📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 سَيِّئَةٌ ও ذَنْبٌ -এর মাঝে পার্থক্য

📄 سَيِّئَةٌ ও ذَنْبٌ -এর মাঝে পার্থক্য


আল্লাহ তাআলার পবিত্র কালামে এ দুটি শব্দ কোথাও একসাথে উল্লেখ করা হয়েছে আবার কোথাও পরস্পরকে আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
একসাথে উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন: আল্লাহ তাআলা তাঁর মুমিন বান্দাদের ব্যাপারে বলেছেন, তারা দুআ করে—
رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّئَاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ “হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের সকল গুনাহ মাফ করে দাও এবং আমাদের সকল দোষত্রুটি দূর করে দাও, আর নেক লোকদের সাথে আমাদের মৃত্যু দিয়ো।” [৯০]
আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন: আল্লাহ তাআলার বাণী—
وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَآمَنُوا بِمَا نُزَّلَ عَلَى مُحَمَّدٍ وَهُوَ الْحَقُّ مِنْ رَّبِّهِمْ كَفِّرَ عَنْهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ وَأَصْلَحَ بَالَهُمْ "আর যারা বিশ্বাস স্থাপন করে, সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে মুহাম্মাদের প্রতি অবতীর্ণ সত্যে বিশ্বাস করে, আল্লাহ তাদের মন্দকর্মসমূহ মার্জনা করেন এবং তাদের অবস্থা ভালো করে দেন।” [৯১]
আর মাগফিরাতের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَلَهُمْ فِيهَا مِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ وَمَغْفِرَةٌ مِّنْ رَّبِّهِمْ "সেখানে তাদের জন্য আছে রকমারি ফলমূল ও তাদের পালনকর্তার ক্ষমা।" [৯২]
এখানে চারটি বিষয় সামনে আসে, তা হলো: যুনূব (ذُنُوبُ), সায়্যিআত (سَيِّئَاتُ), মাগফিরাত (مَغْفِرَةٌ) ও তাকফীর (تَكْفِيْر)।
যুনূব (ذُنُوبُ) : এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: কবীরা গুনাহ।
সায়্যিআত (سَيِّئَاتُ) : এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: সগীরা গুনাহ; যেগুলোর ক্ষেত্রে কাফফারা প্রয়োগ হয়। যেমন: ছোটো ছোটো ত্রুটি-বিচ্যুতি বা এ রকম অন্যান্য বিষয়াদি। এ কারণেই সায়্যিআতের বেলায় কাফফারা প্রযোজ্য হয়।
সায়্যিআত দ্বারা যে সগীরা গুনাহ উদ্দেশ্য এবং এতে যে কাফফারা প্রযোজ্য হয়, তার দলীল হলো আল্লাহ তাআলার এই বাণী-
إِنْ تَجْتَنِبُوا كَبَابِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَنُدْخِلْكُم مُدْخَلًا كَرِيمًا
“যেগুলো সম্পর্কে তোমাদের নিষেধ করা হয়েছে তোমরা যদি তার বড়ো বড়ো গুনাহগুলো থেকে বেঁচে থাকো, তা হলে আমি তোমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো ক্ষমা করে দেবো এবং সম্মানজনক স্থানে তোমাদের প্রবেশ করাবো।” [৯৩]
‘সহীহ মুসলিম’-এর বর্ণনায় এসেছে, আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলতেন,
الصَّلَوَاتُ الخَمْسُ وَالجُمُعَةُ إِلَى الجُمُعَةِ وَرَمَضَانُ إِلَى رَمَضَانَ مُكَفِّرَاتٌ مَّا بَيْنَهُنَّ إِذَا اجْتَنَبَ الْكَبَابِرَ
“পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, এক জুমুআ থেকে আরেক জুমুআ এবং এক রমাদান থেকে আরেক রমাদান তার মধ্যবর্তী সময়ে সংঘটিত (ছোটো ছোটো) গুনাহগুলোকে মিটিয়ে দেবে, যদি কবীরা বা বড়ো বড়ো গুনাহগুলো পরিত্যাগ করে চলে।” [৯৪]
‘মাগফিরাত’ শব্দটি ‘তাকফীর’ শব্দটির চেয়ে বেশি পরিপূর্ণ। এই কারণে মাগফিরাতকে কবীরা গুনাহের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। আর তাকফীরকে সগীরা গুনাহের সাথে। কারণ মাগফিরাত শব্দটি (বান্দাকে গুনাহের ভয়াবহতা থেকে) রক্ষা করা ও হেফাজত করার বিষয়টি শামিল করে। আর তাকফীর শব্দটি ছোটো ছোটো গুনাহকে ক্ষমা করা ও গোপন রাখার অর্থকে অন্তর্ভুক্ত করে। তবে পৃথক পৃথকভাবে উল্লেখ করলে একটি অপরটি মধ্যে দাখিল হয়ে যায়; যেমনটি আগে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
كَفَرَ عَنْهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ “আল্লাহ তাদের মন্দকর্মসমূহ মার্জনা করেন।”[৯৫]
আল্লাহ তাআলার এই বাণীতে—ছোটোবড়ো সব গুনাহ, গুনাহকে মিটিয়ে দেওয়া, এর ক্ষতি থেকে বাঁচানো সবই এর মধ্যে শামিল রয়েছে। এমনিভাবে পৃথকভাবে উল্লেখিত তাকফীর সবচেয়ে খারাপ ও মন্দ আমলকেও অন্তর্ভুক্ত করে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
لِيُكَفِّرَ اللَّهُ عَنْهُمْ أَسْوَأَ الَّذِي عَمِلُوا "যাতে আল্লাহ তাদের সবচেয়ে মন্দকর্মসমূহ মার্জনা করেন।”[৯৬]
যখন এটা বোঝা গেল, তখন এই রহস্যও বোঝা সহজ হবে যে, আল্লাহ তাআলা বিপদাপদ, রোগব্যাধি, চিন্তা, পেরেশানি, দুঃখ-কষ্ট ইত্যাদির ক্ষেত্রে তাকফীর বা সগীরা গুনাহ মাফের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন; মাগফিরাত বা কবীরা গুনাহ মাফের নয়। যেমন, সহীহ হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
مَا يُصِيبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ وَلَا وَصَبٍ وَلَا هَمْ وَلَا حُزْنٍ وَّلَا أَذًى وَلَا غَمْ حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا إِلَّا كَفَرَ اللَّهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ “মুসলিম ব্যক্তির ওপর যে কষ্টক্লেশ, রোগব্যাধি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও পেরেশানি আসে, এমনকি যে কাঁটা তার দেহে বিদ্ধ হয়, এগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তার গুনাহসমূহ দূর করে দেন।”[৯৭]
কারণ বিপদ-মুসীবত গুনাহ মাফের ক্ষেত্রে এককভাবে যথেষ্ট নয়; আবার তাওবা ব্যতীত সমস্ত গুনাহ মাফও হয় না। সুতরাং গুনাহগারদের জন্য দুনিয়াতে তিনটি বড়ো বড়ো নদী রয়েছে, যার দ্বারা সে এখানে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা অর্জন করে-যদি এর দ্বারাও পরিপূর্ণ পবিত্র না হতে পারে, তা হলে কিয়ামাতের দিন জাহান্নামের নদীতে নামিয়ে তা অর্জন করবে। দুনিয়ার বড়ো বড়ো তিনটি নদী হলো: ১. খাঁটি তাওবার নদী, ২. এমন নেক আমলের নদী; যা সমস্ত গুনাহকে বেষ্টন করে নেয় এবং ৩. গুনাহ-দূরকারী বড়ো বড়ো বিপদাপদের নদী। আল্লাহ তাআলা যখন কোনো বান্দার ব্যাপারে কল্যাণ ও মঙ্গলের ফায়সালা করেন, তখন তাকে এই তিন নদীর কোনো একটিতে প্রবেশ করান; ফলে সে কিয়ামাতের দিন পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন হয়ে উঠবে; চতুর্থ কোনো নদীর আর প্রয়োজন হবে না।

টিকাঃ
[৮৯] বাংলাতে দুটোর অর্থই গুনাহ বা পাপ। আসলে আরবি ভাষার ব্যাপকতা ও প্রাচুর্যতা অনেক থাকার কারণে এই দুটোর মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে।
[৯০] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৯৩।
[৯১] সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭: ২।
[৯২] সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭: ১৫।
[৯৩] সূরা নিসা, ৪:৩১।
[৯৪] মুসলিম, ২৩৩।
[৯৫] সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭ : ২।
[৯৬] সূরা যুমার; ৩৯ : ৩৫।
[৯৭] বুখারি, ৫৬৪১; মুসলিম, ২৫৭৩।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 বান্দার তাওবা আল্লাহর দুই রহমত দ্বারা পরিবেষ্টিত

📄 বান্দার তাওবা আল্লাহর দুই রহমত দ্বারা পরিবেষ্টিত


আল্লাহর দিকে বান্দার ফিরে আসা বা তাওবা করার পূর্বে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি রহমত এবং পরে একটি রহমত দ্বারা বান্দার তাওবা পরিবেষ্টিত থাকে। বান্দার তাওবা থাকে আল্লাহর দুই রহমতের মাঝে; আগে একটা, পরে একটা। কারণ প্রথমে তিনি তাকে তাওবা করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন, তার অন্তরে অনুপ্রেরণা জোগান এবং তাওফীক দান করেন। এরপর বান্দা তাওবা করলে তা কবুল করতে এবং এর প্রতিদান দিতে আল্লাহ তাআলা দ্বিতীয়বার তার দিকে মনোযোগী হন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَقَدْ تَابَ اللهُ عَلَى النَّبِيِّ وَالْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ فِي سَاعَةِ الْعُسْرَةِ مِنْ بَعْدِ مَا كَادَ يَزِيغُ قُلُوْبُ فَرِيْقٍ مِّنْهُمْ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ إِنَّهُ بِهِمْ رَءُوْفٌ رَّحِيمٌ ) “আল্লাহ দয়াশীল হয়েছেন নবির প্রতি এবং মুহাজির ও আনসারদের প্রতি, যারা কঠিন মুহূর্তে নবির সঙ্গে ছিল, যখন তাদের এক দলের অন্তর ফিরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। অতঃপর তিনি পুনরায় দয়াশীল হন তাদের প্রতি। নিঃসন্দেহে তিনি তাদের প্রতি দয়াশীল ও করুণাময়।[৯৮]
আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে জানিয়ে দিয়েছেন যে, আল্লাহর দয়া-অনুগ্রহ তাদের তাওবার চেয়ে অগ্রগামী ছিল; যার কারণে তারা তাওবা করতে পেরেছে। আল্লাহর রহমতই তাদের তাওবা করার কারণ। সুতরাং বোঝা যায়, আল্লাহ তাদের প্রতি দয়াশীল না হলে, তারা তাওবা করতে পারত না। কেননা কারণ না থাকলে হুকুমও থাকে না।
তাওবার শুরু ও শেষ রয়েছে। এর শুরুটা হলো আল্লাহ তাআলার দিকে ফেরা, তাঁর দেওয়া সরল-সোজা পথে চলা; যে পথ তিনি নির্ধারণ করে দিয়েছেন তাঁর সন্তুষ্টি পর্যন্ত পৌঁছার জন্য এবং বান্দাদের সে পথে চলার আদেশও করেছেন— وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِيْ مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ “নিশ্চিত এটি আমার সরল পথ; অতএব এ পথে চলো এবং অন্যান্য পথে চলো না।”[৯৯]
আর তাওবার শেষ হলো আখিরাতে তাঁর দিকে ফেরা এবং তাঁর সে পথে চলা; যা তিনি জান্নাত পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেওয়ার জন্য বানিয়েছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি এই দুনিয়াতে তাওবার মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরবে, আল্লাহ তাআলাও আখিরাতে পুরস্কার দেওয়ার মাধ্যমে তার দিকে ফিরবেন।

টিকাঃ
[৯৮] সূরা তাওবা, ৯: ১১৭।
[৯৯] সূরা আনআম, ৬: ১১৩।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 গুনাহের প্রকারভেদ

📄 গুনাহের প্রকারভেদ


যুনূব বা গুনাহ হলো দুই প্রকার: ১. সগীরা গুনাহ ও ২. কবীরা গুনাহ। কুরআন, সুন্নাহ ও উম্মাতের ইজমা দ্বারা এটি প্রমাণিত।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, إِنْ تَجْتَنِبُوا كَبَابِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ “যেগুলো সম্পর্কে তোমাদের নিষেধ করা হয়েছে, তোমরা যদি তার বড়ো বড়ো গুনাহগুলো থেকে বেঁচে থাকো, তা হলে আমি তোমাদের ত্রুটি- বিচ্যুতিগুলো ক্ষমা করে দেবো।”[১০০]
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, الَّذِينَ يَجْتَنِبُوْنَ كَبَابِرَ الْإِثْمِ وَالْفَوَاحِشَ إِلَّا اللَّمَمَ
"যারা বড়ো বড়ো গুনাহ এবং প্রকাশ্য ও সর্বজনবিদিত অশ্লীল কাজ থেকে বিরত থাকে; তবে ছোটোখাটো ত্রুটি-বিচ্যুতি হওয়া ভিন্ন কথা।”[১০১]
'সহীহ মুসলিম'-এর বর্ণনায় এসেছে, আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলতেন, الصَّلَوَاتُ الخَمْسُ وَالجُمُعَةُ إِلَى الجُمُعَةِ وَرَمَضَانُ إِلَى رَمَضَانَ مُكَفِّرَاتٌ مَّا بَيْنَهُنَّ إِذَا اجْتَنَبَ الْكَبَابِرَ
"পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, এক জুমুআ থেকে আরেক জুমুআ এবং এক রমাদান থেকে আরেক রমাদান তার মধ্যবর্তী সময়ে সংঘটিত (ছোটো ছোটো) গুনাহগুলোকে মিটিয়ে দেবে; যদি কবীরা বা বড়ো বড়ো গুনাহগুলো পরিত্যাগ করে চলে।”[১০২]
ইমামগণ দুটি বিষয়ে ইখতিলাফ করেছেন, একটি হলো: উপরিউক্ত আয়াতে ব্যবহৃত اللَّمَمُ -এর অর্থ নিয়ে, আরেকটি হলো: কবীরা গুনাহের ব্যাপারে; এর কী নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা আছে কি না অথবা এর নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা রয়েছে কি না? আমরা এই দুটি বিষয় সম্পর্কে কিছু আলোচনা করব।
اَللَّمُ সম্পর্কে আলোচনা : অনেক সালাফ থেকে বর্ণিত আছে যে, ''লামাম' হলো একবার গুনাহে লিপ্ত হওয়া, অতঃপর আর সে দিকে ফিরে না যাওয়া; যদিও তা কবীরা গুনাহ হয়।' বাগাবি বলেছেন, 'এটি আবূ হুরায়রা, মুজাহিদ ও হাসান বাসরির মত এবং ইবনু আব্বাস থেকে আতার বর্ণনা।' তিনি আরও বলেছেন, 'আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস বলেন, 'اللمم দ্বারা উদ্দেশ্য হলো শিরক ছাড়া অন্যান্য গুনাহ।' সুদ্দি বলেছেন, 'আবূ সালিহ বলেন, 'আল্লাহ তাআলার বাণীতে إِلَّا اللَّمَ দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে, সে সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞাসা করা হলো।' আমি জবাব দিলাম, 'সেই ব্যক্তি যে গুনাহে একবার জড়িয়ে পড়ে, কিন্তু পরবর্তীকালে তাতে আর লিপ্ত হয় না।' অতঃপর এই বিষয়টি আমি আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস-এর নিকট আলোচনা করলে তিনি বলেন, 'দয়াময় অধিপতি আল্লাহ তোমাকে এর ওপর সাহায্য করেছেন।'
আর অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের অভিমত: اللَّمَ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কবীরা গুনাহ ছাড়া অন্যান্য গুনাহ। আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস-এর দুটি রিওয়ায়াতের মধ্যে এটিই অধিক বিশুদ্ধ। যেমন 'সহীহ বুখারি'-র বর্ণনায় তার থেকে তাউস বর্ণনা করেন, 'ইবনু আব্বাস বলেন, 'লামাম সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে নবি বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ عَلَى ابْنِ آدَمَ حَظَّهُ مِنَ الزِّنَا، أَدْرَكَ ذَلِكَ لَا مَحَالَةَ، فَزِنَا الْعَيْنِ النَظَرُ، وَزِنَا النِّسَانِ الْمَنْطِقُ، وَالنَّفْسُ تَمَنَّى وَتَشْتَهِي، وَالْفَرْجُ يُصَدِّقُ ذُلِكَ كُلَّهُ وَيُكَذِّبُهُ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আদম সন্তানের ওপর যিনার একটা অংশ লিখে রেখেছেন। সে অবশ্যই তা পাবে। চোখের যিনা দেখা, জিহ্বার যিনা কথা বলা, নফস কামনা সৃষ্টি করে আর সবশেষে যৌনাঙ্গ তা সত্য অথবা মিথ্যা প্রমাণ করে।" [১০৩]
সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব বলেন, 'অন্তরের দ্বারা বান্দা যে গুনাহে লিপ্ত হয়। অর্থাৎ যা সে চিন্তাভাবনা করে।'
অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের সিদ্ধান্তই হলো সঠিক অভিমত যে, লামাম দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সগীরা গুনাহ। যেমন: দৃষ্টি দেওয়া, স্পর্শ করা, চুম্বন করা ইত্যাদি। এটি হলো অধিকাংশ সাহাবি ও তাবিয়িদের মত। আবূ হুরায়রা, ইবনু মাসউদ, ইবনু আব্বাস, মাসরূক ও শা'বি-এর অভিমত।
এই অভিমত আবার আবূ হুরায়রা ও ইবনু আব্বাস -এর অপর বর্ণনার বিপরীত নয়-'একবার কবীরা গুনাহে জড়িয়ে পড়া; অতঃপর আর তাতে অভ্যস্ত না হওয়া।' কারণ লামাম হয়তো এই দুটোকেই অন্তর্ভুক্ত করে এবং তা দুভাবেই হতে পারে; যেমন কালবি বলেছেন। অথবা আবূ হুরায়রা ও ইবনু আব্বাস সেই ব্যক্তিকেও লামামের অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যে কবীরা গুনাহে মাত্র একবার লিপ্ত হয়েছে এবং তার ওপর অটল থাকেনি; বরং তার সারাজীবনে আকস্মিকভাবে কেবল ওই একবারই ঘটেছে। তবে তাঁরা সে ব্যক্তির ব্যাপারে অনেক কঠোর অবস্থানে রয়েছেন, যে কবীরা গুনাহে অটল ও ধারাবাহিকভাবে লিপ্ত। এটি আসলে তাঁদের সূক্ষ্ম জ্ঞান ও ইলমের গভীরতা।
কবীরা গুনাহ সম্পর্কে আলোচনা: সালাফগণ এ ক্ষেত্রে মতভেদ করেছেন; তবে তা একেবারেই বিপরীতমুখী বা সাংঘর্ষিক নয়; বরং সেগুলো প্রায় কাছাকাছি অর্থের।
'সহীহ বুখারি'-তে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনু আমর থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন,
الْكَبَائِرُ الإِشْرَاكُ بِالله وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ وَقَتْلُ النَّفْسِ وَالْيَمِينُ الْغَمُوسُ
“কবীরা গুনাহসমূহ (-এর অন্যতম) হচ্ছে আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা, পিতামাতার অবাধ্য হওয়া, কাউকে হত্যা করা এবং মিথ্যা কসম খাওয়া।” [১০৪]
'সহীহ বুখারি' ও 'সহীহ মুসলিম'-এর বর্ণনায় এসেছে, আবূ বাকরা থেকে বর্ণিত, নবি একবার বললেন, "আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড়ো বড়ো কবীরা গুনাহ সম্পর্কে জানিয়ে দেবো না?” এই কথাটি তিনি তিনবার বললেন। সাহাবায়ে কেরাম বললেন, 'অবশ্যই, ইয়া রাসূলাল্লাহ।' তিনি বললেন, “আল্লাহ তাআলার সাথে শির্ক করা ও মাতাপিতার অবাধ্য হওয়া।” তিনি হেলান দেওয়া অবস্থা থেকে সোজা হয়ে বসে বললেন, "আর মনে রেখো, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া।" এই কথাটি তিনি বারবার বলতেই থাকেন; এমনকি আমরা বলতে লাগলাম, 'যদি তিনি থেমে যেতেন!'[১০৫]
'সহীহ বুখারি' ও 'সহীহ মুসলিম'-এর আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি রাসূল -কে জিজ্ঞাসা করলাম,
أَيُّ الذَّنْبِ أَعْظَمُ عِنْدَ اللَّهِ 'আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বড়ো গুনাহ কোনটি?'
তিনি জবাব দিলেন,
أَنْ تَجْعَلَ لِلَّهِ نِدًّا وَهُوَ خَلَقَكَ "তুমি কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ বানাবে; অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।"
আমি বললাম, 'নিশ্চয়ই এটি সবচেয়ে বড়ো। এরপর কোনটি?'
তিনি বললেন,
أَنْ تَقْتُلَ وَلَدَكَ مَخَافَةً أَنْ يَطْعَمَ مَعَكَ "তুমি তোমার সন্তানকে এই ভয়ে হত্যা করবে যে, সে তোমার সঙ্গে খাবার খাবে।"
আমি বললাম, 'এরপর কোনটি?'
তিনি বললেন,
أَنْ تُزَانِي حَلِيْلَةَ جَارِكَ “তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া।”
আল্লাহ তাআলা নবি -এর এই বাণীর সত্যায়নে এই আয়াত নাযিল করেন-
وَالَّذِينَ لَا يَدْعُوْنَ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آخَرَ وَلَا يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَا يَزْنُونَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ يَلْقَ أَثَامًا
"এবং যারা আল্লাহ্র সাথে অন্য উপাস্যের ইবাদাত করে না, আল্লাহ যার হত্যা হারাম করেছেন, সঙ্গত কারণ ব্যতীত তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না। যারা একাজগুলো করে, তারা শাস্তির সম্মুখীন হবে।” (সূরা ফুরকান, ২৫: ৬৮) [১০৬]
আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন,
اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوْبِقَاتِ
"তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে বেঁচে থেকো।” সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, সেগুলো কী?' নবি জবাব দিলেন,
الشَّرْكُ بِاللهِ وَالسِّحْرُ وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَأَكْلُ مَالِ الْيَتِيمِ وَأَكْلُ الرِّبَا وَالتَّوَلَّى يَوْمَ الزَّحْفِ وَقَذْفُ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ
১. আল্লাহর সাথে শির্ক করা, ২. জাদু করা, ৩. সঙ্গত কারণ ছাড়া আল্লাহ যার হত্যা নিষেধ করেছেন, তাকে হত্যা করা, ৪ ইয়াতীমের মাল আত্মসাৎ করা, ৫. সুদ খাওয়া, ৬. যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং ৭ পবিত্র, সরলমনা ও ঈমানদার নারীর ওপর অপবাদ দেওয়া।”[১০৭]
আবদুল্লাহ ইবনু আমর থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন,
إِنَّ مِنْ أَكْبَرِ الْكَبَابِرِ أَنْ يَلْعَنَ الرَّجُلُ وَالِدَيْهِ
“কবীরা গুনাহসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো হলো নিজের পিতামাতাকে অভিশাপ দেওয়া।"
সাহাবায়ে কেরام জিজ্ঞাসা করলেন, 'কীভাবে ব্যক্তি তার নিজের পিতামাতাকেই অভিশাপ দেবে?'
তিনি জবাব দিলেন,
يَسُبُّ الرَّجُلُ أَبَا الرَّجُلِ، فَيَسُبُّ أَبَاهُ، وَيَسُبُّ أُمَّهُ فَيَسُبُّ أُمَّهُ
"সে অন্যের পিতাকে গালি দেবে, তখন সেই ব্যক্তি তার পিতাকে গালি দেবে এবং সে অন্যের মাকে গালি দেবে, তখন সেই ব্যক্তিও তার মাকে গালি দেবে। (আর এভাবে সে যেন তার নিজের পিতামাতাকেই গালি দিলো) "[১০৮]
সাঈদ ইবনু জুবাইর বলেন, 'একব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস -কে জিজ্ঞাসা করলেন, 'কবীরা গুনাহ কি সাতটি?' তিনি উত্তর দেন, 'কবীরা গুনাহ প্রায় সাতশ'র কাছাকাছি। ইস্তিগফার করতে থাকলে কবীরা গুনাহ আর কবীরা থাকে না, এমনিভাবে সগীরা গুনাহও বারবার করতে থাকলে তা আর সগীরা থাকে না।' তিনি আরও বলেন, 'যে বস্তুর দ্বারাই আল্লাহর নাফরমানি করা হয়, তা-ই কবীরা; যে ব্যক্তি এর মধ্যে কোনো একটিতে জড়িয়ে পড়ে, তার উচিত ক্ষমা প্রার্থনা করা। কেননা আল্লাহ তাআলা এই উম্মাতের কোনো ব্যক্তিকেই চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামের ফায়সালা করবেন না, কয়েক শ্রেণি ব্যতীত; তা হলো— যে ইসলাম থেকে ফিরে যায় বা কোনো ফরজবিধানকে অস্বীকার করে অথবা তাকদীরকে মিথ্যা সাব্যস্ত করে। [১০৯]
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ বলেন, 'আল্লাহ তাআলা সূরা নিসার শুরু থেকে নিয়ে এই আয়াত পর্যন্ত যে গুনাহের আলোচনা করেছেন, তার সবই কবীরা—
إِنْ تَجْتَنِبُوا كَبَائِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ
“যেগুলো সম্পর্কে তোমাদের নিষেধ করা হয়েছে তোমরা যদি তার বড়ো বড়ো গুনাহগুলো থেকে বেঁচে থাকো, তা হলে আমি তোমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো ক্ষমা করে দেবো।” [১১০]
আলি ইবনু আবী তালহা বলেন, 'কবীরা গুনাহ হলো: এমন প্রতিটি গুনাহ, যার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম, গজব, লা'নত অথবা আযাবের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।' [১১১]
দাহহাক বলেন, 'কবীরা গুনাহ হলো : যার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতে হদ বা আখিরাতে শাস্তি দেওয়া কথা বলেছেন।' [১১২]
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা জানা জরুরি: সেটি হলো কবীরা গুনাহের সাথে যা যুক্ত হয়, কখনো কখনো তা সগীরা গুনাহের সাথেও যুক্ত হয়; যেমন: লজ্জা, ভয়, সেই গুনাহকে অনেক বড়ো মনে করা ইত্যাদি। আবার সগীরা গুনাহের সাথে যা যুক্ত হয়, কখনো কখনো তা কবীরা গুনাহের সাথেও যুক্ত হয়; যেমন: লজ্জাহীনতা, বেপরোয়া ভাব, ভয়ডর না থাকা, গুনাহকে তুচ্ছ করে দেখা, ছোটো ভাবা ইত্যাদি। এভাবে ব্যক্তি সগীরা গুনাহকে কবীরা গুনাহের চেয়েও নিকৃষ্ট স্তরে নিয়ে যায়।
এটি পুরোপুরিভাবে অন্তরের একটি বিষয়। গুনাহে লিপ্ত হওয়ার চেয়ে অতিরিক্ত একটি বিষয়; যা মানুষ নিজের ব্যাপারে ভালো করে জানে আর কখনো কখনো অন্যের ব্যাপারেও জানতে পারে।
আরও একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, যাকে পছন্দ করা হয় ও যার অনেক বড়ো অনুগ্রহ রয়েছে, এমন ব্যক্তিকে অনেক ব্যাপারে ক্ষমা করে দেওয়া হয়, যা অন্যদের ক্ষেত্রে দেওয়া হয় না। এমনিভাবে তাকে অনেক ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়, যা অন্যদের দেওয়া হয় না।
বান্দার আমলসমূহ তার জন্য আল্লাহর নিকট সুপারিশ করবে। যখন সে বিপদে পড়বে, তখন তাকে উদ্ধার করবে। যেমন, আল্লাহ তাআলা ইউনুস সম্পর্কে বলেছেন,
فَلَوْلَا أَنَّهُ كَانَ مِنَ الْمُسَبِّحِينَ ® لَلَبِثَ فِي بَطْنِهِ إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ ® "যদি তিনি আল্লাহর তাসবীহ পাঠ না করতেন, তবে তাঁকে কিয়ামাত দিবস পর্যন্ত মাছের পেটেই থাকতে হতো।"[১১৩]
ফিরআউন মৃত্যুর পূর্বে কোনো নেক আমল পাঠায়নি; যা তার জন্য সুপারিশ করবে। মৃত্যুর সময় ফিরআউন বলে উঠে,
آمَنْتُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا الَّذِي آمَنَتْ بِهِ بَنُو إِسْرَائِيلَ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ ﴾ "এবার আমি বিশ্বাস করে নিচ্ছি যে, কোনো মা'বুদ নেই তিনি ছাড়া যাঁর ওপর ঈমান এনেছে ইসরাঈলের বংশধররা। বস্তুত আমিও তাঁরই অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত।" [১১৪]
প্রতিউত্তরে জিবরীল বলেন,
الْآنَ وَقَدْ عَصَيْتَ قَبْلُ وَكُنْتَ مِنَ الْمُفْسِدِينَ ) "এখন একথা বলছো! অথচ তুমি ইতঃপূর্বে নাফরমানি করছিলে এবং পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে।" [১১৫]

টিকাঃ
[১০০] সূরা নিসা, ৪: ৩১।
[১০১] সূরা নাজম, ৫৩: ৩২।
[১০২] মুসলিম, ২৩৩।
[১০৩] বুখারি, ৬২৪৩; মুসলিম, ২৬৫৭।
[১০৪] বুখারি, ৬৬৭৫।
[১০৫] বুখারি, ২৬৫৪; মুসলিম, ৮৭।
[১০৬] বুখারি, ৪৪৭৭; মুসলিম, ৮৬।
[১০৭] বুখারি, ২৭৬৬; মুসলিম, ৮৯।
[১০৮] বুখারি, ৫৯৭৩; মুসলিম, ৯০।
[১০৯] সা'লাবি, তাফসীর, ১০/২৬১-২৬৪।
[১১০] সূরা নিসা, ৪: ৩১।
[১১১] বাগাবি, তাফসীর, ২/২০২।
[১১২] বাগাবি, তাফসীর, ২/২০৩।
[১১৩] সূরা সাফফাত, ৩৭: ১৪৩-১৪৪।
[১১৪] সূরা ইউনুস, ১০: ৯০।
[১১৫] সূরা ইউনুস, ১০: ৯১।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 যে সমস্ত গুনাহ থেকে তাওবা করতে হবে

📄 যে সমস্ত গুনাহ থেকে তাওবা করতে হবে


বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত তায়িব বা তাওবাকারী হিসেবে পরিচয় পাবে না, যতক্ষণ-না সে ১২টি বিষয় থেকে মুক্ত থাকছে; যেগুলো আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করেছেন। সেগুলো হারামেরই বিভিন্ন প্রকার-
১. কুফর (অস্বীকার করা), ২. শির্ক (আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করা), ৩. নিফাক (কপটতা), ৪. ফুসূক (পাপাচার), ৫. ইসইয়ান (অবাধ্যতা), ৬. ইছম (গুনাহ), ৭. উদওয়ান (সীমালঙ্ঘন), ৮. ফাহ্শা (অশ্লীল কাজ), ৯. মুনকার (মন্দ কাজ), ১০. বাগইয়ু (অত্যাচার), ১১. আল্লাহ সম্পর্কে না জেনে কথা বলা এবং ১২. আল্লাহর পথ ছেড়ে ভিন্ন পথ অনুসরণ করা।
আল্লাহ তাআলা যা কিছু হারাম করেছেন, এই বারোটি প্রকারই হলো তার ভিত্তি। সৃষ্টিজগতের সবাই এতে লিপ্ত; কেবল নবি-রাসূলদের অনুসারীরা ব্যতীত। কারও মধ্যে অনেকগুলো পাওয়া যায়, কারও মধ্যে অনেক কম আবার কারও মধ্যে একটি পাওয়া যায়; কেউ তা টের পায় আর কেউ পায় না।
আমরা এই বিষয়ে আলোচনা করব এবং এই সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ও বর্ণনা করব; যাতে এর সীমা-পরিসীমা ও বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলাই একমাত্র তাওফীকদাতা; যেভাবে তিনি এ পর্যন্ত তাওফীক দিয়েছেন। গুনাহ থেকে বাঁচার আর নেক কাজ করার সামর্থ্য কেবল আল্লাহ তাআলারই দান।
এই পরিচ্ছেদটি এই বইয়ের সবচেয়ে বেশি উপকারী এবং বান্দা এর প্রতি সবচেয়ে বেশি মুখাপেক্ষী।
১. কুফর : কুফর দুই প্রকার: বড়ো কুফর ও ছোটো কুফর।
বড়ো কুফর চিরস্থায়ী জাহান্নামকে আবশ্যক করে।
ছোটো কুফর শাস্তি পাওয়াকে আবশ্যক করে; চিরস্থায়ী জাহান্নামকে নয়। যেমন: আল্লাহ তাআলার এই বাণীতে রয়েছে-যা একসময় পাঠ করা হতো, অতঃপর যার শব্দ রহিত করা হয়েছে-
لَا تَرْغَبُوا عَنْ آبَابِكُمْ فَمَنْ رَّغِبَ عَنْ أَبِيْهِ فَهُوَ كُفْرٌ
"তোমরা তোমাদের পিতাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না। কেননা যে ব্যক্তি নিজের পিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল, সে কুফরি নীতি অবলম্বন করল।" [১১৬]
সহীহ হাদীসে এসেছে, নবি বলেছেন,
اثْنَتَانِ فِي النَّاسِ هُمَا بِهِمْ كُفْرٌ الطَّعْنُ فِي النَّسَبِ وَالنِّيَاحَةُ عَلَى الْمَيِّتِ
"মানুষের মাঝে দুটি স্বভাব রয়েছে, যা কুফর বলে গণ্য- ১. বংশের প্রতি কটাক্ষ করা এবং ২. মৃত ব্যক্তির জন্য উচ্চঃস্বরে বিলাপ করা।" [১১৭]
আরেকটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,
مَنْ أَتَى حَائِضًا أَوِ امْرَأَةً فِي دُبُرِهَا أَوْ كَاهِنًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُوْلُ فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ
“যে ব্যক্তি ঋতুবতী স্ত্রীর সাথে সহবাস করল অথবা স্ত্রীর পেছনপথে সঙ্গম করল অথবা গণকের নিকট গেল এবং সে যা বলল, তা বিশ্বাসও করল, তা হলে সে মুহাম্মাদ -এর ওপর যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তা অস্বীকার করল।"[১১৮]
'সহীহ বুখারি' ও 'সহীহ মুসলিম'-এ বর্ণিত হয়েছে, নবি বলেছেন,
لَا تَرْجِعُوْا بَعْدِي كُفَّارًا يَضْرِبُ بَعْضُكُمْ رِقَابَ بَعْضٍ
"আমার পরে তোমরা পরস্পর হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে কাফিরে পরিণত হোয়ো না।"[১১৯]
বড়ো কুফর: পাঁচ প্রকার: ক. মিথ্যা বিশ্বাস করার কুফর, খ. সত্যায়ন থাকা সত্ত্বেও অহংকার ও দাম্ভিকতার কুফর, গ. উপেক্ষা করার কুফর, ঘ. সংশয়-সন্দেহের কুফর এবং ঙ. কপটতা বা নিফাকের কুফর।
ক. মিথ্যা বিশ্বাস করার কুফর: রাসূলকে মিথ্যা বলে বিশ্বাস করা। এই প্রকারটি কাফিরদের মধ্যে খুব কম পাওয়া যায়। কারণ আল্লাহ তাআলা রাসূলদের শক্তিশালী করেছেন এবং তাঁদের সত্যাবাদিতার ওপর অকাট্য প্রমাণাদি ও অনেক (অলৌকিক) নিদর্শন বা মু'জিযা প্রদান করেছেন; যার দ্বারা তাঁরা দলীল স্থাপন করেন এবং সব ধরনের ওজর-আপত্তি দূর করে দেন।
ফিরআউনের সম্প্রদায় সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَجَحَدُوا بِهَا وَاسْتَيْقَنَتْهَا أَنْفُسُهُمْ ظُلْمًا وَعُلُوًّا
"তারা অন্যায় ও অহংকার করে নিদর্শনাবলিকে প্রত্যাখ্যান করল, যদিও তাদের অন্তর এগুলো সত্য বলে বিশ্বাস করে নিয়েছিল।"[১২০]
আর আল্লাহ রাসূল -কে বলেন,
فَإِنَّهُمْ لَا يُكَذِّبُوْنَكَ وَلَكِنَّ الظَّالِمِينَ بِآيَاتِ اللَّهِ يَجْحَدُونَ * "আসলে তারা আপনাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে না; জালিমরা বরং আল্লাহর নিদর্শনাবলিকেই অস্বীকার করে।"১২১।
যদি এটিকে 'মিথ্যা প্রতিপন্ন করার কুফর' বলে অভিহিত করা হয়, তা হলেও তা সহীহ। কারণ এটি হলো মৌখিকভাবে মিথ্যা সাব্যস্ত করা।
খ. সত্যায়ন থাকা সত্ত্বেও অহংকার ও দাম্ভিকতার কুফর যেমন: ইবলীস শয়তানের কুফর। কেননা সে আল্লাহ তাআলার কোনো হুকুমকে অস্বীকার করেনি এবং প্রত্যাখ্যানও করেনি; বরং সে আল্লাহর সামনে অহংকার ও দম্ভ করেছিল। এই প্রকার কুফরের মধ্যে ওই ব্যক্তির কুফরও শামিল, যে রাসূলের সত্যতা সম্পর্কে জানে এবং এটাও জানে যে, তিনি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সত্যসহ আগমন করেছেন, এরপরও অহংকার ও গর্বের কারণে তাঁর অনুসরণ করে না এবং তাঁকে মেনে নেয় না। অধিকাংশ কাফিরদের অবস্থাই এমন। ইয়াহুদিদের কুফরও ছিল এই প্রকারের। যেমন: আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَلَمَّا جَاءَهُمْ مَّا عَرَفُوْا كَفَرُوا بِهِ
"যখন সেই জিনিসটি এসে গেছে এবং তারা তাকে চিনতেও পেরেছে, তখন তারা তাকে অস্বীকার করেছে।" [১২২] আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন,
يَعْرِفُوْنَهُ كَمَا يَعْرِفُوْنَ أَبْنَاءَهُمْ
"তারা তাকে চেনে, যেমন করে চেনে নিজেদের পুত্রদের।”[১২৩]
আবূ তালিবের কুফরও ছিল এই প্রকারের। কারণ তিনি নবি ﷺ-কে সত্যবাদী হিসেবেই জানতেন এবং এতে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ করতেন না। কিন্তু তাকে পেয়ে বসেছিল আত্ম-অহংকার এবং পিতৃপুরুষদের অন্ধভক্তি যে, তিনি তাদের রীতিনীতি থেকে সরবেন না এবং তাদেরকে কাফির প্রমাণিত হতে দেবেন না।
গ. উপেক্ষা করার কুফর : রাসূল -এর কথা শোনা, বোঝা ও উপলব্ধি করা থেকে দূরে থাকা। তাঁকে সত্যায়নও না করা, আবার মিথ্যা সাব্যস্তও না করা। তাঁর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কও না রাখা, আবার শত্রুতা পোষণও না করা। তিনি যা নিয়ে এসেছেন সে দিকে কর্ণপাতই না করা এবং সম্পূর্ণরূপে তা উপেক্ষা করা। যেমন আবদু ইয়ালীলের বংশধরদের একজন নবি -কে বলেছিল,
وَاللَّهِ أَقُولُ لَكَ كَلِمَةً، إِنْ كُنْتَ صَادِقًا، فَأَنْتَ أَجَلُّ فِي عَيْنِي مِنْ أَنْ أَرُدَّ عَلَيْكَ، وَإِنْ كُنْتَ كَاذِبًا، فَأَنْتَ أَحْقَرُ مِنْ أَنْ أُكَلِّمَكَ
'আল্লাহর শপথ! আপনাকে আমি একটি কথা বলছি (মনে রাখবেন,) আপনি যদি সত্যবাদী হন, তা হলে আমি আপনার নিকট আসার চেয়েও আপনি অনেক বেশি মর্যাদাবান। আর আপনি যদি মিথ্যুক হন, তা হলে আমি আপনার সাথে কথা বলার চেয়েও আপনি অধিক নিকৃষ্ট।'
ঘ. সংশয়-সন্দেহের কুফর : (সন্দেহের কারণেও কুফর হয়।) কেননা এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি রাসূলকে দৃঢ়ভাবে সত্যায়নও করে না, আবার মিথ্যাও বলে না; বরং সে তাঁর ব্যাপারে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে। এমন ব্যক্তির সংশয় তখনই দীর্ঘস্থায়ী হয়, যখন সে রাসূল -এর সত্যাবাদিতার নিদর্শনসমূহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়াকে নিজের ওপর আবশ্যক করে নেয়। ফলে সে তা শোনেও না এবং সে দিকে মনোযোগও দেয় না। যদি সে সেদিকে মনোযোগ দিত এবং সে ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করত, তা হলে তার কোনো সন্দেহ-সংশয় বাকি থাকত না। কারণ এটি রাসূল -এর সত্যতাকে আবশ্যক করে। বিশেষ করে তাঁর সমস্ত নিদর্শনাদি পর্যবেক্ষণ করার দ্বারা। কারণ সেগুলো তাঁর সত্যতার ওপর এমন প্রমাণ বহন করে, যেমন সূর্য দিন হওয়ার ওপর প্রমাণ বহন করে।
ঙ. কপটতা বা নিফাকের কুফর: মুখে মুখে ঈমান আনার কথা বলে, আর অন্তরে তা মিথ্যা সাব্যস্ত করে। এটি সবচেয়ে বড়ো নিফাক। শীঘ্রই এর প্রকারভেদ-সহ আলোচনা আসবে, ইন শা আল্লাহ।
২. শিক্ক : শিক্‌ও দুই প্রকার: বড়ো শির্ক ও ছোটো শিরক।
বড়ো শির্ক : এই শিক্ থেকে তাওবা না করা পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা তা ক্ষমা করবেন না। আর এটি হলো আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে তাঁর সমকক্ষ সাব্যস্ত করা এবং তাকে আল্লাহর মতো ভালোবাসা। মুশরিকরা তাদের বিভিন্ন উপাস্যকে মহাবিশ্বের প্রতিপালক আল্লাহর সাথে সমকক্ষ সাব্যস্ত করে, তা এই বড়ো শিরকের অন্তর্ভুক্ত। এ কারনেই জাহান্নামে তারা তাদের উপাস্যদের বলবে,
تَاللَّهِ إِنْ كُنَّا لَفِي ضَلَالٍ مُّبِيْنٍ إِذْ نُسَوِّيْكُمْ بِرَبِّ الْعَالَمِينَ ۞
"আল্লাহর কসম, আমরা প্রকাশ্য বিভ্রান্তিতে লিপ্ত ছিলাম; যখন আমরা তোমাদেরকে মহাবিশ্বের প্রতিপালকের সমতুল্য গণ্য করতাম!” [১২৪]
আল্লাহ তাআলা একক অদ্বিতীয়, তিনি প্রতিটি বস্তুর সৃষ্টিকর্তা, প্রতিপালক ও মালিক; আর তাদের উপাস্যগুলো কোনোকিছু সৃষ্টি করতে পারে না, রিস্ক দিতে পারে না, মৃত্যু ও জীবন দিতে পারে না-এটা স্বীকার করা সত্ত্বেও, আল্লাহর সাথে তাদের সমকক্ষতা ছিল ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও ইবাদাত-উপাসনার ক্ষেত্রে। যেমন দুনিয়ার অধিকাংশ মুশরিকদের অবস্থাই এ রকম; বরং বলা যায় সবাই এমন। তারা আল্লাহর চেয়েও তাদের মা'বৃদদের বেশি ভালোবাসে, সম্মান করে এবং তাদের সাথে গভীর সম্পর্ক রাখে। তাদের অধিকাংশের অবস্থাই এমন। তারা এক আল্লাহ তাআলার আলোচনা শোনার চেয়ে তাদের উপাস্যদের আলোচনা শুনলে বেশি খুশি হয়।
ছোটো শিৰ্ক: যেমন: মানুষকে দেখানোর জন্য আমল করা, কোনো সৃষ্ট বস্তুর জন্য আমল করা, আল্লাহ বাদে অন্য কারও নামে কসম করা। যেমন নবি ﷺ থেকে প্রমাণিত আছে, তিনি বলেছেন,
مَنْ حَلَفَ بِغَيْرِ اللَّهِ فَقَدْ أَشْرَكَ
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর নামে কসম করল, সে যেন শিক্ করল।" [১২৫]
আবার কাউকে এই কথা বলাও ছোটো শিকের অন্তর্ভুক্ত যে, 'আল্লাহ ও আপনি যা চান' অথবা 'এটি আল্লাহ ও আপনার পক্ষ থেকে' অথবা 'আমি আল্লাহর সাথে ও আপনার সাথে রয়েছি' অথবা 'আল্লাহ ও আপনি ছাড়া আমার আর কেউ নেই' অথবা 'আল্লাহ ও আপনার ওপর আমি ভরসা করছি' অথবা 'আপনি যদি না থাকতেন, তা হলে এমনটা হতো না' ইত্যাদি। কখনো কখনো ব্যক্তির অবস্থা ও উদ্দেশ্য অনুসারে এটি বড়ো শিরকের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। বিশুদ্ধ হাদীসে বর্ণিত আছে যে, একবার একব্যক্তি নবি -কে লক্ষ করে বললেন, 'আল্লাহ ও আপনি যা চান'। (তৎক্ষণাৎ এর জবাবে) নবি বললেন,
جَعَلْتَ لِلَّهِ نِدًّا ، مَا شَاءَ اللهُ وَحْدَهُ.
"তুমি তো (আমাকে) আল্লাহর সমকক্ষ বানিয়ে দিলে! (এ রকমটা না বলে; বরং বলো,) 'একমাত্র আল্লাহ যা চান।”[১২৬] এই শব্দচয়নটি হলো অন্যান্য শব্দের মধ্যে সবচেয়ে হালকা শব্দ।
এই প্রকার শির্কের মধ্যে অন্যতম হলো-মৃত ব্যক্তিদের নিকট নিজের কোনো প্রয়োজন প্রার্থনা করা, তাদের কাছে সাহায্য চাওয়া এবং তাদের দিকে মনোযোগী হওয়া।
এটি হলো পৃথিবীবাসীর শিরকের মূল। কারণ মৃত ব্যক্তির আমল বন্ধ হয়ে গিয়েছে, সে তো নিজের জন্যই কোনো প্রকার লাভ-ক্ষতির মালিক নয়, এটি তো অনেক দূরের ব্যাপার যে, তার নিকট সাহায্য চাওয়া হবে, নিজের প্রয়োজন পূরণের জন্য তার কাছে প্রার্থনা করা হবে অথবা প্রয়োজন পূরণের ব্যাপারে তার কাছে আল্লাহর নিকট সুপারিশ করার কথা বলা হবে!
উপরিউক্ত বিষয়গুলো হলো-সুপারিশকারী, যার জন্য সুপারিশ করা হয় এবং যার নিকট সুপারিশ করা হয় সে সম্পর্কে চরম অজ্ঞতার ফল।
৩. নিফাক: এটি ভেতরগত এমন দুরারোগ্য ব্যাধি, যার দ্বারা ব্যক্তি পরিপূর্ণ থাকে; কিন্তু সে টেরও পায় না। কারণ এটি লোকচক্ষুর আড়ালে থাকে। যাদের সাথে সে মেলামেশা করে, তাদের অনেকের কাছেই এটি অপ্রকাশিত ও গোপনীয় থাকে। ফলে তারা তাকে মুসলিহ বা সংশোধনকারী ভাবতে থাকে; অথচ সে হলো মুফসিদ বা ফাসাদ-সৃষ্টিকারী। নিফাকও দুই প্রকার: বড়ো নিফাক ও ছোটো নিফাক।
বড়ো নিফাক: এটি চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামের সর্বনিম্ন তলায় অবস্থানকে আবশ্যক করে। এটি হলো মুসলিমদের সামনে আল্লাহর ওপর, ফেরেশতা, আসমানি কিতাব, রাসূল ও আখিরাত দিবসের ওপর ঈমান প্রকাশ করা আর ভেতরে ভেতরে এর সবগুলো থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখা এবং মিথ্যা সাব্যস্ত করা। মুনাফিক এটিও বিশ্বাস করে না যে, আল্লাহ তাআলা কথা বলেছেন আবার কোনো মানুষকে অন্যান্য সমস্ত মানুষের জন্য রাসূল বানিয়ে তার ওপর তা অবতীর্ণ করেছেন; যিনি আল্লাহর অনুমতিক্রমে মানুষদের পথ দেখাবেন, তাঁর শাস্তি ও আযাবের ভীতি প্রদর্শন করবেন।
আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজীদে মুনাফিকদের লুকায়িত চরিত্র ও গোপন রহস্য ফাঁস করে দিয়েছেন। তাঁর বান্দাদের সামনে তাদের অবস্থা প্রকাশ্যে তুলে ধরেছেন; যাতে তারা সেগুলোর ব্যাপারে ও মুনাফিকদের ব্যাপারে সতর্ক হয়। সমগ্র দুনিয়াবাসীকে তিন ভাগে বিভক্ত করে সূরা বাকারার শুরুতে আলোচনা করেছেন: ১. মুমিন, ২. কাফির আর ৩. মুনাফিক। মুমিনদের ব্যাপারে চারটি আয়াত, কাফিরদের ব্যাপারে দুটি আয়াত আর মুনাফিকদের ব্যাপারে তেরোটি আয়াত বর্ণনা করেছেন। তাদের সম্পর্কে এত বেশি আয়াত বর্ণনা করার কারণ হলো: তাদের সংখ্যাধিক্য, মুসলমান ও ইসলামের ওপর তাদের ব্যাপক ক্ষতি ও অনিষ্ট। তারা ইসলামের সাথে, এর সাহায্য-সহযোগিতা ও ভ্রাতৃত্বের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণে তাদের মাধ্যমে ইসলামের ওপর তীব্র আঘাত এসেছে। প্রকৃতপক্ষে তারা হলো ইসলামের শত্রু। সুযোগ পেলেই তারা তাদের শত্রুতা ও ষড়যন্ত্র সামনে আনে; মূর্খ ব্যক্তিরা যা বিচক্ষণতা ও সংশোধনকরণ বলে জ্ঞান করে, অথচ সেগুলো তাদের ফিতনা- ফাসাদ সৃষ্টি করার কৌশল।
পুরা কুরআন জুড়েই তাদের ব্যাপারে আলোচনা হওয়া কাম্য ছিল; পৃথিবীর বুকে ও কবরের পেটে তাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে। পৃথিবীর কোনো ভূখণ্ডই তাদের থেকে মুক্ত নয়, (সবখানেই রয়েছে তাদের বিচরণ। এতে বরং সুবিধাই হয়েছে;) ফলে মুমিনরা পথ চলতে একাকিত্ব অনুভব করে না, তাদের জীবিকা ও জীবনোপকরণ (অনুসন্ধানে কোনো) সংকীর্ণতা আসে না এবং মরুভূমিতে তাদেরকে হিংস্র জন্তু- জানোয়ার ছোঁ মেরে নিয়ে যেতে পারে না।
হুযাইফা এক ব্যক্তিকে বলতে শুনলেন, তিনি বলছেন, 'হে আল্লাহ, মুনাফিকদের ধ্বংস করে দিন।' তখন তিনি তাকে বললেন, 'ওহে ভাতিজা, যদি মুনাফিকরা ধ্বংস হয়ে যায়, তা হলে এই পরিমাণ পথিক কমে যাবে যে, তোমরা পথ চলতে নিঃসঙ্গ বোধ করবে।' [১২৮]
আল্লাহর শপথ! নিফাকের ভয় পূর্ববর্তী যুগের অগ্রগামী ব্যক্তিদের অন্তর টুকরো টুকরো করে দিত; কারণ তারা এর সূক্ষ্মতা, ভয়াবহতা ও ক্ষতিকর দিকগুলো বিস্তারিতভাবে জানতেন। ফলে নিজের ব্যাপারে তারা খারাপ ধারণা পোষণ করতেন, এমনকি এই ভয়ও করতেন যে, তারা মুনাফিকদের দলভুক্ত। উমর ইবনুল খাত্তাব হুযাইফা-কে বলেছেন, 'হে হুযাইফা, আমি তোমাকে আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, রাসূলুল্লাহ কি মুনাফিকদের দলে আমার নাম নিয়েছেন?' হুযাইফা এই কসমের জবাবে বলেন, 'না। আপনার পরে আর কাউকে (নিফাক থেকে) পবিত্র বলে ঘোষণা করব না।' [১২৯]
ইবনু আবী মুলাইকা বলেছেন, 'আমি মুহাম্মাদ-এর তিরিশজন সাহাবিকে পেয়েছি; তাদের প্রত্যেকেই নিজের ওপর নিফাকের আশঙ্কা করতেন। তাদের মধ্যে কেউ এমন ছিলেন না যিনি বলেছেন যে, তার ঈমান জিবরীল ও মীকাঈল-এর ঈমানের মতো। [১৩০]
হাসান বাসরী বলেছেন, 'কেবল মুনাফিকই নিফাকের ভয় থেকে নিশ্চিন্ত থাকে। আর মুমিন মাত্রই থাকে নিফাকের ভয়ে ভীত।[১৩১]
কোনো এক সাহাবি [১৩২] সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি তার দু'আয় বলতেন, 'হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে নিফাক মিশ্রিত খুশুখুজু থেকে আশ্রয় চাই।' তাকে প্রশ্ন করা হলো, নিফাক মিশ্রিত খুশুখুজু কী?' তিনি জবাব দিলেন, 'বাহ্যিক শরীরে খুশুখুজু থাকা আর অন্তর আল্লাহ থেকে দূরে থাকা।[১৩৩]
তাদের অন্তর ঈমান ও ইয়াকীনে পরিপূর্ণ ছিল আবার তাদের নিফাকের ভয়ও ছিল অনেক বেশি। আর এ কারণে তাদের অস্থিরতা ও পেরেশানিও ছিল বেশ ভারী। অপরদিকে অনেক মানুষ এমন রয়েছে, যাদের ঈমান তাদের কন্ঠনালীও অতিক্রম করে না; অথচ তারা দাবি করে যে, তাদের ঈমান জিবরীল ও মীকাঈল-এর ঈমানের মতো!
৪ ও ৫. ফুসূক ও ইসইয়ান: ফুসূক শব্দটি কুরআনে দুইভাবে এসেছে: এককভাবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং ইসইয়ানের সাথে যুক্ত করে উল্লেখ করা হয়েছে।
এককভাবে যে ফুসূক উল্লেখ করা হয়েছে, তা আবার দুই প্রকার: ১. এমন কুফরি ফুসূক, যা ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বের দেয় এবং ২. এমন ফুসূক, যা ইসলাম থেকে বের করে দেয় না।
ফুসূককে ইসইয়ানের সাথে যুক্ত করে উল্লেখ করা হয়েছে; যেমন: আল্লাহ তাআলার বাণী-
وَلَكِنَّ اللَّهَ حَبَّبَ إِلَيْكُمُ الْإِيْمَانَ وَزَيَّنَهُ فِي قُلُوْبِكُمْ وَكَرَّةَ إِلَيْكُمُ الْكُفْرَ وَالْفُسُوقَ وَالْعِصْيَانَ أُولَبِكَ هُمُ الرَّاشِدُونَ "কিন্তু আল্লাহ তোমাদের অন্তরে ঈমানের মহব্বত সৃষ্টি করে দিয়েছেন এবং তা হৃদয়গ্রাহী করে দিয়েছেন। পক্ষান্তরে কুফর, পাপাচার ও নাফরমানির প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। তারাই হলো প্রকৃত সৎপথ অবলম্বনকারী।”[১৩৪]
এককভাবে উল্লেখকৃত এমন কুফরি ফুসূক, যা ইসলাম থেকে বের করে দেয়; যেমন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, يُضِلُّ بِهِ كَثِيرًا وَيَهْدِي بِهِ كَثِيرًا وَمَا يُضِلُّ بِهِ إِلَّا الْفَاسِقِينَ الَّذِينَ يَنْقُضُونَ عَهْدَ اللَّهِ مِنْ بَعْدِ مِيثَاقِهِ وَيَقْطَعُوْنَ مَا أَمَرَ اللهُ بِهِ أَنْ يُوْصَلَ وَيُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ أُولَبِكَ هُمُ الخَاسِرُونَ "এর দ্বারা আল্লাহ তাআলা অনেককে বিপথগামী করেন, আবার অনেককে সঠিক পথও প্রদর্শন করেন। তিনি এর দ্বারা কেবল ফাসিকদেরই বিপথগামী করেন; যারা আল্লাহর সঙ্গে দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়ার পরও তা ভঙ্গ করে, যা অবিচ্ছিন্ন রাখতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, তা ছিন্ন করে এবং তারা পৃথিবীর বুকে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়। প্রকৃতপক্ষে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।" [১৩৫]
এই প্রকার ফুসূক হলো কুফরের অন্তর্ভুক্ত।
আর সেই ফুসূক বা পাপাচার, যা ইসলাম থেকে বের করে দেয় না; যেমন, আল্লাহ তাআলার বাণী- وَلَا يُضَارَّ كَاتِبٌ وَلَا شَهِيدٌ وَإِنْ تَفْعَلُوا فَإِنَّهُ فُسُوْقَ بِكُمْ "কোনো লেখক ও সাক্ষীকে যেন হয়রানি না করা হয়। যদি তোমরা এরূপ করো, তবে তা তোমাদের পাপ বলে গণ্য হবে।" [১৩৬]
আমাদের আলোচনা চলছে কোন ফিস্ক বা পাপাচার থেকে তাওবা করা ওয়াজিব; তা হলো দুই প্রকার: ১. আমলগত ফিস্ক এবং ২. বিশ্বাসগত ফিস্ক।
আমলগত ফিস্ক আবার দুই প্রকার: ১. ইসইয়ানের সাথে যুক্ত এবং ২. পৃথকভাবে উল্লেখকৃত।
ইসইয়ানের সাথে যুক্ত ফিস্ক: এটি হলো আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন, তাতে লিপ্ত হওয়া। আর ইসইয়ান হলো আল্লাহর আদেশের অবাধ্য হওয়া। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
لَّا يَعْصُوْنَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُوْنَ
"আল্লাহ যা আদেশ করেন, তারা তার অবাধ্য হয় না এবং তাদের যা করতে আদেশ করা হয়, তারা তা-ই করে।”[১৩৭]
মূসা তাঁর ভাই হারুন-কে বলেছিলেন,
مَا مَنَعَكَ إِذْ رَأَيْتَهُمْ ضَلُّوا أَلَّا تَتَّبِعَنِ أَفَعَصَيْتَ أَمْرِي
"তুমি যখন তাদেরকে পথভ্রষ্ট হতে দেখলে, তখন আমার পথে চলা থেকে তোমাকে কীসে বিরত রেখেছিল? তবে তুমি কি আমার আদেশের অবাধ্য হয়েছ?”[১৩৮]
সুতরাং ফিস্ক হলো আল্লাহ তাআলা যা করতে নিষেধ করেছেন, তাতে লিপ্ত হওয়ার সাথে খাছ। এ কারণে অনেক জায়গায় এমন ব্যবহার লক্ষ করা যায়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَلَا يُضَارَّ كَاتِبٌ وَلَا شَهِيدٌ وَإِنْ تَفْعَلُوا فَإِنَّهُ فُسُوقٌ بِكُمْ
"কোনো লেখক ও সাক্ষীকে যেন হয়রানি না করা হয়। যদি তোমরা এরূপ করো, তবে তা তোমাদের পাপ বলে গণ্য হবে।" [১৩৯]
আর ইসইয়ান বা মা'সিয়াত হলো আদেশের অবাধ্য হওয়া বা অমান্য করার সাথে খাছ। তবে উভয়েই একটি অপরটির অর্থের মধ্যে ব্যবহৃত হয়। যেমন: আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ كَانَ مِنَ الْجِنِّ فَفَسَقَ عَنْ أَمْرِ رَبِّهِ
"আমি যখন ফেরেশতাদের বললাম, 'আদমকে সাজদা করো', তখন ইবলীস ব্যতীত সবাই সাজদা করল। সে ছিল জিনদের একজন। সে তার পালনকর্তার আদেশ অমান্য করল।" [১৪০]
এখানে আদেশ অমান্য করাকে ফিস্ক বলা হচ্ছে। আবার এই আয়াতে-
وَعَصَى آدَمُ رَبَّهُ فَغَوَى
"আদম তার রবের নাফরমানি করল, ফলে সে সঠিক পথ থেকে সরে গেল।" [১৪১]
এখানে নিষেধকৃত বিষয়ে লিপ্ত হওয়াকে মা'সিয়াত বলা হয়েছে। এ রকমটি হয় যখন আলাদা আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়। আর যখন একসাথে মিলে আসে, তখন ইসইয়ানের অর্থ হয় আদেশ অমান্য করা, আর ফিস্কের অর্থ হয় নিষেধকৃত বিষয়ে লিপ্ত হওয়া।
তাকওয়া এই দুটি বিষয় থেকে বেঁচে থাকাকেই শামিল করে। আর এটা বাস্তবায়ন হলেই কেবল ফুসূক ও ইসইয়ান থেকে তাওবা সহীহ হয়। তা এভাবে যে, বান্দা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত নূরের ভিত্তিতে তাঁর আনুগত্য করবে, তাঁর সাওয়াবের আশা রাখবে, আল্লাহর নাফরমানি পরিত্যাগ করে চলবে এবং তাঁর শাস্তির ভয় করবে।
বিশ্বাসগত ফিস্ক: যেমন : বিদআতিদের ফিস্ক; যারা আল্লাহর ওপর, তাঁর রাসূল ও আখিরাতের দিবসের ওপর ঈমান রাখে, আল্লাহ যা হারাম করেছেন, তা হারাম মানে এবং যা আবশ্যক করেছেন, তা পালন করে চলে; কিন্তু আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা সাব্যস্ত করেছেন, তারা তার অনেক কিছুকেই প্রত্যাখ্যান করে; মূর্খতা ও অপব্যাখ্যার কারণে, বা তাদের শাইখদের তাকলীদ করতে গিয়ে। আবার তারা এমন অনেক কিছুও সাব্যস্ত করে, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাব্যস্ত করেননি।
এই সমস্ত ব্যক্তিরা হলেন খাওয়ারিজদের মতো এবং অনেক রাফিজি, কাদিরি ও মু'তাযিলাদের মতো এবং জাহমিয়্যাদের মধ্যে যারা সীমালঙ্ঘন করে না, তাদের মতো। আর জাহমিয়্যাদের মধ্যে যারা সীমালঙ্ঘন করে, তারা হলো রাফিজিদের মধ্যে যারা সীমালঙ্ঘন করে তাদের মতো। ইসলামে এ দুদলেরই কোনো অংশ নেই। আর এ কারণেই পূর্ববর্তী মনীষীদের অনেকেই তাদেরকে পথভ্রষ্ট বাহাত্তর দলের মধ্যে গণ্য করেছেন। এরা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত থেকে বহির্ভূত।
আমাদের আলোচনার উদ্দেশ্য তাদের হুকুম বর্ণনা করা নয়। আমাদের উদ্দেশ্য হলো এই সমস্ত গুনাহ থেকে সহীহ তাওবা কীভাবে করা যায়। সুতরাং এই ধরনের ফিস্ক থেকে তাওবার পদ্ধতি হলো: আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যে সমস্ত বিষয়াদি আল্লাহর সত্তার জন্য সাব্যস্ত করেছেন, সেগুলোকে কোনো প্রকার উপমা ও উদাহরণ ব্যতীতই সাব্যস্ত করা এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যে সমস্ত বিষয়াদি থেকে আল্লাহর সত্তাকে পবিত্র ঘোষণা করেছেন, সে বিষয়গুলোকে কোনো রকম বিকৃতি ও অপব্যাখ্যা করা ছাড়াই মেনে নেওয়া। দ্বীনের কোনো বিষয় প্রত্যাখান করা ও প্রমাণ করা একমাত্র ওহির আলোকেই হতে হবে; কারও সিদ্ধান্ত, যুক্তি বা গবেষণার আলোকে নয়। কারণ এগুলো হচ্ছে বিদআত ও গোমরাহির মূল উৎস।
যারা এই বিশ্বাসগত ফিস্ক বা বিদআতে জড়িত, তাদের তাওবার একমাত্র পথ হলো: সুন্নাহর অনুসরণ করা, আর শুধু এটাই তাদের জন্য যথেষ্ট হবে না, যতক্ষণ- না তারা যে বিদআতের ওপর রয়েছে, তার অসারতা ও বিভ্রান্তি সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে (এবং তা পরিত্যাগ করে।)
৬ ও ৭. ইছম ও উদওয়ান: এই দুটি হলো একে অপরের সঙ্গী। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
"সৎকর্ম ও খোদাভীতিতে একে অন্যের সহযোগিতা করো। আর গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যকে সাহায্য করো না।”[১৪২]
এ দুটিকে যখন আলাদা আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়, তখন একটি অপরটিকে শামিল করে নেয়। সুতরাং প্রতিটি ইছম বা গুনাহই হলো উদওয়ান বা সীমালঙ্ঘন। কারণ ইছম হলো আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন, তাতে লিপ্ত হওয়া বা যা আদেশ করেছেন তা পরিত্যাগ করা। আর এটিই হলো আল্লাহর আদেশ-নিষেধের ব্যাপারে উদওয়ান বা সীমালঙ্ঘন। আবার প্রতিটি উদওয়ানই হলো ইছম। কারণ এর দ্বারা ব্যক্তি গুনাহগার সাব্যস্ত হয়। কিন্তু যখন একসাথে যুক্ত হয়ে আসে, তখন অবস্থা ও প্রাসাঙ্গিকতা ভেদে এ দুটি আলাদা আলাদা অর্থ প্রদান করে।
ইছম (الإثم) হলো যার মূল বিষয়টিই হারাম। যেমন: মিথ্যা, ব্যভিচার, মদপান ইত্যাদি। আর উদওয়ান (العدوان) হলো যার বাড়াবাড়ি ও অতিরিক্ত করা হারাম। এটি হলো বৈধ কোনো বিষয়ে সীমা অতিক্রম করে হারামে পৌঁছে যাওয়া। যেমন: কারও নিকট পাওনা আদায়ের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করা; হয়তো তার অর্থসম্পদে বা শারীরিকভাবে অথবা মানসম্মানে আঘাত করা, বাড়াবাড়ি করা; অথবা কেউ যদি কারও একটি কাঠ বা গাছের ডাল নিয়ে যায় আর এর বিনিময়ে সে তার পুরা বাড়িটাই দখলে নেয়; অথবা কেউ কারও একটি জিনিস নষ্ট করল আর এর পরিবর্তে সে তার অনেকগুলো জিনিস নষ্ট করে দিলো; অথবা কেউ কাউকে একটি কটু কথা বলল আর এর পরিবর্তে সে তাকে অনেকগুলো কথা শুনিয়ে দিলো-এর সবগুলোই উদওয়ান বা সীমালঙ্ঘন এবং ইনসাফ বহির্ভূত।
এই সীমালঙ্ঘন দুই প্রকার: ১. আল্লাহ তাআলার হকের ক্ষেত্রে এবং ২. বান্দার হকের ক্ষেত্রে।
১. আল্লাহ তাআলার হকের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন: যেমন: আল্লাহ তাআলা বান্দার জন্য তার স্ত্রী ও দাসীদের সাথে যে যৌন-সম্পর্ক বৈধ করেছেন, তা অতিক্রম করে তাদের বাদ দিয়ে ভিন্ন জায়গায় হারাম সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া; (এই সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে) আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالَّذِيْنَ هُمْ لِفُرُوْجِهِمْ حَافِظُوْنَ إِلَّا عَلٰى أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُوْمِيْنَ فَمَنِ ابْتَغٰى وَرَآءَ ذٰلِكَ فَأُولٰبِكَ هُمُ الْعَادُوْنَ
"এবং যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে। তবে তাদের স্ত্রী ও মালিকানাভুক্ত দাসীদের ক্ষেত্রে সংযত না রাখলে, তারা তিরস্কৃত হবে না। অতঃপর কেউ এদেরকে ছাড়া অন্যকে কামনা করলে, তারা সীমালঙ্ঘনকারী হবে।"[১৪৩]
এমনিভাবে স্ত্রী ও দাসীদের ক্ষেত্রে যা হালাল করা হয়েছে, সেগুলো বাদ দিয়ে তাদের সাথে অন্য হারামে লিপ্ত হওয়া; যেমন: হায়েজ বা নেফাস অবস্থায় তাদের সাথে সঙ্গম করা অথবা পেছনপথে অথবা হাজ্জের ইহরামরত অবস্থায় অথবা ওয়াজিব সিয়াম পালন অবস্থায় সহবাস করা।
অনুরূপভাবে বান্দার জন্য সুনির্দিষ্ট যে পরিমাণ বৈধ করা হয়েছে, তার চেয়েও বেশিতে লিপ্ত হওয়া; যেমন: কারও জন্য এক চামচ মদ পান বৈধ, কিন্তু সে এক গ্লাস পান করে ফেলল; অথবা বান্দার জন্য বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া, দরদাম করা, সাক্ষ্য দেওয়া, লেনদেন করা, চিকিৎসা করা ইত্যাদি কাজের সময় নারীর দিকে তাকানো বৈধ করা হয়েছে; কিন্তু এ সময় সে তার সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থানগুলো দেখতে আরম্ভ করল। উদওয়ান বা সীমালঙ্ঘনের আরও কিছু উদাহরণ: তীব্র প্রয়োজনে মৃত বস্তু খাওয়া যে পরিমাণ বৈধ করা হয়েছে, তৃপ্তিসহকারে তার চেয়েও বেশি পরিমাণ খাওয়া, অথচ তার জন্য কেবল জীবন-বাঁচানো-পরিমাণ খাওয়া বৈধ ছিল।
সূরা আ'রাফ [১৪৪]-এ বর্ণিত ইছম ও বাগইয়ু (البَغْيُ)-এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো এই ইছম ও উদওয়ান। তবে বাগইয়ু শব্দটি বেশি ব্যবহৃত হয়- বান্দার হকের ক্ষেত্রে এবং তাদের ওপর জুলুম-অত্যাচারের ব্যাপারে। [১৪৫]
এর ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, বাগইয়ু যখন উদওয়ানের সাথে মিলে আসে, তখন বাগইয়ু দ্বারা উদ্দেশ্য হয়: মৌলিকভাবে হারাম এমন বিষয়ের মাধ্যমে বান্দার জুলুম-অত্যাচার; যেমন: চুরি করা, মিথ্যা বলা, অপবাদ দেওয়া, অন্যায়ভাবে কাউকে কষ্ট দেওয়া ইত্যাদি। আর উদওয়ান দ্বারা উদ্দেশ্য হয় হক আদায়ে সীমালঙ্ঘন করা, পাওনার চেয়ে বেশি উসূল করা। বান্দার হকের ক্ষেত্রে বাগইয়ু ও উদওয়ান হলো আল্লাহর সীমার ক্ষেত্রে ইছম ও উদওয়ানের মতো।
৮ ও ৯. ফাহশা ও মুনকার: ফাহশা (অশ্লীলতা) হলো একটি সিফাত বা গুণ। আর এর মাওসূফ হলো কাজ বা বৈশিষ্ট্য। যেমন: ফাহশা বা অশ্লীল কাজ, ফাহশা বৈশিষ্ট্য। এটি হলো যার কদর্যতা ও অশ্লীলতা সবার সামনেই সুস্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়।
ফাহশা কাজকে প্রতিটি সুস্থবোধসম্পন্ন ব্যক্তিই খারাপ ও ঘৃণ্য মনে করে। আর এ কারণেই এর ব্যাখ্যা করা হয় ব্যভিচার ও সমকামিতার দ্বারা। আল্লাহ তাআলা এ দুটির চূড়ান্ত অশ্লীলতা ও কদর্যতার কারণে এ দুটিকে فَاحِشَةٌ বলেছেন। এমনিভাবে মন্দ, খারাপ ও অশ্লীল কথাবার্তাকেও ফাহশা বলা হয়; যার কদর্যতা খুবই প্রকটভাবে প্রকাশ পায়। যেমন: গালি দেওয়া, অপবাদ দেওয়া প্রভৃতি।
আর মুনকার (مُّنكَرُ) শব্দটিও একটি উহ্য মাওসূফের সিফাত। যেমন: মুনকার বা মন্দ কাজ। এটি হলো আকল ও ফিতরাত যাকে মন্দ মনে করে।
বুদ্ধি ও ফিতরাতের সাথে ফাহিশার সম্পর্ক ঠিক নাকের সাথে দুর্গন্ধের যেমন সম্পর্ক, চোখের সাথে খারাপ কোনো দৃশ্যের সম্পর্ক, মুখের সাথে তিক্ত কোনো খাবারের সম্পর্ক, কানের সাথে বিকট কোনো শব্দের সম্পর্ক। সুতরাং বোঝা গেল আকল ও ফিতরাত যে বস্তুকে তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করে এবং ঘৃণা করে তা-ই ফাহিশা। আর মুনকার হলো যাকে আকল ও ফিতরাত মেনে নেয় না এবং মন্দ মনে করে।
এ কারনেই ইবনু আব্বাস রা. বলেছেন, 'ফাহিশা হলো: যিনা বা ব্যভিচার; আর মুনকার হলো: শারীআত ও সুন্নাহর মধ্যে যার কোনো সুস্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায় না।'[১৪৬] এখানে গভীরভাবে চিন্তা করুন যে, যার কোনো ভালো দিক জানা যায় না (তা মুনকার) এবং যার অশ্লীলতা সুস্পষ্ট (তা ফাহশা)-এ দুটির মাঝে তিনি কীভাবে পার্থক্য করেছেন?
১১. আল্লাহ সম্পর্কে না জেনে কথা বলা: উপরিউক্ত সবগুলো হারামের মধ্যে আল্লাহ সম্পর্কে না জেনে কথা বলা হচ্ছে, সবচেয়ে ভয়াবহ এবং সবচেয়ে বড়ো গুনাহ। আর এ কারনেই এটিকে হারামসমূহের এমন স্তরে উল্লেখ করা হয়েছে; যার হারাম হওয়ার ব্যাপারে সমস্ত শারীআত ও দ্বীন একমত, কোনো অবস্থাতেই যার বৈধতা দেওয়া হয়নি; বরং এটি সর্বাবস্থাতেই হারাম। এটি মৃত প্রাণী, রক্ত বা শূকরের মাংসের মতো নয় যে, কিছু অবস্থায় হালাল আর কিছু অবস্থায় হারাম।
কারণ মুহাররমাত বা হারাম বস্তুসমূহ দুই প্রকার: ১. যা সত্তাগতভাবেই হারাম, কোনো অবস্থাতেই যা হালাল নয় এবং ২. যা কোনো সময় হারাম আর কোনো সময় হারাম নয়। সত্তাগতভাবে হারাম বস্তুর ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلُ بِهِ سُلْطَانًا وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُوْنَ *
"আপনি বলে দিন, আমার পালনকর্তা প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সব অশ্লীল বিষয়সমূহ হারাম করেছেন এবং হারাম করেছেন গুনাহ, অন্যায়- অত্যাচার এবং আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করা, তিনি যার কোনো সনদ অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহর প্রতি এমন কথা আরোপ করা, যা তোমরা জানো না।" [১৪৭]
এখানে আল্লাহ তাআলা একের পর এক বড়ো বড়ো গুনাহের কথা উল্লেখ করেছেন। সবশেষে যা উল্লেখ করেছেন অর্থাৎ আল্লাহ সম্পর্কে না জেনে কথা বলা-এটি সবচেয়ে মারাত্মক হারাম এবং সবচেয়ে বড়ো গুনাহ। কারণ এটি আল্লাহ তাআলার ওপর মিথ্যা বলা, যার উপযুক্ত তিনি নন, তাঁকে সে দিকে সম্পৃক্ত করা, তাঁর দ্বীনকে পরিবর্তন করা ও বিকৃত করা, তিনি যা সাব্যস্ত করেছেন তা প্রত্যাখ্যান করা, তিনি যা প্রত্যাখ্যান করেছেন তা সাব্যস্ত করা, তিনি যা বাতিল বলেছেন তা সঠিক বলে মনে করা, তিনি যা সঠিক বলেছেন তা বাতিল করে দেওয়া, তিনি যাকে বন্ধু করে নিয়েছেন তার সাথে শত্রুতা করা, তিনি যাকে নিজের শত্রু বলে ঘোষণা দিয়েছেন তাকে বন্ধু বানানো, তিনি যা ঘৃণা করেছেন তা পছন্দ করা, তিনি যা অপছন্দ করেছেন তা ভালোবাসা, তাঁর সত্তা, গুণাবলি, কাজকর্ম, কথাবার্তা সম্পর্কে এমন মন্তব্য করা, তিনি যার উপযুক্ত নন ইত্যাদি বিষয়াদিকে অন্তর্ভুক্ত করে।
হারাম বস্তুসমূহের মধ্যে এর চেয়ে বড়ো আর কোনো হারাম নেই এবং এর চেয়ে ভয়াবহ আর কোনো গুনাহ নেই। এটিই হলো শিরক ও কুফরের মূল। এর ওপরই রয়েছে বিদআত ও গোমরাহির ভিত্তি। আসলে দ্বীনের ক্ষেত্রে প্রতিটি পথভ্রষ্টকারী বিদআতের শিকড় হলো-আল্লাহ সম্পর্কে না জেনে কথা বলা।
এ কারনেই সালাফগণ ও ইমামগণ এ ব্যাপারে তীব্র প্রতিবাদ করেছেন, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তাদের ভ্রান্তি ধরিয়ে দিয়েছেন, তাদের ফিতনার ব্যাপারে মানুষদের কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন এবং এ ক্ষেত্রে তাদের প্রত্যাখ্যান ছিল অন্যান্য উদওয়ান, জুলুম ও ফাহ্শার চেয়ে অনেক বেশি। [১৪৮]

টিকাঃ
[১১৬] বুখারি, ৬৭৬৮; মুসলিম, ৬২।
[১১৭] মুসলিম, ৬৭।
[১১৮] ইবনু মাজাহ, ৭৩৯; তিরমিযি, ১৩৫; আবু দাউদ, ৩৯০৪; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৯৫৩৬।
[১১৯] বুখারি, ৭০৭৭; মুসলিম, ৬৬।
[১২০] সূরা নাম্, ২৭: ১৪।
[১২১] সূরা আনআম, ৬: ৩৩।
[১২২] সূরা বাকারা, ২: ৮৯।
'১২৩] সূরা বাকারা, ২: ১৪৬।
[১২৪] সূরা শুআরা, ২৬: ৯৭-৯৮।
[১২৫] আবূ দাউদ, ৩২৫১; তিরমিযি, ১৫৩৫।
[১২৬] বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ৭৮৮।
[১২৭] মুসান্নিফ ছোটো নিফাক সম্পর্কে আলোচনা করেননি। ছোটো নিফাক হলো উলামায়ে কেরাম যার নাম দিয়েছেন 'আমলি নিফাক'। সুতরাং নিফাক দুই ধরনের: ১. বিশ্বাসগত নিফাক-মুসান্নিফ এ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন-এবং ২. আমলি বা কার্যগত নিফাক; এর উদাহরণ হলো যেমন সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:"মুনাফিকের আলামত তিনটি: ১. যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, ২. যখন অঙ্গীকার করে ভঙ্গ করে এবং ৩. যদি তার নিকট আমানত রাখা হয়, তা হলে তার খিয়ানত করে।"-বুখারি, ৩৩; মুসলিম, ৫৯।
[১২৮] খারায়িতি, ই'তিলালুল কুলুব, ৩৭৭।
[১২৯] যাহাবি, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ২/৩৬৪।
[১৩০] বুখারি, কিতাবুল ঈমান, ৩৬ নং পরিচ্ছেদ।
[১৩১] বুখারি, কিতাবুল ঈমান, ৩৬ নং পরিচ্ছেদ।
[১৩২] সাহাবিটি ছিলেন আবুদ দারদা।
[১৩৩] আহমাদ ইবনু হাম্বাল, আয-যুহদ, ৭৬২; ইবনু আবী শাইবা, আল-মুসান্নাফ, ৩৫৭১১।
[১৩৪] সূরা হুজুরাত, ৪৯ : ৭।
[১৩৫] সূরা বাকারা, ২: ২৬-২৭।
[১৩৬] সূরা বাকারা, ২: ২৮২।
[১৩৭] সূরা তাহরীম, ৬৬: ৬।
[১৩৮] সূরা ত্ব-হা, ২০: ৯২।
[১৩৯] সূরা বাকারা, ২: ২৮২।
[১৪০] সূরা কাহফ, ১৮:৫০।
[১৪১] সূরা ত্ব-হা, ২০:১২১।
[১৪২] সূরা মায়িদা, ৭:২।
[১৪৩] সূরা মুমিনূন, ২৩:৫-৭।
[১৪৪] এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো এই আয়াত:
... قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطْنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ
"আপনি বলে দিন, 'আমার পালনকর্তা অশ্লীল বিষয়সমূহ হারাম করেছেন; যা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য এবং হারাম করেছেন গুনাহ, সত্যের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি...।'-সূরা আ'রাফ, ৭ : ৩৩।
[১৪৫] এটি হলো দ্বিতীয় প্রকার: বান্দার হকের ক্ষেত্রে উদওয়ান।
[১৪৬] সা'লাবি, তাফসীর, ১৬/১০৭।
[১৪৭] সূরা আ'রাফ, ৭: ৩৩।
[১৪৮] মুসান্নিফ দুটি বিষয় নিয়ে এখানে বিস্তারিত আলোচনা করেননি-বাগইয়ু এবং আল্লাহর পথ ছেড়ে ভিন্ন পথ অনুসরণ করা। যদিও শুরুতে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00