📄 খাঁটি তাওবা বা আন্তরিক অনুশোচনা (اَلتَّوْبَةُ النَّصُوحُ)
উপরিউক্ত বিষয়টি সুস্পষ্ট হবে, যখন খাঁটি তাওবা ও এর প্রকৃত অবস্থা বর্ণনা করা হবে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللهِ تَوْبَةً نَصُوحًا عَلَى رَبُّكُمْ أَنْ يُكَفِّرَ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيُدْخِلَكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ
“হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করো-খাঁটি তাওবা। আশা করা যায়, তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের মন্দকর্মসমূহ দূর করে দেবেন এবং তোমাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার তলদেশে রয়েছে প্রবাহিত নদী।”[৮৫]
আল্লাহ তাআলা এখানে গুনাহ ও মন্দকর্মসমূহের ক্ষতি থেকে রক্ষা করাকে, বান্দা যা অপছন্দ করে সেগুলোকে দূর করে দেওয়াকে; এবং বান্দা যা পছন্দ করে, সেই জান্নাতে প্রবেশ করানোকে— খাঁটি তাওবা (اَلتَّوْبَةُ النَّصُوحُ) হাসিল হওয়ার সাথে সম্পৃক্ত করেছেন।
النَّصُوْحُ শব্দটি فَعُوْلٌ-এর গঠন অনুযায়ী হয়েছে; যা نَصَحَ থেকে উৎসারিত। শব্দকে এই আকৃতিতে গঠন করার কারণ হলো: যাতে শব্দটি ব্যাপক ও পরিপূর্ণতার অর্থ দেয়। যেমন : اَلشَّكُورُ (পরম প্রতিদানদাতা), اَلصَّبُوْرُ (পরম ধৈর্যশীল)। (ن ص ح)- এই শব্দমূলের আসল অর্থ হলো : কোনোকিছু ভেজাল ও দোষত্রুটি মুক্ত হওয়া। نَصَحَ মানে খাঁটি হওয়া, নির্ভেজাল হওয়া। তাওবা, ইবাদাত ও পরামর্শের ক্ষেত্রে النُّصْحُ-এর অর্থ হলো : সব ধরনের ধোঁকাবাজি, ঘাটতি ও ফাসাদ থেকে মুক্ত হওয়া এবং সর্বোত্তম পন্থায় তা বাস্তবায়িত করা। اَلنُّصْحُ-এর বিপরীত হলো اَلْغِشُ ধোঁকা বা প্রতারণা।
এর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে সালাফদের ভাষা ও শব্দের তারতম্য হয়েছে; কিন্তু সবার মূল কথা ছিল একই।
উমর ইবনুল খাত্তাব ও উবাই ইবনু কা'ব বলেছেন, 'التَّوْبَةُ النَّصُوْحُ বা খাঁটি তাওবা হলো: গুনাহ থেকে তাওবা করবে, অতঃপর আর সে দিকে ফিরে যাবে না; যেমন দুধ আর ওলানে ফিরে যায় না।'[৮৬]
হাসান বাসরী বলেছেন, 'তা হলো: যা হয়েছে বান্দা তার জন্য অনুতপ্ত ও লজ্জিত হবে এবং পুনরায় তাতে লিপ্ত না হবার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করবে।'[৮৭]
কালবি বলেছেন, 'জবানে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, অন্তরে অনুতপ্ত হবে এবং শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাধ্যমে তা থেকে বিরত থাকবে।'[৮৮]
আমি বলি, 'খাঁটি তাওবা তিনটি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে-
১. এটি সব রকমের গুনাহ ও পাপকে অন্তর্ভুক্ত করবে; কোনো একটিকেও বাদ দেবে না।
২. এতে সব ধরনের গুনাহ থেকে বিরত থাকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ও সত্যবাদিতা থাকবে; সামান্যতম দ্বিধা ও বিলম্ব করার বিষয়ও থাকবে না। বরং তাৎক্ষণিকভাবে নিজের সাধ্যমতো সেগুলো থেকে বিরত থাকবে।
৩. একনিষ্ঠতার মধ্যে কোনো রকম কমতি ও ঘাটতি থাকবে না। এগুলো থেকে বেঁচে থাকবে একমাত্র আল্লাহর ভয়ভীতির কারণে, তাঁর কাছে যে নিয়ামাত রয়েছে তার প্রতি আগ্রহী হয়ে এবং তাঁর কাছে যে শাস্তি রয়েছে তাঁর ভয়ে; সেই ব্যক্তির মতো নয় যে নিজের মান-সম্মান, পদ-পদবি, কর্তৃত্ব-ক্ষমতা, ধনসম্পদ ইত্যাদি রক্ষার্থে তাওবা করে; কিংবা মানুষের প্রশংসা কুড়াতে বা তাদের নিন্দা থেকে বাঁচতে বা যাতে মূর্খ কেউ তার ওপর কর্তৃত্ব না পায় সে জন্য বা নিজের দুনিয়াবি কোনো উদ্দেশ্য পূরণের জন্য বা অক্ষমতা ও অর্থশূন্যের ভয়ে বা এ জাতীয় বিভিন্ন কারণ সামনে রেখে তাওবা করে; যেসব কারণে তাওবার বিশুদ্ধতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি বিনষ্ট হয়।
সুতরাং ১ নং বিষয়টি যেসব গুনাহ থেকে তাওবা করবে, তার সাথে সম্পর্কিত; ৩ নং বিষয়টি কার জন্য তাওবা করবে, তার সাথে সম্পর্কিত। আর ২ নং বিষয়টি তাওবাকারীর নিজসত্তার সাথে সম্পর্কিত। আসলে খাঁটি তাওবা সত্যবাদিতা ও একনিষ্ঠতা, সমস্ত গুনাহ ও পাপকে শামিল করে। আর তাওবা যে ইস্তিগফারকে অন্তর্ভুক্ত করে এতে কোনো সন্দেহ নেই এবং এই তাওবা সমস্ত গুনাহ ও পাপকে মিটিয়ে দেয়। তাওবার সবচেয়ে পরিপূর্ণ রূপটিই হলো التَّوْبَةُ النَّصُوحُ আল্লাহ তাআলাই একমাত্র সাহায্যকারী এবং ভরসা কেবল তাঁরই ওপর। আল্লাহ তাআলার সাহায্য ব্যতীত কেউ কোনো নেককাজ করতে পারে না এবং কোনো গুনাহ থেকে বেঁচেও থাকতে পারে না।
টিকাঃ
[৮৫] সূরা তাহরীম, ৬৬: ৮।
[৮৬] সা'লাবি, আত-তাফসীর, ৯/৩৫০।
[৮৭] বাগাবি, আত-তাফসীর, ৮/১৬৯।
[৮৮] বাগাবি, আত-তাফসীর, ৮/১৬৯।
📄 سَيِّئَةٌ ও ذَنْبٌ -এর মাঝে পার্থক্য
আল্লাহ তাআলার পবিত্র কালামে এ দুটি শব্দ কোথাও একসাথে উল্লেখ করা হয়েছে আবার কোথাও পরস্পরকে আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
একসাথে উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন: আল্লাহ তাআলা তাঁর মুমিন বান্দাদের ব্যাপারে বলেছেন, তারা দুআ করে—
رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّئَاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ “হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের সকল গুনাহ মাফ করে দাও এবং আমাদের সকল দোষত্রুটি দূর করে দাও, আর নেক লোকদের সাথে আমাদের মৃত্যু দিয়ো।” [৯০]
আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন: আল্লাহ তাআলার বাণী—
وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَآمَنُوا بِمَا نُزَّلَ عَلَى مُحَمَّدٍ وَهُوَ الْحَقُّ مِنْ رَّبِّهِمْ كَفِّرَ عَنْهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ وَأَصْلَحَ بَالَهُمْ "আর যারা বিশ্বাস স্থাপন করে, সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে মুহাম্মাদের প্রতি অবতীর্ণ সত্যে বিশ্বাস করে, আল্লাহ তাদের মন্দকর্মসমূহ মার্জনা করেন এবং তাদের অবস্থা ভালো করে দেন।” [৯১]
আর মাগফিরাতের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَلَهُمْ فِيهَا مِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ وَمَغْفِرَةٌ مِّنْ رَّبِّهِمْ "সেখানে তাদের জন্য আছে রকমারি ফলমূল ও তাদের পালনকর্তার ক্ষমা।" [৯২]
এখানে চারটি বিষয় সামনে আসে, তা হলো: যুনূব (ذُنُوبُ), সায়্যিআত (سَيِّئَاتُ), মাগফিরাত (مَغْفِرَةٌ) ও তাকফীর (تَكْفِيْر)।
যুনূব (ذُنُوبُ) : এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: কবীরা গুনাহ।
সায়্যিআত (سَيِّئَاتُ) : এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: সগীরা গুনাহ; যেগুলোর ক্ষেত্রে কাফফারা প্রয়োগ হয়। যেমন: ছোটো ছোটো ত্রুটি-বিচ্যুতি বা এ রকম অন্যান্য বিষয়াদি। এ কারণেই সায়্যিআতের বেলায় কাফফারা প্রযোজ্য হয়।
সায়্যিআত দ্বারা যে সগীরা গুনাহ উদ্দেশ্য এবং এতে যে কাফফারা প্রযোজ্য হয়, তার দলীল হলো আল্লাহ তাআলার এই বাণী-
إِنْ تَجْتَنِبُوا كَبَابِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَنُدْخِلْكُم مُدْخَلًا كَرِيمًا
“যেগুলো সম্পর্কে তোমাদের নিষেধ করা হয়েছে তোমরা যদি তার বড়ো বড়ো গুনাহগুলো থেকে বেঁচে থাকো, তা হলে আমি তোমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো ক্ষমা করে দেবো এবং সম্মানজনক স্থানে তোমাদের প্রবেশ করাবো।” [৯৩]
‘সহীহ মুসলিম’-এর বর্ণনায় এসেছে, আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলতেন,
الصَّلَوَاتُ الخَمْسُ وَالجُمُعَةُ إِلَى الجُمُعَةِ وَرَمَضَانُ إِلَى رَمَضَانَ مُكَفِّرَاتٌ مَّا بَيْنَهُنَّ إِذَا اجْتَنَبَ الْكَبَابِرَ
“পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, এক জুমুআ থেকে আরেক জুমুআ এবং এক রমাদান থেকে আরেক রমাদান তার মধ্যবর্তী সময়ে সংঘটিত (ছোটো ছোটো) গুনাহগুলোকে মিটিয়ে দেবে, যদি কবীরা বা বড়ো বড়ো গুনাহগুলো পরিত্যাগ করে চলে।” [৯৪]
‘মাগফিরাত’ শব্দটি ‘তাকফীর’ শব্দটির চেয়ে বেশি পরিপূর্ণ। এই কারণে মাগফিরাতকে কবীরা গুনাহের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। আর তাকফীরকে সগীরা গুনাহের সাথে। কারণ মাগফিরাত শব্দটি (বান্দাকে গুনাহের ভয়াবহতা থেকে) রক্ষা করা ও হেফাজত করার বিষয়টি শামিল করে। আর তাকফীর শব্দটি ছোটো ছোটো গুনাহকে ক্ষমা করা ও গোপন রাখার অর্থকে অন্তর্ভুক্ত করে। তবে পৃথক পৃথকভাবে উল্লেখ করলে একটি অপরটি মধ্যে দাখিল হয়ে যায়; যেমনটি আগে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
كَفَرَ عَنْهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ “আল্লাহ তাদের মন্দকর্মসমূহ মার্জনা করেন।”[৯৫]
আল্লাহ তাআলার এই বাণীতে—ছোটোবড়ো সব গুনাহ, গুনাহকে মিটিয়ে দেওয়া, এর ক্ষতি থেকে বাঁচানো সবই এর মধ্যে শামিল রয়েছে। এমনিভাবে পৃথকভাবে উল্লেখিত তাকফীর সবচেয়ে খারাপ ও মন্দ আমলকেও অন্তর্ভুক্ত করে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
لِيُكَفِّرَ اللَّهُ عَنْهُمْ أَسْوَأَ الَّذِي عَمِلُوا "যাতে আল্লাহ তাদের সবচেয়ে মন্দকর্মসমূহ মার্জনা করেন।”[৯৬]
যখন এটা বোঝা গেল, তখন এই রহস্যও বোঝা সহজ হবে যে, আল্লাহ তাআলা বিপদাপদ, রোগব্যাধি, চিন্তা, পেরেশানি, দুঃখ-কষ্ট ইত্যাদির ক্ষেত্রে তাকফীর বা সগীরা গুনাহ মাফের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন; মাগফিরাত বা কবীরা গুনাহ মাফের নয়। যেমন, সহীহ হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
مَا يُصِيبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ وَلَا وَصَبٍ وَلَا هَمْ وَلَا حُزْنٍ وَّلَا أَذًى وَلَا غَمْ حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا إِلَّا كَفَرَ اللَّهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ “মুসলিম ব্যক্তির ওপর যে কষ্টক্লেশ, রোগব্যাধি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও পেরেশানি আসে, এমনকি যে কাঁটা তার দেহে বিদ্ধ হয়, এগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তার গুনাহসমূহ দূর করে দেন।”[৯৭]
কারণ বিপদ-মুসীবত গুনাহ মাফের ক্ষেত্রে এককভাবে যথেষ্ট নয়; আবার তাওবা ব্যতীত সমস্ত গুনাহ মাফও হয় না। সুতরাং গুনাহগারদের জন্য দুনিয়াতে তিনটি বড়ো বড়ো নদী রয়েছে, যার দ্বারা সে এখানে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা অর্জন করে-যদি এর দ্বারাও পরিপূর্ণ পবিত্র না হতে পারে, তা হলে কিয়ামাতের দিন জাহান্নামের নদীতে নামিয়ে তা অর্জন করবে। দুনিয়ার বড়ো বড়ো তিনটি নদী হলো: ১. খাঁটি তাওবার নদী, ২. এমন নেক আমলের নদী; যা সমস্ত গুনাহকে বেষ্টন করে নেয় এবং ৩. গুনাহ-দূরকারী বড়ো বড়ো বিপদাপদের নদী। আল্লাহ তাআলা যখন কোনো বান্দার ব্যাপারে কল্যাণ ও মঙ্গলের ফায়সালা করেন, তখন তাকে এই তিন নদীর কোনো একটিতে প্রবেশ করান; ফলে সে কিয়ামাতের দিন পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন হয়ে উঠবে; চতুর্থ কোনো নদীর আর প্রয়োজন হবে না।
টিকাঃ
[৮৯] বাংলাতে দুটোর অর্থই গুনাহ বা পাপ। আসলে আরবি ভাষার ব্যাপকতা ও প্রাচুর্যতা অনেক থাকার কারণে এই দুটোর মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে।
[৯০] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৯৩।
[৯১] সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭: ২।
[৯২] সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭: ১৫।
[৯৩] সূরা নিসা, ৪:৩১।
[৯৪] মুসলিম, ২৩৩।
[৯৫] সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭ : ২।
[৯৬] সূরা যুমার; ৩৯ : ৩৫।
[৯৭] বুখারি, ৫৬৪১; মুসলিম, ২৫৭৩।
📄 বান্দার তাওবা আল্লাহর দুই রহমত দ্বারা পরিবেষ্টিত
আল্লাহর দিকে বান্দার ফিরে আসা বা তাওবা করার পূর্বে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি রহমত এবং পরে একটি রহমত দ্বারা বান্দার তাওবা পরিবেষ্টিত থাকে। বান্দার তাওবা থাকে আল্লাহর দুই রহমতের মাঝে; আগে একটা, পরে একটা। কারণ প্রথমে তিনি তাকে তাওবা করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন, তার অন্তরে অনুপ্রেরণা জোগান এবং তাওফীক দান করেন। এরপর বান্দা তাওবা করলে তা কবুল করতে এবং এর প্রতিদান দিতে আল্লাহ তাআলা দ্বিতীয়বার তার দিকে মনোযোগী হন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَقَدْ تَابَ اللهُ عَلَى النَّبِيِّ وَالْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ فِي سَاعَةِ الْعُسْرَةِ مِنْ بَعْدِ مَا كَادَ يَزِيغُ قُلُوْبُ فَرِيْقٍ مِّنْهُمْ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ إِنَّهُ بِهِمْ رَءُوْفٌ رَّحِيمٌ ) “আল্লাহ দয়াশীল হয়েছেন নবির প্রতি এবং মুহাজির ও আনসারদের প্রতি, যারা কঠিন মুহূর্তে নবির সঙ্গে ছিল, যখন তাদের এক দলের অন্তর ফিরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। অতঃপর তিনি পুনরায় দয়াশীল হন তাদের প্রতি। নিঃসন্দেহে তিনি তাদের প্রতি দয়াশীল ও করুণাময়।[৯৮]
আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে জানিয়ে দিয়েছেন যে, আল্লাহর দয়া-অনুগ্রহ তাদের তাওবার চেয়ে অগ্রগামী ছিল; যার কারণে তারা তাওবা করতে পেরেছে। আল্লাহর রহমতই তাদের তাওবা করার কারণ। সুতরাং বোঝা যায়, আল্লাহ তাদের প্রতি দয়াশীল না হলে, তারা তাওবা করতে পারত না। কেননা কারণ না থাকলে হুকুমও থাকে না।
তাওবার শুরু ও শেষ রয়েছে। এর শুরুটা হলো আল্লাহ তাআলার দিকে ফেরা, তাঁর দেওয়া সরল-সোজা পথে চলা; যে পথ তিনি নির্ধারণ করে দিয়েছেন তাঁর সন্তুষ্টি পর্যন্ত পৌঁছার জন্য এবং বান্দাদের সে পথে চলার আদেশও করেছেন— وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِيْ مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ “নিশ্চিত এটি আমার সরল পথ; অতএব এ পথে চলো এবং অন্যান্য পথে চলো না।”[৯৯]
আর তাওবার শেষ হলো আখিরাতে তাঁর দিকে ফেরা এবং তাঁর সে পথে চলা; যা তিনি জান্নাত পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেওয়ার জন্য বানিয়েছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি এই দুনিয়াতে তাওবার মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরবে, আল্লাহ তাআলাও আখিরাতে পুরস্কার দেওয়ার মাধ্যমে তার দিকে ফিরবেন।
টিকাঃ
[৯৮] সূরা তাওবা, ৯: ১১৭।
[৯৯] সূরা আনআম, ৬: ১১৩।
📄 গুনাহের প্রকারভেদ
যুনূব বা গুনাহ হলো দুই প্রকার: ১. সগীরা গুনাহ ও ২. কবীরা গুনাহ। কুরআন, সুন্নাহ ও উম্মাতের ইজমা দ্বারা এটি প্রমাণিত।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, إِنْ تَجْتَنِبُوا كَبَابِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ “যেগুলো সম্পর্কে তোমাদের নিষেধ করা হয়েছে, তোমরা যদি তার বড়ো বড়ো গুনাহগুলো থেকে বেঁচে থাকো, তা হলে আমি তোমাদের ত্রুটি- বিচ্যুতিগুলো ক্ষমা করে দেবো।”[১০০]
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, الَّذِينَ يَجْتَنِبُوْنَ كَبَابِرَ الْإِثْمِ وَالْفَوَاحِشَ إِلَّا اللَّمَمَ
"যারা বড়ো বড়ো গুনাহ এবং প্রকাশ্য ও সর্বজনবিদিত অশ্লীল কাজ থেকে বিরত থাকে; তবে ছোটোখাটো ত্রুটি-বিচ্যুতি হওয়া ভিন্ন কথা।”[১০১]
'সহীহ মুসলিম'-এর বর্ণনায় এসেছে, আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলতেন, الصَّلَوَاتُ الخَمْسُ وَالجُمُعَةُ إِلَى الجُمُعَةِ وَرَمَضَانُ إِلَى رَمَضَانَ مُكَفِّرَاتٌ مَّا بَيْنَهُنَّ إِذَا اجْتَنَبَ الْكَبَابِرَ
"পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, এক জুমুআ থেকে আরেক জুমুআ এবং এক রমাদান থেকে আরেক রমাদান তার মধ্যবর্তী সময়ে সংঘটিত (ছোটো ছোটো) গুনাহগুলোকে মিটিয়ে দেবে; যদি কবীরা বা বড়ো বড়ো গুনাহগুলো পরিত্যাগ করে চলে।”[১০২]
ইমামগণ দুটি বিষয়ে ইখতিলাফ করেছেন, একটি হলো: উপরিউক্ত আয়াতে ব্যবহৃত اللَّمَمُ -এর অর্থ নিয়ে, আরেকটি হলো: কবীরা গুনাহের ব্যাপারে; এর কী নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা আছে কি না অথবা এর নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা রয়েছে কি না? আমরা এই দুটি বিষয় সম্পর্কে কিছু আলোচনা করব।
اَللَّمُ সম্পর্কে আলোচনা : অনেক সালাফ থেকে বর্ণিত আছে যে, ''লামাম' হলো একবার গুনাহে লিপ্ত হওয়া, অতঃপর আর সে দিকে ফিরে না যাওয়া; যদিও তা কবীরা গুনাহ হয়।' বাগাবি বলেছেন, 'এটি আবূ হুরায়রা, মুজাহিদ ও হাসান বাসরির মত এবং ইবনু আব্বাস থেকে আতার বর্ণনা।' তিনি আরও বলেছেন, 'আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস বলেন, 'اللمم দ্বারা উদ্দেশ্য হলো শিরক ছাড়া অন্যান্য গুনাহ।' সুদ্দি বলেছেন, 'আবূ সালিহ বলেন, 'আল্লাহ তাআলার বাণীতে إِلَّا اللَّمَ দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে, সে সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞাসা করা হলো।' আমি জবাব দিলাম, 'সেই ব্যক্তি যে গুনাহে একবার জড়িয়ে পড়ে, কিন্তু পরবর্তীকালে তাতে আর লিপ্ত হয় না।' অতঃপর এই বিষয়টি আমি আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস-এর নিকট আলোচনা করলে তিনি বলেন, 'দয়াময় অধিপতি আল্লাহ তোমাকে এর ওপর সাহায্য করেছেন।'
আর অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের অভিমত: اللَّمَ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কবীরা গুনাহ ছাড়া অন্যান্য গুনাহ। আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস-এর দুটি রিওয়ায়াতের মধ্যে এটিই অধিক বিশুদ্ধ। যেমন 'সহীহ বুখারি'-র বর্ণনায় তার থেকে তাউস বর্ণনা করেন, 'ইবনু আব্বাস বলেন, 'লামাম সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে নবি বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ عَلَى ابْنِ آدَمَ حَظَّهُ مِنَ الزِّنَا، أَدْرَكَ ذَلِكَ لَا مَحَالَةَ، فَزِنَا الْعَيْنِ النَظَرُ، وَزِنَا النِّسَانِ الْمَنْطِقُ، وَالنَّفْسُ تَمَنَّى وَتَشْتَهِي، وَالْفَرْجُ يُصَدِّقُ ذُلِكَ كُلَّهُ وَيُكَذِّبُهُ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আদম সন্তানের ওপর যিনার একটা অংশ লিখে রেখেছেন। সে অবশ্যই তা পাবে। চোখের যিনা দেখা, জিহ্বার যিনা কথা বলা, নফস কামনা সৃষ্টি করে আর সবশেষে যৌনাঙ্গ তা সত্য অথবা মিথ্যা প্রমাণ করে।" [১০৩]
সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব বলেন, 'অন্তরের দ্বারা বান্দা যে গুনাহে লিপ্ত হয়। অর্থাৎ যা সে চিন্তাভাবনা করে।'
অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের সিদ্ধান্তই হলো সঠিক অভিমত যে, লামাম দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সগীরা গুনাহ। যেমন: দৃষ্টি দেওয়া, স্পর্শ করা, চুম্বন করা ইত্যাদি। এটি হলো অধিকাংশ সাহাবি ও তাবিয়িদের মত। আবূ হুরায়রা, ইবনু মাসউদ, ইবনু আব্বাস, মাসরূক ও শা'বি-এর অভিমত।
এই অভিমত আবার আবূ হুরায়রা ও ইবনু আব্বাস -এর অপর বর্ণনার বিপরীত নয়-'একবার কবীরা গুনাহে জড়িয়ে পড়া; অতঃপর আর তাতে অভ্যস্ত না হওয়া।' কারণ লামাম হয়তো এই দুটোকেই অন্তর্ভুক্ত করে এবং তা দুভাবেই হতে পারে; যেমন কালবি বলেছেন। অথবা আবূ হুরায়রা ও ইবনু আব্বাস সেই ব্যক্তিকেও লামামের অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যে কবীরা গুনাহে মাত্র একবার লিপ্ত হয়েছে এবং তার ওপর অটল থাকেনি; বরং তার সারাজীবনে আকস্মিকভাবে কেবল ওই একবারই ঘটেছে। তবে তাঁরা সে ব্যক্তির ব্যাপারে অনেক কঠোর অবস্থানে রয়েছেন, যে কবীরা গুনাহে অটল ও ধারাবাহিকভাবে লিপ্ত। এটি আসলে তাঁদের সূক্ষ্ম জ্ঞান ও ইলমের গভীরতা।
কবীরা গুনাহ সম্পর্কে আলোচনা: সালাফগণ এ ক্ষেত্রে মতভেদ করেছেন; তবে তা একেবারেই বিপরীতমুখী বা সাংঘর্ষিক নয়; বরং সেগুলো প্রায় কাছাকাছি অর্থের।
'সহীহ বুখারি'-তে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনু আমর থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন,
الْكَبَائِرُ الإِشْرَاكُ بِالله وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ وَقَتْلُ النَّفْسِ وَالْيَمِينُ الْغَمُوسُ
“কবীরা গুনাহসমূহ (-এর অন্যতম) হচ্ছে আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা, পিতামাতার অবাধ্য হওয়া, কাউকে হত্যা করা এবং মিথ্যা কসম খাওয়া।” [১০৪]
'সহীহ বুখারি' ও 'সহীহ মুসলিম'-এর বর্ণনায় এসেছে, আবূ বাকরা থেকে বর্ণিত, নবি একবার বললেন, "আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড়ো বড়ো কবীরা গুনাহ সম্পর্কে জানিয়ে দেবো না?” এই কথাটি তিনি তিনবার বললেন। সাহাবায়ে কেরাম বললেন, 'অবশ্যই, ইয়া রাসূলাল্লাহ।' তিনি বললেন, “আল্লাহ তাআলার সাথে শির্ক করা ও মাতাপিতার অবাধ্য হওয়া।” তিনি হেলান দেওয়া অবস্থা থেকে সোজা হয়ে বসে বললেন, "আর মনে রেখো, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া।" এই কথাটি তিনি বারবার বলতেই থাকেন; এমনকি আমরা বলতে লাগলাম, 'যদি তিনি থেমে যেতেন!'[১০৫]
'সহীহ বুখারি' ও 'সহীহ মুসলিম'-এর আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি রাসূল -কে জিজ্ঞাসা করলাম,
أَيُّ الذَّنْبِ أَعْظَمُ عِنْدَ اللَّهِ 'আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বড়ো গুনাহ কোনটি?'
তিনি জবাব দিলেন,
أَنْ تَجْعَلَ لِلَّهِ نِدًّا وَهُوَ خَلَقَكَ "তুমি কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ বানাবে; অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।"
আমি বললাম, 'নিশ্চয়ই এটি সবচেয়ে বড়ো। এরপর কোনটি?'
তিনি বললেন,
أَنْ تَقْتُلَ وَلَدَكَ مَخَافَةً أَنْ يَطْعَمَ مَعَكَ "তুমি তোমার সন্তানকে এই ভয়ে হত্যা করবে যে, সে তোমার সঙ্গে খাবার খাবে।"
আমি বললাম, 'এরপর কোনটি?'
তিনি বললেন,
أَنْ تُزَانِي حَلِيْلَةَ جَارِكَ “তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া।”
আল্লাহ তাআলা নবি -এর এই বাণীর সত্যায়নে এই আয়াত নাযিল করেন-
وَالَّذِينَ لَا يَدْعُوْنَ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آخَرَ وَلَا يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَا يَزْنُونَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ يَلْقَ أَثَامًا
"এবং যারা আল্লাহ্র সাথে অন্য উপাস্যের ইবাদাত করে না, আল্লাহ যার হত্যা হারাম করেছেন, সঙ্গত কারণ ব্যতীত তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না। যারা একাজগুলো করে, তারা শাস্তির সম্মুখীন হবে।” (সূরা ফুরকান, ২৫: ৬৮) [১০৬]
আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন,
اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوْبِقَاتِ
"তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে বেঁচে থেকো।” সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, সেগুলো কী?' নবি জবাব দিলেন,
الشَّرْكُ بِاللهِ وَالسِّحْرُ وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَأَكْلُ مَالِ الْيَتِيمِ وَأَكْلُ الرِّبَا وَالتَّوَلَّى يَوْمَ الزَّحْفِ وَقَذْفُ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ
১. আল্লাহর সাথে শির্ক করা, ২. জাদু করা, ৩. সঙ্গত কারণ ছাড়া আল্লাহ যার হত্যা নিষেধ করেছেন, তাকে হত্যা করা, ৪ ইয়াতীমের মাল আত্মসাৎ করা, ৫. সুদ খাওয়া, ৬. যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং ৭ পবিত্র, সরলমনা ও ঈমানদার নারীর ওপর অপবাদ দেওয়া।”[১০৭]
আবদুল্লাহ ইবনু আমর থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন,
إِنَّ مِنْ أَكْبَرِ الْكَبَابِرِ أَنْ يَلْعَنَ الرَّجُلُ وَالِدَيْهِ
“কবীরা গুনাহসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো হলো নিজের পিতামাতাকে অভিশাপ দেওয়া।"
সাহাবায়ে কেরام জিজ্ঞাসা করলেন, 'কীভাবে ব্যক্তি তার নিজের পিতামাতাকেই অভিশাপ দেবে?'
তিনি জবাব দিলেন,
يَسُبُّ الرَّجُلُ أَبَا الرَّجُلِ، فَيَسُبُّ أَبَاهُ، وَيَسُبُّ أُمَّهُ فَيَسُبُّ أُمَّهُ
"সে অন্যের পিতাকে গালি দেবে, তখন সেই ব্যক্তি তার পিতাকে গালি দেবে এবং সে অন্যের মাকে গালি দেবে, তখন সেই ব্যক্তিও তার মাকে গালি দেবে। (আর এভাবে সে যেন তার নিজের পিতামাতাকেই গালি দিলো) "[১০৮]
সাঈদ ইবনু জুবাইর বলেন, 'একব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস -কে জিজ্ঞাসা করলেন, 'কবীরা গুনাহ কি সাতটি?' তিনি উত্তর দেন, 'কবীরা গুনাহ প্রায় সাতশ'র কাছাকাছি। ইস্তিগফার করতে থাকলে কবীরা গুনাহ আর কবীরা থাকে না, এমনিভাবে সগীরা গুনাহও বারবার করতে থাকলে তা আর সগীরা থাকে না।' তিনি আরও বলেন, 'যে বস্তুর দ্বারাই আল্লাহর নাফরমানি করা হয়, তা-ই কবীরা; যে ব্যক্তি এর মধ্যে কোনো একটিতে জড়িয়ে পড়ে, তার উচিত ক্ষমা প্রার্থনা করা। কেননা আল্লাহ তাআলা এই উম্মাতের কোনো ব্যক্তিকেই চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামের ফায়সালা করবেন না, কয়েক শ্রেণি ব্যতীত; তা হলো— যে ইসলাম থেকে ফিরে যায় বা কোনো ফরজবিধানকে অস্বীকার করে অথবা তাকদীরকে মিথ্যা সাব্যস্ত করে। [১০৯]
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ বলেন, 'আল্লাহ তাআলা সূরা নিসার শুরু থেকে নিয়ে এই আয়াত পর্যন্ত যে গুনাহের আলোচনা করেছেন, তার সবই কবীরা—
إِنْ تَجْتَنِبُوا كَبَائِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ
“যেগুলো সম্পর্কে তোমাদের নিষেধ করা হয়েছে তোমরা যদি তার বড়ো বড়ো গুনাহগুলো থেকে বেঁচে থাকো, তা হলে আমি তোমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো ক্ষমা করে দেবো।” [১১০]
আলি ইবনু আবী তালহা বলেন, 'কবীরা গুনাহ হলো: এমন প্রতিটি গুনাহ, যার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম, গজব, লা'নত অথবা আযাবের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।' [১১১]
দাহহাক বলেন, 'কবীরা গুনাহ হলো : যার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতে হদ বা আখিরাতে শাস্তি দেওয়া কথা বলেছেন।' [১১২]
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা জানা জরুরি: সেটি হলো কবীরা গুনাহের সাথে যা যুক্ত হয়, কখনো কখনো তা সগীরা গুনাহের সাথেও যুক্ত হয়; যেমন: লজ্জা, ভয়, সেই গুনাহকে অনেক বড়ো মনে করা ইত্যাদি। আবার সগীরা গুনাহের সাথে যা যুক্ত হয়, কখনো কখনো তা কবীরা গুনাহের সাথেও যুক্ত হয়; যেমন: লজ্জাহীনতা, বেপরোয়া ভাব, ভয়ডর না থাকা, গুনাহকে তুচ্ছ করে দেখা, ছোটো ভাবা ইত্যাদি। এভাবে ব্যক্তি সগীরা গুনাহকে কবীরা গুনাহের চেয়েও নিকৃষ্ট স্তরে নিয়ে যায়।
এটি পুরোপুরিভাবে অন্তরের একটি বিষয়। গুনাহে লিপ্ত হওয়ার চেয়ে অতিরিক্ত একটি বিষয়; যা মানুষ নিজের ব্যাপারে ভালো করে জানে আর কখনো কখনো অন্যের ব্যাপারেও জানতে পারে।
আরও একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, যাকে পছন্দ করা হয় ও যার অনেক বড়ো অনুগ্রহ রয়েছে, এমন ব্যক্তিকে অনেক ব্যাপারে ক্ষমা করে দেওয়া হয়, যা অন্যদের ক্ষেত্রে দেওয়া হয় না। এমনিভাবে তাকে অনেক ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়, যা অন্যদের দেওয়া হয় না।
বান্দার আমলসমূহ তার জন্য আল্লাহর নিকট সুপারিশ করবে। যখন সে বিপদে পড়বে, তখন তাকে উদ্ধার করবে। যেমন, আল্লাহ তাআলা ইউনুস সম্পর্কে বলেছেন,
فَلَوْلَا أَنَّهُ كَانَ مِنَ الْمُسَبِّحِينَ ® لَلَبِثَ فِي بَطْنِهِ إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ ® "যদি তিনি আল্লাহর তাসবীহ পাঠ না করতেন, তবে তাঁকে কিয়ামাত দিবস পর্যন্ত মাছের পেটেই থাকতে হতো।"[১১৩]
ফিরআউন মৃত্যুর পূর্বে কোনো নেক আমল পাঠায়নি; যা তার জন্য সুপারিশ করবে। মৃত্যুর সময় ফিরআউন বলে উঠে,
آمَنْتُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا الَّذِي آمَنَتْ بِهِ بَنُو إِسْرَائِيلَ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ ﴾ "এবার আমি বিশ্বাস করে নিচ্ছি যে, কোনো মা'বুদ নেই তিনি ছাড়া যাঁর ওপর ঈমান এনেছে ইসরাঈলের বংশধররা। বস্তুত আমিও তাঁরই অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত।" [১১৪]
প্রতিউত্তরে জিবরীল বলেন,
الْآنَ وَقَدْ عَصَيْتَ قَبْلُ وَكُنْتَ مِنَ الْمُفْسِدِينَ ) "এখন একথা বলছো! অথচ তুমি ইতঃপূর্বে নাফরমানি করছিলে এবং পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে।" [১১৫]
টিকাঃ
[১০০] সূরা নিসা, ৪: ৩১।
[১০১] সূরা নাজম, ৫৩: ৩২।
[১০২] মুসলিম, ২৩৩।
[১০৩] বুখারি, ৬২৪৩; মুসলিম, ২৬৫৭।
[১০৪] বুখারি, ৬৬৭৫।
[১০৫] বুখারি, ২৬৫৪; মুসলিম, ৮৭।
[১০৬] বুখারি, ৪৪৭৭; মুসলিম, ৮৬।
[১০৭] বুখারি, ২৭৬৬; মুসলিম, ৮৯।
[১০৮] বুখারি, ৫৯৭৩; মুসলিম, ৯০।
[১০৯] সা'লাবি, তাফসীর, ১০/২৬১-২৬৪।
[১১০] সূরা নিসা, ৪: ৩১।
[১১১] বাগাবি, তাফসীর, ২/২০২।
[১১২] বাগাবি, তাফসীর, ২/২০৩।
[১১৩] সূরা সাফফাত, ৩৭: ১৪৩-১৪৪।
[১১৪] সূরা ইউনুস, ১০: ৯০।
[১১৫] সূরা ইউনুস, ১০: ৯১।