📄 শিক্ষা গ্রহণের জন্য উপদেশের প্রতি বান্দার মুখাপেক্ষিতা
উপদেশের প্রতি বান্দা তখনই মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে, যখন আল্লাহর প্রতি ধাবমানতা ও শিক্ষা গ্রহণে তার দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়। অন্যথায় যখন তার আল্লাহ- অভিমুখিতা ও শিক্ষা গ্রহণ প্রবণতা শক্তিশালী থাকবে, তখন উপদেশ, উৎসাহ ও ভীতিপ্রদর্শনের খুব বেশি প্রয়োজন হয় না। তখন তার তীব্র প্রয়োজন দেখা দেয় আল্লাহ তাআলার আদেশ-নিষেধগুলো জানার।
উপদেশ দ্বারা দুইটি বিষয় উদ্দেশ্য নেওয়া হয়: এমন আদেশ ও নিষেধ যেগুলোর মধ্যে ১. আগ্রহ-উদ্দীপনা ও ২. ভয়ভীতির কথা বেশি আলোচনা করা হয়েছে।
আল্লাহ-অভিমুখী শিক্ষা গ্রহণকারী ব্যক্তির জন্য বেশি প্রয়োজন হলো: দ্বীনের আদেশ-নিষেধ সম্পর্কে জানা। আর গাফিল ও উপেক্ষাকারীদের জন্য বেশি প্রয়োজন হলো: তারগীব ও তারহীব অর্থাৎ জান্নাতের উৎসাহ ও জাহান্নামের ভীতিপ্রদর্শন। আপত্তিকারী ও অস্বীকারকারীদের জন্য বেশি প্রয়োজন হলো: উত্তম পন্থায় তর্কবিতর্ক করা, দলীলের মাধ্যমে প্রকৃত বিষয় জানার চেষ্টা করা।
এই তিনটি বিষয়ের আলোচনা এই আয়াতে এসেছে-
أدْعُ إِلَى سَبِيْلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
"আপনার রবের পথে আহ্বান করুন হিকমত ও সদুপদেশ সহকারে এবং লোকদের সাথে বিতর্ক করুন সর্বোত্তম পদ্ধতিতে। "[১৬৬]
এখানে হিকমতের সিফাত 'হাসানা' আনা হয়নি; কারণ এর পুরাটাই হাসানা বা উত্তম। হিকমত সত্তাগতভাবেই হাসান।
আর মাওইযাহ বা উপদেশের ক্ষেত্রে 'হাসানা বা উত্তম' সিফাত আনা হয়েছে। কারণ সব উপদেশই উত্তম ও উপকারী নয়।
এমনিভাবে জিদাল বা বিতর্ক করাও উত্তম পদ্ধতিতে হতে পারে আবার নাও হতে পারে। এই বিষয়টি বিতর্ককারীর অবস্থা, তার কঠোরতা, কোমলতা, তীক্ষ্ণতা ও নম্রতার ওপর নির্ভর করে। তাই তাঁকে আদেশ করা হয়েছে, তিনি যেন সর্বোত্তম পন্থায় বিতর্ক করেন।
আবার এটিও হতে পারে যে, এই আদেশ হলো এই প্রেক্ষাপটে যে, যে ব্যাপারে বিতর্ক করা হবে, তা যেন সর্বোত্তম হয় অর্থাৎ দলীল-প্রমাণ, কথাবার্তা, তথ্যাবলী ইত্যাদি যেন সুস্পষ্ট ও হৃদয়গ্রাহী হয় এবং বিষয়বস্তুর ওপর পরিপূর্ণরূপে আলোকপাত করে এবং ভ্রান্ত বিষয়ের বিভ্রান্তি যেন সহজেই প্রকাশিত হয়ে যায়। সঠিক অভিমত হলো আয়াতটি এই দুটি বিষয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে।
উপদেশদানকারীর দোষত্রুটির প্রতি দৃষ্টি দেওয়া উচিত নয়। কারণ কেউ যখন এ দিকে দৃষ্টি ফেরাবে, তখন সে তার উপদেশ থেকে উপকৃত হতে পারবে না। কেননা মানুষের স্বভাবই এমন যে, সেই ব্যক্তির কথার মাধ্যমে সে উপকার লাভ করে না, যে তার ইলম অনুযায়ী আমল করে না এবং নিজে উপকৃত হয় না।
পূর্ববর্তী মনীষীদের কোনো একজন বলেছেন, 'তুমি যদি চাও যে, লোকজন তোমার নিকট থেকে আদেশ-নিষেধ গ্রহণ করুক, তা হলে তুমি যখন কোনোকিছুর আদেশ করবে, তখন তুমিই তার প্রথম পালনকারী হোয়ো, আর যখন কোনোকিছু থেকে নিষেধ করবে, তখন তুমিই হোয়ো তার প্রথম পরিত্যাগকারী। [১৬৭]
টিকাঃ
[১৬৬] সূরা নাহল, ১৬: ১২৫।
[১৬৭] আহমাদ, আয-যুহদ, ৩১৮; হাসান বাসরী -এর কথা।
📄 যিকিরের সাথে কুরআন তিলাওয়াতের উপকারিতা
কুরআন নিয়ে চিন্তাভাবনা করা অর্থাৎ কুরআনের অর্থ বুঝতে অন্তরের দৃষ্টিশক্তিকে তীক্ষ্ণ করা, কুরআন নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে ও তা বুঝতে নিজের মন ও ফিকিরকে জমিয়ে রাখা—এটিই হলো কুরআন নাযিল করার মূল উদ্দেশ্য; চিন্তাভাবনা ছাড়া, না বুঝে শুধু তিলাওয়াত [১৬৮] করাই উদ্দেশ্য নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ﴿إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ﴾ এর মানযিলসমূহ
كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ ﴾
"এটি অত্যন্ত বরকতময় একটি কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে মানুষ তার আয়াত সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করে এবং জ্ঞানী ও চিন্তাশীলরা তা থেকে শিক্ষা নেয়।”[১৬৯]
আল্লাহ তাআলা আরেক জায়গায় বলেছেন, ﴿أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوْبِ أَقْفَالُهَا ﴾ "তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তাভাবনা করে না, নাকি তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?" [১৭০]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন, ﴿أَفَلَمْ يَدَّبَّرُوا الْقَوْلَ﴾ "তারা কি কখনো এ কালাম সম্পর্কে চিন্তা করেনি?” [১৭১]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন, ﴿إِنَّا جَعَلْنَاهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ ﴾
"আমি একে আরবি ভাষার কুরআন বানিয়েছি, যাতে তোমরা তা বুঝতে পারো।" [১৭২]
হাসান বলেছেন, 'কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে যাতে তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হয় এবং সে অনুযায়ী আমল করা হয়। সুতরাং কুরআন তিলাওয়াত করাকে আমল হিসাবে গ্রহণ করো।' সুতরাং কুরআন নিয়ে তাদাব্বুর ও তাফাকুর করা, দীর্ঘ সময় ধরে তাতে ধ্যান করা এবং এর অর্থ বোঝার জন্য চিন্তা-ফিকির করার চেয়ে বান্দার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে উপকারী ও তার মুক্তির নিকটবর্তী আর কোনো আমল নেই। কারণ এটি বান্দাকে ভালো ও মন্দের নিদর্শনাদি, এর পথসমূহ, এর উপকরণ, উদ্দেশ্য, পরিণতি ও ফলাফল, ভালো ও মন্দ লোকের শেষ ঠিকানা ইত্যাদি সম্পর্কে অবহিত করে, এবং সৌভাগ্যের ও উপকারী ইলম-ভান্ডারের চাবি তার হাতে তুলে দেয়, তার অন্তরে ঈমানের শেকড় মজবুতভাবে সাব্যস্ত করে, এর ভিত্তি সুদৃঢ় করে, তার অন্তরে দুনিয়া-আখিরাত ও জান্নাত-জাহান্নামের সঠিক চিত্র তুলে ধরে, অন্যান্য উম্মাহর অবস্থা, তাদের থেকে আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন সময় কী কী পরীক্ষা নিয়েছেন, সে সম্পর্কে জানিয়ে দেয় এবং তাকে উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণের স্থানসমূহ দেখিয়ে দেয়।
কুরআন আল্লাহ তাআলার ইনসাফ, দয়া ও অনুগ্রহ দেখিয়ে দেয়, তাঁর সত্তা, নাম, গুণাবলি ও কার্যাবলির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়, তিনি কী পছন্দ করেন, কী অপছন্দ করেন, তাঁর পর্যন্ত পৌঁছার রাস্তা, পথচলার পাথেয় এবং পথের বিভিন্ন বিপদাপদ ইত্যাদির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।
এমনিভাবে নফস ও নফসের গুণাবলি, আমল বিনষ্টকারী ও বিশুদ্ধকারী বিষয় সম্পর্কেও জানিয়ে দেয়।
কুরআন মানুষকে জান্নাতি ও জাহান্নামিদের পথ সম্পর্কে, তাদের আমল, অবস্থা, আলামত, সৌভাগ্যবান ও দুর্ভাগাদের বিভিন্ন স্তর, মানুষের প্রকারভেদ, তাদের বিশ্বাস-অবিশ্বাস ইত্যাদি বিষয়ও অবহিত করে।
মোটকথা কুরআনের তাদাব্বুর বা চিন্তাভাবনা ব্যক্তিকে (তিনটি বিষয় সম্পর্কে অবহিত করে) ১. তার রবের পরিচয়, ২. তাঁর পর্যন্ত পৌঁছার পথ এবং ৩. সে পথ পাড়ি দিলে তার জন্য কী সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে, সে সম্পর্কে জানিয়ে দেয়। আবার এর বিপরীতে তাকে আরও তিনটি বিষয় সম্পর্কে অবহিত করে, তা হলো: ১. শয়তান যেদিকে ডাকে, ২. শয়তানের পথ পর্যন্ত পৌঁছার রাস্তা এবং ৩. তার পথে পা বাড়ালে এবং সেখানে পৌঁছে গেলে কী শাস্তি ও লাঞ্ছনা ভাগ্যে জুটবে তা।
ওপরের এই ছয়টি বিষয় জানা, বোঝা ও প্রত্যক্ষ করা বান্দার জন্য অতীব জরুরি। এগুলো তাকে আখিরাতের দৃশ্যাবলি প্রত্যক্ষ করাবে; যেন সে সেখানকারই বাসিন্দা এবং দুনিয়া থেকে তাকে নিয়ে যাবে যেন সে কখনোই এখানে ছিল না। পৃথিবীবাসী যে বিষয়গুলোতে মতভেদ করে থাকে, তার সামনে সেগুলোর ব্যাপারে কোনটা হক আর কোনটা বাতিল তা সুস্পষ্ট করে তুলে ধরবে। সত্যকে সত্য বলে আর মিথ্যাকে মিথ্যা বলে চেনাবে। তাকে ফুরকান ও এমন নূর দান করবে, যার দ্বারা সে হিদায়াত ও গোমরাহি, আলো ও অন্ধকারের মাঝে পার্থক্য করতে সক্ষম হবে, তার অন্তরে শক্তি, প্রাণবন্ততা, প্রশস্ততা, আনন্দ ও উজ্জ্বলতা আনয়ন করবে; যার ফলে সে থাকবে এক অবস্থায় আর অন্যান্য মানুষ থাকবে আরেক অবস্থায়।
কারণ কুরআনের অর্থ বান্দাকে যেসব বিষয়ে জানিয়ে দেয় তা হলো: তাওহীদ, দলীল-প্রমাণ, আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান ও তাঁর পরিপূর্ণ গুণাবলি, সব ধরনের দোষত্রুটি থেকে তাঁর পবিত্রতা, তাঁর রাসূলদের ওপর ঈমান, তাঁদের সত্যবাদিতার দলীল, তাঁদের নুবুওয়াতের বিশুদ্ধতার নিদর্শন, তাঁদের অধিকার সম্পর্কে পরিচয়, ফেরেশতাদের ওপর ঈমান, যারা সৃষ্টির মাঝে আল্লাহর আদেশ পৌঁছানোর ক্ষেত্রে তাঁর দূত, আল্লাহর ইচ্ছায় ও হুকুমে ফেরেশতাদের দ্বারা বিভিন্ন বিষয় পরিচালনা করা, ঊর্ধ্বজগৎ ও নিম্নজগতে তাদের বিভিন্ন কার্যক্রম, ফেরেশতাদের মধ্যে আবার অনেকেই মানবজাতির সাথে তাদের মায়ের পেটে অবস্থান করা থেকে শুরু করে সেই দিন পর্যন্ত সংযুক্ত থাকে, যেদিন তাদের রব তাদেরকে সবকিছুর পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব ও প্রতিদান দেবেন।
এমনিভাবে আখিরাতের দিনের ওপর ঈমান, আল্লাহ তাআলা তাতে তাঁর ওলিদের জন্য যে সুখময় আবাস জান্নাত নির্মাণ করে রেখেছেন, যেখানে তারা কোনো ধরনের দুঃখ-কষ্ট, ব্যথা-বেদনা ও কমতি অনুভব করবে না, আবার তিনি তাঁর শত্রুদের জন্য যে অফুরন্ত শাস্তির ঘর জাহান্নাম তৈরি করে রেখেছেন, যেখানে কোনো রকমের সুখশান্তি-আরাম-আয়েশ থাকবে না-এসব বিষয়ে বিস্তারিত ও সুস্পষ্ট আলোচনা রয়েছে পবিত্র কুরআনে।
এমনিভাবে বিস্তারিত আলোচনা এসেছে আদেশ, নিষেধ, শারীআহ, তাকদীর, হালাল, হারাম, শিক্ষা ও উপদেশ, ঘটনা, উদাহরণ, কারণ, হিকমাহ, সৃষ্টির সূচনা-শেষ-উদ্দেশ্য ইত্যাদি বিষয়ে।
আসলে কুরআনের অর্থসমূহ বান্দাকে উত্তম প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে তার রবের দিকে ধাবিত করে, আল্লাহর ওয়াদাকৃত কঠিন শাস্তি ও আযাবের মাধ্যমে তাকে ভীতিপ্রদর্শন করে ও সতর্ক করে, কঠিন ও ভারী দিনের সাক্ষাতের জন্য তাকে হালকা ও ভারহীন হতে উদ্বুদ্ধ করে, বিভিন্ন যুক্তি, মতবাদ ও দলের অন্ধকার থেকে তাকে সঠিক পথের দিশা দেয়, তাকে হরেকরকমের বিদআত ও গোমরাহিতে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত রাখে, রবের শুকরিয়া আদায়ের মাধ্যমে নিয়ামাত বৃদ্ধি করতে উৎসাহ জোগায়, হালাল-হারামের সীমারেখা দেখিয়ে দেয়, তাকে সেই সীমারেখায় অবস্থান করায় যাতে সে সীমালঙ্ঘন না করে, ফলে দীর্ঘ কষ্টে পড়তে না হয়, তার অন্তরকে সত্য ও হক হতে বিচ্যুত হয়ে যাওয়া থেকে দৃঢ় রাখে, কঠিন কঠিন বিষয়গুলোকে তার জন্য বেশ সহজ করে দেয়, যখনই তার সংকল্প দুর্বল হয়ে যায়, চলার অনুপ্রেরণা নিথর হয়ে পড়ে, তখনই তাকে আহ্বান করে: কাফেলা অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে, অনেক মূল্যবান জিনিস তুমি হারিয়ে ফেলেছ, সুতরাং (তাদের সাথে গিয়ে) মিলিত হও, মিলিত হও! যাত্রা অব্যাহত রাখো, যাত্রা অব্যহত রাখো এবং তাদের আগে চলে যাও!’ আবার যখনই শত্রুপক্ষের কোনো গোপন ফাঁদে সে আটকে যাবার উপক্রম হয়, বা কোনো পথদস্যুদের কবলে পড়তে যায়, তখনই তাকে ডেকে বলে ওঠে, ‘সাবধান হও, সাবধান হও, আল্লাহকে আঁকড়ে ধরো, তাঁর কাছেই সাহায্য চাও এবং বলো, আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট আর উত্তম অভিভাবক (حَسْبِيَ اللهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ )।
কুরআন নিয়ে চিন্তা-ফিকির করা, তাদাব্বর-তাফাকুর করা এবং তা বোঝার চেষ্টা করার মাঝে আমরা যা উল্লেখ করেছি, তার চেয়েও অনেক অনেকগুণ বেশি কল্যাণ ও উপকারিতা নিহিত রয়েছে।
টিকাঃ
[১৬৮] তবে অর্থ না বুঝে তিলাওয়াত করা অনর্থক কিছু নয়, এর দ্বারাও বান্দা সাওয়াবের অধিকারী হয়। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ বলেছেন, مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللهِ فَلَهُ بِهِ حَسَنَةٌ وَالْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا لا أَقُولُ الم حَرْفٌ وَلَكِنْ أَلِفُ حَرْفٌ وَلَامٌ حَرْفٌ وَمِيمٌ حَرْفٌ "যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার কিতাবের একটি হরফ পাঠ করবে তার জন্য এর সাওয়াব রয়েছে। আর একটি সাওয়াব হবে দশ গুণ। আমি বলি না যে, আলিফ, লাম, মীম একটি হরফ; বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ এবং মীম একটি হরফ।" (তিরমিযি, ২৯১০) এই হাদীসটি তো সুস্পষ্ট যে, অর্থ না বুঝে কুরআন পাঠ করলেও সাওয়াব পাওয়া যাবে; কারণ আলিফ, লাম, মীম হলো আল-হুরূফুল মুকাত্তাআতের অন্তর্ভুক্ত; যার অর্থ আল্লাহ ব্যতীত আর কেউই জানে না।
[১৬৯] সূরা সাদ, ৩৮: ২৯।
[১৭০] সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭ : ২৪।
[১৭১] সূরা মুমিনূন, ২৩: ৬৮।
[১৭২] সূরা যুখরুফ, ৪৩: ৩।
📄 স্থুল আশা শিক্ষা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে
আশার স্বল্পতা হলো : এটা জানা যে, মৃত্যু খুবই নিকটবর্তী এবং জীবনের সময়কাল খুব দ্রুতই ফুরিয়ে যাবে। এটি অন্তরের জন্য সবচেয়ে উপকারী বিষয়। কেননা এটি তাকে দুঃখ-দুর্দশায় ও কঠিন সময়ে নিজেকে সামলে রাখতে ও সময়কে কাজে লাগাতে সাহায্য করে। আর সময় তো মেঘমালার উড়ে যাওয়ার মতোই দ্রুত অতিবাহিত হয়। এমনিভাবে তার আমলনামাকে নেক আমল দ্বারা ভারী করতে, নিজের চাওয়া ও ইচ্ছাকে চিরস্থায়ী আবাসের দিকে ফেরাতে উদ্বুদ্ধ করে। তাকে তার সফরের পাথেয় জোগাড় করতে এবং কমতি ও ঘাটতিগুলোকে পূরণ করতে। উৎসাহিত করে। দুনিয়ার প্রতি অনাগ্রহী এবং আখিরাতের প্রতি আগ্রহী বানায়। ধারাবাহিকভাবে অল্প আশার ওপরে অভ্যস্ত হলে ইয়াকীনের প্রহরীগুলোর মধ্য থেকে একটি প্রহরী তার অন্তরে নিযুক্ত হয়; যে তাকে দেখিয়ে দেয় দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্ব, এর দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়া, এর মধ্যে যা অবশিষ্ট রয়েছে তার স্বল্পতা। দুনিয়া কেবল পেছন দিকেই যাচ্ছে, এর ওটুকুই অবশিষ্ট রয়েছে, যেটুকু পাতিলের তলায় সামান্য খাবার অবশিষ্ট থাকে, যা ব্যক্তি চেঁচেমুছে তুলে নেয়, অথবা এর আর বাকি আছে কেবল সেই সময়টুকু, যেটুকু বাকি থাকে সেই দিনের অংশ; যার সূর্য হেলতে হেলতে অবস্থান নিয়েছে পাহাড়ের চূড়ায়। তাকে এটিও দেখিয়ে দেয় যে, আখিরাত চিরস্থায়ী ও অনন্তকালব্যাপী বিস্তৃত এবং তা ক্রমশ সামনে অগ্রসর হচ্ছে।
কিয়ামতের শর্ত ও আলামত চলে এসেছে। আখিরাতের সাথে সাক্ষাতের বিষয়টি সেই মুসাফিরের ন্যায়, যার সাথে সাক্ষাতের জন্য আরেকজন বাড়ি থেকে রওনা দিয়েছে; এদের প্রত্যেকেই একজন অপরজনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, হয়তো খুব দ্রুতই তাদের সাক্ষাৎ ঘটবে।
আশা ছোটো রাখার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার এই বাণীটিই যথেষ্ট- أَفَرَأَيْتَ إِنْ مَتَّعْنَاهُمْ سِنِينَ ثُمَّ جَاءَهُمْ مَّا كَانُوا يُوْعَدُونَ مَا أَغْنَى عَنْهُمْ مَّا كَانُوا يُمَتَّعُوْنَ )
"আপনি ভেবে দেখুন তো, আমি যদি তাদেরকে বছরের পর বছর ভোগবিলাস করতে দিই, অতঃপর যে বিষয়ে তাদেরকে ওয়াদা দেওয়া হতো, তা তাদের কাছে এসে পড়ে, তখন তাদের ভোগবিলাস কি তাদের কোনো উপকারে আসবে?” [১৭৩]
আবদুল্লাহ ইবনু আমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'একদিন রাসূলুল্লাহ আমাদের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমরা তখন আমাদের একটি কুঁড়েঘর মেরামত করছিলাম। তিনি প্রশ্ন করলেন, "এটা কী?"
আমরা বললাম, 'এটা নড়বড়ে হয়ে গেছে, তাই তা ঠিকঠাক করছি।'
তিনি এর জবাবে বললেন,
مَا أَرَى الأَمْرَ إِلَّا أَعْجَلَ مِنْ ذَلِكَ
"আমি তো দেখছি মৃত্যু এর চেয়েও দ্রুত ধাবমান।" [১৭৪]
আশার স্বল্পতার ভিত্তি হলো দুটি বিষয়ের ওপর: ১. দুনিয়া ধ্বংস হওয়া ও তা ছেড়ে যাওয়ার বিশ্বাস এবং ২. আখিরাতের সাক্ষাৎ পাওয়া ও তার চিরস্থায়ী হওয়ার বিশ্বাস। এখন আপনি দুটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিন এবং যেটা উত্তম ও কল্যাণকর সেটাকে প্রাধান্য দিন।
টিকাঃ
[১৭৩] সূরা শুআরা, ২৬: ২০৫-২০৭।
[১৭৪] তিরমিযি, ২৩৩৫; আবূ দাউদ, ৫২৩৬।