📄 মানযিল : আল্লাহভীতি (اَلْخَوْفُ)
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো-আল্লাহভীতি।
এটি হলো সবচেয়ে সম্মানিত মানযিল এবং অন্তরের জন্য সবচেয়ে উপকারী। এটি প্রত্যেকের ওপর ফরজ। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
فَلَا تَخَافُوْهُمْ وَخَافُوْنِ إِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِينَ
"সুতরাং তোমরা তাদেরকে ভয় করো না; বরং আমাকে ভয় করো, যদি তোমরা প্রকৃত মুমিন হয়ে থাকো।” [২৩১]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন,
فَلَا تَخْشَوُا النَّاسَ وَاخْشَوْنِ
"সুতরাং তোমরা মানুষকে ভয় করো না; বরং আমাকে ভয় করো।” [২৩২] আল্লাহ তাআলা তাঁর পবিত্র কালামে ভয়কারীদের প্রশংসা করেছেন এবং তাদের গুণগান বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ هُمْ مِّنْ خَشْيَةِ رَبِّهِمْ مُّشْفِقُوْنَ * وَالَّذِينَ هُمْ بِآيَاتِ رَبِّهِمْ يُؤْمِنُوْنَ وَالَّذِينَ هُمْ بِرَبِّهِمْ لَا يُشْرِكُوْنَ وَالَّذِينَ يُؤْتُونَ مَا آتَوْا وَقُلُوبُهُمْ وَجِلَةً أَنَّهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ رَاجِعُوْنَ أُولَبِكَ يُسَارِعُونَ فِي الخَيْرَاتِ وَهُمْ لَهَا سَابِقُوْنَ
“নিশ্চয় যারা তাদের পালনকর্তার ভয়ে সন্ত্রস্ত, যারা তাদের পালনকর্তার কথায় বিশ্বাস স্থাপন করে, যারা তাদের পালনকর্তার সাথে কাউকে শরীক করে না এবং তারা যা কিছুই দান করে, তা ভীত-কম্পিত হৃদয়ে এ কারণে দান করে যে, তারা তাদের পালনকর্তার কাছে প্রত্যাবর্তন করবে, তারাই কল্যাণের কাজ দ্রুত শেষ করে এবং তারা তাতে অগ্রগামী হয়।”[২০০]
আয়িশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ -কে এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, وَالَّذِيْنَ يُؤْتُوْنَ مَا آتَوْا وَقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ “যারা যা কিছুই দান করে তা ভীত-কম্পিত হৃদয়ে দান করে থাকে”[২০৪] এ ব্যাপারে আয়িশা বললেন, 'এরা কি মদখোর ও চোর?' তিনি বললেন,
لَا يَا بِنْتَ الصِّدِّيْقِ وَلَكِنَّهُمُ الَّذِيْنَ يَصُوْمُوْنَ وَيُصَلُّوْنَ وَيَتَصَدَّقُوْنَ وَهُمْ يَخَافُوْنَ أَنْ لَّا يُقْبَلَ مِنْهُمْ أُولَبِكَ الَّذِيْنَ يُسَارِعُوْنَ فِي الْخَيْرَاتِ وَهُمْ لَهَا سَابِقُوْنَ
“হে সিদ্দীকের মেয়ে, না এরা তা নয়; বরং তারা সালাত আদায় করে, সিয়াম পালন করে, দান-সদাকা করে এবং এই ভয়ে ভীত থাকে যে, তাদের পক্ষ হতে এগুলো কবুল করা হবে কি না, তারাই কল্যাণের কাজে বেশ তৎপর থাকে এবং তাতে তারা অগ্রগামী হয়।”[২০৫]
হাসান বাসরী বলেছেন, 'আল্লাহর শপথ! তারা নেক আমল করে এবং তাতে কঠোর পরিশ্রম করে আবার এই ভয়ও করে যে, সেগুলো তাদের (মুখের) ওপর নিক্ষেপ করা হবে। আসলে মুমিন বান্দারা ভালো কাজ করে আবার ভয়ে ভয়ে থাকে। অপরদিকে মুনাফিকরা খারাপ কাজ করেও নির্ভাবনায় থাকে।'[২০৬]
)الرَّهْبَةُ) (الْخَشْيَةُ) (الْخَوْفُ) (الْوَجَلُ) (এই শব্দগুলো প্রায় কাছাকাছি অর্থ প্রদান করে, তবে সমার্থক নয়; (কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে।)
)اَلْخَوْفُ বা আল্লাহভীতি(:আবুল কাসিম জুনাইদ বলেছেন, 'খাওফ বা আল্লাহভীতি হলো শাস্তির আশঙ্কা শ্বাসপ্রশ্বাসের মধ্যে ঢুকে যাওয়া।।২০৯।
কেউ কেউ বলেছেন, 'আল্লাহভীতি হলো ভয়ের বিষয় (শাস্তির কথা) স্মরণ করে অন্তর অস্থির ও পেরেশান হওয়া।'
কেউ কেউ বলেছেন, 'আল্লাহভীতি হলো হুকুম-আহকামের প্রয়োগ সম্পর্কে মজবুত ইলম। তবে এটি আল্লাহভীতির কারণ, হুবহু এটিই আল্লাহভীতি নয়।'
কেউ কেউ বলেছেন, 'খাওফ হলো মাকরূহ বা অপছন্দনীয় কিছুতে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা টের পাওয়ার সাথে সাথেই অন্তর সেখান থেকে পলায়ন করা।'
আর আল্লা হলো খাওফ থেকেও খাছ বা বিশিষ্ট। কারণ খাশইয়াত হলো আল্লাহ সম্পর্কে যারা গভীর জ্ঞান রাখে, তাদের জন্য। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ "আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই কেবল তাঁকে ভয় করে।” [২৩৮]
এটি এমন ভয়, যার সাথে মা'রিফাত বা আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান সংযুক্ত থাকে।
নবি বলেন,
وَاللَّهِ إِنِّي لَأَخْشَاكُمْ لِلَّهِ وَأَتْقَاكُمْ لَهُ "আল্লাহর কসম, আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি এবং তাঁর নাফরমানي করা থেকে তোমাদের চেয়ে বেশি বেঁচে থাকি।” [২৩৯]
সুতরাং খাওফ হলো নড়াচড়া করা, ভয়ে অস্থির হওয়া আর খাশইয়াত হলো স্থিরতা, গুটিয়ে থাকা ও ভয়ে জমে থাকা। যে ব্যক্তি শত্রু বাহিনীর আগমন দেখে বা এ রকম কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, তখন তার দু রকম অবস্থা হয় :
এক. তাদের থেকে ভয়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্য তার তৎপরতা। এটি হলো খাওফের অবস্থা।
দুই. এমন স্থানে অবস্থান নেওয়া ও স্থির হয়ে থাকা, যেখানে তার নিকট শত্রুপক্ষ পৌঁছাতে পারে না। এটি হলো খাশইয়াত।
الوَجْلُ হলো অপছন্দনীয় বস্তু থেকে ভয়ে পালানোর সময় গভীর মনোযোগী হওয়া। এটি হলো الْرَّغْبَةُ -এর বিপরীত; রগবত-এর অর্থ হলো: আগ্রহের বস্তুর সন্ধানে অন্তর ধাবিত হওয়া।
الْوَجَلُ হলো যার ক্ষমতা ও শাস্তির ভয় করা হয়, তার আলোচনায় বা তাকে দেখে ভয়ে অন্তর প্রকম্পিত ও বিদীর্ণ হওয়া।
الهيبة হলো সম্মান ও শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মা'রিফাত ও মহাব্বতের পাশাপাশি এই ভয়ের সৃষ্টি হয়। আর إِجْلَالُ হলো ভালোবাসা মিশ্রিত শ্রদ্ধা।
সুতরাং খাওফ হলো সাধারণ মুমিনদের জন্য, খাশইয়াত হলো উলামায়ে কেরামের জন্য, হাইবাত হলো মহাব্বতকারীদের জন্য, আর ইজলাল হলো নৈকট্যশীলদের জন্য। ইলম ও মা'রিফাতের পরিমাণ অনুসারে খাওফ ও খাশইয়াত সৃষ্টি হয়। যেমন নবি বলেছেন,
فَوَاللَّهِ إِنِّي لَأَعْلَمُهُمْ بِاللَّهِ وَأَشَدُّهُمْ لَهُ خَشْيَةً
"আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহর সম্পর্কে তাদের চেয়ে বেশি জানি এবং আমি তাদের চেয়ে তাঁকে অনেক বেশি ভয় করি।” [২৪০]
ওপরের হাদীসের বর্ণনায় আরেকটি রিওয়ায়াতে خَوْنً শব্দটি এসেছে। (শব্দ দুটি প্রায় সমার্থক।)
আবূ যার থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন,
لَوْ تَعْلَمُوْنَ مَا أَعْلَمُ لَضَحِكْتُمْ قَلِيلًا وَلَبَكَيْتُمْ كَثِيرًا وَمَا تَلَذَّذْتُمْ بِالنِّسَاءِ عَلَى الْفُرْشِ وَلَخَرَجْتُمْ إِلَى الصُّعُدَاتِ تَجْأَرُوْنَ إِلَى اللَّهِ
"আমি যা জানি তোমরা যদি তা জানতে, তা হলে তোমরা খুব কম হাসতে আর বেশি কাঁদতে এবং স্ত্রীদের সাথে বিছানায় সুখভোগ না করে ঘরবাড়ি ছেড়ে পথে-প্রান্তরে বেরিয়ে পড়তে আর আল্লাহ তাআলার নিকট কাকুতি-মিনতি করতে থাকতে।”[২৪১]
সুতরাং খাওফের গুণে গুণান্বিত ব্যক্তি (আল্লাহর ভয়ে খারাপ কাজ থেকে) বিরত থাকে ও পালিয়ে বেড়ায়।
আর খাশইয়াতের অধিকারী ব্যক্তি ইলমকে আঁকড়ে ধরার দিকে ধাবিত হয়।
এই দুই ব্যক্তির উদাহরণ হলো সেই দুই ব্যক্তির মতো, যাদের একজন চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কে কিছুই জানে না আর অপরজন সে সম্পর্কে বেশ অভিজ্ঞ। ফলে প্রথম ব্যক্তি আশ্রয় নেয় রোগ প্রতিরোধ করার দিকে এবং যাতে রোগাক্রান্ত না হয় সে ব্যবস্থা গ্রহণ করার দিকে। আর অভিজ্ঞ ব্যক্তি আশ্রয় নেয় ওষুধ ও দাওয়া গ্রহণের দিকে।
আবূ হাফস বলেছেন, 'খাওফ বা ভয় হলো আল্লাহর চাবুক, এর দ্বারা তাঁর দুয়ার থেকে পলায়নকারীদের তিনি সঠিক পথে রাখেন।[২৪২]
তিনি আরও বলেছেন, 'খাওফ বা আল্লাহভীতি হলো অন্তরের প্রদীপ, এর দ্বারা অন্তরের ভালো-মন্দ সবকিছু দেখা যায়। তুমি যাদেরকে ভয় করো তাদের প্রত্যেকের নিকট থেকে পালিয়ে বেড়াও, কিন্তু এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম কেবল আল্লাহ তাআলা। কারণ আল্লাহকে ভয় করার পরেও তাঁর কাছে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।'
আসলে আল্লাহকে ভয়কারী ব্যক্তি আল্লাহর নিকট থেকে পালিয়ে আল্লাহর দিকেই ফিরে যায়।
আবূ সুলাইমান বলেছেন, 'কোনো অন্তর আল্লাহর ভয় থেকে শূন্য হলে, তা ধ্বংস হয়ে যায়।' [২৪৩]
ইবরাহীম ইবনু সুফইয়ান বলেছেন, 'অন্তরে যখন খাওফ বা আল্লাহর ভয় স্থান পায়, তখন সেই ভয় তার নফস ও কুপ্রবৃত্তির চাহিদাগুলোকে জ্বালিয়ে দেয় এবং তার নিকট থেকে দুনিয়াকে দূরে রাখে। [২৪৪]
যুন-নূন মিসরি বলেন, 'মানুষ ততক্ষণ সোজা পথে চলতে থাকে, যতক্ষণ তাদের সাথে আল্লাহভীতি অবস্থান করে। আর যখন আল্লাহভীতি উধাও হয়ে যায়, তখন তারা পথ হারিয়ে ফেলে।' [২৪৫]
হাতিম আল-আসাম্মা বলেন, 'কোনো উত্তম স্থান পেয়ে ধোঁকাগ্রস্ত হোয়ো না। কারণ জান্নাতের চেয়ে উত্তম কোনো স্থান নেই, অথচ আদম সেখানে যার মুখোমুখি হবার তার মুখোমুখিই হয়েছেন! অধিক ইবাদাত দ্বারাও ধোঁকাগ্রস্ত হোয়ো না। কারণ ইবলীস দীর্ঘদিন যাবৎ ইবাদাত করার পরও যার সম্মুখীন হবার তার সম্মুখীনই হয়েছেন! অধিক ইলমের কারণেও ধোঁকাগ্রস্ত হোয়ো না। কারণ বালআম ইবনু বাউরা যা পাবার তা-ই পেয়েছে, অথচ সে ইসমে আ'যম জানত! আবার নেককার ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাৎ লাভের কারণেও প্রতারিত হোয়ো না। কারণ নবি -এর চেয়ে অধিক নেককার ও উত্তম মানুষ এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই, অথচ তাঁর শত্রু ও মুনাফিকরা তাঁর সাক্ষাৎ ও দর্শন লাভ করার দ্বারা কোনো উপকৃত হতে পারেনি।' [২৪৬]
খাওফ বা আল্লাহভীতি বান্দার জন্য সত্তাগতভাবে উদ্দেশ্য নয়, বরং (দুনিয়াতে) বিভিন্ন ইবাদাত ও আমলই উদ্দেশ্য। এ কারণেই যখন ভয়ের বস্তু (আখিরাতে) থাকবে না, তখন ভয়ও থাকবে না। কেননা জান্নাতের অধিবাসীদের কোনো ভয় নেই এবং তারা কখনো চিন্তিতও হবে না।
খাওফের সম্পর্ক হলো কাজকর্মের সাথে আর মহাব্বতের সম্পর্ক হলো সত্তা ও গুণাবলির সাথে। এ কারণেই জান্নাতে প্রবেশের পর আল্লাহর প্রতি ঈমানদারদের মহাব্বত বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। সেখানে তাদের কোনো ভয় থাকবে না। আর এই কারণে মহাব্বতের মানযিল খাওফের মানযিলের চেয়েও উঁচু ও মর্যাদাপূর্ণ।
ভারসাম্যপূর্ণ ও প্রশংসিত আল্লাহভীতি (al) হলো: যা ব্যক্তির মাঝে ও আল্লাহ তাআলার হারামকৃত বস্তুসমূহের মাঝে আড়াল সৃষ্টি করে দেয়, (তাকে পাপকাজ থেকে বিরত রাখে)। আর (ভয়ের এই ভারসাম্যপূর্ণ) সীমা যদি কেউ অতিক্রম করে, তা হলে সেই ব্যক্তির মাঝে হতাশা ও নিরাশা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অনুভূতি ও ইলম অর্জনের পরেই খাওফের সৃষ্টি হয়। সুতরাং যে বিষয়ে ইলম ও অনুভূতি নেই, সে বিষয়ে মানুষের ভয় সৃষ্টি হওয়া অসম্ভব।
খাওফ বা ভয় সৃষ্টি হওয়ার জন্য দুটি বিষয় সম্পর্কে জানা প্রয়োজন, এক. অপছন্দনীয় ও হারাম বস্তু সম্পর্কে জানা এবং দুই. সেই বস্তু পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার পথ ও কারণ সম্পর্কে জানা। হারাম বস্তু এবং সে পর্যন্ত পৌঁছার কারণ সম্পর্কে ব্যক্তির অনুভূতি ও ইলম অনুসারে তার মাঝে ভয় সৃষ্টি হবে। এই দুটির মধ্যে যেকোনো একটি সম্পর্কে উপলব্ধি ও জ্ঞানের কমতি হলে, সে অনুপাতে খাওফ বা আল্লাহভীতিতেও কমতি আসবে।
যে ব্যক্তির এই দৃঢ় বিশ্বাস থাকবে না যে, অমুক কারণ ও উপকরণ অমুক গুনাহ পর্যন্ত পৌঁছে দেয়, তা হলে সেই ব্যক্তি ওই কারণ ও উপকরণকে ভয় করবে না। আর যে ব্যক্তি কোনো কারণ সম্পর্কে জানে যে, তা গুনাহ পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেয়, কিন্তু এটা জানে না যে, তা কোন গুনাহ পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেয়, তার ভয়াবহতা কেমন, তাহলেও সে একে ভয় করার মতো ভয় করবে না। আর যদি সে কারণ এবং গুনাহ উভয়টি সম্পর্কেই জ্ঞান রাখে, তা হলে তার প্রকৃত খাওফ বা ভয় হাসিল হবে।
আল্লাহর দিকে সফর করার ক্ষেত্রে অন্তর একটি পাখির মতো। মহাব্বত হলো তার মাথা, ভয় ও আশা হলো তার দুটি ডানা। সুতরাং যখন মাথা ও দুই ডানা সুস্থ থাকবে, তখন পাখি ভালোভাবে উড়তে পারবে। আর যখন মাথা কেটে ফেলা হবে, তখন পাখি মারা যাবে। আর যখন দুই ডানা নষ্ট হয়ে যাবে, তখন সে শিকারী ও হিংস্র জন্তুর শিকারে পরিণত হবে।
সালাফগণ এটা পছন্দ করেছেন যে, সুস্থ থাকাবস্থায় আশার ডানার চেয়ে ভয়ের ডানা শক্তিশালী রাখবে। আর দুনিয়া থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় (অর্থাৎ মৃত্যুর সময়) ভয়ের ডানার চেয়ে আশার ডানা শক্তিশালী রাখবে। এটি হলো আবূ সুফইয়ান ও অন্যান্যদের তরীকা। তিনি বলেছেন, 'অন্তরের জন্য উচিত হলো (সুস্থ থাকাবস্থায়) তার ওপর ভয়েরই প্রাধান্য থাকবে আর যদি তার ওপর (সে সময়) আশা প্রাধান্য পায়, তা হলে অন্তর নষ্ট হয়ে যায়।[২৪৭]
অন্যান্যরা বলেছেন, 'অন্তরের পরিপূর্ণ অবস্থা হলো: আশা ও ভয় সমান সমান থাকা এবং মহব্বতের প্রাধান্য থাকা। আসলে মহব্বত হলো বাহন, আশা তাকে সামনে থেকে টানে এবং ভয় তাকে পেছন থেকে হাঁকিয়ে নিতে থাকে। অবশেষে আল্লাহ তাআলার দয়া ও করুণায় বান্দা মানযিল পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
টিকাঃ
[২৩১] সুরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৭৫।
[২৩২] সূরা মায়িদা, ৫:৪৪।
[২০৩] সূরা মুমিনূন, ২৩: ৫৭-৬১।
[২০৪] সূরা মুমিনূন ২৩:৬০।
[২০৫] তিরমিযি, ৩১৭৫; ইবনু মাজাহ, ৪১৯৮।
[২০৬] বাগাবি, তাফসীর, ৩/৩৬৮।
[২০৭] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ১/২৫৪।
[২৩৮] সূরা ফাতির, ৩৫: ২৮।
[২৩৯] বুখারি, ৫০৬৩।
[২৪০] বুখারি, ৬১০১।
[২৪১] তিরমিযি, ২৩১২; ইবনু মাজাহ, ৪১৯০।
[২৪২] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ১/২৫২।
[২৪৩] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ১/২৫৪।
[২৪৪] ইবনু কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৫/২৩৮।
[২৪৫] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ১/২৫৪।
[২৪৬] আবূ হামিদ গাযালি, ইহইয়াউ উলূমিদ দ্বীন, ৪/১৮৫।
[২৪৭] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ১/২৫৫।
📄 মানযিল : ভীত-সন্ত্রস্ত হওয়া (اَلْإِشْفَاقُ)
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো-ভীত-সন্ত্রস্ত হওয়ার মানযিল।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ بِالْغَيْبِ وَهُمْ مِّنَ السَّاعَةِ مُشْفِقُونَ "তারা না দেখেই তাদের পালনকর্তাকে ভয় করে এবং কিয়ামতের ভয়ে থাকে ভীত-সন্ত্রস্ত।"[২৪৮]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন,
وَأَقْبَلَ بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ يَتَسَاءَلُونَ قَالُوا إِنَّا كُنَّا قَبْلُ فِي أَهْلِنَا مُشْفِقِينَ فَمَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا وَوَقَانَا عَذَابَ السَّمُوْمِ “তারা একে অপরের দিকে মুখ করে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। তারা বলবে, 'আমরা ইতঃপূর্বে আমাদের বাড়িতে ভীত-সন্ত্রস্ত ছিলাম। অতঃপর আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করেছেন।”[২৪৯]
الْإِشْفَاقُ হলো সূক্ষ্ম ও কোমল ভয়। এটি হলো যাকে ভয় করা হয়, তার প্রতি দয়া মিশ্রিত কোমল ভয়। ইশফাকের সাথে খাওফের সম্পর্ক তেমন, রহমতের সাথে রা'ফাত (رَاْفَۃٌ)-এর সম্পর্ক যেমন। কারণ রা'ফাত হলো সূক্ষ্ম ও কোমল রহমত।
ইশফাক বা সূক্ষ্ম ভয় তখনই প্রকাশিত হয়, যখন কোনো আমল নষ্ট হওয়ার ব্যাপারে আশঙ্কা থাকে যে, তা সেই সমস্ত অর্থহীন আমলের মধ্যে গণ্য হবে কি না, যেগুলো সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَقَدِمْنَا إِلَى مَا عَمِلُوا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنَاهُ هَبَاءً مَّنْثُورًا “আমি তাদের কৃতকর্মের প্রতি মনোনিবেশ করব, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণার মতো করে দেবো।”[২৫০]
এগুলো হলো সেই আমল, যা আল্লাহর জন্য করা হয়নি অথবা তাঁর হুকুমমতো বা তাঁর রাসূলের সুন্নাহ মোতাবিক করা হয়নি।
সে এই ভয়ও করে যে, ভবিষ্যতে তার আমল নষ্ট হয়ে যাবে; হয়তো এই আমল পরিত্যাগ করার কারণে অথবা এমন গুনাহে লিপ্ত হওয়ার কারণে, যা সেই আমলকে নষ্ট করে দেবে। ফলে তা একেবারে নস্যাৎ হয়ে যাবে। আমল-নষ্ট-হয়ে-যাওয়া-ব্যক্তির অবস্থা হবে সেই ব্যক্তিদের মতো, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
أَيَوَدُّ أَحَدُكُمْ أَنْ تَكُونَ لَهُ جَنَّةٌ مِّنْ نَّخِيلٍ وَأَعْنَابٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ لَهُ فِيهَا مِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ وَأَصَابَهُ الْكِبَرُ وَلَهُ ذُرِّيَّةٌ ضُعَفَاءُ فَأَصَابَهَا إِعْصَارٌ فِيْهِ نَارٌ فَاحْتَرَقَتْ
"তোমাদের কেউ কি পছন্দ করে, তার একটি সবুজ শ্যামল বাগান থাকবে, সেখানে ঝরনাধারা প্রবাহিত হবে, সব রকম ফলে তা পরিপূর্ণ থাকবে এবং সে বার্ধক্যে পৌঁছবে, তার দুর্বল সন্তানসন্ততিও থাকবে, এমতাবস্থায় এ বাগানে একটি ঘূর্ণিবায়ু আসবে, যাতে আগুন রয়েছে, ফলে বাগানটি জ্বলেপুড়ে যাবে?”[২৫১]
উমর ইবনুল খাত্তাব একদিন সাহাবিদের জিজ্ঞাসা করলেন, 'এই আয়াতটি কাদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে, সে ব্যাপারে আপনাদের অভিমত কী?
তখন তারা বললেন, 'আল্লাহ তাআলাই অধিক জানেন।'
এতে উমর রেগে গিয়ে বললেন, 'বলো, 'আমরা জানি' অথবা 'আমরা জানি না।'
ইবনু আব্বাস বললেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, এ ব্যাপারে আমার অন্তরে কিছুটা ধারণা আছে।'
উমর বললেন, 'ভাতিজা, বলে দাও, নিজেকে তুচ্ছ ভেবো না।'
তখন ইবনু আব্বাস বললেন, 'এটা কর্মের দৃষ্টান্ত হিসেবে পেশ করা হয়েছে।'
উমর বললেন, 'কোন কর্মের?'
ইবনু আব্বাস বললেন, 'একটি কর্মের।'
উমর বললেন, 'এটি হচ্ছে সেই ধনী ব্যক্তির উদাহরণ, যে আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করতে থাকে, এরপর আল্লাহ তাআলা তার প্রতি শয়তানকে প্রেরণ করেন। ফলে সে গুনাহে লিপ্ত হয়; অবশেষে তার সকল সৎকর্মকে বরবাদ করে দেয়।' [২৫২]
টিকাঃ
[২৪৮] সূরা আম্বিয়া, ২১: ৪৯।
[২৪৯] সূরা তুর, ৫২: ২৫-২৭।
[২৫০] সূরা ফুরকান, ২৫: ২৩।
[২৫১] সূরা বাকারা, ২: ২৬৬।
[২৫২] বুখারি, ৪৫৩৮।
📄 মানযিল : নত হওয়া (اَلْإِخْبَاتُ)
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো—নত হওয়ার মানযিল।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَبَشِّرِ الْمُخْبِتِينَ “এবং বিনয়ীদের সুসংবাদ দাও।”[২৭৩]
এর পরের আয়াতে তাদের প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরেছেন—
الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَالصَّابِرِينَ عَلَى مَا أَصَابَهُمْ وَالْمُقِيمِي الصَّلَاةِ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُوْنَ “যাদের অবস্থা এই যে, আল্লাহর নাম স্মরণ করা হলে, তাদের হৃদয় কেঁপে ওঠে; যে বিপদই তাদের ওপর আসে, তার ওপর তারা সবর করে; সালাত কায়েম রাখে এবং আমি যা কিছু রিযক তাদেরকে দান করেছি, তা থেকে খরচ করে।”[২৭৪]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন,
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَأَخْبَتُوا إِلَى رَبِّهِمْ أُولَئِكَ أَصْحَابُ الْجَنَّةِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ “নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে এবং তাদের পালনকর্তার কাছে নত হয়েছে, তারাই জান্নাতের অধিবাসী; সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।” [২৭৫]
الخبث-এর মূল শাব্দিক অর্থ হলো: নিম্নভূমি, জমিনের নিচু অংশ। এই অর্থানুসারেই ইবনু আব্বাস ও কাতাদা الْمُخْبِنِينَ শব্দের ব্যাখ্যা করেছেন, তারা বলেছেন, 'তারা হলেন বিনয়ী ব্যক্তিবর্গ )ا ( الْمُتَوَاضِعُونَ
মুজাহিদ বলেছেন, 'মুখবিত হলো আল্লাহর প্রতি নিশ্চিন্ত বান্দা।।২৭৬]
তিনি আরও বলেছেন, 'আল-খন্ত' অর্থ: নিম্নভূমি।' ২৭৭]
ইমাম আখফাশ বলেছেন, 'তারা হলেন একাগ্রতার অধিকারী ব্যক্তিবর্গ। [২৭৮]
ইবরাহীম নাখায়ি বলেছেন, 'সালাত আদায়কারী একনিষ্ঠ ব্যক্তিগণ।[২৭৯]
কালবি বলেছেন, 'তারা হলেন কোমল হৃদয়ের অধিকারীগণ। [২৮০]
এই সমস্ত মতামত দুইটি অর্থের সাথে সম্পর্কিত: ১. বিনয় এবং ২. আল্লাহর প্রতি নিশ্চিন্ততা। আর এ কারণেই এই শব্দটির সাথে إلى যুক্ত করা হয়। কারণ তা নিশ্চিন্ততা, আল্লাহমুখিতা ও আল্লাহর প্রতি স্থিরতাকে অন্তর্ভুক্ত করে।
নত হওয়া বা ইখবাত হলো প্রথম মাকাম, (যা অর্জন করে নিলে) আল্লাহ-অভিমুখী ব্যক্তি দ্বিধাদ্বন্দ্ব, সন্দেহ-সংশয়, গাফলতি, অমনোযোগিতা এবং আগের অবস্থায় ফিরে যাবার প্রবণতা থেকে মুক্তি পায়। আল্লাহ-অভিমুখী ব্যক্তি সবসময় আল্লাহর দিকে পথ চলতে থাকে, যতদিন শ্বাসপ্রশ্বাস চলতে থাকবে তার পথচলা শেষ হবে না। বান্দার জন্য এই অবস্থা হাসিল হওয়াকে পানির (ঘাটের) সাথে তুলনা করা হয়েছে; দীর্ঘপথ-পাড়ি-দেওয়া-মুসাফির তার তৃষ্ণা পূরণ করতে এবং প্রয়োজন মেটাতে পানির যে ঘাটে অবতরণ করে, সেই ঘাট তাকে পরিতৃপ্তি দান করে, সফর পরিপূর্ণ করার জন্য তার থেকে সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব এবং সফরের কষ্টের কারণে বাড়ি ফেরার প্রবণতা দূর করে দেয়। অতঃপর যখন সে সেই পানিতে নামে, তখন তার থেকে সব সংশয়-সন্দেহ কেটে যায় এবং ঘরে ফিরে যাবার ইচ্ছা দূর হয়ে যায়।
ঠিক তেমনি সালিক বা আল্লাহর-পথের-পথিক যখন ইখবাত বা নত হওয়ার ঘাটে নামে, তখন সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব, সন্দেহ-সংশয় ও ফিরে যাওয়ার বাসনা থেকে সে মুক্তি পায়। ফলে পরবর্তী সফরের জন্য সে নিশ্চিন্ততার মানযিল লাভ করে এবং পূর্ণদ্যমে সফর অব্যাহত রাখে।
টিকাঃ
[২৭৩] সূরা হাজ্জ, ২২: ৩৪।
[২৭৪] সূরা হাজ্জ, ২২: ৩৫।
[২৭৫] সূরা হূদ, ১১: ২৩।
[২৭৬] বাগাবি, তাফসীর, ৫/৩৮৬।
[২৭৭] বাগাবি, তাফসীর, ৫/৩৮৬।
[২৭৮] বাগাবি, তাফসীর, ৫/৩৮৬।
[২৭৯] বাগাবি, তাফসীর, ৫/৩৮৬।
[২৮০] বাগাবি, তাফসীর, ৫/৩৮৬।
📄 মানযিল : অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাকা (اَلْوَرَعُ)
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো-অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাকার মানযিল।
আল্লাহ তাআলা বলেন, يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ “হে রাসূলগণ, পবিত্র বস্তু আহার করুন এবং সৎকাজ করুন। আপনারা যা করেন, আমি তা ভালোভাবেই জানি।”[৩০০]
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ “আপনার পোশাক পবিত্র রাখুন।”[৩০১]
কাতাদা ও মুজাহিদ বলেছেন, 'অর্থাৎ আপন সত্তাকে গুনাহ থেকে পবিত্র রাখুন। এখানে পোশাক বলে সত্তা উদ্দেশ্য নেওয়া হয়েছে।' ইবরাহীম নাখায়ি, দাহহাক, শা'বি, যুহরি-সহ আরও অনেক মুফাসসিরের অভিমত এটি।
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস বলেছেন, 'অর্থাৎ আপনি তা অবাধ্যতা ও বিশ্বাসঘাতকতা করার উদ্দেশ্যে পরিধান করবেন না।' অতঃপর তিনি বলেছেন, 'আপনি কি গায়লان ইবনু সালামা সাকাফির কথা শোনেননি—
وَإِنِّي بِحَمْدِ اللَّهِ لَا ثَوْبَ غَادِرٍ ... لَبِسْتُ وَلَا مِنْ غَدْرَةٍ أَتَقَنَّعُ
আল্লাহর শোকর আমি বিশ্বাসঘাতকের পোশাক পরি না, আবার বিশ্বাসঘাতকতার মুখোশেও আবৃত থাকি না।[৩০২]
আরবরা কোনো ব্যক্তিকে আমানতদারিতা ও সত্যবাদিতার গুণে গুণান্বিত করতে চাইলে বলে থাকে, (ظاهِرُ القِيابِ )পবিত্র কাপড়ের অধিকারী)। আর বিশ্বাসঘাতক ও পাপাচারীকে বলে, دَيْسُ القِيَابِ )নোংরা কাপড়ের অধিকারী)।
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, কাপড়কে নাপাকি থেকে পবিত্র রাখা, পবিত্রতার ফরজ হুকুমের মধ্যেই শামিল। কারণ এর দ্বারা আমল ও আখলাক পূর্ণতা পায়। কেননা প্রকাশ্য নাপাকি, অভ্যন্তরীণ নাপাকির সৃষ্টি করে। আর এ কারণেই আল্লাহর-সামনে-দাঁড়ানো-ব্যক্তিকে নাপাকি দূর করতে এবং তা থেকে দূরে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মূলকথা হলো : الْوَرَعُ অন্তরের নোংরা ও নাপাকিকে পবিত্র করে, যেমন পানি পোশাকের ময়লা ও নাপাকি পবিত্র করে। কাপড়ের মাঝে ও অন্তরের মাঝে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অনেক মিল রয়েছে। এই কারণে স্বপ্নে কেউ কাপড় দেখলে, তা তার অন্তর ও আত্মিক অবস্থার প্রমাণ বহন করে। এ দুটি একটি অপরটিকে বেশ প্রভাবিত করে। এ জন্য রেশম, স্বর্ণ ও হিংস্র প্রাণীর চামড়া পরিধান করতে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ এগুলো দাসত্ব ও একাগ্রতার সাথে সাংঘর্ষিক। কাপড় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও ময়লাযুক্ত হওয়া, উজ্জ্বল ও অনুজ্জ্বল হওয়া এবং কাপড়ের সুঘ্রাণ ও দুর্গন্ধ অন্তরে যে প্রকট প্রভাব ফেলে, তা কেবল অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিরাই উপলব্ধি করতে পারে। এমনকি তারা কোনটা নেককার ব্যক্তির কাপড় আর কোনটা বদকার ব্যক্তির কাপড়, তা তাদের অনুপস্থিতেই আলাদা করে চিনে নিতে পারে।
নবি ﷺ এক বাক্যে الْوَرَعُ-এর সমস্ত বিষয়কে একত্রিত করে দিয়েছেন—
مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ
"মানুষের ইসলামের সৌন্দর্য হচ্ছে অনর্থক কাজকর্ম পরিত্যাগ করা।"[৩০৩]
এই হাদীসটি অপ্রয়োজনীয় সবকিছু পরিত্যাগ করাকেই অন্তর্ভুক্ত করে; যেমন: কথা বলা, দৃষ্টি দেওয়া, শ্রবণ করা, ধরা, হাঁটাচলা করা, চিন্তা করা, এমনিভাবে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সমস্ত কাজকর্ম। নিঃসন্দেহে এই বাক্যটি زغ-এর ব্যাপারে পরিপূর্ণ ও ব্যাপক অর্থবহ।
ইবরাহীম ইবনু আদহাম বলেছেন, "ওয়ারা' হলো প্রতিটি সংশয়পূর্ণ বস্তু পরিত্যাগ করা এবং অপ্রয়োজনীয় বস্তু পরিহার করা। [৩০৪] এর অর্থ হলো অনর্থক বিষয়াদিতে নিজেকে না জড়ানো।
আল্লাহর রাসূল আবূ হুরায়রা-কে বলেছেন, يَا أَبَا هُرَيْرَةَ كُنْ وَرِعًا تَكُنْ أَعْبَدَ النَّاسِ “হে আবূ হুরায়রা, তুমি আল্লাহর অপছন্দনীয় কাজগুলো থেকে বেঁচে থাকো, তা হলে সব মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ইবাদাতকারী বলে গণ্য হবে।”[৩০৫]
শিবলি বলেছেন, 'ওয়ারা' হলো আল্লাহ ছাড়া বাকি সবকিছু থেকে দূরে থাকা।'[৩০৬]
ইসহাক ইবনু খালাফ বলেছেন, 'অনর্থক কথাবার্তা থেকে বেঁচে থাকা, স্বর্ণ- রুপার আকাঙ্ক্ষা থেকে বেঁচে থাকার চেয়েও বেশি কঠিন। এমনিভাবে স্বর্ণ-রুপার প্রতি বিমুখতা প্রদর্শন করার চেয়ে ক্ষমতার প্রতি বিমুখতা প্রদর্শন করা বেশি কঠিন। কারণ স্বর্ণ-রুপা খরচ করা হয় ক্ষমতা অর্জন করার জন্য।[৩০৭]
আবূ সুলাইমান দারানি বলেছেন, 'অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাকা হলো দুনিয়াবিমুখতার প্রথম ধাপ। যেমন অল্পেতুষ্টি হলো সন্তুষ্টির প্রথম ধাপ।'[৩০৮]
ইয়াহইয়া ইবনু মুআয বলেছেন, 'ওয়ারা' হলো দুই প্রকার: একটি বাহ্যিক; তা হলো সবকিছু আল্লাহর জন্যই করা, আরেকটি হলো অভ্যন্তরীণ; আর তা হলো আপনার অন্তরে আল্লাহ ছাড়া আর কারও জন্য স্থান না থাকা।'[৩০৯]
ইউনুস ইবনু উবাইদ বলেছেন, 'اورغ হলো সব ধরনের সন্দেহ-সংশয় থেকে বেরিয়ে যাওয়া এবং প্রতিটি মুহূর্তে নফসের হিসাব নিতে থাকা।।০১০।
সুফইয়ান সাওরি বলেছেন, 'ওয়ারা' এর চেয়ে সহজ কিছু আমি আর দেখিনি, অন্তরে যা খটকা সৃষ্টি করে তা পরিত্যাগ করুন।'[৩১১]
হাসান বাসরী একটি বালককে প্রশ্ন করলেন, 'দ্বীনের মূল কী?' সে জবাব দিলো, '(অন্তরের) অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাকা )اورغ(। তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, 'এর বিপদ কী?' সে উত্তরে বলল, 'লোভ-লালসা।' এই কথা শুনে হাসান অবাক হলেন।[৩১২]
হাসান বলেছেন, 'সামান্য পরিমাণ ওয়ারা' হাজার (নফল) সালাত-সিয়াম থেকেও উত্তম। [৩১৩]
আবূ হুরায়রা বলেছেন, 'আগামীকাল আল্লাহর সঙ্গী হবে-ওয়ারা' ও যুহদের অধিকারী ব্যক্তিগণ।'[৩১৪]
সালাফদের কোনো একজন বলেছেন, 'কোনো বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত তাকওয়া বা খোদাভীতির হাকীকত পর্যন্ত পৌঁছুতে পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত-না ক্ষতির আশঙ্কায় এমন বস্তুও পরিত্যাগ করে, যার মধ্যে কোনো ক্ষতি নেই।'[৩১৫]
সাহাবিদের মধ্যে একজন বলেছেন, 'আমরা হারাম বস্তুসমূহের একটি দরজায় ঢুকে পড়ার আশঙ্কায় হালাল বস্তুসমূহের সত্তরটি দরজাও পরিত্যাগ করতাম।[৩১৬]
টিকাঃ
[৩০০] সূরা মুমিনূন, ২৩ : ৫১।
[৩০১] সূরা মুদ্দাসসির, ৭৪ : ৪।
[৩০২] তাবারি, তাফসীর, ২৩/৪০৫।
[৩০৩] তিরমিযি, ২৩১৭; ইবনু মাজাহ, ৩৯৭৬।
[৩০৪] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ১/২৩৩।
[৩০৫] ইবনু মাজাহ, ৪২১৭; তিরমিযি, ২৩০৫।
[৩০৬] বাইহাকি, আয-যুহদুল কাবীর, ৮৫৭।
[৩০৭] ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশ্ক, ৮/২০৫।
[৩০৮] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৯/২৫৭।
[৩০৯] বাইহাকি, আয-যুহদুল কাবীর, ৮৫৬।
[৩১০] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ১/২৩৫।
[৩১১] আবদুল কাদীর জীলানি, আল-গুনইয়া লি-তালিবী তরীকিল হাক্ক, ১/২৫২।
[৩১২] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ১/২৩৬।
[৩১৩] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ১/২৩৬।
[৩১৪] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ১/২৩৬।
[৩১৫] এর অনুরূপ হাদীস দেখুন-তিরমিযি, ২৪৪১; ইবনু মাজাহ, ৪২১৫।
[৩১৬] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ১/২৩৩; সাহাবিটি হলেন আবূ বকর।