📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 মাকবুল তাওবার কিছু আলামত

📄 মাকবুল তাওবার কিছু আলামত


আল্লাহ্‌ তা’আলার নিকট গ্রহণ যোগ্য বিশুদ্ধ তাওবার কিছু আলামত বা নিদর্শন রয়েছে:
এক. তাওবা করার পরের অবস্থা, তাওবা করার আগের অবস্থার চেয়ে উত্তম হবে।
দুই. সবসময় ভয় করবে, আল্লাহ্‌ তা’আলার পাকড়াও থেকে সে নিজেকে কখনো নিরাপদ মনে করবে না। আসলে তার ভয় ও আশঙ্কা ততক্ষণ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত-না মৃত্যুর ফেরেশতাদের নিকট সে এই সুসংবাদ শোনে-
أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالجَنَّةِ الَّتِي كُنتُمْ تُوعَدُونَ )
“তোমরা ভীত হয়ো না, দুঃখ করো না এবং সেই জান্নাতের সুসংবাদ শুনে খুশি হও, যার প্রতিশ্রুতি তোমাদের দেওয়া হয়েছে।”[৫৩]
সুতরাং ভয়ভীতির আশঙ্কা কেবল তখনই দূর হবে, এর আগে নয়।
তিন. অনুতাপ, অনুশোচনা আর ভয়ে অন্তর চৌচির হয়ে যাওয়া। এই অবস্থার সৃষ্টি হয় অপরাধের ছোটো-বড়ো বিবেচনায়। এটি হলো ইবনু উয়াইনা -এর ব্যাখ্যা। তিনি আল্লাহ্‌ তা’আলার এই আয়াত থেকে তা গ্রহণ করেছেন-
إِلَّا أَنْ تَقَطَّعَ قُلُوبُهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ )
“যে পর্যন্ত-না তাদের অন্তরগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, মহাবিজ্ঞ।" [৫৪]
ইবনু উয়াইনা বলেন, 'অর্থাৎ যে পর্যন্ত-না তাদের অন্তরগুলো তাওবার দ্বারা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।'[৫৫] এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, মহাশাস্তির চরম ভয় অন্তরকে চৌচির করে দেয়। আর এটিই হলো অন্তরকে ছিন্নভিন্ন করা। প্রকৃত তাওবা একেই বলে। কারণ নিজের অপকর্মের দরুন আফসোস ও অনুশোচনা এবং এর খারাপ পরিণতির ভয়, তার অন্তরকে টুকরো টুকরো করে দেয়। যে ব্যক্তির অন্তর দুনিয়ার জীবনে গুনাহের অনুতাপে চৌচির হবে না, আখিরাতে যখন প্রকৃত অবস্থা প্রকাশিত হবে, আনুগত্যশীল বান্দাদের পুরস্কার আর অবাধ্য-পাপীদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে, তখন ঠিকই তার অন্তর চৌচির হয়ে যাবে। আসলে অন্তর ছিন্নভিন্ন ও চৌচির হবেই; হয়তো দুনিয়াতে নয়তো আখিরাতে।
বিশুদ্ধ তাওবার একটি বিশেষ দিক হলো: তাওবার দ্বারা অন্তরে বিশেষ ভাঙনের সৃষ্টি হয়; যার ব্যথা-বেদনা আর কোনোকিছুর সাথেই মেলে না। গুনাহগার আর পাপী ব্যক্তিরই এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়। এটি ক্ষুধা-তৃষ্ণা, পরিশ্রম-সাধনা কিংবা খাঁটি ভালোবাসার মাধ্যমেও অর্জন করা যায় না। এ সবগুলো থেকে ভিন্ন একটি বিষয় এটি। রবের সামনে অন্তরকে পরিপূর্ণভাবে ভেঙে ফেলা; যার ব্যাপ্তি চতুর্দিকে ছড়ানো। এটি আল্লাহর সামনে তাকে অত্যন্ত বিনয়ী, লাঞ্ছিত, অপদস্থ করে নিক্ষেপ করে। যেমন, গুরুতর অপরাধে অপরাধী কোনো গোলাম, যে তার মনিব থেকে পালিয়ে গেছে। অতঃপর তাকে ধরা হয়েছে এবং তাকে তার মনিবের সামনে উপস্থিত করা হয়েছে। তাকে উদ্ধার করার মতো কেউ নেই, আবার মনিব ছাড়া তার কোনো উপায়ও নেই, তার থেকে পালাবার কোনো পথও নেই। সে জানে, তার জীবন-সৌভাগ্য-সফলতা-মুক্তি সবই রয়েছে কেবল মনিবের সন্তুষ্টির মধ্যে। সে এ-ও জানে যে, তার সব রকমের পাপাচার সম্পর্কে তার মনিব খুব ভালোভাবে অবগত। এর সাথে সাথে মনিবের প্রতি তার ভালোবাসা ও তীব্র প্রয়োজনও বিদ্যমান থাকে, এবং সে খুব ভালো করেই জানে, তার নিজের দুর্বলতা ও অসহায়ত্ব আর তার মনিবের বিপুল ক্ষমতা ও শক্তি।
সুতরাং এই সমস্ত অবস্থা থেকে সৃষ্টি হয় ভাঙন, বিনম্রতা ও অপদস্থতা; যা তার জন্য কত-না উপকারী! এ রকম অবস্থা নিয়ে যে ফিরে আসে, সে কত-না অধিক প্রতিদানের উপযুক্ত! এর দ্বারা ক্ষতিপূরণ করা কত-না মহান! এর মাধ্যমে গোলাম তার মনিবের কত-না নৈকট্য হাসিল করে! তার মনিবের নিকট এই বিনম্রতা, অপদস্থতা, রোনাজারি, তার সামনে নিজেকে সমর্পণ করার চেয়ে পছন্দনীয় আর কিছু নেই।
আল্লাহর শপথ! এই অবস্থায় তার এই কথা কতই-না মধুর-
أَسْأَلُكَ بِعِرِّكَ وَذُلَّى لَكَ إِلَّا رَحِمْتَنِي. أَسْأَلُكَ بِقُوَّتِكَ وَضُعْفِي، وَبِغِنَاكَ عَنِّي وَفَقْرِى إِلَيْكَ. هَذِهِ نَاصِيَتِي الْكَاذِبَةُ الخَاطِئَةُ بَيْنَ يَدَيْكَ. عَبِيدُكَ سِوَايَ كَثِيرٌ، وَلَيْسَ لِي سَيِّدٌ سِوَاكَ. لَا مَلْجَأَ وَلَا مَنْجى مِنْكَ إِلَّا إِلَيْكَ. أَسْأَلُكَ مَسْأَلَةَ الْمِسْكِينِ، وَأَبْتَهِلُ إِلَيْكَ ابْتِهَالَ الخَاضِعِ الدَّلِيلِ، وَأَدْعُوكَ دُعَاءَ الخَابِفِ الضَّرِيْرِ، سُؤَالَ مَنْ خَضَعَتْ لَكَ رَقَبَتُهُ، وَرَغِمَ لَكَ أَنْفُهُ، وَفَاضَتْ لَكَ عَيْنَاهُ، وَذَلَّ لَكَ قَلْبُهُ
'আমি আপনার ইজ্জত ও আপনার প্রতি আমার অপদস্থতার দোহাই দিয়ে কেবল এই প্রার্থনাই করছি যে, আপনি আমার ওপর দয়া করুন। আমি আপনার কাছে চাচ্ছি আপনার ক্ষমতা ও আমার দুর্বলতার ওসীলায়, আমার থেকে আপনার অমুখাপেক্ষিতা ও আপনার প্রতি আমার মুখাপেক্ষিতার ওসীলায়, আমার এই মিথ্যা, ভুলে-ভরা কপাল আপনার কবজায়, আমাকে বাদে আপনার অসংখ্য বান্দা রয়েছে, কিন্তু আপনি ছাড়া আমার আর কোনো মালিক নেই, আপনি ব্যতীত আপনার কাছ থেকে মুক্তি ও আশ্রয় পাবার আর কোনো জায়গা নেই। আমি আপনার নিকট মিসকীন ও অসহায়ের ন্যায় ভিক্ষা চাচ্ছি, বিনয়ী ও অপদস্থ ব্যক্তির মতো আমি আপনার দিকে ধাবিত হচ্ছি, আমি আপনাকে ডাকছি ভীত ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির মতো এবং সেই ব্যক্তির চাওয়ার মতো আমি আপনার নিকট চাচ্ছি; যে নিজের ঘাড়কে আপনার সামনে নত করে দিয়েছে, আপন নাককে যে ধূলি ধূসরিত করেছে, আপনার কাছে যার দুচোখ অঝোর ধারায় অশ্রু ছেড়ে দিয়েছে এবং যে নিজের অন্তরকে কেবল আপনার জন্যই বিনীত করেছে।'
এই অবস্থা এবং এর অনুরূপ অন্যান্য অবস্থা হলো আল্লাহর কাছে মাকবুল বা গ্রহণযোগ্য তাওবার প্রভাব। সুতরাং যে ব্যক্তি তার অন্তরে এ রকম অবস্থা পাবে না, সে যেন নিজের তাওবাকে ত্রুটিযুক্ত মনে করে এবং তা সংশোধন করার প্রতি মনোযোগী হয়। প্রকৃতপক্ষে খাঁটি তাওবা বেশ কঠিন, কিন্তু মুখের কথায় ও উচ্চারণে কত-না সহজ! সত্যবাদী ব্যক্তি খাঁটি ও সত্য তাওবা অর্জনের চেয়ে কঠিন কোনোকিছুর জন্য পরিশ্রম করেনি। গুনাহ থেকে বাঁচার আর নেককাজ করার শক্তি কেবল আল্লাহ তাআলারই দান।

টিকাঃ
[৫৩] সূরা ফুসিলাত, ৪১: ৩০।
[৫৪] সূরা তাওবা, ৯: ১১০।
[৫৫] ইবনু আবী হাতিম, তাফসীর, ৬/১৮৮৬।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 ইবাদাতের অহংকার থেকে বাঁচুন

📄 ইবাদাতের অহংকার থেকে বাঁচুন


তাওবার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: আল্লাহ তাআলার নাফরমানি থেকে দূরে থাকা, আল্লাহ তাআলাকে ভয় করা, তাঁর আদেশসমূহ পালন করা এবং নিষেধগুলো থেকে বেঁচে থাকা। এর ফলে বান্দা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত নূরের ভিত্তিতে আল্লাহর আনুগত্য করতে থাকে এবং তাঁর নিকট প্রতিদানের আশা করে। এমনিভাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত নূরের ভিত্তিতে অবাধ্যতা ও নাফরমানি পরিত্যাগ করে, তাঁর শাস্তির ভয় করে এবং এর মাধ্যমে ইবাদাত ও আনুগত্যের গৌরব করে না। আসলে ইবাদাত ও তাওবার মাঝে প্রকাশ্য ও গোপন অহংকার আছে। সুতরাং গর্ব-অহংকার করা তার উদ্দেশ্য হয় না। যদিও সে জানে যে, তাওবা ও ইবাদাতের মাধ্যমে তা অর্জিত হয়। যে ব্যক্তি সম্মান অর্জনের জন্য ও গর্ব-অহংকার করার জন্য তাওবা করে, তার তাওবা বেশ ত্রুটিপূর্ণ।
একটি হাদীসে এসেছে, "আল্লাহ তাআলা তাঁর নবিদের মধ্য থেকে একজন নবির নিকট ওহি পাঠিয়েছেন যে, 'আপনি অমুক দুনিয়াবিমুখ বান্দাকে বলুন, 'তোমার দুনিয়াবিমুখতার দ্বারা তো তুমি নিজেরই আরাম-আয়েশকে ত্বরান্বিত করলে। আবার আমার দিকে ধাবিত হয়ে তো তুমি তোমার জন্যই ইজ্জত-সম্মান অর্জন করে নিলে। তা হলে আমার জন্য তুমি কী আমল করলে?' যাহিদ ব্যক্তি বলল, 'হে আমার রব, এগুলোর পরেও কী আমার ওপর আপনার কোনো হক রয়েছে?' আল্লাহ বললেন, 'তুমি কি আমার সন্তুষ্টির জন্য আমার কোনো বন্ধুকে ভালোবেসেছিলে কিংবা আমার সন্তুষ্টির আশায় আমার কোনো শত্রুকে শত্রু হিসেবে নিয়েছিলে? ৫।
অর্থাৎ শান্তি ও সম্মান তোমার অংশ। আর দুনিয়াবিমুখতা ও ইবাদাত-বন্দেগির দ্বারা তুমি তা অর্জনও করে নিয়েছ। কিন্তু আমার হক আদায়ের বিষয়টি কোথায়, আর তা হলো আমার সন্তুষ্টির জন্য বন্ধুত্ব করা এবং আমার সন্তুষ্টির জন্য শত্রুতা করা? আসলে ইলম ও অবস্থার দিক দিয়ে আদেশ-নিষেধের ক্ষেত্রে নিজের অংশ ও রবের অংশ পৃথক করাই কাম্য।
অনেক সাদিক বা সত্যবাদী এমন রয়েছে, যারা কেবল নিজের অংশ অন্বেষণেই ব্যস্ত থাকে। নিজের অংশ ও রবের অংশের মাঝে পার্থক্য করে কেবল তারাই, তাদের মধ্যে যারা বিচক্ষণ। সত্যবাদীদের মধ্যে তাদের সংখ্যা খুবই অল্প; যেমন মানুষের মধ্যে সত্যবাদীদের সংখ্যা অনেক কম।
প্রকাশ্য-কবীরা গুনাহ ও পাপাচার থেকে বেঁচে থাকে এমন অনেক মানুষ আছে, যারা ঠিক সেই রকম (আত্মিক) অনেক কবীরা গুনাহ বা সেগুলোর চেয়ে বড়ো অথবা তার চেয়ে কম বিভিন্ন গুনাহে লিপ্ত। অথচ তাদের অন্তরে এই ধারণাও আসে না যে, তা গুনাহ, এর থেকে তাওবা করা প্রয়োজন। কিন্তু কবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিদের তারা ঠিকই ঘৃণা করে, তুচ্ছ ভাবে। তাদের অবস্থা দেখে মনে হয় তাদের আনুগত্য-ইবাদাতের ক্ষমতা ও অনুগ্রহ সমগ্র সৃষ্টির ওপর ছড়ানো। তাদের ভেতরগত চাহিদা হলো সবাই তাদের নেককাজের জন্য তাদের সম্মান করুক; এটি এমন এক চাহিদা যা কারও নিকট গোপন থাকে না। এমনিভাবে এ সংশ্লিষ্ট আরও অনেক বিষয়ে তারা আচ্ছন্ন; যা আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে ঘৃণিত, তারা তাঁর দরজা থেকে প্রকাশ্যে কবীরা গুনাহকারীদের চেয়েও বেশি দূরে। আল্লাহ তাআলা যদি কাউকে কবীরা গুনাহে লিপ্ত করান, যার মাধ্যমে বান্দা নিজের নফসকে ভেঙে ফেলে, অনুশোচনায় দগ্ধ হয়, নিজের মর্যাদা ও পরিচয় উপলব্ধি করে, নিজেকে বিনয়ী করে এবং ইবাদাতের অহংকার থেকে বের হয়—তা হলে এটি তার জন্য রহমতস্বরূপ। যেমন আল্লাহ তাআলা যখন কবীরা গুনাহকারীদের পরিশোধন করেন খাঁটি তাওবা ও তাঁর প্রতি তাদের অন্তর ধাবিত করার মাধ্যমে, তখন তা তাদের জন্য রহমতস্বরূপ হয়। সুতরাং এর বিপরীত হলে দুদলই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

টিকাঃ
[৫৬] সুয়ূতি, আল-জামিউস সগীর, ৪৯২৪, দঈফ।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 বান্দাকে গুনাহ করতে ছেড়ে দেওয়ার রহস্য

📄 বান্দাকে গুনাহ করতে ছেড়ে দেওয়ার রহস্য


জেনে রাখুন, বিচক্ষণ ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি থেকে যখন কোনো গুনাহ সংঘটিত হয়ে যায়, তখন কয়েকটি বিষয়ের প্রতি তার দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে—
১. আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুতি ও ভীতিপ্রদর্শনের দিকে সে দৃষ্টি দেয়। ফলে এটি তার মাঝে ভয় সৃষ্টি করে; যা তাকে তাওবা করতে উদ্বুদ্ধ করে।
২. তার প্রতি আল্লাহ তাআলার কী আদেশ ও নিষেধ রয়েছে সেদিকে সে দৃষ্টি দেয়। ফলে তার কৃতকাজটি যে গুনাহ তার স্বীকৃতি দেওয়ার প্রবণতা তার মধ্যে তৈরি করে এবং সে যে গুনাহ করেছে তা স্বীকার করে নেয়।
৩. সে এদিকেও দৃষ্টি ফেরায় যে, আল্লাহ তাআলা তাকে গুনাহের কাজটি করার অবকাশ দিয়েছেন এবং এর মাঝের সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে দিয়েছেন। তিনি ইচ্ছা করলে তাকে এর থেকে নিরাপদ রাখতে পারতেন, আবার গুনাহ করার মাঝে ও তার মাঝে বাধাও সৃষ্টি করে দিতে পারতেন। এই দৃষ্টিভঙ্গির ফলে সে আল্লাহ তাআলার সত্তা, নামসমূহ, গুণাবলি, হিকমত, রহমত, মাগফিরাত, ক্ষমা, সহনশীলতা ও দয়া সম্পর্কে বিভিন্ন প্রকার প্রজ্ঞা ও মা'রিফাত জানতে পারবে। আল্লাহ সম্পর্কে এই প্রজ্ঞা ও মা'রিফাত তাঁর নামসমূহের প্রতি দাসত্বকে আবশ্যক করবে; যা এই পরিস্থিতি ব্যতীত কখনো হাসিল হতো না। সে আরও জানতে পারবে আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি ও আদেশ, প্রতিদান, প্রতিশ্রুতি ও ভীতিপ্রদর্শনের সাথে তাঁর নাম ও গুণাবলির সম্পর্ক কী এবং বাস্তবে সেগুলো আল্লাহ তাআলার নাম ও গুণাবলিরই বৈশিষ্ট্য ও প্রভাব। নিশ্চিতভাবেই আল্লাহ তাআলার প্রতিটি নাম ও গুণের প্রভাব ও কার্যক্ষমতা রয়েছে।
তার এই দর্শন তাকে মা'রিফাত, ঈমান, তাকদীর ও হিকমতের রহস্য সম্পর্কে অনেকগুলো মনোরম বাগানের সন্ধান দেবে; যার বর্ণনা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। (এরপরও কিছু উল্লেখ করা হলো-)
• এর মাধ্যমে বান্দা ফায়সালার ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার শক্তিমত্তা সম্পর্কে জানতে পারবে। মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তাআলা যা ইচ্ছা করেন তা-ই সংঘটিত করেন; তিনি পরিপূর্ণ ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হওয়ায় বান্দার ওপর নিজ হুকুম বাস্তবায়ন করে থাকেন।
যখন বান্দা তার মনিবের শক্তি ও ক্ষমতা সম্পর্কে জানতে পারবে এবং অন্তর দিয়ে তা অবলোকন করবে, তখন গুনাহের লাঞ্ছনা থেকে বাঁচতে আল্লাহর প্রতিই মনোযোগী হবে; যা তার জন্য অতি উত্তম ও উপকারী। কারণ তখন (চিন্তা-ভাবনার ক্ষেত্রে) সে নিজের নফসের সাথে নয়, স্বয়ং আল্লাহর সাথে অবস্থান করে।
ফায়সালা করার ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার ক্ষমতা ও শক্তির পরিচয় পাওয়ার মধ্যে এটাও শামিল: ব্যক্তি জানতে পারবে যে, তাকে পরিচালিত করা হয়, তার সম্পর্কে আল্লাহর সব সিদ্ধান্ত মেনে নিতে সে বাধ্য, তার কপাল রয়েছে অপরের হাতে, সে নিজে নিজে কোনোকিছু থেকে বাঁচতে পারে না; তিনি তাকে না বাঁচালে এবং তাঁর সাহায্য ব্যতীত কিছুই করার ক্ষমতা তার নেই। সে প্রশংসার প্রতিদান দানকারী, মহাপরাক্রমশালী এক সত্তার কবজায় লাঞ্ছিত ও তুচ্ছ।
• সে আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ সম্পর্কে জানতে পারবে যে, গুনাহে লিপ্ত হওয়া অবস্থায় তিনি তা ঢেকে রেখেছেন। পরিপূর্ণভাবে অবগত থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রকাশ করে দেননি। তিনি যদি চাইতেন, তা হলে সবার সামনে তাকে অপদস্থ ও লাঞ্ছিত করতে পারতেন; ফলে সবাই তার থেকে দূরে থাকত। এটা আল্লাহ তাআলার অনেক বড়ো মেহেরবানি ও দয়া। এ কারণেই আল্লাহ তাআলার একটি নাম السٹر 'পরম দানশীল'। বান্দার থেকে আল্লাহ তাআলা পরিপূর্ণ অমুখাপেক্ষী হওয়া সত্ত্বেও বান্দার প্রতি তিনি এই দান ও অনুগ্রহ করেছেন। অথচ বান্দা তাঁর প্রতি পরিপূর্ণভাবে মুখাপেক্ষী। এই কারণে বান্দা এই অনুগ্রহের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখতে এবং আল্লাহর এই মেহেরবানি, করুণা ও দয়া প্রত্যক্ষ করতেই ব্যস্ত হয়ে পড়বে। ফলে গুনাহের নীচতা থেকে বেরিয়ে এবং তা ভুলে গিয়ে আল্লাহ তাআলার সাথে অবস্থান করবে। আর এটি গুনাহ নিয়ে ব্যস্ত থাকা ও এর লাঞ্ছনার দিকে দৃষ্টিপাত করার চেয়ে বেশি উপকারী ও লাভজনক।
• সে এটাও প্রত্যক্ষ করবে যে, গুনাহ ও পাপে লিপ্ত থাকার কারণেও আল্লাহ তাকে শাস্তি না দিয়ে ধৈর্য ধরে আছেন। তিনি যদি চাইতেন, তা হলে গুনাহের শাস্তি দ্রুতই দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তাড়াহুড়ো না করে সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছেন।
এই বিষয়টি বান্দাকে আল্লাহ তাআলার حليم 'পরম সহিষ্ণু' নামের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে, আল্লাহর ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার গুণ সম্পর্কে তাকে অবগত করাবে এবং এই নামের প্রতি ভক্তি ও দাসত্বের মনোভাব তৈরি করবে।
• সে এটাও জানবে, আল্লাহ তাআলা তাকে যে ক্ষমা করে দিয়েছেন, তা হলো তাঁর অফুরন্ত দয়ার একটি অংশ। কারণ ক্ষমা করা আল্লাহ তাআলার অনেক বড়ো একটি অনুগ্রহ ও দয়া। অন্যথায় আল্লাহ যদি আপনাকে পাকড়াও করেন, তা হলেও তিনি ইনসাফকারী ও প্রশংসিত। ক্ষমা করা কেবল তার দয়া ও মেহেরবানি; আপনার কোনো হকের কারণে তিনি ক্ষমা করতে বাধ্য; বিষয়টি এমন নয়।
• এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বান্দার বিনয়, বশ্যতা, নম্রতা, অপদস্থতা ও তাঁর সামনে রোনাজারি করাকে বাড়িয়ে দেন। কারণ মানুষের নফস এইসব ক্ষেত্রে রুবুবিয়্যাতের সমকক্ষ হতে চায়। যদি সে ক্ষমতা পেত, তা হলে নিশ্চয়ই ফিরআউনের মতো কথা বলত। ফিরআউন ক্ষমতা পেয়েছিল বলে সে তা প্রকাশ করেছিল আর অন্যরা ক্ষমতা-শক্তি পায়নি, তাই তা গোপন রেখেছে। এই সমকক্ষতার প্রত্যাশা করা থেকে মুক্তি দেবে দাসত্বের বিনম্রতা ও অপদস্থতা। এর চারটি স্তর রয়েছে—
প্রথম স্তর: পুরা সৃষ্টিজগৎই এর অন্তর্ভুক্ত। আর তা হলো আল্লাহ তাআলার প্রতি মুখাপেক্ষিতার অপদস্থতা। সমস্ত আসমানবাসী ও জমিনবাসী তাঁর দিকে মুখাপেক্ষী ও অভাবী। আর তিনি একাই সবার থেকে অমুখাপেক্ষী। আসমান ও জমিনের প্রত্যেকেই তাঁর নিকট চায়; কিন্তু তিনি কারও কাছেই চান না।
দ্বিতীয় স্তর: ইবাদাত ও দাসত্বের বিনম্রতা। এটা হলো ইখতিয়ার বা পছন্দ করার বিনম্রতা। এটি কেবল অনুগত বান্দাদের সাথেই খাছ। আর ইবাদাত বা দাসত্বের রহস্য এখানেই নিহিত রয়েছে।
তৃতীয় স্তর: মহাব্বতের বিনয় ও নমনীয়তা। আসলে মহাব্বতকারী তার মাহবুব বা প্রিয় মানুষের প্রতি সত্তাগতভাবেই বিনয়ী ও দুর্বল থাকে। মহাব্বতের অনুপাতে এর কমবেশ হয়। প্রিয় মানুষের প্রতি নম্রতার ওপরই মহাব্বতের ভিত্তি স্থাপিত।
চতুর্থ স্তর: পাপাচার ও অপরাধের দরুন নম্রতা ও অপদস্থতা।
সুতরাং এই চারটি স্তর যখন একত্রিত হয়, তখন আল্লাহর জন্য নম্রতা ও বশ্যতা পরিপূর্ণতা লাভ করে। কেননা তখন ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ভয়ভীতি, মহাব্বত, ইনাবাত, আনুগত্য ও মুখাপেক্ষিতার কারণে আরও বেশি অপদস্থতা স্বীকার করে নেয়।
• আল্লাহ তাআলার নামসমূহের মাঝে যে প্রভাব রয়েছে, তা তার সংশ্লিষ্ট বিষয়াদিকে দাবি করে। যেমন পরিপূর্ণ উপকরণ লক্ষ্য অর্জন হওয়াকে দাবি করে। (বিষয়টি উদাহরণের মাধ্যমে সুস্পষ্ট হবে।) যেমন : السَّمِيعُ (সর্বশ্রোতা) ও الْبَصِيرُ (সর্বদ্রষ্টা) আল্লাহ তাআলার এই নাম দুটি দাবি করে শোনার ও দেখার বস্তুসমূহকে। এমনিভাবে الرَّزَّاقُ (রিয্কদানকারী) নামটি রিস্ক দেওয়া মতো কাউকে দাবি করে; الرَّحِيمُ (পরম দয়ালু) নামটি দয়া করা যায় এমন কাউকে দাবি করে। অনুরূপভাবে الْغَفُورُ (অতি ক্ষমাপরায়ণ), الْعَفُوٌّ (পরম ক্ষমাশীল), اَوَّابُ (তাওবা কবুলকারী), الْحَلِيمُ (পরম সহিষ্ণু) এই নামগুলো এমন কাউকে দাবি করে যাকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন, যার তাওবা কবুল করবেন এবং যার প্রতি তিনি সহনশীল হবেন। এই নামগুলো গুণহীন ও অকেজো হওয়া অসম্ভব। কারণ এগুলো হলো সর্বোত্তম নাম ও পরিপূর্ণতার গুণাবলি, সম্মান ও বড়োত্বের বৈশিষ্ট্যাবলি, প্রজ্ঞা, করুণা ও দানশীলতার কার্যক্রম। সুতরাং নিশ্চিতভাবেই সেগুলোর প্রভাব দুনিয়াতে প্রকাশ পাবে। আর এর প্রতি ইঙ্গিত প্রদান করেছেন আল্লাহ সম্পর্কে সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী—আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ ﷺ। তিনি বলেছেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْ لَمْ تُذْنِبُوا لَذَهَبَ اللهُ بِكُمْ وَلَجَاءَ بِقَوْمٍ يُذْنِبُونَ فَيَسْتَغْفِرُوْنَ اللَّهَ فَيَغْفِرُ لَهُمْ
“সেই সত্তার শপথ! যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তোমরা যদি গুনাহ না করতে, তা হলে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তোমাদেরকে সরিয়ে দিয়ে এমন সম্প্রদায় নিয়ে আসতেন যারা গুনাহ করত, অতঃপর ক্ষমা চাইত আর তিনি তাদের ক্ষমা করে দিতেন।”[৫৭]
• আরেকটি হিকমাহ হলো: সবচেয়ে বড়ো রহস্য—যা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না, যার কথা কেউ ইশারা-ইঙ্গিতেও বলার সাহস দেখায় না, এ দিকে ঈমানের আহ্বানকারীও প্রকাশ্যে আহ্বান করে না। বরং বিশেষ বান্দাদের অন্তর তা প্রত্যক্ষ করে; ফলে রবের প্রতি তাদের মা'রিফাত ও মহাব্বত, নিশ্চিন্ততা ও তাঁর প্রতি আগ্রহ, তাঁর অবিরাম স্মরণ, তাঁর দয়া, করুণা, অনুগ্রহ ও মেহেরবানির উপলব্ধি, দাসত্ব ও প্রভুত্ব সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান ও প্রজ্ঞা আরও বেড়ে যায়; আর তা হলো যা 'সহীহ বুখারি' ও 'সহীহ মুসলিম'-এ বর্ণিত আনাস ইবনু মালিক-এর হাদীস থেকে প্রমাণিত হয়। আনাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'নবি বলেছেন,
اللَّهُ أَشَدُّ فَرَحًا بِتَوْبَةِ عَبْدِهِ حِيْنَ يَتُوْبُ إِلَيْهِ مِنْ أَحَدِكُمْ كَانَ عَلَى رَاحِلَتِهِ بِأَرْضِ فَلَاةٍ فَانْفَلَتَتْ مِنْهُ وَعَلَيْهَا طَعَامُهُ وَشَرَابُهُ فَأَيْسَ مِنْهَا فَأَتَى شَجَرَةً فَاضْطَجَعَ فِي ظِلِّهَا قَدْ أَيْسَ مِنْ رَاحِلَتِهِ فَبَيْنَا هُوَ كَذَلِكَ إِذَا هُوَ بِهَا قَائِمَةً عِنْدَهُ فَأَخَذَ بِخِطَامِهَا ثُمَّ قَالَ مِنْ شِدَّةِ الْفَرَحِ اللَّهُمَّ أَنْتَ عَبْدِي وَأَنَا رَبُّكَ . أَخْطَأَ مِنْ شِدَّةِ الْفَرَحِ
"বান্দা যখন আল্লাহ তাআলার কাছে তাওবা করে, তখন আল্লাহ তার তাওবার কারণে ওই লোকের চেয়েও বেশি আনন্দিত হন, যে মরুভূমিতে তার বাহনে চড়ে আরোহন করছিল। অতঃপর বাহনটি তার নিকট হতে পালিয়ে গেল। আর সেই বাহনের ওপরই ছিল তার খাদ্য ও পানীয়। একসময় বাহনটি পাওয়ার ব্যাপারে সে আশা ছেড়ে দিলো। এরপর নিরাশ মনে একটি গাছের নিচে এসে গাছের ছায়ায় শুয়ে পড়ল। সে সেভাবেই সেখানে পড়ে থাকে; এমতাবস্থায় হঠাৎ বাহন জন্তুটি তার কাছে এসে দাঁড়ায়। ফলে দ্রুতই সে তার লাগাম ধরে ফেলে। এরপর আনন্দের আতিশয্যে বলে ওঠে, 'হে আল্লাহ, তুমি আমার বান্দা আর আমিই তোমার রব!' আনন্দ ও খুশির তীব্রতায় সে এমন ভুল করে বসে!”[৫৮]

টিকাঃ
[৫৭] মুসলিম, ২৭৪৯।
[৫৮] বুখারি, ৬৩০৯; মুসলিম, ২৭৪৭।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচুন

📄 শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচুন


মানুষকে গুনাহের আদেশ-দানকারী, গুনাহকে সুসজ্জিত করে সামনে উপস্থাপনকারী এবং গুনাহ ও পাপাচারে জড়িয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধকারী হলো তার সাথে নিযুক্ত-থাকা-শয়তান।
সুতরাং শয়তানের দিকে দৃষ্টিপাত করা এবং তার বিষয়টি আমলে নেওয়া, তাকে শত্রু হিসেবে গ্রহণ করতে, তার থেকে পরিপূর্ণরূপে বাঁচতে এবং নিজের অজান্তেই সে যেন তার উদ্দেশ্য পূরণ করতে না পারে, সে জন্য সতর্ক হতে সাহায্য করে। কারণ শয়তান চায় তার সাতটি ফাঁদের মধ্যে যেকোনো একটিতে মানুষকে লিপ্ত করাতে; যার একটি অপরটির চেয়ে বেশি কঠিন ও ভয়ানক। শয়তান তার সবচেয়ে কঠিন ফাঁদ থেকে নিম্নমানের ফাঁদে তখনই নামে, যখন তাতে লিপ্ত করাতে সে ব্যর্থ ও অক্ষম হয়ে পড়ে। তার সাতটি ফাঁদ হলো-
প্রথম ফাঁদ: কুফরের ফাঁদ; আল্লাহ তাআলাকে অস্বীকার করানো, তাঁর দ্বীনকে, তাঁর সাথে সাক্ষাৎকে, তাঁর পরিপূর্ণ গুণাবলিকে এবং তাঁর সম্পর্কে তাঁর রাসূলগণ যে সংবাদ দিয়েছেন, সেগুলোকে অস্বীকার করানো এবং কুফরের পথ অবলম্বন করানো। শয়তান যদি কারও সাথে এই উদ্দেশ্যে সফল হয়, তা হলে তার শত্রুতার আগুন ঠান্ডা হয়ে যায়, সে তার সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হয়ে অন্যদিকে মনোযোগ দেয়। আর যদি বান্দা শয়তানের এই ধোঁকাকে ব্যর্থ করে দেয়, যদি সে তার হিদায়াতের বিচক্ষণতার মাধ্যমে এর থেকে মুক্তি পায় এবং তার ঈমানের নূর অক্ষুণ্ণ থাকে, তা হলে শয়তান তখন তার দ্বিতীয় ফাঁদ সফল করার ষড়যন্ত্র আঁটে।
দ্বিতীয় ফাঁদ: বিদআতের ফাঁদ; ১. হকের বিপরীত বিশ্বাস করানোর মাধ্যমে; যা দিয়ে আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলদের পাঠিয়েছেন এবং কিতাব নাযিল করেছেন (তার বিপরীত)। বা ২. এমন কিছুকে ইবাদাত বানিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে; আল্লাহ তাআলা যার অনুমতি দেননি, যেমন: দ্বীনের মধ্যে নতুন নতুন রীতি ও প্রথা সৃষ্টি করা; যা আল্লাহ তাআলা কখনো কবুল করবেন না। অধিকাংশ সময়ই এই দুই বিদআত একত্রে অবস্থান করে। খুব কমই এ দুটি পরস্পর থেকে পৃথক হয়। যেমন একজন মনীষী বলেছেন, 'আমলি বিদআতের সঙ্গে কওলি বিদআতের বিবাহ হয়। অতঃপর তারা বাসর করে। যার ফলে তাদের থেকে কেবল কুসন্তানই জন্ম নেয়, যারা ইসলামি শহরগুলোতে বেড়ে উঠতে থাকে। অবশেষে তাদেরকে নিয়েই লোকজন আল্লাহর নিকট হইচই শুরু করে দেয়।' (অর্থাৎ সে বিদআতগুলোকেই উত্তম ইবাদাত হিসেবে গণ্য করে!)
কেউ যদি শয়তানের এই ধোঁকাকেও ছিন্নভিন্ন করে ফেলে, সুন্নাহর আলোর মাধ্যমে এই ফাঁদ থেকে মুক্তি পেয়ে যায়, রাসূল এবং যে সমস্ত সর্বোত্তম পূর্বসূরিগণ- যেমন: সাহাবায়ে কেরাম, তাবিয়িগণ-গত হয়েছেন তারা যেসব বিধিবিধানের ওপর আমল করেছেন, সেগুলোর যথাযথ অনুসরণ করে সেই ধোঁকা থেকে বেঁচে যায়। যদিও তাঁদের একজনের অনুসরণ করা থেকেও পরবর্তী যুগের ব্যক্তিরা রয়েছে অনেক দূরে। এর পরেও যদি কেউ তাঁদের অনুসরণ শুরু করে, তবে বিদআতিরা তাকে বাধা দেয় এবং বলে ওঠে, 'এটা বিদআত, নব উদ্ভূত'!
আল্লাহ তাআলার তাওফীকে বান্দা যখন শয়তানের এই ষড়যন্ত্রকেও কেটে সামনে এগিয়ে যায়, তখন শয়তান তার তৃতীয় ফাঁদের দিকে মনোযোগী হয়।
আসলে বিদআতের ফাঁদে সফল হওয়া শয়তানের নিকট অনেক বেশি পছন্দনীয়। কারণ এর দ্বারা দ্বীন নষ্ট হয়ে যায়, আল্লাহ তাআলা যা দিয়ে তাঁর রাসূলকে প্রেরণ করেছেন, তা বাতিল করে দেওয়া যায়; যারা বিদআত করে, তারা এর থেকে কখনো তাওবা করে না এবং এর থেকে কখনো ফিরে আসে না। বরং অন্যান্য লোকদেরও এর দিকে দাওয়াত দেয়। (বিদআত শয়তানের অতি পছন্দনীয় হওয়ার আরও একটি কারণ হলো) বিদআতের মাধ্যমে ইলম ছাড়াই আল্লাহ সম্পর্কে কথা বলা হয়, সুস্পষ্ট সুন্নাহর বিরোধিতা করা হয়, সুন্নাহপন্থিদের সাথে শত্রুতা করা হয় ও সুন্নাহর আলোকে নিভিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
বিদআত মানুষকে ছোটো অপরাধ থেকে ধীরে ধীরে বড়ো অপরাধের দিকে নিয়ে যায়। একসময় বিদআতকারী দ্বীন থেকেই বেরিয়ে যায়। ময়দা থেকে যেমন চুল বেরিয়ে যায়। আসলে বিদআতের ভয়ংকর ভয়ংকর ক্ষতি সম্পর্কে কেবল বিচক্ষণ ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিরাই উপলব্ধি করতে পারে। আর অন্ধরা থাকে এ সম্পর্কে গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত।
وَمَنْ لَّمْ يَجْعَلِ اللَّهُ لَهُ نُوْرًا فَمَا لَهُ مِنْ نُوْرٍ
"আল্লাহ যাকে আলো দেন না, তার জন্য আর কোনো আলো নেই।"[৫৯]
তৃতীয় ফাঁদ: কবীরা গুনাহের ফাঁদ; যদি এই উদ্দেশ্যে শয়তান সফল হয়, তা হলে কবীরা গুনাহগুলোকে ব্যক্তির চোখে সুসজ্জিত ও উত্তমরূপে উপস্থাপন করে। এর মাধ্যমে সে তার মনে কল্পনা ও আশার দুয়ার খুলে দেয়। শয়তান তাকে বলে, ঈমান তো শুধু অন্তরের বিশ্বাসের নাম। সুতরাং আমল তাতে কোনো প্রভাব ফেলবে না। কখনো কখনো সে তার জবানে ও কানে এমন কথা জারি করে দেয়, যার দ্বারা সমগ্র সৃষ্টিকেই সে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়। সেই কথাটি হলো-
لَا يَضُرُّ مَعَ التَّوْحِيدِ ذَنْبٌ، كَمَا لَا يَنْفَعُ مَعَ الشِّرْكِ حَسَنَةٌ 'তাওহীদ ঠিক থাকলে গুনাহ কোনো ক্ষতি করতে পারে না। যেমন শিরকের সাথে নেক আমল কোনো উপকারে আসে না।'
কেউ যদি আল্লাহ তাআলার তাওফীকে বা খাঁটি তাওবা করার মাধ্যমে শয়তানের এই কবীরা গুনাহের ষড়যন্ত্রকেও ভেঙে দেয়, তখন শয়তান তার পরের ফাঁদকে সফল করার দিকে অগ্রসর হয়।
চতুর্থ ফাঁদ: সগীরা বা ছোটো ছোটো গুনাহের ফাঁদ; সে এগুলোকে খুব তুচ্ছ করে দেখায়। সে বলে, 'তোমার কোনো ক্ষতি নেই, যখন তুমি কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকো। তুমি কি জানো না যে, কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকলে আর নেক আমল করতে থাকলে, ছোটো ছোটো গুনাহগুলোকে এমনিতেই ক্ষমা করে দেওয়া হয়!' এভাবে সে সগীরা গুনাহের বিষয়টিকে খুব সামান্য করেই উপস্থাপন করতে থাকে। যতক্ষণ-না ব্যক্তি এতে অভ্যস্ত ও ধারাবাহিক হয়। ফলে কবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি, যে তার গুনাহের কারণে ভয়ে ভয়ে থাকে এবং অনুশোচনা করে, সে-ও ধারাবাহিক সগীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির তুলনায় উত্তম অবস্থানে থাকে।
কেননা গুনাহের ওপর ধারাবাহিক হওয়া নিকৃষ্ট ও ভয়ংকর বিষয়। তাওবা-ইস্তিগফার করতে থাকলে কবীরা গুনাহ আর কবীরা থাকে না। অপরদিকে সগীরা গুনাহে অনড় থাকলে তা আর সগীরা থাকে না। নবি বলেছেন,
إِيَّاكُمْ وَمُحَقِّرَاتِ الذُّنُوْبِ؛ فَإِنَّمَا مَثَلُ مُحَقِّرَاتِ الذُّنُوْبِ كَقَوْمٍ نَزَلُوا فِي بَطْنِ وَادٍ، فَجَاءَ ذَا بِعُوْدٍ وَجَاءَ ذَا بِعُوْدٍ، حَتَّى أَنْضَجُوْا خُبْزَتَهُمْ، وَإِنَّ مُحَقِّرَاتِ الذُّنُوْبِ مَتَى يُؤْخَذُ بِهَا صَاحِبُهَا تُهْلِكُهُ
"তোমরা গুনাহকে তুচ্ছ ভাবা থেকে দূরে থাকো। গুনাহকে তুচ্ছ মনে করার উপমা হলো সেই সম্প্রদায়ের মতো; যারা একটি উপত্যকায় অবতরণ করেছে; অতঃপর একজন একটি কাঠ আনে, আরেকজন আরেকটি কাঠ আনে। (এভাবে অনেক কাঠ জমা হয়ে যায়) ফলে তারা তাদের রুটি পাকিয়ে ফেলে। গুনাহকে তুচ্ছ-জ্ঞানকারীকে যখন পাকড়াও করা হবে, তখন তার সেই ছোটো ছোটো গুনাহগুলোই তাকে ধ্বংস করে দেবে।[৬০]
যদি বান্দা সতর্কতা, সচেতনতা, সবসময় তাওবা, ইস্তিগফার ও গুনাহের পরে নেককাজ করার মাধ্যমে শয়তানের এই চক্রান্ত থেকেও মুক্তি পেয়ে যায়, তা হলে শয়তান তার পঞ্চম ফাঁদের দিকে ধাবিত হয়।
পঞ্চম ফাঁদ : বৈধ বিষয়াদির ফাঁদ; যা করতে সমস্যা নেই সেগুলোতে লিপ্ত করিয়ে দিয়ে বেশি বেশি ইবাদাত-বন্দেগি করা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে এবং আখিরাতের পাথেয় অর্জনে পরিশ্রম করা থেকে বিরত রাখে। এরপর শয়তান তাকে আস্তে আস্তে বৈধ বিষয় থেকে সুন্নাহ পরিত্যাগ করার দিকে নিয়ে যায়। তারপর সুন্নাহ ত্যাগ করা থেকে ওয়াজিব ছেড়ে দেওয়ার দিকে ধাবিত করে। সর্বনিম্ন যে বিষয়টি শয়তান তার থেকে লাভ করে তা হলো : লাভজনক অর্জন, সুউচ্চ মর্যাদা ও মানযিল থেকে ব্যক্তিকে বঞ্চিত রাখে। আসলে বান্দা যদি সেগুলোর মূল্য বুঝত ও উপলব্ধি করত, তা হলে সে কিছুতেই নৈকট্যলাভের একটি মাধ্যমও হাতছাড়া করত না। কিন্তু সে প্রকৃত অর্থে এর মূল্য জানে না!
এখন যদি কেউ শয়তানের এই চক্রান্ত থেকেও পরিপূর্ণ বিচক্ষণতা, হিদায়াত ও মা'রিফাতের নূর-যা ইবাদাত ও আনুগত্য অনুপাতে অর্জিত হয়—এর মাধ্যমে মুক্তি পায়; পরিণতিতে সে তার প্রতিটি মুহূর্তকেই লাভজনক কাজে ব্যয় করতে থাকে, তখন শয়তান তার পরের ফাঁদ সফল করার দিকে মনোযোগী হয়।
ষষ্ঠ ফাঁদ : অনুত্তম আমলের ফাঁদ; যে আমলগুলো অনুত্তম, অনাগ্রাধিকারপ্রাপ্ত সেগুলোতে লিপ্ত হবার প্ররোচনা দেয়, তার চোখে সেগুলোকে সুসজ্জিত করে তোলে। তাতে কী কী উপকার আছে, তা দেখিয়ে দেয়; যাতে সে উত্তম ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত আমল থেকে দূরে সরে যায়। কারণ যখন শয়তান মূল সাওয়াব থেকে বিরত রাখতে পারে না, তখন সে এই ফন্দি আঁটে যাতে সাওয়াব কম হয়।
এবং সুউচ্চ মর্যাদা ও মর্তবা থেকে বঞ্চিত হয়। সুতরাং তাকে বেশি মর্যাদার আমল থেকে কম মর্যাদার আমলের দিকে, উত্তম থেকে অনুত্তমের দিকে এবং আল্লাহ তাআলার নিকট বেশি পছন্দনীয় আমল থেকে সাধারণ আমলের দিকে ব্যস্ত করে রাখে।
কিন্তু এই স্তরের মানুষজন কোথায়? পুরা পৃথিবীতে তাদের সংখ্যা একেবারে হাতেগোনা। আসলে অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে শয়তান তার প্রথম ফাঁদেই ভরপুর সফল ও কামিয়াব হয়েছে।
বিভিন্ন প্রকার আমল ও আল্লাহর নিকট এর কী মর্যাদা, তা সঠিকভাবে উপলব্ধি করার মাধ্যমে, শ্রেষ্ঠত্বের মানযিলসমূহ সম্পর্কে জানার মাধ্যমে এবং উঁচু ও নিচু, ভালো ও মন্দ, নেতা ও প্রজা, সর্দার ও অধীনস্থ ইত্যাদির মাঝে পার্থক্য করার দ্বারা বান্দা যদি এই ফাঁদ থেকেও মুক্তি পেয়ে যায়, তা হলে শয়তান তার সর্বশেষ ফাঁদের দিকে ধাবিত হয়। আসলে আমল ও কথার মধ্যেও সর্দার ও অধীনস্থ, নেতা ও প্রজা, সর্বোচ্চ চূড়া ও সর্বনিম্ন চূড়া রয়েছে। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছে, 'ইস্তিগফারদের সর্দার )سَيِّدُ الْإِسْتِغْفار( হলো, বান্দা বলবে : اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّنِ، لَا إِلَهَ ..... إِلَّا أَنْتَ [৬১]
আরেকটি হাদীসে এসেছে, اَلْجِهَادُ ذِرْوَةُ سَنَامِ الْأَمْرِ "জিহাদ হলো সববিষয়ের সর্বোচ্চ চূড়া।"[৬২]
সপ্তম ফাঁদ: শয়তানের আক্রমণের ফাঁদ; এই ফাঁদটি ছাড়া শত্রুপক্ষ শয়তানের আর কোনো ফাঁদ অবশিষ্ট থাকে না। এই ধোঁকা থেকে যদি কেউ মুক্তি পেয়ে থাকে, তা হলে তা পেয়েছেন কেবল নবি-রাসূলগণ এবং সৃষ্টির সর্বোত্তম বান্দারা। ফাঁদটি হলো শয়তান বান্দাকে হাত, জবান ও অন্তরের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকার কষ্ট দেওয়ার জন্য তার সৈন্যবাহিনীকে আক্রমণে পাঠায়। কল্যাণ ও নেককাজে ব্যক্তির স্তর অনুসারে তারা তাদের আক্রমণ সাজায়। ফলে যখনই কেউ উঁচু স্তরে ওঠে, তখনই শয়তান তার সমস্ত বাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তার চক্রান্ত সফল করতে তার সাথে যুদ্ধ আরম্ভ করে।
এই ফাঁদ থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই। কারণ কেউ যখন দ্বীনের পথে দৃঢ় থাকতে, আল্লাহর দিকে আহ্বান করতে এবং আল্লাহর সমস্ত হুকুম-আহকাম মেনে চলতে চেষ্টা করে, তখন শয়তানও পুরাদমে তাকে বিভ্রান্ত করার জন্য এবং তার মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগে।

টিকাঃ
[৫৯] সূরা নূর, ২৪:৪০।
[৬০] আহমাদ, আল-মুসনাদ, ২২৮০৮; ইবনু আবিদ দুনইয়া, আত-তাওবা, ৩।
[৬১] বুখারি, ৬৩০৬।
[৬২] তিরমিযি, ২৬১৬; ইবনু মাজাহ, ৩৯৭৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00