📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 আল-আসমাউল হুসনার সাথে তাওয়াক্কুলের সম্পর্ক

📄 আল-আসমাউল হুসনার সাথে তাওয়াক্কুলের সম্পর্ক


আল্লাহ তাআলার উত্তম নামসমূহের সাথে তাওয়াক্কুলের সম্পর্ক সবচেয়ে ব্যাপক। কারণ আল্লাহ তাআলার গুণাবলি-সংক্রান্ত নাম ও কর্মসম্পাদন-সংক্রান্ত নাম উভয়ের সাথেই এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যেমন: الْغَفُورُ (অতি ক্ষমাপরায়ণ), التَّوَّابُ (তাওবা কবুলকারী), الْغَفَّارُ (পরম ক্ষমাশীল), الرَّؤُوْفُ (পরম স্নেহশীল), الرَّحِيمُ (অতি দয়ালু) এই নামগুলোর সাথে তাওয়াক্কুলের সম্পর্ক রয়েছে। তেমনি এর সম্পর্ক রয়েছে- الْفَتَاحُ (উন্মোচনকারী), الْوَهَّابُ (প্রকৃত দানকারী), الرَّزَّاقُ (রিযকদাতা), الْمُعْطِی (পরম দানশীল), الْمُحْسِنُ (ইহসানকারী) এই নামগুলোর সাথেও। الْمُعِزُ (সম্মানদানকারী), الْمُذِلُّ (অপমানকারী), الْحَافِظُ (হেফাজতকারী), الرَّافِعُ (উঁচুকারী), الْمَانِعُ (বাধাদানকারী) এই নামগুলোর সাথে এই দিক দিয়ে তাওয়াক্কুলের সম্পর্ক রয়েছে যে, দ্বীনের শত্রুদের অপমানিত করা, তাদেরকে বাধাদান করা, তাদের থেকে শক্তি-সামর্থ্যের উপকরণ কেড়ে নেওয়া ইত্যাদি। এর সম্পর্ক রয়েছে- الْقُدْرَةُ (ক্ষমতা), الْإِرَادَةُ (ইচ্ছাশক্তি) এই রকম গুণাবলির সাথেও। আসলে আল্লাহ তাআলার সমস্ত উত্তম নামসমূহের সাথেই তাওয়াক্কুলের সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণেই অনেক ইমাম তাওয়াক্কুলের ব্যাখ্যা করেছেন, আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করার দ্বারা।
এই কথার দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য হলো: আল্লাহ সম্পর্কে বান্দার জ্ঞান অনুযায়ী বান্দার তাওয়াক্কুলের মাকাম বিশুদ্ধ হয়। আল্লাহ সম্পর্কে যার জ্ঞান যত বেশি হবে, আল্লাহর ওপর তার তাওয়াক্কুল তত শক্তিশালী হবে।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 তাওয়াক্কুল এবং উপকরণ

📄 তাওয়াক্কুল এবং উপকরণ


পূর্ববর্তী মনীষীগণ এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন যে, উপকরণ অবলম্বন করা তাওয়াক্কুলের বিপরীত নয়। বরং উপকরণ ব্যবহার করা ব্যতীত তাওয়াক্কুল সহীহই হয় না। এটি ব্যতীত তাওয়াক্কুল ত্রুটিযুক্ত হয়।
সাহল ইবনু আবদিল্লাহ বলেছেন, 'যে ব্যক্তি উপায়-উপকরণ অবলম্বন করতে গড়িমসি করল, সে যেন সুন্নাহ পালনেই গড়িমসি করল আর যে তাওয়াক্কুলের ক্ষেত্রে অবহেলা করল, সে যেন ঈমানের ক্ষেত্রেই অবহেলা করল।' [৪১৯]
আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ ভরসা করা হলো নবি -এর বিশেষ অবস্থা আর উপকরণ অবলম্বন করা হলো তাঁর সুন্নাহ। সুতরাং যে ব্যক্তি তাঁর বিশেষ অবস্থার ওপর আমল করবে, সে যেন কোনোভাবেই তাঁর সুন্নাহ ছেড়ে না দেয়। আবূ সাঈদ -এর কথার অর্থ এটিই। তিনি বলেছেন, 'তাওয়াক্কুল হলো (উপকরণ অবলম্বন করার ক্ষেত্রে) নিশ্চিন্ততাশূন্য অস্থিরতা এবং (আল্লাহর ওপর ভরসা করার ক্ষেত্রে) অস্থিরতাশূন্য নিশ্চিন্ততা।'
এ সত্ত্বেও অনেকেই নফসকে কষ্ট দেওয়ার মাধ্যমে উপকরণ ব্যবহার করা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়; যাতে তাদের তাওয়াক্কুল খাঁটি হয়।
সূফি-দরবেশদের মধ্যে ইবাদাতগুজার একটি দলের মাযহাব হলো এটি। তাদের অনেকেই মরুভূমিতে চলতে শুরু করে সাথে কোনো পাথেয় নেওয়া ছাড়াই। তারা পাথেয় নেওয়াকে তাওয়াক্কুলের পরিপন্থি বলে মনে করে। এ ব্যাপারে তাদের প্রসিদ্ধ অনেক ঘটনাও রয়েছে। তারা তাদের সত্যবাদিতা ও স্বচ্ছতা অনুযায়ী ফলাফলও পেয়েছে। কিন্তু তাদের স্তর আরিফ বা আল্লাহর মা'রিফাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের চেয়ে নিচু। এ সত্ত্বেও সত্যিকারার্থে কোনো ব্যক্তির জন্য একেবারে আসবাব-উপকরণ পরিত্যাগ করে জীবন ধারণ করা সম্ভব নয়।
আর সূফিয়ায়ে কেরামের যেসকল প্রসিদ্ধ ঘটনা বর্ণিত আছে, সেগুলো কোনো প্রমাণ হতে পারে না; কারণ তা খণ্ডিত কিছু ঘটনা, যা কখনো কখনো কারও কারও সাথে ঘটেছে। তা অনুসৃত কোনো পথ কিংবা শারীআত-সমর্থিত কোনো আদেশও নয়। তাদের এই বিষয়টি দুটি দলের জন্য ফিতনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে: একটি দল হলো যারা এটাকে অনুসরণীয় পথ ও প্রশংসনীয় মাকাম হিসেবে ধারণা করে। ফলে তারা এর ওপর আমল আরম্ভ করে দেয়। কিন্তু কেউ এই পথ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, কেউ ফিরে আসে; পথচলা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয় না। আর কেউ কেউ পেছন ফিরে পালিয়ে যায়।
আরেকটি দল হলো: তারা প্রকৃত তাওয়াক্কুলের অধিকারী ব্যক্তিদের দুর্নাম ও নিন্দা করে, তাদেরকে শারীআত ও আকল বিরোধী হিসেবে আখ্যায়িত করে। আর তারা নিজেদের দাবি করে সবচেয়ে বেশি মর্যাদাবান এবং সর্বশ্রেষ্ঠ মাকামের অধিকারী বলে; এমনকি তারা নবি ﷺ ও তাঁর সাহাবিদের চেয়েও নিজেদের বেশি পরিপূর্ণ বলে জ্ঞান করে। কারণ সাহাবিদের মধ্যে এমন একজনও ছিলেন না, যিনি এই রকম তাওয়াক্কুলের অধিকারী ছিলেন। তারা উপকরণ গ্রহণ না করে পথ চলতে পুরাপুরি ব্যর্থ হয়েছেন!
রাসূলুল্লাহ ﷺ উহুদের দিন দুটি বর্ম পরিধান করে যুদ্ধ করতে বের হয়েছিলেন। [৪২০] তিনি যুদ্ধের পোশাক না পরিধান করে কখনো যুদ্ধের কাতারে দাঁড়াননি। যেমনটি অনেক ইলম ও মা'রিফাতশূন্য ব্যক্তিদের করতে দেখা যায়। নবি ﷺ মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করার সময় একজন মুশরিক ব্যক্তিকে পথপ্রদর্শক হিসেবে ভাড়া করেছিলেন। যে তাঁকে পথ দেখিয়ে দিয়েছিল। [৪২১] সেই মুশরিক ব্যক্তির সাহায্য করার কারণেই আল্লাহ তাআলা নবি ﷺ-এর মাধ্যমে পুরা বিশ্ববাসীকে হিদায়াত দান করেছেন এবং নবিজিকে মানুষদের (কাফিরদের) থেকে রক্ষা করেছেন।
নবি তাঁর পরিবার-পরিজনদের জন্য এক বছরের খাবার জমা করে রাখতেন। অথচ তিনি ছিলেন সমস্ত তাওয়াক্কুলকারীর সর্দার, সাইয়্যিদুল মুতাওয়াক্কিলীন। তিনি যখন কোনো জিহাদ, হাজ্জ বা উমরার সফরে বের হতেন, তখন পথের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ও পাথেয় সঙ্গে নিয়ে নিতেন। তাঁর সকল সাহাবিও এমনই করতেন। আসলে তাঁরাই ছিলেন প্রকৃত তাওয়াক্কুল অবলম্বনকারী।
তাঁদের পরে পরিপূর্ণ তাওয়াক্কুল অবলম্বনকারী হলেন: যারা বহুদূর থেকেই তাঁদের তাওয়াক্কুলের ঘ্রাণ পায় এবং তাঁদের দেখানো পথ অবলম্বন করে। আসলে তাঁদের অবস্থাই হলো মানদণ্ড ও কষ্টিপাথর; সেগুলোর মাধ্যমেই চেনা যায় কোনটা ভুল আর কোনটা শুদ্ধ। তাওয়াক্কুলের ক্ষেত্রে তাদের হিম্মত ছিল পরবর্তীদের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী ও সুউচ্চ। কারণ তাদের তাওয়াক্কুল ছিল মানুষের অন্তর এবং বড়ো বড়ো শহর জয় করার জন্য; ফলে তারা তাদের তাওয়াক্কুলের মাধ্যমে অন্তরসমূহকে ঈমান ও হিদায়াত দ্বারা পরিপূর্ণ করে দিতেন, কুফরি রাজ্যকে জয় করে ঈমানের রাজ্যে পরিণত করতেন।
তাঁদের সংকল্প ও মনোবল ছিল অনেক মহান ও উঁচু মাপের। ফলে তারা তাদের তাওয়াক্কুলের শক্তি ও উপকারিতা এমন সব ছোটো ছোটো কাজে ব্যয় করতেন না, যা সামান্য চেষ্টায় ও কৌশলেই অর্জন করা যায়। তাদের তাওয়াক্কুল ও মনোবল আরও অনেক বড়ো বড়ো কাজের জন্য ব্যয় হতো।

টিকাঃ
[৪১৯] ইবনু রজব হাম্বালি, জামিউল উলূম ওয়াল হিকাম, ২/৪৯৮।
[৪২০] আবূ দাউদ, ২৫৯০।
[৪২১] বিস্তারিত দেখুন-বুখারি, ৩৯০৫-৩৯০৬।
[৪২২] বুখারি, ২৯০৪; মুসলিম, ১৭৫৭।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 তাওয়াক্কুল এবং তাফবীয

📄 তাওয়াক্কুল এবং তাফবীয


তাফবীয হলো: শক্তি ও সামর্থ্য দেখানো থেকে মুক্ত থাকা, সমস্ত বিষয় আপন মালিকের নিকট অর্পণ করা।
কুরআনের কেবল এক জায়গাই তাফবীযের আলোচনা এসেছে। ফিরআউনের অনুসারীদের মধ্যে যে ঈমান গ্রহণ করেছিল তার প্রসঙ্গে-
وَأُفَوِّضُ أَمْرِي إِلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ بَصِيرٌ بِالْعِبَادِ
"আমি আমার ব্যাপার আল্লাহর কাছে সমর্পণ করছি। নিশ্চয় আল্লাহ বান্দাদের দেখছেন।”[৪২৩]
আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূল -কে আদেশ করেছেন যেন তিনি তাঁকে ওকীল বা অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
رَّبُّ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ فَاتَّخِذْهُ وَكِيلًا
"তিনিই পূর্ব ও পশ্চিমের রব। তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। অতএব, তাঁকেই অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করুন।” [৪২৪]
এটি জাহমিয়্যাদের সেই কথাকে বাতিল করে দেয়, যারা বলে, আল্লাহকে ওকীল বা অভিভাবক বানানোর অর্থ তাঁর ওপর দুঃসাহসিকতা দেখানো। কারণ কাউকে ওকীল বানানোর অর্থ হলো: যাকে ওকীল বানানো হয়, সে তার স্থলাভিষিক্ত হয়ে কাজ করবে। আর আল্লাহর সাথে এমনটা করা তো চরম ধৃষ্টতা। এটা জাহমিয়্যাদের সবচেয়ে বড়ো মূর্খতা। কারণ আল্লাহকে ওকীল বা অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করা খাঁটি দাসত্ব ও স্বচ্ছ তাওহীদের পরিচায়ক; যখন ব্যক্তি তা যথাযথভাবে পালন করে।
সাহল ইবনু আবদিল্লাহ তুসতারি কতই-না প্রজ্ঞাবান ছিলেন, তিনি বলেছেন, 'ইলমের পুরাটাই বন্দেগির একটি অধ্যায়। বন্দেগির পুরাটাই আল্লাহভীতির একটি অধ্যায়। আল্লাহভীতির পুরাটাই দুনিয়াবিমুখতার একটি অধ্যায়। আর দুনিয়াবিমুখতার পুরাটাই হলো তাওয়াক্কুলের একটি অধ্যায়।' [৪২৫]
সুতরাং আমাদের নিকট তাওয়াক্কুল হলো তাফবীযের চেয়েও উচ্চস্তরের ও উচ্চ মর্যাদার।

টিকাঃ
[৪২৩] সূরা গাফির, ৪০: ৪৪।
[৪২৪] সূরা মুযযাম্মিল, ৭৩: ৯।
[৪২৫] আবূ তালিব মাক্কي, কূতুল কুলুব, ২/৪।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 আল্লাহর ওপর ভরসা এবং আল্লাহর ওপর আস্থা

📄 আল্লাহর ওপর ভরসা এবং আল্লাহর ওপর আস্থা


إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো—আল্লাহর ওপর আস্থা রাখা (اَلثِّقَةُ بِاللهِ)।
আল্লাহ তাআলা মূসা -এর মাকে বলেছিলেন,
فَإِذَا خِفْتِ عَلَيْهِ فَأَلْقِيْهِ فِي الْيَمِّ وَلَا تَخَافِي وَلَا تَحْزَنِي
"তারপর যখন তার প্রাণের ভয় করবে, তাকে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেবে এবং কোনো ভয় ও দুঃখ করবে না।" [৪২৬]
(মূসা -এর মা নির্দ্বিধায় আল্লাহ তাআলার সে হুকুম পালন করেছিলেন।) এটি আসলে আল্লাহর ওপর আস্থা রাখার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। কারণ আল্লাহর ওপর যদি তার পরিপূর্ণ আস্থা না থাকত, তা হলে তিনি তার কলিজার টুকরা সন্তানকে উত্তাল সমুদ্রে নিক্ষেপ করতেন না; যার বিশাল বিশাল ঢেউ তাকে নিয়ে খেলা করত, অবশেষে কোথায় নিয়ে পৌঁছাত তা ছিল অজানা।
পূর্বে অনেকের উক্তি বর্ণনা করা হয়েছে, যারা তাওয়াক্কুলের ব্যাখ্যা করেছেন, ‘আল্লাহ ওপর আস্থা রাখা’ বলে। কেউ কেউ একে তাওয়াক্কুলের হাকীকত আখ্যা দিয়েছেন। কেউ তাফবীয বা আত্মসমর্পণ করার দ্বারা আর কেউ তাসলীম বা নির্দ্বিধায় মেনে নেওয়ার দ্বারাও তাওয়াক্কুলের ব্যাখ্যা করেছেন।
সুতরাং আপনি অবগত হয়েছেন যে, তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর ভরসা করার মানযিল উপরিউক্ত সবগুলোকেই অন্তর্ভুক্ত করে।

টিকাঃ
[৪২৬] সূরা কাসাস, ২৮: ৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00