📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 মানযিল : বিচ্ছিন্ন হওয়া (اَلتَّبَتُّلُ)

📄 মানযিল : বিচ্ছিন্ন হওয়া (اَلتَّبَتُّلُ)


إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো-বিচ্ছিন্ন হওয়ার মানযিল।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَاذْكُرِ اسْمَ رَبِّكَ وَتَبَتَّلْ إِلَيْهِ تَبْتِيلًا "আপন রবের নাম স্মরণ করতে থাকো এবং সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তাঁর জন্যই হয়ে যাও।”[৩১৭]
تَبَتَّلُ অর্থ : বিচ্ছিন্ন হওয়া। এটি হলো تَبَتَّلَ থেকে বাবুত তাফাউউল-এর মাসদার; যার অর্থ: কর্তন করা, কেটে ফেলা। মারইয়াম-কে اَلْبَتُولُ-ও বলা হতো। কারণ তিনি স্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন (তার কোনো স্বামী ছিল না) এবং তিনি তার সময়কার অন্যান্য নারীদের মতো হওয়া থেকেও বিচ্ছিন্ন ছিলেন। তিনি সম্মান ও মর্যাদার দিক দিয়ে তাদের চেয়ে ঊর্ধ্বে ছিলেন এবং তাদেরকে অতিক্রম করে গিয়েছিলেন।
تَبَتَّلَ ফেয়েলের মাসদার হলো تَبْتِيلٌ, যেমন: اَفْهَمُ (অনুধাবন করা), اَعْلَمُ (শিক্ষা গ্রহণ করা)। কিন্তু কুরআনে (ওপরে বর্ণিত আয়াতে) এটি বাবুত তাফঈলের মাসদার (تَبْتِيلًا) হিসেবে এসেছে, ফেয়েল বাবুত তাফাউউলের আর মাসদার বাবুত তাফঈলের। এভাবে আনার একটি সূক্ষ্ম কারণ রয়েছে। এখানে বাবুত তাফাউউলের ফেয়েল দ্বারা এটা বুঝানো উদ্দেশ্য যে, ধীরে ধীরে কাজ করা, কষ্ট করে কাজ করা, বেশি বেশি এবং পরিপূর্ণরূপে কাজ করা। আর বাবুত তাফঈল থেকে মাসদার এনে অপর আরেকটি অর্থ বুঝানো উদ্দেশ্য; আর তা হলো নিজে আল্লাহর প্রতি ধাবিত হওয়ার সাথে সাথে নিজের নফসকেও ধাবিত করা। যেন বলা হয়েছে, 'আপনি আপনার নফসকে আল্লাহ তাআলার দিকে পরিপূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন করুন এবং আপনি নিজেও তাঁর প্রতি একাগ্রচিত্তে নিবিষ্ট হোন।' এ রকম ব্যবহার কুরআন মাজীদে অনেক রয়েছে। ব্যাপক অর্থ বোঝানোর জন্য এটি হলো সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ করার সর্বোত্তম পদ্ধতি।
القُلُ হলো প্রতিদানপ্রাপ্তির প্রতি লক্ষ না করে নিঃস্বার্থভাবে আল্লাহর দিকে নিমগ্ন হওয়া; কোনো শ্রমিকের মতো না যে, পারিশ্রমিক পেলে কাজ করবে, অন্যথায় করবে না। আবার যখন পারিশ্রমিক পেয়ে যাবে, মালিকের দরজা থেকে সরে পড়বে। প্রকৃত গোলামের অবস্থা এর বিপরীত। কারণ সে তার মনিবের খেদমত করতে থাকে, কোনোকিছু পাওয়ার আশায় নয়; বরং কেবল দাসত্বের দাবিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে। সে কখনো তার মনিবের দরজা ছেড়ে যায় না। তবে পলায়নকারীর কথা ব্যতিক্রম। অনেক সময় পলাতক গোলাম গোলামির মর্যাদা থেকে বের হয়ে যায়; কিন্তু সে কোথাও পূর্ণরূপে স্বাধীনতা পায় না। আসলে বান্দার চূড়ান্ত মর্যাদা রয়েছে কেবল স্বেচ্ছায় ভালোবাসার সাথে তার মালিকের দাসত্বের শৃঙ্খলে প্রবেশ করার মধ্যে, বাধ্য হয়ে বা জোরপূর্বকভাবে প্রবেশ করার মধ্যে নয়।
القُلُ দুটি বিষয়কে একত্রিত করে: ১. পৃথক হয়ে যাওয়া এবং ২. মিলিত হওয়া। এ দুটি ব্যতীত তা বিশুদ্ধ হয় না।
১. পৃথক হয়ে যাওয়ার মানে হচ্ছে: অন্তর নিজের লাভ ও স্বার্থ থেকে বিচ্ছিন্নতা অবলম্বন করবে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো দিকে দৃষ্টি দেওয়া থেকেও অন্তর বিচ্ছিন্ন রাখবে; আল্লাহ তাআলার ভয়ের কারণে বা তাঁর প্রতি আগ্রহের কারণে বা তাঁর দিকে মনোযোগী হয়ে বা এই কথা ভেবে যে, সেগুলো অন্তরকে আল্লাহ থেকে বিমুখ করে দেবে। (এই জন্য নিজের লাভ ও স্বার্থ থেকে বিচ্ছিন্নতা অবলম্বন করবে।)
২. আর মিলিত হওয়ার বিষয়টি তখনই শুদ্ধ হবে, যখন ওপরে বর্ণিত পৃথক হওয়ার বিষয়টি অর্জিত হবে। আর এটি হলো অন্তর আল্লাহর সাথে মিলিত হওয়া, তাঁর দিকে ধাবিত হওয়া, তাঁর প্রতি ভালোবাসা, ভয়, আশা, একাগ্রতা ও তাওয়াক্কুলকে সঙ্গী করে নিজের সত্তাকে তাঁর প্রতিই ধাবিত রাখা।
ا হলো প্রথমে সৃষ্টিজগৎ থেকে পৃথক হয়ে যাওয়া, অতঃপর নিজের নফস থেকে পৃথক হওয়া।
মানুষের সাথে অধিক মেলামেশা ও ঘনিষ্ঠতাকে যে জিনিসটি বিচ্ছিন্ন করে দেয়, তা হলো হাকীকত বা (দুনিয়ার) প্রকৃত অবস্থা প্রত্যক্ষ করা। আর তা হলো এটা দেখা যে, সমস্ত বস্তু আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে, তাঁরই তাওফীকে এবং তাঁর কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার অধীনেই পরিচালিত হচ্ছে। পুরা সৃষ্টিজগতের মধ্যে একটি বস্তুও এমন নেই, যা আল্লাহর দেওয়া শক্তি-সামর্থ্য ব্যতীত নড়াচড়া করে, কিংবা তাঁর অনুমতি ব্যতীত ক্ষতি বা উপকার করে। সুতরাং এই উপলব্ধির পর সৃষ্টিজগতের প্রতি ধাবিত হওয়ার কী অর্থ?
দুটি বিষয়ের মাধ্যমে নিজের নফস থেকে পৃথক হওয়ার বিষয়টি হাসিল হয় :
১. প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণ না করা, এর বিরোধিতা করা এবং নফসকে তা থেকে দূরে রাখা। কারণ প্রবৃত্তির অনুসরণ আল্লাহর প্রতি মগ্ন হওয়ার পথ বন্ধ করে দেয়।
২. প্রবৃত্তির চাহিদার বিরোধিতা করার পর আল্লাহ তাআলার সাথে ঘনিষ্ঠতার প্রফুল্লতা অনুভব করা। রূহের জন্য প্রফুল্লতা ঠিক তেমনই জরুরি, যেমন শরীরের জন্য রূহ জরুরি। রূহের জন্য এই প্রফুল্লতা ও আরাম অর্জিত হয়, যখন সে প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণ করা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। সে সময় আল্লাহর সাথে তার ঘনিষ্ঠতা সুসংগঠিত হয় এবং সে এর সুঘ্রাণ পায়। কারণ নফস আবশ্যকীয়ভাবেই যেকোনো সম্পর্কে জড়াবে। সুতরাং প্রবৃত্তির সাথে যখন তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে, তখন আল্লাহ তাআলার সাথে তার অন্তরঙ্গতা সৃষ্টি হবে এবং তার ওপর সুবাতাস বইতে শুরু করবে, ফলে তাকে তা সুবাসিত করবে এবং তার মাঝে নবজীবনের সঞ্চার ঘটাবে।

টিকাঃ
[৩১৭] সূরা মুযযাম্মিল, ৭৩: ৮।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 মানযিল : আগ্রহী হওয়া (اَلرَّغْبَةُ)

📄 মানযিল : আগ্রহী হওয়া (اَلرَّغْبَةُ)


إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো—আগ্রহী হওয়ার মানযিল।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَيَدْعُوْنَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا "তারা আগ্রহ ও ভীতি সহকারে আমাকে ডাকত।”[৩৩৫]
الرَّغْبَةُ এবং الرَّجَاءُ এর মাঝে পার্থক্য: 'রজা' হচ্ছে আশা করা আর 'রগবত' হচ্ছে অনুসন্ধান করা। সুতরাং আশা করার ফল হলো অনুসন্ধান করা। কারণ কেউ কোনো জিনিস পেতে আশা করলে, তা সন্ধান করে। রগবত ও রজার সম্পর্ক হচ্ছে ভয় ও পলায়ন করার মতো। যেমন কেউ যখন কোনো বস্তুকে ভয় করে, তখন তার থেকে পলায়ন করে, ঠিক তেমনি কেউ যখন কোনোকিছু আশা করে, তখন তার প্রতি আগ্রহী হয় এবং তা পাওয়ার সন্ধান করতে থাকে।
মূলকথা: আশা-আকাঙ্ক্ষাকারী ব্যক্তি অনুসন্ধান করে আর ভীত ব্যক্তি পলায়ন করে।
اَلرَّغْبَةُ হলো অদৃশ্য জিনিসের অনুসন্ধান করা; ফলে এর অর্জন নিশ্চিত নয়। কারণ মুমিন বান্দা জান্নাতের প্রতি আগ্রহী হয়, কিন্তু তাতে প্রবেশ করার ব্যাপারে সে নিশ্চিত নয়। আশা যখন শক্তিশালী হয়, তখন তা অনুসন্ধানে পরিণত হয়।
রগবত বা আগ্রহ তৈরি হয় ইলম থেকে; ফলে তা পরিশ্রম করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং অলসতা করা থেকে পথিককে বাঁচিয়ে রাখে।
এই আগ্রহ ও অনুসন্ধান বাড়তেই থাকে। একপর্যায়ে তা ইহসানের স্তরে উন্নীত হয়; আর তা হলো-
أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ
"আপনি আল্লাহ তাআলার ইবাদাত এমনভাবে করবেন, যেন তাঁকে দেখছেন।”
সুতরাং রাগিব বা অনুসন্ধানকারী ব্যক্তি যে সমস্ত বিপদাপদে পতিত হয়, তার কোনো পরোয়া করে না। তার আগ্রহ-উদ্দীপনাকে (বিপদাপদের কারণে) তাকদীরের দোহাই দিয়ে দমিয়ে রাখা যায় না এবং তার সংকল্প ও উচ্চ হিম্মতে কোনো প্রকার নির্জীবতা স্থান পায় না।

টিকাঃ
[৩৩৫] সূরা আম্বিয়া, ২১: ৯০।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 মানযিল : যত্ন নেওয়া ও সংরক্ষণ করা (اَلرِّعَايَةُ)

📄 মানযিল : যত্ন নেওয়া ও সংরক্ষণ করা (اَلرِّعَايَةُ)


إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো— যত্ন নেওয়া ও সংরক্ষণ করার মানযিল।
এটি হলো আমলের মাধ্যমে ইলমের যত্ন নেওয়া ও সংরক্ষণ করা। ইহসান ও ইখলাসের মাধ্যমে আমলকে সংরক্ষণ করা এবং তা নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখা। আর একতাবদ্ধ হয়ে থাকা ও বিচ্ছিন্নতা থেকে দূরে থাকার মাধ্যমে নিজের অবস্থাকে সংরক্ষণ করা। সুতরাং الرِّعَايَةُ অর্থ হলো যত্ন নেওয়া ও সংরক্ষণ করা।
ইলম ও আমলের তিনটি স্তর রয়েছে: ১. রিওয়ায়াহ (الرِّوَايَةُ): এটি হলো কেবল বর্ণনা করা এবং বর্ণনাকৃত বিষয়কে (অপরের কাছে) বহন করা।
২. দিরায়াহ (الدِّرَايَةُ): এটি হলো মর্ম উপলব্ধি করা।
৩. রিআয়াহ (الرِّعَايَةُ): এটি হলো ইলম অনুযায়ী আমল করা ও ইলমের চাহিদা পূরণ করা।
হাদীস বর্ণনাকারীদের ব্যস্ততা রিওয়ায়াহ নিয়ে, উলামায়ে কেরামের ব্যস্ততা দিরায়াহ নিয়ে আর আরিফ বা মা'রিফাতের অধিকারী ব্যক্তিগণ মগ্ন থাকেন রিআয়াহ নিয়ে।
যারা নিজের আমলের যত্ন নেয় না, যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে না আল্লাহ তাআলা তাদের নিন্দা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ثُمَّ قَفَّيْنَا عَلَى آثَارِهِمْ بِرُسُلِنَا وَقَفَّيْنَا بِعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ وَآتَيْنَاهُ الْإِنْجِيلَ وَجَعَلْنَا فِي قُلُوْبِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ رَأْفَةً وَرَحْمَةً وَرَهْبَانِيَةً ابْتَدَعُوهَا مَا كَتَبْنَاهَا عَلَيْهِمْ إِلَّا ابْتِغَاءَ رِضْوَانِ اللهِ فَمَا رَعَوْهَا حَقَّ رِعَايَتِهَا
“তাদের পরে আমি একে একে আমার রাসূলদের পাঠিয়েছি। তাদের সবার শেষে মারইয়ামের পুত্র ঈসাকে পাঠিয়েছি, তাঁকে ইনজীল দিয়েছি এবং তাঁর অনুসারীদের মনে দয়া ও করুণার সৃষ্টি করেছি। আর বৈরাগ্যবাদ তো তারা নিজেরাই উদ্ভাবন করে নিয়েছে। আমি ওটা তাদের ওপর ফরজ করিনি। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় তারা নিজেরাই এ বিদআত বানিয়ে নিয়েছে। তারপর সেটি যেভাবে মেনে চলা দরকার, সেভাবে মেনে চলেনি।”[৩৩৬]
এই আয়াতে তাদের নিন্দা করা হয়েছে, যারা নিজেদের জন্য অতিরিক্ত আমল আবশ্যক করে নিয়েছে; কিন্তু তা যথাযথভাবে পালন করেনি। কারণ যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ইবাদাতসংক্রান্ত কোনোকিছুকে নিজের ওপর আবশ্যক করে নেয়, যা আল্লাহ তার ওপর আবশ্যক করেননি, তা হলে তার ওপর সেই আমল পরিপূর্ণ করা আবশ্যক হয়ে যায়।
এমনকি যে ব্যক্তি কোনো মুস্তাহাব আমল শুরু করে, তার জন্য তা পূর্ণ করাকে অনেক ফুকাহায়ে কেরাম ওয়াজিব বলে অভিমত দিয়েছেন। যেমন মান্নত করলে আমল পুরা করা আবশ্যক হয়, তেমনি আমল শুরু করার পর তা পূর্ণ করাকে তারা আবশ্যক বলেছেন। এই অভিমত দিয়েছেন ইমাম আবূ হানিফা, ইমাম মালিক এবং একটি বর্ণনা অনুসারে ইমাম আহমাদ। এটির ওপর উলামায়ে কেরামের ইজমা বা ইজমার মতো ঐকমত্য সংঘটিত হয়েছে।
তারা বলেন: আমল শুরু করার কারণে তা পূর্ণ করা ওয়াজিব হওয়া, কথার কারণে তা পূর্ণ করা ওয়াজিব হওয়ার চেয়ে বেশি শক্তিশালী। সুতরাং (কথার মাধ্যমে) মান্নত করার কারণে বান্দা যে আমল নিজের ওপর আবশ্যক করে নেয়, তা যেমন সম্পন্ন করা ওয়াজিব, ঠিক তেমনি আমল শুরু করার দ্বারা বান্দা নিজের ওপর যে আমল আবশ্যক করে নেয়, তা পূর্ণ করাও ওয়াজিব। এই মাসআলার বিস্তারিত আলোচনা করা এখানে উদ্দেশ্য নয়।
এই আলোচনার মূলকথা হলো: আল্লাহ তাআলা সেই ব্যক্তির নিন্দা করেছেন, আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য আল্লাহ আদেশ করেননি এমন কোনো ইবাদাতকে যে নিজের ওপর আবশ্যক করে নেয়, তারপর তা যথাযথভাবে পালন করে না এবং তা সংরক্ষণ করে না। সুতরাং আল্লাহ তাআলা যে সমস্ত আমলের আদেশ করেছেন, অনুমতি দিয়েছেন এবং যেগুলো পালন করতে উৎসাহিত করেছেন, সেগুলো যে ব্যক্তি যথার্থভাবে পালন করে না এবং যত্ন নেয় না, সেই ব্যক্তির ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার আচরণ কেমন হবে?!
আমলের যত্ন নেওয়া ও সংরক্ষণ করার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: আমলকে অল্প মনে করে যথাযথভাবে তা আদায় করা এবং নিজের আখিরাতের সঞ্চয়কে বৃদ্ধি করা, আমলের প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে একাগ্রচিত্তে তা পালন করতে থাকা এবং ইলম অনুসারে আমল করা। শুধু ভালো লাগার ওপর ভিত্তি করে আমল করা যাবে না, শারীআহ সম্মত হলো কি না তা খেয়াল রাখা।
আমল যথাযথভাবে আদায় করার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: দুই প্রান্তিকতা থেকে মুক্ত থাকা : ১. শিথিলতাও না করা আবার ২. শারীআত নির্ধারিত সীমা, গুণাবলি, শর্ত, সময় ইত্যাদির ক্ষেত্রে বাড়াবাড়িও না করা।
আমলকে অল্প মনে করার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: বান্দার চোখে তা তুচ্ছ ভাবা ও বেশি মনে না করা। আসলে আল্লাহ তাআলার মর্যাদা, সম্মান ও বান্দার ওপর তাঁর দাসত্ব পাওয়ার যে অধিকার, তা কোনো বান্দা পরিপূর্ণভাবে আদায় করতে সক্ষম নয়। আর কারও জন্য এটা সমীচীন নয় যে, সে নিজের আমলের ব্যাপারে সন্তুষ্ট ও খুশি হয়ে যাবে।
কেউ কেউ বলেছেন, বান্দার প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টির আলামত হলো: বান্দার নিজের নফসের ওপর অসন্তুষ্ট থাকা। আর আমল কবুল হওয়ার আলামত হলো: আমলকে তুচ্ছ মনে করা, অল্প ভাবা এবং বান্দার অন্তরে তা ক্ষুদ্র বলে উপলব্ধি হওয়া। আসলে আরিফ বা আল্লাহর পরিচয়প্রাপ্ত ব্যক্তিরা নেককাজ করার পরপরই (তা আল্লাহর শান মোতাবিক না হওয়ার আশঙ্কায়) আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। রাসূলুল্লাহ যখন সালাতের সালাম ফেরাতেন, তখন তিনবার ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। [৩০৭] আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের হাজ্জ আদায় করার পর ক্ষমা প্রার্থনা করার আদেশ দিয়েছেন।[৩৩৮] শেষরাতে সালাত আদায়ের পর বান্দার ইস্তিগফার পাঠ করাকে তিনি প্রশংসা করেছেন।[৩৩৯]
আসলে যে ব্যক্তি তার রবের দেওয়া নিয়ামাত প্রত্যক্ষ করে এবং নিজের আমলের পরিমাণ ও তার দোষত্রুটি সম্পর্কে ধারণা রাখে, সেই ব্যক্তি তার রবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা ব্যতীত এবং নিজেকে ও নিজের আমলকে তুচ্ছ মনে করা ছাড়া আর কোনো উপায় দেখে না।
আমলসমূহ পালন করতে থাকার অর্থ হলো: সেগুলোর হকসহ পরিপূর্ণভাবে আদায় করা এবং সেগুলো নিয়মিতভাবে পালন করা।
আমলের প্রতি দৃষ্টি না দেওয়ার অর্থ হলো: আমলের দিকে মনোযোগ না দেওয়া, বারবার গণনা না করা এবং স্মরণ না করা; এগুলোর মাধ্যমে অহংকার ও আত্মগর্ব আসার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ এর দ্বারা ব্যক্তি আল্লাহর দৃষ্টি থেকে সরে যায় এবং তার সমস্ত আমল নষ্ট হয়ে যায়।
ইলম অনুসারে আমল করার অর্থ হলো: ইলমের দাবি অনুসারে আমল করা; যা নুবুওয়াতের উৎস থেকে গৃহীত। একমাত্র আল্লাহ তাআলার প্রতি একনিষ্ঠ হয়ে, তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এবং তাঁকে রাজি-খুশি করার জন্যই আমল করা। মানুষের নিকট উত্তম ও সুসজ্জিত হওয়ার উদ্দেশ্যে নয়।

টিকাঃ
[৩৩৬] সূরা হাদীদ, ৫৭:২৭।
[৩০৭] মুসলিম, ৫৯১; আবূ দাউদ, ১৫১৩।
[৩৩৮] আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ﴿ثُمَّ أَفِيضُوا مِنْ حَيْثُ أَفَاضَ النَّاسُ وَاسْتَغْفِرُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ﴾ "তারপর যেখান থেকে আর সবাই ফিরে আসে তোমরাও সেখান থেকে ফিরে এসো এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও। নিঃসন্দেহে তিনি ক্ষমাশীল ও করুণাময়।" (সূরা বাকারা, ২: ১৯৯)
[৩৩৯] আল্লাহ তাআলা বলেন, ﴿وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ﴾ "রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত।" (সূরা যারিয়াত, ৫১: ১৮)

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 মানযিল : গভীর ধ্যানে মগ্ন হওয়া (اَلْمُرَاقَبَةُ)

📄 মানযিল : গভীর ধ্যানে মগ্ন হওয়া (اَلْمُرَاقَبَةُ)


إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো- (আল্লাহ তাআলা সবকিছু দেখছেন, এই চিন্তার প্রতি) গভীর ধ্যানে মগ্ন হওয়ার মানযিল।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي أَنْفُسِكُمْ فَاحْذَرُوهُ "আর জেনে রেখো, তোমাদের মনে যে কথা রয়েছে, আল্লাহর তা জানা আছে। কাজেই তাঁকে ভয় করতে থাকো।” [৩৪0]
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَكَانَ اللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ رَقِيبًا “আল্লাহ সবকিছু দেখাশুনা করছেন।” [৩৪১]
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ “তোমরা যেখানেই থাকো, তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন।"[৩৪২]
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
أَلَمْ يَعْلَمُ بِأَنَّ اللَّهَ يَرَى "সে কি জানে না, আল্লাহ দেখছেন?" [৩৪১]
এ বিষয়ে এ রকম আরও অসংখ্য আয়াত রয়েছে।
হাদীসে জিবরীলে এসেছে, জিবরীল নবী -কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, 'ইহসান কী?' তখন নবি জবাবে বলেছিলেন, أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ فَإِنْ لَّمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ
"ইহসান হলো: তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদাত করবে যেন তাঁকে দেখছো, যদি তুমি তাঁকে না দেখো, তা হলে (নিশ্চিতভাবে এই উপলব্ধি করবে যে,) তিনি তোমাকে দেখছেন।" [৩৪২]
الْمُراقبة হলো: সবসময় বান্দার এই ইলম ও বিশ্বাস থাকা যে, আল্লাহ তাআলা তার প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে অবগত আছেন। দিন ও রাতের প্রতিটি মুহূর্ত এই জ্ঞান ও বিশ্বাস লালন করার নামই হচ্ছে 'মুরাকাবা'। এটি হলো প্রতিটি ওয়াক্তে, প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি শ্বাসপ্রশ্বাসে এবং প্রতিটি চোখের পলকে আল্লাহ তাআলা বান্দার পর্যবেক্ষক, তার প্রতি দৃষ্টিপাতকারী, তার কথার শ্রবণকারী, তার সমস্ত আমল সম্পর্কে জ্ঞাত—এই ইলমেরই ফল।
মুরাকাবা থেকে গাফিল ও অসতর্ক ব্যক্তিরা আল্লাহ-অভিমুখী ব্যক্তিদের প্রাথমিক অবস্থা থেকেই বহুদূরে অবস্থান করে। তাহলে আল্লাহকে-চিনতে-ইচ্ছুক-ব্যক্তিদের 'হাল' বা বিশেষ অবস্থা থেকে তারা কতদূরে? আর আরিফ বা আল্লাহর মা'রিফাতাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অবস্থার সাথে তো তাদের কথা চিন্তাও করা যায় না!
জারীরি বলেছেন, 'আমাদের এই বিষয়টি দুইটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত: ১. আপনার নফসকে আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে গভীর ধ্যানে নিমগ্ন করা এবং ২. আপনার বাহ্যিক কাজকর্ম ইলমের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হওয়া।।
কেউ কেউ বলেছেন, 'যে ব্যক্তি তার অন্তরের চিন্তাভাবনার ব্যাপারে আল্লাহর প্রতি গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হয়, তার বাহ্যিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কাজকর্মের ক্ষতি থেকে আল্লাহ তাকে বাঁচিয়ে দেন।'
তাদের কাউকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, 'রাখাল কখন বকরিপালকে তার লাঠির দ্বারা অনিরাপদ বিচরণক্ষেত্র থেকে তাড়িয়ে নেবে?' তিনি জবাব দিয়েছিলেন, 'যখন সে জানবে, তার ওপরে একজন পর্যবেক্ষণকারী রয়েছে।[৩৪৬]
জুনাইদ বাগদাদি বলেছেন, 'যে ব্যক্তির মুরাকাবা বা গভীর ধ্যানে মগ্ন হওয়ার মানযিল হাসিল হয়, সে তার রবের (সান্নিধ্য থেকে) এক মুহূর্ত বঞ্চিত থাকারও ভয় করে; অন্য কিছুর ভয় করে না।'[৩৪৭]
যুন-নূন মিসরি বলেছেন, 'মুরাকাবার আলামত হলো :
১. আল্লাহ তাআলা যা অবতীর্ণ করেছেন, সবকিছুর ওপর সেগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া,
২. আল্লাহ তাআলা যেসব বিষয়কে সম্মান দিতে বলেছেন, সেগুলোকে সম্মান দেওয়া আর
৩. আল্লাহ তাআলা যেগুলোকে ছোটো বলে গণ্য করেছেন, সেগুলোকে ছোটোই বিবেচনা করা।'[৩৪৮]
কেউ কেউ বলেছেন, 'আশা আপনাকে আনুগত্য করতে অনুপ্রেরণা দান করবে, ভয় আপনাকে গুনাহ থেকে দূরে রাখবে আর গভীর ধ্যানে মগ্ন হওয়া আপনাকে বস্তুর হাকীকত বা প্রকৃত অবস্থা প্রত্যক্ষ করার রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেবে।'[৩৪৯]
বলা হয়েছে, 'মুরাকাবা হলো প্রতিটি চিন্তা ও পদক্ষেপে সত্যের মানদণ্ডে অন্তরকে যাচাই করা এবং সত্যের খেয়াল রাখা। [৩৫০]
ইবরাহীম খাওয়াস বলেছেন, 'মুরাকাবা হলো বান্দার বাহির ও ভেতর একমাত্র আল্লাহর জন্য আন্তরিক রাখা। [৩৫১]
বলা হয়েছে, 'আল্লাহর পথে চলতে গিয়ে মানুষ নিজের নফসের ওপর যা আবশ্যক করে নেয়, তার মধ্যে সর্বোত্তম হলো: নিজের হিসাব গ্রহণ করা, গভীর ধ্যানে মগ্ন হওয়া এবং আমলকে ইলম অনুযায়ী পরিচালিত করা।'
আবূ হাফস আবূ উসমান নিশাপুরি-কে বলেছেন, 'যখন তুমি মানুষের সামনে (উপদেশ দেওয়ার জন্য) বসবে, তখন নিজের কল্ব ও নফসকেই উপদেশ দেওয়ার নিয়ত রাখবে। আর তোমার কাছে লোকজনের সমবেত হওয়া যেন তোমাকে ধোঁকায় না ফেলে দেয়। কারণ তারা তো তোমার বাইরের অবস্থা দেখে আর আল্লাহ দেখেন তোমার ভেতরের অবস্থা।'[৩৫২]
আল্লাহর-পথের-অভিজ্ঞ-ব্যক্তিগণ একমত পোষণ করেছেন যে, বাহ্যিক কাজকম সুরক্ষিত থাকার মাধ্যম হলো: আল্লাহকে নিয়ে অন্তরে গভীর ধ্যানে মগ্ন হওয়া। সুতরাং যে ব্যক্তি তার গোপন অবস্থাতেও আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকবে, তার বাহ্যিক কাজকর্মের অনিষ্টতা থেকে প্রকাশ্য ও গোপন সর্বাবস্থায় আল্লাহ তাকে হেফাজত করবেন।
মুরাকাবা হলো : الرِّقِيبُ )পর্যবেক্ষণকারী(, الْحَفِيظ )হেফাজতকারী(, الْعَلِيمُ )সর্বজ্ঞানী(, اَلسَّمِيعُ )সর্বশ্রোতা(, اَلْبَصِيرُ )সর্বদ্রষ্টা) আল্লাহ তাআলার এই নামগুলোর উত্তমরূপে দাসত্ব করা। যে ব্যক্তি এই নামগুলোর অর্থ হৃদয়ঙ্গম করবে, এগুলোর দাবি অনুযায়ী ইবাদাত করবে, কেবল তারই মুরাকাবা বা গভীর ধ্যানে মগ্ন হওয়ার মানযিল অর্জন হবে। আল্লাহ তাআলাই অধিক জানেন।

টিকাঃ
[৩৪০] সূরা বাকারা, ২: ২৩৫।
[৩৪১] সূরা আহযাব, ৩৩: ৫২।
[৩৪২] সূরা হাদীদ, ৫৭:৪।
[৩৪১] সূরা আলাক, ৯৬ : ১৪।
[৩৪২] বুখারি, ৫০; মুসলিম, ৮।
[৩৪৫] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ১/৩৩১।
[৩৪৬] বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৮৮০।
[৩৪৭] তাজুদ্দীন ইবনুস সুবকি, তবাকাতুশ-শাফিয়িয়্যাতিল কুবরা, ২/২৬৫।
[৩৪৮] বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ১৫২৮।
[৩৪৯] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ১/৩৩১।
[৩৫০] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ১/৩৩১।
[৩৫১] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ১/৩৩১।
[৩৫২] ইমাম গাযালি, ইহইয়াউ উলূমিদ দ্বীন, ৪/৩৯৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00