📄 আল্লাহ-অভিমুখী হওয়ার কিছু আলামত
গাফিলদেরকে তুচ্ছ ভাবা এবং তাদের ব্যাপারে শাস্তির আশঙ্কা করা থেকে বিরত থাকা। নিজের ব্যাপারে আশার দরজা উন্মুক্ত মনে করা এবং নিজেকে রহমতের যোগ্য ভাবা অনুচিত। আর অসচেতন ও গাফিল লোকদের ব্যাপারে আযাবের ভয় করা এবং তারা ধ্বংস হয়ে গেছে বলে মনে করা যাবে না। বরং তাদের ব্যাপারেই রহমতের আশা করা আর নিজের ব্যাপারে শাস্তির ভয়ে ভীত হওয়া। আর যদি তাদের ভেতরগত অবস্থা ও হালাত জানা থাকার কারণে তাদের প্রতি ঘৃণা জন্মে, তা হলে আপনি নিজের নফসকেই তাদের চেয়ে বেশি ঘৃণা করবেন এবং নিজের চেয়ে তাদের ব্যাপারে রহমতের আশা বেশি করবেন।
পূর্ববর্তী মনীষীদের কোনো একজন বলেছেন, 'তুমি (ঈমানকে) ততক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণরূপে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত-না আল্লাহর ব্যাপারে (মানুষজনের কাজকর্মের কারণে) তাদেরকে ঘৃণা করবে; তারপর নিজের নফসের দিকে দৃষ্টি ফেরাবে এবং পরিশেষে কেবল নিজেকেই সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করতে থাকবে। [১৫৫]
এই কথার অর্থ কেবল সেই ব্যক্তিই বুঝতে পারবে, যে আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে গভীর প্রজ্ঞা অর্জন করেছে। কারণ সৃষ্টিজগতের প্রকৃত অবস্থা, তাদের অক্ষমতা, দুর্বলতা, বাড়াবাড়ি, ছাড়াছাড়ি, আল্লাহর হক বিনষ্ট করা, আল্লাহকে বাদ দিয়ে অপরের প্রতি ধাবিত হওয়া, আল্লাহর অংশ ও আখিরাতকে এই ধ্বংসশীল দুনিয়ার সামান্য অর্থকড়ির জন্য বিকিয়ে দেওয়া ইত্যাদি পাপাচার ও অনাচার যে প্রত্যক্ষ করে, সে আবশ্যকীয়ভাবেই মানুষদের ঘৃণা করবে, এ ছাড়া তার আর দ্বিতীয় কোনো পথ থাকে না। কিন্তু যখন সে নিজের নফস, সার্বিক অবস্থা ও নিজের শিথিলতার দিকে দৃষ্টি ফেরাবে এবং বিচক্ষণ থাকবে, তখন সে নিজের নফসকেই সবার চেয়ে বেশি ঘৃণা করবে এবং তাকে তুচ্ছ ভাববে। আর এই ব্যক্তিই হলো প্রকৃত ফকীহ বা দ্বীনের গভীর জ্ঞানের অধিকারী।
আল্লাহ-অভিমুখীদের আরেকটি আলামত: নিজের আমল নিয়ে নিরাশ হওয়া। এর দুটি ব্যাখ্যা রয়েছে।
প্রথম ব্যাখ্যা: বান্দা যখন হাকীকতের দৃষ্টিতে আমলসমূহের প্রকৃত কর্তা ও পরিচালনাকারী আল্লাহর দিকে তাকাবে এবং এটি উপলব্ধি করবে যে, আল্লাহর যদি ইচ্ছা না থাকত, তা হলে কোনো আমল করাই সম্ভব হতো না, আসলে নিজের ইচ্ছায় নয় বরং আল্লাহর ইচ্ছাতেই আমল অস্তিত্বে এসেছে, তখন সে তার নিজের কোনো আমল ও কাজ দেখতে পাবে না, সে দেখবে আমলশূন্য তার অস্তিত্বই কেবল অবশিষ্ট রয়েছে। কারও জন্য এই অবস্থার সৃষ্টি হওয়া, তার আমল নজরে পড়ার চেয়ে উত্তম।
দ্বিতীয় ব্যাখ্যা: আপনি আপনার নিজের আমলের মাধ্যমে মুক্তি পাওয়ার আশা করা থেকে নিরাশ হয়ে পড়বেন। আপনি এটা দেখবেন যে, মুক্তি মিলবে কেবল তখনই, যখন আল্লাহ তাআলার রহমত, ক্ষমা ও অনুগ্রহ থাকবে। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছে, নবি ﷺ বলেছেন,
لَنْ يُنَجِّيَ أَحَدًا مِّنْكُمْ عَمَلُهُ "তোমাদের আমল কখনো তোমাদের কাউকে নাজাত দিতে পারবে না।"
তখন সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, 'আপনাকেও না, ইয়া রাসূলাল্লাহ?'
তিনি জবাব দিলেন,
وَلَا أَنَا إِلَّا أَنْ يَتَغَمَّدَنِيَ اللَّهُ بِرَحْمَةٍ
"না, আমাকেও না। তবে আল্লাহ তাআলা আমাকে তাঁর রহমত দিয়ে আবৃত করে নিয়েছেন।”[১৫৬]
এখানে প্রথম অর্থ (অর্থাৎ নিজের আমল দ্বারা নাজাত না পাওয়া) হলো শুরুর পর্যায়ে, আর দ্বিতীয় অর্থ (আল্লাহর রহমতে নাজাত পাওয়া) হলো শেষ ও চূড়ান্ত পর্যায়ে।
কেউ যখন শুরুতে নিজের আমল নিয়ে হতাশা ও নিরাশায় ভুগবে এবং শেষেও এর দ্বারা নাজাত পাওয়া না-পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকবে, তখন সে উপলব্ধি করতে পারবে আল্লাহর নিকট তার প্রয়োজনীয়তা; বরং সে প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর পরিপূর্ণ সাহায্য ও অনুগ্রহ লাভের অনুভব করবে। একদিক থেকে নয়; বরং সে চতুর্দিক থেকে তাঁর সাহায্যের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়বে। কোনো সংখ্যা নয়, বরং প্রতিটি মুহূর্তে সত্তাগতভাবেই সে আল্লাহ তাআলার প্রতি মুখাপেক্ষী ও অভাবী হয়ে পড়বে। যেমন আল্লাহ তাআলা সত্তাগতভাবেই ধনী ও বিপুল প্রাচুর্যের অধিকারী, ঠিক তেমনি বান্দা হলো সত্তাগতভাবেই ফকীর ও নিঃস্ব।
যখন তাঁর সামনে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশিত হয়ে পড়বে, যখন সে নিজের আমলের মাধ্যমে মুক্তি পাওয়া থেকে নিরাশ হয়ে যাবে, তখন সে তার রবের অনুগ্রহ ও দয়ার দিকে দৃষ্টি দেবে এবং জানতে পারবে যে, যে গুণাবলি তার মধ্যে রয়েছে, যা কিছুর আশা সে করছে এবং যেসব আমল সে করেছে, তা-ও আল্লাহ তাআলার দয়া, অনুগ্রহ, করুণা ও নিয়ামাত ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ তিনিই হলেন উপকরণ ও সাফল্য দানকারী, আগে-পরের সবকিছু কেবল তাঁরই, তিনিই প্রথম তিনিই শেষ, তিনি ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই এবং তিনি ছাড়া আর কোনো রব নেই।
টিকাঃ
[১৫৫] মা'মার ইবনু রাশিদ, আল-জামি', ২০৪৮৩। আবুদ দারদা-এর বাণী।
[১৫৬] বুখারি, ৬৪৬৩; মুসলিম, ২৮১৬।