📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 তাওয়াক্কুলের মর্যাদা এবং তাওয়াক্কুলকারীদের প্রকারভেদ

📄 তাওয়াক্কুলের মর্যাদা এবং তাওয়াক্কুলকারীদের প্রকারভেদ


তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর ভরসা-দ্বীনের অর্ধেক। আর বাকি অর্ধেক হলো ইনাবাত বা আল্লাহ-অভিমুখী হওয়া। কারণ দ্বীন হলো সাহায্য প্রার্থনা ও ইবাদাতের নাম। তাওয়াক্কুল হলো সাহায্য প্রার্থনা এবং ইনাবাত হলো ইবাদাত।
তাওয়াক্কুলের মানযিলটি হলো সবচেয়ে প্রশস্ত ও ব্যাপক। সবসময় এটি আল্লাহওয়ালাদের মাধ্যমে মুখরিত থাকে। কারণ তাওয়াক্কুলের পরিধি অনেক বিস্তৃত, সৃষ্টিজগৎ এর প্রতি সবচেয়ে বেশি মুখাপেক্ষী, তাওয়াক্কুল সর্বজনীন; মুমিন- কাফির, নেককার-বদকার, পশুপাখি, জন্তু-জানোয়ারসহ সমস্ত আসমানবাসী ও জমিনবাসী এই তাওয়াক্কুলের মানযিলের অন্তর্ভুক্ত। শারীআতের দায়িত্বপ্রাপ্ত ও বহির্ভূত সবাই এতে শামিল। যদিও সবার তাওয়াক্কুলের বিষয় ও উদ্দেশ্য এক থাকে না। আল্লাহ তাআলার ওলি ও খাছ বান্দাগণ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের ব্যাপারে তাঁর ওপর তাওয়াক্কুল করে থাকে। যেমন: ঈমানের দাবি পূরণ করা, তাঁর দ্বীনের সাহায্য করা, তাঁর কালিমাকে সুউচ্চ ও বিজয়ী করা, তাঁর শত্রুদের সাথে জিহাদে দৃঢ়পদ থাকা, তাঁর প্রতি মহাব্বত, তাঁর হুকুম-আহকাম বাস্তবায়ন করা ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করে এবং কেবল তাঁর ওপরই ভরসা করে।
এর চেয়ে যারা কম স্তরের পরহেযগার, তারা অন্যান্য মানুষের কথা চিন্তা না করে শুধু ব্যক্তিগত বিষয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করে; যেমন: নিজেদের ইস্তিকামাতের ক্ষেত্রে, আল্লাহর সাথে নিজেদের অবস্থানকে হেফাজত করাসহ আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে।
এর চেয়েও যারা নিম্নস্তরের, তারা আল্লাহর ওপর ভরসা করে আল্লাহর পক্ষ থেকে যে সমস্ত বস্তু লাভ করে সেগুলোর ক্ষেত্রে; যেমন: রিক্ব, সুস্থতা, শত্রুর বিরুদ্ধে সাহায্য, স্ত্রী-সন্তানসন্ততির ভরণপোষণ করা ইত্যাদি ক্ষেত্রে।
এর চেয়েও যারা নিম্নস্তরের, তারা তাওয়াক্কুল করে সেই সব বিষয়ে সফলতা পেতে; যা আল্লাহ পছন্দ করেন না এবং যার ব্যাপারে তিনি অসন্তুষ্ট; যেমন: জুলুম-অত্যাচার, অবাধ্যতা এবং গুনাহ-পাপাচার ও অশ্লীলতায় সফল হতে। কারণ এই সমস্ত ব্যক্তিরা অধিকাংশ সময় আল্লাহর নিকট সাহায্য চাওয়া ও তাঁর ওপর ভরসা করা ব্যতীত সফল হয় না। বরং কখনো কখনো তাদের ভরসা, যারা নেককাজের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করে তাদের চেয়ে শক্তিশালী হয়। আর এভাবেই তারা নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করে। তারা আবার আল্লাহর প্রতি এই বিশ্বাসও রাখে যে, তিনি তাদেরকে নিরাপদ রাখবেন এবং তাদের উদ্দেশ্য সফল করবেন!
সর্বোত্তম তাওয়াক্কুল হলো: ওয়াজিব বিধানাবলির ক্ষেত্রে তাওয়াক্কুল করা। অর্থাৎ আল্লাহ, সৃষ্টিজগৎ ও আপন সত্তা—এই তিনটি ক্ষেত্রে যে ওয়াজিব দায়িত্বসমূহ রয়েছে, তা পালনের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর ভরসা করা। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রশস্ত ও উপকারী হলো: কল্যাণকর কোনো দ্বীনিকাজকে প্রাধান্য দেওয়ার ব্যাপারে তাওয়াক্কুল করা। অথবা দ্বীনের জন্য ক্ষতিকর কোনো বিষয়কে প্রতিহত করার জন্য তাওয়াক্কুল করা। এটি হলো আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে, জমিনে ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের ফাসাদকে রুখে দেওয়ার ক্ষেত্রে আম্বিয়ায়ে কেরামের তাওয়াক্কুল। এই তাওয়াক্কুল তাদের থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া।
এরপর আল্লাহর ওপর ভরসা করার ক্ষেত্রে মানুষ তাদের উচ্চ মনোবল, হিম্মত ও উদ্দেশ্য অনুপাতে বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। যেমন কেউ আছে, রাজত্ব ও সাম্রাজ্য লাভের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আবার কেউ আছে, মাত্র একটি রুটি উপার্জনের আশায় আল্লাহর ওপর ভরসা করে থাকে।
যে ব্যক্তি কোনোকিছু অর্জন করার জন্য আল্লাহ তাআলার ওপর মনেপ্রাণে ভরসা করে, সে তা পেয়েই যায়। যদি বস্তুটি আল্লাহর প্রিয় ও সন্তুষ্টিজনক কিছু হয়, তা হলে তা প্রশংসনীয় ও তার জন্য কল্যাণকর। আর যদি অপছন্দনীয় ও ঘৃণিত কোনো বস্তু হয়, তা হলে তার জন্য পরিণতিতে তা ধ্বংস ও ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
আর যদি তা (পছন্দনীয় ও অপছন্দনীয় নয়, বরং) বৈধ কোনো ক্ষেত্র হয়ে থাকে, তা হলে আল্লাহর ওপর ভরসা করার জন্য সে সাওয়াব পাবে; যে বস্তু লাভ হয়েছে সে জন্য নয়; যদি না তা কোনো নেককাজে কাজে লাগে। আল্লাহ তাআলাই অধিক জানেন।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 তাওয়াক্কুলের সংজ্ঞা ও মনীষীদের বক্তব্য

📄 তাওয়াক্কুলের সংজ্ঞা ও মনীষীদের বক্তব্য


এখন আমরা তাওয়াক্কুলের সংজ্ঞা, স্তর ও এ সম্পর্কে গুণীজনদের মন্তব্য নিয়ে আলোচনা করব।
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল বলেন, 'তাওয়াক্কুল হলো অন্তরের আমল।' এ কথার অর্থ হলো এটি অভ্যন্তরীণ কাজ, মুখের কথা বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দ্বারা সংঘটিত হওয়া কোনো কাজ নয় এবং এখানে ইলম ও উপলব্ধিরও কোনো দখল নেই।
তবে অনেকেই এটিকে মা'রিফাত ও ইলমের অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করেন। তারা বলেন, বান্দার জন্য আল্লাহ যে যথেষ্ট, সে সম্পর্কে অন্তরের অবগত হওয়ার নামই তাওয়াক্কুল।
সাহল বলেন, 'তাওয়াক্কুল হলো: বান্দা যা করতে মনস্থ করে, তা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া।' [৪১১]
বিশ্ব হাফী বলেন, 'কেউ কেউ বলে, تَوَكَّلْتُ عَلَى اللهِ “আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করলাম” আসলে সে এর দ্বারা আল্লাহর ওপর মিথ্যাচার করে। কারণ যদি সে প্রকৃতই আল্লাহর ওপর ভরসা করত, তা হলে আল্লাহ যা ফায়সালা করেন তার ওপরই সে সন্তুষ্ট থাকত!' [৪১২]
ইয়াহইয়া ইবনু মুআয-কে প্রশ্ন করা হলো, 'কখন ব্যক্তি মুতাওয়াক্কিল বা আল্লাহর ওপর ভরসাকারী বলে গণ্য হয়?' তিনি উত্তর দিলেন, 'আল্লাহ যখন যা করেন, সে তাতে সন্তুষ্ট থাকে।' [৪১৩]
পূর্ববর্তী জ্ঞানীজনদের মধ্যে অনেকেই তাওয়াক্কুলের ব্যাখ্যা করেছেন আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা, অন্তরে তাঁর প্রতি স্থিরতা ও প্রশান্তি লাভ করার দ্বারা।
যুন-নূন মিসরি বলেছেন, 'তাওয়াক্কুল হলো: নফসের পদক্ষেপগ্রহণ পরিত্যাগ করা এবং শক্তি-সামর্থ্য প্রদর্শন করা থেকে বিরত থাকা। বান্দার তাওয়াক্কুল বেশ শক্তিশালী হয় তখন, যখন সে এই বিষয়টি উপলব্ধি করে যে, আল্লাহ তাআলা তার ব্যাপারে সবকিছু জানেন এবং তার প্রতিটি অবস্থা দেখেন।' [৪১৪]
কেউ কেউ বলেছেন, 'তাওয়াক্কুল হলো: সর্বাবস্থায় আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক রাখা।'
বলা হয়েছে, 'তাওয়াক্কুল হলো: মুখাপেক্ষিতার অনেক ঘাট আপনার সামনে উপস্থিত হবে আর আপনি কেবল সেই সত্তার নিকটেই তা উত্থাপন করবেন, যার নিকট রয়েছে এর প্রকৃত সমাধান।'
যুন-নূন বলেছেন, 'ক্ষমতাশীলদের কাছে ধরনা না দেওয়া এবং উপকরণ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা।'[৪১৫] এর দ্বারা তিনি উদ্দেশ্য নিয়েছেন এগুলোর সাথে অন্তরের কোনো সম্পর্ক না রাখা। তার এই উক্তিটি বাহ্যিকভাবে চেষ্টা-প্রচেষ্টা করাকে অসমর্থন করে না।
তাদের মধ্যে কেউ কেউ একে দুটি বা আরও বেশি বস্তুর সমন্বিত রূপ বলে উল্লেখ করেছেন।
আবূ তুরাব নাখশাবি বলেছেন, 'তাওয়াক্কুল হলো শরীরকে দাসত্বে নিক্ষেপ করা, অন্তরকে রুবুবিয়্যাতের সাথে সম্পৃক্ত করা এবং আল্লাহ তাআলার প্রাচুর্যতায় নিশ্চিত হওয়া। অবশেষে যদি প্রার্থিত বস্তু দেওয়া হয়, তা হলে শোকর আদায় করা আর না দেওয়া হলে ধৈর্য ধারণ করা।' [৪১৬]
তিনি তাওয়াক্কুলকে পাঁচটি উপকরণ দ্বারা গঠিত বলে উল্লেখ করেছেন-১. বাহ্যিকভাবে পরিপূর্ণরূপে বিধানসমূহ পালন করা, ২. অন্তরকে রবের সাথে সম্পৃক্ত করা, ৩. আল্লাহর ফায়সালায় ও ধনাঢ্যতায় নিশ্চিন্ত থাকা, ৪. আল্লাহ দান করলে শোকর আদায় করা এবং ৫. আল্লাহ দান না করলে সবর করা।
কেউ কেউ তাওয়াক্কুলকে পথের শুরু, মেনে নেওয়াকে পথের মাঝ আর আত্মসমর্পন কে পথের শেষ বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন।
আবূ আলি দাক্কাক বলেছেন, 'আল্লাহর ওপর ভরসা করার তিনটি স্তর রয়েছে: ১. তাওয়াক্কুল, ২. এরপর তাসলীম বা মেনে নেওয়া, ৩. এরপর তাফবীয বা আত্মসমর্পণ করা। তাওয়াক্কুলের অধিকারী ব্যক্তি আল্লাহর প্রতিশ্রুতির ওপর নিশ্চিন্ত থাকে, তাসলীমের অধিকারী ব্যক্তি তার সম্পর্কে আল্লাহ যে ইলম রাখেন, একেই যথেষ্ট মনে করে এবং তাফবীযের অধিকারী ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকে। তাওয়াক্কুল হলো সূচনা, তাসলীম হলো মধ্যম অবস্থা, আর তাফবীয হলো শেষ ধাপ। সুতরাং তাওয়াক্কুল হলো সাধারণ মুমিনদের সিফাত, তাসলীম হলো আউলিয়াদের সিফাত আর তাফবীয হলো মুওয়াহহিদীন (একত্ববাদী)-দের সিফাত।[৪১৭]

টিকাঃ
[৪১১] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ১/৩০০।
[৪১২] ইবনুল মুলাক্কিন, তবাকাতুল আউলিয়া, ১১৩।
[৪১৩] আবদুল কাদীর জীলানি, আল-গুনইয়া লি-তালিবী তরীকিল হাক, ২/৩২০।
[৪১৪] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ১/৩০০।
[৪১৫] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৫/৩৮০।
[৪১৬] ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশুক, ৪০/৩৪৫।
[৪১৭] ইমাম গাযালি, ইহইয়াউ উলূমিদ দ্বীন, ৪/২৬৫।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 তাওয়াক্কুলের প্রকৃত মর্ম

📄 তাওয়াক্কুলের প্রকৃত মর্ম


মূলকথা হলো তাওয়াক্কুল অনেকগুলো বিষয়ের সমষ্টির নাম। সেগুলো ব্যতীত তাওয়াক্কুলের প্রকৃত অর্থ পরিপূর্ণ হয় না। জ্ঞানীদের প্রত্যেকেই এই সকল বিষয়ের যেকোনো একটির দিকে অথবা দুইটির দিকে অথবা তার চেয়েও অধিক বিষয়ের দিকে ইশারা করেছেন।
সেগুলোর মধ্য থেকে প্রথমটি হলো: আল্লাহ তাআলার সত্তা, ক্ষমতা, প্রাচুর্যতা, সবকিছু পরিচালনা করার সক্ষমতা, সৃষ্টিজগতের সবকিছুর শেষ পরিণতি সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান, সবকিছুর অস্তিত্ব আসে আল্লাহর ইচ্ছা ও ক্ষমতায় ইত্যাদি গুণাবলি সম্পর্কে অবগত হওয়া। এই জ্ঞান লাভ করাই হচ্ছে বান্দার প্রথম ধাপ; যার মাধ্যমে সে তাওয়াক্কুলের পথে পা বাড়ায়।
আমাদের শাইখ ইবনু তাইমিয়্যা বলেছেন, 'আর এ কারণেই ফালসাফি বা দার্শনিকদের তাওয়াক্কুল বিশুদ্ধ হয় না এবং তাদের কাছে তা কল্পনাও করা যায় না। এমনিভাবে কাদরিয়্যাদের নিকট থেকেও তা আশা করা যায় না। কারণ তারা আল্লাহ তাআলার অনেক সিফাতকে অস্বীকার করে এবং বলে: তাঁর রাজত্বে এমন কিছুরও অস্তিত্ব রয়েছে, যা তিনি চান না। অনুরূপভাবে জাহমিয়্যাদের কাছ থেকেও তাওয়াক্কুল বিশুদ্ধ হবে না। কারণ তারা আল্লাহর সিফাতকে প্রত্যাখ্যান করে। তাওয়াক্কুল কেবল সেই সমস্ত ব্যক্তিদের থেকেই বিশুদ্ধ হবে, যারা আল্লাহ তাআলার গুণাবলিতে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তা কোনোরূপ বিকৃত করা ছাড়াই যথাযথভাবে সাব্যস্ত করে।'
দ্বিতীয় স্তর[৪১৮]: কার্যকরী উপকরণ ও উত্তম পন্থা অবলম্বন করা। সুতরাং যে ব্যক্তি তা পরিত্যাগ করবে, তার তাওয়াক্কুল হবে অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিযুক্ত। অগভীর ও চিন্তাশূন্য দৃষ্টিতে তাকালে বিষয়টি সম্পূর্ণ এর উলটা মনে হয়। অর্থাৎ উপায়-উপকরণ ও বাহ্যিক তাদবীর গ্রহণ করা হলো তাওয়াক্কুলের পরিপন্থি আর কোনো ধরনের উপকরণ অবলম্বন না করাই হলো প্রকৃত তাওয়াক্কুল।
জেনে রাখবেন, যারা আসবাব-উপকরণকে বাদ দেয় এবং তা প্রত্যাখ্যান করে, তাদের তাওয়াক্কুল কখনোই সঠিক হয় না। কারণ স্বয়ং তাওয়াক্কুলই হলো প্রয়োজনীয় বস্তু হাসিল হওয়ার জন্য শক্তিশালী একটি উপকরণ। এটি দুআর মতো; আল্লাহ তাআলা যা কাঙ্ক্ষিত বস্তু লাভ করা মাধ্যম ও কারণ বানিয়েছেন।
তাওয়াক্কুল হলো প্রত্যাশিত বস্তু হাসিলের জন্য এবং ক্ষতিকর জিনিস হতে বেঁচে থাকার জন্য সবচেয়ে বড়ো উপকরণ। সুতরাং যে ব্যক্তি উপকরণকে অস্বীকার করে তার তাওয়াক্কুল পরিপূর্ণ হয় না এবং তা সঠিকও হয় না। তবে হ্যাঁ, খাঁটি ও প্রকৃত তাওয়াক্কুলের একটি অন্যতম দিক হলো: উপকরণের দিকে ঝুঁকে না পড়া, কেবল সেগুলোর ওপরই আস্থা না রাখা এবং অন্তর সেগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা। উপকরণ অবলম্বনের পর ব্যক্তির অন্তর আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত থাকবে, উপকরণের সাথে নয়। যদিও বাহ্যিকভাবে তার শরীরের অঙ্গভঙ্গি দেখলে মনে হয়, উপকরণের প্রতি সে একান্ত নিবিষ্ট।
বাহ্যিক উপকরণের সম্পর্ক আল্লাহ তাআলার হিকমত, আদেশ ও দ্বীনের সাথে। আর তাওয়াক্কুলের সম্পর্ক তাঁর রুবুবিয়্যাত, ফায়সালা ও সিদ্ধান্তের সাথে। সুতরাং উপকরণের ক্ষেত্রে দাসত্বের যে হুকুম, তা তাওয়াক্কুল ব্যতীত অর্জন করা সম্ভব নয়। তাওয়াক্কুল আর উপকরণ অবলম্বন করা একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, একটি অপরটিকে ছাড়া অসম্পূর্ণ। আল্লাহ তাআলাই অধিক জানেন।
তৃতীয় স্তর : তাওয়াক্কুলের তাওহীদ অর্থাৎ একমাত্র আল্লাহ তাআলার ওপরই ভরসা করার ব্যাপারে অন্তরকে মজবুত করা।
কেননা বান্দার তাওয়াক্কুল ততক্ষণ পর্যন্ত সঠিক অবস্থানে আসে না, যতক্ষণ-না তার তাওহীদ বিশুদ্ধ হয়। বরং তাওয়াক্কুলের হাকীকত হলো অন্তরের তাওহীদ তথা অন্তর কেবল আল্লাহর ওপরই ভরসা করবে। এ ক্ষেত্রে শির্ক অর্থাৎ আল্লাহর সাথে সাথে আসবাব বা অন্য কোনোকিছুর ওপরও ভরসা করার বিষয়টি অন্তরে থাকলে তাওয়াক্কুল হবে ত্রুটিপূর্ণ ও রোগাক্রান্ত। আসলে তাওহীদের বিশুদ্ধতা ও স্বচ্ছতা অনুপাতে তাওয়াক্কুলেও আসে বিশুদ্ধতা ও স্বচ্ছতা। কারণ বান্দা যখন গাইরুল্লাহর দিকে দৃষ্টিপাত করে, তখন তার সেই দৃষ্টিপাত অন্তরে বিভিন্নভাবে প্রভাব ফেলে। যার ফলে আল্লাহর ওপর তার তাওয়াক্কুলের পরিমাণ কমে যায়। এখান থেকেই অনেকে ধারণা করে বসেছেন যে, তাওয়াক্কুল কেবল তখনই সহীহ হয়, যখন উপকরণ বর্জন করা হয়। এই ধারণাটি সত্য। তবে তা হলো আত্মিকভাবে পরিত্যাগ করা, বাহ্যিকভাবে নয়।
চতুর্থ স্তর: আল্লাহর প্রতি অন্তর নির্ভরশীল হওয়া, নিশ্চিন্ত ও স্থির থাকা; যেন উপকরণের স্বল্পতার কারণে তাতে কোনো প্রকারের অস্থিরতা, দুশ্চিন্তা ও উদ্‌দ্বেগ না থাকে। আবার উপকরণ বেশি হলে সেগুলোর ওপর আস্থাও না রাখা। বরং পরম নিশ্চিন্ততা, নির্ভরতা ও আস্থা থাকবে কেবলই আল্লাহর ওপর।
পঞ্চম স্তর: আল্লাহ তাআলার প্রতি উত্তম ধারণা রাখা। আল্লাহর প্রতি আশা রাখা ও উত্তম ধারণা করার অনুপাতে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের তীব্রতা ও দৃঢ়তা নির্ভর করে। আর এ কারণে অনেকেই এর দ্বারা তাওয়াক্কুলের ব্যাখ্যা করেছেন, বলেছেন, 'তাওয়াক্কুল হলো: আল্লাহর প্রতি উত্তম ধারণা রাখা।'
তবে সঠিক কথা হলো: আল্লাহর প্রতি সুধারণা বান্দাকে তাওয়াক্কুলের প্রতি আহ্বান জানায়। কারণ সেই সত্তার ওপর ভরসা করা যায় না, যার প্রতি ধারণা খারাপ থাকে। এমনিভাবে যার কাছে কোনো আশা-প্রত্যাশা থাকে না, তার ওপরও ভরসা করা যায় না।
ষষ্ঠ স্তর : আল্লাহর প্রতি অন্তর অনুগত থাকা, নিজেকে অর্পণ করা, সমস্ত অনুপ্রেরণাকে তাঁর প্রতিই ধাবিত করা এবং সব ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলা।
এর দ্বারা অনেকেই তাওয়াক্কুলের ব্যাখ্যা করেছেন যে, বান্দা আল্লাহর সামনে এমনভাবে অবস্থান করবে, যেমন ধৌতকারীর সামনে মৃত ব্যক্তি অবস্থান করে; সে তাকে যেমন ইচ্ছা তেমন করে উলট-পালট করে, যেখানে মৃত ব্যক্তির কোনো ইচ্ছা বা নড়াচড়া থাকে না।
এটিই হলো সেই ব্যক্তির কথার অর্থ, যিনি বলেছেন, 'তাওয়াক্কুল হলো: সব ধরনের চেষ্টা-তাদবীর থেকে সম্পর্কহীনতা। অর্থাৎ আল্লাহ যা করেন, তার সামনে নিজেকে অনুগত করে রাখা। তবে মনে রাখতে হবে, এই বিষয়টি সেখানে প্রযোজ্য, যেখানে আল্লাহর কোনো আদেশ-নিষেধ নেই। তখন আপনার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার যা ফায়সালা, তা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিতে হবে। তবে যেখানে আল্লাহ তাআলাই আপনাকে কাজ করতে এবং উপকরণ অবলম্বন করতে হুকুম প্রদান করেছেন, সেখানে আপনাকে মেনে নেওয়ার পাশাপাশি উপকরণ অবলম্বন করতে হবে।
অনুগত হওয়ার বিষয়টি হলো লাঞ্ছিত ও অপমানিত গোলামের ন্যায়, যে নিজেকে তার মনিবের সামনে অনুগত ও অর্পণ করে দেয়, মনিবের সব কথা মেনে নেয়, নিজের চাহিদা নিয়ে মনিবের সাথে কোনো প্রকার বিরোধিতা করে না, মনিবের ইচ্ছাই তার ইচ্ছা।
সপ্তম স্তর: তাফবীয বা সমর্পণ করা। এটি হলো তাওয়াক্কুলের প্রাণ, সারাংশ ও হাকীকত। নিজের সব বিষয় আল্লাহ তাআলার নিকট সোপর্দ করা। আগ্রহ সহকারে নিজ ইচ্ছায় এই বিষয়ে এগিয়ে আসা। বাধ্য হয়ে বা জোরপূর্বকভাবে নয়। যেমন দুর্বল অদক্ষ ছেলে, যে নিজের কাজ নিজে ঠিকমতো করতে পারে না, সে তার সমস্ত কাজকর্ম তার স্নেহশীল, দয়াময়, উত্তমভাবে পরিচর্যাকারী ও দেখাশুনাকারী বাবার প্রতি ন্যস্ত করে। সে এটাই বিশ্বাস করে যে, কাজগুলো নিজে নিজে আঞ্জাম দেওয়ার চেয়ে তার পিতার মাধ্যমে সেগুলো পরিচালিত করা উত্তম ও কল্যাণকর।
অষ্টম স্তর: বান্দা যখন এই স্তরে অবতরণ করে, তখন সে 'রিযা' বা 'সন্তুষ্টি'র স্তরে স্থানান্তরিত হয়। এটি হলো তাওয়াক্কুলের ফল। যে ব্যক্তি এর দ্বারা তাওয়াক্কুলের ব্যাখ্যা করে, সে মূলত তাওয়াক্কুলের অন্যতম একটি ফলাফল ও উপকারিতার মাধ্যমে এর ব্যাখ্যা করে। কারণ বান্দা যখন যথাযথভাবে তাওয়াক্কুল করে, তখন সে তার কর্মসম্পাদনকারী আল্লাহর সমস্ত কাজকর্মে সন্তুষ্ট থাকে।
আমাদের শাইখ (ইবনু তাইমিয়্যা রহিমাহুল্লাহ) বলতেন, 'যেকোনো কাজ দুটি বিষয় দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে: শুরুতে তাওয়াক্কুল আর শেষে সন্তুষ্টি। সুতরাং যে ব্যক্তি কাজ শুরু করার পূর্বে আল্লাহর ওপর ভরসা করে এবং কাজ শেষ করার পর আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকে, সে যেন পরিপূর্ণরূপে তার দাসত্ব পালন করে নিল।'
সুতরাং এই অষ্টম স্তরটি পরিপূর্ণভাবে আয়ত্ত করার মাধ্যমে বান্দা তার তাওয়াক্কুলের মাকাম পরিপূর্ণ করে নেয়। এতে তার অবস্থান দৃঢ় হয়। এটিই হলো বিশ্ব হাফী -এর কথার তাৎপর্য: 'কেউ কেউ বলে, تَوَكَّلْتُ عَلَى اللهِ ‘আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করলাম’ আসলে সে এর দ্বারা আল্লাহর ওপর মিথ্যাচার করে। কারণ যদি সে প্রকৃতই আল্লাহর ওপর ভরসা করত, তা হলে আল্লাহ যা ফায়সালা করেন তার ওপরই সন্তুষ্ট থাকত!'

টিকাঃ
[৪১৮] মুসান্নিফ এখানে তা স্তর হিসেবে বর্ণনা করেছেন; যদিও তা তাওয়াক্কুলের প্রকৃত অর্থের বিবরণ।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 আল-আসমাউল হুসনার সাথে তাওয়াক্কুলের সম্পর্ক

📄 আল-আসমাউল হুসনার সাথে তাওয়াক্কুলের সম্পর্ক


আল্লাহ তাআলার উত্তম নামসমূহের সাথে তাওয়াক্কুলের সম্পর্ক সবচেয়ে ব্যাপক। কারণ আল্লাহ তাআলার গুণাবলি-সংক্রান্ত নাম ও কর্মসম্পাদন-সংক্রান্ত নাম উভয়ের সাথেই এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যেমন: الْغَفُورُ (অতি ক্ষমাপরায়ণ), التَّوَّابُ (তাওবা কবুলকারী), الْغَفَّارُ (পরম ক্ষমাশীল), الرَّؤُوْفُ (পরম স্নেহশীল), الرَّحِيمُ (অতি দয়ালু) এই নামগুলোর সাথে তাওয়াক্কুলের সম্পর্ক রয়েছে। তেমনি এর সম্পর্ক রয়েছে- الْفَتَاحُ (উন্মোচনকারী), الْوَهَّابُ (প্রকৃত দানকারী), الرَّزَّاقُ (রিযকদাতা), الْمُعْطِی (পরম দানশীল), الْمُحْسِنُ (ইহসানকারী) এই নামগুলোর সাথেও। الْمُعِزُ (সম্মানদানকারী), الْمُذِلُّ (অপমানকারী), الْحَافِظُ (হেফাজতকারী), الرَّافِعُ (উঁচুকারী), الْمَانِعُ (বাধাদানকারী) এই নামগুলোর সাথে এই দিক দিয়ে তাওয়াক্কুলের সম্পর্ক রয়েছে যে, দ্বীনের শত্রুদের অপমানিত করা, তাদেরকে বাধাদান করা, তাদের থেকে শক্তি-সামর্থ্যের উপকরণ কেড়ে নেওয়া ইত্যাদি। এর সম্পর্ক রয়েছে- الْقُدْرَةُ (ক্ষমতা), الْإِرَادَةُ (ইচ্ছাশক্তি) এই রকম গুণাবলির সাথেও। আসলে আল্লাহ তাআলার সমস্ত উত্তম নামসমূহের সাথেই তাওয়াক্কুলের সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণেই অনেক ইমাম তাওয়াক্কুলের ব্যাখ্যা করেছেন, আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করার দ্বারা।
এই কথার দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য হলো: আল্লাহ সম্পর্কে বান্দার জ্ঞান অনুযায়ী বান্দার তাওয়াক্কুলের মাকাম বিশুদ্ধ হয়। আল্লাহ সম্পর্কে যার জ্ঞান যত বেশি হবে, আল্লাহর ওপর তার তাওয়াক্কুল তত শক্তিশালী হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00