📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 গুনাহের ক্ষেত্রে মানুষের বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি

📄 গুনাহের ক্ষেত্রে মানুষের বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি


মানুষজন যে বিপদাপদে আক্রান্ত হয়, সেগুলো সম্পর্কে তাদের ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা এবং সেগুলোর উদ্দেশ্য ও উপকরণের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে রয়েছে অনেক ব্যবধান। এই ক্ষেত্রে মোট আট ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে-
প্রথম দৃষ্টিভঙ্গি: জন্তু-জানোয়ারের দৃষ্টিভঙ্গি। এ স্তরে ব্যক্তির দৃষ্টি কেবল তার আনন্দ-ফুর্তি আর উদরপূর্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এ ক্ষেত্রে সে পশুর সদৃশ হয়ে যায়। অধিক বিলাসিতা আর খাহেশাত পূরণ করতে গিয়ে কখনো কখনো সে জন্তু-জানোয়ারদেরও ছাড়িয়ে যায়।
এই শ্রেণির মানুষ ও প্রাণী-পশুর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই; কেবল নিজের চাহিদা পূরণের পদ্ধতির ভিন্নতা ছাড়া। তাদের একমাত্র ভাবনা হলো কীভাবে কোন পন্থায় আনন্দ আর স্বাদ লাভ করা যায়। তাদের নফস জন্তু-জানোয়ারের নফসের মতো হয়ে যায়।
দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গি: জাবরিয়্যাদের দৃষ্টিভঙ্গি; আর তা হলো: মানুষ বাধ্য হয়েই সবকিছু করছে, তার কাজকর্ম অন্য কেউ করে দিচ্ছে, সে কেবল তার মাধ্যম। ফলে এই শ্রেণির ব্যক্তিরা মনে করে, তাদের কোনো গুনাহ নেই। কারণ কাজ তো তারা করছে না, তাদের দিয়ে করানো হচ্ছে।
তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো: তারা তাদের কাজকর্মের ওপর বাধ্য, যা সংঘটিত হচ্ছে তাতে তাদের কোনো সক্ষমতা নেই। বরং তারা এটাই বিশ্বাস করে নিয়েছে যে, যে কাজগুলো তারা করছে, সেগুলো তাদের কর্ম নয়।
এটি হলো মুশরিক ও রাসূলের শত্রুদের দৃষ্টিভঙ্গি; যারা আল্লাহর প্রকৃত শত্রু এবং ইবলীসের বন্ধু।
তৃতীয় দৃষ্টিভঙ্গি: কাদরিয়‍্যাদের দৃষ্টিভঙ্গি। তারা মনে করে যে সমস্ত গুনাহে তারা লিপ্ত, তা কেবল তাদের ইচ্ছা ও চাওয়াতেই সংঘটিত হয়, এতে আল্লাহ তাআলার ইচ্ছার কোনো দখল নেই। তারা এটাও বিশ্বাস করে যে, তাদের কাজকর্মের ওপর আল্লাহর কোনো ক্ষমতা নেই, তিনি তা পূর্বে লিখেও রাখেননি এবং তাদের এই কাজকর্ম তাঁর সৃষ্টিও নয়; (বরং তারাই সেগুলোর স্রষ্টা।)
এটি হলো মাজুসি কাদরিয়‍্যাদের দৃষ্টিভঙ্গি।
চতুর্থ দৃষ্টিভঙ্গি: আলিম ও ঈমানদারদের দৃষ্টিভঙ্গি। তা হলো তাকদীর ও শারীআতের দৃষ্টিভঙ্গি। এ ক্ষেত্রে গুনাহগার বান্দা তার নিজের কর্ম যেমন দেখে, তেমনি দেখে আল্লাহ তাআলার ফায়সালা ও ক্ষমতা।
পঞ্চম দৃষ্টিভঙ্গি: অভাবগ্রস্ততা, অক্ষমতা ও দুর্বলতার দৃষ্টিভঙ্গি। যেখানে গুনাহগার দেখে যদি আল্লাহ তাআলা তাকে সাহায্য না করেন, তাকে সরল পথে অটল না রাখেন এবং তাওফীক না দেন, তা হলে সে ধ্বংস হয়ে যাবে।
ষষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি: তাওহীদ ও আদেশ-সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি দেখে সবকিছু কেবল আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি ও ইচ্ছারই বাস্তবায়ন, অস্তিত্বশীল সমগ্র বস্তু কেবল তাঁর সাথেই সম্পৃক্ত, সবকিছু একমাত্র তাঁর হুকুমেই চলমান এবং তাঁর ইলমে যা রয়েছে ও তাঁর কলমে যা লেখা হয়েছে, শুধু তা-ই ঘটে।
এর সাথে সাথে সে আল্লাহ তাআলার আদেশ-নিষেধ, পুরস্কার-শাস্তি, আমল অনুযায়ী প্রতিদান দেওয়া, জরুরি উপকরণের সাথে মূল কাজের সম্পর্ক ইত্যাদিও প্রত্যক্ষ করে।
সপ্তম দৃষ্টিভঙ্গি: নাম ও গুণাবলি-সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি। এটি হলো ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার নাম ও গুণাবলির সাথে তাঁর সৃষ্টি, আদেশ, ফায়সালা ও ক্ষমতার নিগুঢ় সম্পর্ক প্রত্যক্ষ করে এবং এটিও বিশ্বাস করে যে, এগুলো হলো আল্লাহর নাম ও গুণাবলির আবশ্যকীয় দাবি। কারণ তাঁর উত্তম নামসমূহ তা দাবি করে। আল্লাহ তাআলার الْحَلِيمُ، الْعَفْوُ، التَّوَّابُ، الْغَفَّارُ এই নামগুলো অপরিহার্যভাবে তার বাস্তব প্রভাবকে কামনা করে। যেমন হাদীসে এসেছে,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْ لَمْ تُذْنِبُوا لَذَهَبَ اللهُ بِكُمْ وَلَجَاءَ بِقَوْمٍ يُذْنِبُوْنَ فَيَسْتَغْفِرُونَ اللَّهَ فَيَغْفِرُ لَهُمْ
“সেই সত্তার শপথ! যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তোমরা যদি গুনাহ না করতে, তা হলে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তোমাদেরকে সরিয়ে দিয়ে এমন সম্প্রদায় নিয়ে আসতেন যারা গুনাহ করত, অতঃপর ক্ষমা চাইত। আর তিনি তাদের ক্ষমা করে দিতেন।"[১৪৯]
অষ্টম দৃষ্টিভঙ্গি: আল্লাহ তাআলার হিকমাহ বা প্রজ্ঞা-সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি। এটি হলো আল্লাহ তাআলার ফায়সালা ও সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর হিকমাহ প্রত্যক্ষ করা। বান্দার মাঝে ও গুনাহের মাঝের সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূর করে দেওয়া এবং তা সংঘটন করার শক্তি-সামর্থ্য দান করার ক্ষেত্রেও বান্দা আল্লাহর বিশেষ হিকমাহ ও প্রজ্ঞা দেখতে পায়। কারণ আল্লাহ যদি ইচ্ছা করতেন, তা হলে তাকে গুনাহ থেকে মুক্ত রাখতেন কিংবা কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে দিতেন। কিন্তু তিনি তা না করে, বান্দা ও তার গুনাহ করার মাঝে সুযোগ করে দিয়েছেন; এই কাজের পেছনে বিরাট হিকমাহ রয়েছে; যা পরিপূর্ণভাবে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না, এ ব্যাপারটিকে বুঝতে আকল-বুদ্ধি চূড়ান্তভাবে অক্ষম।
সপ্তম ও অষ্টম দৃষ্টিভঙ্গি দুটি অন্যান্যগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উঁচু স্তরের, সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ ও সম্মানের দৃষ্টিভঙ্গি।

টিকাঃ
[১৪৯] মুসলিম, ২৭৪৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00