📘 মাদারিজুস সালিকীন 📄 উল্লেখিত দলীলসমূহের জবাব

📄 উল্লেখিত দলীলসমূহের জবাব


জবাব: আপনারা যা বলেছেন, সেগুলো হলো মূল বিষয়বস্তুর বাইরের এবং বিতর্কের স্থান থেকে অনেক দূরের আলোচনা, যার সাথে আলোচ্যবিষয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ কোনো বস্তু ইন্দ্রিয়গতভাবে মজাদার ও স্বাদযুক্ত হওয়া এটা প্রমাণ করে না যে, তা বৈধ বা হারাম, আবার অপছন্দনীয় বা পছন্দনীয় হওয়াও বুঝায় না। কেননা এই স্বাদ ও সুন্দর উপলব্ধি শারীআর পাঁচটি হুকুম: হারাম, ওয়াজিব, মাকরূহ, মুস্তাহাব ও মুবাহ-সবগুলোর মধ্যেই পাওয়া যায়। সুতরাং সেই ব্যক্তি কীভাবে এগুলোর দ্বারা এর বৈধতার ওপর দলীল দিতে পারে, যে ব্যক্তি দলীলের শর্তসমূহ ও দলীল প্রয়োগ করার স্থানসমূহ সম্পর্কে জ্ঞান রাখে?!
এটি তো সেই ব্যক্তির অবস্থার মতো হয়ে যায়, যে ব্যক্তি যিনা-ব্যভিচার বৈধ হওয়ার ওপর দলীল পেশ করে যে, এর সম্পাদনকারী স্বাদ অনুভব করে। আসলে কোনো হারাম কাজই কি লায্যাত বা স্বাদ শূন্য হয়? বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ কি এমন মজা ও স্বাদ থেকে খালি হয়, যার শ্রবণে কান প্রশান্তি পায় না? বাদ্যযন্ত্রকে নবি হারাম বলেছেন এবং সহীহ সনদে প্রমানিত আছে যে, তাঁর উম্মাতের মধ্যে একটা দল তা হালাল মনে করবে। আলিমগণ কিছু কিছু বাদ্যযন্ত্র হারাম হওয়ার ওপর একমত হয়েছেন; তবে অধিকাংশ আলিমের মত হলো সমস্ত বাদ্যযন্ত্রই হারাম। এমনিভাবে সুন্দর আওয়াজ শ্রবণের কারণে বাচ্চা শিশু বা উটের স্থির হয়ে যাওয়া কি তা হালাল বা হারাম হওয়ার দলীল হতে পারে?
গানবাজনা বৈধ করার জন্য এর চেয়েও আশ্চর্যজনক দলীল হলো-আল্লাহ তাআলা সুন্দর সুর সৃষ্টি করেছেন এবং তা ব্যক্তির জন্য অতিরিক্ত একটি নিয়ামাত। (তাই গানবাজনা বৈধ।)
সুতরাং তাকে বলা হবে: সুন্দর-সুদৃশ্য চেহারা কি অতিরিক্ত নিয়ামাত নয়? তা কী আল্লাহর সৃষ্টি ও দান নয়? এই কারণে কি কোনো শর্ত বা কানূন ছাড়াই এর দ্বারা উপভোগ করা ও স্বাদ নেওয়া বৈধ হয়ে যাবে?
আর আল্লাহ তাআলা গাধার আওয়াজকে নিকৃষ্ট বলেছেন বলে কি মিউজিকের সাথে আনন্দদায়ক ও সুরেলা সুরও বৈধ হতে পারে?
এর চেয়েও আশ্চর্যজনক হলো: গান শোনা বৈধ হওয়ার ব্যাপারে জান্নাতিদের শ্রবণ দ্বারা দলীল দেওয়া। তা হলে তো এর চেয়েও উপযুক্ত হলো মদ হালাল হওয়ার ব্যাপারে দলীল দেওয়া। কারণ জান্নাতে তো মদও থাকবে। এখন যদি বলেন, মদ হারাম হওয়ার ওপর ভিন্ন দলীল আছে; কিন্তু শ্রবণ হারাম হওয়ার ওপর কোনো দলীল নেই।
তা হলে বলা হবে: এটি তো এক ইস্তিদলাল বা দলীল উপস্থাপন। আর জান্নাতিদের জন্য বৈধ তাই দুনিয়াবাসীদের জন্যও বৈধ-এটি ভিন্ন আরেকটি ইস্তিদলাল। সুতরাং আপনি জান্নাতবাসীদের জন্য বৈধ বলে যে দলীল পেশ করেছেন, তা বাতিল দলীল, এতে সত্য অনুসন্ধানী কোনো ব্যক্তিই সন্তুষ্ট হবে না।
আর আপনি যে বললেন, 'শ্রবণ হারাম হওয়ার ওপর কোনো দলীল নেই' এর দ্বারা আপনার উদ্দেশ্য কী? কোন ধরনের শ্রবণ ও কোন ধরনের বিষয় উদ্দেশ্য নিয়েছেন? কারণ এগুলোর মধ্যে হারাম, মাকরূহ, মুবাহ, ওয়াজিব ও মুস্তাহাব বিভিন্ন শ্রেণি রয়েছে। সুতরাং আপনি একটি প্রকারকে নির্দিষ্ট করুন; যাতে বৈধ-অবৈধ প্রমাণ করা যায়। যদি আপনি বলেন, কবিতা (কাসীদা) শ্রবণ। আপনাকে বলা হবে, কোন ধরনের কবিতা আপনার উদ্দেশ্য? যার দ্বারা আল্লাহ, তাঁর রাসূল, দ্বীন ও কিতাবের প্রশংসা করা হয় আর তাঁর শত্রুদের জবাব দেওয়া হয়?
এ রকম বিষয় তো মুসলিমরা সবসময় বর্ণনা করেন, শ্রবণ করেন এবং পরস্পর তা নিয়ে আলোচনা করে থাকেন। এটিই রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর সাহাবিগণ শ্রবণ করেছিলেন এবং এর ওপরই তিনি পুরস্কার দিয়েছিলেন, হাসসান -কে এর ওপরই উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। এই বিষয়টিতেই শয়তানি শ্রবণের অধিকারীরা ধোঁকা খেয়েছে। ফলে তারা বলতে শুরু করেছে: সেগুলো কবিতা ছিল আর আমরাও কবিতাই শুনি। হ্যাঁ তা হলে তো সুন্নাতও কথা, বিদআতও কথা, তাসবীহও কথা, গীবতও কথা, দুআও কথা আবার অপবাদ দেওয়াও কথা (এসব কি এক ও বৈধ?)। রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবায়ে কেরাম কি আপনাদের মতো এ রকম শয়তানি শ্রবণে কখনো জড়িত হয়েছেন, যার অধিকাংশই ফাসাদ ও বিভ্রান্তিমূলক বিষয়াদিতে পরিপূর্ণ?
এর আরেকটি দৃষ্টান্ত হলো: রাসূলুল্লাহ ﷺ সুমিষ্ট সুরে কুরআন তিলাওয়াত করা এবং তা শ্রবণ করাকে পছন্দ করেছেন, অনুমতি দিয়েছেন এবং আল্লাহ তাআলা তা ভালোবাসেন-এই বিষয়টি তাদের ধোঁকায় ফেলে রেখেছে। ফলে তারা এই পছন্দ করা ও প্রশংসা করার বিষয়টিকে নারী, দাড়িহীন বালক ও অন্যান্যদের আওয়াজের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা শুরু করে দিয়েছে; যেগুলো বাদ্যযন্ত্রের সাথে মিশ্রিত, যাতে উল্লেখ করা হয় দেহের আকার-আকৃতি, স্তন, কোমর, চোখের বর্ণনা ও তার কারুকার্য, কালো চুল, যৌবনের সৌন্দর্য, গালের উপস্থাপনা, মিলন ও এতে বাধাপ্রাপ্ত হওয়া, প্রেম-ভালোবাসা ও বিচ্ছেদ হওয়ার কথা এবং এ রকম আরও বিভিন্ন দিকের কথা; যা অন্তরের জন্য মদপান করার চেয়েও বেশি ক্ষতিকর।
এর চেয়েও আশ্চর্যজনক হলো: যে শ্রবণ উপরিউক্ত বিষয়গুলোর সাথে মিশ্রিত, তার বৈধতার জন্য দলীল পেশ করা হয় ঈদ ও খুশি-আনন্দের দিনে ছোটো একজন মেয়ের নিকট দুজন অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালিকার গীত গাওয়ার দ্বারা; তাও আবার তারা আরবদের সাহসিকতা, যুদ্ধ-বিগ্রহ, উত্তম চরিত্র ও লাজুকতা সমৃদ্ধ কতিপয় শ্লোক আবৃত্তি করছিল। সেগুলো কোথায় আর (আপনারা যেগুলোর কথা উল্লেখ করেন) সেগুলো কোথায়?!
আশ্চর্যের হলো উপরিউক্ত এই হাদীসটিই তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড়ো দলীল। কারণ আবু বকর এটিকে বলেছিলেন, مَزْمُوْرًا مِنْ مَّزَامِيْرِ الشَّيْطَانِ 'শয়তানের বাঁশিসমূহের মধ্যে একটি বাঁশি' আর রাসূল ﷺ এটিকে সমর্থন করেছেন, তবে শারীআতের দায়িত্বপ্রাপ্ত নয় এমন দুজন নাবালেগা মেয়ের জন্য অনুমতি দিয়েছেন, যা গাওয়া ও শোনার মধ্যে কোনো ফাসাদ ও অনিষ্ট নেই। এটি কি কোনোভাবে তারা যে গানবাজনার কথা বলে-যাতে কত কী অন্তর্ভুক্ত থাকে-তার বৈধতার ওপর প্রমাণ বহন করে?! সুবহানাল্লাহ! কীভাবে বোধবুদ্ধি ও চিন্তাভাবনা বিভ্রান্ত হয়ে গেছে?
এই সবগুলোর চেয়ে আশ্চর্যের হলো: আল্লাহর রাসূল ﷺ যে কবিতা শ্রবণ করেছেন, যাতে হক ও তাওহীদ অন্তর্ভুক্ত ছিল, তার মাধ্যমে এগুলোর বৈধতার প্রমাণ দেওয়া! কেউ কি ব্যাপকভাবে কবিতা পাঠ, তা শ্রবণ করা এবং তা নিয়ে আলোচনা করাকে হারাম বলেছে? মাকড়সার ঘরের ন্যায় কত দুর্বল বিষয়কে তারা আঁকড়ে ধরে রয়েছে!
এর চেয়েও আশ্চর্যের হলো: পাখির সুন্দর ও মনোহারী আওয়াজ বৈধ হওয়ার কারণে গানবাজনাকেও হালাল বলে দলীল দেওয়া। এটি ঠিক তাদের ন্যায়, যারা সুদকে হালাল বলে আর দলীল দেয়—
إِنَّمَا الْبَيْعُ مِثْلُ الرِّبَا
“ব্যবসা তো সুদেরই মতো।”[২৩০]
কোথায় ডালে ডালে পাখির সুর আর কোথায় নারীসদৃশ দাড়িগোঁফহীন বালকের সুর? যা প্রত্যেক প্রেমিক-প্রেমিকার অন্তরকে মিলিত হতে উদ্বুদ্ধ করে! কোথায় এর ফিতনা আর কোথায় ঘুঘু-কবুতর আর বুলবুলির মতো পাখির আওয়াজের দরুন ফিতনা?!

টিকাঃ
[২২৯] বুখারি, ৫৫৯০; আবূ দাউদ, ৪০৩৯।
[২৩০] সূরা বাকারা, ২: ২৭৫।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية