📄 দুনিয়াবিমুখতার প্রকৃত মর্ম এবং এ সম্পর্কিত বিষয়াদি
আল্লাহর মা'রিফাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ একমত পোষণ করেছেন যে, যুহদ বা দুনিয়াবিমুখতা হলো দুনিয়ার আবাস থেকে আখিরাতের আবাসের দিকে আত্মিক সফর। এ সম্পর্কে পূর্ববর্তীগণ অনেক কিতাব রচনা করেছেন; যেমন: আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক, আহমাদ ইবনু হাম্বাল, ওয়াকী, হান্নাদ ইবনুস সারি -সহ আরও অনেকেই। (সকলেই নিজ নিজ রচনার নাম দিয়েছেন 'কিতাবুয যুহদ'।)
যুহদ সম্পর্কিত ছয়টি বিষয় রয়েছে, যেগুলো থেকে বিমুখতা প্রদর্শন না করা পর্যন্ত কেউ যুহদ বা দুনিয়াবিমুখতার গুণে গুণান্বিত হতে পারবে না। সেগুলো হলো :
১. সম্পদ, ২. (সুন্দর) আকৃতি, ৩. কর্তৃত্ব, ৪. মানুষজন, ৫. নফস এবং ৬. আল্লাহ ছাড়া বাকি সবকিছু।
এর দ্বারা উদ্দেশ্য এটা নয় যে, সবকিছু একেবারে ছেড়ে দেবে। কারণ সুলাইমান ও দাউদ ছিলেন তাদের সময়কার সবচেয়ে বড়ো দুনিয়াবিমুখ। অথচ তাদের প্রাচুর্য ছিল অনেক বেশি, স্ত্রী, দাস-দাসী এবং রাজত্বও ছিল ব্যাপক। আমাদের নবি ছিলেন সমস্ত মানুষের চেয়ে বেশি যাহিদ বা দুনিয়াবিমুখ; অথচ তাঁরও ছিল নয়জন স্ত্রী। আলি ইবনু আবী তালিব, আবদুর রহমান ইবনু আউফ, যুবাইর ইবনুল আওয়াম ও উসমান ইবনু আফফান ছিলেন দুনিয়াবিমুখদের অন্যতম; এর সাথে সাথে তাদের বেশ অর্থসম্পদও ছিল। হাসান ইবনু আলি খাঁটি যাহিদদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, এর পাশাপাশি তিনি তার স্ত্রীদের প্রচণ্ড ভালোবাসতেন এবং আদর করতেন আর তিনি ধনাঢ্যদেরও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক-এর অনেক ধনসম্পদ থাকা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন দুনিয়ার প্রতি অনাগ্রহী। এমনিভাবে লাইস ইবনু সা'দ ও সুফইয়ান সাওরি ছিলেন দুনিয়াবিমুখদের ইমাম। সুফইয়ান সাওরি -এর অনেক ধনসম্পদ ছিল, তিনি বলতেন, 'এগুলো যদি না থাকত, তা হলে তারা (রাজা-বাদশাহরা) আমাদেরকে রুমাল হিসেবে ব্যবহার করত। অর্থাৎ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত। [২৯৭]
যুহদ সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তার মধ্যে সর্বোত্তম হলো হাসান বাসরি -এর কথা। তিনি বলেছেন, 'হালাল বস্তুকে নিজের ওপর হারাম করে নেওয়া এবং বেশি বেশি সম্পদ ব্যয় করার নাম দুনিয়াবিমুখতা নয়; বরং তা হলো আপনার হাতে যা রয়েছে, তার তুলনায় আল্লাহর হাতে যা রয়েছে, তার ওপর বেশি নির্ভরশীল হওয়া, আপনার নিকট বিপদাপদ না আসার চেয়ে আপনি বিপদাপদের সম্মুখীন হয়ে যে সাওয়াবের অধিকারী হবেন, তার প্রতি বেশি আগ্রহী হওয়া।'[২৯৮]
এটি হলো দুনিয়াবিমুখতা সম্পর্কে সবচেয়ে ব্যাপক ও উত্তম কথা।
টিকাঃ
[২৯৭] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৬/৩৮১।
[২৯৮] ইবনুল আসীর, জামিউল উসূল, ২৭৭০।
📄 দুনিয়াবিমুখতা অর্জন করার পদ্ধতি
দুনিয়াবিমুখতার সূচনা করতে হবে হারাম ছাড়ার পর সন্দেহযুক্ত কাজকর্ম পরিত্যাগ করার মাধ্যমে; যা বান্দার মনে সংশয় সৃষ্টি করে যে, এটি হালাল নাকি হারাম?
যেমন নু'মান ইবনু বাশির থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, নবি বলেছেন, إِنَّ الْحَلَالَ بَيِّنٌ وَإِنَّ الْحَرَامَ بَيِّنٌ وَبَيْنَهُمَا مُشْتَبِهَاتٌ لَا يَعْلَمُهُنَّ كَثِيرٌ مِّنَ النَّاسِ فَمَنِ اتَّقَى الشُّبُهَاتِ اسْتَبْرَأَ لِدِينِهِ وَعِرْضِهِ وَمَنْ وَقَعَ فِي الشُّبُهَاتِ وَقَعَ فِي الْحَرَامِ كَالرَّاعِي يَرْعَى حَوْلَ الْحِمَى يُوْشِكُ أَنْ يَرْتَعَ فِيْهِ أَلَا وَإِنَّ لِكُلِّ مَلِكٍ حِمِّى أَلَا وَإِنَّ حِمَى اللهِ مَحَارِمُهُ أَلَا وَإِنَّ فِي الجَسَدِ مُضْغَةً إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الجَسَدُ كُلُّهُ وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الجَسَدُ كُلُّهُ أَلَا وَهِيَ الْقَلْبُ
"নিশ্চয় হালাল সুস্পষ্ট, হারামও সুস্পষ্ট, আর এ দুয়ের মাঝে রয়েছে কিছু সন্দেহযুক্ত বিষয়, যেগুলো অনেক মানুষই জানে না। যে ব্যক্তি সন্দেহযুক্ত বিষয়সমূহে লিপ্ত হওয়া থেকে বেঁচে থাকে, সে তার দ্বীন ও সম্মানকে অটুট রাখে, আর যে ব্যক্তি সন্দেহযুক্ত বিষয়সমূহে লিপ্ত হয়, সে হারামে জড়িয়ে যায়। এর উদাহরণ হলো, যেমন: কোনো রাখাল কারও সংরক্ষিত চারণভূমির আশপাশে পশু চরায়, আশঙ্কা রয়েছে যে, সে তার ভেতরে ঢুকে পড়বে। মনে রেখো, প্রত্যেক রাজারই একটি সংরক্ষিত এলাকা থাকে। আর মনে রেখো, আল্লাহর সংরক্ষিত এলাকা হলো তার হারামকৃত বিষয়গুলো। মনে রেখো, দেহের মধ্যে এক টুকরো গোশত রয়েছে; যা সংশোধিত হলে পুরো দেহই সংশোধিত হয়ে যায়, আর যা নষ্ট হয়ে গেলে পুরো দেহই নষ্ট হয়ে যায়। মনে রেখো, সেটা হলো কলব বা অন্তর।”[২৯৯]
আসলে সন্দেহযুক্ত বিষয়াদি হলো হালাল ও হারামের মাঝে ভিন্ন একটি জগৎ।
এরপর প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার, পানীয়, পোশাক-আশাক, ঘরবাড়ি, বিবাহ-শাদী ইত্যাদি বিষয় থেকে বিমুখ হওয়া, আস্তে আস্তে এগুলোও পরিত্যাগ করা; এর মাধ্যমে যুহ্দ বা দুনিয়াবিমুখতা অর্জন করা যায়।
টিকাঃ
[২৯৯] বুখারি, ৫২; মুসলিম, ১৫৯৯।