📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 মানযিল : ভীত-সন্ত্রস্ত হওয়া (اَلْإِشْفَاقُ)

📄 মানযিল : ভীত-সন্ত্রস্ত হওয়া (اَلْإِشْفَاقُ)


إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো-ভীত-সন্ত্রস্ত হওয়ার মানযিল।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ بِالْغَيْبِ وَهُمْ مِّنَ السَّاعَةِ مُشْفِقُونَ "তারা না দেখেই তাদের পালনকর্তাকে ভয় করে এবং কিয়ামতের ভয়ে থাকে ভীত-সন্ত্রস্ত।"[২৪৮]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন,
وَأَقْبَلَ بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ يَتَسَاءَلُونَ قَالُوا إِنَّا كُنَّا قَبْلُ فِي أَهْلِنَا مُشْفِقِينَ فَمَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا وَوَقَانَا عَذَابَ السَّمُوْمِ “তারা একে অপরের দিকে মুখ করে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। তারা বলবে, 'আমরা ইতঃপূর্বে আমাদের বাড়িতে ভীত-সন্ত্রস্ত ছিলাম। অতঃপর আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করেছেন।”[২৪৯]
الْإِشْفَاقُ হলো সূক্ষ্ম ও কোমল ভয়। এটি হলো যাকে ভয় করা হয়, তার প্রতি দয়া মিশ্রিত কোমল ভয়। ইশফাকের সাথে খাওফের সম্পর্ক তেমন, রহমতের সাথে রা'ফাত (رَاْفَۃٌ)-এর সম্পর্ক যেমন। কারণ রা'ফাত হলো সূক্ষ্ম ও কোমল রহমত।
ইশফাক বা সূক্ষ্ম ভয় তখনই প্রকাশিত হয়, যখন কোনো আমল নষ্ট হওয়ার ব্যাপারে আশঙ্কা থাকে যে, তা সেই সমস্ত অর্থহীন আমলের মধ্যে গণ্য হবে কি না, যেগুলো সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَقَدِمْنَا إِلَى مَا عَمِلُوا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنَاهُ هَبَاءً مَّنْثُورًا “আমি তাদের কৃতকর্মের প্রতি মনোনিবেশ করব, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণার মতো করে দেবো।”[২৫০]
এগুলো হলো সেই আমল, যা আল্লাহর জন্য করা হয়নি অথবা তাঁর হুকুমমতো বা তাঁর রাসূলের সুন্নাহ মোতাবিক করা হয়নি।
সে এই ভয়ও করে যে, ভবিষ্যতে তার আমল নষ্ট হয়ে যাবে; হয়তো এই আমল পরিত্যাগ করার কারণে অথবা এমন গুনাহে লিপ্ত হওয়ার কারণে, যা সেই আমলকে নষ্ট করে দেবে। ফলে তা একেবারে নস্যাৎ হয়ে যাবে। আমল-নষ্ট-হয়ে-যাওয়া-ব্যক্তির অবস্থা হবে সেই ব্যক্তিদের মতো, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
أَيَوَدُّ أَحَدُكُمْ أَنْ تَكُونَ لَهُ جَنَّةٌ مِّنْ نَّخِيلٍ وَأَعْنَابٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ لَهُ فِيهَا مِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ وَأَصَابَهُ الْكِبَرُ وَلَهُ ذُرِّيَّةٌ ضُعَفَاءُ فَأَصَابَهَا إِعْصَارٌ فِيْهِ نَارٌ فَاحْتَرَقَتْ
"তোমাদের কেউ কি পছন্দ করে, তার একটি সবুজ শ্যামল বাগান থাকবে, সেখানে ঝরনাধারা প্রবাহিত হবে, সব রকম ফলে তা পরিপূর্ণ থাকবে এবং সে বার্ধক্যে পৌঁছবে, তার দুর্বল সন্তানসন্ততিও থাকবে, এমতাবস্থায় এ বাগানে একটি ঘূর্ণিবায়ু আসবে, যাতে আগুন রয়েছে, ফলে বাগানটি জ্বলেপুড়ে যাবে?”[২৫১]
উমর ইবনুল খাত্তাব একদিন সাহাবিদের জিজ্ঞাসা করলেন, 'এই আয়াতটি কাদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে, সে ব্যাপারে আপনাদের অভিমত কী?
তখন তারা বললেন, 'আল্লাহ তাআলাই অধিক জানেন।'
এতে উমর রেগে গিয়ে বললেন, 'বলো, 'আমরা জানি' অথবা 'আমরা জানি না।'
ইবনু আব্বাস বললেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, এ ব্যাপারে আমার অন্তরে কিছুটা ধারণা আছে।'
উমর বললেন, 'ভাতিজা, বলে দাও, নিজেকে তুচ্ছ ভেবো না।'
তখন ইবনু আব্বাস বললেন, 'এটা কর্মের দৃষ্টান্ত হিসেবে পেশ করা হয়েছে।'
উমর বললেন, 'কোন কর্মের?'
ইবনু আব্বাস বললেন, 'একটি কর্মের।'
উমর বললেন, 'এটি হচ্ছে সেই ধনী ব্যক্তির উদাহরণ, যে আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করতে থাকে, এরপর আল্লাহ তাআলা তার প্রতি শয়তানকে প্রেরণ করেন। ফলে সে গুনাহে লিপ্ত হয়; অবশেষে তার সকল সৎকর্মকে বরবাদ করে দেয়।' [২৫২]

টিকাঃ
[২৪৮] সূরা আম্বিয়া, ২১: ৪৯।
[২৪৯] সূরা তুর, ৫২: ২৫-২৭।
[২৫০] সূরা ফুরকান, ২৫: ২৩।
[২৫১] সূরা বাকারা, ২: ২৬৬।
[২৫২] বুখারি, ৪৫৩৮।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 মানযিল : নত হওয়া (اَلْإِخْبَاتُ)

📄 মানযিল : নত হওয়া (اَلْإِخْبَاتُ)


إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো—নত হওয়ার মানযিল।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَبَشِّرِ الْمُخْبِتِينَ “এবং বিনয়ীদের সুসংবাদ দাও।”[২৭৩]
এর পরের আয়াতে তাদের প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরেছেন—
الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَالصَّابِرِينَ عَلَى مَا أَصَابَهُمْ وَالْمُقِيمِي الصَّلَاةِ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُوْنَ “যাদের অবস্থা এই যে, আল্লাহর নাম স্মরণ করা হলে, তাদের হৃদয় কেঁপে ওঠে; যে বিপদই তাদের ওপর আসে, তার ওপর তারা সবর করে; সালাত কায়েম রাখে এবং আমি যা কিছু রিযক তাদেরকে দান করেছি, তা থেকে খরচ করে।”[২৭৪]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন,
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَأَخْبَتُوا إِلَى رَبِّهِمْ أُولَئِكَ أَصْحَابُ الْجَنَّةِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ “নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে এবং তাদের পালনকর্তার কাছে নত হয়েছে, তারাই জান্নাতের অধিবাসী; সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।” [২৭৫]
الخبث-এর মূল শাব্দিক অর্থ হলো: নিম্নভূমি, জমিনের নিচু অংশ। এই অর্থানুসারেই ইবনু আব্বাস ও কাতাদা الْمُخْبِنِينَ শব্দের ব্যাখ্যা করেছেন, তারা বলেছেন, 'তারা হলেন বিনয়ী ব্যক্তিবর্গ )ا ( الْمُتَوَاضِعُونَ
মুজাহিদ বলেছেন, 'মুখবিত হলো আল্লাহর প্রতি নিশ্চিন্ত বান্দা।।২৭৬]
তিনি আরও বলেছেন, 'আল-খন্ত' অর্থ: নিম্নভূমি।' ২৭৭]
ইমাম আখফাশ বলেছেন, 'তারা হলেন একাগ্রতার অধিকারী ব্যক্তিবর্গ। [২৭৮]
ইবরাহীম নাখায়ি বলেছেন, 'সালাত আদায়কারী একনিষ্ঠ ব্যক্তিগণ।[২৭৯]
কালবি বলেছেন, 'তারা হলেন কোমল হৃদয়ের অধিকারীগণ। [২৮০]
এই সমস্ত মতামত দুইটি অর্থের সাথে সম্পর্কিত: ১. বিনয় এবং ২. আল্লাহর প্রতি নিশ্চিন্ততা। আর এ কারণেই এই শব্দটির সাথে إلى যুক্ত করা হয়। কারণ তা নিশ্চিন্ততা, আল্লাহমুখিতা ও আল্লাহর প্রতি স্থিরতাকে অন্তর্ভুক্ত করে।
নত হওয়া বা ইখবাত হলো প্রথম মাকাম, (যা অর্জন করে নিলে) আল্লাহ-অভিমুখী ব্যক্তি দ্বিধাদ্বন্দ্ব, সন্দেহ-সংশয়, গাফলতি, অমনোযোগিতা এবং আগের অবস্থায় ফিরে যাবার প্রবণতা থেকে মুক্তি পায়। আল্লাহ-অভিমুখী ব্যক্তি সবসময় আল্লাহর দিকে পথ চলতে থাকে, যতদিন শ্বাসপ্রশ্বাস চলতে থাকবে তার পথচলা শেষ হবে না। বান্দার জন্য এই অবস্থা হাসিল হওয়াকে পানির (ঘাটের) সাথে তুলনা করা হয়েছে; দীর্ঘপথ-পাড়ি-দেওয়া-মুসাফির তার তৃষ্ণা পূরণ করতে এবং প্রয়োজন মেটাতে পানির যে ঘাটে অবতরণ করে, সেই ঘাট তাকে পরিতৃপ্তি দান করে, সফর পরিপূর্ণ করার জন্য তার থেকে সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব এবং সফরের কষ্টের কারণে বাড়ি ফেরার প্রবণতা দূর করে দেয়। অতঃপর যখন সে সেই পানিতে নামে, তখন তার থেকে সব সংশয়-সন্দেহ কেটে যায় এবং ঘরে ফিরে যাবার ইচ্ছা দূর হয়ে যায়।
ঠিক তেমনি সালিক বা আল্লাহর-পথের-পথিক যখন ইখবাত বা নত হওয়ার ঘাটে নামে, তখন সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব, সন্দেহ-সংশয় ও ফিরে যাওয়ার বাসনা থেকে সে মুক্তি পায়। ফলে পরবর্তী সফরের জন্য সে নিশ্চিন্ততার মানযিল লাভ করে এবং পূর্ণদ্যমে সফর অব্যাহত রাখে।

টিকাঃ
[২৭৩] সূরা হাজ্জ, ২২: ৩৪।
[২৭৪] সূরা হাজ্জ, ২২: ৩৫।
[২৭৫] সূরা হূদ, ১১: ২৩।
[২৭৬] বাগাবি, তাফসীর, ৫/৩৮৬।
[২৭৭] বাগাবি, তাফসীর, ৫/৩৮৬।
[২৭৮] বাগাবি, তাফসীর, ৫/৩৮৬।
[২৭৯] বাগাবি, তাফসীর, ৫/৩৮৬।
[২৮০] বাগাবি, তাফসীর, ৫/৩৮৬।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 মানযিল : অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাকা (اَلْوَرَعُ)

📄 মানযিল : অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাকা (اَلْوَرَعُ)


إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো-অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাকার মানযিল।
আল্লাহ তাআলা বলেন, يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ “হে রাসূলগণ, পবিত্র বস্তু আহার করুন এবং সৎকাজ করুন। আপনারা যা করেন, আমি তা ভালোভাবেই জানি।”[৩০০]
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ “আপনার পোশাক পবিত্র রাখুন।”[৩০১]
কাতাদা ও মুজাহিদ বলেছেন, 'অর্থাৎ আপন সত্তাকে গুনাহ থেকে পবিত্র রাখুন। এখানে পোশাক বলে সত্তা উদ্দেশ্য নেওয়া হয়েছে।' ইবরাহীম নাখায়ি, দাহহাক, শা'বি, যুহরি-সহ আরও অনেক মুফাসসিরের অভিমত এটি।
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস বলেছেন, 'অর্থাৎ আপনি তা অবাধ্যতা ও বিশ্বাসঘাতকতা করার উদ্দেশ্যে পরিধান করবেন না।' অতঃপর তিনি বলেছেন, 'আপনি কি গায়লان ইবনু সালামা সাকাফির কথা শোনেননি—
وَإِنِّي بِحَمْدِ اللَّهِ لَا ثَوْبَ غَادِرٍ ... لَبِسْتُ وَلَا مِنْ غَدْرَةٍ أَتَقَنَّعُ
আল্লাহর শোকর আমি বিশ্বাসঘাতকের পোশাক পরি না, আবার বিশ্বাসঘাতকতার মুখোশেও আবৃত থাকি না।[৩০২]
আরবরা কোনো ব্যক্তিকে আমানতদারিতা ও সত্যবাদিতার গুণে গুণান্বিত করতে চাইলে বলে থাকে, (ظاهِرُ القِيابِ )পবিত্র কাপড়ের অধিকারী)। আর বিশ্বাসঘাতক ও পাপাচারীকে বলে, دَيْسُ القِيَابِ )নোংরা কাপড়ের অধিকারী)।
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, কাপড়কে নাপাকি থেকে পবিত্র রাখা, পবিত্রতার ফরজ হুকুমের মধ্যেই শামিল। কারণ এর দ্বারা আমল ও আখলাক পূর্ণতা পায়। কেননা প্রকাশ্য নাপাকি, অভ্যন্তরীণ নাপাকির সৃষ্টি করে। আর এ কারণেই আল্লাহর-সামনে-দাঁড়ানো-ব্যক্তিকে নাপাকি দূর করতে এবং তা থেকে দূরে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মূলকথা হলো : الْوَرَعُ অন্তরের নোংরা ও নাপাকিকে পবিত্র করে, যেমন পানি পোশাকের ময়লা ও নাপাকি পবিত্র করে। কাপড়ের মাঝে ও অন্তরের মাঝে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অনেক মিল রয়েছে। এই কারণে স্বপ্নে কেউ কাপড় দেখলে, তা তার অন্তর ও আত্মিক অবস্থার প্রমাণ বহন করে। এ দুটি একটি অপরটিকে বেশ প্রভাবিত করে। এ জন্য রেশম, স্বর্ণ ও হিংস্র প্রাণীর চামড়া পরিধান করতে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ এগুলো দাসত্ব ও একাগ্রতার সাথে সাংঘর্ষিক। কাপড় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও ময়লাযুক্ত হওয়া, উজ্জ্বল ও অনুজ্জ্বল হওয়া এবং কাপড়ের সুঘ্রাণ ও দুর্গন্ধ অন্তরে যে প্রকট প্রভাব ফেলে, তা কেবল অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিরাই উপলব্ধি করতে পারে। এমনকি তারা কোনটা নেককার ব্যক্তির কাপড় আর কোনটা বদকার ব্যক্তির কাপড়, তা তাদের অনুপস্থিতেই আলাদা করে চিনে নিতে পারে।
নবি ﷺ এক বাক্যে الْوَرَعُ-এর সমস্ত বিষয়কে একত্রিত করে দিয়েছেন—
مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ
"মানুষের ইসলামের সৌন্দর্য হচ্ছে অনর্থক কাজকর্ম পরিত্যাগ করা।"[৩০৩]
এই হাদীসটি অপ্রয়োজনীয় সবকিছু পরিত্যাগ করাকেই অন্তর্ভুক্ত করে; যেমন: কথা বলা, দৃষ্টি দেওয়া, শ্রবণ করা, ধরা, হাঁটাচলা করা, চিন্তা করা, এমনিভাবে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সমস্ত কাজকর্ম। নিঃসন্দেহে এই বাক্যটি زغ-এর ব্যাপারে পরিপূর্ণ ও ব্যাপক অর্থবহ।
ইবরাহীম ইবনু আদহাম বলেছেন, "ওয়ারা' হলো প্রতিটি সংশয়পূর্ণ বস্তু পরিত্যাগ করা এবং অপ্রয়োজনীয় বস্তু পরিহার করা। [৩০৪] এর অর্থ হলো অনর্থক বিষয়াদিতে নিজেকে না জড়ানো।
আল্লাহর রাসূল আবূ হুরায়রা-কে বলেছেন, يَا أَبَا هُرَيْرَةَ كُنْ وَرِعًا تَكُنْ أَعْبَدَ النَّاسِ “হে আবূ হুরায়রা, তুমি আল্লাহর অপছন্দনীয় কাজগুলো থেকে বেঁচে থাকো, তা হলে সব মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ইবাদাতকারী বলে গণ্য হবে।”[৩০৫]
শিবলি বলেছেন, 'ওয়ারা' হলো আল্লাহ ছাড়া বাকি সবকিছু থেকে দূরে থাকা।'[৩০৬]
ইসহাক ইবনু খালাফ বলেছেন, 'অনর্থক কথাবার্তা থেকে বেঁচে থাকা, স্বর্ণ- রুপার আকাঙ্ক্ষা থেকে বেঁচে থাকার চেয়েও বেশি কঠিন। এমনিভাবে স্বর্ণ-রুপার প্রতি বিমুখতা প্রদর্শন করার চেয়ে ক্ষমতার প্রতি বিমুখতা প্রদর্শন করা বেশি কঠিন। কারণ স্বর্ণ-রুপা খরচ করা হয় ক্ষমতা অর্জন করার জন্য।[৩০৭]
আবূ সুলাইমান দারানি বলেছেন, 'অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাকা হলো দুনিয়াবিমুখতার প্রথম ধাপ। যেমন অল্পেতুষ্টি হলো সন্তুষ্টির প্রথম ধাপ।'[৩০৮]
ইয়াহইয়া ইবনু মুআয বলেছেন, 'ওয়ারা' হলো দুই প্রকার: একটি বাহ্যিক; তা হলো সবকিছু আল্লাহর জন্যই করা, আরেকটি হলো অভ্যন্তরীণ; আর তা হলো আপনার অন্তরে আল্লাহ ছাড়া আর কারও জন্য স্থান না থাকা।'[৩০৯]
ইউনুস ইবনু উবাইদ বলেছেন, 'اورغ হলো সব ধরনের সন্দেহ-সংশয় থেকে বেরিয়ে যাওয়া এবং প্রতিটি মুহূর্তে নফসের হিসাব নিতে থাকা।।০১০।
সুফইয়ান সাওরি বলেছেন, 'ওয়ারা' এর চেয়ে সহজ কিছু আমি আর দেখিনি, অন্তরে যা খটকা সৃষ্টি করে তা পরিত্যাগ করুন।'[৩১১]
হাসান বাসরী একটি বালককে প্রশ্ন করলেন, 'দ্বীনের মূল কী?' সে জবাব দিলো, '(অন্তরের) অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাকা )اورغ(। তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, 'এর বিপদ কী?' সে উত্তরে বলল, 'লোভ-লালসা।' এই কথা শুনে হাসান অবাক হলেন।[৩১২]
হাসান বলেছেন, 'সামান্য পরিমাণ ওয়ারা' হাজার (নফল) সালাত-সিয়াম থেকেও উত্তম। [৩১৩]
আবূ হুরায়রা বলেছেন, 'আগামীকাল আল্লাহর সঙ্গী হবে-ওয়ারা' ও যুহদের অধিকারী ব্যক্তিগণ।'[৩১৪]
সালাফদের কোনো একজন বলেছেন, 'কোনো বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত তাকওয়া বা খোদাভীতির হাকীকত পর্যন্ত পৌঁছুতে পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত-না ক্ষতির আশঙ্কায় এমন বস্তুও পরিত্যাগ করে, যার মধ্যে কোনো ক্ষতি নেই।'[৩১৫]
সাহাবিদের মধ্যে একজন বলেছেন, 'আমরা হারাম বস্তুসমূহের একটি দরজায় ঢুকে পড়ার আশঙ্কায় হালাল বস্তুসমূহের সত্তরটি দরজাও পরিত্যাগ করতাম।[৩১৬]

টিকাঃ
[৩০০] সূরা মুমিনূন, ২৩ : ৫১।
[৩০১] সূরা মুদ্দাসসির, ৭৪ : ৪।
[৩০২] তাবারি, তাফসীর, ২৩/৪০৫।
[৩০৩] তিরমিযি, ২৩১৭; ইবনু মাজাহ, ৩৯৭৬।
[৩০৪] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ১/২৩৩।
[৩০৫] ইবনু মাজাহ, ৪২১৭; তিরমিযি, ২৩০৫।
[৩০৬] বাইহাকি, আয-যুহদুল কাবীর, ৮৫৭।
[৩০৭] ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশ্ক, ৮/২০৫।
[৩০৮] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৯/২৫৭।
[৩০৯] বাইহাকি, আয-যুহদুল কাবীর, ৮৫৬।
[৩১০] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ১/২৩৫।
[৩১১] আবদুল কাদীর জীলানি, আল-গুনইয়া লি-তালিবী তরীকিল হাক্ক, ১/২৫২।
[৩১২] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ১/২৩৬।
[৩১৩] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ১/২৩৬।
[৩১৪] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ১/২৩৬।
[৩১৫] এর অনুরূপ হাদীস দেখুন-তিরমিযি, ২৪৪১; ইবনু মাজাহ, ৪২১৫।
[৩১৬] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ১/২৩৩; সাহাবিটি হলেন আবূ বকর।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 মানযিল : বিচ্ছিন্ন হওয়া (اَلتَّبَتُّلُ)

📄 মানযিল : বিচ্ছিন্ন হওয়া (اَلتَّبَتُّلُ)


إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো-বিচ্ছিন্ন হওয়ার মানযিল।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَاذْكُرِ اسْمَ رَبِّكَ وَتَبَتَّلْ إِلَيْهِ تَبْتِيلًا "আপন রবের নাম স্মরণ করতে থাকো এবং সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তাঁর জন্যই হয়ে যাও।”[৩১৭]
تَبَتَّلُ অর্থ : বিচ্ছিন্ন হওয়া। এটি হলো تَبَتَّلَ থেকে বাবুত তাফাউউল-এর মাসদার; যার অর্থ: কর্তন করা, কেটে ফেলা। মারইয়াম-কে اَلْبَتُولُ-ও বলা হতো। কারণ তিনি স্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন (তার কোনো স্বামী ছিল না) এবং তিনি তার সময়কার অন্যান্য নারীদের মতো হওয়া থেকেও বিচ্ছিন্ন ছিলেন। তিনি সম্মান ও মর্যাদার দিক দিয়ে তাদের চেয়ে ঊর্ধ্বে ছিলেন এবং তাদেরকে অতিক্রম করে গিয়েছিলেন।
تَبَتَّلَ ফেয়েলের মাসদার হলো تَبْتِيلٌ, যেমন: اَفْهَمُ (অনুধাবন করা), اَعْلَمُ (শিক্ষা গ্রহণ করা)। কিন্তু কুরআনে (ওপরে বর্ণিত আয়াতে) এটি বাবুত তাফঈলের মাসদার (تَبْتِيلًا) হিসেবে এসেছে, ফেয়েল বাবুত তাফাউউলের আর মাসদার বাবুত তাফঈলের। এভাবে আনার একটি সূক্ষ্ম কারণ রয়েছে। এখানে বাবুত তাফাউউলের ফেয়েল দ্বারা এটা বুঝানো উদ্দেশ্য যে, ধীরে ধীরে কাজ করা, কষ্ট করে কাজ করা, বেশি বেশি এবং পরিপূর্ণরূপে কাজ করা। আর বাবুত তাফঈল থেকে মাসদার এনে অপর আরেকটি অর্থ বুঝানো উদ্দেশ্য; আর তা হলো নিজে আল্লাহর প্রতি ধাবিত হওয়ার সাথে সাথে নিজের নফসকেও ধাবিত করা। যেন বলা হয়েছে, 'আপনি আপনার নফসকে আল্লাহ তাআলার দিকে পরিপূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন করুন এবং আপনি নিজেও তাঁর প্রতি একাগ্রচিত্তে নিবিষ্ট হোন।' এ রকম ব্যবহার কুরআন মাজীদে অনেক রয়েছে। ব্যাপক অর্থ বোঝানোর জন্য এটি হলো সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ করার সর্বোত্তম পদ্ধতি।
القُلُ হলো প্রতিদানপ্রাপ্তির প্রতি লক্ষ না করে নিঃস্বার্থভাবে আল্লাহর দিকে নিমগ্ন হওয়া; কোনো শ্রমিকের মতো না যে, পারিশ্রমিক পেলে কাজ করবে, অন্যথায় করবে না। আবার যখন পারিশ্রমিক পেয়ে যাবে, মালিকের দরজা থেকে সরে পড়বে। প্রকৃত গোলামের অবস্থা এর বিপরীত। কারণ সে তার মনিবের খেদমত করতে থাকে, কোনোকিছু পাওয়ার আশায় নয়; বরং কেবল দাসত্বের দাবিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে। সে কখনো তার মনিবের দরজা ছেড়ে যায় না। তবে পলায়নকারীর কথা ব্যতিক্রম। অনেক সময় পলাতক গোলাম গোলামির মর্যাদা থেকে বের হয়ে যায়; কিন্তু সে কোথাও পূর্ণরূপে স্বাধীনতা পায় না। আসলে বান্দার চূড়ান্ত মর্যাদা রয়েছে কেবল স্বেচ্ছায় ভালোবাসার সাথে তার মালিকের দাসত্বের শৃঙ্খলে প্রবেশ করার মধ্যে, বাধ্য হয়ে বা জোরপূর্বকভাবে প্রবেশ করার মধ্যে নয়।
القُلُ দুটি বিষয়কে একত্রিত করে: ১. পৃথক হয়ে যাওয়া এবং ২. মিলিত হওয়া। এ দুটি ব্যতীত তা বিশুদ্ধ হয় না।
১. পৃথক হয়ে যাওয়ার মানে হচ্ছে: অন্তর নিজের লাভ ও স্বার্থ থেকে বিচ্ছিন্নতা অবলম্বন করবে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো দিকে দৃষ্টি দেওয়া থেকেও অন্তর বিচ্ছিন্ন রাখবে; আল্লাহ তাআলার ভয়ের কারণে বা তাঁর প্রতি আগ্রহের কারণে বা তাঁর দিকে মনোযোগী হয়ে বা এই কথা ভেবে যে, সেগুলো অন্তরকে আল্লাহ থেকে বিমুখ করে দেবে। (এই জন্য নিজের লাভ ও স্বার্থ থেকে বিচ্ছিন্নতা অবলম্বন করবে।)
২. আর মিলিত হওয়ার বিষয়টি তখনই শুদ্ধ হবে, যখন ওপরে বর্ণিত পৃথক হওয়ার বিষয়টি অর্জিত হবে। আর এটি হলো অন্তর আল্লাহর সাথে মিলিত হওয়া, তাঁর দিকে ধাবিত হওয়া, তাঁর প্রতি ভালোবাসা, ভয়, আশা, একাগ্রতা ও তাওয়াক্কুলকে সঙ্গী করে নিজের সত্তাকে তাঁর প্রতিই ধাবিত রাখা।
ا হলো প্রথমে সৃষ্টিজগৎ থেকে পৃথক হয়ে যাওয়া, অতঃপর নিজের নফস থেকে পৃথক হওয়া।
মানুষের সাথে অধিক মেলামেশা ও ঘনিষ্ঠতাকে যে জিনিসটি বিচ্ছিন্ন করে দেয়, তা হলো হাকীকত বা (দুনিয়ার) প্রকৃত অবস্থা প্রত্যক্ষ করা। আর তা হলো এটা দেখা যে, সমস্ত বস্তু আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে, তাঁরই তাওফীকে এবং তাঁর কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার অধীনেই পরিচালিত হচ্ছে। পুরা সৃষ্টিজগতের মধ্যে একটি বস্তুও এমন নেই, যা আল্লাহর দেওয়া শক্তি-সামর্থ্য ব্যতীত নড়াচড়া করে, কিংবা তাঁর অনুমতি ব্যতীত ক্ষতি বা উপকার করে। সুতরাং এই উপলব্ধির পর সৃষ্টিজগতের প্রতি ধাবিত হওয়ার কী অর্থ?
দুটি বিষয়ের মাধ্যমে নিজের নফস থেকে পৃথক হওয়ার বিষয়টি হাসিল হয় :
১. প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণ না করা, এর বিরোধিতা করা এবং নফসকে তা থেকে দূরে রাখা। কারণ প্রবৃত্তির অনুসরণ আল্লাহর প্রতি মগ্ন হওয়ার পথ বন্ধ করে দেয়।
২. প্রবৃত্তির চাহিদার বিরোধিতা করার পর আল্লাহ তাআলার সাথে ঘনিষ্ঠতার প্রফুল্লতা অনুভব করা। রূহের জন্য প্রফুল্লতা ঠিক তেমনই জরুরি, যেমন শরীরের জন্য রূহ জরুরি। রূহের জন্য এই প্রফুল্লতা ও আরাম অর্জিত হয়, যখন সে প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণ করা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। সে সময় আল্লাহর সাথে তার ঘনিষ্ঠতা সুসংগঠিত হয় এবং সে এর সুঘ্রাণ পায়। কারণ নফস আবশ্যকীয়ভাবেই যেকোনো সম্পর্কে জড়াবে। সুতরাং প্রবৃত্তির সাথে যখন তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে, তখন আল্লাহ তাআলার সাথে তার অন্তরঙ্গতা সৃষ্টি হবে এবং তার ওপর সুবাতাস বইতে শুরু করবে, ফলে তাকে তা সুবাসিত করবে এবং তার মাঝে নবজীবনের সঞ্চার ঘটাবে।

টিকাঃ
[৩১৭] সূরা মুযযাম্মিল, ৭৩: ৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00