📄 ইবাদাতের অহংকার থেকে বাঁচুন
তাওবার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: আল্লাহ তাআলার নাফরমানি থেকে দূরে থাকা, আল্লাহ তাআলাকে ভয় করা, তাঁর আদেশসমূহ পালন করা এবং নিষেধগুলো থেকে বেঁচে থাকা। এর ফলে বান্দা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত নূরের ভিত্তিতে আল্লাহর আনুগত্য করতে থাকে এবং তাঁর নিকট প্রতিদানের আশা করে। এমনিভাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত নূরের ভিত্তিতে অবাধ্যতা ও নাফরমানি পরিত্যাগ করে, তাঁর শাস্তির ভয় করে এবং এর মাধ্যমে ইবাদাত ও আনুগত্যের গৌরব করে না। আসলে ইবাদাত ও তাওবার মাঝে প্রকাশ্য ও গোপন অহংকার আছে। সুতরাং গর্ব-অহংকার করা তার উদ্দেশ্য হয় না। যদিও সে জানে যে, তাওবা ও ইবাদাতের মাধ্যমে তা অর্জিত হয়। যে ব্যক্তি সম্মান অর্জনের জন্য ও গর্ব-অহংকার করার জন্য তাওবা করে, তার তাওবা বেশ ত্রুটিপূর্ণ।
একটি হাদীসে এসেছে, "আল্লাহ তাআলা তাঁর নবিদের মধ্য থেকে একজন নবির নিকট ওহি পাঠিয়েছেন যে, 'আপনি অমুক দুনিয়াবিমুখ বান্দাকে বলুন, 'তোমার দুনিয়াবিমুখতার দ্বারা তো তুমি নিজেরই আরাম-আয়েশকে ত্বরান্বিত করলে। আবার আমার দিকে ধাবিত হয়ে তো তুমি তোমার জন্যই ইজ্জত-সম্মান অর্জন করে নিলে। তা হলে আমার জন্য তুমি কী আমল করলে?' যাহিদ ব্যক্তি বলল, 'হে আমার রব, এগুলোর পরেও কী আমার ওপর আপনার কোনো হক রয়েছে?' আল্লাহ বললেন, 'তুমি কি আমার সন্তুষ্টির জন্য আমার কোনো বন্ধুকে ভালোবেসেছিলে কিংবা আমার সন্তুষ্টির আশায় আমার কোনো শত্রুকে শত্রু হিসেবে নিয়েছিলে? ৫।
অর্থাৎ শান্তি ও সম্মান তোমার অংশ। আর দুনিয়াবিমুখতা ও ইবাদাত-বন্দেগির দ্বারা তুমি তা অর্জনও করে নিয়েছ। কিন্তু আমার হক আদায়ের বিষয়টি কোথায়, আর তা হলো আমার সন্তুষ্টির জন্য বন্ধুত্ব করা এবং আমার সন্তুষ্টির জন্য শত্রুতা করা? আসলে ইলম ও অবস্থার দিক দিয়ে আদেশ-নিষেধের ক্ষেত্রে নিজের অংশ ও রবের অংশ পৃথক করাই কাম্য।
অনেক সাদিক বা সত্যবাদী এমন রয়েছে, যারা কেবল নিজের অংশ অন্বেষণেই ব্যস্ত থাকে। নিজের অংশ ও রবের অংশের মাঝে পার্থক্য করে কেবল তারাই, তাদের মধ্যে যারা বিচক্ষণ। সত্যবাদীদের মধ্যে তাদের সংখ্যা খুবই অল্প; যেমন মানুষের মধ্যে সত্যবাদীদের সংখ্যা অনেক কম।
প্রকাশ্য-কবীরা গুনাহ ও পাপাচার থেকে বেঁচে থাকে এমন অনেক মানুষ আছে, যারা ঠিক সেই রকম (আত্মিক) অনেক কবীরা গুনাহ বা সেগুলোর চেয়ে বড়ো অথবা তার চেয়ে কম বিভিন্ন গুনাহে লিপ্ত। অথচ তাদের অন্তরে এই ধারণাও আসে না যে, তা গুনাহ, এর থেকে তাওবা করা প্রয়োজন। কিন্তু কবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিদের তারা ঠিকই ঘৃণা করে, তুচ্ছ ভাবে। তাদের অবস্থা দেখে মনে হয় তাদের আনুগত্য-ইবাদাতের ক্ষমতা ও অনুগ্রহ সমগ্র সৃষ্টির ওপর ছড়ানো। তাদের ভেতরগত চাহিদা হলো সবাই তাদের নেককাজের জন্য তাদের সম্মান করুক; এটি এমন এক চাহিদা যা কারও নিকট গোপন থাকে না। এমনিভাবে এ সংশ্লিষ্ট আরও অনেক বিষয়ে তারা আচ্ছন্ন; যা আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে ঘৃণিত, তারা তাঁর দরজা থেকে প্রকাশ্যে কবীরা গুনাহকারীদের চেয়েও বেশি দূরে। আল্লাহ তাআলা যদি কাউকে কবীরা গুনাহে লিপ্ত করান, যার মাধ্যমে বান্দা নিজের নফসকে ভেঙে ফেলে, অনুশোচনায় দগ্ধ হয়, নিজের মর্যাদা ও পরিচয় উপলব্ধি করে, নিজেকে বিনয়ী করে এবং ইবাদাতের অহংকার থেকে বের হয়—তা হলে এটি তার জন্য রহমতস্বরূপ। যেমন আল্লাহ তাআলা যখন কবীরা গুনাহকারীদের পরিশোধন করেন খাঁটি তাওবা ও তাঁর প্রতি তাদের অন্তর ধাবিত করার মাধ্যমে, তখন তা তাদের জন্য রহমতস্বরূপ হয়। সুতরাং এর বিপরীত হলে দুদলই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
টিকাঃ
[৫৬] সুয়ূতি, আল-জামিউস সগীর, ৪৯২৪, দঈফ।
📄 বান্দাকে গুনাহ করতে ছেড়ে দেওয়ার রহস্য
জেনে রাখুন, বিচক্ষণ ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি থেকে যখন কোনো গুনাহ সংঘটিত হয়ে যায়, তখন কয়েকটি বিষয়ের প্রতি তার দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে—
১. আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুতি ও ভীতিপ্রদর্শনের দিকে সে দৃষ্টি দেয়। ফলে এটি তার মাঝে ভয় সৃষ্টি করে; যা তাকে তাওবা করতে উদ্বুদ্ধ করে।
২. তার প্রতি আল্লাহ তাআলার কী আদেশ ও নিষেধ রয়েছে সেদিকে সে দৃষ্টি দেয়। ফলে তার কৃতকাজটি যে গুনাহ তার স্বীকৃতি দেওয়ার প্রবণতা তার মধ্যে তৈরি করে এবং সে যে গুনাহ করেছে তা স্বীকার করে নেয়।
৩. সে এদিকেও দৃষ্টি ফেরায় যে, আল্লাহ তাআলা তাকে গুনাহের কাজটি করার অবকাশ দিয়েছেন এবং এর মাঝের সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে দিয়েছেন। তিনি ইচ্ছা করলে তাকে এর থেকে নিরাপদ রাখতে পারতেন, আবার গুনাহ করার মাঝে ও তার মাঝে বাধাও সৃষ্টি করে দিতে পারতেন। এই দৃষ্টিভঙ্গির ফলে সে আল্লাহ তাআলার সত্তা, নামসমূহ, গুণাবলি, হিকমত, রহমত, মাগফিরাত, ক্ষমা, সহনশীলতা ও দয়া সম্পর্কে বিভিন্ন প্রকার প্রজ্ঞা ও মা'রিফাত জানতে পারবে। আল্লাহ সম্পর্কে এই প্রজ্ঞা ও মা'রিফাত তাঁর নামসমূহের প্রতি দাসত্বকে আবশ্যক করবে; যা এই পরিস্থিতি ব্যতীত কখনো হাসিল হতো না। সে আরও জানতে পারবে আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি ও আদেশ, প্রতিদান, প্রতিশ্রুতি ও ভীতিপ্রদর্শনের সাথে তাঁর নাম ও গুণাবলির সম্পর্ক কী এবং বাস্তবে সেগুলো আল্লাহ তাআলার নাম ও গুণাবলিরই বৈশিষ্ট্য ও প্রভাব। নিশ্চিতভাবেই আল্লাহ তাআলার প্রতিটি নাম ও গুণের প্রভাব ও কার্যক্ষমতা রয়েছে।
তার এই দর্শন তাকে মা'রিফাত, ঈমান, তাকদীর ও হিকমতের রহস্য সম্পর্কে অনেকগুলো মনোরম বাগানের সন্ধান দেবে; যার বর্ণনা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। (এরপরও কিছু উল্লেখ করা হলো-)
• এর মাধ্যমে বান্দা ফায়সালার ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার শক্তিমত্তা সম্পর্কে জানতে পারবে। মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তাআলা যা ইচ্ছা করেন তা-ই সংঘটিত করেন; তিনি পরিপূর্ণ ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হওয়ায় বান্দার ওপর নিজ হুকুম বাস্তবায়ন করে থাকেন।
যখন বান্দা তার মনিবের শক্তি ও ক্ষমতা সম্পর্কে জানতে পারবে এবং অন্তর দিয়ে তা অবলোকন করবে, তখন গুনাহের লাঞ্ছনা থেকে বাঁচতে আল্লাহর প্রতিই মনোযোগী হবে; যা তার জন্য অতি উত্তম ও উপকারী। কারণ তখন (চিন্তা-ভাবনার ক্ষেত্রে) সে নিজের নফসের সাথে নয়, স্বয়ং আল্লাহর সাথে অবস্থান করে।
ফায়সালা করার ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার ক্ষমতা ও শক্তির পরিচয় পাওয়ার মধ্যে এটাও শামিল: ব্যক্তি জানতে পারবে যে, তাকে পরিচালিত করা হয়, তার সম্পর্কে আল্লাহর সব সিদ্ধান্ত মেনে নিতে সে বাধ্য, তার কপাল রয়েছে অপরের হাতে, সে নিজে নিজে কোনোকিছু থেকে বাঁচতে পারে না; তিনি তাকে না বাঁচালে এবং তাঁর সাহায্য ব্যতীত কিছুই করার ক্ষমতা তার নেই। সে প্রশংসার প্রতিদান দানকারী, মহাপরাক্রমশালী এক সত্তার কবজায় লাঞ্ছিত ও তুচ্ছ।
• সে আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ সম্পর্কে জানতে পারবে যে, গুনাহে লিপ্ত হওয়া অবস্থায় তিনি তা ঢেকে রেখেছেন। পরিপূর্ণভাবে অবগত থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রকাশ করে দেননি। তিনি যদি চাইতেন, তা হলে সবার সামনে তাকে অপদস্থ ও লাঞ্ছিত করতে পারতেন; ফলে সবাই তার থেকে দূরে থাকত। এটা আল্লাহ তাআলার অনেক বড়ো মেহেরবানি ও দয়া। এ কারণেই আল্লাহ তাআলার একটি নাম السٹر 'পরম দানশীল'। বান্দার থেকে আল্লাহ তাআলা পরিপূর্ণ অমুখাপেক্ষী হওয়া সত্ত্বেও বান্দার প্রতি তিনি এই দান ও অনুগ্রহ করেছেন। অথচ বান্দা তাঁর প্রতি পরিপূর্ণভাবে মুখাপেক্ষী। এই কারণে বান্দা এই অনুগ্রহের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখতে এবং আল্লাহর এই মেহেরবানি, করুণা ও দয়া প্রত্যক্ষ করতেই ব্যস্ত হয়ে পড়বে। ফলে গুনাহের নীচতা থেকে বেরিয়ে এবং তা ভুলে গিয়ে আল্লাহ তাআলার সাথে অবস্থান করবে। আর এটি গুনাহ নিয়ে ব্যস্ত থাকা ও এর লাঞ্ছনার দিকে দৃষ্টিপাত করার চেয়ে বেশি উপকারী ও লাভজনক।
• সে এটাও প্রত্যক্ষ করবে যে, গুনাহ ও পাপে লিপ্ত থাকার কারণেও আল্লাহ তাকে শাস্তি না দিয়ে ধৈর্য ধরে আছেন। তিনি যদি চাইতেন, তা হলে গুনাহের শাস্তি দ্রুতই দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তাড়াহুড়ো না করে সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছেন।
এই বিষয়টি বান্দাকে আল্লাহ তাআলার حليم 'পরম সহিষ্ণু' নামের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে, আল্লাহর ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার গুণ সম্পর্কে তাকে অবগত করাবে এবং এই নামের প্রতি ভক্তি ও দাসত্বের মনোভাব তৈরি করবে।
• সে এটাও জানবে, আল্লাহ তাআলা তাকে যে ক্ষমা করে দিয়েছেন, তা হলো তাঁর অফুরন্ত দয়ার একটি অংশ। কারণ ক্ষমা করা আল্লাহ তাআলার অনেক বড়ো একটি অনুগ্রহ ও দয়া। অন্যথায় আল্লাহ যদি আপনাকে পাকড়াও করেন, তা হলেও তিনি ইনসাফকারী ও প্রশংসিত। ক্ষমা করা কেবল তার দয়া ও মেহেরবানি; আপনার কোনো হকের কারণে তিনি ক্ষমা করতে বাধ্য; বিষয়টি এমন নয়।
• এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বান্দার বিনয়, বশ্যতা, নম্রতা, অপদস্থতা ও তাঁর সামনে রোনাজারি করাকে বাড়িয়ে দেন। কারণ মানুষের নফস এইসব ক্ষেত্রে রুবুবিয়্যাতের সমকক্ষ হতে চায়। যদি সে ক্ষমতা পেত, তা হলে নিশ্চয়ই ফিরআউনের মতো কথা বলত। ফিরআউন ক্ষমতা পেয়েছিল বলে সে তা প্রকাশ করেছিল আর অন্যরা ক্ষমতা-শক্তি পায়নি, তাই তা গোপন রেখেছে। এই সমকক্ষতার প্রত্যাশা করা থেকে মুক্তি দেবে দাসত্বের বিনম্রতা ও অপদস্থতা। এর চারটি স্তর রয়েছে—
প্রথম স্তর: পুরা সৃষ্টিজগৎই এর অন্তর্ভুক্ত। আর তা হলো আল্লাহ তাআলার প্রতি মুখাপেক্ষিতার অপদস্থতা। সমস্ত আসমানবাসী ও জমিনবাসী তাঁর দিকে মুখাপেক্ষী ও অভাবী। আর তিনি একাই সবার থেকে অমুখাপেক্ষী। আসমান ও জমিনের প্রত্যেকেই তাঁর নিকট চায়; কিন্তু তিনি কারও কাছেই চান না।
দ্বিতীয় স্তর: ইবাদাত ও দাসত্বের বিনম্রতা। এটা হলো ইখতিয়ার বা পছন্দ করার বিনম্রতা। এটি কেবল অনুগত বান্দাদের সাথেই খাছ। আর ইবাদাত বা দাসত্বের রহস্য এখানেই নিহিত রয়েছে।
তৃতীয় স্তর: মহাব্বতের বিনয় ও নমনীয়তা। আসলে মহাব্বতকারী তার মাহবুব বা প্রিয় মানুষের প্রতি সত্তাগতভাবেই বিনয়ী ও দুর্বল থাকে। মহাব্বতের অনুপাতে এর কমবেশ হয়। প্রিয় মানুষের প্রতি নম্রতার ওপরই মহাব্বতের ভিত্তি স্থাপিত।
চতুর্থ স্তর: পাপাচার ও অপরাধের দরুন নম্রতা ও অপদস্থতা।
সুতরাং এই চারটি স্তর যখন একত্রিত হয়, তখন আল্লাহর জন্য নম্রতা ও বশ্যতা পরিপূর্ণতা লাভ করে। কেননা তখন ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ভয়ভীতি, মহাব্বত, ইনাবাত, আনুগত্য ও মুখাপেক্ষিতার কারণে আরও বেশি অপদস্থতা স্বীকার করে নেয়।
• আল্লাহ তাআলার নামসমূহের মাঝে যে প্রভাব রয়েছে, তা তার সংশ্লিষ্ট বিষয়াদিকে দাবি করে। যেমন পরিপূর্ণ উপকরণ লক্ষ্য অর্জন হওয়াকে দাবি করে। (বিষয়টি উদাহরণের মাধ্যমে সুস্পষ্ট হবে।) যেমন : السَّمِيعُ (সর্বশ্রোতা) ও الْبَصِيرُ (সর্বদ্রষ্টা) আল্লাহ তাআলার এই নাম দুটি দাবি করে শোনার ও দেখার বস্তুসমূহকে। এমনিভাবে الرَّزَّاقُ (রিয্কদানকারী) নামটি রিস্ক দেওয়া মতো কাউকে দাবি করে; الرَّحِيمُ (পরম দয়ালু) নামটি দয়া করা যায় এমন কাউকে দাবি করে। অনুরূপভাবে الْغَفُورُ (অতি ক্ষমাপরায়ণ), الْعَفُوٌّ (পরম ক্ষমাশীল), اَوَّابُ (তাওবা কবুলকারী), الْحَلِيمُ (পরম সহিষ্ণু) এই নামগুলো এমন কাউকে দাবি করে যাকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন, যার তাওবা কবুল করবেন এবং যার প্রতি তিনি সহনশীল হবেন। এই নামগুলো গুণহীন ও অকেজো হওয়া অসম্ভব। কারণ এগুলো হলো সর্বোত্তম নাম ও পরিপূর্ণতার গুণাবলি, সম্মান ও বড়োত্বের বৈশিষ্ট্যাবলি, প্রজ্ঞা, করুণা ও দানশীলতার কার্যক্রম। সুতরাং নিশ্চিতভাবেই সেগুলোর প্রভাব দুনিয়াতে প্রকাশ পাবে। আর এর প্রতি ইঙ্গিত প্রদান করেছেন আল্লাহ সম্পর্কে সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী—আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ ﷺ। তিনি বলেছেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْ لَمْ تُذْنِبُوا لَذَهَبَ اللهُ بِكُمْ وَلَجَاءَ بِقَوْمٍ يُذْنِبُونَ فَيَسْتَغْفِرُوْنَ اللَّهَ فَيَغْفِرُ لَهُمْ
“সেই সত্তার শপথ! যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তোমরা যদি গুনাহ না করতে, তা হলে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তোমাদেরকে সরিয়ে দিয়ে এমন সম্প্রদায় নিয়ে আসতেন যারা গুনাহ করত, অতঃপর ক্ষমা চাইত আর তিনি তাদের ক্ষমা করে দিতেন।”[৫৭]
• আরেকটি হিকমাহ হলো: সবচেয়ে বড়ো রহস্য—যা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না, যার কথা কেউ ইশারা-ইঙ্গিতেও বলার সাহস দেখায় না, এ দিকে ঈমানের আহ্বানকারীও প্রকাশ্যে আহ্বান করে না। বরং বিশেষ বান্দাদের অন্তর তা প্রত্যক্ষ করে; ফলে রবের প্রতি তাদের মা'রিফাত ও মহাব্বত, নিশ্চিন্ততা ও তাঁর প্রতি আগ্রহ, তাঁর অবিরাম স্মরণ, তাঁর দয়া, করুণা, অনুগ্রহ ও মেহেরবানির উপলব্ধি, দাসত্ব ও প্রভুত্ব সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান ও প্রজ্ঞা আরও বেড়ে যায়; আর তা হলো যা 'সহীহ বুখারি' ও 'সহীহ মুসলিম'-এ বর্ণিত আনাস ইবনু মালিক-এর হাদীস থেকে প্রমাণিত হয়। আনাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'নবি বলেছেন,
اللَّهُ أَشَدُّ فَرَحًا بِتَوْبَةِ عَبْدِهِ حِيْنَ يَتُوْبُ إِلَيْهِ مِنْ أَحَدِكُمْ كَانَ عَلَى رَاحِلَتِهِ بِأَرْضِ فَلَاةٍ فَانْفَلَتَتْ مِنْهُ وَعَلَيْهَا طَعَامُهُ وَشَرَابُهُ فَأَيْسَ مِنْهَا فَأَتَى شَجَرَةً فَاضْطَجَعَ فِي ظِلِّهَا قَدْ أَيْسَ مِنْ رَاحِلَتِهِ فَبَيْنَا هُوَ كَذَلِكَ إِذَا هُوَ بِهَا قَائِمَةً عِنْدَهُ فَأَخَذَ بِخِطَامِهَا ثُمَّ قَالَ مِنْ شِدَّةِ الْفَرَحِ اللَّهُمَّ أَنْتَ عَبْدِي وَأَنَا رَبُّكَ . أَخْطَأَ مِنْ شِدَّةِ الْفَرَحِ
"বান্দা যখন আল্লাহ তাআলার কাছে তাওবা করে, তখন আল্লাহ তার তাওবার কারণে ওই লোকের চেয়েও বেশি আনন্দিত হন, যে মরুভূমিতে তার বাহনে চড়ে আরোহন করছিল। অতঃপর বাহনটি তার নিকট হতে পালিয়ে গেল। আর সেই বাহনের ওপরই ছিল তার খাদ্য ও পানীয়। একসময় বাহনটি পাওয়ার ব্যাপারে সে আশা ছেড়ে দিলো। এরপর নিরাশ মনে একটি গাছের নিচে এসে গাছের ছায়ায় শুয়ে পড়ল। সে সেভাবেই সেখানে পড়ে থাকে; এমতাবস্থায় হঠাৎ বাহন জন্তুটি তার কাছে এসে দাঁড়ায়। ফলে দ্রুতই সে তার লাগাম ধরে ফেলে। এরপর আনন্দের আতিশয্যে বলে ওঠে, 'হে আল্লাহ, তুমি আমার বান্দা আর আমিই তোমার রব!' আনন্দ ও খুশির তীব্রতায় সে এমন ভুল করে বসে!”[৫৮]
টিকাঃ
[৫৭] মুসলিম, ২৭৪৯।
[৫৮] বুখারি, ৬৩০৯; মুসলিম, ২৭৪৭।
📄 শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচুন
মানুষকে গুনাহের আদেশ-দানকারী, গুনাহকে সুসজ্জিত করে সামনে উপস্থাপনকারী এবং গুনাহ ও পাপাচারে জড়িয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধকারী হলো তার সাথে নিযুক্ত-থাকা-শয়তান।
সুতরাং শয়তানের দিকে দৃষ্টিপাত করা এবং তার বিষয়টি আমলে নেওয়া, তাকে শত্রু হিসেবে গ্রহণ করতে, তার থেকে পরিপূর্ণরূপে বাঁচতে এবং নিজের অজান্তেই সে যেন তার উদ্দেশ্য পূরণ করতে না পারে, সে জন্য সতর্ক হতে সাহায্য করে। কারণ শয়তান চায় তার সাতটি ফাঁদের মধ্যে যেকোনো একটিতে মানুষকে লিপ্ত করাতে; যার একটি অপরটির চেয়ে বেশি কঠিন ও ভয়ানক। শয়তান তার সবচেয়ে কঠিন ফাঁদ থেকে নিম্নমানের ফাঁদে তখনই নামে, যখন তাতে লিপ্ত করাতে সে ব্যর্থ ও অক্ষম হয়ে পড়ে। তার সাতটি ফাঁদ হলো-
প্রথম ফাঁদ: কুফরের ফাঁদ; আল্লাহ তাআলাকে অস্বীকার করানো, তাঁর দ্বীনকে, তাঁর সাথে সাক্ষাৎকে, তাঁর পরিপূর্ণ গুণাবলিকে এবং তাঁর সম্পর্কে তাঁর রাসূলগণ যে সংবাদ দিয়েছেন, সেগুলোকে অস্বীকার করানো এবং কুফরের পথ অবলম্বন করানো। শয়তান যদি কারও সাথে এই উদ্দেশ্যে সফল হয়, তা হলে তার শত্রুতার আগুন ঠান্ডা হয়ে যায়, সে তার সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হয়ে অন্যদিকে মনোযোগ দেয়। আর যদি বান্দা শয়তানের এই ধোঁকাকে ব্যর্থ করে দেয়, যদি সে তার হিদায়াতের বিচক্ষণতার মাধ্যমে এর থেকে মুক্তি পায় এবং তার ঈমানের নূর অক্ষুণ্ণ থাকে, তা হলে শয়তান তখন তার দ্বিতীয় ফাঁদ সফল করার ষড়যন্ত্র আঁটে।
দ্বিতীয় ফাঁদ: বিদআতের ফাঁদ; ১. হকের বিপরীত বিশ্বাস করানোর মাধ্যমে; যা দিয়ে আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলদের পাঠিয়েছেন এবং কিতাব নাযিল করেছেন (তার বিপরীত)। বা ২. এমন কিছুকে ইবাদাত বানিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে; আল্লাহ তাআলা যার অনুমতি দেননি, যেমন: দ্বীনের মধ্যে নতুন নতুন রীতি ও প্রথা সৃষ্টি করা; যা আল্লাহ তাআলা কখনো কবুল করবেন না। অধিকাংশ সময়ই এই দুই বিদআত একত্রে অবস্থান করে। খুব কমই এ দুটি পরস্পর থেকে পৃথক হয়। যেমন একজন মনীষী বলেছেন, 'আমলি বিদআতের সঙ্গে কওলি বিদআতের বিবাহ হয়। অতঃপর তারা বাসর করে। যার ফলে তাদের থেকে কেবল কুসন্তানই জন্ম নেয়, যারা ইসলামি শহরগুলোতে বেড়ে উঠতে থাকে। অবশেষে তাদেরকে নিয়েই লোকজন আল্লাহর নিকট হইচই শুরু করে দেয়।' (অর্থাৎ সে বিদআতগুলোকেই উত্তম ইবাদাত হিসেবে গণ্য করে!)
কেউ যদি শয়তানের এই ধোঁকাকেও ছিন্নভিন্ন করে ফেলে, সুন্নাহর আলোর মাধ্যমে এই ফাঁদ থেকে মুক্তি পেয়ে যায়, রাসূল এবং যে সমস্ত সর্বোত্তম পূর্বসূরিগণ- যেমন: সাহাবায়ে কেরাম, তাবিয়িগণ-গত হয়েছেন তারা যেসব বিধিবিধানের ওপর আমল করেছেন, সেগুলোর যথাযথ অনুসরণ করে সেই ধোঁকা থেকে বেঁচে যায়। যদিও তাঁদের একজনের অনুসরণ করা থেকেও পরবর্তী যুগের ব্যক্তিরা রয়েছে অনেক দূরে। এর পরেও যদি কেউ তাঁদের অনুসরণ শুরু করে, তবে বিদআতিরা তাকে বাধা দেয় এবং বলে ওঠে, 'এটা বিদআত, নব উদ্ভূত'!
আল্লাহ তাআলার তাওফীকে বান্দা যখন শয়তানের এই ষড়যন্ত্রকেও কেটে সামনে এগিয়ে যায়, তখন শয়তান তার তৃতীয় ফাঁদের দিকে মনোযোগী হয়।
আসলে বিদআতের ফাঁদে সফল হওয়া শয়তানের নিকট অনেক বেশি পছন্দনীয়। কারণ এর দ্বারা দ্বীন নষ্ট হয়ে যায়, আল্লাহ তাআলা যা দিয়ে তাঁর রাসূলকে প্রেরণ করেছেন, তা বাতিল করে দেওয়া যায়; যারা বিদআত করে, তারা এর থেকে কখনো তাওবা করে না এবং এর থেকে কখনো ফিরে আসে না। বরং অন্যান্য লোকদেরও এর দিকে দাওয়াত দেয়। (বিদআত শয়তানের অতি পছন্দনীয় হওয়ার আরও একটি কারণ হলো) বিদআতের মাধ্যমে ইলম ছাড়াই আল্লাহ সম্পর্কে কথা বলা হয়, সুস্পষ্ট সুন্নাহর বিরোধিতা করা হয়, সুন্নাহপন্থিদের সাথে শত্রুতা করা হয় ও সুন্নাহর আলোকে নিভিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
বিদআত মানুষকে ছোটো অপরাধ থেকে ধীরে ধীরে বড়ো অপরাধের দিকে নিয়ে যায়। একসময় বিদআতকারী দ্বীন থেকেই বেরিয়ে যায়। ময়দা থেকে যেমন চুল বেরিয়ে যায়। আসলে বিদআতের ভয়ংকর ভয়ংকর ক্ষতি সম্পর্কে কেবল বিচক্ষণ ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিরাই উপলব্ধি করতে পারে। আর অন্ধরা থাকে এ সম্পর্কে গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত।
وَمَنْ لَّمْ يَجْعَلِ اللَّهُ لَهُ نُوْرًا فَمَا لَهُ مِنْ نُوْرٍ
"আল্লাহ যাকে আলো দেন না, তার জন্য আর কোনো আলো নেই।"[৫৯]
তৃতীয় ফাঁদ: কবীরা গুনাহের ফাঁদ; যদি এই উদ্দেশ্যে শয়তান সফল হয়, তা হলে কবীরা গুনাহগুলোকে ব্যক্তির চোখে সুসজ্জিত ও উত্তমরূপে উপস্থাপন করে। এর মাধ্যমে সে তার মনে কল্পনা ও আশার দুয়ার খুলে দেয়। শয়তান তাকে বলে, ঈমান তো শুধু অন্তরের বিশ্বাসের নাম। সুতরাং আমল তাতে কোনো প্রভাব ফেলবে না। কখনো কখনো সে তার জবানে ও কানে এমন কথা জারি করে দেয়, যার দ্বারা সমগ্র সৃষ্টিকেই সে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়। সেই কথাটি হলো-
لَا يَضُرُّ مَعَ التَّوْحِيدِ ذَنْبٌ، كَمَا لَا يَنْفَعُ مَعَ الشِّرْكِ حَسَنَةٌ 'তাওহীদ ঠিক থাকলে গুনাহ কোনো ক্ষতি করতে পারে না। যেমন শিরকের সাথে নেক আমল কোনো উপকারে আসে না।'
কেউ যদি আল্লাহ তাআলার তাওফীকে বা খাঁটি তাওবা করার মাধ্যমে শয়তানের এই কবীরা গুনাহের ষড়যন্ত্রকেও ভেঙে দেয়, তখন শয়তান তার পরের ফাঁদকে সফল করার দিকে অগ্রসর হয়।
চতুর্থ ফাঁদ: সগীরা বা ছোটো ছোটো গুনাহের ফাঁদ; সে এগুলোকে খুব তুচ্ছ করে দেখায়। সে বলে, 'তোমার কোনো ক্ষতি নেই, যখন তুমি কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকো। তুমি কি জানো না যে, কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকলে আর নেক আমল করতে থাকলে, ছোটো ছোটো গুনাহগুলোকে এমনিতেই ক্ষমা করে দেওয়া হয়!' এভাবে সে সগীরা গুনাহের বিষয়টিকে খুব সামান্য করেই উপস্থাপন করতে থাকে। যতক্ষণ-না ব্যক্তি এতে অভ্যস্ত ও ধারাবাহিক হয়। ফলে কবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি, যে তার গুনাহের কারণে ভয়ে ভয়ে থাকে এবং অনুশোচনা করে, সে-ও ধারাবাহিক সগীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির তুলনায় উত্তম অবস্থানে থাকে।
কেননা গুনাহের ওপর ধারাবাহিক হওয়া নিকৃষ্ট ও ভয়ংকর বিষয়। তাওবা-ইস্তিগফার করতে থাকলে কবীরা গুনাহ আর কবীরা থাকে না। অপরদিকে সগীরা গুনাহে অনড় থাকলে তা আর সগীরা থাকে না। নবি বলেছেন,
إِيَّاكُمْ وَمُحَقِّرَاتِ الذُّنُوْبِ؛ فَإِنَّمَا مَثَلُ مُحَقِّرَاتِ الذُّنُوْبِ كَقَوْمٍ نَزَلُوا فِي بَطْنِ وَادٍ، فَجَاءَ ذَا بِعُوْدٍ وَجَاءَ ذَا بِعُوْدٍ، حَتَّى أَنْضَجُوْا خُبْزَتَهُمْ، وَإِنَّ مُحَقِّرَاتِ الذُّنُوْبِ مَتَى يُؤْخَذُ بِهَا صَاحِبُهَا تُهْلِكُهُ
"তোমরা গুনাহকে তুচ্ছ ভাবা থেকে দূরে থাকো। গুনাহকে তুচ্ছ মনে করার উপমা হলো সেই সম্প্রদায়ের মতো; যারা একটি উপত্যকায় অবতরণ করেছে; অতঃপর একজন একটি কাঠ আনে, আরেকজন আরেকটি কাঠ আনে। (এভাবে অনেক কাঠ জমা হয়ে যায়) ফলে তারা তাদের রুটি পাকিয়ে ফেলে। গুনাহকে তুচ্ছ-জ্ঞানকারীকে যখন পাকড়াও করা হবে, তখন তার সেই ছোটো ছোটো গুনাহগুলোই তাকে ধ্বংস করে দেবে।[৬০]
যদি বান্দা সতর্কতা, সচেতনতা, সবসময় তাওবা, ইস্তিগফার ও গুনাহের পরে নেককাজ করার মাধ্যমে শয়তানের এই চক্রান্ত থেকেও মুক্তি পেয়ে যায়, তা হলে শয়তান তার পঞ্চম ফাঁদের দিকে ধাবিত হয়।
পঞ্চম ফাঁদ : বৈধ বিষয়াদির ফাঁদ; যা করতে সমস্যা নেই সেগুলোতে লিপ্ত করিয়ে দিয়ে বেশি বেশি ইবাদাত-বন্দেগি করা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে এবং আখিরাতের পাথেয় অর্জনে পরিশ্রম করা থেকে বিরত রাখে। এরপর শয়তান তাকে আস্তে আস্তে বৈধ বিষয় থেকে সুন্নাহ পরিত্যাগ করার দিকে নিয়ে যায়। তারপর সুন্নাহ ত্যাগ করা থেকে ওয়াজিব ছেড়ে দেওয়ার দিকে ধাবিত করে। সর্বনিম্ন যে বিষয়টি শয়তান তার থেকে লাভ করে তা হলো : লাভজনক অর্জন, সুউচ্চ মর্যাদা ও মানযিল থেকে ব্যক্তিকে বঞ্চিত রাখে। আসলে বান্দা যদি সেগুলোর মূল্য বুঝত ও উপলব্ধি করত, তা হলে সে কিছুতেই নৈকট্যলাভের একটি মাধ্যমও হাতছাড়া করত না। কিন্তু সে প্রকৃত অর্থে এর মূল্য জানে না!
এখন যদি কেউ শয়তানের এই চক্রান্ত থেকেও পরিপূর্ণ বিচক্ষণতা, হিদায়াত ও মা'রিফাতের নূর-যা ইবাদাত ও আনুগত্য অনুপাতে অর্জিত হয়—এর মাধ্যমে মুক্তি পায়; পরিণতিতে সে তার প্রতিটি মুহূর্তকেই লাভজনক কাজে ব্যয় করতে থাকে, তখন শয়তান তার পরের ফাঁদ সফল করার দিকে মনোযোগী হয়।
ষষ্ঠ ফাঁদ : অনুত্তম আমলের ফাঁদ; যে আমলগুলো অনুত্তম, অনাগ্রাধিকারপ্রাপ্ত সেগুলোতে লিপ্ত হবার প্ররোচনা দেয়, তার চোখে সেগুলোকে সুসজ্জিত করে তোলে। তাতে কী কী উপকার আছে, তা দেখিয়ে দেয়; যাতে সে উত্তম ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত আমল থেকে দূরে সরে যায়। কারণ যখন শয়তান মূল সাওয়াব থেকে বিরত রাখতে পারে না, তখন সে এই ফন্দি আঁটে যাতে সাওয়াব কম হয়।
এবং সুউচ্চ মর্যাদা ও মর্তবা থেকে বঞ্চিত হয়। সুতরাং তাকে বেশি মর্যাদার আমল থেকে কম মর্যাদার আমলের দিকে, উত্তম থেকে অনুত্তমের দিকে এবং আল্লাহ তাআলার নিকট বেশি পছন্দনীয় আমল থেকে সাধারণ আমলের দিকে ব্যস্ত করে রাখে।
কিন্তু এই স্তরের মানুষজন কোথায়? পুরা পৃথিবীতে তাদের সংখ্যা একেবারে হাতেগোনা। আসলে অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে শয়তান তার প্রথম ফাঁদেই ভরপুর সফল ও কামিয়াব হয়েছে।
বিভিন্ন প্রকার আমল ও আল্লাহর নিকট এর কী মর্যাদা, তা সঠিকভাবে উপলব্ধি করার মাধ্যমে, শ্রেষ্ঠত্বের মানযিলসমূহ সম্পর্কে জানার মাধ্যমে এবং উঁচু ও নিচু, ভালো ও মন্দ, নেতা ও প্রজা, সর্দার ও অধীনস্থ ইত্যাদির মাঝে পার্থক্য করার দ্বারা বান্দা যদি এই ফাঁদ থেকেও মুক্তি পেয়ে যায়, তা হলে শয়তান তার সর্বশেষ ফাঁদের দিকে ধাবিত হয়। আসলে আমল ও কথার মধ্যেও সর্দার ও অধীনস্থ, নেতা ও প্রজা, সর্বোচ্চ চূড়া ও সর্বনিম্ন চূড়া রয়েছে। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছে, 'ইস্তিগফারদের সর্দার )سَيِّدُ الْإِسْتِغْفار( হলো, বান্দা বলবে : اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّنِ، لَا إِلَهَ ..... إِلَّا أَنْتَ [৬১]
আরেকটি হাদীসে এসেছে, اَلْجِهَادُ ذِرْوَةُ سَنَامِ الْأَمْرِ "জিহাদ হলো সববিষয়ের সর্বোচ্চ চূড়া।"[৬২]
সপ্তম ফাঁদ: শয়তানের আক্রমণের ফাঁদ; এই ফাঁদটি ছাড়া শত্রুপক্ষ শয়তানের আর কোনো ফাঁদ অবশিষ্ট থাকে না। এই ধোঁকা থেকে যদি কেউ মুক্তি পেয়ে থাকে, তা হলে তা পেয়েছেন কেবল নবি-রাসূলগণ এবং সৃষ্টির সর্বোত্তম বান্দারা। ফাঁদটি হলো শয়তান বান্দাকে হাত, জবান ও অন্তরের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকার কষ্ট দেওয়ার জন্য তার সৈন্যবাহিনীকে আক্রমণে পাঠায়। কল্যাণ ও নেককাজে ব্যক্তির স্তর অনুসারে তারা তাদের আক্রমণ সাজায়। ফলে যখনই কেউ উঁচু স্তরে ওঠে, তখনই শয়তান তার সমস্ত বাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তার চক্রান্ত সফল করতে তার সাথে যুদ্ধ আরম্ভ করে।
এই ফাঁদ থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই। কারণ কেউ যখন দ্বীনের পথে দৃঢ় থাকতে, আল্লাহর দিকে আহ্বান করতে এবং আল্লাহর সমস্ত হুকুম-আহকাম মেনে চলতে চেষ্টা করে, তখন শয়তানও পুরাদমে তাকে বিভ্রান্ত করার জন্য এবং তার মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগে।
টিকাঃ
[৫৯] সূরা নূর, ২৪:৪০।
[৬০] আহমাদ, আল-মুসনাদ, ২২৮০৮; ইবনু আবিদ দুনইয়া, আত-তাওবা, ৩।
[৬১] বুখারি, ৬৩০৬।
[৬২] তিরমিযি, ২৬১৬; ইবনু মাজাহ, ৩৯৭৩।
📄 বিশেষ ব্যক্তিদের জন্য কি বিশেষ কোনো তাওবা রয়েছে?
'মানাযিলুস সায়িরীন' (مَنَازِلُ السَّابِرِينَ)-গ্রন্থের লেখক আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মাদ হারাবি বলেছেন, 'কারও তাওবার মাকাম ততক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণ হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত-না সে এই স্তরে পৌঁছে যে, সে আল্লাহ ছাড়া বাকিদের থেকে তাওবা করবে; এরপর তাওবা করার কারণ দেখবে; এরপর তাওবা করার সেই কারণ দেখা থেকেও তাওবা করবে।'[৬৪]
আল্লাহ ছাড়া বাকিদের থেকে তাওবা করার অর্থ হলো: আল্লাহ ছাড়া অন্তরে অন্য কারও ইচ্ছা লালন করা থেকে বান্দা বিরত থাকবে। বান্দা কেবল একক, লা শরীক আল্লাহর হুকুম মোতাবিক চলা এবং তাঁরই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করার মাধ্যমে তাঁর ইবাদাত করবে। ফলে বান্দার সবকিছুই হবে আল্লাহকে কেন্দ্র করে এবং আল্লাহর হুকুম অনুসারে। এই বিষয়টি কেবল সেই ব্যক্তির জন্যই সহীহ হবে, আল্লাহর জন্য যার অন্তরে থাকে পরিপূর্ণ ভালোবাসা, সম্মান-শ্রদ্ধা, বিনয়, বশ্যতা, তাঁর সামনে। বিনীত হওয়া এবং সবসময় তাঁর দিকেই মুখাপেক্ষী থাকা।
এই তাওবা যখন বান্দার জন্য বিশুদ্ধ বলে প্রমাণিত হয়, তখন তার ওপর আরেকটি বিষয় অবশিষ্ট থেকে যায়। আর তা হলো তার তাওবা করার কারণ উপলব্ধি করা, তা দেখা এবং তা থেকে পুরোপুরি দৃষ্টি ফিরিয়ে না নেওয়া। আর এই বিষয়টি বান্দার মর্যাদা ও মর্তবা অনুসারে গুনাহের শামিল। সুতরাং তাকে তার এই উপলব্ধি, দেখা এবং তা থেকে ফানা বা পুরোপুরি দৃষ্টি ফিরিয়ে না নেওয়া থেকেও তাওবা করতে হবে।
এখানে তিনটি বিষয় রয়েছে: ১. আল্লাহ ছাড়া বাকি সবকিছু থেকে তাওবা করা, ২. এই তাওবা দেখতে পাওয়া এবং ৩. এই দেখতে পাওয়া থেকেও তাওবা করা (অর্থাৎ বান্দার অন্তরে কেবল আল্লাহই স্থান পাবে, অন্য কোনোকিছু নয়; এমনকি সে যে তাওবা করে, নেক আমল করে সেগুলোও তার অন্তরে স্থান পাবে না।)
সূফিয়ায়ে কেরামের নিকট এটি হলো চূড়ান্ত গন্তব্য; এর পরে আর কিছু নেই। এটিই আল্লাহর-পথের-পথিকদের সর্বশেষ মানযিল, যাতে কেবল অতি বিশেষ ব্যক্তিরাই সফর করে থাকে। আল্লাহর শপথ! বান্দার নিজের কাজসমূহ দেখতে পাওয়া, এর মাধ্যমে রব থেকে আড়াল হওয়া এবং তার চলার পথে বিভিন্ন বিষয় প্রত্যক্ষ করা তাওবাকে আবশ্যক করে। (এটি হলো মানাযিলুস সায়িরীন গ্রন্থের লেখকের অভিমত)
(ইবনুল কাইয়্যিম রহিমাহুল্লাহ বলেন) সঠিক কথা হলো আল্লাহ তাআলার দেওয়া নিয়ামত, দয়া-অনুগ্রহ, শক্তি-সামর্থ্য ও সাহায্য দেখতে না পাওয়ার চেয়ে, দেখতে পাওয়াই হলো উত্তম ও পরিপূর্ণ। তারা যে মাকামের কথা বলে, তার চেয়েও এটি উঁচু স্তরের এবং খাঁটি মহাব্বত ও দাসত্বের পূর্ণাঙ্গ বহিঃপ্রকাশ। আসলে দয়া ও অনুগ্রহ প্রত্যক্ষ করাই হলো অধিক যুক্তিসংগত। কারণ প্রত্যক্ষকারীর উপলব্ধি না থাকলে সে কীভাবে তার ওপর আল্লাহ তাআলার যে দয়া ও অনুগ্রহ, তা অনুভব করবে! (এটি তো অসম্ভব।)
আসলে তাদেরকে এ দিকে পরিচালিত করেছে প্রত্যক্ষ করার ক্ষেত্রে ফানা বা নিজেকে বিলীন করার উপত্যকায় চলার অনুপ্রেরণা। ফলে তারা আল্লাহকে ব্যতীত অন্য কোনো কারণ, মাধ্যম ও রীতিনীতিকে প্রত্যক্ষ ও অনুভব করার বিপক্ষে।
আমরা এই মাকামের স্বাদ ও আনন্দকে অস্বীকার করি না। নিঃসন্দেহে আল্লাহর-পথের-পথিক এ স্তরে পৌঁছে এমন স্বাদ ও আনন্দ অনুভব করেন, যা আর কেউ করতে পারে না। আমাদের বক্তব্য দ্বারা উদ্দেশ্য হলো এই অবস্থার চেয়ে সেই ব্যক্তির অবস্থা আরও বেশি উত্তম ও পরিপূর্ণ, যে নিজের কাজকর্ম ও সিদ্ধান্তসমূহ প্রত্যক্ষ করে এবং এর বিস্তারিত অবস্থাসমূহ দেখে আবার এটিও প্রত্যক্ষ করে যে, সেগুলো কেবল আল্লাহর ইচ্ছা ও তাঁর সাহায্যেই সে সম্পাদন করতে পেরেছে। এই ব্যক্তি তার দাসত্ব ও ইবাদাতের সাথে সাথে দাসত্বের তাওফীক দানকারী সত্তার প্রতিও দৃষ্টি দেয়। দুদিকেই সমান দৃষ্টি থাকে তার। (অনেকেই আছে শুধু আল্লাহর দিকে দৃষ্টি রাখে, আবার কেউ আছে কেবল ইবাদাত আর নিয়ামাতের দিকেই দৃষ্টি রাখে।)
এই দুটি অবস্থাই অসম্পূর্ণ। পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ অবস্থা হলো ব্যক্তি এটি প্রত্যক্ষ করবে যে, তার ইবাদাত-বন্দেগি সবই অর্জিত হয়েছে আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা, অনুগ্রহ, করুণা ও দয়ার বদৌলতে। সুতরাং আপনি যদি এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অনুপস্থিত থাকেন, তা হলে আপনার মাকাম হবে তাওবার মাকাম। আসলে দাসত্বের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, ব্যক্তিকে কেবল ক্ষতির মুখেই ঠেলে দেয়।
এ ক্ষেত্রে ওয়াজিব হলো, এ বিষয়ের সঠিক জ্ঞান জানার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দ্বারস্থ হওয়া এবং ঈমানের হাকীকতের নিকট নিজেকে পেশ করা, কারও রুচি বা পছন্দের নিকট নয়। তবে আমরা এই অবস্থার যে স্বাদ ও আনন্দ তা অস্বীকার করি না, আমরা অস্বীকার করি এই বিষয়টিকে যে, এই অবস্থাটা অন্যদের চেয়ে পরিপূর্ণ। কুরআন-সুন্নাহর কোথাও কি এর প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে? অথবা সাহাবা-তাবিয়ীনের কথাবার্তার কোথাও কি এই ইশারা-ইঙ্গিত রয়েছে যে, এ রকম ফানা হয়ে যেতে হবে আর এটিই হলো পূর্ণাঙ্গতা? কিংবা কোথাও এ রকম কথা রয়েছে যে, বান্দা যদি তার কাজকে আল্লাহর সাহায্য, শক্তি ও অনুগ্রহের মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছে বলে দেখতে পায় এবং এর কারণ যদি সে প্রত্যক্ষ করে, তা হলে এর থেকে তাওবা করা ওয়াজিব? এই বিষয়টুকু অস্বীকার করা তাদের জন্য খুব কঠিন হয়ে যাবে। তারা এর অস্বীকারকারীকে ছুঁড়ে ফেলবে এবং বলবে, সে এ সম্পর্কে অজ্ঞ এবং সে এই মাকাম পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি, যদি এ পর্যন্ত পৌঁছত, তা হলে সে এটিকে অস্বীকার করতে পারত না। আসলে এগুলো এমন কোনো দলীল না যে, এগুলোর সাহায্যে তাদের দাবি সহীহ বলে প্রমাণিত হয়। আবার এগুলো সঠিক কোনো জবাবও নয়। এই অজ্ঞ ব্যক্তি আপনাদের কাছে একটি শারঈ মাসআলা জিজ্ঞাসা করেছে আর আপনারা এর যে উত্তর দিচ্ছেন, তা তো সেটার কোনো জবাব নয়।
আল্লাহর কসম! নিশ্চয় সেই ব্যক্তি আপনাদেরকে এর চেয়ে আরও বড়ো মর্যাদা ও উচ্চ মাকাম থেকে বঞ্চিত হিসেবেই দেখছে। শুধুমাত্র ফানা, আল্লাহর পরিচালনাগত বিষয়াদি প্রত্যক্ষ করা থেকে বিরত থাকা, উপকরণ, কারণ আর মাধ্যম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার মধ্যেই ভূরি ভূরি জ্ঞানের ভান্ডার, মা'রিফাত আর দাসত্ব নিহিত নেই। পূর্ণাঙ্গ মা'রিফাত, দাসত্ব আর ইবাদাত-বন্দেগি কি কেবল এই সমস্ত বস্তুর মধ্যেই রয়েছে? অথচ পুরা কুরআনই আল্লাহ তাআলার নিদর্শনাবলি সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করা, সৃষ্টিজগতের অবস্থার প্রতি দৃষ্টি দেওয়া, মানুষের নিজের শরীর ও তার বিভিন্ন অবস্থা সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ করা ইত্যাদির আলোচনায় ভরপুর।
এর চেয়েও বিশেষ ব্যাপার হলো সেসব বিষয়, যা বান্দা আখিরাতের জন্য অগ্রীম পাঠিয়েছে তা পর্যবেক্ষণ করা, আল্লাহ তাআলা বান্দাকে ঈমান, নেককাজ করার তাওফীক ও হিদায়াতের দ্বারা যে নিয়ামাত দান করেছেন তা স্মরণ করা, তাতে চিন্তা-ফিকির করা, এর জন্য আল্লাহ তাআলার প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা আদায় করা। এগুলো ফানা ও ফানা-সংশ্লিষ্ট বিষয়াদির সাথে কখনো অর্জন করা সম্ভব নয়।
তারপর কথা হলো আপনাদের বক্তব্য সত্যিকারার্থে বাস্তবায়ন করা একটি অসম্ভব ব্যাপার-আপনারা বলেছেন তাওবার বিষয়টি দেখতে পাওয়া একটি ইল্লত বা দোষ, এ থেকে আবার তাওবা করা জরুরি। এটি অসম্ভব হওয়ার কারণ হিসেবে বলব, তার সেই প্রত্যক্ষ করাকে প্রত্যক্ষ করাও তো একটি দোষের ব্যাপার; যা থেকে তাওবা করা আবশ্যক। এমনিভাবে সেই দেখতে পাওয়াও একটি দোষ; তা থেকেও তাওবা করা জরুরি। এ রকমভাবে বিষয়টি একের পর এক অবিরামভাবে চলতেই থাকবে। সার্বিকভাবে এর প্রতি কোনো রকম ভ্রুক্ষেপ না করার মাধ্যমেই কেবল এটি শেষ হতে পারে। এই রকম পাগলামি আর বিলুপ্তি তো দাসত্বেরই বিপরীত ও বিরোধী, সুতরাং এগুলো ইবাদাত-বন্দেগি আর দাসত্বের চূড়ান্ত গন্তব্য হয় কীভাবে?
সুতরাং এখন আপনি সালাতের ভেতরের বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিতভাবে চিন্তা- ফিকির করলে বুঝতে পারবেন যে, সেগুলো প্রত্যক্ষ না করলে তা পরিপূর্ণ হয় না। (যেগুলো থেকে আপনি অনুপস্থিত থাকলে দাসত্বের ক্ষেত্রে তা ত্রুটিপূর্ণ বলে বিবেচিত হবে।) দেখুন, সালাত আদায়কারী সালাত আদায়ের শুরুতে বলবে,
إِنِّي وَجَهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيفًا
"আমি একনিষ্ঠভাবে নিজের চেহারা সেই সত্তার দিকে ফিরিয়ে নিলাম, যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন।” [৬৫]
এই কথার দাসত্ব হবে: তার চেহারার বিষয়টি প্রত্যক্ষ করা আর তা হলো তার ইচ্ছা ও নিয়ত। এমনিভাবে হানাফিয়্যাতও প্রত্যক্ষ করবে আর তা হলো আল্লাহর প্রতি তার একনিষ্ঠতা। এরপর সে বলবে,
إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
"আমার সালাত, আমার যাবতীয় ইবাদাত, আমার জীবন, আমার মরণ সবকিছুই বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহর জন্য।”[৬৬]
এই কথার দাসত্ব হলো: সে তার সালাত ও অন্যান্য ইবাদাত যা একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্যই নিবেদিত তা প্রত্যক্ষ করবে। এখন যদি সে তা থেকে অনুপস্থিত থাকে, তা হলে সে আল্লাহর কাছে মুখে এমন কথা বলছে; যা থেকে তার অন্তর শূন্য, সুতরাং কীভাবে এটা সেই ব্যক্তির চেয়ে পরিপূর্ণ ও উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হবে, যে তার অন্তরকে কাজকর্ম ও দাসত্বের সাথে নিবেদিত রাখে, সেগুলোকে সে আল্লাহর প্রতি সম্পৃক্ত করে এবং এটাও প্রত্যক্ষ করে যে, সেগুলো একমাত্র আল্লাহ তাআলারই জন্য?! (সত্যিকারার্থেই এই দুইজনের মধ্যে রয়েছে অনেক ব্যবধান।)
তবে ফানার অধিকারী ব্যক্তির পরিণতি ও চূড়ান্ত অবস্থা হিসেবে বলা যায় সে অক্ষম; তার মাকাম সর্বোচ্চ ও সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ তা কশ্চিনকালেও নয়। এমনিভাবে যখন সে তিলাওয়াত করবে,
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
"আমরা কেবল তোমারই দাসত্ব করি, আর তোমার কাছেই সাহায্য চাই।”[৬৭]
এই কথার দাসত্ব হবে: ইবাদাত করা ও সাহায্য প্রার্থনা করার অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা, এ দুটি বিষয়কে অন্তরে উপস্থিত রাখা, তা কেবল আল্লাহর জন্যই নিবেদন করা এবং তিনি ব্যতীত অন্য সবার থেকে প্রত্যাখ্যান করা। এই বিষয়টি অন্তর অনুপস্থিত রেখে, শুধু মুখে মুখে উচ্চারণ করার চেয়ে পরিপূর্ণ।
এমনিভাবে যখন সে তার রুকূতে গিয়ে বলবে, اللَّهُمَّ لَكَ رَكَعْتُ وَبِكَ آمَنْتُ وَلَكَ أَسْلَمْتُ خَشَعَ لَكَ سَمْعِي وَبَصَرِي وَمُخِّي وَعَظْمِي وَعَصَبِى وَمَا اسْتَقَلَّتْ بِهِ قَدَمَى
“হে আল্লাহ, তোমার উদ্দেশ্যে রুকূ করলাম, তোমার প্রতি ঈমান আনলাম এবং তোমার কাছে আত্মসমর্পণ করলাম। আমার কান, চোখ, মগজ, হাড়, স্নায়ুতন্ত্র এবং আমার দু'পা যা বহন করে-সবই তোমার কাছে বিনত হলো।” [৬৮]
সুতরাং এই কথাগুলোর দাসত্ব কীভাবে আদায় করবে সেই ব্যক্তি, যে তার কাজকর্ম থেকে অনুপস্থিত, যে রয়েছে তার ফানার মধ্যে নিমজ্জিত? এগুলো তা হলে তার মুখে উচ্চারিত কিছু আওয়াজ ব্যতীত আর কী? যদি অপারগতা ও ওজর না থাকত, তা হলে এগুলো দাসত্ব ও ইবাদাত হিসেবেই গণ্য হতো না। (পরিপূর্ণ অবস্থা হওয়া তো দূরের কথা!)
তবে এ কথা অস্বীকার করা যায় না যে, বান্দার নিজের কাজকর্ম প্রত্যক্ষ করা, সেখানেই থেমে থাকা, সেগুলোর কারণে প্রকৃত নিয়ামাতদাতা, তাওফীকদাতা ও অনুগ্রহকারী সত্তা থেকে দূরে থাকা অনেক বড়ো ত্রুটি এবং দাসত্বের পথে অনেক বড়ো প্রতিবন্ধক। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
يَمُنُّوْنَ عَلَيْكَ أَنْ أَسْلَمُوا قُل لَّا تَمُنُّوْا عَلَيَّ إِسْلَامَكُمْ بَلِ اللَّهُ يَمُنُّ عَلَيْكُمْ أَنْ هَدَاكُمْ لِلْإِيْمَانِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ
“তারা মুসলমান হয়ে আপনাকে ধন্য করেছে বলে মনে করে। আপনি বলুন, 'তোমরা মুসলমান হয়ে আমাকে ধন্য করেছ বলে মনে কোরো না; ঈমানের পথে পরিচালিত করে বরং আল্লাহ তোমাদেরকেই ধন্য করেছেন, যদি তোমরা সত্যনিষ্ঠ হয়ে থাকো।” [৬৯]
সুতরাং আরিফ বা আল্লাহর মা'রিফাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ তাদের দাসত্বকে প্রত্যক্ষ করার পাশাপাশি আল্লাহ তাআলা যে দয়া ও অনুগ্রহ তাদের প্রতি করেছেন, তাতে তারা নিমগ্ন থাকেন। জাহিল-মূর্খরা আল্লাহর অনুগ্রহের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া থেকে গাফিল ও অন্যমনস্ক থাকে। আর ফানার গুণে গুণান্বিত ব্যক্তি নিমগ্ন থাকেন শুধু আল্লাহর প্রতি, (সে আর কিছু দেখে না) অথচ তা আল্লাহ তাআলার বিধান অনুসারেই অসম্পূর্ণ। কারণ আল্লাহ তাআলা প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি আদর্শ ও ভারসাম্যপূর্ণ পরিমাণ নির্ধারিত করে দিয়েছেন।
টিকাঃ
[৬৩] 'মানযিলুস সায়িরীন'-গ্রন্থের লেখক প্রতিটি মানযিলকে তিনটি স্তরে ভাগ করেছেন: ১. সাধারণ ব্যক্তিদের মানযিল, ২. বিশেষ ব্যক্তিদের মানযিল এবং ৩. অতি বিশেষ ব্যক্তিদের মানযিল; যা ফানার মানযিলে পৌঁছে দেবে। ইবনুল কাইয়্যিম এই পদ্ধতি ও প্রকারভেদকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই আলোচনাটিই হলো তার নমুনা। এটার ওপরই বাকিগুলোকে ধারণা করে নিন। কারণ এই গ্রন্থে এই বিষয়ে আর কোথাও আলোচনা করা হয়নি।
[৬৪] সাধারণ ও মধ্যম শ্রেণির তাওবার উল্লেখের পর এটি অতি বিশেষ শ্রেণির ব্যক্তিদের তাওবার আলোচনা।
[৬৫] সূরা আনআম, ৬: ৭৯।
[৬৬] সূরা আনআম, ৬: ১৬২।
[৬৭] সূরা ফাতিহা, ১:৫।
[৬৮] মুসলিম, ৭৭1।
[৬৯] সূরা হুজুরাত, ৪৯: ১৭।