📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 বিশেষ ব্যক্তিদের জন্য কি বিশেষ কোনো তাওবা রয়েছে?

📄 বিশেষ ব্যক্তিদের জন্য কি বিশেষ কোনো তাওবা রয়েছে?


'মানাযিলুস সায়িরীন' (مَنَازِلُ السَّابِرِينَ)-গ্রন্থের লেখক আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মাদ হারাবি বলেছেন, 'কারও তাওবার মাকাম ততক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণ হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত-না সে এই স্তরে পৌঁছে যে, সে আল্লাহ ছাড়া বাকিদের থেকে তাওবা করবে; এরপর তাওবা করার কারণ দেখবে; এরপর তাওবা করার সেই কারণ দেখা থেকেও তাওবা করবে।'[৬৪]
আল্লাহ ছাড়া বাকিদের থেকে তাওবা করার অর্থ হলো: আল্লাহ ছাড়া অন্তরে অন্য কারও ইচ্ছা লালন করা থেকে বান্দা বিরত থাকবে। বান্দা কেবল একক, লা শরীক আল্লাহর হুকুম মোতাবিক চলা এবং তাঁরই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করার মাধ্যমে তাঁর ইবাদাত করবে। ফলে বান্দার সবকিছুই হবে আল্লাহকে কেন্দ্র করে এবং আল্লাহর হুকুম অনুসারে। এই বিষয়টি কেবল সেই ব্যক্তির জন্যই সহীহ হবে, আল্লাহর জন্য যার অন্তরে থাকে পরিপূর্ণ ভালোবাসা, সম্মান-শ্রদ্ধা, বিনয়, বশ্যতা, তাঁর সামনে। বিনীত হওয়া এবং সবসময় তাঁর দিকেই মুখাপেক্ষী থাকা।
এই তাওবা যখন বান্দার জন্য বিশুদ্ধ বলে প্রমাণিত হয়, তখন তার ওপর আরেকটি বিষয় অবশিষ্ট থেকে যায়। আর তা হলো তার তাওবা করার কারণ উপলব্ধি করা, তা দেখা এবং তা থেকে পুরোপুরি দৃষ্টি ফিরিয়ে না নেওয়া। আর এই বিষয়টি বান্দার মর্যাদা ও মর্তবা অনুসারে গুনাহের শামিল। সুতরাং তাকে তার এই উপলব্ধি, দেখা এবং তা থেকে ফানা বা পুরোপুরি দৃষ্টি ফিরিয়ে না নেওয়া থেকেও তাওবা করতে হবে।
এখানে তিনটি বিষয় রয়েছে: ১. আল্লাহ ছাড়া বাকি সবকিছু থেকে তাওবা করা, ২. এই তাওবা দেখতে পাওয়া এবং ৩. এই দেখতে পাওয়া থেকেও তাওবা করা (অর্থাৎ বান্দার অন্তরে কেবল আল্লাহই স্থান পাবে, অন্য কোনোকিছু নয়; এমনকি সে যে তাওবা করে, নেক আমল করে সেগুলোও তার অন্তরে স্থান পাবে না।)
সূফিয়ায়ে কেরামের নিকট এটি হলো চূড়ান্ত গন্তব্য; এর পরে আর কিছু নেই। এটিই আল্লাহর-পথের-পথিকদের সর্বশেষ মানযিল, যাতে কেবল অতি বিশেষ ব্যক্তিরাই সফর করে থাকে। আল্লাহর শপথ! বান্দার নিজের কাজসমূহ দেখতে পাওয়া, এর মাধ্যমে রব থেকে আড়াল হওয়া এবং তার চলার পথে বিভিন্ন বিষয় প্রত্যক্ষ করা তাওবাকে আবশ্যক করে। (এটি হলো মানাযিলুস সায়িরীন গ্রন্থের লেখকের অভিমত)
(ইবনুল কাইয়্যিম রহিমাহুল্লাহ বলেন) সঠিক কথা হলো আল্লাহ তাআলার দেওয়া নিয়ামত, দয়া-অনুগ্রহ, শক্তি-সামর্থ্য ও সাহায্য দেখতে না পাওয়ার চেয়ে, দেখতে পাওয়াই হলো উত্তম ও পরিপূর্ণ। তারা যে মাকামের কথা বলে, তার চেয়েও এটি উঁচু স্তরের এবং খাঁটি মহাব্বত ও দাসত্বের পূর্ণাঙ্গ বহিঃপ্রকাশ। আসলে দয়া ও অনুগ্রহ প্রত্যক্ষ করাই হলো অধিক যুক্তিসংগত। কারণ প্রত্যক্ষকারীর উপলব্ধি না থাকলে সে কীভাবে তার ওপর আল্লাহ তাআলার যে দয়া ও অনুগ্রহ, তা অনুভব করবে! (এটি তো অসম্ভব।)
আসলে তাদেরকে এ দিকে পরিচালিত করেছে প্রত্যক্ষ করার ক্ষেত্রে ফানা বা নিজেকে বিলীন করার উপত্যকায় চলার অনুপ্রেরণা। ফলে তারা আল্লাহকে ব্যতীত অন্য কোনো কারণ, মাধ্যম ও রীতিনীতিকে প্রত্যক্ষ ও অনুভব করার বিপক্ষে।
আমরা এই মাকামের স্বাদ ও আনন্দকে অস্বীকার করি না। নিঃসন্দেহে আল্লাহর-পথের-পথিক এ স্তরে পৌঁছে এমন স্বাদ ও আনন্দ অনুভব করেন, যা আর কেউ করতে পারে না। আমাদের বক্তব্য দ্বারা উদ্দেশ্য হলো এই অবস্থার চেয়ে সেই ব্যক্তির অবস্থা আরও বেশি উত্তম ও পরিপূর্ণ, যে নিজের কাজকর্ম ও সিদ্ধান্তসমূহ প্রত্যক্ষ করে এবং এর বিস্তারিত অবস্থাসমূহ দেখে আবার এটিও প্রত্যক্ষ করে যে, সেগুলো কেবল আল্লাহর ইচ্ছা ও তাঁর সাহায্যেই সে সম্পাদন করতে পেরেছে। এই ব্যক্তি তার দাসত্ব ও ইবাদাতের সাথে সাথে দাসত্বের তাওফীক দানকারী সত্তার প্রতিও দৃষ্টি দেয়। দুদিকেই সমান দৃষ্টি থাকে তার। (অনেকেই আছে শুধু আল্লাহর দিকে দৃষ্টি রাখে, আবার কেউ আছে কেবল ইবাদাত আর নিয়ামাতের দিকেই দৃষ্টি রাখে।)
এই দুটি অবস্থাই অসম্পূর্ণ। পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ অবস্থা হলো ব্যক্তি এটি প্রত্যক্ষ করবে যে, তার ইবাদাত-বন্দেগি সবই অর্জিত হয়েছে আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা, অনুগ্রহ, করুণা ও দয়ার বদৌলতে। সুতরাং আপনি যদি এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অনুপস্থিত থাকেন, তা হলে আপনার মাকাম হবে তাওবার মাকাম। আসলে দাসত্বের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, ব্যক্তিকে কেবল ক্ষতির মুখেই ঠেলে দেয়।
এ ক্ষেত্রে ওয়াজিব হলো, এ বিষয়ের সঠিক জ্ঞান জানার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দ্বারস্থ হওয়া এবং ঈমানের হাকীকতের নিকট নিজেকে পেশ করা, কারও রুচি বা পছন্দের নিকট নয়। তবে আমরা এই অবস্থার যে স্বাদ ও আনন্দ তা অস্বীকার করি না, আমরা অস্বীকার করি এই বিষয়টিকে যে, এই অবস্থাটা অন্যদের চেয়ে পরিপূর্ণ। কুরআন-সুন্নাহর কোথাও কি এর প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে? অথবা সাহাবা-তাবিয়ীনের কথাবার্তার কোথাও কি এই ইশারা-ইঙ্গিত রয়েছে যে, এ রকম ফানা হয়ে যেতে হবে আর এটিই হলো পূর্ণাঙ্গতা? কিংবা কোথাও এ রকম কথা রয়েছে যে, বান্দা যদি তার কাজকে আল্লাহর সাহায্য, শক্তি ও অনুগ্রহের মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছে বলে দেখতে পায় এবং এর কারণ যদি সে প্রত্যক্ষ করে, তা হলে এর থেকে তাওবা করা ওয়াজিব? এই বিষয়টুকু অস্বীকার করা তাদের জন্য খুব কঠিন হয়ে যাবে। তারা এর অস্বীকারকারীকে ছুঁড়ে ফেলবে এবং বলবে, সে এ সম্পর্কে অজ্ঞ এবং সে এই মাকাম পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি, যদি এ পর্যন্ত পৌঁছত, তা হলে সে এটিকে অস্বীকার করতে পারত না। আসলে এগুলো এমন কোনো দলীল না যে, এগুলোর সাহায্যে তাদের দাবি সহীহ বলে প্রমাণিত হয়। আবার এগুলো সঠিক কোনো জবাবও নয়। এই অজ্ঞ ব্যক্তি আপনাদের কাছে একটি শারঈ মাসআলা জিজ্ঞাসা করেছে আর আপনারা এর যে উত্তর দিচ্ছেন, তা তো সেটার কোনো জবাব নয়।
আল্লাহর কসম! নিশ্চয় সেই ব্যক্তি আপনাদেরকে এর চেয়ে আরও বড়ো মর্যাদা ও উচ্চ মাকাম থেকে বঞ্চিত হিসেবেই দেখছে। শুধুমাত্র ফানা, আল্লাহর পরিচালনাগত বিষয়াদি প্রত্যক্ষ করা থেকে বিরত থাকা, উপকরণ, কারণ আর মাধ্যম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার মধ্যেই ভূরি ভূরি জ্ঞানের ভান্ডার, মা'রিফাত আর দাসত্ব নিহিত নেই। পূর্ণাঙ্গ মা'রিফাত, দাসত্ব আর ইবাদাত-বন্দেগি কি কেবল এই সমস্ত বস্তুর মধ্যেই রয়েছে? অথচ পুরা কুরআনই আল্লাহ তাআলার নিদর্শনাবলি সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করা, সৃষ্টিজগতের অবস্থার প্রতি দৃষ্টি দেওয়া, মানুষের নিজের শরীর ও তার বিভিন্ন অবস্থা সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ করা ইত্যাদির আলোচনায় ভরপুর।
এর চেয়েও বিশেষ ব্যাপার হলো সেসব বিষয়, যা বান্দা আখিরাতের জন্য অগ্রীম পাঠিয়েছে তা পর্যবেক্ষণ করা, আল্লাহ তাআলা বান্দাকে ঈমান, নেককাজ করার তাওফীক ও হিদায়াতের দ্বারা যে নিয়ামাত দান করেছেন তা স্মরণ করা, তাতে চিন্তা-ফিকির করা, এর জন্য আল্লাহ তাআলার প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা আদায় করা। এগুলো ফানা ও ফানা-সংশ্লিষ্ট বিষয়াদির সাথে কখনো অর্জন করা সম্ভব নয়।
তারপর কথা হলো আপনাদের বক্তব্য সত্যিকারার্থে বাস্তবায়ন করা একটি অসম্ভব ব্যাপার-আপনারা বলেছেন তাওবার বিষয়টি দেখতে পাওয়া একটি ইল্লত বা দোষ, এ থেকে আবার তাওবা করা জরুরি। এটি অসম্ভব হওয়ার কারণ হিসেবে বলব, তার সেই প্রত্যক্ষ করাকে প্রত্যক্ষ করাও তো একটি দোষের ব্যাপার; যা থেকে তাওবা করা আবশ্যক। এমনিভাবে সেই দেখতে পাওয়াও একটি দোষ; তা থেকেও তাওবা করা জরুরি। এ রকমভাবে বিষয়টি একের পর এক অবিরামভাবে চলতেই থাকবে। সার্বিকভাবে এর প্রতি কোনো রকম ভ্রুক্ষেপ না করার মাধ্যমেই কেবল এটি শেষ হতে পারে। এই রকম পাগলামি আর বিলুপ্তি তো দাসত্বেরই বিপরীত ও বিরোধী, সুতরাং এগুলো ইবাদাত-বন্দেগি আর দাসত্বের চূড়ান্ত গন্তব্য হয় কীভাবে?
সুতরাং এখন আপনি সালাতের ভেতরের বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিতভাবে চিন্তা- ফিকির করলে বুঝতে পারবেন যে, সেগুলো প্রত্যক্ষ না করলে তা পরিপূর্ণ হয় না। (যেগুলো থেকে আপনি অনুপস্থিত থাকলে দাসত্বের ক্ষেত্রে তা ত্রুটিপূর্ণ বলে বিবেচিত হবে।) দেখুন, সালাত আদায়কারী সালাত আদায়ের শুরুতে বলবে,
إِنِّي وَجَهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيفًا
"আমি একনিষ্ঠভাবে নিজের চেহারা সেই সত্তার দিকে ফিরিয়ে নিলাম, যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন।” [৬৫]
এই কথার দাসত্ব হবে: তার চেহারার বিষয়টি প্রত্যক্ষ করা আর তা হলো তার ইচ্ছা ও নিয়ত। এমনিভাবে হানাফিয়্যাতও প্রত্যক্ষ করবে আর তা হলো আল্লাহর প্রতি তার একনিষ্ঠতা। এরপর সে বলবে,
إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
"আমার সালাত, আমার যাবতীয় ইবাদাত, আমার জীবন, আমার মরণ সবকিছুই বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহর জন্য।”[৬৬]
এই কথার দাসত্ব হলো: সে তার সালাত ও অন্যান্য ইবাদাত যা একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্যই নিবেদিত তা প্রত্যক্ষ করবে। এখন যদি সে তা থেকে অনুপস্থিত থাকে, তা হলে সে আল্লাহর কাছে মুখে এমন কথা বলছে; যা থেকে তার অন্তর শূন্য, সুতরাং কীভাবে এটা সেই ব্যক্তির চেয়ে পরিপূর্ণ ও উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হবে, যে তার অন্তরকে কাজকর্ম ও দাসত্বের সাথে নিবেদিত রাখে, সেগুলোকে সে আল্লাহর প্রতি সম্পৃক্ত করে এবং এটাও প্রত্যক্ষ করে যে, সেগুলো একমাত্র আল্লাহ তাআলারই জন্য?! (সত্যিকারার্থেই এই দুইজনের মধ্যে রয়েছে অনেক ব্যবধান।)
তবে ফানার অধিকারী ব্যক্তির পরিণতি ও চূড়ান্ত অবস্থা হিসেবে বলা যায় সে অক্ষম; তার মাকাম সর্বোচ্চ ও সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ তা কশ্চিনকালেও নয়। এমনিভাবে যখন সে তিলাওয়াত করবে,
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
"আমরা কেবল তোমারই দাসত্ব করি, আর তোমার কাছেই সাহায্য চাই।”[৬৭]
এই কথার দাসত্ব হবে: ইবাদাত করা ও সাহায্য প্রার্থনা করার অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা, এ দুটি বিষয়কে অন্তরে উপস্থিত রাখা, তা কেবল আল্লাহর জন্যই নিবেদন করা এবং তিনি ব্যতীত অন্য সবার থেকে প্রত্যাখ্যান করা। এই বিষয়টি অন্তর অনুপস্থিত রেখে, শুধু মুখে মুখে উচ্চারণ করার চেয়ে পরিপূর্ণ।
এমনিভাবে যখন সে তার রুকূতে গিয়ে বলবে, اللَّهُمَّ لَكَ رَكَعْتُ وَبِكَ آمَنْتُ وَلَكَ أَسْلَمْتُ خَشَعَ لَكَ سَمْعِي وَبَصَرِي وَمُخِّي وَعَظْمِي وَعَصَبِى وَمَا اسْتَقَلَّتْ بِهِ قَدَمَى
“হে আল্লাহ, তোমার উদ্দেশ্যে রুকূ করলাম, তোমার প্রতি ঈমান আনলাম এবং তোমার কাছে আত্মসমর্পণ করলাম। আমার কান, চোখ, মগজ, হাড়, স্নায়ুতন্ত্র এবং আমার দু'পা যা বহন করে-সবই তোমার কাছে বিনত হলো।” [৬৮]
সুতরাং এই কথাগুলোর দাসত্ব কীভাবে আদায় করবে সেই ব্যক্তি, যে তার কাজকর্ম থেকে অনুপস্থিত, যে রয়েছে তার ফানার মধ্যে নিমজ্জিত? এগুলো তা হলে তার মুখে উচ্চারিত কিছু আওয়াজ ব্যতীত আর কী? যদি অপারগতা ও ওজর না থাকত, তা হলে এগুলো দাসত্ব ও ইবাদাত হিসেবেই গণ্য হতো না। (পরিপূর্ণ অবস্থা হওয়া তো দূরের কথা!)
তবে এ কথা অস্বীকার করা যায় না যে, বান্দার নিজের কাজকর্ম প্রত্যক্ষ করা, সেখানেই থেমে থাকা, সেগুলোর কারণে প্রকৃত নিয়ামাতদাতা, তাওফীকদাতা ও অনুগ্রহকারী সত্তা থেকে দূরে থাকা অনেক বড়ো ত্রুটি এবং দাসত্বের পথে অনেক বড়ো প্রতিবন্ধক। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
يَمُنُّوْنَ عَلَيْكَ أَنْ أَسْلَمُوا قُل لَّا تَمُنُّوْا عَلَيَّ إِسْلَامَكُمْ بَلِ اللَّهُ يَمُنُّ عَلَيْكُمْ أَنْ هَدَاكُمْ لِلْإِيْمَانِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ
“তারা মুসলমান হয়ে আপনাকে ধন্য করেছে বলে মনে করে। আপনি বলুন, 'তোমরা মুসলমান হয়ে আমাকে ধন্য করেছ বলে মনে কোরো না; ঈমানের পথে পরিচালিত করে বরং আল্লাহ তোমাদেরকেই ধন্য করেছেন, যদি তোমরা সত্যনিষ্ঠ হয়ে থাকো।” [৬৯]
সুতরাং আরিফ বা আল্লাহর মা'রিফাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ তাদের দাসত্বকে প্রত্যক্ষ করার পাশাপাশি আল্লাহ তাআলা যে দয়া ও অনুগ্রহ তাদের প্রতি করেছেন, তাতে তারা নিমগ্ন থাকেন। জাহিল-মূর্খরা আল্লাহর অনুগ্রহের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া থেকে গাফিল ও অন্যমনস্ক থাকে। আর ফানার গুণে গুণান্বিত ব্যক্তি নিমগ্ন থাকেন শুধু আল্লাহর প্রতি, (সে আর কিছু দেখে না) অথচ তা আল্লাহ তাআলার বিধান অনুসারেই অসম্পূর্ণ। কারণ আল্লাহ তাআলা প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি আদর্শ ও ভারসাম্যপূর্ণ পরিমাণ নির্ধারিত করে দিয়েছেন।

টিকাঃ
[৬৩] 'মানযিলুস সায়িরীন'-গ্রন্থের লেখক প্রতিটি মানযিলকে তিনটি স্তরে ভাগ করেছেন: ১. সাধারণ ব্যক্তিদের মানযিল, ২. বিশেষ ব্যক্তিদের মানযিল এবং ৩. অতি বিশেষ ব্যক্তিদের মানযিল; যা ফানার মানযিলে পৌঁছে দেবে। ইবনুল কাইয়্যিম এই পদ্ধতি ও প্রকারভেদকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই আলোচনাটিই হলো তার নমুনা। এটার ওপরই বাকিগুলোকে ধারণা করে নিন। কারণ এই গ্রন্থে এই বিষয়ে আর কোথাও আলোচনা করা হয়নি।
[৬৪] সাধারণ ও মধ্যম শ্রেণির তাওবার উল্লেখের পর এটি অতি বিশেষ শ্রেণির ব্যক্তিদের তাওবার আলোচনা।
[৬৫] সূরা আনআম, ৬: ৭৯।
[৬৬] সূরা আনআম, ৬: ১৬২।
[৬৭] সূরা ফাতিহা, ১:৫।
[৬৮] মুসলিম, ৭৭1।
[৬৯] সূরা হুজুরাত, ৪৯: ১৭।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 তাওবার কতিপয় আহকাম

📄 তাওবার কতিপয় আহকাম


এখন তাওবার সাথে সম্পর্কিত কিছু আহকাম নিয়ে আলোচনা করব; যার প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি; যার থেকে অজ্ঞ থাকা বান্দার পক্ষে শোভনীয় নয়।
এক. খুব দ্রুত গুনাহ থেকে তাওবার দিকে ধাবিত হওয়া বান্দার ওপর তাৎক্ষণিকভাবে ফরজ; তাওবা করতে বিলম্ব করা জায়িয নয়।
যে ব্যক্তি তাওবা করতে দেরি করে, তার জন্য দেরি করার আলাদা একটি গুনাহ লেখা হয়। সুতরাং যখন সে গুনাহ থেকে তাওবা করে, তখন তার ওপর আরেকটি তাওবা অবশিষ্ট থেকে যায়; সেটি হলো তাওবা করতে দেরি করার কারণে তাওবা। তাওবাকারীর অন্তরে এই বিষয়টি খুব কমই আসে। বরং সে মনে করে গুনাহ থেকে তাওবা করলে তার ওপর আর কিছুই বাকি থাকে না; অথচ বিলম্বে তাওবা করার গুনাহটি তার নামে থেকেই যায়।
এর থেকে কেবল তখনই মুক্তি মিলবে, যখন জানা-অজানা সব ধরনের গুনাহ থেকে ব্যাপকভাবে তাওবা করবে। কারণ বান্দার জানা গুনাহের থেকে অজানা গুনাহের পরিমাণই বেশি। আর যখন জানার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেউ অজ্ঞ থাকে, তখন তার সেই অজ্ঞতা তাকে শাস্তির মুখোমুখি হওয়া থেকে বাঁচাতে পারবে না। কারণ জ্ঞান অর্জন না করা এবং সে অনুযায়ী আমল না করার অপরাধে সে অপরাধী। ফলে মূর্খ ব্যক্তির ক্ষেত্রে গুনাহের পরিমাণ যেমন বেশি, তেমনি ভয়াবহ। একটি হাদীসে এসেছে, আবূ বকর -কে উদ্দেশ্য করে রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
يَا أَبَا بَكْرٍ، لَلشَّرْكُ فِيْكُمْ أَخْفَى مِنْ دَبِيْبِ النَّمْلِ
“হে আবূ বকর, নিশ্চয় শির্ক পিঁপড়ার হেঁটে চলা থেকেও বেশি গোপনে তোমাদের মধ্যে লুকিয়ে থাকে।"
আবূ বকর বললেন, 'আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে ইলাহ্ সাব্যস্ত করা ছাড়াও কি শির্ক আছে?'
নবি তার জবাবে বললেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَلشَّرْكُ أَخْفَى مِنْ دَبِيْبِ النَّمْلِ، أَلَا أَدُلُّكَ عَلَى شَيْءٍ إِذَا قُلْتَهُ ذَهَبَ عَنْكَ قَلِيْلُهُ وَكَثِيرُهُ؟
“সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! শির্ক পিপীলিকার পদধ্বনির চেয়েও সূক্ষ্ম। আমি কি তোমাকে এমন কিছু শিখিয়ে দেবো না, যা বললে তোমার থেকে অল্পবেশি সব শির্কই দূর হয়ে যাবে?” তিনি বললেন, 'তা হলে তুমি এই দুআ পাঠ কোরো,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُ بِكَ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ وَأَنَا أَعْلَمُ، وَأَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لَا أَعْلَمُ
“হে আল্লাহ, আমি সজ্ঞানে তোমার সাথে শিরক করা থেকে তোমার কাছে আশ্রয় চাই এবং যা আমার অজানা তা থেকেও তোমার কাছে ক্ষমা চাই।”[৭০]
এটি হলো সেই বিষয় থেকে ক্ষমা প্রার্থনা, যা আল্লাহ জানে যে সেটা গুনাহ কিন্তু বান্দা তা জানে না।
দুই. কোনো গুনাহে অটল থাকাবস্থায় আরেকটি গুনাহ থেকে তাওবা করলে তা কি বিশুদ্ধ হবে?
এ ব্যাপারে আলিমদের দুটি মতামত রয়েছে; যা ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল -এর দুটি রিওয়ায়াত।
মাসআলাটির মূলকথা হলো: তাওবা গুনাহের মতো খণ্ড খণ্ড হয় কি না; ফলে এক দিক থেকে তাওবাকারী বলে গণ্য হবে, আবার অন্য দিক থেকে হবে না; নাকি ঈমান ও ইসলামের মতো অখণ্ডনীয়? অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মত হলো তাওবা খণ্ড খণ্ড হয়; যেমন তা গুণগত মানের দিক দিয়ে বিভিন্ন রকম হয়, তেমনি পরিমাণের দিক দিয়েও কমবেশ হয়। বান্দা যদি একটি ফরজ আমল আদায় করে আর অন্য একটি ছাড়ে, তা হলে সে যা পরিত্যাগ করে তার জন্য শাস্তির মুখোমুখি হবে; যা আদায় করেছে তার জন্য নয়। ঠিক তেমনি যখন একটি গুনাহ থেকে তাওবা করে এবং অন্য একটি গুনাহে অটল থাকে। কারণ দুটি গুনাহ থেকেই তাওবা করা ফরজ। সে এর একটি আদায় করেছে এবং একটি ছেড়ে দিয়েছে। সুতরাং যা ছেড়ে দিয়েছে তার কারণে যা আদায় করেছে তা বাতিল হবে না; যেমন কেউ হাজ্জের ফরজ আদায় করেনি; কিন্তু সালাত, সিয়াম ও যাকাত ঠিকমতো পালন করেছে।
এই মাসআলার ক্ষেত্রে আমার অভিমত হলো: অনুরূপ গুনাহে লিপ্ত থাকা অবস্থায় সেরকম কোনো একটি গুনাহ থেকে তাওবা করলে, সে তাওবা সহীহ হবে না। আর কোনো গুনাহে লিপ্ত থাকা অবস্থায় সেই গুনাহের সাথে সম্পর্কহীন ভিন্ন কোনো একটি গুনাহ থেকে তাওবা করলে, সে তাওবা সহীহ বলে গণ্য হবে। যেমন: কেউ যদি সুদ থেকে তাওবা করে, কিন্তু মদপান থেকে তাওবা না করে; তা হলে তার সুদ থেকে তাওবা সহীহ ও বিশুদ্ধ। অপরদিকে কেউ যদি নগদসুদ থেকে তাওবা করে, কিন্তু বাকিসুদ থেকে তাওবা না করে অথবা গাঁজা খাওয়া থেকে তাওবা করে, কিন্তু মদপান থেকে তাওবা না করে, অথবা এর উল্টোটা করে, তা হলে তার তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে না।
তিন. তাওবা সহীহ হওয়ার জন্য কি এটাও শর্ত যে, সেই গুনাহে আর কোনো দিন কখনো লিপ্ত হতে পারবে না, নাকি এটা তাওবার শর্ত নয়?
কেউ কেউ সেই গুনাহে অভ্যস্ত না হওয়াকে শর্ত করেছেন। তারা বলেছেন, যদি আবার তাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তা হলে বোঝা যাবে তার আগের তাওবা বাতিল ছিল, সহীহ ছিল না।
আর অধিকাংশের মত হলো: এটি তাওবা সহীহ হওয়ার জন্য কোনো শর্ত নয়। কারণ তাওবার শুদ্ধতা নির্ভর করে তিনটি বিষয়ের ওপর- ১. তাৎক্ষণিকভাবে সেই গুনাহ পরিত্যাগ করা, ২. তার ওপর অনুতপ্ত হওয়া এবং ৩. পরবর্তীকালে তাতে আর লিপ্ত না হওয়ার দৃঢ় সংকল্প করা।
চার. অপরাধকারীর মাঝে ও অপরাধ সংঘটনের কারণসমূহের মাঝে যখন কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয় এবং সে তাতে লিপ্ত হওয়ার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে যে, তার থেকে অপরাধ সংঘটিত হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে; এমতাবস্থায় কি তার তাওবা সহীহ হবে? এই ব্যক্তির অবস্থা হয় ঠিক তেমনই, যেমন কোনো মিথ্যাবাদী, অপবাদ-দানকারী বা মিথ্যা-সাক্ষ্যদানকারীর জিহ্বা নষ্ট হয়ে যায়, কোনো ব্যভিচারকারীর গোপনাঙ্গ কেটে ফেলা হয়, কোনো চোরের চার হাত-পা অকেজো হয়ে যায়, কোনো জালকারীর হাত অবশ হয়ে যায়, কোনো ব্যক্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, তার আর গুনাহে জড়িয়ে পড়ার মতো অবস্থা থাকে না।
এই ব্যাপারে দুটি অভিমত রয়েছে: একদল বলেছেন, তার তাওবা সহীহ হবে না। কারণ তাওবা তো সেই ব্যক্তির কাছ থেকেই সহীহ হবে, যে গুনাহও করতে পারে আবার তা থেকে বেঁচেও থাকতে পারে। সুতরাং তাওবা সম্ভাবনাময় স্থান থেকে হতে হবে, অসম্ভব কিছু থেকে নয়। আর এ কারণেই পাহাড়কে আপন স্থান থেকে সরিয়ে দেওয়া, সমুদ্র শুকিয়ে ফেলা, আকাশে উড়া এবং এ রকম বিভিন্ন বিষয় থেকে তাওবা করার কল্পনাও করা হয় না।
তারা বলে, এর আরেকটি কারণ হলো, তাওবা হচ্ছে নফসের আহ্বানের বিরোধিতা করা আর সত্যের আহ্বানে সাড়া দেওয়া। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে তো নফসের কোনো আহ্বানই থাকে না। কারণ এখানে কোনো কার্যসম্পাদন করা নফসের পক্ষে সম্ভবই নয়।
দ্বিতীয় মতটি হলো—আর এটিই সঠিক মত—এ রকম ব্যক্তির তাওবা সহীহ ও সম্ভব; বরং বাস্তবসম্মত। কারণ তাওবার সবকটি ভিত্তিই এখানে উপস্থিত আর সে যেটার ওপর সক্ষম, তা হলো অনুতাপ-অনুশোচনা করা। কারণ হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, اَلنَّدَمُ تَوْبَةٌ “অনুতপ্ত হওয়াই তাওবা।”[৭১] সুতরাং গুনাহের ওপর যখন তার অনুশোচনা এবং নফসের ওপর যখন তার তিরস্কার পাওয়া গেল, তখন এটাই হলো তার তাওবা। আর কীভাবেই-বা তার থেকে তাওবাকে প্রত্যাখ্যান করা হবে, যখন সে গুনাহের ওপর প্রচণ্ড অনুতপ্ত হয় এবং এ কারণে নিজের নফসকে বেশ তিরস্কার করে। বিশেষ করে যখন এর সাথে কান্নাকাটি, পেরেশানি, ভয়, দৃঢ় ইচ্ছা এবং তার এই নিয়ত যুক্ত হয় যে, সে যদি সুস্থ থাকত এবং কাজটি করার সক্ষমতা থাকত, তা হলেও অবশ্যই সে তা থেকে বিরত থাকত। (এমন অবস্থাতে তার তাওবা অগ্রহণযোগ্য হওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।)
আবার নবি ﷺ নিয়ত সহীহ থাকার কারণে নেককাজে অক্ষম ব্যক্তিকেও সক্ষম ও নেককাজ সম্পাদনকারীর সমান গণ্য করেছেন। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছে, নবি ﷺ বলেছেন, إِذَا مَرِضَ الْعَبْدُ أَوْ سَافَرَ كُتِبَ لَهُ مِثْلُ مَا كَانَ يَعْمَلُ مُقِيمًا صَحِيحًا “যখন বান্দা অসুস্থ হয় কিংবা সফরে থাকে, তখন তার জন্য সে নিজগৃহে সুস্থ থাকাবস্থায় যে আমল করত, তার অনুরূপ আমলের সাওয়াবই লেখা হয়।”[৭২]
এমনিভাবে 'সহীহ মুসলিম'-এর আরেকটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবি ﷺ যুদ্ধরত সাহাবিদের বলেছেন,
إِنَّ بِالْمَدِينَةِ لَرِجَالًا مَا سِرْتُمْ مَّسِيرًا وَلَا قَطَعْتُمْ وَادِيًا إِلَّا كَانُوْا مَعَكُمْ حَبَسَهُمُ الْمَرَضُ “মদীনায় এমন কিছু লোক রয়েছে, তোমরা যে পথই পাড়ি দাও আর যে উপত্যকাই অতিক্রম করো, তারা তোমাদের সঙ্গে রয়েছে। কেবল রোগব্যাধিই তাদের বাধা দিয়ে রেখেছে।”[৭৩]
হাদীসে এ রকম আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে। সুতরাং যে ব্যক্তি গুনাহ করতে অক্ষম, বাধ্য হয়েই তা পরিত্যাগ করছে—কিন্তু সে এই নিয়ত রাখে যে, সক্ষম হলেও ইচ্ছা করেই গুনাহ থেকে বিরত থাকবে—এমন ব্যক্তিকে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও স্বেচ্ছায় গুনাহ পরিত্যাগকারী ব্যক্তিদের স্তরে গণ্য করাই উত্তম।
পাঁচ: মানুষের হক নষ্ট করে কেউ যদি তা থেকে তাওবা করে, তা হলে তার জন্য জরুরি হলো : সেই হক থেকে নিজেকে মুক্ত করা; হয়তো সরাসরি হক আদায় করার মাধ্যমে অথবা সেই ব্যক্তিকে জানিয়ে তার থেকে হালাল করে নেওয়ার মাধ্যমে। যদিও তা অর্থসংক্রান্ত বা কারও শরীরে আঘাত দেওয়া বা কারও ওয়ারিশের শরীরে আঘাত দেওয়া হোক না কেন। যেমন নবী থেকে প্রমাণিত, তিনি বলেছেন,
مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لِأَخِيهِ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ شَيْءٍ فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ الْيَوْمَ قَبْلَ أَنْ لَا يَكُونَ دِينَارٌ وَلَا دِرْهَمْ إِنْ كَانَ لَهُ عَمَلَ صَالِحٌ أُخِذَ مِنْهُ بِقَدْرِ مَظْلَمَتِهِ وَإِنْ لَمْ تَكُنْ لَّهُ حَسَنَاتٌ أُخِذَ مِنْ سَيِّئَاتِ صَاحِبِهِ فَحُمِلَ عَلَيْهِ
“যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের মান-সম্মান অথবা অন্য কোনো বিষয়ে জুলুম করে, সে যেন আজই তার নিকট হতে সে ব্যাপারে ক্ষমা চেয়ে নেয়, সেদিন আসার পূর্বেই, যেদিন তার না কোনো দীনার থাকবে আর না কোনো দিরহাম। সেদিন যদি তার কোনো নেক আমল থাকে, তা হলে তার জুলুমের সমপরিমাণ তার নিকট হতে তা নিয়ে নেওয়া হবে। আর যদি তার কোনো নেক আমল না থাকে, তা হলে তার সেই সঙ্গীর পাপরাশি হতে সেই পরিমাণ পাপ নিয়ে তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।”[৭৪]
যদি কারও সম্মানহানি, গীবত বা অপবাদ দেওয়ার মাধ্যমে জুলুম করা হয়, তা হলে এর থেকে তাওবা করার জন্য কি এই শর্ত রয়েছে যে, সে ব্যক্তিকে সেই সব গুনাহের নাম ধরে নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করতে হবে এবং তার থেকে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে? নাকি নির্দিষ্ট না করে তাকে জানিয়ে দেওয়া যে, তার সম্মানে আঘাত করা হয়েছে? নাকি এ দুটোর কোনোটাই শর্ত নয়; বরং কোনো প্রকার জানানো ব্যতীত আল্লাহর নিকট তাওবা করাই যথেষ্ট হবে?
ইমাম শাফিয়ি, ইমাম আবূ হানীফা ও ইমাম মালিক -এর মাযহাবে প্রসিদ্ধ মত হলো— জানানো ও ক্ষমা চাওয়া তাওবার শর্তের অন্তর্ভুক্ত। তাদের সঙ্গীসাথিরা তাদের কিতাবে এভাবেই উল্লেখ করেছেন।
যারা এটিকে শর্ত হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন, তারা দলীল দেন যে, এই গুনাহটি হলো বান্দার হকসম্পর্কিত। সুতরাং তার পক্ষ থেকে ক্ষমা ও মুক্তি না পাওয়া পর্যন্ত তা রহিত হবে না।
আরেকটি মত হলো— সম্মানহানি করা, গীবত করা, অপবাদ দেওয়া ইত্যাদি সম্পর্কে জানিয়ে দেওয়া তাওবা করার জন্য শর্ত নয়। বরং বান্দা ও আল্লাহর মাঝে তাওবাই যথেষ্ট। তবে যে সমস্ত জায়গায় ব্যক্তির গীবত করা হয়েছে এবং অপবাদ দেওয়া হয়েছে, সে সমস্ত জায়গায় তার প্রশংসা করবে, তার ভালো গুণসমূহের আলোচনা করবে, তার পবিত্রতা ও নির্দোষিতা বর্ণনা করবে এবং যে পরিমাণ গীবত ও অপবাদ দেওয়া হয়েছে, তার জন্য সে পরিমাণ আল্লাহ তাআলার নিকট ইস্তিগফার করবে। এই মতটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন আমাদের শাইখ আবুল আব্বাস ইবনু তাইমিয়্যা ।
এই মতাবলম্বীগণ প্রমাণ পেশ করেন যে, তাকে জানিয়ে দেওয়া কেবল অনিষ্ট ও ক্ষতিই ডেকে আনবে, কোনো উপকার বয়ে আনবে না। কারণ এর মাধ্যমে ব্যক্তি নতুন করে কষ্ট পাবে, অন্তরে অশান্তি ও অস্থিরতার সৃষ্টি হবে। অথচ তা শোনার পূর্বে সে নির্ভাবনায় ছিল। অনেক সময় যখন সে তার সম্মানহানি, অপবাদের কথা শুনবে, তখন হয়তো তা সহ্য করতে পারবে না; ফলে তার মানসিক বা শারীরিক কোনো ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
ছয়. যে ব্যক্তি কোনো বিষয়ে সীমালঙ্ঘন করে, পরে তার জন্য তা আদায় করা দুষ্কর ও কঠিন হয়ে পড়ে এবং এর প্রতিকার করাও সম্ভব হয় না; অতঃপর সে তাওবা করে, তা হলে তার তাওবার হুকুম কী এবং কীভাবে সে তাওবা করবে? এটি আল্লাহর হক ও বান্দার হক উভয় ক্ষেত্রেই হতে পারে।
আল্লাহর হকের ক্ষেত্রে: যেমন- কেউ সালাত আদায় করা ফরজ জানা সত্ত্বেও কোনো ওজর ছাড়া ইচ্ছা করেই সালাত ছেড়ে দিলো, তার পর তাওবা করল এবং অনুতপ্ত হলো। সালাফগণ এই মাসআলার ক্ষেত্রে ইখতিলাফ করেছেন।
একদল বলেছেন, তার তাওবা হবে অনুশোচনা ও লজ্জিত হওয়া, ভবিষ্যতের ফরজগুলো আদায় করা এবং যেগুলো ছেড়ে দিয়েছে, সেগুলোর কাযা আদায় করার মাধ্যমে। চার ইমামসহ আরও অনেক ইমামের অভিমত এমনই।
আরেকদল বলেছেন, তার তাওবা হবে ভবিষ্যতের ফরজ সালাতগুলো আদায় করার মাধ্যমে। আর যা পরিত্যাগ করেছে, তা কাযা আদায় করার দ্বারা কোনো উপকার হবে না এবং তা কবুলও করা হবে না। সুতরাং কাযা আদায় করা ওয়াজিব নয়। এটি হলো যাহিরি মাযহাব অবলম্বীদের অভিমত। এটি সালাফের অনেকের নিকট থেকেই বর্ণিত হয়েছে।
যারা কাযাকে ওয়াজিব বলেছেন তাদের দলীল হলো নবি -এর বাণী-
مَنْ نَّسِيَ صَلَاةٌ فَلْيُصَلِّهَا إِذَا ذَكَرَهَا لَا كَفَّارَةً لَهَا إِلَّا ذَلِكَ
“কেউ কোনো সালাত আদায় করতে ভুলে গেলে যখন তা স্মরণ হবে, তখনই সে যেন তা আদায় করে নেয়। এর কাফফারা কেবল এটিই।”[৭৫]
তারা বলেন, ঘুমন্ত ও ভুলে যাওয়া ব্যক্তির কোনো সীমালঙ্ঘন না থাকা সত্ত্বেও হাদীসে যখন তাদের ওপর কাযা আদায় করা ওয়াজিব করা হয়েছে, তখন যে ব্যক্তি সীমালঙ্ঘন করে স্বেচ্ছায় সালাত ছেড়ে দেয়, তার ওপর ওয়াজিব হওয়া তো বাস্তবসম্মত ও যুক্তির দাবি।
প্রথম মতাবলম্বীরা বলেন, কোনো ইবাদাত সম্পর্কে যখন কোনো নির্দিষ্ট সিফাতের ওপর বা নির্দিষ্ট সময়ে তা আদায় করার আদেশ করা হয়, তখন আদেশপ্রাপ্ত ব্যক্তি কেবল তখনই পরিপূর্ণরূপে সেই আদেশ পালন করতে পারবে, যখন যেভাবে যে সিফাতের সাথে যে সময়ে তা পালন করার আদেশ করা হয়েছে, ঠিক সেভাবেই সে তা আদায় করে। সুতরাং নির্দিষ্ট সময় না থাকার মানে শর্ত ও সিফাতও না থাকা। তাই বলা যায়, নির্দিষ্ট সময়ে আদায় না করলে যথাযথভাবে তা আদায় হয় না।
তারা বলেন, সালাতকে তার ওয়াক্ত থেকে বের করা, কিবলা-অভিমুখী হওয়া থেকে বের করার মতোই।
বান্দার হকের ক্ষেত্রে যেমন: কেউ কারও অনেকগুলো অর্থ-সম্পদ আত্মসাৎ করল, তারপরে এক সময় গিয়ে তাওবা করল, কিন্তু এখন সেগুলোর প্রকৃত মালিক বা তাদের ওয়ারিশদের বের করা তার জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে; তাদের না চেনার কারণে বা তাদের কেউ মারা যাওয়ার কারণে বা অন্য কোনো কারণে। এই ব্যক্তির মতো পরিস্থিতি যাদের, তাদের তাওবার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে।
একদল বলেছেন, প্রকৃত মালিকের নিকট এই অর্থকড়ি না পৌঁছানো পর্যন্ত তার কোনো তাওবা নেই। যখন তা অসম্ভব হয়ে যাবে, তখন তার তাওবাও অসম্ভব হয়ে পড়বে। এর থেকে মুক্তি মিলবে কেবল কিয়ামতের দিন; পূণ্য-পাপের অদলবদলে।
আরেকদল বলেছেন, এই ব্যক্তির জন্যও তাওবার দরজা উন্মুক্ত রয়েছে। আল্লাহ তাআলা এই ব্যক্তির জন্য তাওবার দরজা বন্ধ করেননি এবং অন্যান্য গুনাহগারদের জন্যও না। এই ব্যক্তির তাওবা হলো-সে তার আত্মসাৎকৃত মাল-সম্পদগুলো প্রকৃত মালিকের নামে আল্লাহর রাস্তায় সদাকা করে দেবে। ফলে যখন সমস্ত হক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আদায় করার দিন (কিয়ামাতের দিন) আসবে, তখন তাদের ইখতিয়ার থাকবে যে, তারা চাইলে এই ব্যক্তি যে কাজ করেছে, তার অনুমোদন দিয়ে সদাকার যে সাওয়াব হয়েছে তার অধিকারী হবে আবার চাইলে অনুমোদন না দিয়ে তাদের সম্পদের সমপরিমাণ সাওয়াব সেই ব্যক্তির কাছ থেকে নিয়ে নেবে আর সেই ব্যক্তি এই দান-সদাকার সাওয়াব পেয়ে যাবে। কারণ আল্লাহ তাআলা কোনো নেক আমলের সাওয়াব নস্যাৎ করে দেন না। আবার সম্পদের মালিকদের জন্য সম্পদ দান করার সাওয়াব এবং ওই ব্যক্তির কাছ থেকে নেক আমল নিয়ে নেওয়া-এই দুই প্রতিদানকেও একত্রিত করবেন না। তারা দুটোর যেকোনো একটি পাবে।
অনেক সাহাবি-ও এই মত পোষণ করেছেন।

টিকাঃ
[৭০] বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ৭২১।
[৭১] ইবনু মাজাহ, ৪২৫২; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৩৫৬৮।
[৭২] বুখারি, ২৯৯৬।
[৭৩] মুসলিম, ১৯১১।
[৭৪] বুখারি, ২৪৪৯।
[৭৫] বুখারি, ৫৯৭; মুসলিম, ৬৮৪।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 ইস্তিগফার ও তাওবার প্রকৃত মর্ম

📄 ইস্তিগফার ও তাওবার প্রকৃত মর্ম


এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 তাওবার আলোচনা

📄 তাওবার আলোচনা


অধিকাংশ মানুষ তাওবার তাফসীর করে থাকে তিনটি বিষয়ের মাধ্যমে—গুনাহে লিপ্ত না হওয়ার দৃঢ় সংকল্প করা, তাৎক্ষণিকভাবে তা থেকে বিরত থাকা এবং অতীতের করা-গুনাহের ওপর অনুতপ্ত হওয়া। আর যদি বান্দার হকসংক্রান্ত হয়, তা হলে চতুর্থ আরেকটি বিষয় জরুরি তা হলো: বান্দার কাছ থেকে বৈধ করে নেওয়া।
তারা যে বিষয়গুলো উল্লেখ করে থাকেন, তা হলো তাওবার কিছু অংশ বা শর্ত। অন্যথায় আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বাণীতে এগুলো অন্তর্ভুক্ত থাকার সাথে সাথে আরেকটি বিষয়ও রয়েছে। তা হলো—সেই গুনাহের বিপরীতে যে বিষয়ের আদেশ করা হয়েছে, তা করার সুদৃঢ় ইচ্ছা ও তা পালন করাকে নিজের ওপর অপরিহার্য করে নেওয়া। সুতরাং শুধু গুনাহ থেকে বিরত থাকা, পুনরায় তাতে লিপ্ত না হওয়ার দৃঢ় সংকল্প করা এবং অনুশোচনার মাধ্যমে কেউ তাওবাকারী বলে গণ্য হয় না; যতক্ষণ-না যা করতে আদেশ করা হয়েছে, তা পালন করতে তার কাছ থেকে সুদৃঢ় প্রতিজ্ঞা পাওয়া যায়। এটিই হলো তাওবার প্রকৃত মর্ম। তাওবা হলো এই দুটি বিষয়ের সম্মিলিত নাম। তবে যদি আদেশকৃত বিষয়টি এর সাথে সংযুক্ত থাকে, তা হলে তারা যা উল্লেখ করেন, তা-ই উদ্দেশ্য হবে। আর যদি সংযুক্ত না হয়ে আলাদাভাবে আসে, তা হলে দুটি বিষয়ই এর অন্তর্ভুক্ত হবে।
এটি হলো ‘তাকওয়া’ (اتَّقوى) শব্দটির মতো; যখন তা আলাদাভাবে আসে, তখন তা আল্লাহ তাআলা যা আদেশ করেছেন তা পালন করা এবং যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা—এ দুটিকেই অন্তর্ভুক্ত করে। আর যদি আদেশকৃত বিষয়ের সাথে তাকওয়া যুক্ত হয়ে আসে, তা হলে তা হারাম থেকে বেঁচে থাকাকে অন্তর্ভুক্ত করে।
কারণ তাওবার মূল অর্থ হলো: আল্লাহর দিকে ফিরে আসা; তিনি যা ওয়াজিব করেছেন, তা আদায় করার মাধ্যমে এবং তিনি যা অপছন্দ ও নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে। সুতরাং অপছন্দনীয় বিষয়াদি থেকে নিজেকে সংযমে রেখে, পছন্দনীয় বিষয়াদির দিকে ধাবিত হওয়ার নামই তাওবা। এখানে দুটি বিষয় রয়েছে; একটি হলো মাকরূহ বা অপছন্দনীয় বিষয় থেকে নিজেকে বিরত রাখা। আরেকটি হলো মাহবুব বা পছন্দনীয় বিষয়ের দিকে ধাবিত হওয়া। আর এ কারণেই আল্লাহ তাআলা আদেশকৃত কাজগুলো পালন করা এবং নিষেধকৃত কাজগুলো পরিত্যাগ করার সাথে সফলতাকে সম্পৃক্ত করে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَتُوْبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُوْنَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ
“হে মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর নিকট তাওবা করো, আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে।”[৭৬]
সুতরাং প্রত্যেক তাওবাকারী ব্যক্তিই সফল; তবে সে ততক্ষণ পর্যন্ত সফল হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত-না তাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তা আদায় করে এবং তাকে যা নিষেধ করা হয়েছে, তা পরিত্যাগ করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَنْ لَّمْ يَتُبْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُوْنَ
"আর যারা তাওবা করে না, তারাই জালিম বা অত্যাচারী।”[৭৭]
হারামে-লিপ্ত-ব্যক্তির মতো আল্লাহর আদেশ-পরিত্যাগকারী ব্যক্তিও জালিম। সুতরাং জুলুম থেকে বেঁচে থাকতে হলে দুটি বিষয়েই তাওবা করতে হবে। উপরিউক্ত আয়াত অনুসারে সমস্ত মানুষ দুই প্রকারে সীমাবদ্ধ-১. তাওবাকারী, ২. জালিম। তাওবাকারী ব্যতীত সবাই জালিম। আর তাওবাকারী ব্যক্তিরা হলেন নিম্নোক্ত আয়াতের গুণে গুণান্বিত-
الْعَابِدُونَ الْحَامِدُونَ السَّائِحُونَ الرَّاكِعُونَ السَّاجِدُونَ الْآمِرُونَ بِالْمَعْرُوْفِ وَالنَّاهُوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَالْحَافِظُونَ لِحُدُودِ اللَّهِ
“ইবাদাতকারী, শোকরগুজার, (দুনিয়ার সাথে) সম্পর্কচ্ছেদকারী, রুকূ ও সাজদা আদায়কারী, সৎকাজের আদেশ দানকারী, মন্দকাজ থেকে নিষেধকারী এবং আল্লাহর দেওয়া সীমাসমূহের হেফাজতকারী।”[৭৮]
আল্লাহর-দেওয়া-সীমারেখা হেফাজত করা হলো তাওবার একটি অংশ। আর তাওবা হলো এই সবগুলো বিষয়ের সমষ্টির নাম। তাওবাকারীকে 'তায়িব' এ কারণেই বলা হয় যে, সে আল্লাহর নিষেধকৃত বস্তুসমূহ থেকে আল্লাহর আদেশকৃত বস্তুর দিকে এবং গুনাহ ছেড়ে তাঁর আনুগত্যের দিকে ফিরে আসে। যেমন পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে।
সুতরাং তাওবাই হলো দ্বীন-ইসলামের হাকীকত। দ্বীনের পুরাটাই তাওবার অন্তর্ভুক্ত। এর দ্বারা তাওবাকারী আল্লাহ তাআলার ভালোবাসার পাত্রে পরিণত হয়। কারণ আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন, পবিত্র-পরিচ্ছন্ন এবং সেই ব্যক্তিদেরও তিনি ভালোবাসেন, যারা তাঁর দেওয়া আদেশগুলো পালন করে আর নিষেধগুলো থেকে বেঁচে থাকে।
তা হলে বুঝা যায়, তাওবা হলো প্রকাশ্যভাবে ও অপ্রকাশ্যভাবে আল্লাহ তাআলা যা অপছন্দ করেন, তা থেকে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্যভাবে তিনি যা পছন্দ করেন সে দিকে ফিরে আসা।
তাওবার মধ্যে ইসলাম, ঈমান, ইহসান-সবই শামিল এবং তা সমস্ত মানযিল ও মাকামকে অন্তর্ভুক্ত করে। আর এ কারণেই প্রতিটি মুমিনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এবং শুরু ও শেষ হলো তাওবা। যেমনটি পূর্বে আলোচিত হয়েছে। এটি হলো সেই উদ্দেশ্য, যার জন্য সমগ্র সৃষ্টিজগৎকে অস্তিত্বে আনা হয়েছে। আদেশ ও তাওহীদ হলো এর একটি অংশ। বরং বলা যায় সবেচেয়ে বড়ো অংশ; যার ওপর এর ভিত্তি।
অধিকাংশ মানুষ তাওবার মর্যাদা ও প্রকৃত মর্মই বোঝে না; ইলমি, আমলি, অবস্থাগতভাবে তা আদায় করা তো অনেক দূরের কথা। আল্লাহ তাআলার নিকট তাওবাকারীদের বিশেষ মর্যাদা ও সম্মান আছে বলেই তিনি তাদের অনেক ভালোবাসেন।
তাওবা যদি পুরা ইসলামি শারীআতকে এবং ঈমানের হাকীকতকে অন্তর্ভুক্ত না করত, তা হলে আল্লাহ তাআলা বান্দার তাওবার কারণে অত বেশি খুশি হতেন না। আসলে সূফিয়ায়ে কেরাম সে সমস্ত মানযিল, মাকাম ও অন্তরের বিশেষ অবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করেন, তা তাওবারই বিস্তারিত বিবরণ ও প্রভাব।

টিকাঃ
[৭৬] সূরা নূর, ২৪: ৩১।
[৭৭] সূরা হুজুরাত, ৪৯: ১১।
[৭৮] সূরা তাওবা, ৯: ১১২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00