করছে!'
জান্নাত বলবে,
مَا لِي لَا يَدْخُلُنِي إِلَّا ضُعَفَاءُ النَّاسِ وَسَقَطُهُمْ
'আমার কী হলো, আমার মধ্যে কেবল দুর্বল ও অসহায় ব্যক্তিরাই প্রবেশ করছে!'[৫৭৭]
'সহীহ মুসলিম'-এর এক বর্ণনায় এসেছে, আবূ সাঈদ খুদরি ও আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, তারা বলেন, 'রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
الْعِزُّ إِزَارُهُ، وَالْكِبْرِيَاءُ رِدَاؤُهُ، فَمَنْ يُنَازِعُنِي عَذَّبْتُهُ
"সম্মান হলো আল্লাহ তাআলার জামা আর অহংকার হলো তাঁর চাদর। (আল্লাহ বলেন) যে ব্যক্তি আমার সাথে তা নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করবে, আমি অবশ্যই তাকে শাস্তি দেবো।”[৫ ৭৮]
নবি ছোটো ছোটো শিশুদের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদেরকে সালাম দিতেন।[৫৭৯]
দাসীও রাসূলুল্লাহ -এর হাত ধরে যেখানে ইচ্ছা নিয়ে যেত। আর তিনিও তার সাথে তার ইচ্ছামতো চলে যেতেন।[৫৮০]
নবি যখন ঘরে থাকতেন, ঘরের লোকজনকে তাদের কাজে সাহায্য করতেন।[৫৮১]
আল্লাহর রাসূল নিজের জুতা নিজেই মেরামত করতেন, নিজের কাপড় নিজেই সেলাই করতেন, পরিবারের লোকজনদের জন্য বকরির দুধ দোহন করতেন, খাদিমের সঙ্গে বসে খাবার খেতেন, ইয়াতীম ও বিধবাদের প্রয়োজন পুরা করতেন, কারও সাথে দেখা হলে তিনিই আগে সালাম দিতেন আবার কেউ দাওয়াত করলে তা গ্রহণ করতেন, তা যত সামান্য বস্তুর জন্যই হোক না কেন।
নবি বলেছেন,
لَوْ دُعِيْتُ إِلَى ذِرَاعٍ أَوْ كُرَاعٍ لَأَجَبْتُ وَلَوْ أُهْدِيَ إِلَيَّ ذِرَاعٌ أَوْ كُرَاعٌ لَقَبِلْتُ
"যদি আমাকে পশুর পায়া বা হাতা খেতে দাওয়াত করা হয়, তবুও আমি তা কবুল করব। আর যদি আমাকে পায়া বা হাতা হাদিয়া দেওয়া হয়, তা হলে অবশ্যই আমি তা গ্রহণ করব।”[৫৮২]
নবি অসুস্থ ব্যক্তিদের দেখতে যেতেন, জানাযায় উপস্থিত হতেন এবং গোলাম বা দাসের দাওয়াতও কবুল করতেন।
ফুযাইল ইবনু ইয়ায-কে একবার বিনয় ( تواضع ) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো। উত্তরে তিনি বললেন, 'বিনয় হলো-হক ও সত্যের প্রতি নত হওয়া, তা মেনে নেওয়া এবং তা যে-ই বলুক, তার থেকে তা গ্রহণ করা।'[৫৮৩]
কেউ কেউ বলেছেন, 'বিনয় হলো নিজেকে মূল্যহীন দেখা। যে নিজেকে মূল্যবান মনে করে, বিনয়ে তার কোনো অংশ নেই।' এটি ফুযাইল-সহ আরও কতিপয় আলিমের মত।[৫৮৪]
জুনাইদ বাগদাদি বলেছেন, 'তাওয়াজু' হলো: ডানাকে নত করা এবং পার্শ্বকে নরম করা।'
আবূ ইয়াযীদ বুসতামি বলেছেন, 'নিজের কোনো মর্যাদা ও অবস্থান চোখে না পড়া এবং সৃষ্টির মধ্যে নিজের থেকে খারাপ আর কাউকে না দেখা।'[৫৮৫]
ইবনু আতা বলেছেন, 'বিনয় হলো সত্যকে গ্রহণ করা, তা যার কাছেই থাকুক। আর বিনয়ের মধ্যেই নিহিত রয়েছে প্রকৃত সম্মান। যে ব্যক্তি অহংকারের মধ্যে তা তালাশ করে, সে ওই ব্যক্তির মতো যে আগুনের মধ্যে পানি খোঁজে।'
উরওয়া ইবনুয যুবাইর বলেন, 'আমি উমর ইবনুল খাত্তাব-এর কাঁধে পানির মশক দেখে বললাম, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আপনার জন্য এটা শোভা পায় না।' জবাবে তিনি বললেন, 'বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধিদল যখন নত হয়ে, আনুগত্য স্বীকার করে আমার কাছে আসে, তখন আমার অন্তরে কিছুটা অহমিকা চলে আসে, আমি পছন্দ করি যে, তা ভেঙে দিই।'[৫৮৬]
আবূ হুরায়রা একবার আমীর নিযুক্ত হলেন। তখন তিনি নিজের পিঠে করে কাঠের বোঝা বহন করতেন আর বলতেন, 'আমীরকে পথ করে দাও, আমীরকে পথ করে দাও!'[৫৮৭]
রজাহ ইবনু হাইওয়া বলেন, 'উমর ইবনু আবদিল আযীয যে পোশাক পরে খুতবা দিতেন, তার মূল্য ছিল মাত্র বারো দিরহাম। পোশাকের মধ্যে ছিল-একটি জুব্বা, একটি পাজামা, একটি পাগড়ি, দুটি মোজা আর একটি টুপি।'[৫৮৮]
মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াসি' তার এক ছেলেকে দেখলেন দাম্ভিকতার সাথে হাঁটছে। তখন তিনি তাকে বললেন, 'তুমি জানো, তোমার মাকে আমি কত দিরহাম দিয়ে কিনেছি? মাত্র তিনশ দিরহাম। আর তোমার বাবা? আমি! আল্লাহ যেন মুসলমানদের মধ্যে তার মতো অধিক (মানুষ) না বানান! আর তুমি এভাবে দাম্ভিকতার সাথে হাঁটছো!? [৫৮৯]
আল্লাহর সাথে সর্বপ্রথম যে গুনাহ করা হয়েছে তা হলো-অহংকার ও লোভ। অহংকার ছিল অভিশপ্ত ইবলীসের গুনাহ। আর এর পরিণতি যা হবার তা-ই হয়েছে। আর লোভ ও খাহেশ ছিল আদম-এর গুনাহ। যার পরিণতি হয়েছিল তাওবা ও হিদায়াত। ইবলীসের গুনাহ তাকে হঠকারিতা, বড়োত্ব আর মর্যাদা পাওয়ার জন্য তর্কবিতর্কের দিকে ঠেলে দিয়েছে। অপরদিকে আদম-এর গুনাহ তাকে নিজেকে দোষী বলে স্বীকার করতে এবং ইস্তিগফার করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
সুতরাং অহংকারী, হঠকারী ও দাম্ভিক ব্যক্তিদের ঠিকানা হবে তাদের শাইখ ও নেতা ইবলীসের সাথে জাহান্নামে। অপরদিকে অপরাধে লিপ্ত ও লোভী ব্যক্তি, যারা ইস্তিগফার করে, তাওবা করে, নিজের দোষ স্বীকার করে এবং বড়োত্ব লাভের জন্য তর্কবিতর্ক করে না, তাদের ঠিকানা হবে তাদের পিতা আদম-এর সাথে জান্নাতে।
আমি শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা -কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, ‘অহংকার হলো শিরকের চেয়েও নিকৃষ্ট। কারণ অহংকারী ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার ইবাদাতের ক্ষেত্রেও অহংকার করে। আর মুশরিক আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করে, তবে তার সাথে অন্যান্য উপাস্যেরও ইবাদাত করে।’ আল্লাহর রাসূল বলেছেন,
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِّنْ كِبْرٍ
"যার অন্তরে বিন্দু পরিমাণও অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" ২৯০।
টিকাঃ
[৫৭৩] সূরা ফুরকান, ২৫: ৬৩।
[৫৭৪] মুসলিম, ২৮৬৫।
[৫৭৫] মুসলিম, ৯১।
[৫৭৬] বুখারি, ৪৯১৮; মুসলিম, ২৮৫৩।
[৫৭৭] বুখারি, ৪৮৫০; মুসলিম, ২১৪৬।
[৫৭৮] মুসলিম, ২৬২০।
[৫৭৯] বুখারি, ৬২৪৭; মুসলিম, ২১৬৮।
[৫৮০] বুখারি, ৬০৭২।
[৫৮১] বুখারি, ৬৭৬।
[৫৮২] বুখারি, ২৫৬৮।
[৫৮৩] ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশূক, ৪৮/৪১৯।
[৫৮৪] ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশুক, ৪৮/৪১৯।
[৫৮৫] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ১/২৭৯।
[৫৮৬] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ১/২৭৯।
[৫৮৭] ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশ্ক। ৬৭/৩৭৩।
[৫৮৮] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৫/৩২২।
[৫৮১] ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশ্ক, ৩/৭২।
[৫৯০] মুসলিম, ৯১।
📄 মানযিল : মানবিকতা (اَلْمُرُوءَةُ)
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো-মানবিকতার মানযিল।
الْمُرُوْءَةُ হলো-আত্মাকে মানবিক গুণাবলিতে গুণান্বিত করা; যে গুণগুলোর মাধ্যমে প্রাণী ও অভিশপ্ত শয়তান থেকে মানুষ পৃথক হয়ে যায়।
ফকীহগণ এর সংজ্ঞায় বলেছেন, ' যা ব্যক্তিকে সুন্দর ও উত্তম গুণাবলিতে সুসজ্জিত করে, তা আঁকড়ে ধরা আর যা তাকে ত্রুটিযুক্ত ও মন্দ স্বভাবের বানায়, তা পরিত্যাগ করা।'
কেউ কেউ বলেছেন, 'সব ধরনের ভালো ও উত্তম আচরণ প্রয়োগ করা এবং সব ধরনের খারাপ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা।'
মুরূআত বা মানবিকতার মূল তাৎপর্য হলো-কথায়, কাজে এবং স্বভাব-চরিত্রে সমস্ত নীচতা ও হীনতা পরিহার করে চলা।
সুতরাং জিহ্বার মুরূআত : মিষ্টতা, পবিত্রতা ও কোমলতা এবং সহজ ও প্রাঞ্জলতার মাধ্যমে এর উপকারী ফল লাভ করা।
স্বভাব-চরিত্রের মুরূআত : প্রিয়জন ও দুশমন সবার প্রতিই অন্তর প্রশস্ত রাখা এবং হাসিখুশি ব্যবহার করা।
সম্পদের মুরূআত : যৌক্তিক, সামাজিক ও শারঈ দৃষ্টিকোণ থেকে কেবল প্রশংসনীয় খাতে তা ব্যয় করা।
ক্ষমতার মুরূআত : অভাবী ব্যক্তির প্রয়োজনে ক্ষমতাকে কাজে লাগানো।
দয়া-অনুগ্রহের মুরূআত: দ্রুততার সাথে বেশি বেশি দয়া ও অনুগ্রহ করতে থাকা। কারও প্রতি ইহসান করার সময় এর পরিমাণের দিকে না দেখা এবং ইহসান করার পর তা ভুলে যাওয়া।
এগুলো হলো সুন্দর ও উত্তম গুণাবলি দ্বারা নিজেকে সুসজ্জিত করার মানবিকতা।
আর মন্দ ও খারাপ গুণাবলি থেকে বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে মুরূআত হলো: ঝগড়া করা থেকে বিরত থাকা; এমনিভাবে নিন্দা করা, কারও নিকট হাতপাতা এবং তর্কবিতর্ক করা থেকে বিরত থাকা। এর তিনটি স্তর রয়েছে—
প্রথম স্তর: ব্যক্তির নিজের সাথে মানবিকতা (مُرُوْءَةُ الْمَرْءِ مَعَ نَفْسِهِ): এটি ব্যক্তিকে সমস্ত ভালো গুণাবলির দ্বারা সজ্জিত হওয়ার দিকে এবং খারাপ গুণাবলি ছেড়ে দেওয়ার দিকে মনোযোগী হতে বাধ্য করে।
দ্বিতীয় স্তর : অন্যান্য সবার সাথে মানবিকতা (الْمُرُوْءَةِ مَعَ الخُلْقِ): এটি হলো সবার সাথে শিষ্টাচার, ভদ্রতা, লজ্জাশীলতা এবং উত্তম আদব-আখলাকের সাথে মেলামেশা করা।
তৃতীয় স্তর : আল্লাহর সাথে মানবিকতা (الْمُرُوْءَةُ مَعَ الْحَقِّ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى): আল্লাহ তাআলা আপনাকে দেখছেন এবং তিনি আপনার প্রতিটি বিষয়ে খুঁটিনাটি সবকিছু অবগত আছেন—এই ভাবনায় আল্লাহকে লজ্জা পাওয়া। আর নিজের নফসের দোষত্রুটিগুলোকে সংশোধন করতে সাধ্যমতো চেষ্টা করা।
উত্তম চরিত্র ও উদারতার মানযিলে যে আলোচনা অতিবাহিত হয়েছে, সে আলোচনা এই মানযিলেও প্রযোজ্য।
📄 মানযিল : ইচ্ছা (اَلْإِرَادَةُ)
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো—ইচ্ছা বা ইরাদার মানযিল।
আল্লাহ তাআলা বলেন, وَلَا تَطْرُدِ الَّذِينَ يَدْعُوْنَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ “আর তাদেরকে তাড়িয়ে দেবেন না, যারা সকাল-বিকাল তাদের রবের ইবাদাত করে এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের ইচ্ছা করে।” [৬০০]
সুফিয়ায়ে কেরামের নিকট ইচ্ছার মানযিলের মূলকথা হলো—ইচ্ছাশূন্য হওয়া।[৬০২]
এই বিষয়ে অনেকের অনেক বক্তব্য রয়েছে। অধিকাংশের অভিমত হলো—ইরাদা হচ্ছে: অভ্যাস পরিত্যাগ করা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষের কাজগুলো অভ্যাসের বশে অন্যমনস্কতার সাথে এবং প্রবৃত্তির আহ্বানে সাড়া দিতে গিয়ে সম্পন্ন হয়। কিন্তু আল্লাহর-পথের-পথিক বা মুরীদ এর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তার থেকে (তার নিজস্ব) ইচ্ছাকে দূর করা হয়। আল্লাহর পথের পথিকের ব্যক্তিগত ইচ্ছা থেকে বের হয়ে যাওয়াটাই হচ্ছে, তার শুদ্ধ ইচ্ছার আলামত ও প্রমাণ।
কেউ কেউ বলেছেন, 'সত্যের সন্ধানে অন্তরকে জাগ্রত করা।'
দাক্কাক বলেছেন, 'ইরাদা হলো : অন্তরে জ্বলন, অস্থিরতা ও আসক্তি সৃষ্টি হওয়া এবং নিজের ভেতরে এমন তোলপাড় ও আগুন অনুভব করা, যা হৃদয়কে দগ্ধ করে দেয়।' [৬০২]
কেউ কেউ বলেছেন, 'মুরীদের অন্যতম গুণাবলি হলো—বেশি বেশি নফল আমলের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা, উম্মাতের কল্যাণকামিতায় একনিষ্ঠ হওয়া, একাকিত্ব ভালো লাগা, আল্লাহর হুকুম-আহকাম পালনে কষ্ট সহ্য করা, সর্বাবস্থায় আল্লাহর আদেশ-নিষেধকে প্রাধান্য দেওয়া, 'আল্লাহ দেখছেন' এই ভেবে লজ্জা অনুভব করা, তাঁর প্রিয় ক্ষেত্রগুলোতে সাধ্যমতো পরিশ্রম করা, যে সমস্ত মাধ্যম আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছে দেয়, তা আঁকড়ে ধরা, অল্পে পরিতুষ্ট হওয়া এবং আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত অন্তর স্থির না হওয়া।'
আবার কেউ কেউ বলেছেন, 'মুরীদ বা আল্লাহকে-চিনতে-ইচ্ছুক ব্যক্তির গুণাবলির মধ্যে অন্যতম হলো—সে কেবল তখনই ঘুমাবে, যখন চোখ খোলা রাখতে অপারগ হবে; সে কেবল তখনই আহার করবে, যখন প্রচণ্ড ক্ষুধা অনুভব করবে আর সে কেবল তখনই কথা বলবে, যখন তার কথা বলা জরুরি হবে।'
আবূ উসমান হারীরি বলেছেন, 'পথচলার শুরুতেই যার ইচ্ছা শুদ্ধ হবে না, তার পথচলা তাকে কেবল উলটো দিকেই নিয়ে যাবে।' [৬০৩]
তিনি আরও বলেছেন, 'মুরীদ যখন কোনো জ্ঞানের কথা শোনে আর সে অনুযায়ী আমল করে, তখন তা একটি হিকমত হিসেবে আজীবন তার অন্তরে থেকে যায়, যা তার উপকার করে এবং যখন কথা বলে, তখন শ্রোতারা এর মাধ্যমে উপকৃত হয়। অপরদিকে কেউ যখন কোনো জ্ঞানের কথা শোনে; কিন্তু সে অনুযায়ী আমল করে না, তখন তা একটি ঘটনা হিসেবে সে কয়েক দিন স্মরণ রাখতে পারে, অতঃপর ভুলে যায়।' [৬০৪]
ওয়াসিতি বলেছেন, 'মুরীদের সর্বপ্রথম স্তর হলো—আল্লাহ তাআলার ইচ্ছার মাঝে নিজের ইচ্ছাকে বিলীন করে দেওয়া'।[৬০৫]
টিকাঃ
[৬০০] সূরা আনআম, ৬:৫২।
[৬০২] আবদুল কারীম কুশাইরি তার ‘আর-রিসালাহ (২/৩৫১)’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘ইচ্ছা বা ইরাদা হলো আল্লাহ-অভিমুখীদের পথের শুরু। এটি হলো এই পথের প্রথম মানযিল। একে ‘ইরাদা’ করে নামকরণের কারণ হলো: সবকিছুর শুরুতেই ইচ্ছা বা ইরাদা থাকে। কেউ যদি কোনোকিছুর ইচ্ছাই না করে, তা হলে তার আর সেই কাজ করা হয়ে ওঠে না। ইচ্ছা বা ইরাদা আল্লাহর-পথের-পথিকদের পথচলার শুরু হওয়ার কারণে বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে তাদের প্রথম মানযিলের নাম রাখা হয়েছে ইচ্ছা বা ইরাদার মানযিল। সুতরাং শব্দের দিকে লক্ষ করলে ‘মুরীদ’ তাকেই বলা হবে, যার ইরাদা রয়েছে; যেমন আলিম তাকেই বলা হয়, যার ইলম রয়েছে। কিন্তু সুফিয়ায়ে কেরামের পরিভাষায় ‘মুরীদ’ তাকেই বলা হয়, যার নিজস্ব কোনো ইচ্ছা বা ইরাদা থাকে না। সুতরাং তাদের পরিভাষায় যে ব্যক্তি ইচ্ছাশূন্য হতে পারে না, তাকে মুরীদ বলা হয় না; যেমন শব্দের দিকে লক্ষ করলে যার ইচ্ছা থাকবে না, তাকে মুরীদ বলা হবে না।’
[৬০২] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ২/৩৫২।
[৬০৩] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ২/৩৫৩।
[৬০৪] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ২/৩৫৪।
[৬০৫] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ২/৩৫৪।