📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 শ্রোতার প্রকারভেদ

📄 শ্রোতার প্রকারভেদ


এক প্রকার শ্রোতা হলো: যে তার স্বভাব, নফস ও প্রবৃত্তি অনুসারে শোনে। এই শ্রেণির ব্যক্তিদের স্বভাবের সাথে যা মিলে, শোনা-বিষয় থেকে কেবল ততটুকুই তাদের অংশ। (তারা কেবল ওইটুকুই শোনে।)
আরেক প্রকার হলো: যে তার অবস্থা, ঈমান, মা'রিফাত ও বুদ্ধি অনুসারে শোনে। এই শ্রেণির ব্যক্তিরা তাদের যোগ্যতা ও সামর্থ্য অনুসারে শ্রুতবিষয় থেকে জ্ঞান ও উপকারিতা লাভ করে থাকে।
শ্রোতাদের মধ্যে আরেক প্রকার হলো: যারা কেবল আল্লাহ-সম্পর্কিত বিষয়াদিই শোনে, এ ছাড়া আর কিছুই শোনে না। যেমন হাদীসে কুদসিতে এসেছে— فَإِذَا أَحْبَبْتُهُ، كُنْتُ سَمْعَهُ الَّذِي يَسْمَعُ بِهِ، وَبَصَرَهُ الَّذِي يُبْصِرُ بِهِ،
“অবশেষে আমি তাকে আমার এমন প্রিয় বানিয়ে নিই; আমি তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শোনে, আমি তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে।” [২০২]
এটি হলো সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও সর্বোচ্চ স্তরের শ্রবণ।

টিকাঃ
[২০২] বুখারি, ৬৫০২।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 শ্রবণের হুকুম যা শোনা হয় তার সাথে সম্পর্কিত

📄 শ্রবণের হুকুম যা শোনা হয় তার সাথে সম্পর্কিত


সামা' বা শ্রবণ করার প্রশংসা ও নিন্দার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে হলে, যা শোনা হয় তার পরিচয়, প্রকৃত অবস্থা, তার কারণ, এর প্রতি উদ্বুদ্ধকারী বস্তুটি কী, এর ফলাফল ও পরিণতি কী ইত্যাদি বিষয়ে জানা জরুরি।
পরবর্তী তিনটি পরিচ্ছেদে শ্রবণের বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে এবং এর উপকারিতা ও অপকারিতা, হক ও বাতিল, প্রশংসনীয় ও নিন্দনীয় বিষয়গুলোর মাঝে পার্থক্য হয়ে যাবে।
যা শোনা হয় তা তিন প্রকার :
এক. যা আল্লাহ তাআলা ভালোবাসেন, যাতে তিনি সন্তুষ্ট, যার আদেশ তিনি তাঁর বান্দাদের দিয়েছেন, যার গুণে গুণান্বিত ব্যক্তিদের তিনি প্রশংসা করেছেন এবং তাদের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।
দুই. এমন বিষয়বস্তুর শ্রবণ; যা তিনি ঘৃণা করেন, অপছন্দ করেন, যা থেকে তিনি নিষেধ করেছেন এবং যারা তা থেকে বিরত থাকে তাদের প্রশংসা করেছেন।
তিন. যা মুবাহ বা বৈধ, যার অনুমতি রয়েছে কিন্তু আল্লাহ তা পছন্দও করেন না আবার অপছন্দও করেন না, যারা তা করে তাদের প্রশংসাও করেন না, তাদের নিন্দাও করেন না। এর হুকুম হলো অন্যান্য বৈধ বিষয়ের মতো। যেমন: বৈধ দর্শন, ঘ্রাণ, খাদ্য, পোশাক ইত্যাদি। যারা এই তৃতীয় প্রকারকে হারাম বলে, তারা আল্লাহ সম্পর্কে না জেনেই কথা বলে এবং আল্লাহ যা হালাল করেছেন, তাকে হারাম বলে ঘোষণা দেয়। আর যে এই মুবাহ শ্রবণকেই দ্বীন ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম বানিয়ে নেয়, সে তো আল্লাহর ওপর মিথ্যাচার করে এবং নতুন একটি শারীআত আবিষ্কার করে, যার অনুমতি আল্লাহ দেননি। এর দ্বারা সে মুশরিকদের সাদৃশ্য অবলম্বন করে।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 আল্লাহ তাআলা যে শ্রবণের ব্যাপারে প্রশংসা করেছেন

📄 আল্লাহ তাআলা যে শ্রবণের ব্যাপারে প্রশংসা করেছেন


প্রথম প্রকার শ্রবণের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা কুরআনে প্রশংসা করেছেন, এর আদেশ দিয়েছেন, যারা তাতে লিপ্ত তাদের প্রশংসা করেছেন, যারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তাদের নিন্দা করেছেন, অভিশাপ দিয়েছেন এবং তাদেরকে প্রাণী-পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট ও পথভ্রষ্ট বলে ঘোষণা করেছেন, তারা জাহান্নামের আগুনের ভেতরে জ্বলতে থাকবে আর বলবে,
لَوْ كُنَّا نَسْمَعُ أَوْ نَعْقِلُ مَا كُنَّا فِي أَصْحَابِ السَّعِيرِ )
“যদি আমরা শুনতাম অথবা বুদ্ধি খাটাতাম, তা হলে আমরা এ জ্বলন্ত আগুনের অধিবাসীদের মধ্যে থাকতাম না।” [২০৩]
এটি হলো সেই সমস্ত আয়াত শ্রবণ করা, যা আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ -এর ওপর অবতীর্ণ করেছেন।
এই শ্রবণই হলো ঈমানের ভিত্তি, যার ওপর ঈমান প্রতিষ্ঠিত। এটি তিন প্রকার: ১. বাহ্যিকভাবে কানের মাধ্যমে শ্রবণ, ২. বোঝা ও উপলব্ধির জন্য শ্রবণ এবং ৩. সাড়া দেওয়া ও কবুল করার জন্য শ্রবণ।
কুরআনে এই তিন প্রকার শ্রবণের আলোচনাই রয়েছে।
১. বাহ্যিকভাবে কানের মাধ্যমে শ্রবণ: জিনদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে, তাদের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
إِنَّا سَمِعْنَا قُرْآنًا عَجَبًا يَهْدِي إِلَى الرُّشْدِ فَآمَنَّا بِهِ
"আমরা এক বিস্ময়কর কুরআন শুনেছি; যা সত্য ও সঠিক পথের নির্দেশনা দেয়, তাই আমরা তার ওপর ঈমান এনেছি।” [২০৪]
এটি হলো ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে শ্রবণ; যার সাথে ঈমান ও সাড়া দেওয়াও যুক্ত হয়েছে।
২. বোঝা ও উপলব্ধি করার জন্য শ্রবণ: এটি উপেক্ষাকারী ও গাফিলদের মধ্যে পাওয়া যায় না। আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَإِنَّكَ لَا تُسْمِعُ الْمَوْتَى وَلَا تُسْمِعُ الصُّمَّ الدُّعَاءَ إِذَا وَلَّوْا مُدْبِرِينَ
"আপনি মৃতদের শুনাতে পারবেন না এবং এমন বধিরদেরও নিজের আহ্বান শুনাতে পারবেন না, যারা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে চলে যায়।”[২০৫]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
إِنَّ اللَّهَ يُسْمِعُ مَنْ يَشَاءُ وَمَا أَنْتَ بِمُسْمِعٍ مَّنْ فِي الْقُبُورِ
"আল্লাহ যাকে ইচ্ছা শুনান, কিন্তু আপনি তাদেরকে শুনাতে পারবেন না, যারা কবরে রয়েছে।”[২০৬]
এখানে আল্লাহ তাআলার বিশেষত্ব হলো: বুঝানো ও উপলব্ধি করানোর জন্য শুনানো। অন্যথায় যে ব্যাপক শ্রবণের দ্বারা দলীল প্রতিষ্ঠিত[২০৭] হয়, তাতে কোনো বিশেষত্ব নেই। (তা আল্লাহও যেমন শুনাতে পারেন, নবি-ও শুনাতে পারেন।) এই প্রকার শ্রবণের ব্যাপারে আরেকটি আয়াত হলো: وَلَوْ عَلِمَ اللَّهُ فِيهِمْ خَيْرًا لَّأَسْمَعَهُمْ وَلَوْ أَسْمَعَهُمْ لَتَوَلَّوْا وَهُمْ مُّعْرِضُونَ
"আল্লাহ যদি জানতেন, এদের মধ্যে সামান্য পরিমাণও কল্যাণ আছে, তা হলে নিশ্চয়ই তিনি তাদেরকে শুনিয়ে দিতেন। (কিন্তু কল্যাণ ছাড়া) তিনি যদি তাদের শুনাতেন, তা হলে তারা মুখ ফিরিয়ে পালিয়ে যেত।” [২০৮]
অর্থাৎ সেই কাফিরদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা যদি জানতেন যে, তারা কবুল করবে ও মানবে, তা হলে অবশ্যই তিনি তাদের তা বুঝিয়ে দিতেন। নতুবা তারা তো বাহ্যিকভাবে তা শুনেছেই। وَلَوْ أَسْمَعَهُمْ لَتَوَلَّوْا وَهُمْ مُّعْرِضُونَ
"তিনি যদি তাদেরকে শুনাতেন, তা হলে তারা মুখ ফিরিয়ে পালিয়ে যেত।”
অর্থাৎ যদি তিনি তাদেরকে বুঝিয়ে দিতেন, তা হলে তারা তা মানত না এবং যা বুঝেছে, তার দ্বারা উপকৃত হতো না। কারণ তাদের অন্তরে উপেক্ষা করা ও মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা প্রকট; যা শোনা বিষয় থেকে তাদেরকে উপকৃত হতে বাধা দেয়।
৩. সাড়া দেওয়া ও কবুল করা জন্য শ্রবণ: মুমিন বান্দাদের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا "আমরা নির্দেশ শুনেছি এবং অনুগত হয়েছি।"[২০৯]
এটি হলো সাড়া দেওয়া ও গ্রহণ করার জন্য শ্রবণ করা, যা আনুগত্যের ফল।
তবে সঠিক কথা হলো: এই আয়াতটি শ্রবণের তিনটি প্রকারকেই শামিল করে, তারা এই খবর দিয়েছে যে, তাদের যা বলা হয়েছে তারা তা শুনেছে, উপলব্ধি করেছে এবং তা মেনে নিয়েছে।
মূলকথা: নৈকট্যশীল অতি বিশেষ ব্যক্তিদের শ্রবণ হলো: এই তিনটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই কুরআন শ্রবণ করা-নিজ কানে শোনা, উপলব্ধি করা এবং তা মেনে নেওয়া। পবিত্র কুরআনে যে শ্রবণের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা প্রশংসা করেছেন, যা শোনার জন্য তাঁর ওলিদের আদেশ করেছেন এবং শ্রবণের অধিকারী ব্যক্তিদের যে সুসংবাদ দিয়েছেন, তার প্রতিটিই হলো এই প্রকারের শ্রবণের অন্তর্ভুক্ত।
এটি হলো আয়াত শ্রবণ, কবিতা শ্রবণ নয়। কুরআন শ্রবণ, শয়তানের আওয়াজ (গান-মিউজিক) শ্রবণ নয়। সত্য কথা ও হিদায়াতের বাণী শ্রবণ, কোনো ছন্দ শ্রবণ নয়। নবি, রাসূল ও মুমিনদের কথা শ্রবণ, গায়ক ও বাদকদের সুর শ্রবণ নয়। আসমান-জমিনের প্রতিপালকের কালাম শ্রবণ, কবিদের কাব্য ও কবিতা শ্রবণ নয়। এই সমস্ত শ্রবণ অন্তরকে চালিত করে অদৃশ্যের মহাজ্ঞানী আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছে দেয়, রূহকে খুশি ও আনন্দের জগতে টেনে নেয়, এটি দমে-যাওয়া-ইচ্ছেগুলোকে সুউচ্চ মর্যাদা ও মর্তবা অর্জনের জন্য জাগ্রত করে, ঈমানের প্রতি আহ্বান করে, জান্নাতের পথপ্রদর্শন করে, সকাল-সন্ধ্যা অন্তরকে ডাকতে থাকে, ভোর হওয়ার আগে বলে উঠে,
حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ، حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ 'কল্যাণের পথে আসুন, কল্যাণের পথে আসুন।'
যে ব্যক্তি এই প্রকার শ্রবণে অভ্যস্ত হয় দলীল উপস্থাপন করা, অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন উপদেশ দেওয়া, কোনো প্রজ্ঞার স্মরণ, কোনো আয়াত সম্পর্কে চিন্তাভাবনা, ভালো কাজের জন্য পথ দেখানো, কোনো গোমরাহিকে প্রতিহত করা, পথভোলা কাউকে পথ দেখানো, অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসা, কোনো কল্যাণকর কাজের আদেশ করা, কোনো ক্ষতিকর ও অনিষ্টকর বস্তু থেকে নিষেধ করা ইত্যাদি থেকে সে কখনো অনুপস্থিত থাকে না। (সে গভীর ধ্যানে শ্রবণ করার কারণে সবকিছু তার সামনে উপস্থিত থাকে।)
এমনিভাবে আলোর পথে নিয়ে যাওয়া, অন্ধকার থেকে বের করা, কুপ্রবৃত্তির চাহিদাকে দমিয়ে রাখা, তাকওয়া অবলম্বন করতে উদ্বুদ্ধ করা, বিচক্ষণতা শাণিত হওয়া, প্রাণবন্ত হওয়া, শক্তিশালী হওয়া, সুস্থ থাকা, নিরাপদ থাকা, মুক্তি পাওয়া, সংশয়-সন্দেহ দূরীভূত করা, দলীল-প্রমাণ সুস্পষ্ট করা, হককে হক হিসেবে আর বাতিলকে বাতিল হিসেবে প্রকাশিত করা ইত্যাদি বিষয়গুলো থেকেও সে বঞ্চিত থাকে না।

টিকাঃ
[২০৩] সূরা মুল্ক, ৬৭: ১০।
[২০৪] সূরা জিন, ৭২: ১-২।
[২০৫] সূরা রূম, ৩০:৫২।
[২০৬] সূরা ফাতির, ৩৫: ২২।
[২০৭] অর্থাৎ কেউ এটা বলতে পারবে না যে, আমি শুনিনি, আমি জানিনি, আমাকে শুনানো হয়নি। আসলে শোনা এক জিনিস আর তা বোঝা ও উপলব্ধি করা আরেক জিনিস।
[২০৮] সূরা আনফাল, ৮: ২৩।
[২০৯] সূরা বাকারা, ২: ২৮৫।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 যে শ্রবণকে আল্লাহ তাআলা ঘৃণা করেন

📄 যে শ্রবণকে আল্লাহ তাআলা ঘৃণা করেন


শ্রবণের দ্বিতীয় প্রকার: এই প্রকারের শ্রবণকে আল্লাহ তাআলা ঘৃণা করেছেন, অপছন্দ করেছেন এবং যারা এই প্রকার থেকে বেঁচে থাকে, তিনি তাদের প্রশংসা করেছেন। আর দ্বিতীয় প্রকারটি হলো-প্রত্যেক ওই শ্রবণ, যা ব্যক্তির অন্তর ও দ্বীনের ক্ষেত্রে ক্ষতি সাধন করে। যেমন: সব ধরনের বাতিল বিষয়বস্তু শ্রবণ করা; তবে তা প্রতিহত করার জন্য বা তা থেকে উপদেশ গ্রহণ করার জন্য বা তার বিপরীত বিষয়ের সৌন্দর্য ও উপকারিতা জানিয়ে দেওয়ার জন্য হলে ভিন্ন কথা। কারণ কোনো বস্তু খারাপ হলে তার বিপরীত দিকটি ভালো হয়।
এই প্রকার শ্রবণের একটি উদাহরণ হলো: অনর্থক কিছু শোনা; আল্লাহ তাআলা যার পরিত্যাগকারী ও উপেক্ষাকারীর প্রশংসা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَإِذَا سَمِعُوا اللَّغْوَ أَعْرَضُوا عَنْهُ
“তারা যখন অনর্থক কথাবার্তা শ্রবণ করে, তখন তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।"[২১০]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন,
وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا "যখন তারা খেল-তামাশার নিকট দিয়ে যায়, তখন ভদ্রভাবে চলে যায়।"[২১১]
মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়্যা বলেছেন, 'এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো গানবাজনা।'
হাসান বাসরী ও অন্যান্যরা বলেছেন, 'তারা তা শোনা থেকে নিজেদেরকে সম্মানিত মনে করে।'[২১২]
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ বলেছেন,
الْغِنَاءُ يُنْبِتُ النِّفَاقَ فِي الْقَلْبِ كَمَا يُنْبِتُ الْمَاءُ الْبَقْلَ 'গানবাজনা অন্তরে নিফাক সৃষ্টি করে, যেমন পানি উদ্ভিদ উৎপন্ন করে।'[২১৩]
এটি সেই ব্যক্তির কথা, যিনি গানবাজনার প্রভাব ও পরিণতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখেন। কারণ যে এতে অভ্যস্ত হয়, তার অন্তরে নিফাক সৃষ্টি হয়, কিন্তু সে টেরও পায় না। যদি সে নিফাকের প্রকৃত অর্থ ও চূড়ান্ত পরিণতি জানত, তা হলে তার অন্তরে সে তা অবশ্যই দেখতে পেত। কেননা কোনো ব্যক্তির অন্তরে গানবাজনার প্রতি ভালোবাসা এবং কুরআনের প্রতি ভালোবাসা কখনো একসাথে অবস্থান করতে পারে না। একটি অপরটিকে বিদায় করে দেয়। আমি নিজে এবং আরও অনেকেই এটা প্রত্যক্ষ করেছেন যে, যারা গানবাজনা শোনে, তাদের নিকট কুরআন পাঠ ও তা শ্রবণ করা অনেক ভারী হয়ে যায়, কুরআনের সাথে তাদের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন থাকে, (সালাতে) বেশিক্ষণ তিলাওয়াত করলে বিরক্তিতে তারা তিলাওয়াতকারীর ওপর চেঁচামেচি শুরু করে, যা তিলাওয়াত করা হয়, তা তাদের অন্তরে কোনো উপকার পৌঁছায় না। ফলে তা প্রাণবন্ত হয় না, আনন্দিতও না। হয় না এবং কুরআনের বিভিন্ন সুসংবাদ ও কঠিন শাস্তির ভীতিপ্রদর্শনও তাদের মাঝে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। অপরদিকে যখন তারা শয়তানের সুর (গানবাজনা, মিউজিক) শ্রবণ করে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ! তখন কীভাবে তাদের আওয়াজগুলো থেমে যায়, সমস্ত কাজকর্ম থেকে তারা অবসর হয়, তাদের অন্তর প্রশান্তি পায়, এতে তাদের প্রাণচাঞ্চল্য বেড়ে যায়, তাদের বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি দেখে বোঝা যায়, তারা এতে কতটা নিমগ্ন, এর জন্য তারা পয়সা খরচ করতে সামান্যতম দ্বিধা অনুভব করে না, রাতের পর রাত জেগে থাকে, দীর্ঘ সময় ব্যয়েও তাদের কোনো বিরক্তি, ক্লান্তি কিংবা অবসাদ আসে না। তারা রাত আরও দীর্ঘ হওয়ার কামনা করে! আসলে এগুলো যদি নিফাক না হয়, তবে নিশ্চিতভাবেই তা নিফাক সৃষ্টির ভিত্তি ও বুনিয়াদ।

টিকাঃ
[২১০] সূরা কাসাস, ২৮:৫৫।
[২১১] সূরা ফুরকান, ২৫: ৭২।
[২১২] বাগাবি, তাফসীর, ৬/৯৮-৯৯।
[২১৩] 'কাশফুল খফা' গ্রন্থকার বলেন, 'ইমাম নববি বলেছেন, 'এটি সহীহ নয়'।'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00