📄 মানযিল : স্থির ও অবিচল থাকা (اَلْإِسْتِقَامَةُ)
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো-স্থির ও অবিচল থাকার মানযil।
আল্লাহ তাআলা বলেন, إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوْا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالجَنَّةِ الَّتِي كُنْتُمْ تُوْعَدُونَ "নিশ্চয় যারা বলে, 'আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ', অতঃপর তাতেই স্থির ও অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, 'তোমরা ভয় করো না, চিন্তা করো না এবং তোমরা সেই জান্নাতের সুসংবাদ শুনে আনন্দিত হও, যার প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেওয়া হয়েছে।” [৩৮৫]
আল্লাহ তাআলা বলেন, إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ "নিশ্চয় যারা বলে, 'আল্লাহ আমাদের রব' অতঃপর স্থির ও অবিচল থাকে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।”[৩৮৬]
আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলকে বলেছেন, فَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ وَمَنْ تَابَ مَعَكَ وَلَا تَطْغَوْا إِنَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ “কাজেই তুমি এবং তোমার সাথে যারা তাওবা করেছে, সবাই সত্যপথে স্থির ও অবিচল থাকো; যেমন তোমাকে হুকুম দেওয়া হয়েছে, আর সীমালঙ্ঘন করো না। তোমরা যা কিছু করছো, নিশ্চয় তিনি তা প্রত্যক্ষ করছেন।”[৩৮৭]
এখানে আল্লাহ তাআলা পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, স্থিরতা ও অবিচলতা হলো সীমালঙ্ঘন ও অবাধ্যতার (الظُّفْيَانُ) বিপরীত; যা প্রতিটি বস্তুর নির্ধারিত সীমারেখা অতিক্রম করাকে বুঝায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَى أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ فَاسْتَقِيمُوا إِلَيْهِ وَاسْتَغْفِرُوهُ “বলুন, ‘আমিও তোমাদের মতোই একজন মানুষ। আমাকে ওহির মাধ্যমে জানানো হয়েছে যে, তোমাদের ইলাহ্ মাত্র একজন ইলাহ্, অতএব তাঁর পথেই দৃঢ় ও স্থির থাকো এবং তাঁর কাছেই ক্ষমা প্রার্থনা করো।”[৩৮৮]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, وَأَنْ لَّوِ اسْتَقَامُوا عَلَى الطَّرِيقَةِ لَأَسْقَيْنَاهُمْ مَاءً غَدَقًا لِنَفْتِنَهُمْ فِيهِ “(আর এই প্রত্যাদেশ করা হয়েছে যে,) লোকেরা যদি সঠিক পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকত, তা হলে আমি তাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণের মাধ্যমে সমৃদ্ধ করতাম। যাতে আমি এর মাধ্যমে তাদের পরীক্ষা করতে পারি।”[৩৮৯]
এই উম্মাতের সবচেয়ে বড়ো সত্যবাদী ও দ্বীনের ওপর সবচেয়ে দৃঢ়ভাবে অবস্থানকারী সাহাবি আবূ বকর -কে ইস্তিকামাত বা অবিচল থাকা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। তিনি জবাবে বলেছিলেন, 'তুমি আল্লাহর সাথে কোনোকিছুকে শরীক করবে না'।[৩৯০] এর দ্বারা তিনি শুধু তাওহীদের ওপর ইস্তিকামাত উদ্দেশ্য নিয়েছেন।
উমর ইবনুল খাত্তাব বলেছেন, 'ইস্তিকামাত হলো: তুমি আল্লাহ তাআলার আদেশ ও নিষেধের ওপর অটল থাকবে। শেয়ালের মতো ছলচাতুরির আশ্রয় নেবে না'।[৩৯১]
উসমান ইবনু আফফান বলেছেন, 'আয়াতে বর্ণিত অবিচলতার গুণে গুণান্বিত ব্যক্তি দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: যারা ইলমকে একমাত্র আল্লাহর জন্য খাঁটি করে'।[৩৯২]
আলি ইবনু আবী তালিব ও ইবনু আব্বাস বলেছেন, 'যারা ফরজ-দায়িত্বগুলো যথাযথভাবে আদায় করে'।[৩৯৩]
হাসান বাসরী বলেছেন, 'যারা আল্লাহ তাআলার হুকুমের ওপর অবিচল থাকে; ফলে তাঁর আনুগত্য করে এবং তাঁর অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকে'।[৩৯৪]
মুজাহিদ বলেছেন, 'যারা আল্লাহ তাআলার সাথে সাক্ষাৎ করার পূর্ব পর্যন্ত লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর সাক্ষ্যের ওপর স্থির থাকে'।[৩৯৫]
আমি শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যা -কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, 'তারা হলেন সেই সমস্ত ব্যক্তি, যারা আল্লাহ তাআলার মহাব্বত ও দাসত্বে অবিচল থাকে; ফলে ডানে-বামে কোনোদিকে ভ্রুক্ষেপ করে না'।[৩৯৬]
'সহীহ মুসলিম'-এ এসেছে, সুফইয়ান ইবনু আবদিল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি বললাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাকে ইসলাম সম্পর্কে এমন একটি কথা বলুন, যেন আপনার পরে আমাকে এ সম্পর্কে আর অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করতে না হয়।' নবি বললেন,
قُلْ آمَنْتُ بِاللهِ، ثُمَّ اسْتَقِمْ
"বলো, আমি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনলাম, অতঃপর এর ওপর অবিচল থাকো।”[৩৯৭]
সাওবান থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন,
اسْتَقِيمُوا وَلَنْ تُحْصُوا وَاعْلَمُوا أَنَّ خَيْرَ أَعْمَالِكُمُ الصَّلَاةُ وَلَا يُحَافِظُ عَلَى الْوُضُوءِ إِلَّا مُؤْمِنٌ
"তোমরা (সঠিক পথের ওপর) অবিচল থেকো, যদিও তোমরা তা আয়ত্তে রাখতে পারবে না। জেনে রেখো, তোমাদের আমলসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম আমল হলো সালাত। আর মুমিন ব্যক্তিই কেবল ওজুকে পরিপূর্ণরূপে হেফাজত করে থাকে।”[৩৯৮]
বান্দা সবসময় ইস্তিকামাত বা স্থির-অবিচলতার গুণে গুণান্বিত থাকবে এটাই কাম্য। আর তা হলো যথাযথভাবে পরিপূর্ণরূপে দ্বীনের বিধানাবলি মেনে চলা। যদি এর ওপর সক্ষম না হয়, তা হলে এর কাছাকাছি অবস্থান করবে। আর যদি এর থেকেও নিচে নামে, তা হলে তা হবে শিথিলতা ও বিনষ্ট করা। যেমন 'সহীহ মুসলিম'-এ আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত আছে, নবি বলেছেন,
سَيِّدُوا وَقَارِبُوا وَاعْلَمُوا أَنَّهُ لَنْ يَنْجُوَ أَحَدٌ مِنْكُمْ بِعَمَلِهِ
"তোমরা সঠিক পথে যথাযথভাবে অবিচল থাকো এবং কমপক্ষে তার কাছাকাছি থাকো। তোমরা নিশ্চিতভাবেই জেনে রাখো যে, তোমাদের কেউ তার আমলের দ্বারা মুক্তি পাবে না।"
সাহাবায়ে কেরাম বললেন, "আপনিও না, ইয়া রাসূলাল্লাহ?'
তিনি বললেন, وَلَا أَنَا إِلَّا أَنْ يَتَغَمَّدَنِيَ اللَّهُ بِرَحْمَةٍ مِّنْهُ وَفَضْلٍ "আমিও না। তবে আল্লাহ তাঁর রহমত ও অনুগ্রহ দ্বারা আমাকে ঢেকে নিয়েছেন।” [৩৯৯]
এই হাদীসটিতে দ্বীনের সমস্ত মাকামকে একত্র করে দেওয়া হয়েছে। ইস্তিকামাতের ওপর থাকার আদেশ করা হয়েছে; আর তা হলো নিয়ত, কথাবার্তা ও কাজকর্মে সঠিক পথ অবলম্বন করা এবং তাতে অবিচল থাকা।
ওপরে বর্ণিত সাওবান -এর হাদীস দ্বারা নবি এই সংবাদ দিয়েছেন যে, তারা ইস্তিকামাত বা অবিচল থাকতে পারবে না। ফলে তাদেরকে কাছাকাছি অবস্থান করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন। আর তা হলো তাদের সাধ্যানুসারে ইস্তিকামাতের নিকটে আসার চেষ্টায় থাকা। তিরন্দাজের মতো, তার ছোঁড়া তির যদি লক্ষ্যে আঘাত নাও করে, তবে লক্ষ্যের প্রায় কাছাকাছি থাকে। এ সত্ত্বেও তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যে, এই অবিচল থাকা এবং কাছাকাছি অবস্থান করাও কাউকে কিয়ামাতের দিন নাজাত দেবে না। সুতরাং শুধু আমলের দিকেই ঝুঁকে পড়া, আমলের কারণে গর্বিত হওয়া, এর ওপর ভরসা করা কারও জন্য উচিত হবে না। সেদিন কেবল মহান আল্লাহ তাআলার দয়া, অনুগ্রহ ও রহমতের কারণেই ব্যক্তি নাজাত পাবে।
আসলে 'ইস্তিকামাত বা অবিচল থাকা' হলো একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। এটি দ্বীনের মৌলিক বিষয়াদিকেই অন্তর্ভুক্ত করে। আর তা হলো আল্লাহ তাআলার সামনে একনিষ্ঠতা ও প্রকৃত সত্যবাদিতার পরিচয় দেওয়া এবং অঙ্গীকার পূরণ করা।
ইস্তিকামাতের সম্পর্ক কথা, কাজ, অবস্থা, নিয়ত সবকিছুর সাথে। এগুলোর ওপর ইস্তিকামাতের অর্থ হলো: আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আল্লাহর সাহায্য কামনা করে আল্লাহর দেখানো পথেই এ কাজগুলো সম্পাদন করা।
কোনো একজন আরিফ বা আল্লাহর পরিচয়প্রাপ্ত ব্যক্তি বলেছেন, 'তুমি ইস্তিকামাতের অধিকারী হতে সচেষ্ট হও, তবে কারামাত (অলৌকিক বস্তু) অন্বেষণকারী হয়ো না। কারণ তোমার নফস তোমাকে কারামাত অর্জন করতে অনুপ্রেরণা জোগাবে আর তোমার রব তোমাকে খুঁজে নেবে ইস্তিকামাতের কারণে।'
আমি শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, 'সবচেয়ে বড়ো কারামাত হলো সর্বদা ইস্তিকামাতের ওপর থাকা। [৪০০]
টিকাঃ
[৩৮৫] সূরা ফুসসিলাত, ৪১ : ৩০।
[৩৮৬] সূরা আহকাফ, ৪৬: ১৩।
[৩৮৭] সূরা হূদ, ১১: ১১২।
[৩৮৮] সূরা ফুসিলাত, ৪১: ৬।
[৩৮৯] সূরা জিন, ৭২: ১৬-১৭।
[৩৯০] বাগাবি, তাফসীর, ৭/১৭২।
[৩৯১] বাগাবি, তাফসীর, ৭/১৭২।
[৩৯২] বাগাবি, তাফসীর, ৭/১৭২।
[৩৯৩] বাগাবি, তাফসীর, ৭/১৭২।
[৩৯৪] সা'লাবি, তাফসীর, ২৩/২৮৮।
[৩৯৫] সা'লাবি, তাফসীর, ২৩/২৮৮।
[৩৯৬] ইবনু তাইমিয়্যা, মাজমুউল ফাতাওয়া, ২৮/৩২।
[৩৯৭] মুসলিম, ৩৮।
[৩৯৮] ইবনু মাজাহ, ২৭৭; দারিমি, ৬৬১।
[৩৯৯] মুসলিম, ২৮১৬; বুখারি, .৩৯।
[৪০০] ইবনু তাইমিয়্যা, মাজমুউল ফাতাওয়া, ১১/২৯৮।
📄 মানযিল : নির্দ্বিধায় মেনে নেওয়া (اَلتَّسْلِيمُ)
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ-এর আরেকটি মানযিল হলো-নির্দ্বিধায় মেনে নেওয়ার মানযিল।
এটি দুই প্রকার : ১. আল্লাহর আদেশসূচক দ্বীনি ফায়সালা মেনে নেওয়া এবং ২. মহাবিশ্বসংক্রান্ত আল্লাহর তাকদীরি ফায়সালা মেনে নেওয়া।
প্রথম প্রকারটি হলো: মুমিন ও আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞানী ব্যক্তিদের তাসলীম বা মেনে নেওয়া। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا )
“না, আপনার রবের কসম, এরা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ-না এদের পারস্পরিক মতবিরোধের ক্ষেত্রে এরা আপনাকে ফায়সালাকারী হিসেবে মেনে নেবে, অতঃপর আপনার ফায়সালা সম্পর্কে নিজেদের মনে কোনো প্রকার দ্বিধা ও জটিলতা খুঁজে পাবে না, বরং নির্দ্বিধায় তা মেনে নেবে।” [৪২৭]
এই তিনটি স্তরকে বিবেচনা করা জরুরি: ১. (নবিজিকে) বিচারক বানানো, ২. দ্বিধা ও সংকীর্ণতা ঝেড়ে ফেলে বক্ষকে প্রশস্ত করা এবং ३. মনেপ্রাণে মেনে নেওয়া।
মহাবিশ্বসংক্রান্ত আল্লাহর তাকদীরি ফায়সালা মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে অধিকাংশ মানুষের পদস্খলন ঘটে। এ বিষয়টি তাদেরকে পেরেশান করে তোলে এবং ঝগড়ায় লিপ্ত করে। সেটি হলো 'রিযা বিল কাযা' বা তাকদীরে সন্তুষ্ট থাকার মাসআলা। পূর্বে এর যথেষ্ট আলোচনা অতিবাহিত হয়েছে। আমরা বলেছি, ফায়সালা মেনে নেওয়া তখনই প্রশংসনীয়, যখন বান্দাকে সে ব্যাপারে চেষ্টা-তাদবীর ও প্রতিরোধ করার হুকুম দেওয়া না হয়, এবং সে ওই ব্যাপারে সক্ষমও নয়; যেমন বিপদাপদে আক্রান্ত হওয়া; যা প্রতিহত করা বা দমিয়ে রাখার ক্ষমতা বান্দার নেই।
পক্ষান্তরে যে বিষয়ে প্রতিরোধ ও চেষ্টা করার আদেশ দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে কিছুই না করে শুধু মেনে নেওয়া জায়িয নয়। বরং সেই বিষয়গুলোকে (আল্লাহ তাআলার) অন্য হুকুম দ্বারা প্রতিহত করার মাধ্যমে আল্লাহর দাসত্ব করা আল্লাহর নিকট বেশি পছন্দনীয়।
জেনে রাখবেন, তাসলীম বা মেনে নেওয়া হলো: শারঈ বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো সন্দেহ করা থেকে বিরত থাকা, আল্লাহর আদেশের সাথে সাংঘর্ষিক কামনা করা থেকে বিরত থাকা, ইখলাসের বিপরীত ইচ্ছা করা থেকে এবং শরীআত ও তাকদীরের ওপর আপত্তি করা থেকে বিরত থাকা। এই সব গুণের অধিকারী ব্যক্তিই হলো সেই অন্তরের অধিকারী ব্যক্তি, কিয়ামাতের দিন যেই অন্তর নিয়ে না এলে কেউ নাজাত পাবে না। কারণ তাসলীম হলো বিরোধিতায় লিপ্ত হওয়ার বিপরীত।
বিরোধিতা করা বা মেনে না নেওয়া সৃষ্টি হয় এমন ভ্রান্ত সন্দেহের কারণে, যা আল্লাহ তাআলা নিজ সত্তা ও গুণাবলি সম্পর্কে যে সংবাদ দিয়েছেন, তার সাথে সাংঘর্ষিক; অথবা তিনি আখিরাতের জগৎ সম্পর্কে যে খবর জানিয়েছেন, তার বিপরীত অথবা এ রকম অন্যান্য বিষয়ে। সুতরাং এগুলোর ক্ষেত্রে তাসলীম হলো: মুতাকাল্লিমীন বা দার্শনিকদের বিভ্রান্ত চিন্তাচেতনার কারণে নিজে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও সংশয়ে জড়িয়ে না পড়া।
অথবা (বিরোধিতা করা বা মেনে না নেওয়া সৃষ্টি হয়) এমন কামনার কারণে, যা আল্লাহ তাআলার আদেশের সাথে সাংঘর্ষিক। সুতরাং আল্লাহর আদেশের ক্ষেত্রে তাসলীম বা মেনে নেওয়া হলো: অসংযত ও বেপরোয়া কামনা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা।
অথবা (বিরোধিতা করা বা মেনে না নেওয়া সৃষ্টি হয়) এমন ইচ্ছার কারণে, যা বান্দার নিকট আল্লাহ যা চান, তার সাথে সাংঘর্ষিক। এর ফলে আল্লাহর নিকট বান্দার চাওয়ার মধ্যেও বৈপরিত্যের সৃষ্টি হয়। এ ক্ষেত্রে তাসলীম হলো: এগুলো থেকে মুক্ত থাকা।
অথবা (বিরোধিতা করা বা মেনে না নেওয়া সৃষ্টি হয়) এমন আপত্তি করার কারণে, যা সৃষ্টিজগৎ ও আদেশের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার হিকমতের বিপরীত। এমন ধারণা করা যে, শারীআত ও তাকদীরি ফায়সালা হলো যুক্তি ও প্রজ্ঞার পরিপন্থি। এ ধরনের সমস্ত বিবাদ ও বিরোধিতা থেকে বেঁচে থাকা ও মুক্ত থাকার নামই তাসলীম বা নির্দ্বিধায় মেনে নেওয়া।
উপরিউক্ত আলোচনা দ্বারা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, তাসলীম হলো ঈমানের মাকামসমূহের মধ্যে সর্বোচ্চ মাকাম ও মানযিল। বিশেষ ব্যক্তিদের বিশেষ পথ। তাসলীম হলো খাঁটি সত্যবাদিতার মানযিল; যার মর্যাদা নুবুওয়াতের মর্যাদার পরেই। যে ব্যক্তির তাসলীম বা মেনে নেওয়ার গুণটি পরিপূর্ণ হবে, তার সত্যবাদিতাও পরিপূর্ণ হবে।
টিকাঃ
[৪২৭] সূরা নিসা, ৪: ৬৫।
📄 মানযিল : বিনয় (اَلتَّوَاضُعُ)
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো-বিনয়ের মানযিল।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا
"রহমানের বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে।”[৫৭৩]
অর্থাৎ স্থিরতা, গাম্ভীর্য ও বিনয়ের সাথে পথ চলে। দাম্ভিকতা, অহংকার ও গর্বের সাথে নয়। হাসান বাসরী বলছেন, 'তারা হলেন জ্ঞানী ও সহনশীল সম্প্রদায়।' মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়্যা বলেছেন, 'গাম্ভীর্যপূর্ণ ও পবিত্র ব্যক্তিগণ, যারা মূর্খতাসুলভ আচরণ থেকে দূরে থাকেন। আর তাদের সাথে কোনো অশোভনীয় আচরণ করা হলে, তারা তা সহ্য করেন।'
'সহীহ মুসলিম'-এ এসেছে, ইয়ায ইবনু হিমার থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ বলেছেন, إِنَّ اللَّهَ أَوْحَى إِلَى أَنْ تَوَاضَعُوا حَتَّى لَا يَفْخَرَ أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ وَّلَا يَبْغِيَ أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ
"আল্লাহ তাআলা আমার নিকট ওহি পাঠিয়েছেন যে, তোমরা বিনয়ী হও, কেউ যেন কারও ওপর গর্ব না করে এবং কেউ যেন কারও প্রতি অবিচার না করে।” [৫৭৪]
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল বলেছেন,
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِّنْ كِبْرٍ
"যার অন্তরে বিন্দু পরিমাণও অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।"[৫৭৫]
'সহীহাইন'-এর বর্ণনায় এসেছে, নবি বলেছেন,
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ النَّارِ كُلُّ عُتُلٍ جَوَّاظٍ مُسْتَكْبِرٍ
"আমি কি তোমাদেরকে জাহান্নামবাসীর পরিচয় জানাব না? তারা হবে প্রত্যেক নিষ্ঠুর, দাম্ভিক ও অহংকারী লোক।”[৫৭৬]
আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ জান্নাত-জাহান্নামের তর্কবিতর্ক সম্পর্কে বলেছেন, "জাহান্নাম বলবে,
مَا لِي لَا يَدْخُلُنِي إِلَّا الْجَبَّارُوْنَ وَالْمُتَكَبِّرُونَ
'আমার কী হলো, আমার মধ্যে কেবল দাম্ভিক ও অহংকারীরাই প্রবেশ করছে!'
জান্নাত বলবে,
مَا لِي لَا يَدْخُلُنِي إِلَّا ضُعَفَاءُ النَّاسِ وَسَقَطُهُمْ
'আমার কী হলো, আমার মধ্যে কেবল দুর্বল ও অসহায় ব্যক্তিরাই প্রবেশ করছে!'[৫৭৭]
'সহীহ মুসলিম'-এর এক বর্ণনায় এসেছে, আবূ সাঈদ খুদরি ও আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, তারা বলেন, 'রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
الْعِزُّ إِزَارُهُ، وَالْكِبْرِيَاءُ رِدَاؤُهُ، فَمَنْ يُنَازِعُنِي عَذَّبْتُهُ
"সম্মান হলো আল্লাহ তাআলার জামা আর অহংকার হলো তাঁর চাদর। (আল্লাহ বলেন) যে ব্যক্তি আমার সাথে তা নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করবে, আমি অবশ্যই তাকে শাস্তি দেবো।”[৫ ৭৮]
নবি ছোটো ছোটো শিশুদের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদেরকে সালাম দিতেন।[৫৭৯]
দাসীও রাসূলুল্লাহ -এর হাত ধরে যেখানে ইচ্ছা নিয়ে যেত। আর তিনিও তার সাথে তার ইচ্ছামতো চলে যেতেন।[৫৮০]
নবি যখন ঘরে থাকতেন, ঘরের লোকজনকে তাদের কাজে সাহায্য করতেন।[৫৮১]
আল্লাহর রাসূল নিজের জুতা নিজেই মেরামত করতেন, নিজের কাপড় নিজেই সেলাই করতেন, পরিবারের লোকজনদের জন্য বকরির দুধ দোহন করতেন, খাদিমের সঙ্গে বসে খাবার খেতেন, ইয়াতীম ও বিধবাদের প্রয়োজন পুরা করতেন, কারও সাথে দেখা হলে তিনিই আগে সালাম দিতেন আবার কেউ দাওয়াত করলে তা গ্রহণ করতেন, তা যত সামান্য বস্তুর জন্যই হোক না কেন।
নবি বলেছেন,
لَوْ دُعِيْتُ إِلَى ذِرَاعٍ أَوْ كُرَاعٍ لَأَجَبْتُ وَلَوْ أُهْدِيَ إِلَيَّ ذِرَاعٌ أَوْ كُرَاعٌ لَقَبِلْتُ
"যদি আমাকে পশুর পায়া বা হাতা খেতে দাওয়াত করা হয়, তবুও আমি তা কবুল করব। আর যদি আমাকে পায়া বা হাতা হাদিয়া দেওয়া হয়, তা হলে অবশ্যই আমি তা গ্রহণ করব।”[৫৮২]
নবি অসুস্থ ব্যক্তিদের দেখতে যেতেন, জানাযায় উপস্থিত হতেন এবং গোলাম বা দাসের দাওয়াতও কবুল করতেন।
ফুযাইল ইবনু ইয়ায-কে একবার বিনয় ( تواضع ) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো। উত্তরে তিনি বললেন, 'বিনয় হলো-হক ও সত্যের প্রতি নত হওয়া, তা মেনে নেওয়া এবং তা যে-ই বলুক, তার থেকে তা গ্রহণ করা।'[৫৮৩]
কেউ কেউ বলেছেন, 'বিনয় হলো নিজেকে মূল্যহীন দেখা। যে নিজেকে মূল্যবান মনে করে, বিনয়ে তার কোনো অংশ নেই।' এটি ফুযাইল-সহ আরও কতিপয় আলিমের মত।[৫৮৪]
জুনাইদ বাগদাদি বলেছেন, 'তাওয়াজু' হলো: ডানাকে নত করা এবং পার্শ্বকে নরম করা।'
আবূ ইয়াযীদ বুসতামি বলেছেন, 'নিজের কোনো মর্যাদা ও অবস্থান চোখে না পড়া এবং সৃষ্টির মধ্যে নিজের থেকে খারাপ আর কাউকে না দেখা।'[৫৮৫]
ইবনু আতা বলেছেন, 'বিনয় হলো সত্যকে গ্রহণ করা, তা যার কাছেই থাকুক। আর বিনয়ের মধ্যেই নিহিত রয়েছে প্রকৃত সম্মান। যে ব্যক্তি অহংকারের মধ্যে তা তালাশ করে, সে ওই ব্যক্তির মতো যে আগুনের মধ্যে পানি খোঁজে।'
উরওয়া ইবনুয যুবাইর বলেন, 'আমি উমর ইবনুল খাত্তাব-এর কাঁধে পানির মশক দেখে বললাম, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আপনার জন্য এটা শোভা পায় না।' জবাবে তিনি বললেন, 'বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধিদল যখন নত হয়ে, আনুগত্য স্বীকার করে আমার কাছে আসে, তখন আমার অন্তরে কিছুটা অহমিকা চলে আসে, আমি পছন্দ করি যে, তা ভেঙে দিই।'[৫৮৬]
আবূ হুরায়রা একবার আমীর নিযুক্ত হলেন। তখন তিনি নিজের পিঠে করে কাঠের বোঝা বহন করতেন আর বলতেন, 'আমীরকে পথ করে দাও, আমীরকে পথ করে দাও!'[৫৮৭]
রজাহ ইবনু হাইওয়া বলেন, 'উমর ইবনু আবদিল আযীয যে পোশাক পরে খুতবা দিতেন, তার মূল্য ছিল মাত্র বারো দিরহাম। পোশাকের মধ্যে ছিল-একটি জুব্বা, একটি পাজামা, একটি পাগড়ি, দুটি মোজা আর একটি টুপি।'[৫৮৮]
মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াসি' তার এক ছেলেকে দেখলেন দাম্ভিকতার সাথে হাঁটছে। তখন তিনি তাকে বললেন, 'তুমি জানো, তোমার মাকে আমি কত দিরহাম দিয়ে কিনেছি? মাত্র তিনশ দিরহাম। আর তোমার বাবা? আমি! আল্লাহ যেন মুসলমানদের মধ্যে তার মতো অধিক (মানুষ) না বানান! আর তুমি এভাবে দাম্ভিকতার সাথে হাঁটছো!? [৫৮৯]
আল্লাহর সাথে সর্বপ্রথম যে গুনাহ করা হয়েছে তা হলো-অহংকার ও লোভ। অহংকার ছিল অভিশপ্ত ইবলীসের গুনাহ। আর এর পরিণতি যা হবার তা-ই হয়েছে। আর লোভ ও খাহেশ ছিল আদম-এর গুনাহ। যার পরিণতি হয়েছিল তাওবা ও হিদায়াত। ইবলীসের গুনাহ তাকে হঠকারিতা, বড়োত্ব আর মর্যাদা পাওয়ার জন্য তর্কবিতর্কের দিকে ঠেলে দিয়েছে। অপরদিকে আদম-এর গুনাহ তাকে নিজেকে দোষী বলে স্বীকার করতে এবং ইস্তিগফার করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
সুতরাং অহংকারী, হঠকারী ও দাম্ভিক ব্যক্তিদের ঠিকানা হবে তাদের শাইখ ও নেতা ইবলীসের সাথে জাহান্নামে। অপরদিকে অপরাধে লিপ্ত ও লোভী ব্যক্তি, যারা ইস্তিগফার করে, তাওবা করে, নিজের দোষ স্বীকার করে এবং বড়োত্ব লাভের জন্য তর্কবিতর্ক করে না, তাদের ঠিকানা হবে তাদের পিতা আদম-এর সাথে জান্নাতে।
আমি শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা -কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, ‘অহংকার হলো শিরকের চেয়েও নিকৃষ্ট। কারণ অহংকারী ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার ইবাদাতের ক্ষেত্রেও অহংকার করে। আর মুশরিক আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করে, তবে তার সাথে অন্যান্য উপাস্যেরও ইবাদাত করে।’ আল্লাহর রাসূল বলেছেন,
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِّنْ كِبْرٍ
"যার অন্তরে বিন্দু পরিমাণও অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" ২৯০।
টিকাঃ
[৫৭৩] সূরা ফুরকান, ২৫: ৬৩।
[৫৭৪] মুসলিম, ২৮৬৫।
[৫৭৫] মুসলিম, ৯১।
[৫৭৬] বুখারি, ৪৯১৮; মুসলিম, ২৮৫৩।
[৫৭৭] বুখারি, ৪৮৫০; মুসলিম, ২১৪৬।
[৫৭৮] মুসলিম, ২৬২০।
[৫৭৯] বুখারি, ৬২৪৭; মুসলিম, ২১৬৮।
[৫৮০] বুখারি, ৬০৭২।
[৫৮১] বুখারি, ৬৭৬।
[৫৮২] বুখারি, ২৫৬৮।
[৫৮৩] ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশূক, ৪৮/৪১৯।
[৫৮৪] ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশুক, ৪৮/৪১৯।
[৫৮৫] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ১/২৭৯।
[৫৮৬] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ১/২৭৯।
[৫৮৭] ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশ্ক। ৬৭/৩৭৩।
[৫৮৮] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৫/৩২২।
[৫৮১] ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশ্ক, ৩/৭২।
[৫৯০] মুসলিম, ৯১।
📄 মানযিল : মানবিকতা (اَلْمُرُوءَةُ)
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো-মানবিকতার মানযিল।
الْمُرُوْءَةُ হলো-আত্মাকে মানবিক গুণাবলিতে গুণান্বিত করা; যে গুণগুলোর মাধ্যমে প্রাণী ও অভিশপ্ত শয়তান থেকে মানুষ পৃথক হয়ে যায়।
ফকীহগণ এর সংজ্ঞায় বলেছেন, ' যা ব্যক্তিকে সুন্দর ও উত্তম গুণাবলিতে সুসজ্জিত করে, তা আঁকড়ে ধরা আর যা তাকে ত্রুটিযুক্ত ও মন্দ স্বভাবের বানায়, তা পরিত্যাগ করা।'
কেউ কেউ বলেছেন, 'সব ধরনের ভালো ও উত্তম আচরণ প্রয়োগ করা এবং সব ধরনের খারাপ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা।'
মুরূআত বা মানবিকতার মূল তাৎপর্য হলো-কথায়, কাজে এবং স্বভাব-চরিত্রে সমস্ত নীচতা ও হীনতা পরিহার করে চলা।
সুতরাং জিহ্বার মুরূআত : মিষ্টতা, পবিত্রতা ও কোমলতা এবং সহজ ও প্রাঞ্জলতার মাধ্যমে এর উপকারী ফল লাভ করা।
স্বভাব-চরিত্রের মুরূআত : প্রিয়জন ও দুশমন সবার প্রতিই অন্তর প্রশস্ত রাখা এবং হাসিখুশি ব্যবহার করা।
সম্পদের মুরূআত : যৌক্তিক, সামাজিক ও শারঈ দৃষ্টিকোণ থেকে কেবল প্রশংসনীয় খাতে তা ব্যয় করা।
ক্ষমতার মুরূআত : অভাবী ব্যক্তির প্রয়োজনে ক্ষমতাকে কাজে লাগানো।
দয়া-অনুগ্রহের মুরূআত: দ্রুততার সাথে বেশি বেশি দয়া ও অনুগ্রহ করতে থাকা। কারও প্রতি ইহসান করার সময় এর পরিমাণের দিকে না দেখা এবং ইহসান করার পর তা ভুলে যাওয়া।
এগুলো হলো সুন্দর ও উত্তম গুণাবলি দ্বারা নিজেকে সুসজ্জিত করার মানবিকতা।
আর মন্দ ও খারাপ গুণাবলি থেকে বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে মুরূআত হলো: ঝগড়া করা থেকে বিরত থাকা; এমনিভাবে নিন্দা করা, কারও নিকট হাতপাতা এবং তর্কবিতর্ক করা থেকে বিরত থাকা। এর তিনটি স্তর রয়েছে—
প্রথম স্তর: ব্যক্তির নিজের সাথে মানবিকতা (مُرُوْءَةُ الْمَرْءِ مَعَ نَفْسِهِ): এটি ব্যক্তিকে সমস্ত ভালো গুণাবলির দ্বারা সজ্জিত হওয়ার দিকে এবং খারাপ গুণাবলি ছেড়ে দেওয়ার দিকে মনোযোগী হতে বাধ্য করে।
দ্বিতীয় স্তর : অন্যান্য সবার সাথে মানবিকতা (الْمُرُوْءَةِ مَعَ الخُلْقِ): এটি হলো সবার সাথে শিষ্টাচার, ভদ্রতা, লজ্জাশীলতা এবং উত্তম আদব-আখলাকের সাথে মেলামেশা করা।
তৃতীয় স্তর : আল্লাহর সাথে মানবিকতা (الْمُرُوْءَةُ مَعَ الْحَقِّ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى): আল্লাহ তাআলা আপনাকে দেখছেন এবং তিনি আপনার প্রতিটি বিষয়ে খুঁটিনাটি সবকিছু অবগত আছেন—এই ভাবনায় আল্লাহকে লজ্জা পাওয়া। আর নিজের নফসের দোষত্রুটিগুলোকে সংশোধন করতে সাধ্যমতো চেষ্টা করা।
উত্তম চরিত্র ও উদারতার মানযিলে যে আলোচনা অতিবাহিত হয়েছে, সে আলোচনা এই মানযিলেও প্রযোজ্য।