📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 শাস্তির ভয় ও সাওয়াবের আশা না করে ইবাদাত করা কি সম্মান-প্রদর্শনের অন্তর্ভুক্ত?

📄 শাস্তির ভয় ও সাওয়াবের আশা না করে ইবাদাত করা কি সম্মান-প্রদর্শনের অন্তর্ভুক্ত?


এ সম্পর্কে সৃফিয়ায়ে কেরামের অনেক আলোচনা রয়েছে। মানুষ এই গুণের অধিকারী ব্যক্তিদের অনেক বেশি সম্মান করে এবং এই বিশ্বাস রাখে যে, এটিই হলো দাসত্বের সর্বোচ্চ স্তর। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করবে, তাঁর আদেশ- নিষেধ পরিপূর্ণরূপে মেনে চলবে; তবে তা তাঁর শাস্তির ভয়ে কিংবা সাওয়াব পাওয়ার আশায় নয়।
কারণ এটি হলো কেবলই নিজস্বার্থ চিন্তা ও সুবিধা ভোগ। আর মহাব্বত এই বিষয়টিকে প্রত্যাখ্যান করে। কারণ ভক্ত তার প্রিয় মানুষের মহাব্বতে কোনো স্বার্থ অনুসন্ধান করে না। কেউ যদি তা স্বার্থের কারণে করে, তা হলে তার মহাব্বত ও ভালোবাসা ত্রুটিযুক্ত। আর সাওয়াবের আশা করার মাঝে এই বিষয়টি লুকায়িত রয়েছে যে, বান্দা নিজ আমলের দ্বারা আল্লাহর নিকট প্রতিদান পাওয়ার জন্য নিজেকে হকদার মনে করে থাকে। এর মধ্যে দুটি বিপদ রয়েছে: ১. পুরস্কার পাওয়ার কামনা এবং ২. নিজ আমল সম্পর্কে উত্তম ধারণা। কারণ তার আমলের দ্বারাই তো সে নিজেকে পুরস্কার ও প্রতিদান পাওয়ার হকদার মনে করে বসে আছে। অপরদিকে শাস্তির ভয় করা মানে নিজের নফসের সাথে ঝগড়া করা। কারণ যখনই কোনো হুকুমের বিপরীত হবে, তখনই ঝগড়া শুরু হয়ে যাবে, নিজের নফসকে বলতে থাকবে, 'তুমি কি জাহান্নামের আগুনকে ভয় করো না? এর আযাব ও জাহান্নামিদের জন্য আল্লাহ কী কঠিন শাস্তি তৈরি করে রেখেছেন তার কি কোনো পরোয়া করো না?' তার মাঝে ও তার নফসের মাঝে এই বাগ্বিতণ্ডা চলতেই থাকবে।
সে এই ঝগড়া ও বাগ্বিতণ্ডা থেকে রেহাই পাবে না কখনো। এ থেকে মুক্তি মিলবে কেবল তখনই, যখন আল্লাহ তাআলার আদেশ-নিষেধ পালন করবে কোনো ধরনের স্বার্থচিন্তা ছাড়াই। বরং শুধু আদেশকারী ও নিষেধকারী আল্লাহর সম্মানার্থে তা পালন করে যাবে, এই বিশ্বাস রাখবে যে, তিনিই একমাত্র ইবাদাত পাওয়ার উপযুক্ত সত্তা, যাঁর সম্মানিত বস্তুসমূহকে (আদেশ-নিষেধ ইত্যাদি) সম্মান দেখানো এবং মেনে চলা অবশ্যকর্তব্য। যদি তিনি জান্নাত-জাহান্নাম সৃষ্টি নাও করতেন, তবুও তিনি সত্তাগতভাবে ইবাদাত, সম্মান ও মর্যাদা পাওয়ার একচ্ছত্র অধিকার রাখতেন। সুতরাং পবিত্র ও সুউচ্চ গুণাবলির অধিকারী নফস তাঁর ইবাদাত করতে থাকে কোনোকিছু পাওয়ার আশায় কিংবা ক্ষতি থেকে বাঁচতে নয়; বরং তিনি সত্তাগতভাবেই উপযুক্ত যে, তাঁর ইবাদাত করা হবে, তাঁকে সম্মান দেখানো হবে, তাঁকে মহাব্বত করা হবে; তিনি সবকিছুর প্রকৃত মালিক এবং তিনি দাসত্ব লাভের একমাত্র সত্তা। তারা বলেন, বান্দা কখনো শ্রমিকের ন্যায় হতে পারে না যে, পারিশ্রমিক পেলে কাজ করবে আর না পেলে কাজ করবে না। সে যদি এ রকম করে, তা হলে সে হবে প্রতিদানের গোলাম; মহাব্বত ও স্বেচ্ছায় গোলাম নয়।
তারা বলেন: এ ক্ষেত্রে আমলকারীগণ দুইটি মানযিলের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখে: ১. প্রতিদানের মানযিল এবং ২. অনুসরণীয় সত্তা আল্লাহর নৈকট্য লাভের মানযিল। আল্লাহ তাআলা দাউদ -এর ব্যাপারে বলেছেন,
وَإِنَّ لَهُ عِنْدَنَا لَزُلْفَى وَحُسْنَ مَآبٍ )
"নিশ্চয়ই আমার কাছে তাঁর জন্য রয়েছে নৈকট্যের মর্যাদা ও উত্তম প্রতিদান।”[৩৫৬]
আয়াতে উল্লেখিত زُلْفَى হলো : নৈকট্যের মানযিল আর حُسْنَ مَآبٍ হলো : উত্তম সাওয়াব ও প্রতিদানের মানযিল।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ
"যারা সৎকর্ম করেছে তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ এবং তার চেয়েও বেশি।"[৩২৭]
এখানে উল্যা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: প্রতিদান ও পুরস্কারের মানযিল। আর উল্যা হলো: নৈকট্যের মানযিল। এ কারণেই এর তাফসীর করা হয় 'আল্লাহ তাআলার দর্শন লাভ' বলে।
তারা বলেন: আরিফ বা আল্লাহর পরিচয়প্রাপ্ত ব্যক্তিদের আমল হয় নৈকট্যের মানযিল ও মর্তবাকে কেন্দ্র করে আর সাধারণ আমলকারীদের আমল হয় সাওয়াব ও প্রতিদান পাওয়াকে কেন্দ্র করে। এ দুয়ের মাঝে রয়েছে বিশাল ব্যবধান।
অপর একটি দল এই দৃষ্টিভঙ্গিকে অপরিণামদর্শী ও চিন্তাশূন্য দৃষ্টিভঙ্গি বলে অভিহিত করেছেন। এর বিপক্ষে তারা দলীল হিসেবে পেশ করেছেন নবি-রাসূল-সিদ্দীকদের অবস্থা, তাঁদের দুআ, আল্লাহর নিকট তাঁদের প্রার্থনা, জাহান্নামকে ভয় করা এবং জান্নাতের প্রত্যাশা করার কারণে তাঁদের প্রশংসা ইত্যাদিকে। যেমন আল্লাহ তাআলা তাঁর বিশেষ বান্দাদের সম্পর্কে বলেছেন যে, তারা তাঁর রহমতের আশা রাখে এবং শাস্তির ভয় করে; যার আলোচনা পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে। এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা তাঁর নবি-রাসূলদের ব্যাপারে বলেছেন,
وَزَكَرِيَّا إِذْ نَادَى رَبَّهُ رَبِّ لَا تَذَرْنِي فَرْدًا وَأَنْتَ خَيْرُ الْوَارِثِينَ فَاسْتَجَبْنَا لَهُ وَوَهَبْنَا لَهُ يَحْيِي وَأَصْلَحْنَا لَهُ زَوْجَهُ إِنَّهُمْ كَانُوا يُسَارِعُوْنَ فِي الخَيْرَاتِ وَيَدْعُوْنَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوا لَنَا خَاشِعِينَ )
"আর যাকারিয়ার কথা স্মরণ করুন, যখন সে তাঁর রবকে ডেকে বলেছিল, 'হে আমার প্রতিপালক, আমাকে একাকী ছেড়ে দিয়ো না আর সবচেয়ে ভালো উত্তরাধিকারী তো তুমিই।' ফলে আমি তাঁর দুআ কবুল করেছিলাম এবং তাঁকে দান করেছিলাম ইয়াহইয়া, আর তাঁর স্ত্রীকে তাঁর জন্য যোগ্য করে দিয়েছিলাম। তারা সৎকাজে আপ্রাণ চেষ্টা করত, আমাকে ডাকত আশা ও ভীতি সহকারে এবং আমার সামনে ছিল অবনত হয়ে।"[৩৫৮]
অর্থাৎ আমার নিকট যা রয়েছে তার প্রতি আগ্রহী হয়ে এবং আমার কঠিন শাস্তির ভয়। এই আয়াতে وَيَدْعُوْنَنَا رَغَبًا وَّرَهَبًا "তারা সৎকাজে আপ্রাণ চেষ্টা করত, আমাকে ডাকত আশা ও ভয় নিয়ে"-এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো এই সূরাতে যেসকল নবি-রাসূলদের আলোচনা এসেছে তারা সবাই। অধিকাংশ মুফাসসিরের অভিমত এটিই।
আর তাদের সবার নিকট اَلرَّغَبُ وَالرَّهَبُ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: আল্লাহর রহমতের আশা করা এবং জাহান্নামের ভয় করা।
আল্লাহ তাআলা তাঁর বিশেষ বান্দাদের আলোচনা করে তাদের আমলের প্রশংসা করেছেন। আর প্রশংসিত আমলের একটি হলো: তাঁর নিকট জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَالَّذِيْنَ يَقُوْلُوْنَ رَبَّنَا اصْرِفْ عَنَّا عَذَابَ جَهَنَّمَ إِنَّ عَذَابَهَا كَانَ غَرَامًا إِنَّهَا سَاءَتْ مُسْتَقَرًّا وَمُقَامًا "তারা দুআ করতে থাকে, 'হে আমাদের রব, জাহান্নামের আযাব থেকে আমাদের বাঁচাও, এর আযাব তো সর্বনাশা। আশ্রয়স্থল ও আবাস হিসেবে তা বড়োই নিকৃষ্ট জায়গা।” [৩৫৯]
আল্লাহ তাআলা তাদের ব্যাপারে এটিও জানিয়ে দিয়েছেন যে, তারা তাদের ঈমানের ওসীলায় জাহান্নাম থেকে মুক্তি কামনা করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, رَبَّنَا إِنَّنَا آمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ الَّذِينَ يَقُولُونَ "যারা বলে, 'হে আমাদের পালনকর্তা, আমরা ঈমান এনেছি, কাজেই আমাদের গুনাহগুলো ক্ষমা করে দাও আর আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করো।”[৩৬০]
তারা আল্লাহ নিকট তাদের ঈমানকে সবচেয়ে বড়ো মাধ্যম বানিয়েছেন এবং এর ওসীলায় জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য প্রার্থনা করেছেন।
নবি ﷺ তাঁর উম্মাতকে আদেশ করেছেন যে, দুআ কবুলের সময় অর্থাৎ আযানের পরপরই তারা যেন তাঁর জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ মানযিল প্রাপ্তির জন্য দুআ করে। তিনি এটিও জানিয়ে দিয়েছেন যে, যারা তাঁর জন্য এই দুআ করবে, তাদের জন্য তাঁর সুপারিশ করা ওয়াজিব হয়ে যাবে।[৩৬১]
একবার সুলাইম আনসারি রাদিয়াল্লাহু আনহু নবি ﷺ-কে বলেছিলেন, 'আমি তো আল্লাহ তাআলার নিকট জান্নাতের প্রার্থনা করি আর জাহান্নাম থেকে পানাহ চাই। কিন্তু আপনার ও মুআযের গুনগুনানি ভালোমতো শুনতে পারি না। (ফলে, আপনারা দুআয় কী বলেন তা বুঝি না)। তখন নবি ﷺ বলেছিলেন, "আমি আর মুআয আমরাও তোমার দুআর কাছাকাছিই গুনগুন (দুআ) করি।”[৩৬২]
আসলে কুরআন মাজীদ ও পবিত্র সুন্নাহয় আল্লাহর এমন বান্দা ও ওলিদের প্রশংসায় ভরপুর, যারা জান্নাত লাভের প্রার্থনা করে ও এর আশা রাখে এবং জাহান্নাম থেকে পানাহ চায় ও এর ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত থাকে।
তারা বলেন: নবি ﷺ সাহাবায়ে কেরামকে বলেছেন,
اسْتَعِيذُوا بِاللَّهِ مِنْ عَذَابِ جَهَنَّمَ، وَاسْتَعِيذُوا بِاللَّهِ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ، اِسْتَعِيذُوا بِاللَّهِ مِنْ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ وَاسْتَعِيذُوا بِاللَّهِ مِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ
"তোমরা আল্লাহর কাছে জাহান্নামের শাস্তি থেকে পানাহ চাও, তোমরা আল্লাহর কাছে কবরের শাস্তি থেকে পানাহ চাও, তোমরা আল্লাহর কাছে মাসীহ দাজ্জালের ফিতনা থেকে পানাহ চাও, তোমরা আল্লাহর কাছে জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা থেকে পানাহ চাও।”[৩৬৩]
যেই ব্যক্তি জান্নাতে নবি ﷺ-এর সান্নিধ্য পাওয়ার কামনা করেছিল, সেই ব্যক্তিকে তিনি বলেছিলেন,
فَأَعِنِّي عَلَى نَفْسِكَ بِكَثْرَةِ السُّجُودِ
“তা হলে তুমি অধিক পরিমাণে সাজদার মাধ্যমে (অর্থাৎ বেশি বেশি সালাত আদায় করে) তোমার নিজের জন্য আমাকে সাহায্য করো।”৩৯৪।
তারা বলেন: উম্মাতের নিকট নবি -এর এটা মাকসুদ বা উদ্দেশ্য ছিল যে, তারা জান্নাত লাভের জন্য এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আমল করবে। যাতে তারা সবসময় এ দুটিকে স্মরণে রাখে, কখনো ভুলে না যায়। এর আরেকটি কারণ হলো: আখিরাতে নাজাত পাওয়ার জন্য জান্নাত-জাহান্নামের ওপর ঈমান আনা আবশ্যক। আর জান্নাত লাভের আশায় এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার আগ্রহে আমল করা এটি খাঁটি ঈমানের পরিচয়। (কারণ পুরা দ্বীনের ওপর ঈমান না থাকলে কারও থেকে এমনটি প্রকাশ পাওয়া অসম্ভব।)
তারা বলেন: নবি তাঁর সাথিসঙ্গীদের ও পুরা উম্মাহকে জান্নাত লাভের জন্য উদ্বুদ্ধ করতেন, জান্নাতের হৃদয়গ্রাহী বর্ণনা দিতেন, যাতে করে তারা তা পাওয়ার কামনা করে এবং সে জন্য আমল করে। তিনি বলেছেন,
أَلَا مُشَمِّرٌ لِلْجَنَّةِ فَإِنَّ الجَنَّةَ لَا خَطَرَ لَهَا هِيَ وَرَبِّ الْكَعْبَةِ نُوْرٌ يَتَلالُأُ وَرَيْحَانَةٌ تَهْتَزُّ وَقَصْرٌ مَّشِيدٌ وَنَهَرٌ مُطَرِدٌ وَفَاكِهَةٌ كَثِيرَةٌ نَضِيجَةٌ وَزَوْجَةً حَسْنَاءُ جَمِيلَةً وَحُلَلْ كَثِيرَةٌ فِي مَقَامٍ أَبَدًا فِي حَبْرَةٍ وَنَضْرَةٍ فِي دَارٍ عَالِيَةٍ سَلِيمَةٍ بَهِيَّةٍ
“জান্নাতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণকারী কেউ কি আছে? কারণ কা'বার রবের কসম! জান্নাতের সমতুল্য আর কিছু নেই। তার এমন আলো রয়েছে, যা চারদিক ঝলমল করে তোলে। তার পুষ্পরাজি সুবাস ছড়ায়। যাতে রয়েছে সুরম্য মজবুত অট্টালিকা, অবিরাম প্রবাহমান নদী, সুমিষ্ট পাকা ফলের প্রাচুর্য, অলংকারে সুসজ্জিতা পরমা সুন্দরী স্ত্রী, সবুজ শ্যামলিমার নিয়ামাতে ভরপুর চিরস্থায়ী বাসস্থান, গগনচুম্বী নিরাপদ ও মনোরম বাড়িঘর।”
সাহাবায়ে কেরাম জবাব দেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, তার জন্য আমরাই প্রস্তুতি গ্রহণ করব।'
তিনি বলেন,
قُوْلُوْا إِنْ شَاءَ اللهُ
"তোমরা বলো, 'ইন শা আল্লাহ', আল্লাহ যদি চান।”[৩৬৫]
এখন যদি আমরা হাদীসে উল্লেখিত নবি -এর এই রকম বাণী নিয়ে আলোচনা শুরু করি যে, 'যে ব্যক্তি এই এই আমল করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন', তা হলে বইয়ের কলেবর বৃদ্ধি পেয়ে বিশালাকার ধারণ করবে। আসলে এ রকম অসংখ্য বর্ণনা রয়েছে। তিনি এ রকম করে বলেছেন যাতে তারা জান্নাতের আশায় সেই আমল করতে উদ্বুদ্ধ হয় এবং জান্নাতই যেন হয় তাদের আগ্রহের বিষয়।
তারা বলেন: প্রতিদানপ্রাপ্তির আশায় ও শাস্তির ভয়ে আমল করলে তা কীভাবে ত্রুটিযুক্ত বলে গণ্য হবে?! অথচ রাসূলুল্লাহ -এর ওপর উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং এ রকমভাবে বলেছেন, যে ব্যক্তি এই আমল করবে, তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজাই খুলে দেওয়া হবে...!
তারা বলেন: এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা সেই বান্দাদের ভালোবাসেন, যারা তাঁর নিকট জান্নাতের প্রার্থনা করে এবং জাহান্নাম থেকে পানাহ চায়। কারণ আল্লাহ তাআলার নিকট চাইলে তিনি খুশি হন এবং না চাইলে তিনি রাগান্বিত হন। আর তাঁর কাছে যা চাওয়া হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে উত্তম ও সবচেয়ে বড়ো হলো: জান্নাত এবং যা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়, তার মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট ও খারাপ হলো: জাহান্নাম।
সুতরাং জান্নাত লাভের আশায় এবং জাহান্নামের ভয়ে আমল করা আল্লাহ তাআলার নিকট অতি প্রিয় ও সন্তুষ্টিজনক। জান্নাত অনুসন্ধান করা এবং জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাওয়া হলো রবের দাসত্ব। আর অপূর্ণাঙ্গ দাসত্বের চেয়ে পরিপূর্ণরূপে দাসত্বের পরিচয় দেওয়াই হলো উত্তম। (যারা জান্নাতের আশা করে না এবং জাহান্নামের ভয় করে না, তাদের দাসত্ব হয় অপূর্ণাঙ্গ।)
তারা বলেন: যখন কোনো আমলকারী জান্নাত ও জাহান্নামের প্রতি দৃষ্টি দেবে না, জান্নাতের আশা-আকাঙ্ক্ষা করবে না, তখন তার সংকল্প নিস্তেজ হয়ে যাবে, তার হিম্মত দুর্বল হয়ে পড়বে, চলার অনুপ্রেরণা সে হারিয়ে ফেলবে। কিন্তু যখন তার জান্নাত পাওয়ার তীব্র বাসনা জন্মাবে, তখন এর জন্য আমল করার প্রতি উদ্বুদ্ধকারীও বেশ শক্তিশালী হবে, তার সংকল্প ও পথচলার ইচ্ছাও সুদৃঢ় হবে এবং এর জন্য তার পরিশ্রমও পূর্ণতা পাবে। আসলে এই বিষয়টি সুস্থ রুচিবোধের দ্বারাই জানা যায়।
তারা বলেন: এটি যদি শারীআহ-প্রণেতার উদ্দেশ্য না হতো, তা হলে তিনি তার বান্দাদের জন্য জান্নাতের বর্ণনা দিতেন না, তাদের সামনে তা সুসজ্জিত ও লোভনীয়রূপে ফুটিয়ে তুলতেন না, তাদের নিকট তা পেশ করতেন না এবং তাদেরকে এর বিস্তারিত বিবরণ শুনাতেন না, যে পর্যন্ত তাদের চিন্তাভাবনা কখনো পৌঁছার কথা ছিল না। এ সবগুলো তিনি করেছেন জান্নাতের প্রতি বান্দাদের আগ্রহ বাড়ানোর জন্য এবং তা হাসিল করতে যথাযথ প্রস্তুতি নেবার জন্য।
তারা বলেন: আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَاللَّهُ يَدْعُوْ إِلَى دَارِ السَّلَامِ "আর আল্লাহ শান্তি ও নিরাপত্তার ঘর (-জান্নাত)-এর দিকে আহ্বান করেন।” [৩৬৬]
এটি হলো সেই আহ্বানে সাড়া দেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা এবং জান্নাতের প্রতি তৎপর হওয়া এবং দ্রুত সেই ডাকে লাব্বাইক বলার জন্য উৎসাহ দেওয়া।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: জান্নাত শুধু গাছ-গাছালি, ফলমূল, খাবার, পানীয়, ডাগর চক্ষুবিশিষ্ট হুর, নদী, অট্টালিকা ইত্যাদির নাম নয়। অধিকাংশ মানুষ জান্নাতের নামের ক্ষেত্রে এই ভুলটি করে থাকে। আসলে জান্নাত হলো সব নিয়ামাতে পরিপূর্ণ একটি আবাসের নাম। জান্নাতের সবচেয়ে বড়ো উপভোগ্য নিয়ামাত হলো: আল্লাহর দিকে তাকিয়ে থাকা, তাঁর কথা শ্রবণ করা, তাঁর সন্তুষ্টি ও সান্নিধ্য দ্বারা চক্ষু শীতল করা। প্রকৃত অর্থে জান্নাতের খাদ্য, পানীয়, পোশাক-পরিচ্ছদ, আকার-আকৃতি ইত্যাদির সাথে এই দুনিয়ার কোনোকিছুরই কোনো মিল নেই। দেখতে এক রকম হলেও স্বাদে ও পরিপূর্ণতায় রয়েছে বিশাল ব্যবধান। পরকালে আল্লাহ তাআলার সামান্য একটু সন্তুষ্টি জান্নাত ও তার মধ্যকার সমস্ত নাজ-নিয়ামাত থেকেও উত্তম। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَرِضْوَانٌ مِّنَ اللَّهِ أَكْبَرُ "বস্তুত এ (নিয়ামাত) সমুদয়ের মাঝে সবচেয়ে বড়ো হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি।”[৩৬৭]
رضوان-কে এখানে তানবীনসহ আনা হয়েছে, ফলে তা তাকলীল বা কম বোঝানোর অর্থ প্রদান করে; যার অর্থ দাঁড়ায়: বান্দার প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টির সামান্যতম অংশও জান্নাতের চেয়ে অনেক বড়ো।
সহীহ হাদীসে এসেছে, যাকে حَدِيثُ الرُّؤْيَةِ (দর্শনের হাদীস) বলা হয়, নবি বলেছেন,
فَمَا أُعْطُوا شَيْئًا أَحَبَّ إِلَيْهِمْ مِّنَ النَّظَرِ إِلَى رَبِّهِمْ عَزَّ وَجَلَّ "তাদেরকে আল্লাহর দর্শন লাভের চেয়ে অধিক পছন্দনীয় জিনিস আর কিছুই দান করা হয়নি।”[৩৬৮]
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, বিষয়টি এমনই। চিন্তাভাবনা আর কল্পনায় যা আসে, তার চেয়ে এটি অধিক সম্মানিত ও মহান। বিশেষ করে মহাব্বতকারীরা যখন সেখানে মহাব্বতের প্রতিদান পাবে, তাদের প্রিয় সত্তার সান্নিধ্য লাভ করার মাধ্যমে, তখন তা বুঝে আসবে। কারণ মানুষ যাকে ভালোবাসবে, সেদিন সে তারই সঙ্গী হবে। এই হুকুমের মধ্যে কোনো ব্যতিক্রম নেই। বরং তা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বেশ শক্তিশালীভাবেই প্রমাণিত।
সুতরাং কোন স্বাচ্ছন্দ্য, কোন স্বাদ, চক্ষু শীতলকারী কোন বস্তু ও কোন সফলতা সেদিনের সেই নৈকট্য ও সান্নিধ্য এবং সেই স্বাদ ও চোখের শীতলতার সমান হবে?
আল্লাহর শপথ! আল্লাহর নৈকট্যলাভ ও দর্শনই হলো সেই নিদর্শন, যার দিকে মহাব্বতকারীরা ছুটে চলে! এটিই সেই পতাকা, যার ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণের জন্য আল্লাহর মা'রিফাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা উদ্‌গ্রীব থাকে! এটিই হলো 'জান্নাত'-এর রূহ ও প্রাণ। এর কারণেই জান্নাত এত সুশোভিত ও মনোরম! এর ওপরই জান্নাতের খুঁটি!
সুতরাং কীভাবে বলা যায়, বান্দা জান্নাত লাভের আশায় এবং জাহান্নামের ভয়ে আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করবে না?!
জাহান্নাম থেকে আমরা আল্লাহর কাছে পানাহ চাই! জাহান্নামের অধিবাসীদের জন্য আল্লাহ তাআলাকে না দেখার যে কঠিন শাস্তি, তাদের ওপর তাঁর লাঞ্ছনা, রাগ ও অসন্তুষ্টি এবং আল্লাহর নিকট থেকে তাদের দূরে থাকা—জাহান্নামের আগুনে তাদের শরীর ও রূহ জ্বলেপুড়ে অঙ্গার হওয়ার চেয়েও বেশি ভয়াবহ ও মারাত্মক যন্ত্রণার। আসলে আল্লাহকে না দেখার আগুনে আগে তাদের অন্তর পুড়ে যায়, এরপর সেখান থেকে পুরা শরীরে সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
সুতরাং নবি, রাসূল, সিদ্দীক, শহীদ ও নেককার ব্যক্তিগণ—সবার পরম চাওয়ার বস্তু হলো: জান্নাত অর্জন আর জাহান্নাম থেকে পলায়ন। আল্লাহ তাআলাই একমাত্র সাহায্যকারী। ভরসা করতে হবে শুধু তাঁরই ওপর। তাঁর সাহায্য ব্যতীত কেউ না-কোনো নেককাজ করতে পারে আর না-কোনো গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে পারে। তিনিই আমাদের জন্য যথেষ্ট আর তিনি সর্বোত্তম অভিভাবক।

টিকাঃ
[৩৫৬] সূরা সাদ, ৩৮: ২৫।
[৩৫৭] সূরা ইউনুস, ১০: ২৬।
[৩৫৮] সূরা আম্বিয়া, ২১: ৮৯-৯০।
[৩৫৯] সূরা ফুরকান, ২৫: ৬৫-৬৬।
[৩৬০] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৬।
[৩৬১] মুসলিম, ৩৮৪।
[৩৬২] আবূ দাউদ, ৭৯২; ইবনু মাজাহ, ৯১০।
[৩৬৩] তিরমিযি, ৩৬০৪।
[৩৬৪] মুসলিম, ৪৮৯।
[৩৬৫] ইবনু মাজাহ, ৪৩৩২।
[৩৬৬] সূরা ইউনুস, ১০: ২৫।
[৩৬৭] সূরা তাওবা, ৯: ৭২।
[৩৬৮] মুসলিম, ১৮১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00