📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 মানযিল : আগ্রহী হওয়া (اَلرَّغْبَةُ)

📄 মানযিল : আগ্রহী হওয়া (اَلرَّغْبَةُ)


إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো—আগ্রহী হওয়ার মানযিল।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَيَدْعُوْنَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا "তারা আগ্রহ ও ভীতি সহকারে আমাকে ডাকত।”[৩৩৫]
الرَّغْبَةُ এবং الرَّجَاءُ এর মাঝে পার্থক্য: 'রজা' হচ্ছে আশা করা আর 'রগবত' হচ্ছে অনুসন্ধান করা। সুতরাং আশা করার ফল হলো অনুসন্ধান করা। কারণ কেউ কোনো জিনিস পেতে আশা করলে, তা সন্ধান করে। রগবত ও রজার সম্পর্ক হচ্ছে ভয় ও পলায়ন করার মতো। যেমন কেউ যখন কোনো বস্তুকে ভয় করে, তখন তার থেকে পলায়ন করে, ঠিক তেমনি কেউ যখন কোনোকিছু আশা করে, তখন তার প্রতি আগ্রহী হয় এবং তা পাওয়ার সন্ধান করতে থাকে।
মূলকথা: আশা-আকাঙ্ক্ষাকারী ব্যক্তি অনুসন্ধান করে আর ভীত ব্যক্তি পলায়ন করে।
اَلرَّغْبَةُ হলো অদৃশ্য জিনিসের অনুসন্ধান করা; ফলে এর অর্জন নিশ্চিত নয়। কারণ মুমিন বান্দা জান্নাতের প্রতি আগ্রহী হয়, কিন্তু তাতে প্রবেশ করার ব্যাপারে সে নিশ্চিত নয়। আশা যখন শক্তিশালী হয়, তখন তা অনুসন্ধানে পরিণত হয়।
রগবত বা আগ্রহ তৈরি হয় ইলম থেকে; ফলে তা পরিশ্রম করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং অলসতা করা থেকে পথিককে বাঁচিয়ে রাখে।
এই আগ্রহ ও অনুসন্ধান বাড়তেই থাকে। একপর্যায়ে তা ইহসানের স্তরে উন্নীত হয়; আর তা হলো-
أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ
"আপনি আল্লাহ তাআলার ইবাদাত এমনভাবে করবেন, যেন তাঁকে দেখছেন।”
সুতরাং রাগিব বা অনুসন্ধানকারী ব্যক্তি যে সমস্ত বিপদাপদে পতিত হয়, তার কোনো পরোয়া করে না। তার আগ্রহ-উদ্দীপনাকে (বিপদাপদের কারণে) তাকদীরের দোহাই দিয়ে দমিয়ে রাখা যায় না এবং তার সংকল্প ও উচ্চ হিম্মতে কোনো প্রকার নির্জীবতা স্থান পায় না।

টিকাঃ
[৩৩৫] সূরা আম্বিয়া, ২১: ৯০।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 মানযিল : যত্ন নেওয়া ও সংরক্ষণ করা (اَلرِّعَايَةُ)

📄 মানযিল : যত্ন নেওয়া ও সংরক্ষণ করা (اَلرِّعَايَةُ)


إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো— যত্ন নেওয়া ও সংরক্ষণ করার মানযিল।
এটি হলো আমলের মাধ্যমে ইলমের যত্ন নেওয়া ও সংরক্ষণ করা। ইহসান ও ইখলাসের মাধ্যমে আমলকে সংরক্ষণ করা এবং তা নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখা। আর একতাবদ্ধ হয়ে থাকা ও বিচ্ছিন্নতা থেকে দূরে থাকার মাধ্যমে নিজের অবস্থাকে সংরক্ষণ করা। সুতরাং الرِّعَايَةُ অর্থ হলো যত্ন নেওয়া ও সংরক্ষণ করা।
ইলম ও আমলের তিনটি স্তর রয়েছে: ১. রিওয়ায়াহ (الرِّوَايَةُ): এটি হলো কেবল বর্ণনা করা এবং বর্ণনাকৃত বিষয়কে (অপরের কাছে) বহন করা।
২. দিরায়াহ (الدِّرَايَةُ): এটি হলো মর্ম উপলব্ধি করা।
৩. রিআয়াহ (الرِّعَايَةُ): এটি হলো ইলম অনুযায়ী আমল করা ও ইলমের চাহিদা পূরণ করা।
হাদীস বর্ণনাকারীদের ব্যস্ততা রিওয়ায়াহ নিয়ে, উলামায়ে কেরামের ব্যস্ততা দিরায়াহ নিয়ে আর আরিফ বা মা'রিফাতের অধিকারী ব্যক্তিগণ মগ্ন থাকেন রিআয়াহ নিয়ে।
যারা নিজের আমলের যত্ন নেয় না, যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে না আল্লাহ তাআলা তাদের নিন্দা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ثُمَّ قَفَّيْنَا عَلَى آثَارِهِمْ بِرُسُلِنَا وَقَفَّيْنَا بِعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ وَآتَيْنَاهُ الْإِنْجِيلَ وَجَعَلْنَا فِي قُلُوْبِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ رَأْفَةً وَرَحْمَةً وَرَهْبَانِيَةً ابْتَدَعُوهَا مَا كَتَبْنَاهَا عَلَيْهِمْ إِلَّا ابْتِغَاءَ رِضْوَانِ اللهِ فَمَا رَعَوْهَا حَقَّ رِعَايَتِهَا
“তাদের পরে আমি একে একে আমার রাসূলদের পাঠিয়েছি। তাদের সবার শেষে মারইয়ামের পুত্র ঈসাকে পাঠিয়েছি, তাঁকে ইনজীল দিয়েছি এবং তাঁর অনুসারীদের মনে দয়া ও করুণার সৃষ্টি করেছি। আর বৈরাগ্যবাদ তো তারা নিজেরাই উদ্ভাবন করে নিয়েছে। আমি ওটা তাদের ওপর ফরজ করিনি। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় তারা নিজেরাই এ বিদআত বানিয়ে নিয়েছে। তারপর সেটি যেভাবে মেনে চলা দরকার, সেভাবে মেনে চলেনি।”[৩৩৬]
এই আয়াতে তাদের নিন্দা করা হয়েছে, যারা নিজেদের জন্য অতিরিক্ত আমল আবশ্যক করে নিয়েছে; কিন্তু তা যথাযথভাবে পালন করেনি। কারণ যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ইবাদাতসংক্রান্ত কোনোকিছুকে নিজের ওপর আবশ্যক করে নেয়, যা আল্লাহ তার ওপর আবশ্যক করেননি, তা হলে তার ওপর সেই আমল পরিপূর্ণ করা আবশ্যক হয়ে যায়।
এমনকি যে ব্যক্তি কোনো মুস্তাহাব আমল শুরু করে, তার জন্য তা পূর্ণ করাকে অনেক ফুকাহায়ে কেরাম ওয়াজিব বলে অভিমত দিয়েছেন। যেমন মান্নত করলে আমল পুরা করা আবশ্যক হয়, তেমনি আমল শুরু করার পর তা পূর্ণ করাকে তারা আবশ্যক বলেছেন। এই অভিমত দিয়েছেন ইমাম আবূ হানিফা, ইমাম মালিক এবং একটি বর্ণনা অনুসারে ইমাম আহমাদ। এটির ওপর উলামায়ে কেরামের ইজমা বা ইজমার মতো ঐকমত্য সংঘটিত হয়েছে।
তারা বলেন: আমল শুরু করার কারণে তা পূর্ণ করা ওয়াজিব হওয়া, কথার কারণে তা পূর্ণ করা ওয়াজিব হওয়ার চেয়ে বেশি শক্তিশালী। সুতরাং (কথার মাধ্যমে) মান্নত করার কারণে বান্দা যে আমল নিজের ওপর আবশ্যক করে নেয়, তা যেমন সম্পন্ন করা ওয়াজিব, ঠিক তেমনি আমল শুরু করার দ্বারা বান্দা নিজের ওপর যে আমল আবশ্যক করে নেয়, তা পূর্ণ করাও ওয়াজিব। এই মাসআলার বিস্তারিত আলোচনা করা এখানে উদ্দেশ্য নয়।
এই আলোচনার মূলকথা হলো: আল্লাহ তাআলা সেই ব্যক্তির নিন্দা করেছেন, আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য আল্লাহ আদেশ করেননি এমন কোনো ইবাদাতকে যে নিজের ওপর আবশ্যক করে নেয়, তারপর তা যথাযথভাবে পালন করে না এবং তা সংরক্ষণ করে না। সুতরাং আল্লাহ তাআলা যে সমস্ত আমলের আদেশ করেছেন, অনুমতি দিয়েছেন এবং যেগুলো পালন করতে উৎসাহিত করেছেন, সেগুলো যে ব্যক্তি যথার্থভাবে পালন করে না এবং যত্ন নেয় না, সেই ব্যক্তির ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার আচরণ কেমন হবে?!
আমলের যত্ন নেওয়া ও সংরক্ষণ করার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: আমলকে অল্প মনে করে যথাযথভাবে তা আদায় করা এবং নিজের আখিরাতের সঞ্চয়কে বৃদ্ধি করা, আমলের প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে একাগ্রচিত্তে তা পালন করতে থাকা এবং ইলম অনুসারে আমল করা। শুধু ভালো লাগার ওপর ভিত্তি করে আমল করা যাবে না, শারীআহ সম্মত হলো কি না তা খেয়াল রাখা।
আমল যথাযথভাবে আদায় করার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: দুই প্রান্তিকতা থেকে মুক্ত থাকা : ১. শিথিলতাও না করা আবার ২. শারীআত নির্ধারিত সীমা, গুণাবলি, শর্ত, সময় ইত্যাদির ক্ষেত্রে বাড়াবাড়িও না করা।
আমলকে অল্প মনে করার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: বান্দার চোখে তা তুচ্ছ ভাবা ও বেশি মনে না করা। আসলে আল্লাহ তাআলার মর্যাদা, সম্মান ও বান্দার ওপর তাঁর দাসত্ব পাওয়ার যে অধিকার, তা কোনো বান্দা পরিপূর্ণভাবে আদায় করতে সক্ষম নয়। আর কারও জন্য এটা সমীচীন নয় যে, সে নিজের আমলের ব্যাপারে সন্তুষ্ট ও খুশি হয়ে যাবে।
কেউ কেউ বলেছেন, বান্দার প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টির আলামত হলো: বান্দার নিজের নফসের ওপর অসন্তুষ্ট থাকা। আর আমল কবুল হওয়ার আলামত হলো: আমলকে তুচ্ছ মনে করা, অল্প ভাবা এবং বান্দার অন্তরে তা ক্ষুদ্র বলে উপলব্ধি হওয়া। আসলে আরিফ বা আল্লাহর পরিচয়প্রাপ্ত ব্যক্তিরা নেককাজ করার পরপরই (তা আল্লাহর শান মোতাবিক না হওয়ার আশঙ্কায়) আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। রাসূলুল্লাহ যখন সালাতের সালাম ফেরাতেন, তখন তিনবার ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। [৩০৭] আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের হাজ্জ আদায় করার পর ক্ষমা প্রার্থনা করার আদেশ দিয়েছেন।[৩৩৮] শেষরাতে সালাত আদায়ের পর বান্দার ইস্তিগফার পাঠ করাকে তিনি প্রশংসা করেছেন।[৩৩৯]
আসলে যে ব্যক্তি তার রবের দেওয়া নিয়ামাত প্রত্যক্ষ করে এবং নিজের আমলের পরিমাণ ও তার দোষত্রুটি সম্পর্কে ধারণা রাখে, সেই ব্যক্তি তার রবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা ব্যতীত এবং নিজেকে ও নিজের আমলকে তুচ্ছ মনে করা ছাড়া আর কোনো উপায় দেখে না।
আমলসমূহ পালন করতে থাকার অর্থ হলো: সেগুলোর হকসহ পরিপূর্ণভাবে আদায় করা এবং সেগুলো নিয়মিতভাবে পালন করা।
আমলের প্রতি দৃষ্টি না দেওয়ার অর্থ হলো: আমলের দিকে মনোযোগ না দেওয়া, বারবার গণনা না করা এবং স্মরণ না করা; এগুলোর মাধ্যমে অহংকার ও আত্মগর্ব আসার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ এর দ্বারা ব্যক্তি আল্লাহর দৃষ্টি থেকে সরে যায় এবং তার সমস্ত আমল নষ্ট হয়ে যায়।
ইলম অনুসারে আমল করার অর্থ হলো: ইলমের দাবি অনুসারে আমল করা; যা নুবুওয়াতের উৎস থেকে গৃহীত। একমাত্র আল্লাহ তাআলার প্রতি একনিষ্ঠ হয়ে, তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এবং তাঁকে রাজি-খুশি করার জন্যই আমল করা। মানুষের নিকট উত্তম ও সুসজ্জিত হওয়ার উদ্দেশ্যে নয়।

টিকাঃ
[৩৩৬] সূরা হাদীদ, ৫৭:২৭।
[৩০৭] মুসলিম, ৫৯১; আবূ দাউদ, ১৫১৩।
[৩৩৮] আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ﴿ثُمَّ أَفِيضُوا مِنْ حَيْثُ أَفَاضَ النَّاسُ وَاسْتَغْفِرُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ﴾ "তারপর যেখান থেকে আর সবাই ফিরে আসে তোমরাও সেখান থেকে ফিরে এসো এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও। নিঃসন্দেহে তিনি ক্ষমাশীল ও করুণাময়।" (সূরা বাকারা, ২: ১৯৯)
[৩৩৯] আল্লাহ তাআলা বলেন, ﴿وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ﴾ "রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত।" (সূরা যারিয়াত, ৫১: ১৮)

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 মানযিল : গভীর ধ্যানে মগ্ন হওয়া (اَلْمُرَاقَبَةُ)

📄 মানযিল : গভীর ধ্যানে মগ্ন হওয়া (اَلْمُرَاقَبَةُ)


إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো- (আল্লাহ তাআলা সবকিছু দেখছেন, এই চিন্তার প্রতি) গভীর ধ্যানে মগ্ন হওয়ার মানযিল।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي أَنْفُسِكُمْ فَاحْذَرُوهُ "আর জেনে রেখো, তোমাদের মনে যে কথা রয়েছে, আল্লাহর তা জানা আছে। কাজেই তাঁকে ভয় করতে থাকো।” [৩৪0]
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَكَانَ اللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ رَقِيبًا “আল্লাহ সবকিছু দেখাশুনা করছেন।” [৩৪১]
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ “তোমরা যেখানেই থাকো, তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন।"[৩৪২]
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
أَلَمْ يَعْلَمُ بِأَنَّ اللَّهَ يَرَى "সে কি জানে না, আল্লাহ দেখছেন?" [৩৪১]
এ বিষয়ে এ রকম আরও অসংখ্য আয়াত রয়েছে।
হাদীসে জিবরীলে এসেছে, জিবরীল নবী -কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, 'ইহসান কী?' তখন নবি জবাবে বলেছিলেন, أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ فَإِنْ لَّمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ
"ইহসান হলো: তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদাত করবে যেন তাঁকে দেখছো, যদি তুমি তাঁকে না দেখো, তা হলে (নিশ্চিতভাবে এই উপলব্ধি করবে যে,) তিনি তোমাকে দেখছেন।" [৩৪২]
الْمُراقبة হলো: সবসময় বান্দার এই ইলম ও বিশ্বাস থাকা যে, আল্লাহ তাআলা তার প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে অবগত আছেন। দিন ও রাতের প্রতিটি মুহূর্ত এই জ্ঞান ও বিশ্বাস লালন করার নামই হচ্ছে 'মুরাকাবা'। এটি হলো প্রতিটি ওয়াক্তে, প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি শ্বাসপ্রশ্বাসে এবং প্রতিটি চোখের পলকে আল্লাহ তাআলা বান্দার পর্যবেক্ষক, তার প্রতি দৃষ্টিপাতকারী, তার কথার শ্রবণকারী, তার সমস্ত আমল সম্পর্কে জ্ঞাত—এই ইলমেরই ফল।
মুরাকাবা থেকে গাফিল ও অসতর্ক ব্যক্তিরা আল্লাহ-অভিমুখী ব্যক্তিদের প্রাথমিক অবস্থা থেকেই বহুদূরে অবস্থান করে। তাহলে আল্লাহকে-চিনতে-ইচ্ছুক-ব্যক্তিদের 'হাল' বা বিশেষ অবস্থা থেকে তারা কতদূরে? আর আরিফ বা আল্লাহর মা'রিফাতাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অবস্থার সাথে তো তাদের কথা চিন্তাও করা যায় না!
জারীরি বলেছেন, 'আমাদের এই বিষয়টি দুইটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত: ১. আপনার নফসকে আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে গভীর ধ্যানে নিমগ্ন করা এবং ২. আপনার বাহ্যিক কাজকর্ম ইলমের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হওয়া।।
কেউ কেউ বলেছেন, 'যে ব্যক্তি তার অন্তরের চিন্তাভাবনার ব্যাপারে আল্লাহর প্রতি গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হয়, তার বাহ্যিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কাজকর্মের ক্ষতি থেকে আল্লাহ তাকে বাঁচিয়ে দেন।'
তাদের কাউকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, 'রাখাল কখন বকরিপালকে তার লাঠির দ্বারা অনিরাপদ বিচরণক্ষেত্র থেকে তাড়িয়ে নেবে?' তিনি জবাব দিয়েছিলেন, 'যখন সে জানবে, তার ওপরে একজন পর্যবেক্ষণকারী রয়েছে।[৩৪৬]
জুনাইদ বাগদাদি বলেছেন, 'যে ব্যক্তির মুরাকাবা বা গভীর ধ্যানে মগ্ন হওয়ার মানযিল হাসিল হয়, সে তার রবের (সান্নিধ্য থেকে) এক মুহূর্ত বঞ্চিত থাকারও ভয় করে; অন্য কিছুর ভয় করে না।'[৩৪৭]
যুন-নূন মিসরি বলেছেন, 'মুরাকাবার আলামত হলো :
১. আল্লাহ তাআলা যা অবতীর্ণ করেছেন, সবকিছুর ওপর সেগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া,
২. আল্লাহ তাআলা যেসব বিষয়কে সম্মান দিতে বলেছেন, সেগুলোকে সম্মান দেওয়া আর
৩. আল্লাহ তাআলা যেগুলোকে ছোটো বলে গণ্য করেছেন, সেগুলোকে ছোটোই বিবেচনা করা।'[৩৪৮]
কেউ কেউ বলেছেন, 'আশা আপনাকে আনুগত্য করতে অনুপ্রেরণা দান করবে, ভয় আপনাকে গুনাহ থেকে দূরে রাখবে আর গভীর ধ্যানে মগ্ন হওয়া আপনাকে বস্তুর হাকীকত বা প্রকৃত অবস্থা প্রত্যক্ষ করার রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেবে।'[৩৪৯]
বলা হয়েছে, 'মুরাকাবা হলো প্রতিটি চিন্তা ও পদক্ষেপে সত্যের মানদণ্ডে অন্তরকে যাচাই করা এবং সত্যের খেয়াল রাখা। [৩৫০]
ইবরাহীম খাওয়াস বলেছেন, 'মুরাকাবা হলো বান্দার বাহির ও ভেতর একমাত্র আল্লাহর জন্য আন্তরিক রাখা। [৩৫১]
বলা হয়েছে, 'আল্লাহর পথে চলতে গিয়ে মানুষ নিজের নফসের ওপর যা আবশ্যক করে নেয়, তার মধ্যে সর্বোত্তম হলো: নিজের হিসাব গ্রহণ করা, গভীর ধ্যানে মগ্ন হওয়া এবং আমলকে ইলম অনুযায়ী পরিচালিত করা।'
আবূ হাফস আবূ উসমান নিশাপুরি-কে বলেছেন, 'যখন তুমি মানুষের সামনে (উপদেশ দেওয়ার জন্য) বসবে, তখন নিজের কল্ব ও নফসকেই উপদেশ দেওয়ার নিয়ত রাখবে। আর তোমার কাছে লোকজনের সমবেত হওয়া যেন তোমাকে ধোঁকায় না ফেলে দেয়। কারণ তারা তো তোমার বাইরের অবস্থা দেখে আর আল্লাহ দেখেন তোমার ভেতরের অবস্থা।'[৩৫২]
আল্লাহর-পথের-অভিজ্ঞ-ব্যক্তিগণ একমত পোষণ করেছেন যে, বাহ্যিক কাজকম সুরক্ষিত থাকার মাধ্যম হলো: আল্লাহকে নিয়ে অন্তরে গভীর ধ্যানে মগ্ন হওয়া। সুতরাং যে ব্যক্তি তার গোপন অবস্থাতেও আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকবে, তার বাহ্যিক কাজকর্মের অনিষ্টতা থেকে প্রকাশ্য ও গোপন সর্বাবস্থায় আল্লাহ তাকে হেফাজত করবেন।
মুরাকাবা হলো : الرِّقِيبُ )পর্যবেক্ষণকারী(, الْحَفِيظ )হেফাজতকারী(, الْعَلِيمُ )সর্বজ্ঞানী(, اَلسَّمِيعُ )সর্বশ্রোতা(, اَلْبَصِيرُ )সর্বদ্রষ্টা) আল্লাহ তাআলার এই নামগুলোর উত্তমরূপে দাসত্ব করা। যে ব্যক্তি এই নামগুলোর অর্থ হৃদয়ঙ্গম করবে, এগুলোর দাবি অনুযায়ী ইবাদাত করবে, কেবল তারই মুরাকাবা বা গভীর ধ্যানে মগ্ন হওয়ার মানযিল অর্জন হবে। আল্লাহ তাআলাই অধিক জানেন।

টিকাঃ
[৩৪০] সূরা বাকারা, ২: ২৩৫।
[৩৪১] সূরা আহযাব, ৩৩: ৫২।
[৩৪২] সূরা হাদীদ, ৫৭:৪।
[৩৪১] সূরা আলাক, ৯৬ : ১৪।
[৩৪২] বুখারি, ৫০; মুসলিম, ৮।
[৩৪৫] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ১/৩৩১।
[৩৪৬] বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৮৮০।
[৩৪৭] তাজুদ্দীন ইবনুস সুবকি, তবাকাতুশ-শাফিয়িয়্যাতিল কুবরা, ২/২৬৫।
[৩৪৮] বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ১৫২৮।
[৩৪৯] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ১/৩৩১।
[৩৫০] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ১/৩৩১।
[৩৫১] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ১/৩৩১।
[৩৫২] ইমাম গাযালি, ইহইয়াউ উলূমিদ দ্বীন, ৪/৩৯৭।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 মানযিল : আল্লাহর সম্মানিত বস্তুসমূহকে সম্মান করা (تَعْظِيمُ حُرُمَاتِ اللَّهِ)

📄 মানযিল : আল্লাহর সম্মানিত বস্তুসমূহকে সম্মান করা (تَعْظِيمُ حُرُمَاتِ اللَّهِ)


إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো—আল্লাহ তাআলার সম্মানিত বস্তুসমূহকে সম্মান করার মানযিল।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَمَنْ يُعَظِّمْ حُرُمَاتِ اللَّهِ فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ عِنْدَ رَبِّهِ “আর যে কেউ আল্লাহর সম্মানিত বস্তুসমূহের সম্মান করবে, তার জন্য তার রবের কাছে তা উত্তম (বলে গণ্য হবে)।” [৩৫৩]
অনেক মুফাসসির বলেছেন, ‘এখানে আল্লাহর সম্মানিত বস্তুসমূহ (حُرُمَاتُ اللهِ) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: তাঁর অবাধ্যতা ও তাঁর নিষেধকৃত বস্তুসমূহ। আর একে সম্মান করার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: সেগুলোতে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকা।’
লাইস বলেছেন, ‘আল্লাহর সম্মানিত বস্তুসমূহ হলো: যে কাজে লিপ্ত হওয়া হালাল নয়।’[৩৫৪] আরেক দল বলেছেন, ‘হুরুমাতুল্লাহ হলো: আল্লাহ তাআলার আদেশ ও নিষেধ।’
যাজ্জাজ বলেছেন, ‘তা হলো: যা পালন করা ওয়াজিব এবং যে ব্যাপারে শিথিলতা প্রদর্শন করা হারাম।’[৩৫৫] একদল বলেছেন, ‘এখানে হুরুমাত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: সময় ও স্থান বিবেচনায় হাজ্জের পালনীয় বিধিবিধান ও নিদর্শনাদি।'
তবে সঠিক অভিমত হলো: হুরুমাতুল্লাহ এগুলোর সব কয়টিকেই অন্তর্ভুক্ত করে। حُرُمَات হলো حُرْمَةٌ-এর বহুবচন। এর অর্থ হলো: যা শ্রদ্ধা করা ও হেফাজত করা ওয়াজিব; যেমন: অধিকার, ব্যক্তি, সময় ও স্থান। আর এর সম্মান করার অর্থ হলো: এর হক যথাযথভাবে আদায় করা এবং তা নষ্ট না করে সংরক্ষণ করা।
শাস্তির ভয় ও সাওয়াবের আশা না করে ইবাদাত করা কি সম্মান- প্রদর্শনের অন্তর্ভুক্ত?
এ সম্পর্কে সৃফিয়ায়ে কেরামের অনেক আলোচনা রয়েছে। মানুষ এই গুণের অধিকারী ব্যক্তিদের অনেক বেশি সম্মান করে এবং এই বিশ্বাস রাখে যে, এটিই হলো দাসত্বের সর্বোচ্চ স্তর। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করবে, তাঁর আদেশ- নিষেধ পরিপূর্ণরূপে মেনে চলবে; তবে তা তাঁর শাস্তির ভয়ে কিংবা সাওয়াব পাওয়ার আশায় নয়।
কারণ এটি হলো কেবলই নিজস্বার্থ চিন্তা ও সুবিধা ভোগ। আর মহাব্বত এই বিষয়টিকে প্রত্যাখ্যান করে। কারণ ভক্ত তার প্রিয় মানুষের মহাব্বতে কোনো স্বার্থ অনুসন্ধান করে না। কেউ যদি তা স্বার্থের কারণে করে, তা হলে তার মহাব্বত ও ভালোবাসা ত্রুটিযুক্ত। আর সাওয়াবের আশা করার মাঝে এই বিষয়টি লুকায়িত রয়েছে যে, বান্দা নিজ আমলের দ্বারা আল্লাহর নিকট প্রতিদান পাওয়ার জন্য নিজেকে হকদার মনে করে থাকে। এর মধ্যে দুটি বিপদ রয়েছে: ১. পুরস্কার পাওয়ার কামনা এবং ২. নিজ আমল সম্পর্কে উত্তম ধারণা। কারণ তার আমলের দ্বারাই তো সে নিজেকে পুরস্কার ও প্রতিদান পাওয়ার হকদার মনে করে বসে আছে। অপরদিকে শাস্তির ভয় করা মানে নিজের নফসের সাথে ঝগড়া করা। কারণ যখনই কোনো হুকুমের বিপরীত হবে, তখনই ঝগড়া শুরু হয়ে যাবে, নিজের নফসকে বলতে থাকবে, 'তুমি কি জাহান্নামের আগুনকে ভয় করো না? এর আযাব ও জাহান্নামিদের জন্য আল্লাহ কী কঠিন শাস্তি তৈরি করে রেখেছেন তার কি কোনো পরোয়া করো না?' তার মাঝে ও তার নফসের মাঝে এই বাগ্বিতণ্ডা চলতেই থাকবে।
সে এই ঝগড়া ও বাগ্বিতণ্ডা থেকে রেহাই পাবে না কখনো। এ থেকে মুক্তি মিলবে কেবল তখনই, যখন আল্লাহ তাআলার আদেশ-নিষেধ পালন করবে কোনো ধরনের স্বার্থচিন্তা ছাড়াই। বরং শুধু আদেশকারী ও নিষেধকারী আল্লাহর সম্মানার্থে তা পালন করে যাবে, এই বিশ্বাস রাখবে যে, তিনিই একমাত্র ইবাদাত পাওয়ার উপযুক্ত সত্তা, যাঁর সম্মানিত বস্তুসমূহকে (আদেশ-নিষেধ ইত্যাদি) সম্মান দেখানো এবং মেনে চলা অবশ্যকর্তব্য। যদি তিনি জান্নাত-জাহান্নাম সৃষ্টি নাও করতেন, তবুও তিনি সত্তাগতভাবে ইবাদাত, সম্মান ও মর্যাদা পাওয়ার একচ্ছত্র অধিকার রাখতেন। সুতরাং পবিত্র ও সুউচ্চ গুণাবলির অধিকারী নফস তাঁর ইবাদাত করতে থাকে কোনোকিছু পাওয়ার আশায় কিংবা ক্ষতি থেকে বাঁচতে নয়; বরং তিনি সত্তাগতভাবেই উপযুক্ত যে, তাঁর ইবাদাত করা হবে, তাঁকে সম্মান দেখানো হবে, তাঁকে মহাব্বত করা হবে; তিনি সবকিছুর প্রকৃত মালিক এবং তিনি দাসত্ব লাভের একমাত্র সত্তা। তারা বলেন, বান্দা কখনো শ্রমিকের ন্যায় হতে পারে না যে, পারিশ্রমিক পেলে কাজ করবে আর না পেলে কাজ করবে না। সে যদি এ রকম করে, তা হলে সে হবে প্রতিদানের গোলাম; মহাব্বত ও স্বেচ্ছায় গোলাম নয়।
তারা বলেন: এ ক্ষেত্রে আমলকারীগণ দুইটি মানযিলের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখে: ১. প্রতিদানের মানযিল এবং ২. অনুসরণীয় সত্তা আল্লাহর নৈকট্য লাভের মানযিল। আল্লাহ তাআলা দাউদ -এর ব্যাপারে বলেছেন,
وَإِنَّ لَهُ عِنْدَنَا لَزُلْفَى وَحُسْنَ مَآبٍ )
"নিশ্চয়ই আমার কাছে তাঁর জন্য রয়েছে নৈকট্যের মর্যাদা ও উত্তম প্রতিদান।”[৩৫৬]
আয়াতে উল্লেখিত زُلْفَى হলো : নৈকট্যের মানযিল আর حُسْنَ مَآبٍ হলো : উত্তম সাওয়াব ও প্রতিদানের মানযিল।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ
"যারা সৎকর্ম করেছে তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ এবং তার চেয়েও বেশি।"[৩২৭]
এখানে উল্যা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: প্রতিদান ও পুরস্কারের মানযিল। আর উল্যা হলো: নৈকট্যের মানযিল। এ কারণেই এর তাফসীর করা হয় 'আল্লাহ তাআলার দর্শন লাভ' বলে।
তারা বলেন: আরিফ বা আল্লাহর পরিচয়প্রাপ্ত ব্যক্তিদের আমল হয় নৈকট্যের মানযিল ও মর্তবাকে কেন্দ্র করে আর সাধারণ আমলকারীদের আমল হয় সাওয়াব ও প্রতিদান পাওয়াকে কেন্দ্র করে। এ দুয়ের মাঝে রয়েছে বিশাল ব্যবধান।
অপর একটি দল এই দৃষ্টিভঙ্গিকে অপরিণামদর্শী ও চিন্তাশূন্য দৃষ্টিভঙ্গি বলে অভিহিত করেছেন। এর বিপক্ষে তারা দলীল হিসেবে পেশ করেছেন নবি-রাসূল-সিদ্দীকদের অবস্থা, তাঁদের দুআ, আল্লাহর নিকট তাঁদের প্রার্থনা, জাহান্নামকে ভয় করা এবং জান্নাতের প্রত্যাশা করার কারণে তাঁদের প্রশংসা ইত্যাদিকে। যেমন আল্লাহ তাআলা তাঁর বিশেষ বান্দাদের সম্পর্কে বলেছেন যে, তারা তাঁর রহমতের আশা রাখে এবং শাস্তির ভয় করে; যার আলোচনা পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে। এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা তাঁর নবি-রাসূলদের ব্যাপারে বলেছেন,
وَزَكَرِيَّا إِذْ نَادَى رَبَّهُ رَبِّ لَا تَذَرْنِي فَرْدًا وَأَنْتَ خَيْرُ الْوَارِثِينَ فَاسْتَجَبْنَا لَهُ وَوَهَبْنَا لَهُ يَحْيِي وَأَصْلَحْنَا لَهُ زَوْجَهُ إِنَّهُمْ كَانُوا يُسَارِعُوْنَ فِي الخَيْرَاتِ وَيَدْعُوْنَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوا لَنَا خَاشِعِينَ )
"আর যাকারিয়ার কথা স্মরণ করুন, যখন সে তাঁর রবকে ডেকে বলেছিল, 'হে আমার প্রতিপালক, আমাকে একাকী ছেড়ে দিয়ো না আর সবচেয়ে ভালো উত্তরাধিকারী তো তুমিই।' ফলে আমি তাঁর দুআ কবুল করেছিলাম এবং তাঁকে দান করেছিলাম ইয়াহইয়া, আর তাঁর স্ত্রীকে তাঁর জন্য যোগ্য করে দিয়েছিলাম। তারা সৎকাজে আপ্রাণ চেষ্টা করত, আমাকে ডাকত আশা ও ভীতি সহকারে এবং আমার সামনে ছিল অবনত হয়ে।"[৩৫৮]
অর্থাৎ আমার নিকট যা রয়েছে তার প্রতি আগ্রহী হয়ে এবং আমার কঠিন শাস্তির ভয়। এই আয়াতে وَيَدْعُوْنَنَا رَغَبًا وَّرَهَبًا "তারা সৎকাজে আপ্রাণ চেষ্টা করত, আমাকে ডাকত আশা ও ভয় নিয়ে"-এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো এই সূরাতে যেসকল নবি-রাসূলদের আলোচনা এসেছে তারা সবাই। অধিকাংশ মুফাসসিরের অভিমত এটিই।
আর তাদের সবার নিকট اَلرَّغَبُ وَالرَّهَبُ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: আল্লাহর রহমতের আশা করা এবং জাহান্নামের ভয় করা।
আল্লাহ তাআলা তাঁর বিশেষ বান্দাদের আলোচনা করে তাদের আমলের প্রশংসা করেছেন। আর প্রশংসিত আমলের একটি হলো: তাঁর নিকট জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَالَّذِيْنَ يَقُوْلُوْنَ رَبَّنَا اصْرِفْ عَنَّا عَذَابَ جَهَنَّمَ إِنَّ عَذَابَهَا كَانَ غَرَامًا إِنَّهَا سَاءَتْ مُسْتَقَرًّا وَمُقَامًا "তারা দুআ করতে থাকে, 'হে আমাদের রব, জাহান্নামের আযাব থেকে আমাদের বাঁচাও, এর আযাব তো সর্বনাশা। আশ্রয়স্থল ও আবাস হিসেবে তা বড়োই নিকৃষ্ট জায়গা।” [৩৫৯]
আল্লাহ তাআলা তাদের ব্যাপারে এটিও জানিয়ে দিয়েছেন যে, তারা তাদের ঈমানের ওসীলায় জাহান্নাম থেকে মুক্তি কামনা করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, رَبَّنَا إِنَّنَا آمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ الَّذِينَ يَقُولُونَ "যারা বলে, 'হে আমাদের পালনকর্তা, আমরা ঈমান এনেছি, কাজেই আমাদের গুনাহগুলো ক্ষমা করে দাও আর আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করো।”[৩৬০]
তারা আল্লাহ নিকট তাদের ঈমানকে সবচেয়ে বড়ো মাধ্যম বানিয়েছেন এবং এর ওসীলায় জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য প্রার্থনা করেছেন।
নবি ﷺ তাঁর উম্মাতকে আদেশ করেছেন যে, দুআ কবুলের সময় অর্থাৎ আযানের পরপরই তারা যেন তাঁর জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ মানযিল প্রাপ্তির জন্য দুআ করে। তিনি এটিও জানিয়ে দিয়েছেন যে, যারা তাঁর জন্য এই দুআ করবে, তাদের জন্য তাঁর সুপারিশ করা ওয়াজিব হয়ে যাবে।[৩৬১]
একবার সুলাইম আনসারি রাদিয়াল্লাহু আনহু নবি ﷺ-কে বলেছিলেন, 'আমি তো আল্লাহ তাআলার নিকট জান্নাতের প্রার্থনা করি আর জাহান্নাম থেকে পানাহ চাই। কিন্তু আপনার ও মুআযের গুনগুনানি ভালোমতো শুনতে পারি না। (ফলে, আপনারা দুআয় কী বলেন তা বুঝি না)। তখন নবি ﷺ বলেছিলেন, "আমি আর মুআয আমরাও তোমার দুআর কাছাকাছিই গুনগুন (দুআ) করি।”[৩৬২]
আসলে কুরআন মাজীদ ও পবিত্র সুন্নাহয় আল্লাহর এমন বান্দা ও ওলিদের প্রশংসায় ভরপুর, যারা জান্নাত লাভের প্রার্থনা করে ও এর আশা রাখে এবং জাহান্নাম থেকে পানাহ চায় ও এর ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত থাকে।
তারা বলেন: নবি ﷺ সাহাবায়ে কেরামকে বলেছেন,
اسْتَعِيذُوا بِاللَّهِ مِنْ عَذَابِ جَهَنَّمَ، وَاسْتَعِيذُوا بِاللَّهِ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ، اِسْتَعِيذُوا بِاللَّهِ مِنْ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ وَاسْتَعِيذُوا بِاللَّهِ مِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ
"তোমরা আল্লাহর কাছে জাহান্নামের শাস্তি থেকে পানাহ চাও, তোমরা আল্লাহর কাছে কবরের শাস্তি থেকে পানাহ চাও, তোমরা আল্লাহর কাছে মাসীহ দাজ্জালের ফিতনা থেকে পানাহ চাও, তোমরা আল্লাহর কাছে জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা থেকে পানাহ চাও।”[৩৬৩]
যেই ব্যক্তি জান্নাতে নবি ﷺ-এর সান্নিধ্য পাওয়ার কামনা করেছিল, সেই ব্যক্তিকে তিনি বলেছিলেন,
فَأَعِنِّي عَلَى نَفْسِكَ بِكَثْرَةِ السُّجُودِ
“তা হলে তুমি অধিক পরিমাণে সাজদার মাধ্যমে (অর্থাৎ বেশি বেশি সালাত আদায় করে) তোমার নিজের জন্য আমাকে সাহায্য করো।”৩৯৪।
তারা বলেন: উম্মাতের নিকট নবি -এর এটা মাকসুদ বা উদ্দেশ্য ছিল যে, তারা জান্নাত লাভের জন্য এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আমল করবে। যাতে তারা সবসময় এ দুটিকে স্মরণে রাখে, কখনো ভুলে না যায়। এর আরেকটি কারণ হলো: আখিরাতে নাজাত পাওয়ার জন্য জান্নাত-জাহান্নামের ওপর ঈমান আনা আবশ্যক। আর জান্নাত লাভের আশায় এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার আগ্রহে আমল করা এটি খাঁটি ঈমানের পরিচয়। (কারণ পুরা দ্বীনের ওপর ঈমান না থাকলে কারও থেকে এমনটি প্রকাশ পাওয়া অসম্ভব।)
তারা বলেন: নবি তাঁর সাথিসঙ্গীদের ও পুরা উম্মাহকে জান্নাত লাভের জন্য উদ্বুদ্ধ করতেন, জান্নাতের হৃদয়গ্রাহী বর্ণনা দিতেন, যাতে করে তারা তা পাওয়ার কামনা করে এবং সে জন্য আমল করে। তিনি বলেছেন,
أَلَا مُشَمِّرٌ لِلْجَنَّةِ فَإِنَّ الجَنَّةَ لَا خَطَرَ لَهَا هِيَ وَرَبِّ الْكَعْبَةِ نُوْرٌ يَتَلالُأُ وَرَيْحَانَةٌ تَهْتَزُّ وَقَصْرٌ مَّشِيدٌ وَنَهَرٌ مُطَرِدٌ وَفَاكِهَةٌ كَثِيرَةٌ نَضِيجَةٌ وَزَوْجَةً حَسْنَاءُ جَمِيلَةً وَحُلَلْ كَثِيرَةٌ فِي مَقَامٍ أَبَدًا فِي حَبْرَةٍ وَنَضْرَةٍ فِي دَارٍ عَالِيَةٍ سَلِيمَةٍ بَهِيَّةٍ
“জান্নাতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণকারী কেউ কি আছে? কারণ কা'বার রবের কসম! জান্নাতের সমতুল্য আর কিছু নেই। তার এমন আলো রয়েছে, যা চারদিক ঝলমল করে তোলে। তার পুষ্পরাজি সুবাস ছড়ায়। যাতে রয়েছে সুরম্য মজবুত অট্টালিকা, অবিরাম প্রবাহমান নদী, সুমিষ্ট পাকা ফলের প্রাচুর্য, অলংকারে সুসজ্জিতা পরমা সুন্দরী স্ত্রী, সবুজ শ্যামলিমার নিয়ামাতে ভরপুর চিরস্থায়ী বাসস্থান, গগনচুম্বী নিরাপদ ও মনোরম বাড়িঘর।”
সাহাবায়ে কেরাম জবাব দেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, তার জন্য আমরাই প্রস্তুতি গ্রহণ করব।'
তিনি বলেন,
قُوْلُوْا إِنْ شَاءَ اللهُ
"তোমরা বলো, 'ইন শা আল্লাহ', আল্লাহ যদি চান।”[৩৬৫]
এখন যদি আমরা হাদীসে উল্লেখিত নবি -এর এই রকম বাণী নিয়ে আলোচনা শুরু করি যে, 'যে ব্যক্তি এই এই আমল করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন', তা হলে বইয়ের কলেবর বৃদ্ধি পেয়ে বিশালাকার ধারণ করবে। আসলে এ রকম অসংখ্য বর্ণনা রয়েছে। তিনি এ রকম করে বলেছেন যাতে তারা জান্নাতের আশায় সেই আমল করতে উদ্বুদ্ধ হয় এবং জান্নাতই যেন হয় তাদের আগ্রহের বিষয়।
তারা বলেন: প্রতিদানপ্রাপ্তির আশায় ও শাস্তির ভয়ে আমল করলে তা কীভাবে ত্রুটিযুক্ত বলে গণ্য হবে?! অথচ রাসূলুল্লাহ -এর ওপর উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং এ রকমভাবে বলেছেন, যে ব্যক্তি এই আমল করবে, তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজাই খুলে দেওয়া হবে...!
তারা বলেন: এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা সেই বান্দাদের ভালোবাসেন, যারা তাঁর নিকট জান্নাতের প্রার্থনা করে এবং জাহান্নাম থেকে পানাহ চায়। কারণ আল্লাহ তাআলার নিকট চাইলে তিনি খুশি হন এবং না চাইলে তিনি রাগান্বিত হন। আর তাঁর কাছে যা চাওয়া হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে উত্তম ও সবচেয়ে বড়ো হলো: জান্নাত এবং যা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়, তার মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট ও খারাপ হলো: জাহান্নাম।
সুতরাং জান্নাত লাভের আশায় এবং জাহান্নামের ভয়ে আমল করা আল্লাহ তাআলার নিকট অতি প্রিয় ও সন্তুষ্টিজনক। জান্নাত অনুসন্ধান করা এবং জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাওয়া হলো রবের দাসত্ব। আর অপূর্ণাঙ্গ দাসত্বের চেয়ে পরিপূর্ণরূপে দাসত্বের পরিচয় দেওয়াই হলো উত্তম। (যারা জান্নাতের আশা করে না এবং জাহান্নামের ভয় করে না, তাদের দাসত্ব হয় অপূর্ণাঙ্গ।)
তারা বলেন: যখন কোনো আমলকারী জান্নাত ও জাহান্নামের প্রতি দৃষ্টি দেবে না, জান্নাতের আশা-আকাঙ্ক্ষা করবে না, তখন তার সংকল্প নিস্তেজ হয়ে যাবে, তার হিম্মত দুর্বল হয়ে পড়বে, চলার অনুপ্রেরণা সে হারিয়ে ফেলবে। কিন্তু যখন তার জান্নাত পাওয়ার তীব্র বাসনা জন্মাবে, তখন এর জন্য আমল করার প্রতি উদ্বুদ্ধকারীও বেশ শক্তিশালী হবে, তার সংকল্প ও পথচলার ইচ্ছাও সুদৃঢ় হবে এবং এর জন্য তার পরিশ্রমও পূর্ণতা পাবে। আসলে এই বিষয়টি সুস্থ রুচিবোধের দ্বারাই জানা যায়।
তারা বলেন: এটি যদি শারীআহ-প্রণেতার উদ্দেশ্য না হতো, তা হলে তিনি তার বান্দাদের জন্য জান্নাতের বর্ণনা দিতেন না, তাদের সামনে তা সুসজ্জিত ও লোভনীয়রূপে ফুটিয়ে তুলতেন না, তাদের নিকট তা পেশ করতেন না এবং তাদেরকে এর বিস্তারিত বিবরণ শুনাতেন না, যে পর্যন্ত তাদের চিন্তাভাবনা কখনো পৌঁছার কথা ছিল না। এ সবগুলো তিনি করেছেন জান্নাতের প্রতি বান্দাদের আগ্রহ বাড়ানোর জন্য এবং তা হাসিল করতে যথাযথ প্রস্তুতি নেবার জন্য।
তারা বলেন: আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَاللَّهُ يَدْعُوْ إِلَى دَارِ السَّلَامِ "আর আল্লাহ শান্তি ও নিরাপত্তার ঘর (-জান্নাত)-এর দিকে আহ্বান করেন।” [৩৬৬]
এটি হলো সেই আহ্বানে সাড়া দেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা এবং জান্নাতের প্রতি তৎপর হওয়া এবং দ্রুত সেই ডাকে লাব্বাইক বলার জন্য উৎসাহ দেওয়া।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: জান্নাত শুধু গাছ-গাছালি, ফলমূল, খাবার, পানীয়, ডাগর চক্ষুবিশিষ্ট হুর, নদী, অট্টালিকা ইত্যাদির নাম নয়। অধিকাংশ মানুষ জান্নাতের নামের ক্ষেত্রে এই ভুলটি করে থাকে। আসলে জান্নাত হলো সব নিয়ামাতে পরিপূর্ণ একটি আবাসের নাম। জান্নাতের সবচেয়ে বড়ো উপভোগ্য নিয়ামাত হলো: আল্লাহর দিকে তাকিয়ে থাকা, তাঁর কথা শ্রবণ করা, তাঁর সন্তুষ্টি ও সান্নিধ্য দ্বারা চক্ষু শীতল করা। প্রকৃত অর্থে জান্নাতের খাদ্য, পানীয়, পোশাক-পরিচ্ছদ, আকার-আকৃতি ইত্যাদির সাথে এই দুনিয়ার কোনোকিছুরই কোনো মিল নেই। দেখতে এক রকম হলেও স্বাদে ও পরিপূর্ণতায় রয়েছে বিশাল ব্যবধান। পরকালে আল্লাহ তাআলার সামান্য একটু সন্তুষ্টি জান্নাত ও তার মধ্যকার সমস্ত নাজ-নিয়ামাত থেকেও উত্তম। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَرِضْوَانٌ مِّنَ اللَّهِ أَكْبَرُ "বস্তুত এ (নিয়ামাত) সমুদয়ের মাঝে সবচেয়ে বড়ো হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি।”[৩৬৭]
رضوان-কে এখানে তানবীনসহ আনা হয়েছে, ফলে তা তাকলীল বা কম বোঝানোর অর্থ প্রদান করে; যার অর্থ দাঁড়ায়: বান্দার প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টির সামান্যতম অংশও জান্নাতের চেয়ে অনেক বড়ো।
সহীহ হাদীসে এসেছে, যাকে حَدِيثُ الرُّؤْيَةِ (দর্শনের হাদীস) বলা হয়, নবি বলেছেন,
فَمَا أُعْطُوا شَيْئًا أَحَبَّ إِلَيْهِمْ مِّنَ النَّظَرِ إِلَى رَبِّهِمْ عَزَّ وَجَلَّ "তাদেরকে আল্লাহর দর্শন লাভের চেয়ে অধিক পছন্দনীয় জিনিস আর কিছুই দান করা হয়নি।”[৩৬৮]
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, বিষয়টি এমনই। চিন্তাভাবনা আর কল্পনায় যা আসে, তার চেয়ে এটি অধিক সম্মানিত ও মহান। বিশেষ করে মহাব্বতকারীরা যখন সেখানে মহাব্বতের প্রতিদান পাবে, তাদের প্রিয় সত্তার সান্নিধ্য লাভ করার মাধ্যমে, তখন তা বুঝে আসবে। কারণ মানুষ যাকে ভালোবাসবে, সেদিন সে তারই সঙ্গী হবে। এই হুকুমের মধ্যে কোনো ব্যতিক্রম নেই। বরং তা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বেশ শক্তিশালীভাবেই প্রমাণিত।
সুতরাং কোন স্বাচ্ছন্দ্য, কোন স্বাদ, চক্ষু শীতলকারী কোন বস্তু ও কোন সফলতা সেদিনের সেই নৈকট্য ও সান্নিধ্য এবং সেই স্বাদ ও চোখের শীতলতার সমান হবে?
আল্লাহর শপথ! আল্লাহর নৈকট্যলাভ ও দর্শনই হলো সেই নিদর্শন, যার দিকে মহাব্বতকারীরা ছুটে চলে! এটিই সেই পতাকা, যার ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণের জন্য আল্লাহর মা'রিফাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা উদ্‌গ্রীব থাকে! এটিই হলো 'জান্নাত'-এর রূহ ও প্রাণ। এর কারণেই জান্নাত এত সুশোভিত ও মনোরম! এর ওপরই জান্নাতের খুঁটি!
সুতরাং কীভাবে বলা যায়, বান্দা জান্নাত লাভের আশায় এবং জাহান্নামের ভয়ে আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করবে না?!
জাহান্নাম থেকে আমরা আল্লাহর কাছে পানাহ চাই! জাহান্নামের অধিবাসীদের জন্য আল্লাহ তাআলাকে না দেখার যে কঠিন শাস্তি, তাদের ওপর তাঁর লাঞ্ছনা, রাগ ও অসন্তুষ্টি এবং আল্লাহর নিকট থেকে তাদের দূরে থাকা—জাহান্নামের আগুনে তাদের শরীর ও রূহ জ্বলেপুড়ে অঙ্গার হওয়ার চেয়েও বেশি ভয়াবহ ও মারাত্মক যন্ত্রণার। আসলে আল্লাহকে না দেখার আগুনে আগে তাদের অন্তর পুড়ে যায়, এরপর সেখান থেকে পুরা শরীরে সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
সুতরাং নবি, রাসূল, সিদ্দীক, শহীদ ও নেককার ব্যক্তিগণ—সবার পরম চাওয়ার বস্তু হলো: জান্নাত অর্জন আর জাহান্নাম থেকে পলায়ন। আল্লাহ তাআলাই একমাত্র সাহায্যকারী। ভরসা করতে হবে শুধু তাঁরই ওপর। তাঁর সাহায্য ব্যতীত কেউ না-কোনো নেককাজ করতে পারে আর না-কোনো গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে পারে। তিনিই আমাদের জন্য যথেষ্ট আর তিনি সর্বোত্তম অভিভাবক।

টিকাঃ
[৩৫৩] সূরা হাজ্জ, ২২: ৩০।
[৩৫৪] বাগাবি, তাফসীর, ৫/৩৮৩।
[৩৫৫] বাগাবি, তাফসীর, ৫/৩৮৩।
[৩৫৬] সূরা সাদ, ৩৮: ২৫।
[৩৫৭] সূরা ইউনুস, ১০: ২৬।
[৩৫৮] সূরা আম্বিয়া, ২১: ৮৯-৯০।
[৩৫৯] সূরা ফুরকান, ২৫: ৬৫-৬৬।
[৩৬০] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৬।
[৩৬১] মুসলিম, ৩৮৪।
[৩৬২] আবূ দাউদ, ৭৯২; ইবনু মাজাহ, ৯১০।
[৩৬৩] তিরমিযি, ৩৬০৪।
[৩৬৪] মুসলিম, ৪৮৯।
[৩৬৫] ইবনু মাজাহ, ৪৩৩২।
[৩৬৬] সূরা ইউনুস, ১০: ২৫।
[৩৬৭] সূরা তাওবা, ৯: ৭২।
[৩৬৮] মুসলিম, ১৮১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00