📄 মানযিল : আল্লাহর সম্মানিত বস্তুসমূহকে সম্মান করা (تَعْظِيمُ حُرُمَاتِ اللَّهِ)
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো—আল্লাহ তাআলার সম্মানিত বস্তুসমূহকে সম্মান করার মানযিল।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَمَنْ يُعَظِّمْ حُرُمَاتِ اللَّهِ فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ عِنْدَ رَبِّهِ “আর যে কেউ আল্লাহর সম্মানিত বস্তুসমূহের সম্মান করবে, তার জন্য তার রবের কাছে তা উত্তম (বলে গণ্য হবে)।” [৩৫৩]
অনেক মুফাসসির বলেছেন, ‘এখানে আল্লাহর সম্মানিত বস্তুসমূহ (حُرُمَاتُ اللهِ) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: তাঁর অবাধ্যতা ও তাঁর নিষেধকৃত বস্তুসমূহ। আর একে সম্মান করার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: সেগুলোতে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকা।’
লাইস বলেছেন, ‘আল্লাহর সম্মানিত বস্তুসমূহ হলো: যে কাজে লিপ্ত হওয়া হালাল নয়।’[৩৫৪] আরেক দল বলেছেন, ‘হুরুমাতুল্লাহ হলো: আল্লাহ তাআলার আদেশ ও নিষেধ।’
যাজ্জাজ বলেছেন, ‘তা হলো: যা পালন করা ওয়াজিব এবং যে ব্যাপারে শিথিলতা প্রদর্শন করা হারাম।’[৩৫৫] একদল বলেছেন, ‘এখানে হুরুমাত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: সময় ও স্থান বিবেচনায় হাজ্জের পালনীয় বিধিবিধান ও নিদর্শনাদি।'
তবে সঠিক অভিমত হলো: হুরুমাতুল্লাহ এগুলোর সব কয়টিকেই অন্তর্ভুক্ত করে। حُرُمَات হলো حُرْمَةٌ-এর বহুবচন। এর অর্থ হলো: যা শ্রদ্ধা করা ও হেফাজত করা ওয়াজিব; যেমন: অধিকার, ব্যক্তি, সময় ও স্থান। আর এর সম্মান করার অর্থ হলো: এর হক যথাযথভাবে আদায় করা এবং তা নষ্ট না করে সংরক্ষণ করা।
শাস্তির ভয় ও সাওয়াবের আশা না করে ইবাদাত করা কি সম্মান- প্রদর্শনের অন্তর্ভুক্ত?
এ সম্পর্কে সৃফিয়ায়ে কেরামের অনেক আলোচনা রয়েছে। মানুষ এই গুণের অধিকারী ব্যক্তিদের অনেক বেশি সম্মান করে এবং এই বিশ্বাস রাখে যে, এটিই হলো দাসত্বের সর্বোচ্চ স্তর। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করবে, তাঁর আদেশ- নিষেধ পরিপূর্ণরূপে মেনে চলবে; তবে তা তাঁর শাস্তির ভয়ে কিংবা সাওয়াব পাওয়ার আশায় নয়।
কারণ এটি হলো কেবলই নিজস্বার্থ চিন্তা ও সুবিধা ভোগ। আর মহাব্বত এই বিষয়টিকে প্রত্যাখ্যান করে। কারণ ভক্ত তার প্রিয় মানুষের মহাব্বতে কোনো স্বার্থ অনুসন্ধান করে না। কেউ যদি তা স্বার্থের কারণে করে, তা হলে তার মহাব্বত ও ভালোবাসা ত্রুটিযুক্ত। আর সাওয়াবের আশা করার মাঝে এই বিষয়টি লুকায়িত রয়েছে যে, বান্দা নিজ আমলের দ্বারা আল্লাহর নিকট প্রতিদান পাওয়ার জন্য নিজেকে হকদার মনে করে থাকে। এর মধ্যে দুটি বিপদ রয়েছে: ১. পুরস্কার পাওয়ার কামনা এবং ২. নিজ আমল সম্পর্কে উত্তম ধারণা। কারণ তার আমলের দ্বারাই তো সে নিজেকে পুরস্কার ও প্রতিদান পাওয়ার হকদার মনে করে বসে আছে। অপরদিকে শাস্তির ভয় করা মানে নিজের নফসের সাথে ঝগড়া করা। কারণ যখনই কোনো হুকুমের বিপরীত হবে, তখনই ঝগড়া শুরু হয়ে যাবে, নিজের নফসকে বলতে থাকবে, 'তুমি কি জাহান্নামের আগুনকে ভয় করো না? এর আযাব ও জাহান্নামিদের জন্য আল্লাহ কী কঠিন শাস্তি তৈরি করে রেখেছেন তার কি কোনো পরোয়া করো না?' তার মাঝে ও তার নফসের মাঝে এই বাগ্বিতণ্ডা চলতেই থাকবে।
সে এই ঝগড়া ও বাগ্বিতণ্ডা থেকে রেহাই পাবে না কখনো। এ থেকে মুক্তি মিলবে কেবল তখনই, যখন আল্লাহ তাআলার আদেশ-নিষেধ পালন করবে কোনো ধরনের স্বার্থচিন্তা ছাড়াই। বরং শুধু আদেশকারী ও নিষেধকারী আল্লাহর সম্মানার্থে তা পালন করে যাবে, এই বিশ্বাস রাখবে যে, তিনিই একমাত্র ইবাদাত পাওয়ার উপযুক্ত সত্তা, যাঁর সম্মানিত বস্তুসমূহকে (আদেশ-নিষেধ ইত্যাদি) সম্মান দেখানো এবং মেনে চলা অবশ্যকর্তব্য। যদি তিনি জান্নাত-জাহান্নাম সৃষ্টি নাও করতেন, তবুও তিনি সত্তাগতভাবে ইবাদাত, সম্মান ও মর্যাদা পাওয়ার একচ্ছত্র অধিকার রাখতেন। সুতরাং পবিত্র ও সুউচ্চ গুণাবলির অধিকারী নফস তাঁর ইবাদাত করতে থাকে কোনোকিছু পাওয়ার আশায় কিংবা ক্ষতি থেকে বাঁচতে নয়; বরং তিনি সত্তাগতভাবেই উপযুক্ত যে, তাঁর ইবাদাত করা হবে, তাঁকে সম্মান দেখানো হবে, তাঁকে মহাব্বত করা হবে; তিনি সবকিছুর প্রকৃত মালিক এবং তিনি দাসত্ব লাভের একমাত্র সত্তা। তারা বলেন, বান্দা কখনো শ্রমিকের ন্যায় হতে পারে না যে, পারিশ্রমিক পেলে কাজ করবে আর না পেলে কাজ করবে না। সে যদি এ রকম করে, তা হলে সে হবে প্রতিদানের গোলাম; মহাব্বত ও স্বেচ্ছায় গোলাম নয়।
তারা বলেন: এ ক্ষেত্রে আমলকারীগণ দুইটি মানযিলের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখে: ১. প্রতিদানের মানযিল এবং ২. অনুসরণীয় সত্তা আল্লাহর নৈকট্য লাভের মানযিল। আল্লাহ তাআলা দাউদ -এর ব্যাপারে বলেছেন,
وَإِنَّ لَهُ عِنْدَنَا لَزُلْفَى وَحُسْنَ مَآبٍ )
"নিশ্চয়ই আমার কাছে তাঁর জন্য রয়েছে নৈকট্যের মর্যাদা ও উত্তম প্রতিদান।”[৩৫৬]
আয়াতে উল্লেখিত زُلْفَى হলো : নৈকট্যের মানযিল আর حُسْنَ مَآبٍ হলো : উত্তম সাওয়াব ও প্রতিদানের মানযিল।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ
"যারা সৎকর্ম করেছে তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ এবং তার চেয়েও বেশি।"[৩২৭]
এখানে উল্যা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: প্রতিদান ও পুরস্কারের মানযিল। আর উল্যা হলো: নৈকট্যের মানযিল। এ কারণেই এর তাফসীর করা হয় 'আল্লাহ তাআলার দর্শন লাভ' বলে।
তারা বলেন: আরিফ বা আল্লাহর পরিচয়প্রাপ্ত ব্যক্তিদের আমল হয় নৈকট্যের মানযিল ও মর্তবাকে কেন্দ্র করে আর সাধারণ আমলকারীদের আমল হয় সাওয়াব ও প্রতিদান পাওয়াকে কেন্দ্র করে। এ দুয়ের মাঝে রয়েছে বিশাল ব্যবধান।
অপর একটি দল এই দৃষ্টিভঙ্গিকে অপরিণামদর্শী ও চিন্তাশূন্য দৃষ্টিভঙ্গি বলে অভিহিত করেছেন। এর বিপক্ষে তারা দলীল হিসেবে পেশ করেছেন নবি-রাসূল-সিদ্দীকদের অবস্থা, তাঁদের দুআ, আল্লাহর নিকট তাঁদের প্রার্থনা, জাহান্নামকে ভয় করা এবং জান্নাতের প্রত্যাশা করার কারণে তাঁদের প্রশংসা ইত্যাদিকে। যেমন আল্লাহ তাআলা তাঁর বিশেষ বান্দাদের সম্পর্কে বলেছেন যে, তারা তাঁর রহমতের আশা রাখে এবং শাস্তির ভয় করে; যার আলোচনা পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে। এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা তাঁর নবি-রাসূলদের ব্যাপারে বলেছেন,
وَزَكَرِيَّا إِذْ نَادَى رَبَّهُ رَبِّ لَا تَذَرْنِي فَرْدًا وَأَنْتَ خَيْرُ الْوَارِثِينَ فَاسْتَجَبْنَا لَهُ وَوَهَبْنَا لَهُ يَحْيِي وَأَصْلَحْنَا لَهُ زَوْجَهُ إِنَّهُمْ كَانُوا يُسَارِعُوْنَ فِي الخَيْرَاتِ وَيَدْعُوْنَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوا لَنَا خَاشِعِينَ )
"আর যাকারিয়ার কথা স্মরণ করুন, যখন সে তাঁর রবকে ডেকে বলেছিল, 'হে আমার প্রতিপালক, আমাকে একাকী ছেড়ে দিয়ো না আর সবচেয়ে ভালো উত্তরাধিকারী তো তুমিই।' ফলে আমি তাঁর দুআ কবুল করেছিলাম এবং তাঁকে দান করেছিলাম ইয়াহইয়া, আর তাঁর স্ত্রীকে তাঁর জন্য যোগ্য করে দিয়েছিলাম। তারা সৎকাজে আপ্রাণ চেষ্টা করত, আমাকে ডাকত আশা ও ভীতি সহকারে এবং আমার সামনে ছিল অবনত হয়ে।"[৩৫৮]
অর্থাৎ আমার নিকট যা রয়েছে তার প্রতি আগ্রহী হয়ে এবং আমার কঠিন শাস্তির ভয়। এই আয়াতে وَيَدْعُوْنَنَا رَغَبًا وَّرَهَبًا "তারা সৎকাজে আপ্রাণ চেষ্টা করত, আমাকে ডাকত আশা ও ভয় নিয়ে"-এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো এই সূরাতে যেসকল নবি-রাসূলদের আলোচনা এসেছে তারা সবাই। অধিকাংশ মুফাসসিরের অভিমত এটিই।
আর তাদের সবার নিকট اَلرَّغَبُ وَالرَّهَبُ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: আল্লাহর রহমতের আশা করা এবং জাহান্নামের ভয় করা।
আল্লাহ তাআলা তাঁর বিশেষ বান্দাদের আলোচনা করে তাদের আমলের প্রশংসা করেছেন। আর প্রশংসিত আমলের একটি হলো: তাঁর নিকট জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَالَّذِيْنَ يَقُوْلُوْنَ رَبَّنَا اصْرِفْ عَنَّا عَذَابَ جَهَنَّمَ إِنَّ عَذَابَهَا كَانَ غَرَامًا إِنَّهَا سَاءَتْ مُسْتَقَرًّا وَمُقَامًا "তারা দুআ করতে থাকে, 'হে আমাদের রব, জাহান্নামের আযাব থেকে আমাদের বাঁচাও, এর আযাব তো সর্বনাশা। আশ্রয়স্থল ও আবাস হিসেবে তা বড়োই নিকৃষ্ট জায়গা।” [৩৫৯]
আল্লাহ তাআলা তাদের ব্যাপারে এটিও জানিয়ে দিয়েছেন যে, তারা তাদের ঈমানের ওসীলায় জাহান্নাম থেকে মুক্তি কামনা করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, رَبَّنَا إِنَّنَا آمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ الَّذِينَ يَقُولُونَ "যারা বলে, 'হে আমাদের পালনকর্তা, আমরা ঈমান এনেছি, কাজেই আমাদের গুনাহগুলো ক্ষমা করে দাও আর আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করো।”[৩৬০]
তারা আল্লাহ নিকট তাদের ঈমানকে সবচেয়ে বড়ো মাধ্যম বানিয়েছেন এবং এর ওসীলায় জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য প্রার্থনা করেছেন।
নবি ﷺ তাঁর উম্মাতকে আদেশ করেছেন যে, দুআ কবুলের সময় অর্থাৎ আযানের পরপরই তারা যেন তাঁর জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ মানযিল প্রাপ্তির জন্য দুআ করে। তিনি এটিও জানিয়ে দিয়েছেন যে, যারা তাঁর জন্য এই দুআ করবে, তাদের জন্য তাঁর সুপারিশ করা ওয়াজিব হয়ে যাবে।[৩৬১]
একবার সুলাইম আনসারি রাদিয়াল্লাহু আনহু নবি ﷺ-কে বলেছিলেন, 'আমি তো আল্লাহ তাআলার নিকট জান্নাতের প্রার্থনা করি আর জাহান্নাম থেকে পানাহ চাই। কিন্তু আপনার ও মুআযের গুনগুনানি ভালোমতো শুনতে পারি না। (ফলে, আপনারা দুআয় কী বলেন তা বুঝি না)। তখন নবি ﷺ বলেছিলেন, "আমি আর মুআয আমরাও তোমার দুআর কাছাকাছিই গুনগুন (দুআ) করি।”[৩৬২]
আসলে কুরআন মাজীদ ও পবিত্র সুন্নাহয় আল্লাহর এমন বান্দা ও ওলিদের প্রশংসায় ভরপুর, যারা জান্নাত লাভের প্রার্থনা করে ও এর আশা রাখে এবং জাহান্নাম থেকে পানাহ চায় ও এর ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত থাকে।
তারা বলেন: নবি ﷺ সাহাবায়ে কেরামকে বলেছেন,
اسْتَعِيذُوا بِاللَّهِ مِنْ عَذَابِ جَهَنَّمَ، وَاسْتَعِيذُوا بِاللَّهِ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ، اِسْتَعِيذُوا بِاللَّهِ مِنْ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ وَاسْتَعِيذُوا بِاللَّهِ مِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ
"তোমরা আল্লাহর কাছে জাহান্নামের শাস্তি থেকে পানাহ চাও, তোমরা আল্লাহর কাছে কবরের শাস্তি থেকে পানাহ চাও, তোমরা আল্লাহর কাছে মাসীহ দাজ্জালের ফিতনা থেকে পানাহ চাও, তোমরা আল্লাহর কাছে জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা থেকে পানাহ চাও।”[৩৬৩]
যেই ব্যক্তি জান্নাতে নবি ﷺ-এর সান্নিধ্য পাওয়ার কামনা করেছিল, সেই ব্যক্তিকে তিনি বলেছিলেন,
فَأَعِنِّي عَلَى نَفْسِكَ بِكَثْرَةِ السُّجُودِ
“তা হলে তুমি অধিক পরিমাণে সাজদার মাধ্যমে (অর্থাৎ বেশি বেশি সালাত আদায় করে) তোমার নিজের জন্য আমাকে সাহায্য করো।”৩৯৪।
তারা বলেন: উম্মাতের নিকট নবি -এর এটা মাকসুদ বা উদ্দেশ্য ছিল যে, তারা জান্নাত লাভের জন্য এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আমল করবে। যাতে তারা সবসময় এ দুটিকে স্মরণে রাখে, কখনো ভুলে না যায়। এর আরেকটি কারণ হলো: আখিরাতে নাজাত পাওয়ার জন্য জান্নাত-জাহান্নামের ওপর ঈমান আনা আবশ্যক। আর জান্নাত লাভের আশায় এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার আগ্রহে আমল করা এটি খাঁটি ঈমানের পরিচয়। (কারণ পুরা দ্বীনের ওপর ঈমান না থাকলে কারও থেকে এমনটি প্রকাশ পাওয়া অসম্ভব।)
তারা বলেন: নবি তাঁর সাথিসঙ্গীদের ও পুরা উম্মাহকে জান্নাত লাভের জন্য উদ্বুদ্ধ করতেন, জান্নাতের হৃদয়গ্রাহী বর্ণনা দিতেন, যাতে করে তারা তা পাওয়ার কামনা করে এবং সে জন্য আমল করে। তিনি বলেছেন,
أَلَا مُشَمِّرٌ لِلْجَنَّةِ فَإِنَّ الجَنَّةَ لَا خَطَرَ لَهَا هِيَ وَرَبِّ الْكَعْبَةِ نُوْرٌ يَتَلالُأُ وَرَيْحَانَةٌ تَهْتَزُّ وَقَصْرٌ مَّشِيدٌ وَنَهَرٌ مُطَرِدٌ وَفَاكِهَةٌ كَثِيرَةٌ نَضِيجَةٌ وَزَوْجَةً حَسْنَاءُ جَمِيلَةً وَحُلَلْ كَثِيرَةٌ فِي مَقَامٍ أَبَدًا فِي حَبْرَةٍ وَنَضْرَةٍ فِي دَارٍ عَالِيَةٍ سَلِيمَةٍ بَهِيَّةٍ
“জান্নাতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণকারী কেউ কি আছে? কারণ কা'বার রবের কসম! জান্নাতের সমতুল্য আর কিছু নেই। তার এমন আলো রয়েছে, যা চারদিক ঝলমল করে তোলে। তার পুষ্পরাজি সুবাস ছড়ায়। যাতে রয়েছে সুরম্য মজবুত অট্টালিকা, অবিরাম প্রবাহমান নদী, সুমিষ্ট পাকা ফলের প্রাচুর্য, অলংকারে সুসজ্জিতা পরমা সুন্দরী স্ত্রী, সবুজ শ্যামলিমার নিয়ামাতে ভরপুর চিরস্থায়ী বাসস্থান, গগনচুম্বী নিরাপদ ও মনোরম বাড়িঘর।”
সাহাবায়ে কেরাম জবাব দেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, তার জন্য আমরাই প্রস্তুতি গ্রহণ করব।'
তিনি বলেন,
قُوْلُوْا إِنْ شَاءَ اللهُ
"তোমরা বলো, 'ইন শা আল্লাহ', আল্লাহ যদি চান।”[৩৬৫]
এখন যদি আমরা হাদীসে উল্লেখিত নবি -এর এই রকম বাণী নিয়ে আলোচনা শুরু করি যে, 'যে ব্যক্তি এই এই আমল করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন', তা হলে বইয়ের কলেবর বৃদ্ধি পেয়ে বিশালাকার ধারণ করবে। আসলে এ রকম অসংখ্য বর্ণনা রয়েছে। তিনি এ রকম করে বলেছেন যাতে তারা জান্নাতের আশায় সেই আমল করতে উদ্বুদ্ধ হয় এবং জান্নাতই যেন হয় তাদের আগ্রহের বিষয়।
তারা বলেন: প্রতিদানপ্রাপ্তির আশায় ও শাস্তির ভয়ে আমল করলে তা কীভাবে ত্রুটিযুক্ত বলে গণ্য হবে?! অথচ রাসূলুল্লাহ -এর ওপর উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং এ রকমভাবে বলেছেন, যে ব্যক্তি এই আমল করবে, তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজাই খুলে দেওয়া হবে...!
তারা বলেন: এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা সেই বান্দাদের ভালোবাসেন, যারা তাঁর নিকট জান্নাতের প্রার্থনা করে এবং জাহান্নাম থেকে পানাহ চায়। কারণ আল্লাহ তাআলার নিকট চাইলে তিনি খুশি হন এবং না চাইলে তিনি রাগান্বিত হন। আর তাঁর কাছে যা চাওয়া হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে উত্তম ও সবচেয়ে বড়ো হলো: জান্নাত এবং যা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়, তার মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট ও খারাপ হলো: জাহান্নাম।
সুতরাং জান্নাত লাভের আশায় এবং জাহান্নামের ভয়ে আমল করা আল্লাহ তাআলার নিকট অতি প্রিয় ও সন্তুষ্টিজনক। জান্নাত অনুসন্ধান করা এবং জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাওয়া হলো রবের দাসত্ব। আর অপূর্ণাঙ্গ দাসত্বের চেয়ে পরিপূর্ণরূপে দাসত্বের পরিচয় দেওয়াই হলো উত্তম। (যারা জান্নাতের আশা করে না এবং জাহান্নামের ভয় করে না, তাদের দাসত্ব হয় অপূর্ণাঙ্গ।)
তারা বলেন: যখন কোনো আমলকারী জান্নাত ও জাহান্নামের প্রতি দৃষ্টি দেবে না, জান্নাতের আশা-আকাঙ্ক্ষা করবে না, তখন তার সংকল্প নিস্তেজ হয়ে যাবে, তার হিম্মত দুর্বল হয়ে পড়বে, চলার অনুপ্রেরণা সে হারিয়ে ফেলবে। কিন্তু যখন তার জান্নাত পাওয়ার তীব্র বাসনা জন্মাবে, তখন এর জন্য আমল করার প্রতি উদ্বুদ্ধকারীও বেশ শক্তিশালী হবে, তার সংকল্প ও পথচলার ইচ্ছাও সুদৃঢ় হবে এবং এর জন্য তার পরিশ্রমও পূর্ণতা পাবে। আসলে এই বিষয়টি সুস্থ রুচিবোধের দ্বারাই জানা যায়।
তারা বলেন: এটি যদি শারীআহ-প্রণেতার উদ্দেশ্য না হতো, তা হলে তিনি তার বান্দাদের জন্য জান্নাতের বর্ণনা দিতেন না, তাদের সামনে তা সুসজ্জিত ও লোভনীয়রূপে ফুটিয়ে তুলতেন না, তাদের নিকট তা পেশ করতেন না এবং তাদেরকে এর বিস্তারিত বিবরণ শুনাতেন না, যে পর্যন্ত তাদের চিন্তাভাবনা কখনো পৌঁছার কথা ছিল না। এ সবগুলো তিনি করেছেন জান্নাতের প্রতি বান্দাদের আগ্রহ বাড়ানোর জন্য এবং তা হাসিল করতে যথাযথ প্রস্তুতি নেবার জন্য।
তারা বলেন: আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَاللَّهُ يَدْعُوْ إِلَى دَارِ السَّلَامِ "আর আল্লাহ শান্তি ও নিরাপত্তার ঘর (-জান্নাত)-এর দিকে আহ্বান করেন।” [৩৬৬]
এটি হলো সেই আহ্বানে সাড়া দেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা এবং জান্নাতের প্রতি তৎপর হওয়া এবং দ্রুত সেই ডাকে লাব্বাইক বলার জন্য উৎসাহ দেওয়া।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: জান্নাত শুধু গাছ-গাছালি, ফলমূল, খাবার, পানীয়, ডাগর চক্ষুবিশিষ্ট হুর, নদী, অট্টালিকা ইত্যাদির নাম নয়। অধিকাংশ মানুষ জান্নাতের নামের ক্ষেত্রে এই ভুলটি করে থাকে। আসলে জান্নাত হলো সব নিয়ামাতে পরিপূর্ণ একটি আবাসের নাম। জান্নাতের সবচেয়ে বড়ো উপভোগ্য নিয়ামাত হলো: আল্লাহর দিকে তাকিয়ে থাকা, তাঁর কথা শ্রবণ করা, তাঁর সন্তুষ্টি ও সান্নিধ্য দ্বারা চক্ষু শীতল করা। প্রকৃত অর্থে জান্নাতের খাদ্য, পানীয়, পোশাক-পরিচ্ছদ, আকার-আকৃতি ইত্যাদির সাথে এই দুনিয়ার কোনোকিছুরই কোনো মিল নেই। দেখতে এক রকম হলেও স্বাদে ও পরিপূর্ণতায় রয়েছে বিশাল ব্যবধান। পরকালে আল্লাহ তাআলার সামান্য একটু সন্তুষ্টি জান্নাত ও তার মধ্যকার সমস্ত নাজ-নিয়ামাত থেকেও উত্তম। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَرِضْوَانٌ مِّنَ اللَّهِ أَكْبَرُ "বস্তুত এ (নিয়ামাত) সমুদয়ের মাঝে সবচেয়ে বড়ো হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি।”[৩৬৭]
رضوان-কে এখানে তানবীনসহ আনা হয়েছে, ফলে তা তাকলীল বা কম বোঝানোর অর্থ প্রদান করে; যার অর্থ দাঁড়ায়: বান্দার প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টির সামান্যতম অংশও জান্নাতের চেয়ে অনেক বড়ো।
সহীহ হাদীসে এসেছে, যাকে حَدِيثُ الرُّؤْيَةِ (দর্শনের হাদীস) বলা হয়, নবি বলেছেন,
فَمَا أُعْطُوا شَيْئًا أَحَبَّ إِلَيْهِمْ مِّنَ النَّظَرِ إِلَى رَبِّهِمْ عَزَّ وَجَلَّ "তাদেরকে আল্লাহর দর্শন লাভের চেয়ে অধিক পছন্দনীয় জিনিস আর কিছুই দান করা হয়নি।”[৩৬৮]
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, বিষয়টি এমনই। চিন্তাভাবনা আর কল্পনায় যা আসে, তার চেয়ে এটি অধিক সম্মানিত ও মহান। বিশেষ করে মহাব্বতকারীরা যখন সেখানে মহাব্বতের প্রতিদান পাবে, তাদের প্রিয় সত্তার সান্নিধ্য লাভ করার মাধ্যমে, তখন তা বুঝে আসবে। কারণ মানুষ যাকে ভালোবাসবে, সেদিন সে তারই সঙ্গী হবে। এই হুকুমের মধ্যে কোনো ব্যতিক্রম নেই। বরং তা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বেশ শক্তিশালীভাবেই প্রমাণিত।
সুতরাং কোন স্বাচ্ছন্দ্য, কোন স্বাদ, চক্ষু শীতলকারী কোন বস্তু ও কোন সফলতা সেদিনের সেই নৈকট্য ও সান্নিধ্য এবং সেই স্বাদ ও চোখের শীতলতার সমান হবে?
আল্লাহর শপথ! আল্লাহর নৈকট্যলাভ ও দর্শনই হলো সেই নিদর্শন, যার দিকে মহাব্বতকারীরা ছুটে চলে! এটিই সেই পতাকা, যার ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণের জন্য আল্লাহর মা'রিফাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা উদ্গ্রীব থাকে! এটিই হলো 'জান্নাত'-এর রূহ ও প্রাণ। এর কারণেই জান্নাত এত সুশোভিত ও মনোরম! এর ওপরই জান্নাতের খুঁটি!
সুতরাং কীভাবে বলা যায়, বান্দা জান্নাত লাভের আশায় এবং জাহান্নামের ভয়ে আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করবে না?!
জাহান্নাম থেকে আমরা আল্লাহর কাছে পানাহ চাই! জাহান্নামের অধিবাসীদের জন্য আল্লাহ তাআলাকে না দেখার যে কঠিন শাস্তি, তাদের ওপর তাঁর লাঞ্ছনা, রাগ ও অসন্তুষ্টি এবং আল্লাহর নিকট থেকে তাদের দূরে থাকা—জাহান্নামের আগুনে তাদের শরীর ও রূহ জ্বলেপুড়ে অঙ্গার হওয়ার চেয়েও বেশি ভয়াবহ ও মারাত্মক যন্ত্রণার। আসলে আল্লাহকে না দেখার আগুনে আগে তাদের অন্তর পুড়ে যায়, এরপর সেখান থেকে পুরা শরীরে সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
সুতরাং নবি, রাসূল, সিদ্দীক, শহীদ ও নেককার ব্যক্তিগণ—সবার পরম চাওয়ার বস্তু হলো: জান্নাত অর্জন আর জাহান্নাম থেকে পলায়ন। আল্লাহ তাআলাই একমাত্র সাহায্যকারী। ভরসা করতে হবে শুধু তাঁরই ওপর। তাঁর সাহায্য ব্যতীত কেউ না-কোনো নেককাজ করতে পারে আর না-কোনো গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে পারে। তিনিই আমাদের জন্য যথেষ্ট আর তিনি সর্বোত্তম অভিভাবক।
টিকাঃ
[৩৫৩] সূরা হাজ্জ, ২২: ৩০।
[৩৫৪] বাগাবি, তাফসীর, ৫/৩৮৩।
[৩৫৫] বাগাবি, তাফসীর, ৫/৩৮৩।
[৩৫৬] সূরা সাদ, ৩৮: ২৫।
[৩৫৭] সূরা ইউনুস, ১০: ২৬।
[৩৫৮] সূরা আম্বিয়া, ২১: ৮৯-৯০।
[৩৫৯] সূরা ফুরকান, ২৫: ৬৫-৬৬।
[৩৬০] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৬।
[৩৬১] মুসলিম, ৩৮৪।
[৩৬২] আবূ দাউদ, ৭৯২; ইবনু মাজাহ, ৯১০।
[৩৬৩] তিরমিযি, ৩৬০৪।
[৩৬৪] মুসলিম, ৪৮৯।
[৩৬৫] ইবনু মাজাহ, ৪৩৩২।
[৩৬৬] সূরা ইউনুস, ১০: ২৫।
[৩৬৭] সূরা তাওবা, ৯: ৭২।
[৩৬৮] মুসলিম, ১৮১।
📄 মানযিল : সংশোধন ও পরিশোধন করা (اَلتَّهْذِيبُ وَالتَّصْفِيَةُ)
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ এর আরেকটি মানযিল হলো-সংশোধন ও পরিশোধন করার মানযিল।
এটি হলো ইবাদাত ও দাসত্বের মাঝে যেসব অনিষ্ট, খাদ ও ভেজাল রয়েছে, সেগুলোকে বের করে দেওয়ার আশায় আমলকে পরীক্ষায় নিক্ষিপ্ত করা।
এটি প্রাথমিক পর্যায়ের আল্লাহ-অভিমুখীদের জন্য বেশ কঠিন। এটি যেন তাদের জন্য একটি বিশেষ পরীক্ষা।
সংশোধন ও পরিশোধন করার মানযিল হাসিল হয় তিনটি বিষয়ের মাধ্যমে : ১. মূর্খদের সাথে মেলামেশা করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে, ২. অভ্যাসের মিশ্রণ থেকে বেঁচে থাকার মাধ্যমে এবং ৩. নিজের ইচ্ছা-সংকল্পকে শুধু ইবাদাত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে।
১. মূর্খদের সাথে মেলামেশা করা থেকে বিরত থাকা : কারণ যখন দাসত্বের সাথে মূর্খতা মিশ্রিত হবে, তখন তা বান্দাকে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করবে, অহেতুক স্থানে অবতরণ করাবে, অনর্থক কাজে জড়াবে, কল্যাণকর বিশ্বাস করে এমন অনেক কাজে লিপ্ত করাবে, যা প্রকৃতপক্ষে তার ইবাদাত ও আমলের জন্য ক্ষতিকর। কারণ হয়তো সে স্থির থাকার স্থানে নড়াচড়া করবে, বা সক্রিয় থাকার জায়গায় নিষ্ক্রিয় থাকবে, বা পেছনে থাকার স্থানে অগ্রসর হবে, বা অগ্রসর হওয়ার স্থানে পেছনে থাকবে, বা থেমে থাকার স্থানে গতি বাড়িয়ে দেবে, বা গতিশীল থাকার স্থানে থমকে দাঁড়াবে-এ রকম আরও বিভিন্ন প্রকারের কার্যাবলি তার থেকে প্রকাশ পাবে। মূর্খদের কাজকর্মে যা প্রায়ই লক্ষ করা যায়। এই ব্যক্তির কর্মকাণ্ড মানুষের হকসমূহের ব্যাপারে অলস ও বেকুব ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের ন্যায়। (যাতে কেবল অসংগতিই ধরা পড়ে।)
আসলে যে আমলের সাথে ইলমের সংযোগ থাকে না এবং যে আমল শিষ্টাচার ও হকসমূহ থেকে শূন্য হয়, সে আমল তার সম্পাদনকারীকে ক্রমশ দূরেই নিয়ে যায়; যদিও তার উদ্দেশ্য থাকে নৈকট্য হাসিল করা। এই কারণে তার সাওয়াব ও প্রতিদান নষ্ট হয়ে যাওয়া আবশ্যক হয় না। তবে এটা নিশ্চিত যে, এই কারণে সে সুউচ্চ ও মর্যাদাপূর্ণ মানযিলসমূহে পৌঁছুতে পারে না এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারে না। এই বিষয়ে প্রকৃত অবস্থা কেবল তখনই উপলব্ধি করা সম্ভব হবে, যখন আল্লাহ তাআলার সত্তা ও তাঁর আদেশ-নিষেধ সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান হাসিল হয়, অন্তরে তাঁর প্রতি পরিপূর্ণ মহাব্বত থাকে এবং নিজের নফস ও দোষত্রুটি সম্পর্কে ভালোভাবে অবগতি লাভ করে।
২. অভ্যাসের মিশ্রণ থেকে বেঁচে থাকা: এটি হলো ইবাদাত-বন্দেগির সাথে নফসের এমন কোনো অভ্যাস মিশ্রিত হওয়া, যা তাকে সেই ইবাদাত আদায় করতে সাহায্য করে এবং তা সহজ করে দেয়; ফলে ব্যক্তি মনে করে যে, তা আনুগত্য ও নৈকট্য লাভের মাধ্যম। যেমন কোনো ব্যক্তি সাওম পালনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে, খাদ্য-পানীয় না খেয়ে থাকার ওপর সে বেশ অনুশীলন করেছে, ফলে তার নফস তাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। একটা সময় সাওম পালন করতে সে উদগ্রীব থাকে, (ক্ষুধার্ত না থাকলে তার ভালো লাগে না)। ফলে সে ধারণা করে তার (সাওম পালনের) এই চাহিদা ও অনুপ্রেরণাই হলো খাঁটি ইবাদাত। অথচ তা অভ্যাসের দাবি ও চাহিদা। সুতরাং এ রকম অবস্থা থেকেও বিরত থাকা জরুরি।
এটি যে নফসের দাবি তার আলামত হলো: যখন ওই আমল ব্যতীত তার নিকট তুলনামূলক সহজ ও অধিক কল্যাণকর অন্য একটি আমল পেশ করা হয়, তখন তা পালন করতে সে গড়িমসি করে এবং আগের আমলকেই প্রাধান্য দেয়। কারণ সে তাতে অভ্যস্ত এবং স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
৩. নিজের ইচ্ছা-সংকল্পকে শুধু ইবাদাত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা থেকে বিরত থাকা: এটি ব্যক্তির দুর্বলতার নিদর্শন। কারণ প্রকৃত গোলামের ইচ্ছা-সংকল্প কেবল তার মালিকের খেদমত করতে থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তার ইচ্ছা থাকে এর চেয়েও অনেক উঁচু। কারণ সে তার মালিকের সন্তুষ্টির সন্ধানী, সে তার খেদমত ও সেবাকে সবসময় তুচ্ছ ও অল্প মনে করে, এর মধ্যেই সে থেমে থাকে না। সব ক্ষেত্রে অল্পেতুষ্টি প্রশংসনীয়; শুধু এই ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। কারণ এটি বঞ্চিত থাকার কারণ। কেউ তার প্রিয় মানুষকে না পাওয়া পর্যন্ত তার কোনোকিছুর ব্যাপারে তৃপ্ত হয় না। সুতরাং বান্দার ইচ্ছা-সংকল্প শুধু আমল ও প্রতিদানপ্রাপ্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখা জরুরি; (কারণ যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন না করা যায়, তবে এটি বঞ্চনা ও মাহরুম হওয়ারই মতো।
📄 মানযিল : স্থির ও অবিচল থাকা (اَلْإِسْتِقَامَةُ)
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো-স্থির ও অবিচল থাকার মানযil।
আল্লাহ তাআলা বলেন, إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوْا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالجَنَّةِ الَّتِي كُنْتُمْ تُوْعَدُونَ "নিশ্চয় যারা বলে, 'আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ', অতঃপর তাতেই স্থির ও অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, 'তোমরা ভয় করো না, চিন্তা করো না এবং তোমরা সেই জান্নাতের সুসংবাদ শুনে আনন্দিত হও, যার প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেওয়া হয়েছে।” [৩৮৫]
আল্লাহ তাআলা বলেন, إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ "নিশ্চয় যারা বলে, 'আল্লাহ আমাদের রব' অতঃপর স্থির ও অবিচল থাকে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।”[৩৮৬]
আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলকে বলেছেন, فَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ وَمَنْ تَابَ مَعَكَ وَلَا تَطْغَوْا إِنَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ “কাজেই তুমি এবং তোমার সাথে যারা তাওবা করেছে, সবাই সত্যপথে স্থির ও অবিচল থাকো; যেমন তোমাকে হুকুম দেওয়া হয়েছে, আর সীমালঙ্ঘন করো না। তোমরা যা কিছু করছো, নিশ্চয় তিনি তা প্রত্যক্ষ করছেন।”[৩৮৭]
এখানে আল্লাহ তাআলা পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, স্থিরতা ও অবিচলতা হলো সীমালঙ্ঘন ও অবাধ্যতার (الظُّفْيَانُ) বিপরীত; যা প্রতিটি বস্তুর নির্ধারিত সীমারেখা অতিক্রম করাকে বুঝায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَى أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ فَاسْتَقِيمُوا إِلَيْهِ وَاسْتَغْفِرُوهُ “বলুন, ‘আমিও তোমাদের মতোই একজন মানুষ। আমাকে ওহির মাধ্যমে জানানো হয়েছে যে, তোমাদের ইলাহ্ মাত্র একজন ইলাহ্, অতএব তাঁর পথেই দৃঢ় ও স্থির থাকো এবং তাঁর কাছেই ক্ষমা প্রার্থনা করো।”[৩৮৮]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, وَأَنْ لَّوِ اسْتَقَامُوا عَلَى الطَّرِيقَةِ لَأَسْقَيْنَاهُمْ مَاءً غَدَقًا لِنَفْتِنَهُمْ فِيهِ “(আর এই প্রত্যাদেশ করা হয়েছে যে,) লোকেরা যদি সঠিক পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকত, তা হলে আমি তাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণের মাধ্যমে সমৃদ্ধ করতাম। যাতে আমি এর মাধ্যমে তাদের পরীক্ষা করতে পারি।”[৩৮৯]
এই উম্মাতের সবচেয়ে বড়ো সত্যবাদী ও দ্বীনের ওপর সবচেয়ে দৃঢ়ভাবে অবস্থানকারী সাহাবি আবূ বকর -কে ইস্তিকামাত বা অবিচল থাকা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। তিনি জবাবে বলেছিলেন, 'তুমি আল্লাহর সাথে কোনোকিছুকে শরীক করবে না'।[৩৯০] এর দ্বারা তিনি শুধু তাওহীদের ওপর ইস্তিকামাত উদ্দেশ্য নিয়েছেন।
উমর ইবনুল খাত্তাব বলেছেন, 'ইস্তিকামাত হলো: তুমি আল্লাহ তাআলার আদেশ ও নিষেধের ওপর অটল থাকবে। শেয়ালের মতো ছলচাতুরির আশ্রয় নেবে না'।[৩৯১]
উসমান ইবনু আফফান বলেছেন, 'আয়াতে বর্ণিত অবিচলতার গুণে গুণান্বিত ব্যক্তি দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: যারা ইলমকে একমাত্র আল্লাহর জন্য খাঁটি করে'।[৩৯২]
আলি ইবনু আবী তালিব ও ইবনু আব্বাস বলেছেন, 'যারা ফরজ-দায়িত্বগুলো যথাযথভাবে আদায় করে'।[৩৯৩]
হাসান বাসরী বলেছেন, 'যারা আল্লাহ তাআলার হুকুমের ওপর অবিচল থাকে; ফলে তাঁর আনুগত্য করে এবং তাঁর অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকে'।[৩৯৪]
মুজাহিদ বলেছেন, 'যারা আল্লাহ তাআলার সাথে সাক্ষাৎ করার পূর্ব পর্যন্ত লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর সাক্ষ্যের ওপর স্থির থাকে'।[৩৯৫]
আমি শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যা -কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, 'তারা হলেন সেই সমস্ত ব্যক্তি, যারা আল্লাহ তাআলার মহাব্বত ও দাসত্বে অবিচল থাকে; ফলে ডানে-বামে কোনোদিকে ভ্রুক্ষেপ করে না'।[৩৯৬]
'সহীহ মুসলিম'-এ এসেছে, সুফইয়ান ইবনু আবদিল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি বললাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাকে ইসলাম সম্পর্কে এমন একটি কথা বলুন, যেন আপনার পরে আমাকে এ সম্পর্কে আর অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করতে না হয়।' নবি বললেন,
قُلْ آمَنْتُ بِاللهِ، ثُمَّ اسْتَقِمْ
"বলো, আমি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনলাম, অতঃপর এর ওপর অবিচল থাকো।”[৩৯৭]
সাওবান থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন,
اسْتَقِيمُوا وَلَنْ تُحْصُوا وَاعْلَمُوا أَنَّ خَيْرَ أَعْمَالِكُمُ الصَّلَاةُ وَلَا يُحَافِظُ عَلَى الْوُضُوءِ إِلَّا مُؤْمِنٌ
"তোমরা (সঠিক পথের ওপর) অবিচল থেকো, যদিও তোমরা তা আয়ত্তে রাখতে পারবে না। জেনে রেখো, তোমাদের আমলসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম আমল হলো সালাত। আর মুমিন ব্যক্তিই কেবল ওজুকে পরিপূর্ণরূপে হেফাজত করে থাকে।”[৩৯৮]
বান্দা সবসময় ইস্তিকামাত বা স্থির-অবিচলতার গুণে গুণান্বিত থাকবে এটাই কাম্য। আর তা হলো যথাযথভাবে পরিপূর্ণরূপে দ্বীনের বিধানাবলি মেনে চলা। যদি এর ওপর সক্ষম না হয়, তা হলে এর কাছাকাছি অবস্থান করবে। আর যদি এর থেকেও নিচে নামে, তা হলে তা হবে শিথিলতা ও বিনষ্ট করা। যেমন 'সহীহ মুসলিম'-এ আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত আছে, নবি বলেছেন,
سَيِّدُوا وَقَارِبُوا وَاعْلَمُوا أَنَّهُ لَنْ يَنْجُوَ أَحَدٌ مِنْكُمْ بِعَمَلِهِ
"তোমরা সঠিক পথে যথাযথভাবে অবিচল থাকো এবং কমপক্ষে তার কাছাকাছি থাকো। তোমরা নিশ্চিতভাবেই জেনে রাখো যে, তোমাদের কেউ তার আমলের দ্বারা মুক্তি পাবে না।"
সাহাবায়ে কেরাম বললেন, "আপনিও না, ইয়া রাসূলাল্লাহ?'
তিনি বললেন, وَلَا أَنَا إِلَّا أَنْ يَتَغَمَّدَنِيَ اللَّهُ بِرَحْمَةٍ مِّنْهُ وَفَضْلٍ "আমিও না। তবে আল্লাহ তাঁর রহমত ও অনুগ্রহ দ্বারা আমাকে ঢেকে নিয়েছেন।” [৩৯৯]
এই হাদীসটিতে দ্বীনের সমস্ত মাকামকে একত্র করে দেওয়া হয়েছে। ইস্তিকামাতের ওপর থাকার আদেশ করা হয়েছে; আর তা হলো নিয়ত, কথাবার্তা ও কাজকর্মে সঠিক পথ অবলম্বন করা এবং তাতে অবিচল থাকা।
ওপরে বর্ণিত সাওবান -এর হাদীস দ্বারা নবি এই সংবাদ দিয়েছেন যে, তারা ইস্তিকামাত বা অবিচল থাকতে পারবে না। ফলে তাদেরকে কাছাকাছি অবস্থান করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন। আর তা হলো তাদের সাধ্যানুসারে ইস্তিকামাতের নিকটে আসার চেষ্টায় থাকা। তিরন্দাজের মতো, তার ছোঁড়া তির যদি লক্ষ্যে আঘাত নাও করে, তবে লক্ষ্যের প্রায় কাছাকাছি থাকে। এ সত্ত্বেও তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যে, এই অবিচল থাকা এবং কাছাকাছি অবস্থান করাও কাউকে কিয়ামাতের দিন নাজাত দেবে না। সুতরাং শুধু আমলের দিকেই ঝুঁকে পড়া, আমলের কারণে গর্বিত হওয়া, এর ওপর ভরসা করা কারও জন্য উচিত হবে না। সেদিন কেবল মহান আল্লাহ তাআলার দয়া, অনুগ্রহ ও রহমতের কারণেই ব্যক্তি নাজাত পাবে।
আসলে 'ইস্তিকামাত বা অবিচল থাকা' হলো একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। এটি দ্বীনের মৌলিক বিষয়াদিকেই অন্তর্ভুক্ত করে। আর তা হলো আল্লাহ তাআলার সামনে একনিষ্ঠতা ও প্রকৃত সত্যবাদিতার পরিচয় দেওয়া এবং অঙ্গীকার পূরণ করা।
ইস্তিকামাতের সম্পর্ক কথা, কাজ, অবস্থা, নিয়ত সবকিছুর সাথে। এগুলোর ওপর ইস্তিকামাতের অর্থ হলো: আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আল্লাহর সাহায্য কামনা করে আল্লাহর দেখানো পথেই এ কাজগুলো সম্পাদন করা।
কোনো একজন আরিফ বা আল্লাহর পরিচয়প্রাপ্ত ব্যক্তি বলেছেন, 'তুমি ইস্তিকামাতের অধিকারী হতে সচেষ্ট হও, তবে কারামাত (অলৌকিক বস্তু) অন্বেষণকারী হয়ো না। কারণ তোমার নফস তোমাকে কারামাত অর্জন করতে অনুপ্রেরণা জোগাবে আর তোমার রব তোমাকে খুঁজে নেবে ইস্তিকামাতের কারণে।'
আমি শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, 'সবচেয়ে বড়ো কারামাত হলো সর্বদা ইস্তিকামাতের ওপর থাকা। [৪০০]
টিকাঃ
[৩৮৫] সূরা ফুসসিলাত, ৪১ : ৩০।
[৩৮৬] সূরা আহকাফ, ৪৬: ১৩।
[৩৮৭] সূরা হূদ, ১১: ১১২।
[৩৮৮] সূরা ফুসিলাত, ৪১: ৬।
[৩৮৯] সূরা জিন, ৭২: ১৬-১৭।
[৩৯০] বাগাবি, তাফসীর, ৭/১৭২।
[৩৯১] বাগাবি, তাফসীর, ৭/১৭২।
[৩৯২] বাগাবি, তাফসীর, ৭/১৭২।
[৩৯৩] বাগাবি, তাফসীর, ৭/১৭২।
[৩৯৪] সা'লাবি, তাফসীর, ২৩/২৮৮।
[৩৯৫] সা'লাবি, তাফসীর, ২৩/২৮৮।
[৩৯৬] ইবনু তাইমিয়্যা, মাজমুউল ফাতাওয়া, ২৮/৩২।
[৩৯৭] মুসলিম, ৩৮।
[৩৯৮] ইবনু মাজাহ, ২৭৭; দারিমি, ৬৬১।
[৩৯৯] মুসলিম, ২৮১৬; বুখারি, .৩৯।
[৪০০] ইবনু তাইমিয়্যা, মাজমুউল ফাতাওয়া, ১১/২৯৮।
📄 মানযিল : নির্দ্বিধায় মেনে নেওয়া (اَلتَّسْلِيمُ)
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ-এর আরেকটি মানযিল হলো-নির্দ্বিধায় মেনে নেওয়ার মানযিল।
এটি দুই প্রকার : ১. আল্লাহর আদেশসূচক দ্বীনি ফায়সালা মেনে নেওয়া এবং ২. মহাবিশ্বসংক্রান্ত আল্লাহর তাকদীরি ফায়সালা মেনে নেওয়া।
প্রথম প্রকারটি হলো: মুমিন ও আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞানী ব্যক্তিদের তাসলীম বা মেনে নেওয়া। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا )
“না, আপনার রবের কসম, এরা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ-না এদের পারস্পরিক মতবিরোধের ক্ষেত্রে এরা আপনাকে ফায়সালাকারী হিসেবে মেনে নেবে, অতঃপর আপনার ফায়সালা সম্পর্কে নিজেদের মনে কোনো প্রকার দ্বিধা ও জটিলতা খুঁজে পাবে না, বরং নির্দ্বিধায় তা মেনে নেবে।” [৪২৭]
এই তিনটি স্তরকে বিবেচনা করা জরুরি: ১. (নবিজিকে) বিচারক বানানো, ২. দ্বিধা ও সংকীর্ণতা ঝেড়ে ফেলে বক্ষকে প্রশস্ত করা এবং ३. মনেপ্রাণে মেনে নেওয়া।
মহাবিশ্বসংক্রান্ত আল্লাহর তাকদীরি ফায়সালা মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে অধিকাংশ মানুষের পদস্খলন ঘটে। এ বিষয়টি তাদেরকে পেরেশান করে তোলে এবং ঝগড়ায় লিপ্ত করে। সেটি হলো 'রিযা বিল কাযা' বা তাকদীরে সন্তুষ্ট থাকার মাসআলা। পূর্বে এর যথেষ্ট আলোচনা অতিবাহিত হয়েছে। আমরা বলেছি, ফায়সালা মেনে নেওয়া তখনই প্রশংসনীয়, যখন বান্দাকে সে ব্যাপারে চেষ্টা-তাদবীর ও প্রতিরোধ করার হুকুম দেওয়া না হয়, এবং সে ওই ব্যাপারে সক্ষমও নয়; যেমন বিপদাপদে আক্রান্ত হওয়া; যা প্রতিহত করা বা দমিয়ে রাখার ক্ষমতা বান্দার নেই।
পক্ষান্তরে যে বিষয়ে প্রতিরোধ ও চেষ্টা করার আদেশ দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে কিছুই না করে শুধু মেনে নেওয়া জায়িয নয়। বরং সেই বিষয়গুলোকে (আল্লাহ তাআলার) অন্য হুকুম দ্বারা প্রতিহত করার মাধ্যমে আল্লাহর দাসত্ব করা আল্লাহর নিকট বেশি পছন্দনীয়।
জেনে রাখবেন, তাসলীম বা মেনে নেওয়া হলো: শারঈ বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো সন্দেহ করা থেকে বিরত থাকা, আল্লাহর আদেশের সাথে সাংঘর্ষিক কামনা করা থেকে বিরত থাকা, ইখলাসের বিপরীত ইচ্ছা করা থেকে এবং শরীআত ও তাকদীরের ওপর আপত্তি করা থেকে বিরত থাকা। এই সব গুণের অধিকারী ব্যক্তিই হলো সেই অন্তরের অধিকারী ব্যক্তি, কিয়ামাতের দিন যেই অন্তর নিয়ে না এলে কেউ নাজাত পাবে না। কারণ তাসলীম হলো বিরোধিতায় লিপ্ত হওয়ার বিপরীত।
বিরোধিতা করা বা মেনে না নেওয়া সৃষ্টি হয় এমন ভ্রান্ত সন্দেহের কারণে, যা আল্লাহ তাআলা নিজ সত্তা ও গুণাবলি সম্পর্কে যে সংবাদ দিয়েছেন, তার সাথে সাংঘর্ষিক; অথবা তিনি আখিরাতের জগৎ সম্পর্কে যে খবর জানিয়েছেন, তার বিপরীত অথবা এ রকম অন্যান্য বিষয়ে। সুতরাং এগুলোর ক্ষেত্রে তাসলীম হলো: মুতাকাল্লিমীন বা দার্শনিকদের বিভ্রান্ত চিন্তাচেতনার কারণে নিজে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও সংশয়ে জড়িয়ে না পড়া।
অথবা (বিরোধিতা করা বা মেনে না নেওয়া সৃষ্টি হয়) এমন কামনার কারণে, যা আল্লাহ তাআলার আদেশের সাথে সাংঘর্ষিক। সুতরাং আল্লাহর আদেশের ক্ষেত্রে তাসলীম বা মেনে নেওয়া হলো: অসংযত ও বেপরোয়া কামনা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা।
অথবা (বিরোধিতা করা বা মেনে না নেওয়া সৃষ্টি হয়) এমন ইচ্ছার কারণে, যা বান্দার নিকট আল্লাহ যা চান, তার সাথে সাংঘর্ষিক। এর ফলে আল্লাহর নিকট বান্দার চাওয়ার মধ্যেও বৈপরিত্যের সৃষ্টি হয়। এ ক্ষেত্রে তাসলীম হলো: এগুলো থেকে মুক্ত থাকা।
অথবা (বিরোধিতা করা বা মেনে না নেওয়া সৃষ্টি হয়) এমন আপত্তি করার কারণে, যা সৃষ্টিজগৎ ও আদেশের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার হিকমতের বিপরীত। এমন ধারণা করা যে, শারীআত ও তাকদীরি ফায়সালা হলো যুক্তি ও প্রজ্ঞার পরিপন্থি। এ ধরনের সমস্ত বিবাদ ও বিরোধিতা থেকে বেঁচে থাকা ও মুক্ত থাকার নামই তাসলীম বা নির্দ্বিধায় মেনে নেওয়া।
উপরিউক্ত আলোচনা দ্বারা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, তাসলীম হলো ঈমানের মাকামসমূহের মধ্যে সর্বোচ্চ মাকাম ও মানযিল। বিশেষ ব্যক্তিদের বিশেষ পথ। তাসলীম হলো খাঁটি সত্যবাদিতার মানযিল; যার মর্যাদা নুবুওয়াতের মর্যাদার পরেই। যে ব্যক্তির তাসলীম বা মেনে নেওয়ার গুণটি পরিপূর্ণ হবে, তার সত্যবাদিতাও পরিপূর্ণ হবে।
টিকাঃ
[৪২৭] সূরা নিসা, ৪: ৬৫।