📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 একাগ্রতা বা খুশুর পরিচয়

📄 একাগ্রতা বা খুশুর পরিচয়


আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ "ঈমানদারদের জন্য কি সে সময় আসেনি যে, আল্লাহর স্মরণ এবং যে সত্য অবর্তীর্ণ হয়েছে তার সামনে তাদের অন্তর বিগলিত হবে?”[২৫৩]
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ বলেছেন, 'আমাদের ইসলাম গ্রহণ করা এবং এই আয়াত দ্বারা আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তিরস্কার করার মাঝে ব্যবধান ছিল চার বছর।'[২৫৪]
ইবনু আব্বাস বলেছেন, 'আল্লাহ তাআলা মুমিনদের অন্তরকে অবকাশ দিয়েছিলেন, কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার তেরো বছরের মাথায় তাদেরকে তিরস্কৃত করেছেন।'[২৫৫]
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُوْنَ الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُوْنَ )
“মুমিনগণ সফলকাম হয়ে গেছে, যারা নিজেদের সালাতে একাগ্রচিত্ত থাকে।”[২৫৬]
الخُمُوعُ-এর মূল শাব্দিক অর্থ হলো: নিচু হওয়া, বশ্যতা স্বীকার করা ও স্থির হওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَخَشَعَتِ الْأَصْوَاتُ لِلرَّحْمَنِ فَلَا تَسْمَعُ إِلَّا هَمْسًا )
“দয়াময় আল্লাহর ভয়ে সব আওয়াজ ক্ষীণ হয়ে যাবে। তখন মৃদুগুঞ্জন ব্যতীত তুমি আর কিছুই শুনবে না।”[২৫৭]
অর্থাৎ সকল আওয়াজ স্থির, স্তব্ধ ও নিচু হয়ে যাবে। এই অর্থ থেকেই জমিনের বিশেষণরূপে 'খুশু' শব্দটি ব্যবহৃত হয়। তখন এর অর্থ হয়: জমিন শুকিয়ে যাওয়া, নিচু হওয়া, উদ্ভিদ ও তৃণ দ্বারা উঁচু না হওয়া। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنَّكَ تَرَى الْأَرْضَ خَاشِعَةً فَإِذَا أَنْزَلْنَا عَلَيْهَا الْمَاءَ اهْتَزَّتْ وَرَبَتْ
“আর এটিও আল্লাহর নিদর্শনসমূহের একটি যে, তোমরা দেখতে পাও ভূমি শুষ্ক-শস্যহীন পড়ে আছে। অতঃপর আমি যখন তার ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করি, তখন তা শস্য-শ্যামল হয় এবং বেড়ে ওঠে।”[২৫৮]
الخُمُوعُ হলো : অন্তর আল্লাহ তাআলার সামনে একাগ্র ও বিনয়ী হয়ে অবস্থান করবে এবং তাঁর ওপরেই জমে থাকবে।
কেউ কেউ বলেছেন, 'খুশু হলো হককে মেনে নেওয়া। এটি হলো খুশুর অপরিহার্য অনুষঙ্গ। সুতরাং এর একটি আলামত হচ্ছে: বান্দার সাথে যখন কোনো বিষয় নিয়ে বিতর্ক হয়, অতঃপর তার সামনে যখন সত্য পেশ করা হয়, তখন সে তা মেনে নেয়।'
কেউ কেউ বলেছেন, 'খুশু হলো: প্রবৃত্তির চাহিদার আগুনকে নিভিয়ে দেওয়া, বুকের ধোঁয়াশাকে দূর করা এবং অন্তরে (আল্লাহর) সম্মান ও শ্রদ্ধার নূর প্রজ্বলিত করা।'
জুনাইদ বাগদাদি বলেন, 'খুশু হলো: আল্লামুল গুয়ূব (অদৃশ্যের মহাজ্ঞানী) আল্লাহর সামনে অন্তরকে বিনয়ী করা।[২৫৯]
আল্লাহর মা'রিফাতের অধিকারী সকল ব্যক্তিরা একমত হয়েছেন যে, খুশু বা একাগ্রতার স্থান হলো অন্তর আর এর ফলাফল প্রকাশ পায় বাহ্যিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গে।
নবি বলেন, التَّقْوَى هَاهُنَا "তাকওয়া বা আল্লাহর ভয় এখানে রয়েছে।” একথাটি তিনি তিনবার বলেছেন এবং নিজের বুকের দিকে ইশারা করেছেন।[২৬০]
কোনো একজন আরিফ বা আল্লাহ-সম্পর্কে-গভীর-প্রজ্ঞার অধিকারী ব্যক্তি বলেছেন, 'বাইরের উত্তম আচরণ, ভেতর পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর হওয়ার শিরোনাম।'
তাদের কেউ কোনো একব্যক্তিকে দেখতে পান, সে তার দুই কাঁধ ও শরীর নিচু করে চলাফেরা করছে। তখন তিনি তাকে ডেকে বলেন, 'হে অমুক, একাগ্রতা ও বিনম্রতা এখানে থাকে।' এই কথা বলার সময় তিনি তার বুকের দিকে ইশারা করেন। (তারপর বলেন,) 'ওখানে নয়'। এটি বলার সময় তিনি তার দুই কাঁধের দিকে ইশারা করেন।
আবুদ দারদা বলেন, 'আমি আল্লাহর কাছে নিফাক মিশ্রিত একাগ্রতা থেকে আশ্রয় চাই।' তাকে প্রশ্ন করা হলো, 'নিফাক মিশ্রিত একাগ্রতা কী?' তিনি জবাব দিলেন, 'তুমি দেখবে বাহ্যিকভাবে শরীর একাগ্র ও বিনম্র; কিন্তু অন্তর থাকবে আল্লাহ থেকে অনেক দূরে।' [২৬১]
উমর ইবনুল খাত্তাব এক ব্যক্তিকে দেখলেন যে সালাতে তার গর্দানকে নিচু করে রেখেছে। তখন তিনি তাকে বললেন, 'হে গর্দানওয়ালা, গর্দান উঁচু করো। একাগ্রতা গর্দানের মধ্যে নেই, একাগ্রতা রয়েছে অন্তরে।' [২৬২]
আয়িশা দেখেন কয়েকজন যুবক খুব আস্তে আস্তে অসুস্থদের মতো হাঁটছে। তখন তিনি তার সাথিসঙ্গীদের জিজ্ঞাসা করেন, 'এরা কারা?' তারা উত্তর দেন, 'ইবাদাতগুজার একটি দল।' প্রতিউত্তরে তিনি বলেন, 'উমর ইবনুল খাত্তাব যখন হাঁটতেন, খুব দ্রুত হাঁটতেন; যখন কথা বলতেন, সবাইকে শুনিয়ে বলতেন; যখন আঘাত করতেন, ব্যথা পাইয়ে দিতেন আর যখন খাবার খাওয়াতেন, পরিতৃপ্ত করতেন। আসলে তিনি ছিলেন প্রকৃত ইবাদাতগুজার।'
ফুযাইল ইবনু ইয়ায বলেছেন, 'এটা অপছন্দনীয় যে, কেউ তার অন্তরে যতটুকু খুশুখুজু রয়েছে, বাইরে তার চেয়েও বেশি প্রকাশ করে।' [২৬৩]
হুযাইফা বলেছেন, 'তোমাদের দ্বীন থেকে সর্বপ্রথম তোমরা যা হারিয়েছ, তা হলো একাগ্রতা। আর সর্বশেষ যা হারাবে, তা হলো সালাত। অনেক সালাত আদায়কারী রয়েছে, যার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই। অবস্থা এ রকম দাঁড়িয়েছে যে, তুমি জামাআতওয়ালা একটি মাসজিদে প্রবেশ করবে, কিন্তু তাদের মধ্যে একজনকেও একাগ্র ও খুশুখুজুর অধিকারী পাবে না।' [২৬৪]
সাহল বলেছেন, 'যার অন্তরে একাগ্রতা থাকবে, শয়তান তার কাছে যেতে পারবে না।' [২৬৫]

টিকাঃ
[২৫৩] সূরা হাদীদ, ৫৭: ১৬।
[২৫৪] মুসলিম, ৩০২৯১।
[২৫৫] কুরতুবি, তাফসীর, ১৭/২৪৯।
[২৫৬] সূরা মুমিনূন, ২৩: ১-২।
[২৫৭] সূরা ত্ব-হা, ২০: ১০৮।
[২৫৮] সূরা ফুসসিলাত, ৪১: ৩৯।
[২৫৯] তাজুদ্দীন ইবনুস সুবকি, তবাকাতুশ-শাফিয়িয়্যাতিল কুবরা, ২/২৬৪।
[২৬০] বুখারি, ৫১৪৩; মুসলিম, ২৫৬৩।
[২৬১] আহমাদ ইবনু হাম্বাল, আয-যুহদ, ৭৬২; বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৬৫৬৭।
[২৬২] শামসুদ্দীন যাহাবি, আল-কাবায়ির, ১৪৪।
[২৬৩] আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ৩/২৭৭।
[২৬৪] আহমাদ, আয-যুহদ, ১০০৩।
[২৬৫] সা'লাবি, তাফসীর, ৪/৯৯।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 সালাতে একাগ্রতা

📄 সালাতে একাগ্রতা


যদি প্রশ্ন করা হয়: সেই ব্যক্তির সালাতের ব্যাপারে আপনারা কী বলেন, সালাতে যার কোনো একাগ্রতা থাকে না, তা কি গ্রহণ করা হবে নাকি হবে না?
উত্তরে বলা হবে: সাওয়াবের ক্ষেত্রে কেবল ততটুকুই গণ্য হবে, যতটুকু সে উপলব্ধি করবে এবং যে পরিমাণ তার রবের প্রতি একাগ্র থাকবে।
ইবনু আব্বাস বলেছেন, 'সালাতে তোমার অংশ কেবল ততটুকুই, যতটুকু তুমি অনুধাবন করো।' [২৬৬]
আম্মার ইবনু ইয়াসীর থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল বলেছেন,
إِنَّ الرَّجُلَ لَيَنْصَرِفُ وَمَا كُتِبَ لَهُ إِلَّا عُشْرُ صَلَاتِهِ تُسْعُهَا ثُمُنْهَا سُبْعُهَا سُدُسُهَا خُمْسُهَا رُبُعُهَا ثُلُثُهَا نِصْفُهَا
“মানুষ (সালাত আদায় করে) ফিরে যায়, অথচ তাদের (কারও কারও) জন্য লেখা হয়—সাওয়াবের দশ ভাগের এক ভাগ, নয় ভাগের এক ভাগ, আট ভাগের এক ভাগ, সাত ভাগের এক ভাগ, ছয় ভাগের এক ভাগ, পাঁচ ভাগের এক ভাগ, চার ভাগের এক ভাগ, তিন ভাগের একভাগ, (আর কারও জন্য) অর্ধেক।”[২৬৭]
আল্লাহ তাআলা সালাতে একাগ্র থাকার সাথে সালাত আদায়কারীদের সফলতাকে সংযুক্ত করে উল্লেখ করেছেন। ফলে তা এটাই প্রমাণ করে যে, যে ব্যক্তি সালাতে একাগ্র থাকে না, সে সফল ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। যদি এর মাধ্যমে সে সাওয়াবের অধিকারী হতো, তা হলে অবশ্যই সে সফলদের দলভুক্ত হতো। (সুতরাং খুশুখুজু বা একাগ্রতা না থাকলে সাওয়াব পাওয়া যায় না।)
আর দুনিয়াবী হুকুম-আহকামের ক্ষেত্রে এবং পুনরায় আদায় করা না-করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হচ্ছে: সালাতে অধিকাংশ সময় যদি বান্দার একাগ্রতা থাকে, তা হলে সর্বসম্মতিক্রমে তা গ্রহণযোগ্য হিসেবে গণ্য হবে। সালাতের পর বিভিন্ন তাসবীহ, তাহলীল, যিক্-আযকার, দুআ, সুন্নাত ও নফল সালাত ইত্যাদির মাধ্যমে যে ঘাটতি ছিল, তা পূরণ হবে বলে আশা করা যায়।
আর যদি অধিকাংশ সময় সালাতে তার একাগ্রতা না থাকে এবং তার অন্তর সালাতে উপস্থিত না থাকে, সে ক্ষেত্রে উলামায়ে কেরাম ইখতিলাফ করেছেন যে, তার ওপর পুনরায় সালাত আদায় করা ওয়াজিব কি না?
হাম্বালি মাযহাবের আবূ আবদিল্লাহ ইবনু হামিদ ইআদা করা বা পুনরায় আদায় করা ওয়াজিব হওয়ার মত দিয়েছেন। ইমাম আবু হামিদ গাযালি তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ইহইয়াউ উলূমিদ দ্বীন’-কিতাবে তাকে সমর্থন করেছেন।[২৬৮]
তারা দলীল হিসেবে উল্লেখ করেছেন যে, সেটি এমন সালাত, যার ওপর কোনো সাওয়াব দেওয়া হবে না এবং তা সফলতাকেও অন্তর্ভুক্ত করে না। সুতরাং সে এই সালাতের মাধ্যমে দায়িত্বমুক্ত হতে পারবে না এবং তার ওপর থেকে কাযা রহিতও হবে না; যেমন: লোকদেখানো সালাত।
তারা বলেন: আরেকটি কারণ হলো, একাগ্রতা ও উপলব্ধি করা হলো সালাতের রূহ, উদ্দেশ্য ও সারাংশ। সুতরাং সেই সালাতকে কীভাবে গণনায় ধরা হবে, যার রূহ ও সারাংশ অনুপস্থিত, অবশিষ্ট রয়েছে কেবল বাহ্যিক অংশ ও অবয়ব?
তারা বলেন : বান্দা যদি সালাতের ওয়াজিবসমূহের মধ্য থেকে কোনো একটি ওয়াজিব ইচ্ছাকৃতভাবে পরিত্যাগ করে, তা হলে তা সালাতকে বাতিল করে দেয়। এর উদাহরণ হলো: সালাতের অংশসমূহের মধ্য থেকে একটি অংশ পরিত্যাগ করা, কাফফারা আদায় করার জন্য যে গোলাম আযাদ করা হয়; তার অঙ্গসমূহের মধ্য থেকে একটি অঙ্গ না থাকার ন্যায়। সুতরাং যখন রূহ, উদ্দেশ্য ও মজ্জাই অনুপস্থিত থাকবে, তখন কীভাবে তা পূর্ণাঙ্গ হিসেবে গণ্য করা হবে। তখন তো এটি মৃত গোলামের ন্যায় হয়ে পড়ে। যখন ওয়াজিব কাফফারার ক্ষেত্রে হাতকাটা গোলাম আযাদ করা যথেষ্ট হয় না, তখন কীভাবে তা মৃত গোলাম দ্বারা যথেষ্ট হবে?
এ কারণে সালাফদের কেউ কেউ বলেছেন, সালাত হলো সেই দাসীর মতো, যাকে কোনো বাদশাহর নিকট উপহার দেওয়া হয়। সুতরাং যে ব্যক্তি বাদশাহকে একটি লুলা, টেরা, অন্ধ, হাত-পা'কাটা, অসুস্থ, অবশ বা কুৎসিত; এমনকি প্রাণহীন মৃত কোনো দাসী উপহার দেয়, সেই ব্যক্তির প্রতি তার ধারণা কেমন হবে? সালাতের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনই, বান্দা তার রবের নিকট তা হাদিয়া পাঠায় এবং এর দ্বারা তাঁর নৈকট্য লাভ করে থাকে! আল্লাহ তাআলা পবিত্র ও উত্তম, তিনি পবিত্র ও উত্তম ছাড়া কোনোকিছু গ্রহণ করেন না। আর প্রাণহীন সালাত উত্তম আমলের মধ্যে পড়ে না। যেমন নিষ্প্রাণ মৃত গোলাম আযাদ করা উত্তম-গোলাম-আযাদের মধ্যে পড়ে না।
তারা বলেন : অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হলো অন্তরের অধীন; অন্তরের সুস্থতায় সেগুলো সুস্থ থাকে, অন্তরের অসুস্থতায় সেগুলো অসুস্থ হয়ে পড়ে। সুতরাং অন্তর যখন দাসত্ব থেকে মুক্ত থাকে, তখন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দাসত্ব থেকে মুক্ত থাকবে আরও উত্তমভাবে।
গাফলত ও ওয়াসওয়াসার কারণে যখন অন্তরের আমলই নষ্ট হয়ে যায়, তখন তার অধীনস্থ প্রজা ও সৈন্যসেনাদের আমল কীভাবে বিশুদ্ধ বলে পরিগণিত হবে, যারা তার নির্দেশেই চলে?!
তারা বলেন: 'সুনানুত-তিরমিযি'-তে বর্ণিত হয়েছে, নবি বলেছেন, إِنَّ اللَّهَ لَا يَسْتَجِيْبُ دُعَاءٌ مِّنْ قَلْبٍ غَافِلٍ لَامٍ “নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা অমনোযোগী ও উদাসীন অন্তরের দুআ কবুল করেন না।” [২৬৯]
তিনি সতর্ক করেছেন যে, দুআ যা আল্লাহ তাআলার খাঁটি হক, আল্লাহ তা গাফিল ও অমনোযোগী অন্তর থেকে কবুল করেন না।
তারা বলেন: ইআদা বা পুনারায় পড়া ওয়াজিব হওয়ার আরেকটি কারণ হলো : যার ওপর গাফলত প্রাধান্য বিস্তার করে থাকে এবং অধিকাংশ সময় যে অন্যমনস্ক থাকে, ইখলাস ও একনিষ্ঠতা তার সঙ্গী হয় না। কারণ ইখলাস হলো একমাত্র আল্লাহর জন্যই ইবাদাত করা। আর গাফিল ব্যক্তির (ভালো) কোনো ইচ্ছাই নেই, সুতরাং তার কোনো দাসত্বও নেই।
তারা বলেন: আল্লাহ তাআলা বলেছেন, فَوَيْلٌ لِلْمُصَلِّينَ الَّذِينَ هُمْ عَنْ صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ "সেই সালাত আদায়কারীদের জন্য ধ্বংস; যারা তাদের সালাত সম্বন্ধে বেখবর থাকে।” [২৭০]
এখানে বেখবর মানে সালাত পরিত্যাগ করা নয়। কারণ এ রকমটা হলে তো তারা মুসল্লি বা সালাত আদায়কারী বলে গণ্য হতো না। তাদের বেখবর বা গাফলত হয়তো ১. সালাতের সময়ের ব্যাপারে; যেমনটি বলেছেন ইবনু মাসউদ ও অন্যান্যরা, অথবা ২. একাগ্রতা ও অন্তর-উপস্থিত রাখার ব্যাপারে।
তবে সঠিক অভিমত হলো আয়াতটি উভয় প্রকার গাফলতকেই শামিল করে। কারণ আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য সালাতকে সাব্যস্ত করেছেন। তবে সে ব্যাপারে তাদের গাফলত ও বেখবরের কথা উল্লেখ করেছেন। সেটি হলো ওয়াজিব-ওয়াক্ত সম্পর্কে বেখবর থাকা বা ওয়াজিব-ইখলাস ও একাগ্রতা সম্পর্কে বেখবর থাকা। আর এ কারণে পরে তাদের রিয়া বা লোক-দেখানোর বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। যদি এর অর্থ সালাত পরিত্যাগ করা হতো, তা হলে রিয়ার কথা উল্লেখ থাকত না।
মোটকথা সালাতে ইখলাস, একাগ্রতা ও অন্তরকে আল্লাহর ওপর স্থির রাখা, শারীআত-প্রণেতার দৃষ্টিতে সালাতের অন্যান্য ওয়াজিব আমলের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং আল্লাহর প্রতি আপনার কেমন ধারণা যে, তিনি একটি তাকবীর পরিত্যাগ করার কারণে বা কোনো রোকনে ধীরস্থিরতা, কিরআতের ক্ষেত্রে কোনো হরফ, ওয়াজিব কোনো তাশদীদ, তাসবীহ পাঠ, সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ, রব্বানা ওয়া লাকাল হাম্দ বা রাসূল ﷺ-এর ওপর দরুদ পাঠ ইত্যাদি পরিত্যাগ করার দরুন সালাতকে বাতিল বলে ঘোষণা করবেন আর সালাতের রূহ, মূলবিষয় ও সবচেয়ে বড়ো উদ্দেশ্য (একাগ্রতা) অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও তা বিশুদ্ধ বলে গণ্য করবেন!?
যারা গাফিল ব্যক্তির সালাতকে পুনরায় আদায় করা ওয়াজিব বলেন এগুলো হলো তাদের দলীল-প্রমাণ। এগুলো বাহ্যিকভাবে মজবুত ও শক্তিশালী আপনি যেমন দেখছেন।
আরেক দল বলেছেন, তার জন্য সালাত পুনরায় আদায় করা ওয়াজিব নয়। তারা বলেন: এটি নবি ﷺ থেকেই প্রমাণিত। কারণ তিনি বলেছেন,
إِذَا نُودِيَ بِالأَذَانِ أَدْبَرَ الشَّيْطَانُ لَهُ ضُرَاطٌ حَتَّى لَا يَسْمَعَ الْأَذَانَ فَإِذَا قُضِيَ الْأَذَانُ أَقْبَلَ فَإِذَا ثُوبَ بِهَا أَدْبَرَ فَإِذَا قُضِيَ التَّشْوِيبُ أَقْبَلَ يَخْطُرُ بَيْنَ الْمَرْءِ وَنَفْسِهِ يَقُوْلُ اذْكُرْ كَذَا أُذْكُرْ كَذَا، لِمَا لَمْ يَكُنْ يَذْكُرُ حَتَّى يَظْلَّ الرَّجُلُ إِنْ يَدْرِي كَمْ صَلَّى فَإِذَا لَمْ يَدْرِ أَحَدُكُمْ كَمْ صَلَّى فَلْيَسْجُدْ سَجْدَتَيْنِ وَهُوَ جَالِسٌ
"সালাতের আযান শুরু হলে শয়তান পিঠ ফিরে বায়ু ছাড়তে ছাড়তে পালাতে থাকে এবং এত দূরে চলে যায় যে, সে আর আযান শুনতে পায় না। অতঃপর আযান শেষ হলে সে আবার ফিরে আসে। কিন্তু যে সময় ইকামাত দেওয়া হয়, তখন পুনরায় পিঠ ফিরে পালায়। ইকামাত শেষ হলে আবার ফিরে আসে এবং মানুষের মনে সন্দেহ ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে বলে, 'অমুক কথা স্মরণ করো, অমুক কথা স্মরণ করো; যেসব কথা তার কখনো স্মরণ করবার মতো নয়। অবশেষে সে কত রাকাআত আদায় করল, তা স্মরণ করতে পারে না। এরূপ অবস্থায় তোমাদের কেউ যখন স্মরণ করতে পারবে না যে, কত রাকাআত আদায় করেছে, তখন সে যেন বসে থাকা অবস্থাতেই দুটি সাজদা দেয়।” [২৭১]
তারা বলেন: এই সালাতে শয়তান মানুষকে এমন গাফিল বানিয়ে দেয় যে, সে স্মরণও করতে পারে না, সে কত রাকাআত আদায় করেছে। এ ক্ষেত্রে নবি আদেশ দিয়েছেন দুটি সাজদায়ে সাহু আদায় করার জন্য, তিনি তা পুনরায় আদায় করার কথা বলেননি। যদি তা বাতিল হয়ে যেত—যেমনটি আপনারা ধারণা করে থাকেন—তা হলে অবশ্যই তিনি তা পুনরায় আদায় করার কথাই বলতেন।
তারা বলেন: আর এর মাঝেই লুকায়িত আছে দুই সাজদায়ে সাহু দেওয়ার রহস্য। বান্দাকে ওয়াসওয়াসা দেওয়া এবং বান্দার মাঝে ও সালাতে-একাগ্র-হওয়ার মাঝে শয়তান প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার কারণে তাকে লাঞ্ছিত করার উদ্দেশ্যেই এই সাজদায়ে সাহু দেওয়ার হুকুম।
এ কারণেই নবি সাজদায়ে সাহুকে ‘লাঞ্ছনাকারী’ (الْمُرْعْمَتَيْنِ) বলে নামকরণ করেছেন। যে সালাতে ভুল করে, তাকে তিনি এই হুকুম দিয়েছেন। তবে ভুলের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেননি যে, কম হলে না বেশি হলে, ভুল প্রাধান্য পাওয়া না-পাওয়া ইত্যাদি। তিনি শুধু বলেছেন,
لِكُلِّ سَهْرٍ سَجْدَتَانِ “যেকোনো ভুলের জন্য দুটি সাজদা।”[২৭২]
তিনি এর থেকে কোনো ভুলকে ব্যতিক্রম বলে উল্লেখ করেননি।
তারা বলেন: ইআদা বা পুনরায় আদায় করা ওয়াজিব না হওয়ার আরেকটি কারণ হলো : ইসলামের হুকুমসমূহ বাহ্যিক কার্যাবলির সাথেই সম্পর্কিত। আর ঈমানের অভ্যন্তরীণ মূল বিষয়াদির ওপর সাওয়াব ও শাস্তির সম্পর্ক। আল্লাহ তাআলার দুটি হুকুম রয়েছে: একটি হুকুম দুনিয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, আর তা হলো বাহ্যিক কাজকর্ম ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমলের ওপর। আরেকটি হুকুম হলো আখিরাতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, আর তা হলো প্রকাশ্য-গোপন সব আমলের ওপর।
এ কারণেই নবি মুনাফিকদের বাহ্যিক কাজকর্ম গ্রহণ করতেন আর তাদের অভ্যন্তরীণ অবস্থা আল্লাহ তাআলার ওপর ন্যস্ত করতেন। এর ফলে তারা মুমিন নারীদের বিবাহ করত, মুমিনদের ওয়ারিশ হতো, তাদের থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পদও নেওয়া হতো, দুনিয়ার বিচারে তাদের সালাত আদায় গ্রহণযোগ্য ছিল; তারা সালাত পরিত্যাগকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। কারণ তারা প্রকাশ্যভাবে সালাত আদায় করত। আর সাওয়াব ও শাস্তির বিধান তো কোনো মানুষের নিকট নয়; বরং তা আল্লাহ তাআলার নিকটে ন্যস্ত। আখিরাতে তিনি এর পরিপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করবেন (এবং পূর্ণাঙ্গরূপে যার যা প্রাপ্য, তাকে তা প্রদান করবেন।)
তারা বলেন: সুতরাং আমরা ইসলামের বিধানাবলির হুকুম দেওয়ার ক্ষেত্রে এই হুকুম দেবো যে, মুনাফিক ও রিয়াকারীর সালাত সহীহ; তবে এর সাথে সাথে এটাও বলব যে, তাদের থেকে শাস্তি উঠিয়ে নেওয়া হবে না এবং তারা সাওয়াবেরও অধিকারী হবে না। সুতরাং অমনোযোগী মুসলিম ব্যক্তির সালাত তো আরও উত্তমভাবে সহীহ ও বিশুদ্ধ বলে গণ্য হবে; যদিও তার মাঝে গাফলতি ও ওয়াসওয়াসা এসে ভর করে, যার দরুন সে পরিপূর্ণ মনোযোগী হতে পারে না।
তবে হ্যাঁ, এই সালাতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে যে পুরস্কার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা অর্জিত হয় না। কারণ অন্তরের জন্য সালাতের তাৎক্ষণিক পুরস্কার রয়েছে; অন্তর ও চিন্তাচেতনা কেবল আল্লাহর ওপর স্থির থাকলে তা অর্জিত হয়, যেমন: ঈমানের শক্তি, উজ্বলতা, প্রশস্ততা, উদারতা, ইবাদাতের স্বাদ আস্বাদন করা, আনন্দ-খুশি ইত্যাদি। এমনিভাবে এই নিয়ামাতগুলো লাভ করতে সর্বদা আল্লাহর সামনে অন্তর উপস্থিত থাকতে হয়; যেমন আল্লাহ তাআলার বিশেষ নৈকট্যপ্রাপ্ত ব্যক্তি তা লাভ করে থাকে; যাকে আল্লাহ তাঁর সাথে মুনাজাত করার ও অগ্রসর হওয়ার জন্য খাছ করে নেন। আল্লাহ তাআলা সুউচ্চ ও সুমহান।
সালাতে একাগ্র থাকার দ্বারা আখিরাতে যে উঁচু মর্যাদা ও মর্তবা এবং নৈকট্যশীলদের যে সান্নিধ্য লাভ হবে, গাফিল ব্যক্তি তা-ও লাভ করবে না।
এর সবগুলো সে হারাবে শুধু একাগ্রতা ও একনিষ্ঠতা না থাকার কারণে। দুইজন ব্যক্তি একই কাতারে সালাতে দাঁড়ায়; অথচ তাদের দুজনের সালাতে থাকে আসমান-জমিন ব্যবধান। আমাদের আলোচনা এসব বিষয়ে নয়।
ইআদা বা সালাত পুনরায় আদায় করা ওয়াজিব বলার দ্বারা যদি আপনাদের উদ্দেশ্য হয়, এই সমস্ত ফলাফল ও ফায়দা অর্জন করা; তা হলে এটি সেই ব্যক্তির ইচ্ছা; সে চাইলে তা অর্জন করতে পারে আবার চাইলে তা থেকে বঞ্চিতও থাকতে পারে। আর যদি আপনাদের উদ্দেশ্য হয়, সালাত পুনরায় আদায় করা আবশ্যক এবং তা পরিত্যাগ করার কারণে আমরা তাকে শাস্তির মুখোমুখি দাঁড় করাবো এবং সালাত পরিত্যাগকারীর দুনিয়াবি যে হুকুম রয়েছে, তার ওপর সেগুলো প্রয়োগ করব, তা হলে তা বৈধ হবে না।
দ্বিতীয় এই অভিমতটিই অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ও অধিক গ্রহণযোগ্য। আল্লাহ তাআলাই অধিক জানেন।

টিকাঃ
[২৬৬] ইবনু তাইমিয়্যা, মাজমুউল ফাতাওয়া, ১৫/২৩৬।
[২৬৭] আবূ দাউদ, ৭৯৬।
[২৬৮] ইহইয়াউ উলূমিদ দ্বীন, ১/২৮৫।
[২৬৯] তিরমিযি, ৩৪৭৪।
[২৭০] সূরা মাউন, ১০৭: ৪-৫।
[২৭১] মুসলিম, ৩৮৯; বুখারি, ৬০৮।
[২৭২] আদূ দাউদ, ১০৩৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00