📄 আশার কয়েকটি ফায়দা ও উপকারিতা
আশার অনেক উপকারিতা ও কল্যাণ রয়েছে। তার কতিপয় নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
১. আল্লাহ তাআলার নিকট দয়া, অনুগ্রহ ও ইহসানের আশা করার মাধ্যমে দাসত্ব, দরিদ্রতা ও মুখাপেক্ষিতার প্রকাশ ঘটানো হয়। কারণ বান্দা আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া থেকে চোখের পলক পরিমাণ সময়ও অমুখাপেক্ষী নয়।
২. আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের নিকট এটা পছন্দ করেন যে, তারা আল্লাহর নিকট তাঁর অনুগ্রহ পাওয়ার আশা-আকাঙ্ক্ষা করুক, তাঁর নিকট প্রার্থনা করুক। কারণ তিনিই তো প্রকৃত মালিক, পরম দাতা; যার নিকট সবকিছু চাওয়া যায়, যিনি সবচেয়ে বেশি দান করেন, যার দান অফুরন্ত, সবকিছুর ভান্ডার তো রয়েছে তাঁরই কাছে। আল্লাহর নিকট আশা-আকাঙ্ক্ষা করলে এবং চাইলে তিনি সর্বাধিক খুশি হন। হাদীসে এসেছে-
مَنْ لَّمْ يَسْأَلِ اللَّهَ يَغْضَبْ عَلَيْهِ
“যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে না, আল্লাহ তার ওপর রাগান্বিত হন।”[৩৩১]
আর প্রার্থনাকারী হয় (রহমতের) আশা পোষণকারী ও অনুসন্ধানী। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে আশা পোষণ করে না, আল্লাহ তার ওপর গোসসা করেন।
আশার উপকারিতাসমূহের মধ্য থেকে এটি একটি অতিরিক্ত পাওনা যে, এর দ্বারা আল্লাহর রাগ ও গোসসা থেকে বেঁচে থাকা যায়।
৩. আশা হলো এমন চালক, যার দ্বারা ব্যক্তি আল্লাহর পথে চলার অনুপ্রেরণা পায় এবং তার পথচলা স্বাচ্ছন্দ্যময় হয়, এটি তাকে ধারাবাহিকভাবে পথ চলতে উদ্বুদ্ধ করে। যদি আশা না থাকত, কেউ পথ চলত না। কারণ শুধু ভয় ব্যক্তির ভেতর সাড়া জাগাতে পারে না। আসলে মহাব্বত-ভালোবাসা তার ভেতরটা নাড়িয়ে দেয়, ভয় তাকে অস্থির করে তোলে আর আশা তাকে পরিচালিত করে।
৪. আশা সর্বশ্রেষ্ঠ মাকাম অর্জন করতে সহায়তা করে; সর্বশ্রেষ্ঠ মাকামটি হলো শোকরের মাকাম, যা দাসত্বের সারাংশ ও মূল। কারণ ব্যক্তি যখন তার আশার বস্তুটি পেয়ে যায়, তখন তা তাকে শোকরগুজার হতে দৃঢ়ভাবে আহ্বান জানায়।
৫. আশা আল্লাহ তাআলার উত্তম নামসমূহের অর্থ, পরিচয় ও সেগুলোর সাথে সম্পর্কিত বিষয়াদির ব্যাপারে অতিরিক্ত জানাকে আবশ্যক করে। কারণ আশা ইহসানের নামসমূহের সাথে সম্পর্কিত, সেগুলোর মাধ্যমে তার দাসত্ব প্রমাণিত হয় এবং সেগুলোর দ্বারা দুআও করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا "আল্লাহর জন্য রয়েছে উত্তম নামসমূহ। সুতরাং সে নাম ধরেই তাঁকে ডাকো।"[৩৩২]
তাই আল্লাহ তাআলার উত্তম নামসমূহ দ্বারা দুআ করার বিষয়টিকে বেকার ভাবা উচিত নয়। কারণ দুআকারী ব্যক্তি যেসব মাধ্যম দ্বারা দুআ করে, সেগুলোর মধ্যে আল্লাহ তাআলার নামসমূহ্ই হচ্ছে সর্বোৎকৃষ্ট। সুতরাং আশার মানযিল সঠিকভাবে অর্জন করতে না পারলে, এই সমস্ত নামসমূহের মাধ্যমে ইবাদাত করা ও দুআ করাও পরিপূর্ণ হয় না; বরং সেগুলোকে বেকার ও অর্থহীন করে দেওয়ার শামিল হয়ে যায়।
৬. ভয় আশাকে আবশ্যক করে আর আশা ভয়কে আবশ্যক করে। সুতরাং প্রতিটি আশা পোষণকারী ব্যক্তিই ভয়কারী আবার প্রতিটি ভয়কারী ব্যক্তিই আশা পোষণকারী। এ কারণেই যেখানে ভয়ের আলোচনা সুন্দর, সেখানে আশার আলোচনাও সুন্দর বলে গণ্য হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, مَا لَكُمْ لَا تَرْجُوْنَ لِلَّهِ وَقَارًا ) "তোমাদের কী হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহর বড়োত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের (কাছে কোনো) আশা করছো না?"[৩৩৩]
অনেক মুফাসসির বলেছেন, 'অর্থাৎ তোমাদের কী হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বকে ভয় করছো না? এখানে আশার অর্থ ভয়।'
আসলে একটি অপরটির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। প্রত্যেক আশা পোষণকারী ব্যক্তিই তার আশার বস্তুটি হারানোর ভয় করে থাকে। আর আশাহীন ভয় হতাশা ও নৈরাশ্য সৃষ্টি করে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
قُل لِلَّذِينَ آمَنُوا يَغْفِرُوا لِلَّذِينَ لَا يَرْجُوْنَ أَيَّامَ اللَّهِ
“হে নবি, যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে বলে দিন, যারা আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো কঠিন দিন আসার ভয় করে না, তাদের আচরণসমূহ যেন (মুমিনরা) ক্ষমা করে দেয়।”[৩৩৪]
মুফাসসিরগণ এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, 'অর্থাৎ তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে দুঃখ-দুর্দশা আসার ভয় করে না; যেমন তিনি দুঃখ-দুর্দশা ও কঠিন অবস্থার সম্মুখীন করেছিলেন পূর্ববর্তী জাতিদের।' (অর্থাৎ এই আয়াতে يَرْجُوْنَ দ্বারা ভয় করা উদ্দেশ্য নেওয়া হয়েছে।)
৭. আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের নিকট দাসত্বের পরিপূর্ণতা কামনা করেন; বিনম্রতা, বিগলিত অবস্থা, তাওয়াক্কুল, সাহায্য প্রার্থনা, ভয়, আশা, সবর, শোকর, সন্তুষ্টি, তাঁর দিকে ধাবিত হওয়া ইত্যাদির ক্ষেত্রে তিনি বান্দার নিকট পূর্ণ আত্মসমর্পণ চান। আর এ কারণেই তিনি বান্দার জন্য গুনাহ ও পাপে জড়িয়ে পড়া আবশ্যক করে দিয়েছেন। যাতে সে তাওবা করে তার দাসত্বের স্তর পরিপূর্ণ করে নিতে পারে; যা আল্লাহর নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয়। এমনিভাবে ভয় ও আশার মাধ্যমে দাসত্ব পরিপূর্ণ করাও আল্লাহ তাআলার নিকট অনেক পছন্দনীয়।
৮. আশা করার মধ্যে আল্লাহ তাআলার দয়া ও অনুগ্রহের যে অপেক্ষা, পর্যবেক্ষণ ও প্রত্যাশা রয়েছে, তা ব্যক্তির অন্তরকে সবসময় আল্লাহর স্মরণ করা এবং তাঁর নাম ও গুণসমূহের প্রতি খেয়াল রেখে আল্লাহর দিকে মনোযোগী হওয়াকে আবশ্যক করে, অন্তরকে সেই নাম ও গুণাবলির মনোরম বাগানে পৌঁছিয়ে দেয় এবং প্রতিটি নাম ও গুণ থেকে তার করণীয় ও বর্জনীয় অংশ গ্রহণ করতে উৎসাহিত করে।
যেমন পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু যখন আশা থাকে না, আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া লাভের প্রত্যাশা ও অপেক্ষা থাকে না, তখন অন্তর আল্লাহ তা'আলার উত্তম নামসমূহ ও গুণাবলির অর্থ অনুধাবন করতে এবং সেখান থেকে নিজের অংশ গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়।
এমনিভাবে আশার আরও অসংখ্য উপকারিতা ও কল্যাণ রয়েছে, কেবল সেই ব্যক্তিই এই সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত হতে পারে, যে তা অনুসন্ধান করতে চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা করে। আল্লাহ তা'আলাই একমাত্র তাওফীকদাতা।
টিকাঃ
[৩৩১] তিরমিযি, ৩৩৭৩; ইবনু মাজাহ, ৩৮২৭।
[৩৩২] সূরা আ'রাফ, ৭: ১৮০।
[৩৩৩] সূরা নূহ, ৭১: ১৩।
[৩৩৪] সূরা জাসিয়া, ৪৫: ১৪।