📄 তাওবার কতিপয় আহকাম
এখন তাওবার সাথে সম্পর্কিত কিছু আহকাম নিয়ে আলোচনা করব; যার প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি; যার থেকে অজ্ঞ থাকা বান্দার পক্ষে শোভনীয় নয়।
এক. খুব দ্রুত গুনাহ থেকে তাওবার দিকে ধাবিত হওয়া বান্দার ওপর তাৎক্ষণিকভাবে ফরজ; তাওবা করতে বিলম্ব করা জায়িয নয়।
যে ব্যক্তি তাওবা করতে দেরি করে, তার জন্য দেরি করার আলাদা একটি গুনাহ লেখা হয়। সুতরাং যখন সে গুনাহ থেকে তাওবা করে, তখন তার ওপর আরেকটি তাওবা অবশিষ্ট থেকে যায়; সেটি হলো তাওবা করতে দেরি করার কারণে তাওবা। তাওবাকারীর অন্তরে এই বিষয়টি খুব কমই আসে। বরং সে মনে করে গুনাহ থেকে তাওবা করলে তার ওপর আর কিছুই বাকি থাকে না; অথচ বিলম্বে তাওবা করার গুনাহটি তার নামে থেকেই যায়।
এর থেকে কেবল তখনই মুক্তি মিলবে, যখন জানা-অজানা সব ধরনের গুনাহ থেকে ব্যাপকভাবে তাওবা করবে। কারণ বান্দার জানা গুনাহের থেকে অজানা গুনাহের পরিমাণই বেশি। আর যখন জানার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেউ অজ্ঞ থাকে, তখন তার সেই অজ্ঞতা তাকে শাস্তির মুখোমুখি হওয়া থেকে বাঁচাতে পারবে না। কারণ জ্ঞান অর্জন না করা এবং সে অনুযায়ী আমল না করার অপরাধে সে অপরাধী। ফলে মূর্খ ব্যক্তির ক্ষেত্রে গুনাহের পরিমাণ যেমন বেশি, তেমনি ভয়াবহ। একটি হাদীসে এসেছে, আবূ বকর -কে উদ্দেশ্য করে রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
يَا أَبَا بَكْرٍ، لَلشَّرْكُ فِيْكُمْ أَخْفَى مِنْ دَبِيْبِ النَّمْلِ
“হে আবূ বকর, নিশ্চয় শির্ক পিঁপড়ার হেঁটে চলা থেকেও বেশি গোপনে তোমাদের মধ্যে লুকিয়ে থাকে।"
আবূ বকর বললেন, 'আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে ইলাহ্ সাব্যস্ত করা ছাড়াও কি শির্ক আছে?'
নবি তার জবাবে বললেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَلشَّرْكُ أَخْفَى مِنْ دَبِيْبِ النَّمْلِ، أَلَا أَدُلُّكَ عَلَى شَيْءٍ إِذَا قُلْتَهُ ذَهَبَ عَنْكَ قَلِيْلُهُ وَكَثِيرُهُ؟
“সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! শির্ক পিপীলিকার পদধ্বনির চেয়েও সূক্ষ্ম। আমি কি তোমাকে এমন কিছু শিখিয়ে দেবো না, যা বললে তোমার থেকে অল্পবেশি সব শির্কই দূর হয়ে যাবে?” তিনি বললেন, 'তা হলে তুমি এই দুআ পাঠ কোরো,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُ بِكَ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ وَأَنَا أَعْلَمُ، وَأَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لَا أَعْلَمُ
“হে আল্লাহ, আমি সজ্ঞানে তোমার সাথে শিরক করা থেকে তোমার কাছে আশ্রয় চাই এবং যা আমার অজানা তা থেকেও তোমার কাছে ক্ষমা চাই।”[৭০]
এটি হলো সেই বিষয় থেকে ক্ষমা প্রার্থনা, যা আল্লাহ জানে যে সেটা গুনাহ কিন্তু বান্দা তা জানে না।
দুই. কোনো গুনাহে অটল থাকাবস্থায় আরেকটি গুনাহ থেকে তাওবা করলে তা কি বিশুদ্ধ হবে?
এ ব্যাপারে আলিমদের দুটি মতামত রয়েছে; যা ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল -এর দুটি রিওয়ায়াত।
মাসআলাটির মূলকথা হলো: তাওবা গুনাহের মতো খণ্ড খণ্ড হয় কি না; ফলে এক দিক থেকে তাওবাকারী বলে গণ্য হবে, আবার অন্য দিক থেকে হবে না; নাকি ঈমান ও ইসলামের মতো অখণ্ডনীয়? অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মত হলো তাওবা খণ্ড খণ্ড হয়; যেমন তা গুণগত মানের দিক দিয়ে বিভিন্ন রকম হয়, তেমনি পরিমাণের দিক দিয়েও কমবেশ হয়। বান্দা যদি একটি ফরজ আমল আদায় করে আর অন্য একটি ছাড়ে, তা হলে সে যা পরিত্যাগ করে তার জন্য শাস্তির মুখোমুখি হবে; যা আদায় করেছে তার জন্য নয়। ঠিক তেমনি যখন একটি গুনাহ থেকে তাওবা করে এবং অন্য একটি গুনাহে অটল থাকে। কারণ দুটি গুনাহ থেকেই তাওবা করা ফরজ। সে এর একটি আদায় করেছে এবং একটি ছেড়ে দিয়েছে। সুতরাং যা ছেড়ে দিয়েছে তার কারণে যা আদায় করেছে তা বাতিল হবে না; যেমন কেউ হাজ্জের ফরজ আদায় করেনি; কিন্তু সালাত, সিয়াম ও যাকাত ঠিকমতো পালন করেছে।
এই মাসআলার ক্ষেত্রে আমার অভিমত হলো: অনুরূপ গুনাহে লিপ্ত থাকা অবস্থায় সেরকম কোনো একটি গুনাহ থেকে তাওবা করলে, সে তাওবা সহীহ হবে না। আর কোনো গুনাহে লিপ্ত থাকা অবস্থায় সেই গুনাহের সাথে সম্পর্কহীন ভিন্ন কোনো একটি গুনাহ থেকে তাওবা করলে, সে তাওবা সহীহ বলে গণ্য হবে। যেমন: কেউ যদি সুদ থেকে তাওবা করে, কিন্তু মদপান থেকে তাওবা না করে; তা হলে তার সুদ থেকে তাওবা সহীহ ও বিশুদ্ধ। অপরদিকে কেউ যদি নগদসুদ থেকে তাওবা করে, কিন্তু বাকিসুদ থেকে তাওবা না করে অথবা গাঁজা খাওয়া থেকে তাওবা করে, কিন্তু মদপান থেকে তাওবা না করে, অথবা এর উল্টোটা করে, তা হলে তার তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে না।
তিন. তাওবা সহীহ হওয়ার জন্য কি এটাও শর্ত যে, সেই গুনাহে আর কোনো দিন কখনো লিপ্ত হতে পারবে না, নাকি এটা তাওবার শর্ত নয়?
কেউ কেউ সেই গুনাহে অভ্যস্ত না হওয়াকে শর্ত করেছেন। তারা বলেছেন, যদি আবার তাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তা হলে বোঝা যাবে তার আগের তাওবা বাতিল ছিল, সহীহ ছিল না।
আর অধিকাংশের মত হলো: এটি তাওবা সহীহ হওয়ার জন্য কোনো শর্ত নয়। কারণ তাওবার শুদ্ধতা নির্ভর করে তিনটি বিষয়ের ওপর- ১. তাৎক্ষণিকভাবে সেই গুনাহ পরিত্যাগ করা, ২. তার ওপর অনুতপ্ত হওয়া এবং ৩. পরবর্তীকালে তাতে আর লিপ্ত না হওয়ার দৃঢ় সংকল্প করা।
চার. অপরাধকারীর মাঝে ও অপরাধ সংঘটনের কারণসমূহের মাঝে যখন কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয় এবং সে তাতে লিপ্ত হওয়ার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে যে, তার থেকে অপরাধ সংঘটিত হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে; এমতাবস্থায় কি তার তাওবা সহীহ হবে? এই ব্যক্তির অবস্থা হয় ঠিক তেমনই, যেমন কোনো মিথ্যাবাদী, অপবাদ-দানকারী বা মিথ্যা-সাক্ষ্যদানকারীর জিহ্বা নষ্ট হয়ে যায়, কোনো ব্যভিচারকারীর গোপনাঙ্গ কেটে ফেলা হয়, কোনো চোরের চার হাত-পা অকেজো হয়ে যায়, কোনো জালকারীর হাত অবশ হয়ে যায়, কোনো ব্যক্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, তার আর গুনাহে জড়িয়ে পড়ার মতো অবস্থা থাকে না।
এই ব্যাপারে দুটি অভিমত রয়েছে: একদল বলেছেন, তার তাওবা সহীহ হবে না। কারণ তাওবা তো সেই ব্যক্তির কাছ থেকেই সহীহ হবে, যে গুনাহও করতে পারে আবার তা থেকে বেঁচেও থাকতে পারে। সুতরাং তাওবা সম্ভাবনাময় স্থান থেকে হতে হবে, অসম্ভব কিছু থেকে নয়। আর এ কারণেই পাহাড়কে আপন স্থান থেকে সরিয়ে দেওয়া, সমুদ্র শুকিয়ে ফেলা, আকাশে উড়া এবং এ রকম বিভিন্ন বিষয় থেকে তাওবা করার কল্পনাও করা হয় না।
তারা বলে, এর আরেকটি কারণ হলো, তাওবা হচ্ছে নফসের আহ্বানের বিরোধিতা করা আর সত্যের আহ্বানে সাড়া দেওয়া। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে তো নফসের কোনো আহ্বানই থাকে না। কারণ এখানে কোনো কার্যসম্পাদন করা নফসের পক্ষে সম্ভবই নয়।
দ্বিতীয় মতটি হলো—আর এটিই সঠিক মত—এ রকম ব্যক্তির তাওবা সহীহ ও সম্ভব; বরং বাস্তবসম্মত। কারণ তাওবার সবকটি ভিত্তিই এখানে উপস্থিত আর সে যেটার ওপর সক্ষম, তা হলো অনুতাপ-অনুশোচনা করা। কারণ হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, اَلنَّدَمُ تَوْبَةٌ “অনুতপ্ত হওয়াই তাওবা।”[৭১] সুতরাং গুনাহের ওপর যখন তার অনুশোচনা এবং নফসের ওপর যখন তার তিরস্কার পাওয়া গেল, তখন এটাই হলো তার তাওবা। আর কীভাবেই-বা তার থেকে তাওবাকে প্রত্যাখ্যান করা হবে, যখন সে গুনাহের ওপর প্রচণ্ড অনুতপ্ত হয় এবং এ কারণে নিজের নফসকে বেশ তিরস্কার করে। বিশেষ করে যখন এর সাথে কান্নাকাটি, পেরেশানি, ভয়, দৃঢ় ইচ্ছা এবং তার এই নিয়ত যুক্ত হয় যে, সে যদি সুস্থ থাকত এবং কাজটি করার সক্ষমতা থাকত, তা হলেও অবশ্যই সে তা থেকে বিরত থাকত। (এমন অবস্থাতে তার তাওবা অগ্রহণযোগ্য হওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।)
আবার নবি ﷺ নিয়ত সহীহ থাকার কারণে নেককাজে অক্ষম ব্যক্তিকেও সক্ষম ও নেককাজ সম্পাদনকারীর সমান গণ্য করেছেন। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছে, নবি ﷺ বলেছেন, إِذَا مَرِضَ الْعَبْدُ أَوْ سَافَرَ كُتِبَ لَهُ مِثْلُ مَا كَانَ يَعْمَلُ مُقِيمًا صَحِيحًا “যখন বান্দা অসুস্থ হয় কিংবা সফরে থাকে, তখন তার জন্য সে নিজগৃহে সুস্থ থাকাবস্থায় যে আমল করত, তার অনুরূপ আমলের সাওয়াবই লেখা হয়।”[৭২]
এমনিভাবে 'সহীহ মুসলিম'-এর আরেকটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবি ﷺ যুদ্ধরত সাহাবিদের বলেছেন,
إِنَّ بِالْمَدِينَةِ لَرِجَالًا مَا سِرْتُمْ مَّسِيرًا وَلَا قَطَعْتُمْ وَادِيًا إِلَّا كَانُوْا مَعَكُمْ حَبَسَهُمُ الْمَرَضُ “মদীনায় এমন কিছু লোক রয়েছে, তোমরা যে পথই পাড়ি দাও আর যে উপত্যকাই অতিক্রম করো, তারা তোমাদের সঙ্গে রয়েছে। কেবল রোগব্যাধিই তাদের বাধা দিয়ে রেখেছে।”[৭৩]
হাদীসে এ রকম আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে। সুতরাং যে ব্যক্তি গুনাহ করতে অক্ষম, বাধ্য হয়েই তা পরিত্যাগ করছে—কিন্তু সে এই নিয়ত রাখে যে, সক্ষম হলেও ইচ্ছা করেই গুনাহ থেকে বিরত থাকবে—এমন ব্যক্তিকে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও স্বেচ্ছায় গুনাহ পরিত্যাগকারী ব্যক্তিদের স্তরে গণ্য করাই উত্তম।
পাঁচ: মানুষের হক নষ্ট করে কেউ যদি তা থেকে তাওবা করে, তা হলে তার জন্য জরুরি হলো : সেই হক থেকে নিজেকে মুক্ত করা; হয়তো সরাসরি হক আদায় করার মাধ্যমে অথবা সেই ব্যক্তিকে জানিয়ে তার থেকে হালাল করে নেওয়ার মাধ্যমে। যদিও তা অর্থসংক্রান্ত বা কারও শরীরে আঘাত দেওয়া বা কারও ওয়ারিশের শরীরে আঘাত দেওয়া হোক না কেন। যেমন নবী থেকে প্রমাণিত, তিনি বলেছেন,
مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لِأَخِيهِ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ شَيْءٍ فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ الْيَوْمَ قَبْلَ أَنْ لَا يَكُونَ دِينَارٌ وَلَا دِرْهَمْ إِنْ كَانَ لَهُ عَمَلَ صَالِحٌ أُخِذَ مِنْهُ بِقَدْرِ مَظْلَمَتِهِ وَإِنْ لَمْ تَكُنْ لَّهُ حَسَنَاتٌ أُخِذَ مِنْ سَيِّئَاتِ صَاحِبِهِ فَحُمِلَ عَلَيْهِ
“যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের মান-সম্মান অথবা অন্য কোনো বিষয়ে জুলুম করে, সে যেন আজই তার নিকট হতে সে ব্যাপারে ক্ষমা চেয়ে নেয়, সেদিন আসার পূর্বেই, যেদিন তার না কোনো দীনার থাকবে আর না কোনো দিরহাম। সেদিন যদি তার কোনো নেক আমল থাকে, তা হলে তার জুলুমের সমপরিমাণ তার নিকট হতে তা নিয়ে নেওয়া হবে। আর যদি তার কোনো নেক আমল না থাকে, তা হলে তার সেই সঙ্গীর পাপরাশি হতে সেই পরিমাণ পাপ নিয়ে তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।”[৭৪]
যদি কারও সম্মানহানি, গীবত বা অপবাদ দেওয়ার মাধ্যমে জুলুম করা হয়, তা হলে এর থেকে তাওবা করার জন্য কি এই শর্ত রয়েছে যে, সে ব্যক্তিকে সেই সব গুনাহের নাম ধরে নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করতে হবে এবং তার থেকে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে? নাকি নির্দিষ্ট না করে তাকে জানিয়ে দেওয়া যে, তার সম্মানে আঘাত করা হয়েছে? নাকি এ দুটোর কোনোটাই শর্ত নয়; বরং কোনো প্রকার জানানো ব্যতীত আল্লাহর নিকট তাওবা করাই যথেষ্ট হবে?
ইমাম শাফিয়ি, ইমাম আবূ হানীফা ও ইমাম মালিক -এর মাযহাবে প্রসিদ্ধ মত হলো— জানানো ও ক্ষমা চাওয়া তাওবার শর্তের অন্তর্ভুক্ত। তাদের সঙ্গীসাথিরা তাদের কিতাবে এভাবেই উল্লেখ করেছেন।
যারা এটিকে শর্ত হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন, তারা দলীল দেন যে, এই গুনাহটি হলো বান্দার হকসম্পর্কিত। সুতরাং তার পক্ষ থেকে ক্ষমা ও মুক্তি না পাওয়া পর্যন্ত তা রহিত হবে না।
আরেকটি মত হলো— সম্মানহানি করা, গীবত করা, অপবাদ দেওয়া ইত্যাদি সম্পর্কে জানিয়ে দেওয়া তাওবা করার জন্য শর্ত নয়। বরং বান্দা ও আল্লাহর মাঝে তাওবাই যথেষ্ট। তবে যে সমস্ত জায়গায় ব্যক্তির গীবত করা হয়েছে এবং অপবাদ দেওয়া হয়েছে, সে সমস্ত জায়গায় তার প্রশংসা করবে, তার ভালো গুণসমূহের আলোচনা করবে, তার পবিত্রতা ও নির্দোষিতা বর্ণনা করবে এবং যে পরিমাণ গীবত ও অপবাদ দেওয়া হয়েছে, তার জন্য সে পরিমাণ আল্লাহ তাআলার নিকট ইস্তিগফার করবে। এই মতটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন আমাদের শাইখ আবুল আব্বাস ইবনু তাইমিয়্যা ।
এই মতাবলম্বীগণ প্রমাণ পেশ করেন যে, তাকে জানিয়ে দেওয়া কেবল অনিষ্ট ও ক্ষতিই ডেকে আনবে, কোনো উপকার বয়ে আনবে না। কারণ এর মাধ্যমে ব্যক্তি নতুন করে কষ্ট পাবে, অন্তরে অশান্তি ও অস্থিরতার সৃষ্টি হবে। অথচ তা শোনার পূর্বে সে নির্ভাবনায় ছিল। অনেক সময় যখন সে তার সম্মানহানি, অপবাদের কথা শুনবে, তখন হয়তো তা সহ্য করতে পারবে না; ফলে তার মানসিক বা শারীরিক কোনো ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
ছয়. যে ব্যক্তি কোনো বিষয়ে সীমালঙ্ঘন করে, পরে তার জন্য তা আদায় করা দুষ্কর ও কঠিন হয়ে পড়ে এবং এর প্রতিকার করাও সম্ভব হয় না; অতঃপর সে তাওবা করে, তা হলে তার তাওবার হুকুম কী এবং কীভাবে সে তাওবা করবে? এটি আল্লাহর হক ও বান্দার হক উভয় ক্ষেত্রেই হতে পারে।
আল্লাহর হকের ক্ষেত্রে: যেমন- কেউ সালাত আদায় করা ফরজ জানা সত্ত্বেও কোনো ওজর ছাড়া ইচ্ছা করেই সালাত ছেড়ে দিলো, তার পর তাওবা করল এবং অনুতপ্ত হলো। সালাফগণ এই মাসআলার ক্ষেত্রে ইখতিলাফ করেছেন।
একদল বলেছেন, তার তাওবা হবে অনুশোচনা ও লজ্জিত হওয়া, ভবিষ্যতের ফরজগুলো আদায় করা এবং যেগুলো ছেড়ে দিয়েছে, সেগুলোর কাযা আদায় করার মাধ্যমে। চার ইমামসহ আরও অনেক ইমামের অভিমত এমনই।
আরেকদল বলেছেন, তার তাওবা হবে ভবিষ্যতের ফরজ সালাতগুলো আদায় করার মাধ্যমে। আর যা পরিত্যাগ করেছে, তা কাযা আদায় করার দ্বারা কোনো উপকার হবে না এবং তা কবুলও করা হবে না। সুতরাং কাযা আদায় করা ওয়াজিব নয়। এটি হলো যাহিরি মাযহাব অবলম্বীদের অভিমত। এটি সালাফের অনেকের নিকট থেকেই বর্ণিত হয়েছে।
যারা কাযাকে ওয়াজিব বলেছেন তাদের দলীল হলো নবি -এর বাণী-
مَنْ نَّسِيَ صَلَاةٌ فَلْيُصَلِّهَا إِذَا ذَكَرَهَا لَا كَفَّارَةً لَهَا إِلَّا ذَلِكَ
“কেউ কোনো সালাত আদায় করতে ভুলে গেলে যখন তা স্মরণ হবে, তখনই সে যেন তা আদায় করে নেয়। এর কাফফারা কেবল এটিই।”[৭৫]
তারা বলেন, ঘুমন্ত ও ভুলে যাওয়া ব্যক্তির কোনো সীমালঙ্ঘন না থাকা সত্ত্বেও হাদীসে যখন তাদের ওপর কাযা আদায় করা ওয়াজিব করা হয়েছে, তখন যে ব্যক্তি সীমালঙ্ঘন করে স্বেচ্ছায় সালাত ছেড়ে দেয়, তার ওপর ওয়াজিব হওয়া তো বাস্তবসম্মত ও যুক্তির দাবি।
প্রথম মতাবলম্বীরা বলেন, কোনো ইবাদাত সম্পর্কে যখন কোনো নির্দিষ্ট সিফাতের ওপর বা নির্দিষ্ট সময়ে তা আদায় করার আদেশ করা হয়, তখন আদেশপ্রাপ্ত ব্যক্তি কেবল তখনই পরিপূর্ণরূপে সেই আদেশ পালন করতে পারবে, যখন যেভাবে যে সিফাতের সাথে যে সময়ে তা পালন করার আদেশ করা হয়েছে, ঠিক সেভাবেই সে তা আদায় করে। সুতরাং নির্দিষ্ট সময় না থাকার মানে শর্ত ও সিফাতও না থাকা। তাই বলা যায়, নির্দিষ্ট সময়ে আদায় না করলে যথাযথভাবে তা আদায় হয় না।
তারা বলেন, সালাতকে তার ওয়াক্ত থেকে বের করা, কিবলা-অভিমুখী হওয়া থেকে বের করার মতোই।
বান্দার হকের ক্ষেত্রে যেমন: কেউ কারও অনেকগুলো অর্থ-সম্পদ আত্মসাৎ করল, তারপরে এক সময় গিয়ে তাওবা করল, কিন্তু এখন সেগুলোর প্রকৃত মালিক বা তাদের ওয়ারিশদের বের করা তার জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে; তাদের না চেনার কারণে বা তাদের কেউ মারা যাওয়ার কারণে বা অন্য কোনো কারণে। এই ব্যক্তির মতো পরিস্থিতি যাদের, তাদের তাওবার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে।
একদল বলেছেন, প্রকৃত মালিকের নিকট এই অর্থকড়ি না পৌঁছানো পর্যন্ত তার কোনো তাওবা নেই। যখন তা অসম্ভব হয়ে যাবে, তখন তার তাওবাও অসম্ভব হয়ে পড়বে। এর থেকে মুক্তি মিলবে কেবল কিয়ামতের দিন; পূণ্য-পাপের অদলবদলে।
আরেকদল বলেছেন, এই ব্যক্তির জন্যও তাওবার দরজা উন্মুক্ত রয়েছে। আল্লাহ তাআলা এই ব্যক্তির জন্য তাওবার দরজা বন্ধ করেননি এবং অন্যান্য গুনাহগারদের জন্যও না। এই ব্যক্তির তাওবা হলো-সে তার আত্মসাৎকৃত মাল-সম্পদগুলো প্রকৃত মালিকের নামে আল্লাহর রাস্তায় সদাকা করে দেবে। ফলে যখন সমস্ত হক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আদায় করার দিন (কিয়ামাতের দিন) আসবে, তখন তাদের ইখতিয়ার থাকবে যে, তারা চাইলে এই ব্যক্তি যে কাজ করেছে, তার অনুমোদন দিয়ে সদাকার যে সাওয়াব হয়েছে তার অধিকারী হবে আবার চাইলে অনুমোদন না দিয়ে তাদের সম্পদের সমপরিমাণ সাওয়াব সেই ব্যক্তির কাছ থেকে নিয়ে নেবে আর সেই ব্যক্তি এই দান-সদাকার সাওয়াব পেয়ে যাবে। কারণ আল্লাহ তাআলা কোনো নেক আমলের সাওয়াব নস্যাৎ করে দেন না। আবার সম্পদের মালিকদের জন্য সম্পদ দান করার সাওয়াব এবং ওই ব্যক্তির কাছ থেকে নেক আমল নিয়ে নেওয়া-এই দুই প্রতিদানকেও একত্রিত করবেন না। তারা দুটোর যেকোনো একটি পাবে।
অনেক সাহাবি-ও এই মত পোষণ করেছেন।
টিকাঃ
[৭০] বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ৭২১।
[৭১] ইবনু মাজাহ, ৪২৫২; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৩৫৬৮।
[৭২] বুখারি, ২৯৯৬।
[৭৩] মুসলিম, ১৯১১।
[৭৪] বুখারি, ২৪৪৯।
[৭৫] বুখারি, ৫৯৭; মুসলিম, ৬৮৪।
📄 ইস্তিগফার ও তাওবার প্রকৃত মর্ম
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 তাওবার আলোচনা
অধিকাংশ মানুষ তাওবার তাফসীর করে থাকে তিনটি বিষয়ের মাধ্যমে—গুনাহে লিপ্ত না হওয়ার দৃঢ় সংকল্প করা, তাৎক্ষণিকভাবে তা থেকে বিরত থাকা এবং অতীতের করা-গুনাহের ওপর অনুতপ্ত হওয়া। আর যদি বান্দার হকসংক্রান্ত হয়, তা হলে চতুর্থ আরেকটি বিষয় জরুরি তা হলো: বান্দার কাছ থেকে বৈধ করে নেওয়া।
তারা যে বিষয়গুলো উল্লেখ করে থাকেন, তা হলো তাওবার কিছু অংশ বা শর্ত। অন্যথায় আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বাণীতে এগুলো অন্তর্ভুক্ত থাকার সাথে সাথে আরেকটি বিষয়ও রয়েছে। তা হলো—সেই গুনাহের বিপরীতে যে বিষয়ের আদেশ করা হয়েছে, তা করার সুদৃঢ় ইচ্ছা ও তা পালন করাকে নিজের ওপর অপরিহার্য করে নেওয়া। সুতরাং শুধু গুনাহ থেকে বিরত থাকা, পুনরায় তাতে লিপ্ত না হওয়ার দৃঢ় সংকল্প করা এবং অনুশোচনার মাধ্যমে কেউ তাওবাকারী বলে গণ্য হয় না; যতক্ষণ-না যা করতে আদেশ করা হয়েছে, তা পালন করতে তার কাছ থেকে সুদৃঢ় প্রতিজ্ঞা পাওয়া যায়। এটিই হলো তাওবার প্রকৃত মর্ম। তাওবা হলো এই দুটি বিষয়ের সম্মিলিত নাম। তবে যদি আদেশকৃত বিষয়টি এর সাথে সংযুক্ত থাকে, তা হলে তারা যা উল্লেখ করেন, তা-ই উদ্দেশ্য হবে। আর যদি সংযুক্ত না হয়ে আলাদাভাবে আসে, তা হলে দুটি বিষয়ই এর অন্তর্ভুক্ত হবে।
এটি হলো ‘তাকওয়া’ (اتَّقوى) শব্দটির মতো; যখন তা আলাদাভাবে আসে, তখন তা আল্লাহ তাআলা যা আদেশ করেছেন তা পালন করা এবং যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা—এ দুটিকেই অন্তর্ভুক্ত করে। আর যদি আদেশকৃত বিষয়ের সাথে তাকওয়া যুক্ত হয়ে আসে, তা হলে তা হারাম থেকে বেঁচে থাকাকে অন্তর্ভুক্ত করে।
কারণ তাওবার মূল অর্থ হলো: আল্লাহর দিকে ফিরে আসা; তিনি যা ওয়াজিব করেছেন, তা আদায় করার মাধ্যমে এবং তিনি যা অপছন্দ ও নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে। সুতরাং অপছন্দনীয় বিষয়াদি থেকে নিজেকে সংযমে রেখে, পছন্দনীয় বিষয়াদির দিকে ধাবিত হওয়ার নামই তাওবা। এখানে দুটি বিষয় রয়েছে; একটি হলো মাকরূহ বা অপছন্দনীয় বিষয় থেকে নিজেকে বিরত রাখা। আরেকটি হলো মাহবুব বা পছন্দনীয় বিষয়ের দিকে ধাবিত হওয়া। আর এ কারণেই আল্লাহ তাআলা আদেশকৃত কাজগুলো পালন করা এবং নিষেধকৃত কাজগুলো পরিত্যাগ করার সাথে সফলতাকে সম্পৃক্ত করে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَتُوْبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُوْنَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ
“হে মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর নিকট তাওবা করো, আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে।”[৭৬]
সুতরাং প্রত্যেক তাওবাকারী ব্যক্তিই সফল; তবে সে ততক্ষণ পর্যন্ত সফল হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত-না তাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তা আদায় করে এবং তাকে যা নিষেধ করা হয়েছে, তা পরিত্যাগ করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَنْ لَّمْ يَتُبْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُوْنَ
"আর যারা তাওবা করে না, তারাই জালিম বা অত্যাচারী।”[৭৭]
হারামে-লিপ্ত-ব্যক্তির মতো আল্লাহর আদেশ-পরিত্যাগকারী ব্যক্তিও জালিম। সুতরাং জুলুম থেকে বেঁচে থাকতে হলে দুটি বিষয়েই তাওবা করতে হবে। উপরিউক্ত আয়াত অনুসারে সমস্ত মানুষ দুই প্রকারে সীমাবদ্ধ-১. তাওবাকারী, ২. জালিম। তাওবাকারী ব্যতীত সবাই জালিম। আর তাওবাকারী ব্যক্তিরা হলেন নিম্নোক্ত আয়াতের গুণে গুণান্বিত-
الْعَابِدُونَ الْحَامِدُونَ السَّائِحُونَ الرَّاكِعُونَ السَّاجِدُونَ الْآمِرُونَ بِالْمَعْرُوْفِ وَالنَّاهُوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَالْحَافِظُونَ لِحُدُودِ اللَّهِ
“ইবাদাতকারী, শোকরগুজার, (দুনিয়ার সাথে) সম্পর্কচ্ছেদকারী, রুকূ ও সাজদা আদায়কারী, সৎকাজের আদেশ দানকারী, মন্দকাজ থেকে নিষেধকারী এবং আল্লাহর দেওয়া সীমাসমূহের হেফাজতকারী।”[৭৮]
আল্লাহর-দেওয়া-সীমারেখা হেফাজত করা হলো তাওবার একটি অংশ। আর তাওবা হলো এই সবগুলো বিষয়ের সমষ্টির নাম। তাওবাকারীকে 'তায়িব' এ কারণেই বলা হয় যে, সে আল্লাহর নিষেধকৃত বস্তুসমূহ থেকে আল্লাহর আদেশকৃত বস্তুর দিকে এবং গুনাহ ছেড়ে তাঁর আনুগত্যের দিকে ফিরে আসে। যেমন পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে।
সুতরাং তাওবাই হলো দ্বীন-ইসলামের হাকীকত। দ্বীনের পুরাটাই তাওবার অন্তর্ভুক্ত। এর দ্বারা তাওবাকারী আল্লাহ তাআলার ভালোবাসার পাত্রে পরিণত হয়। কারণ আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন, পবিত্র-পরিচ্ছন্ন এবং সেই ব্যক্তিদেরও তিনি ভালোবাসেন, যারা তাঁর দেওয়া আদেশগুলো পালন করে আর নিষেধগুলো থেকে বেঁচে থাকে।
তা হলে বুঝা যায়, তাওবা হলো প্রকাশ্যভাবে ও অপ্রকাশ্যভাবে আল্লাহ তাআলা যা অপছন্দ করেন, তা থেকে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্যভাবে তিনি যা পছন্দ করেন সে দিকে ফিরে আসা।
তাওবার মধ্যে ইসলাম, ঈমান, ইহসান-সবই শামিল এবং তা সমস্ত মানযিল ও মাকামকে অন্তর্ভুক্ত করে। আর এ কারণেই প্রতিটি মুমিনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এবং শুরু ও শেষ হলো তাওবা। যেমনটি পূর্বে আলোচিত হয়েছে। এটি হলো সেই উদ্দেশ্য, যার জন্য সমগ্র সৃষ্টিজগৎকে অস্তিত্বে আনা হয়েছে। আদেশ ও তাওহীদ হলো এর একটি অংশ। বরং বলা যায় সবেচেয়ে বড়ো অংশ; যার ওপর এর ভিত্তি।
অধিকাংশ মানুষ তাওবার মর্যাদা ও প্রকৃত মর্মই বোঝে না; ইলমি, আমলি, অবস্থাগতভাবে তা আদায় করা তো অনেক দূরের কথা। আল্লাহ তাআলার নিকট তাওবাকারীদের বিশেষ মর্যাদা ও সম্মান আছে বলেই তিনি তাদের অনেক ভালোবাসেন।
তাওবা যদি পুরা ইসলামি শারীআতকে এবং ঈমানের হাকীকতকে অন্তর্ভুক্ত না করত, তা হলে আল্লাহ তাআলা বান্দার তাওবার কারণে অত বেশি খুশি হতেন না। আসলে সূফিয়ায়ে কেরাম সে সমস্ত মানযিল, মাকাম ও অন্তরের বিশেষ অবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করেন, তা তাওবারই বিস্তারিত বিবরণ ও প্রভাব।
টিকাঃ
[৭৬] সূরা নূর, ২৪: ৩১।
[৭৭] সূরা হুজুরাত, ৪৯: ১১।
[৭৮] সূরা তাওবা, ৯: ১১২।
📄 ইস্তিগফারের আলোচনা
ইস্তিগফার দুই প্রকার: ১. আলাদাভাবে উল্লেখকৃত ও ২. তাওবার সাথে যুক্ত করে উল্লেখকৃত।
১. আলাদাভাবে উল্লেখকৃত ইস্তিগফার যেমন: আপন কওমকে উদ্দেশ্য করে নূহ-এর বক্তব্য-
فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُم مِّدْرَارًا ۞
"অতঃপর আমি বলেছি, 'তোমরা তোমাদের পালনকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিঃসন্দেহে তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তা হলে তিনি তোমাদের ওপর অজস্র বৃষ্টিধারা বর্ষণ করবেন।” [৭৯]
যেমন আল্লাহ তাআলার বাণী-
وَمَا كَانَ اللهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَأَنْتَ فِيهِمْ وَمَا كَانَ اللَّهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُوْنَ ۞
"অথচ আল্লাহ কখনই তাদের ওপর আযাব নাযিল করবেন না, যতক্ষণ আপনি তাদের মাঝে অবস্থান করবেন। তা ছাড়া তারা যতক্ষণ ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে, আল্লাহ কখনো তাদের ওপর আযাব দেবেন না।” [৮০]
২. তাওবার সাথে যুক্ত করে উল্লেখকৃত: যেমন আল্লাহ তাআলার বাণী-
وَأَنِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ يُمَتِّعْكُمْ مَّتَاعًا حَسَنًا إِلَى أَجَلٍ مُّسَمًّى وَيُؤْتِ كُلَّ ذِي فَضْلٍ فَضْلَهُ
"তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও এবং তাঁর নিকট তাওবা করো, তা হলে তিনি একটি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তোমাদেরকে উত্তম জীবন- সামগ্রী দেবেন এবং অনুগ্রহ লাভের যোগ্য প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার অনুগ্রহ দান করবেন।"[৮১]
যেমন সালিহ তার সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, فَاسْتَغْفِرُوهُ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ إِنَّ رَبِّي قَرِيبٌ مُجِيبٌ "কাজেই তোমরা তাঁর কাছে ক্ষমা চাও, অতঃপর তাঁর নিকটেই তাওবা করো। নিশ্চয়ই আমার রব নিকটে আছেন, তিনি আহ্বানে সাড়া দেন।”[৮২]
আলাদাভাবে উল্লেখকৃত ইস্তিগফার তাওবার ন্যায়। বরং তা হুবহু তাওবাই; তবে এর সাথে সাথে আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করাকেও তা অন্তর্ভুক্ত করে। ক্ষমা প্রার্থনা হলো গুনাহকে মিটিয়ে দেওয়া, এর প্রভাব দূর করা এবং এর ক্ষতি থেকে বাঁচা। কিছু মানুষ যেমন ধারণা করে, বিষয়টি সেরকম নয় যে, তা হলো সতর বা পর্দা; অর্থাৎ গুনাহকে ঢেকে রাখা। কারণ আল্লাহ তাআলা তার গুনাহও ঢেকে রাখেন, যাকে তিনি ক্ষমা করেন আবার তার গুনাহও ঢেকে রাখেন, যাকে তিনি ক্ষমা করেন না। তবে হ্যাঁ ক্ষমার অংশ বা অপরিহার্য ব্যাপার হলো গুনাহকে পর্দায় রাখা বা ঢেকে রাখা। সুতরাং পর্দার বিষয়টি পরোক্ষভাবে সাব্যস্ত হয়।
তবে ইস্তিগফারের হাকীকত বা প্রকৃত মর্ম হলো: গুনাহের ক্ষতি থেকে সংরক্ষিত থাকা। এই শব্দমূল থেকেই اَلْمِغْفَرُ শব্দের উৎপত্তি; এর অর্থ হলো: যা মাথাকে আঘাত পাওয়া থেকে সংরক্ষিত রাখে, শিরস্ত্রাণ। আর ঢেকে রাখা বা পর্দার বিষয়টি অপরিহার্যভাবে এর সাথে সম্পর্কিত। কিন্তু এটিই মূল না। আর এ কারণেই পাগড়িকে ‘মিগফার’ বলা হয় না, টুপিকেও না। মিগফার শব্দের মধ্যে সংরক্ষণ করার অর্থ থাকা জরুরি।
এই ইস্তিগফারই আযাবকে প্রতিহত করে, শাস্তি থেকে সংরক্ষিত রাখে; যেমন আল্লাহ তাআলার এই বাণীতে তা লক্ষ করা যায়-
وَمَا كَانَ اللهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَأَنْتَ فِيهِمْ وَمَا كَانَ اللَّهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُونَ “অথচ আল্লাহ কখনই তাদের ওপর আযাব নাযিল করবেন না, যতক্ষণ আপনি তাদের মাঝে অবস্থান করবেন। তা ছাড়া তারা যতক্ষণ ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে, আল্লাহ কখনো তাদের ওপর আযাব দেবেন না।”[৮৩]
কারণ আল্লাহ তাআলা ক্ষমা প্রার্থনাকারীকে শাস্তি দেন না, তাদেরকে শাস্তি থেকে নিরাপদ রাখেন।
আর যে ব্যক্তি অবিরাম গুনাহ করতে থাকে আবার আল্লাহর কাছে ক্ষমাও প্রার্থনা করে, তা হলে এটা তার কোনো ক্ষমা প্রার্থনাই নয়। আর এই কারণে সে আযাব ও শাস্তি থেকে সংরক্ষিতও থাকবে না।
ইস্তিগফার তাওবাকে অন্তর্ভুক্ত করে। আর তাওবা ইস্তিগফারকে। সাধারণভাবে একটি অপরটির মধ্যে শামিল।
আর যখন ইস্তিগফার ও তাওবা একসাথে আসে, তখন ইস্তিগফার দ্বারা উদ্দেশ্য হয় : অতীতে যা অতিবাহিত হয়েছে, তার ক্ষতি থেকে সুরক্ষিত থাকার জন্য প্রার্থনা করা; আর তাওবা দ্বারা উদ্দেশ্য হয় : গুনাহ থেকে ফেরা এবং ভবিষ্যতে মন্দ আমলের ক্ষতির আশঙ্কা থেকে মুক্তি পাওয়ার কামনা করা।
এখানে দুটি গুনাহ: একটি গুনাহ যা অতীতে হয়ে গেছে; এর থেকে ইস্তিগফারের অর্থ হবে: এর ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য প্রার্থনা করা; আরেকটি গুনাহ যা সামনে সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা আছে; এর থেকে তাওবা করার অর্থ হবে: তা না করার দৃঢ় সংকল্প করা। আল্লাহর দিকে ফিরে আসা এই দুই প্রকারকেই শামিল করে— তাঁর দিকে ফেরা; যাতে তিনি অতীতে যা অতিবাহিত হয়েছে, তার ক্ষতি থেকে রক্ষা করেন এবং যাতে তিনি ভবিষ্যতে নফসের ও মন্দ আমলের ক্ষতি থেকেও বাঁচিয়ে দেন।
গুনাহগার ব্যক্তির উদাহরণ হলো সেই পথিকের ন্যায়; যে একটি পথ ধরে হেঁটে চলেছে, যা তাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে, তার গন্তব্যে তাকে পৌঁছাবে না। এখন তার জন্য জরুরি হলো: সে তার যাত্রা থামিয়ে দিয়ে পেছন ফিরবে এবং এমন পথ অবলম্বন করবে, যা তাকে তার গন্তব্যে পৌঁছে দেবে এবং সেখানে নিয়ে যাবে, যেখানে রয়েছে তার সফলতা।
এখানে দুটি বিষয় জরুরি: যে পথে সে চলছিল, তা থেকে পৃথক হওয়া এবং অন্য পথ ধরে গন্তব্যে ফেরা। সুতরাং তাওবা হলো এই ফিরে আসা আর ইস্তিগফার হলো (বাতিল থেকে) পৃথক হয়ে যাওয়া। যখন আলাদা আলাদা করে উল্লেখ করা হয়, তখন প্রত্যেকটিই এই দুটি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে। এ কারণেই-আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন-আগে ইস্তিগফারের হুকুম দেওয়া হয়েছে, পরে তাওবার :
فَاسْتَغْفِرُوهُ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ
"কাজেই তোমরা তাঁর কাছে ক্ষমা চাও, অতঃপর তাঁর নিকটই তাওবা করো।" [৮৪]
কারণ বাতিল থেকে পৃথক হওয়ার পরেই তো সত্য পথে ফিরে আসা।
এমনিভাবে ইস্তিগফার হলো: ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য প্রার্থনা আর তাওবা হলো : উপকার ও কল্যাণ লাভের জন্য প্রার্থনা। সুতরাং মাগফিরাত মানে গুনাহের ক্ষতি থেকে যেন তাকে রক্ষা করা হয়। আর তাওবা মানে এই রক্ষার পর আল্লাহ যা পছন্দ করেন, তা যেন তার হাসিল হয়। আর পৃথক পৃথকভাবে উল্লেখ করা হলে প্রতিটিই একটি অপরটিকে শামিল করে। আল্লাহ তাআলাই অধিক জানেন।
টিকাঃ
[৭৯] সূরা নূহ, ৭১: ১০-১১।
[৮০] সূরা আনফাল, ৮: ৩৩।
[৮১] সূরা হুদ, ১১:৩।
[৮২] সূরা হূদ, ১১:৬১।
[৮৩] সূরা আনফাল, ৮: ৩৩।
[৮৪] সূরা হুদ, ১১:৬১।