📄 আল্লাহ তাআলা যে শ্রবণের ব্যাপারে প্রশংসা করেছেন
প্রথম প্রকার শ্রবণের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা কুরআনে প্রশংসা করেছেন, এর আদেশ দিয়েছেন, যারা তাতে লিপ্ত তাদের প্রশংসা করেছেন, যারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তাদের নিন্দা করেছেন, অভিশাপ দিয়েছেন এবং তাদেরকে প্রাণী-পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট ও পথভ্রষ্ট বলে ঘোষণা করেছেন, তারা জাহান্নামের আগুনের ভেতরে জ্বলতে থাকবে আর বলবে,
لَوْ كُنَّا نَسْمَعُ أَوْ نَعْقِلُ مَا كُنَّا فِي أَصْحَابِ السَّعِيرِ )
“যদি আমরা শুনতাম অথবা বুদ্ধি খাটাতাম, তা হলে আমরা এ জ্বলন্ত আগুনের অধিবাসীদের মধ্যে থাকতাম না।” [২০৩]
এটি হলো সেই সমস্ত আয়াত শ্রবণ করা, যা আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ -এর ওপর অবতীর্ণ করেছেন।
এই শ্রবণই হলো ঈমানের ভিত্তি, যার ওপর ঈমান প্রতিষ্ঠিত। এটি তিন প্রকার: ১. বাহ্যিকভাবে কানের মাধ্যমে শ্রবণ, ২. বোঝা ও উপলব্ধির জন্য শ্রবণ এবং ৩. সাড়া দেওয়া ও কবুল করার জন্য শ্রবণ।
কুরআনে এই তিন প্রকার শ্রবণের আলোচনাই রয়েছে।
১. বাহ্যিকভাবে কানের মাধ্যমে শ্রবণ: জিনদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে, তাদের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
إِنَّا سَمِعْنَا قُرْآنًا عَجَبًا يَهْدِي إِلَى الرُّشْدِ فَآمَنَّا بِهِ
"আমরা এক বিস্ময়কর কুরআন শুনেছি; যা সত্য ও সঠিক পথের নির্দেশনা দেয়, তাই আমরা তার ওপর ঈমান এনেছি।” [২০৪]
এটি হলো ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে শ্রবণ; যার সাথে ঈমান ও সাড়া দেওয়াও যুক্ত হয়েছে।
২. বোঝা ও উপলব্ধি করার জন্য শ্রবণ: এটি উপেক্ষাকারী ও গাফিলদের মধ্যে পাওয়া যায় না। আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَإِنَّكَ لَا تُسْمِعُ الْمَوْتَى وَلَا تُسْمِعُ الصُّمَّ الدُّعَاءَ إِذَا وَلَّوْا مُدْبِرِينَ
"আপনি মৃতদের শুনাতে পারবেন না এবং এমন বধিরদেরও নিজের আহ্বান শুনাতে পারবেন না, যারা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে চলে যায়।”[২০৫]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
إِنَّ اللَّهَ يُسْمِعُ مَنْ يَشَاءُ وَمَا أَنْتَ بِمُسْمِعٍ مَّنْ فِي الْقُبُورِ
"আল্লাহ যাকে ইচ্ছা শুনান, কিন্তু আপনি তাদেরকে শুনাতে পারবেন না, যারা কবরে রয়েছে।”[২০৬]
এখানে আল্লাহ তাআলার বিশেষত্ব হলো: বুঝানো ও উপলব্ধি করানোর জন্য শুনানো। অন্যথায় যে ব্যাপক শ্রবণের দ্বারা দলীল প্রতিষ্ঠিত[২০৭] হয়, তাতে কোনো বিশেষত্ব নেই। (তা আল্লাহও যেমন শুনাতে পারেন, নবি-ও শুনাতে পারেন।) এই প্রকার শ্রবণের ব্যাপারে আরেকটি আয়াত হলো: وَلَوْ عَلِمَ اللَّهُ فِيهِمْ خَيْرًا لَّأَسْمَعَهُمْ وَلَوْ أَسْمَعَهُمْ لَتَوَلَّوْا وَهُمْ مُّعْرِضُونَ
"আল্লাহ যদি জানতেন, এদের মধ্যে সামান্য পরিমাণও কল্যাণ আছে, তা হলে নিশ্চয়ই তিনি তাদেরকে শুনিয়ে দিতেন। (কিন্তু কল্যাণ ছাড়া) তিনি যদি তাদের শুনাতেন, তা হলে তারা মুখ ফিরিয়ে পালিয়ে যেত।” [২০৮]
অর্থাৎ সেই কাফিরদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা যদি জানতেন যে, তারা কবুল করবে ও মানবে, তা হলে অবশ্যই তিনি তাদের তা বুঝিয়ে দিতেন। নতুবা তারা তো বাহ্যিকভাবে তা শুনেছেই। وَلَوْ أَسْمَعَهُمْ لَتَوَلَّوْا وَهُمْ مُّعْرِضُونَ
"তিনি যদি তাদেরকে শুনাতেন, তা হলে তারা মুখ ফিরিয়ে পালিয়ে যেত।”
অর্থাৎ যদি তিনি তাদেরকে বুঝিয়ে দিতেন, তা হলে তারা তা মানত না এবং যা বুঝেছে, তার দ্বারা উপকৃত হতো না। কারণ তাদের অন্তরে উপেক্ষা করা ও মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা প্রকট; যা শোনা বিষয় থেকে তাদেরকে উপকৃত হতে বাধা দেয়।
৩. সাড়া দেওয়া ও কবুল করা জন্য শ্রবণ: মুমিন বান্দাদের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا "আমরা নির্দেশ শুনেছি এবং অনুগত হয়েছি।"[২০৯]
এটি হলো সাড়া দেওয়া ও গ্রহণ করার জন্য শ্রবণ করা, যা আনুগত্যের ফল।
তবে সঠিক কথা হলো: এই আয়াতটি শ্রবণের তিনটি প্রকারকেই শামিল করে, তারা এই খবর দিয়েছে যে, তাদের যা বলা হয়েছে তারা তা শুনেছে, উপলব্ধি করেছে এবং তা মেনে নিয়েছে।
মূলকথা: নৈকট্যশীল অতি বিশেষ ব্যক্তিদের শ্রবণ হলো: এই তিনটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই কুরআন শ্রবণ করা-নিজ কানে শোনা, উপলব্ধি করা এবং তা মেনে নেওয়া। পবিত্র কুরআনে যে শ্রবণের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা প্রশংসা করেছেন, যা শোনার জন্য তাঁর ওলিদের আদেশ করেছেন এবং শ্রবণের অধিকারী ব্যক্তিদের যে সুসংবাদ দিয়েছেন, তার প্রতিটিই হলো এই প্রকারের শ্রবণের অন্তর্ভুক্ত।
এটি হলো আয়াত শ্রবণ, কবিতা শ্রবণ নয়। কুরআন শ্রবণ, শয়তানের আওয়াজ (গান-মিউজিক) শ্রবণ নয়। সত্য কথা ও হিদায়াতের বাণী শ্রবণ, কোনো ছন্দ শ্রবণ নয়। নবি, রাসূল ও মুমিনদের কথা শ্রবণ, গায়ক ও বাদকদের সুর শ্রবণ নয়। আসমান-জমিনের প্রতিপালকের কালাম শ্রবণ, কবিদের কাব্য ও কবিতা শ্রবণ নয়। এই সমস্ত শ্রবণ অন্তরকে চালিত করে অদৃশ্যের মহাজ্ঞানী আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছে দেয়, রূহকে খুশি ও আনন্দের জগতে টেনে নেয়, এটি দমে-যাওয়া-ইচ্ছেগুলোকে সুউচ্চ মর্যাদা ও মর্তবা অর্জনের জন্য জাগ্রত করে, ঈমানের প্রতি আহ্বান করে, জান্নাতের পথপ্রদর্শন করে, সকাল-সন্ধ্যা অন্তরকে ডাকতে থাকে, ভোর হওয়ার আগে বলে উঠে,
حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ، حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ 'কল্যাণের পথে আসুন, কল্যাণের পথে আসুন।'
যে ব্যক্তি এই প্রকার শ্রবণে অভ্যস্ত হয় দলীল উপস্থাপন করা, অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন উপদেশ দেওয়া, কোনো প্রজ্ঞার স্মরণ, কোনো আয়াত সম্পর্কে চিন্তাভাবনা, ভালো কাজের জন্য পথ দেখানো, কোনো গোমরাহিকে প্রতিহত করা, পথভোলা কাউকে পথ দেখানো, অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসা, কোনো কল্যাণকর কাজের আদেশ করা, কোনো ক্ষতিকর ও অনিষ্টকর বস্তু থেকে নিষেধ করা ইত্যাদি থেকে সে কখনো অনুপস্থিত থাকে না। (সে গভীর ধ্যানে শ্রবণ করার কারণে সবকিছু তার সামনে উপস্থিত থাকে।)
এমনিভাবে আলোর পথে নিয়ে যাওয়া, অন্ধকার থেকে বের করা, কুপ্রবৃত্তির চাহিদাকে দমিয়ে রাখা, তাকওয়া অবলম্বন করতে উদ্বুদ্ধ করা, বিচক্ষণতা শাণিত হওয়া, প্রাণবন্ত হওয়া, শক্তিশালী হওয়া, সুস্থ থাকা, নিরাপদ থাকা, মুক্তি পাওয়া, সংশয়-সন্দেহ দূরীভূত করা, দলীল-প্রমাণ সুস্পষ্ট করা, হককে হক হিসেবে আর বাতিলকে বাতিল হিসেবে প্রকাশিত করা ইত্যাদি বিষয়গুলো থেকেও সে বঞ্চিত থাকে না।
টিকাঃ
[২০৩] সূরা মুল্ক, ৬৭: ১০।
[২০৪] সূরা জিন, ৭২: ১-২।
[২০৫] সূরা রূম, ৩০:৫২।
[২০৬] সূরা ফাতির, ৩৫: ২২।
[২০৭] অর্থাৎ কেউ এটা বলতে পারবে না যে, আমি শুনিনি, আমি জানিনি, আমাকে শুনানো হয়নি। আসলে শোনা এক জিনিস আর তা বোঝা ও উপলব্ধি করা আরেক জিনিস।
[২০৮] সূরা আনফাল, ৮: ২৩।
[২০৯] সূরা বাকারা, ২: ২৮৫।
📄 যে শ্রবণকে আল্লাহ তাআলা ঘৃণা করেন
শ্রবণের দ্বিতীয় প্রকার: এই প্রকারের শ্রবণকে আল্লাহ তাআলা ঘৃণা করেছেন, অপছন্দ করেছেন এবং যারা এই প্রকার থেকে বেঁচে থাকে, তিনি তাদের প্রশংসা করেছেন। আর দ্বিতীয় প্রকারটি হলো-প্রত্যেক ওই শ্রবণ, যা ব্যক্তির অন্তর ও দ্বীনের ক্ষেত্রে ক্ষতি সাধন করে। যেমন: সব ধরনের বাতিল বিষয়বস্তু শ্রবণ করা; তবে তা প্রতিহত করার জন্য বা তা থেকে উপদেশ গ্রহণ করার জন্য বা তার বিপরীত বিষয়ের সৌন্দর্য ও উপকারিতা জানিয়ে দেওয়ার জন্য হলে ভিন্ন কথা। কারণ কোনো বস্তু খারাপ হলে তার বিপরীত দিকটি ভালো হয়।
এই প্রকার শ্রবণের একটি উদাহরণ হলো: অনর্থক কিছু শোনা; আল্লাহ তাআলা যার পরিত্যাগকারী ও উপেক্ষাকারীর প্রশংসা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَإِذَا سَمِعُوا اللَّغْوَ أَعْرَضُوا عَنْهُ
“তারা যখন অনর্থক কথাবার্তা শ্রবণ করে, তখন তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।"[২১০]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন,
وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا "যখন তারা খেল-তামাশার নিকট দিয়ে যায়, তখন ভদ্রভাবে চলে যায়।"[২১১]
মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়্যা বলেছেন, 'এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো গানবাজনা।'
হাসান বাসরী ও অন্যান্যরা বলেছেন, 'তারা তা শোনা থেকে নিজেদেরকে সম্মানিত মনে করে।'[২১২]
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ বলেছেন,
الْغِنَاءُ يُنْبِتُ النِّفَاقَ فِي الْقَلْبِ كَمَا يُنْبِتُ الْمَاءُ الْبَقْلَ 'গানবাজনা অন্তরে নিফাক সৃষ্টি করে, যেমন পানি উদ্ভিদ উৎপন্ন করে।'[২১৩]
এটি সেই ব্যক্তির কথা, যিনি গানবাজনার প্রভাব ও পরিণতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখেন। কারণ যে এতে অভ্যস্ত হয়, তার অন্তরে নিফাক সৃষ্টি হয়, কিন্তু সে টেরও পায় না। যদি সে নিফাকের প্রকৃত অর্থ ও চূড়ান্ত পরিণতি জানত, তা হলে তার অন্তরে সে তা অবশ্যই দেখতে পেত। কেননা কোনো ব্যক্তির অন্তরে গানবাজনার প্রতি ভালোবাসা এবং কুরআনের প্রতি ভালোবাসা কখনো একসাথে অবস্থান করতে পারে না। একটি অপরটিকে বিদায় করে দেয়। আমি নিজে এবং আরও অনেকেই এটা প্রত্যক্ষ করেছেন যে, যারা গানবাজনা শোনে, তাদের নিকট কুরআন পাঠ ও তা শ্রবণ করা অনেক ভারী হয়ে যায়, কুরআনের সাথে তাদের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন থাকে, (সালাতে) বেশিক্ষণ তিলাওয়াত করলে বিরক্তিতে তারা তিলাওয়াতকারীর ওপর চেঁচামেচি শুরু করে, যা তিলাওয়াত করা হয়, তা তাদের অন্তরে কোনো উপকার পৌঁছায় না। ফলে তা প্রাণবন্ত হয় না, আনন্দিতও না। হয় না এবং কুরআনের বিভিন্ন সুসংবাদ ও কঠিন শাস্তির ভীতিপ্রদর্শনও তাদের মাঝে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। অপরদিকে যখন তারা শয়তানের সুর (গানবাজনা, মিউজিক) শ্রবণ করে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ! তখন কীভাবে তাদের আওয়াজগুলো থেমে যায়, সমস্ত কাজকর্ম থেকে তারা অবসর হয়, তাদের অন্তর প্রশান্তি পায়, এতে তাদের প্রাণচাঞ্চল্য বেড়ে যায়, তাদের বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি দেখে বোঝা যায়, তারা এতে কতটা নিমগ্ন, এর জন্য তারা পয়সা খরচ করতে সামান্যতম দ্বিধা অনুভব করে না, রাতের পর রাত জেগে থাকে, দীর্ঘ সময় ব্যয়েও তাদের কোনো বিরক্তি, ক্লান্তি কিংবা অবসাদ আসে না। তারা রাত আরও দীর্ঘ হওয়ার কামনা করে! আসলে এগুলো যদি নিফাক না হয়, তবে নিশ্চিতভাবেই তা নিফাক সৃষ্টির ভিত্তি ও বুনিয়াদ।
টিকাঃ
[২১০] সূরা কাসাস, ২৮:৫৫।
[২১১] সূরা ফুরকান, ২৫: ৭২।
[২১২] বাগাবি, তাফসীর, ৬/৯৮-৯৯।
[২১৩] 'কাশফুল খফা' গ্রন্থকার বলেন, 'ইমাম নববি বলেছেন, 'এটি সহীহ নয়'।'
📄 যারা গানবাজনাকে বৈধ বলে তাদের দলীলসমূহ
সবচেয়ে আশ্চর্যের হলো: অনেকেই দলীল পেশ করে যে, এই প্রকারের শ্রবণ হলো সৃফিয়ায়ে কেরামের রীতিনীতি এবং এটি বৈধ; কারণ তা সুমিষ্ট ও হৃদয়গ্রাহী, এর দ্বারা অন্তর স্বাদ অনুভব করে এবং আরাম পায়। ছোটো বাচ্চাও সুন্দর সুর শুনে শান্ত হয়ে যায়। গীত গাওয়ার ফলে উটও তার হাঁটার ক্লান্তি এবং বোঝা বহন করার কষ্ট সহ্য করে নেয়, তার জন্য সামনে এগিয়ে যাওয়া সহজ হয়।। আবার সুন্দর সুর ও কণ্ঠস্বর হলো আল্লাহর দেওয়া একটি নিয়ামাত এবং সৃষ্টি-অবয়বের অতিরিক্ত একটি দান। আরেকটি কারণ হলো আল্লাহ তাআলা কর্কশ আওয়াজের নিন্দা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
إِنَّ أَنْكَرَ الْأَصْوَاتِ لَصَوْتُ الْحَمِيْرِ
“নিঃসন্দেহে সব আওয়াজের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ হচ্ছে গাধার আওয়াজ।” [২১৪]
তাদের আরেকটি দলীল হলো: আল্লাহ তাআলা জান্নাতের নিয়ামাতের বর্ণনায় বলেছেন,
فَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ فَهُمْ فِي رَوْضَةٍ يُحْبَرُوْنَ
"যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তারা একটি বাগানে আনন্দে থাকবে।" [২১৫]
আর আনন্দে থাকার অর্থ হলো: উত্তম শ্রবণ অর্থাৎ সঙ্গীতময় আবহে থাকা। সুতরাং তা কীভাবে হারাম হতে পারে অথচ তা জান্নাতে রয়েছে?!
তাদের আরেকটি দলীল হলো: নবি ﷺ বলেছেন,
مَا أَذِنَ اللَّهُ لِشَيْءٍ مَّا أَذِنَ لِنَبِي يَتَغَنَّى بِالْقُرْآنِ
"নবির সুমিষ্ট স্বরে কুরআন তিলাওয়াত আল্লাহ যেভাবে শোনেন, অন্য কিছু সেভাবে শোনেন না।"[২১৬]
তাদের আরেকটি দলীল হলো: নবি ﷺ একবার আবূ মূসা আশআরি -এর সুন্দর কণ্ঠস্বর শ্রবণ করেন, তারপর তার সুমিষ্ট আওয়াজের প্রশংসা করে তাকে বলেন,
يَا أَبَا مُوسَى لَقَدْ أُوتِيْتَ مِزْمَارًا مِّنْ مَّزَامِيرِ آلِ دَاوُدَ
"হে আবূ মূসা, দাউদ -এর সুমধুর কণ্ঠস্বর থেকে তোমাকেও কিছুটা দান করা হয়েছে।"[২১৭]
জবাবে আবূ মূসা বলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমি যদি জানতে পারতাম যে, আপনি তা শুনেছেন, তা হলে আপনার জন্য আরও সুন্দর করে তিলাওয়াত করতাম!' [২১৮]
তাদের আরেকটি দলীল হলো: নবি ﷺ বলেছেন,
زَيِّنُوا الْقُرْآنَ بِأَصْوَاتِكُمْ
"তোমরা সুমিষ্ট আওয়াজ দ্বারা কুরআনকে সুসজ্জিত করো।”[২১৯]
তাদের আরেকটি দলীল হলো: আল্লাহর রাসূল বলেছেন, لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَّمْ يَتَغَنَّ بِالْقُرْآنِ "যে ব্যক্তি সুন্দর ও মিষ্টি আওয়াজে কুরআন পড়ে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।”[২২০]
সহীহ মত হলো : اَنِي দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে আওয়াজকে সুন্দর করা। ইমাম আহমাদ -ও এই ব্যাখ্যাই করেছেন, তিনি বলেছেন, 'ব্যক্তি তার সাধ্যানুযায়ী যতটুকু পারে সুন্দর আওয়াজে কুরআন তিলাওয়াত করবে।[২২১]
তাদের আরেকটি দলীল হলো: নবি ঈদের দিন আয়িশা -কে আরও দুজন বালিকার সাথে গান গাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন এবং আবু বকর -কে বলেছিলেন, دَعْهُمَا يَا أَبَا بَكْرٍ إِنَّ لِكُلِّ قَوْمٍ عِيْدًا وَهُذَا عِيْدُنَا “ওহে আবু বকর, ওদের দুজনকে ছেড়ে দাও। কারণ প্রত্যেক জাতির জন্য উৎসবের ব্যবস্থা আছে। আর এটা হচ্ছে আমাদের উৎসবের দিন।” [২২২]
আরেকটি দলীল হলো : নবি বিয়ের ক্ষেত্রে গান গাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন এবং একে 'লাহওয়ান' বলে নামকরণ করেছেন। [২২৩]
আরেকটি দলীল হলো: নবি উটওয়ালাদের গান শুনেছেন এবং তার অনুমতি দিয়েছেন। তিনি সাহাবায়ে কেরাম -এর ছন্দ পাঠ শুনতে থাকেন, যখন তারা খন্দকের যুদ্ধের জন্য পরিখা খনন করছিলেন আর ছন্দ মিলিয়ে মিলিয়ে গাইছিলেন, نَحْنُ الَّذِينَ بَايَعُوْا مُحَمَّدًا ... عَلَى الجِهَادِ مَا بَقِيْنَا أَبَدًا 'আমরা সেসব লোক, যারা মুহাম্মাদ-এর কাছে করেছি পণ, (আল্লাহর পথে) জিহাদ করেই কাটিয়ে দেবো সারাটি জীবন।'
নবি - এর জবাবে বলছিলেন, اللَّهُمَّ إِنَّهُ لَا خَيْرَ إِلَّا خَيْرُ الآخِرَهُ ... فَبَارِكْ فِي الْأَنْصَارِ والمُهَاجِرَهُ “হে আল্লাহ, পরকালের কল্যাণই তো হলো আসল কল্যাণ; তুমি আনসার ও মুহাজিরদের কাজে বরকত দাও (অফুরান)।” [২২৪]
আরেকটি দলীল হলো: নবি যখন মক্কায় প্রবেশ করছিলেন, তখন একজন তাঁর সামনে আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা -এর কবিতা আবৃত্তি করছিলেন।
আরেকটি দলীল হলো: তিনি কা'ব ইবনু যুহাইর-এর কবিতা শুনেছিলেন এবং তাকে নিজের একটি চাদরও হাদিয়া দিয়েছিলেন। [২২৫]
আরেকটি দলীল হলো: তিনি উমাইয়্যা ইবনু আবিস সালত-এর একশটি কবিতা পাঠ করতে বলেছিলেন। [২২৬]
আরেকটি দলীল হলো: নবি একটি শ্লোকে কবি লাবীদকে সত্যায়ন করেছিলেন। তা হলো: أَلا كُلُّ شَيْءٍ مَّا خَلَا اللَّهَ بَاطِلٌ 'জেনে রেখো, আল্লাহ ছাড়া যা কিছু রয়েছে সবই বাতিল।” [২২৭]
আরেকটি দলীল হলো : তিনি হাসান ইবনু সাবিত -এর জন্য দুআ করেছিলেন যে, আল্লাহ যেন রূহুল কুদুস (জিবরীল ) এর মাধ্যমে তাকে সাহায্য করেন, যতদিন তিনি তাঁর পক্ষে লড়াই করতে থাকবেন। নবি তাঁর কবিতা অনেক পছন্দ করতেন। একবার তাকে বলেছিলেন,
أَجِبْ عَلَى اللَّهُمَّ أَيَّدَهُ بِرُوحِ الْقُدُسِ
“তুমি আমার পক্ষ হতে উত্তর দাও। হে আল্লাহ, তাকে পবিত্র আত্মা (জিবরীল)-এর দ্বারা শক্তিশালী করো।”[২২৮]
আরেকটি দলীল হলো: ইবনু উমর, আবদুল্লাহ ইবনু জা'ফর ও মদীনাবাসীরা এর অনুমতি দিয়েছেন।
আরেকটি দলীল হলো: এসব মজলিসে আল্লাহর অনেক বড়ো বড়ো ওলিরা উপস্থিত হতেন এবং সেগুলো শ্রবণ করতেন। এখন যে ব্যক্তি তাকে হারাম বলবে, সে তো তা হলে সেই সমস্ত বড়ো বড়ো জ্ঞানী ও অনুসরণীয় ব্যক্তিদের ব্যাপারে দুর্নাম করবে।
আরেকটি দলীল হলো: এই ব্যাপারে ইজমা সংঘটিত হয়েছে যে, পাখির ছন্দবদ্ধ আওয়াজ শ্রবণ করা বৈধ। সুতরাং মানুষের আওয়াজ উপভোগ করা তার চেয়েও উত্তম পন্থায় বা তার সমপর্যায়ের বৈধ বিষয় বলে গণ্য হবে।
আরেকটি দলীল হলো : শ্রবণ শ্রোতার রূহ ও কল্বকে তার প্রিয় মানুষের দিকে টেনে নিয়ে যায়। এখন যদি তার সেই সম্পর্ক হারাম হয়, তা হলে শ্রবণ হবে হারাম কাজে তার সাহায্যকারী। আর যদি বৈধ হয়, তা হলে এ ক্ষেত্রে শ্রবণও বৈধ হবে। আর যদি তার ভালোবাসা হয় রহমানের প্রতি তা হলে সে ক্ষেত্রে তা হবে নৈকট্য ও আনুগত্য। কারণ এই শ্রবণের দ্বারা সেই ভালোবাসা বৃদ্ধি পেতে থাকবে, আরও দৃঢ় হবে এবং তার প্রতি আরও বেশি উদ্বুদ্ধ করবে।
তাদের আরেকটি দলীল হলো: কোনো আওয়াজ শ্রবণের মাধ্যমে স্বাদ অনুভব করা—সুন্দর কোনো দৃশ্য দেখে বা কোনো সুগন্ধি শুঁকে অথবা মজাদার কোনো খাবার খেয়ে স্বাদ অনুভব করার মতোই। সুতরাং এটি যদি হারাম হয়, তা হলে তো সেগুলোও হারাম হবে!
টিকাঃ
[২১৪] সূরা লোকমান, ৩১: ১৯।
[২১৫] সূরা রূম, ৩০: ১৫।
[২১৬] বুখারি, ৫০২৩; মুসলিম, ৭৯২।
[২১৭] বুখারি, ৫০৪৮; মুসলিম, ৭৯৩।
[২১৮] ইবনু হিব্বান, আস-সহীহ, ৭১৯৭।
[২১৯] আবূ দাউদ, ১৪৬৮।
[২২০] বুখারি, ৭৫২৭।
[২২১] ইবনু তাইমিয়্যা, মাজমুউল ফাতাওয়া, ১২/৫৪০।
[২২২] বুখারি, ৯৪৯; মুসলিম, ৮৯২।
[২২৩] দেখুন-বুখারি, ৫১৬২।
[২২৪] দেখুন-বুখারি, ৪০৯৯, ৪১০০।
[২২৫] ইবনুল আসীর, উসদুল গাবাহ, ৪/১৭৭; ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ৪/১৪৬।
[২২৬] মুসলিম, ২২৫৫।
[২২৭] বুখারি, ৩৮৪১; মুসলিম, ২২৫৬।
[২২৮] বুখারি, ৪৫৩; মুসলিম, ২৪৮৫।
📄 উল্লেখিত দলীলসমূহের জবাব
জবাব: আপনারা যা বলেছেন, সেগুলো হলো মূল বিষয়বস্তুর বাইরের এবং বিতর্কের স্থান থেকে অনেক দূরের আলোচনা, যার সাথে আলোচ্যবিষয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ কোনো বস্তু ইন্দ্রিয়গতভাবে মজাদার ও স্বাদযুক্ত হওয়া এটা প্রমাণ করে না যে, তা বৈধ বা হারাম, আবার অপছন্দনীয় বা পছন্দনীয় হওয়াও বুঝায় না। কেননা এই স্বাদ ও সুন্দর উপলব্ধি শারীআর পাঁচটি হুকুম: হারাম, ওয়াজিব, মাকরূহ, মুস্তাহাব ও মুবাহ-সবগুলোর মধ্যেই পাওয়া যায়। সুতরাং সেই ব্যক্তি কীভাবে এগুলোর দ্বারা এর বৈধতার ওপর দলীল দিতে পারে, যে ব্যক্তি দলীলের শর্তসমূহ ও দলীল প্রয়োগ করার স্থানসমূহ সম্পর্কে জ্ঞান রাখে?!
এটি তো সেই ব্যক্তির অবস্থার মতো হয়ে যায়, যে ব্যক্তি যিনা-ব্যভিচার বৈধ হওয়ার ওপর দলীল পেশ করে যে, এর সম্পাদনকারী স্বাদ অনুভব করে। আসলে কোনো হারাম কাজই কি লায্যাত বা স্বাদ শূন্য হয়? বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ কি এমন মজা ও স্বাদ থেকে খালি হয়, যার শ্রবণে কান প্রশান্তি পায় না? বাদ্যযন্ত্রকে নবি হারাম বলেছেন এবং সহীহ সনদে প্রমানিত আছে যে, তাঁর উম্মাতের মধ্যে একটা দল তা হালাল মনে করবে। আলিমগণ কিছু কিছু বাদ্যযন্ত্র হারাম হওয়ার ওপর একমত হয়েছেন; তবে অধিকাংশ আলিমের মত হলো সমস্ত বাদ্যযন্ত্রই হারাম। এমনিভাবে সুন্দর আওয়াজ শ্রবণের কারণে বাচ্চা শিশু বা উটের স্থির হয়ে যাওয়া কি তা হালাল বা হারাম হওয়ার দলীল হতে পারে?
গানবাজনা বৈধ করার জন্য এর চেয়েও আশ্চর্যজনক দলীল হলো-আল্লাহ তাআলা সুন্দর সুর সৃষ্টি করেছেন এবং তা ব্যক্তির জন্য অতিরিক্ত একটি নিয়ামাত। (তাই গানবাজনা বৈধ।)
সুতরাং তাকে বলা হবে: সুন্দর-সুদৃশ্য চেহারা কি অতিরিক্ত নিয়ামাত নয়? তা কী আল্লাহর সৃষ্টি ও দান নয়? এই কারণে কি কোনো শর্ত বা কানূন ছাড়াই এর দ্বারা উপভোগ করা ও স্বাদ নেওয়া বৈধ হয়ে যাবে?
আর আল্লাহ তাআলা গাধার আওয়াজকে নিকৃষ্ট বলেছেন বলে কি মিউজিকের সাথে আনন্দদায়ক ও সুরেলা সুরও বৈধ হতে পারে?
এর চেয়েও আশ্চর্যজনক হলো: গান শোনা বৈধ হওয়ার ব্যাপারে জান্নাতিদের শ্রবণ দ্বারা দলীল দেওয়া। তা হলে তো এর চেয়েও উপযুক্ত হলো মদ হালাল হওয়ার ব্যাপারে দলীল দেওয়া। কারণ জান্নাতে তো মদও থাকবে। এখন যদি বলেন, মদ হারাম হওয়ার ওপর ভিন্ন দলীল আছে; কিন্তু শ্রবণ হারাম হওয়ার ওপর কোনো দলীল নেই।
তা হলে বলা হবে: এটি তো এক ইস্তিদলাল বা দলীল উপস্থাপন। আর জান্নাতিদের জন্য বৈধ তাই দুনিয়াবাসীদের জন্যও বৈধ-এটি ভিন্ন আরেকটি ইস্তিদলাল। সুতরাং আপনি জান্নাতবাসীদের জন্য বৈধ বলে যে দলীল পেশ করেছেন, তা বাতিল দলীল, এতে সত্য অনুসন্ধানী কোনো ব্যক্তিই সন্তুষ্ট হবে না।
আর আপনি যে বললেন, 'শ্রবণ হারাম হওয়ার ওপর কোনো দলীল নেই' এর দ্বারা আপনার উদ্দেশ্য কী? কোন ধরনের শ্রবণ ও কোন ধরনের বিষয় উদ্দেশ্য নিয়েছেন? কারণ এগুলোর মধ্যে হারাম, মাকরূহ, মুবাহ, ওয়াজিব ও মুস্তাহাব বিভিন্ন শ্রেণি রয়েছে। সুতরাং আপনি একটি প্রকারকে নির্দিষ্ট করুন; যাতে বৈধ-অবৈধ প্রমাণ করা যায়। যদি আপনি বলেন, কবিতা (কাসীদা) শ্রবণ। আপনাকে বলা হবে, কোন ধরনের কবিতা আপনার উদ্দেশ্য? যার দ্বারা আল্লাহ, তাঁর রাসূল, দ্বীন ও কিতাবের প্রশংসা করা হয় আর তাঁর শত্রুদের জবাব দেওয়া হয়?
এ রকম বিষয় তো মুসলিমরা সবসময় বর্ণনা করেন, শ্রবণ করেন এবং পরস্পর তা নিয়ে আলোচনা করে থাকেন। এটিই রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর সাহাবিগণ শ্রবণ করেছিলেন এবং এর ওপরই তিনি পুরস্কার দিয়েছিলেন, হাসসান -কে এর ওপরই উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। এই বিষয়টিতেই শয়তানি শ্রবণের অধিকারীরা ধোঁকা খেয়েছে। ফলে তারা বলতে শুরু করেছে: সেগুলো কবিতা ছিল আর আমরাও কবিতাই শুনি। হ্যাঁ তা হলে তো সুন্নাতও কথা, বিদআতও কথা, তাসবীহও কথা, গীবতও কথা, দুআও কথা আবার অপবাদ দেওয়াও কথা (এসব কি এক ও বৈধ?)। রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবায়ে কেরাম কি আপনাদের মতো এ রকম শয়তানি শ্রবণে কখনো জড়িত হয়েছেন, যার অধিকাংশই ফাসাদ ও বিভ্রান্তিমূলক বিষয়াদিতে পরিপূর্ণ?
এর আরেকটি দৃষ্টান্ত হলো: রাসূলুল্লাহ ﷺ সুমিষ্ট সুরে কুরআন তিলাওয়াত করা এবং তা শ্রবণ করাকে পছন্দ করেছেন, অনুমতি দিয়েছেন এবং আল্লাহ তাআলা তা ভালোবাসেন-এই বিষয়টি তাদের ধোঁকায় ফেলে রেখেছে। ফলে তারা এই পছন্দ করা ও প্রশংসা করার বিষয়টিকে নারী, দাড়িহীন বালক ও অন্যান্যদের আওয়াজের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা শুরু করে দিয়েছে; যেগুলো বাদ্যযন্ত্রের সাথে মিশ্রিত, যাতে উল্লেখ করা হয় দেহের আকার-আকৃতি, স্তন, কোমর, চোখের বর্ণনা ও তার কারুকার্য, কালো চুল, যৌবনের সৌন্দর্য, গালের উপস্থাপনা, মিলন ও এতে বাধাপ্রাপ্ত হওয়া, প্রেম-ভালোবাসা ও বিচ্ছেদ হওয়ার কথা এবং এ রকম আরও বিভিন্ন দিকের কথা; যা অন্তরের জন্য মদপান করার চেয়েও বেশি ক্ষতিকর।
এর চেয়েও আশ্চর্যজনক হলো: যে শ্রবণ উপরিউক্ত বিষয়গুলোর সাথে মিশ্রিত, তার বৈধতার জন্য দলীল পেশ করা হয় ঈদ ও খুশি-আনন্দের দিনে ছোটো একজন মেয়ের নিকট দুজন অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালিকার গীত গাওয়ার দ্বারা; তাও আবার তারা আরবদের সাহসিকতা, যুদ্ধ-বিগ্রহ, উত্তম চরিত্র ও লাজুকতা সমৃদ্ধ কতিপয় শ্লোক আবৃত্তি করছিল। সেগুলো কোথায় আর (আপনারা যেগুলোর কথা উল্লেখ করেন) সেগুলো কোথায়?!
আশ্চর্যের হলো উপরিউক্ত এই হাদীসটিই তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড়ো দলীল। কারণ আবু বকর এটিকে বলেছিলেন, مَزْمُوْرًا مِنْ مَّزَامِيْرِ الشَّيْطَانِ 'শয়তানের বাঁশিসমূহের মধ্যে একটি বাঁশি' আর রাসূল ﷺ এটিকে সমর্থন করেছেন, তবে শারীআতের দায়িত্বপ্রাপ্ত নয় এমন দুজন নাবালেগা মেয়ের জন্য অনুমতি দিয়েছেন, যা গাওয়া ও শোনার মধ্যে কোনো ফাসাদ ও অনিষ্ট নেই। এটি কি কোনোভাবে তারা যে গানবাজনার কথা বলে-যাতে কত কী অন্তর্ভুক্ত থাকে-তার বৈধতার ওপর প্রমাণ বহন করে?! সুবহানাল্লাহ! কীভাবে বোধবুদ্ধি ও চিন্তাভাবনা বিভ্রান্ত হয়ে গেছে?
এই সবগুলোর চেয়ে আশ্চর্যের হলো: আল্লাহর রাসূল ﷺ যে কবিতা শ্রবণ করেছেন, যাতে হক ও তাওহীদ অন্তর্ভুক্ত ছিল, তার মাধ্যমে এগুলোর বৈধতার প্রমাণ দেওয়া! কেউ কি ব্যাপকভাবে কবিতা পাঠ, তা শ্রবণ করা এবং তা নিয়ে আলোচনা করাকে হারাম বলেছে? মাকড়সার ঘরের ন্যায় কত দুর্বল বিষয়কে তারা আঁকড়ে ধরে রয়েছে!
এর চেয়েও আশ্চর্যের হলো: পাখির সুন্দর ও মনোহারী আওয়াজ বৈধ হওয়ার কারণে গানবাজনাকেও হালাল বলে দলীল দেওয়া। এটি ঠিক তাদের ন্যায়, যারা সুদকে হালাল বলে আর দলীল দেয়—
إِنَّمَا الْبَيْعُ مِثْلُ الرِّبَا
“ব্যবসা তো সুদেরই মতো।”[২৩০]
কোথায় ডালে ডালে পাখির সুর আর কোথায় নারীসদৃশ দাড়িগোঁফহীন বালকের সুর? যা প্রত্যেক প্রেমিক-প্রেমিকার অন্তরকে মিলিত হতে উদ্বুদ্ধ করে! কোথায় এর ফিতনা আর কোথায় ঘুঘু-কবুতর আর বুলবুলির মতো পাখির আওয়াজের দরুন ফিতনা?!
টিকাঃ
[২২৯] বুখারি, ৫৫৯০; আবূ দাউদ, ৪০৩৯।
[২৩০] সূরা বাকারা, ২: ২৭৫।