📄 তাওবার শর্তসমূহ
গুনাহে লিপ্ত হয়ে মুমিন কখনো পরিপূর্ণ স্বাদ ও আনন্দ পেতে পারে না, এর দ্বারা সে কখনো পরিতৃপ্ত হতে পারে না। বরং যখন সে গুনাহে জড়িয়ে যায়, তখনো তার অন্তরে পেরেশানি ও অস্থিরতা বিরাজ করে। কিন্তু নফস ও কুপ্রবৃত্তির খাহেশাত আর চাহিদা তাকে (গুনাহে জড়ানোর) পেরেশানি থেকে ভুলিয়ে দেয়, (ফলে সে গুনাহ করতে থাকে।) অন্তর যখন এই পেরেশানি ও অস্থিরতা থেকে শূন্য হয় এবং গুনাহ ও পাপাচারের দরুন তার আনন্দ-খুশি বেড়ে যায়, তখন সে যেন তার ঈমানের খবর নেয় এবং সে যেন তার অন্তরের মৃত্যুর জন্য কান্নাকাটি করে; কেননা তার অন্তর যদি জীবিত থাকত, তা হলে অবশ্যই গুনাহে লিপ্ত হওয়ার বিষয়টি তাকে পেরেশান ও অস্থির করে তুলত, সে চিন্তিত হয়ে পড়ত। অথচ অন্তর কিছুই টের পায় না। আসলে আঘাতের দরুন মৃত ব্যক্তি কোনো ব্যথা অনুভব করে না।
গুনাহের এই বেপরোয়া অবস্থা থেকে অল্পসংখ্যক মানুষই পথ খুঁজে পায় কিংবা এ ব্যাপারে সতর্ক হয়। এটি অত্যন্ত ভয়ংকর একটি ক্ষেত্র। তিনটি বিষয় দ্বারা যদি এর প্রতিকার না করা হয়, তা হলে এটি ব্যক্তিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। বিষয় তিনটি হলো: ১. তাওবার পূর্বেই মৃত্যু এসে যাওয়ার ভয় করা, ২. আল্লাহর আদেশের বিরোধিতা করে আল্লাহর যে নিয়ামাত হারিয়েছে, তার জন্য অনুশোচনা করা এবং ৩. গুনাহের কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা।
সুতরাং তাওবার হাকীকত হলো— ১. অতীতে যা হয়েছে তার জন্য অনুতপ্ত হওয়া, ২. বর্তমানে তাৎক্ষণিকভাবে তা থেকে বিরত থাকা এবং ৩. ভবিষ্যতে তাতে লিপ্ত না হওয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা।
আর এই তিনটি বিষয় সেই সময় একত্রিত হয়, যখন খাঁটি তাওবা সংঘটিত হয়। কেননা সেই সময় ব্যক্তি অনুতপ্ত হয়, গুনাহ থেকে বিরত থাকে এবং গুনাহে না জড়ানোর দৃঢ় সংকল্প করে। ফলে যে দাসত্বের জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে, সে তার দিকে ফিরে আসে। এই ফিরে আসাটাই হলো প্রকৃত তাওবা। এই বিষয়টি যেহেতু ওই তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাই সেগুলোকে তাওবার শর্ত সাব্যস্ত করা হয়েছে।
অনুতপ্ত হওয়া ছাড়া তাওবা সংঘটিত হয় না। কারণ যে ব্যক্তি গুনাহ ও মন্দ বিষয়ে লিপ্ত হয়েও কোনো অনুশোচনা করে না; সেটাই এর দলীল যে, সে তাতে সন্তুষ্ট এবং অনড়। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে, "অনুতপ্ত হওয়াই হলো তাওবা।”[৫২]
আর গুনাহ থেকে তাৎক্ষণিক বিরত থাকার বিষয়টিও জরুরি। কারণ গুনাহে লিপ্ত থাকা অবস্থায় তাওবা করা অসম্ভব।
গুনাহের ওপর অটল থাকা ভিন্ন আরেকটি গুনাহ। গুনাহের ক্ষতিপূরণে সচেষ্ট না হয়ে বসে থাকার মানে হলো ধারাবাহিকভাবে গুনাহে লিপ্ত থাকা, এর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা এবং এতে নিশ্চিন্ত থাকা। আর এটি হলো ধ্বংসের আলামত।
এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর বিষয় হলো : আরশের ওপর থেকে আল্লাহ তাআলা দেখছেন এই বিশ্বাস রাখা সত্ত্বেও প্রকাশ্যে গুনাহে লিপ্ত হওয়া। সুতরাং কেউ যদি এই বিশ্বাস রাখে যে, আল্লাহ তাকে দেখছেন, তা সত্ত্বেও প্রকাশ্য গুনাহে পা বাড়ায়; তা হলে তো তা অত্যন্ত মারাত্মক বিষয়। আর আল্লাহ তাকে দেখছেন, তিনি সবকিছু অবগত আছেন—এই বিশ্বাস যদি না রাখে; তা হলে তো তা কুফর। এবং ইসলাম থেকে পরিপূর্ণভাবে বের হয়ে যাওয়া। এই দুইটির মধ্যেই গুনাহ করার বিষয়টি আবর্তিত হয়।
এ কারনেই তাওবা বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য একটি শর্ত হলো: এই বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ্ তাকে সবসময় দেখছেন, তার সমস্ত বিষয়াদি সম্পর্কে তিনি অবগত আছেন এবং গুনাহে লিপ্ত হওয়ার সময়ও তিনি তার দিকে সরাসরি তাকিয়ে থাকেন। কারন তাওবা সহীহ হয় কেবল মুসলিম থেকেই। তবে হ্যাঁ, যে ব্যক্তি পূর্বে আল্লাহকে অস্বীকার করার সাথে সাথে আল্লাহ যে তাকে দেখছেন এটাও অস্বীকার করত, তার তাওবাও সহীহ হবে; তার তাওবা হবে ইসলামে প্রবেশ করা এবং আল্লাহ তা’আলাকে তাঁর গুণাবলিসহ স্বীকার করে নেয়া।
টিকাঃ
[৫২] আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৩৫৬৭; ইবনু মাজাহ, ৪২৫২।
📄 মাকবুল তাওবার কিছু আলামত
আল্লাহ্ তা’আলার নিকট গ্রহণ যোগ্য বিশুদ্ধ তাওবার কিছু আলামত বা নিদর্শন রয়েছে:
এক. তাওবা করার পরের অবস্থা, তাওবা করার আগের অবস্থার চেয়ে উত্তম হবে।
দুই. সবসময় ভয় করবে, আল্লাহ্ তা’আলার পাকড়াও থেকে সে নিজেকে কখনো নিরাপদ মনে করবে না। আসলে তার ভয় ও আশঙ্কা ততক্ষণ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত-না মৃত্যুর ফেরেশতাদের নিকট সে এই সুসংবাদ শোনে-
أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالجَنَّةِ الَّتِي كُنتُمْ تُوعَدُونَ )
“তোমরা ভীত হয়ো না, দুঃখ করো না এবং সেই জান্নাতের সুসংবাদ শুনে খুশি হও, যার প্রতিশ্রুতি তোমাদের দেওয়া হয়েছে।”[৫৩]
সুতরাং ভয়ভীতির আশঙ্কা কেবল তখনই দূর হবে, এর আগে নয়।
তিন. অনুতাপ, অনুশোচনা আর ভয়ে অন্তর চৌচির হয়ে যাওয়া। এই অবস্থার সৃষ্টি হয় অপরাধের ছোটো-বড়ো বিবেচনায়। এটি হলো ইবনু উয়াইনা -এর ব্যাখ্যা। তিনি আল্লাহ্ তা’আলার এই আয়াত থেকে তা গ্রহণ করেছেন-
إِلَّا أَنْ تَقَطَّعَ قُلُوبُهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ )
“যে পর্যন্ত-না তাদের অন্তরগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, মহাবিজ্ঞ।" [৫৪]
ইবনু উয়াইনা বলেন, 'অর্থাৎ যে পর্যন্ত-না তাদের অন্তরগুলো তাওবার দ্বারা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।'[৫৫] এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, মহাশাস্তির চরম ভয় অন্তরকে চৌচির করে দেয়। আর এটিই হলো অন্তরকে ছিন্নভিন্ন করা। প্রকৃত তাওবা একেই বলে। কারণ নিজের অপকর্মের দরুন আফসোস ও অনুশোচনা এবং এর খারাপ পরিণতির ভয়, তার অন্তরকে টুকরো টুকরো করে দেয়। যে ব্যক্তির অন্তর দুনিয়ার জীবনে গুনাহের অনুতাপে চৌচির হবে না, আখিরাতে যখন প্রকৃত অবস্থা প্রকাশিত হবে, আনুগত্যশীল বান্দাদের পুরস্কার আর অবাধ্য-পাপীদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে, তখন ঠিকই তার অন্তর চৌচির হয়ে যাবে। আসলে অন্তর ছিন্নভিন্ন ও চৌচির হবেই; হয়তো দুনিয়াতে নয়তো আখিরাতে।
বিশুদ্ধ তাওবার একটি বিশেষ দিক হলো: তাওবার দ্বারা অন্তরে বিশেষ ভাঙনের সৃষ্টি হয়; যার ব্যথা-বেদনা আর কোনোকিছুর সাথেই মেলে না। গুনাহগার আর পাপী ব্যক্তিরই এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়। এটি ক্ষুধা-তৃষ্ণা, পরিশ্রম-সাধনা কিংবা খাঁটি ভালোবাসার মাধ্যমেও অর্জন করা যায় না। এ সবগুলো থেকে ভিন্ন একটি বিষয় এটি। রবের সামনে অন্তরকে পরিপূর্ণভাবে ভেঙে ফেলা; যার ব্যাপ্তি চতুর্দিকে ছড়ানো। এটি আল্লাহর সামনে তাকে অত্যন্ত বিনয়ী, লাঞ্ছিত, অপদস্থ করে নিক্ষেপ করে। যেমন, গুরুতর অপরাধে অপরাধী কোনো গোলাম, যে তার মনিব থেকে পালিয়ে গেছে। অতঃপর তাকে ধরা হয়েছে এবং তাকে তার মনিবের সামনে উপস্থিত করা হয়েছে। তাকে উদ্ধার করার মতো কেউ নেই, আবার মনিব ছাড়া তার কোনো উপায়ও নেই, তার থেকে পালাবার কোনো পথও নেই। সে জানে, তার জীবন-সৌভাগ্য-সফলতা-মুক্তি সবই রয়েছে কেবল মনিবের সন্তুষ্টির মধ্যে। সে এ-ও জানে যে, তার সব রকমের পাপাচার সম্পর্কে তার মনিব খুব ভালোভাবে অবগত। এর সাথে সাথে মনিবের প্রতি তার ভালোবাসা ও তীব্র প্রয়োজনও বিদ্যমান থাকে, এবং সে খুব ভালো করেই জানে, তার নিজের দুর্বলতা ও অসহায়ত্ব আর তার মনিবের বিপুল ক্ষমতা ও শক্তি।
সুতরাং এই সমস্ত অবস্থা থেকে সৃষ্টি হয় ভাঙন, বিনম্রতা ও অপদস্থতা; যা তার জন্য কত-না উপকারী! এ রকম অবস্থা নিয়ে যে ফিরে আসে, সে কত-না অধিক প্রতিদানের উপযুক্ত! এর দ্বারা ক্ষতিপূরণ করা কত-না মহান! এর মাধ্যমে গোলাম তার মনিবের কত-না নৈকট্য হাসিল করে! তার মনিবের নিকট এই বিনম্রতা, অপদস্থতা, রোনাজারি, তার সামনে নিজেকে সমর্পণ করার চেয়ে পছন্দনীয় আর কিছু নেই।
আল্লাহর শপথ! এই অবস্থায় তার এই কথা কতই-না মধুর-
أَسْأَلُكَ بِعِرِّكَ وَذُلَّى لَكَ إِلَّا رَحِمْتَنِي. أَسْأَلُكَ بِقُوَّتِكَ وَضُعْفِي، وَبِغِنَاكَ عَنِّي وَفَقْرِى إِلَيْكَ. هَذِهِ نَاصِيَتِي الْكَاذِبَةُ الخَاطِئَةُ بَيْنَ يَدَيْكَ. عَبِيدُكَ سِوَايَ كَثِيرٌ، وَلَيْسَ لِي سَيِّدٌ سِوَاكَ. لَا مَلْجَأَ وَلَا مَنْجى مِنْكَ إِلَّا إِلَيْكَ. أَسْأَلُكَ مَسْأَلَةَ الْمِسْكِينِ، وَأَبْتَهِلُ إِلَيْكَ ابْتِهَالَ الخَاضِعِ الدَّلِيلِ، وَأَدْعُوكَ دُعَاءَ الخَابِفِ الضَّرِيْرِ، سُؤَالَ مَنْ خَضَعَتْ لَكَ رَقَبَتُهُ، وَرَغِمَ لَكَ أَنْفُهُ، وَفَاضَتْ لَكَ عَيْنَاهُ، وَذَلَّ لَكَ قَلْبُهُ
'আমি আপনার ইজ্জত ও আপনার প্রতি আমার অপদস্থতার দোহাই দিয়ে কেবল এই প্রার্থনাই করছি যে, আপনি আমার ওপর দয়া করুন। আমি আপনার কাছে চাচ্ছি আপনার ক্ষমতা ও আমার দুর্বলতার ওসীলায়, আমার থেকে আপনার অমুখাপেক্ষিতা ও আপনার প্রতি আমার মুখাপেক্ষিতার ওসীলায়, আমার এই মিথ্যা, ভুলে-ভরা কপাল আপনার কবজায়, আমাকে বাদে আপনার অসংখ্য বান্দা রয়েছে, কিন্তু আপনি ছাড়া আমার আর কোনো মালিক নেই, আপনি ব্যতীত আপনার কাছ থেকে মুক্তি ও আশ্রয় পাবার আর কোনো জায়গা নেই। আমি আপনার নিকট মিসকীন ও অসহায়ের ন্যায় ভিক্ষা চাচ্ছি, বিনয়ী ও অপদস্থ ব্যক্তির মতো আমি আপনার দিকে ধাবিত হচ্ছি, আমি আপনাকে ডাকছি ভীত ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির মতো এবং সেই ব্যক্তির চাওয়ার মতো আমি আপনার নিকট চাচ্ছি; যে নিজের ঘাড়কে আপনার সামনে নত করে দিয়েছে, আপন নাককে যে ধূলি ধূসরিত করেছে, আপনার কাছে যার দুচোখ অঝোর ধারায় অশ্রু ছেড়ে দিয়েছে এবং যে নিজের অন্তরকে কেবল আপনার জন্যই বিনীত করেছে।'
এই অবস্থা এবং এর অনুরূপ অন্যান্য অবস্থা হলো আল্লাহর কাছে মাকবুল বা গ্রহণযোগ্য তাওবার প্রভাব। সুতরাং যে ব্যক্তি তার অন্তরে এ রকম অবস্থা পাবে না, সে যেন নিজের তাওবাকে ত্রুটিযুক্ত মনে করে এবং তা সংশোধন করার প্রতি মনোযোগী হয়। প্রকৃতপক্ষে খাঁটি তাওবা বেশ কঠিন, কিন্তু মুখের কথায় ও উচ্চারণে কত-না সহজ! সত্যবাদী ব্যক্তি খাঁটি ও সত্য তাওবা অর্জনের চেয়ে কঠিন কোনোকিছুর জন্য পরিশ্রম করেনি। গুনাহ থেকে বাঁচার আর নেককাজ করার শক্তি কেবল আল্লাহ তাআলারই দান।
টিকাঃ
[৫৩] সূরা ফুসিলাত, ৪১: ৩০।
[৫৪] সূরা তাওবা, ৯: ১১০।
[৫৫] ইবনু আবী হাতিম, তাফসীর, ৬/১৮৮৬।
📄 ইবাদাতের অহংকার থেকে বাঁচুন
তাওবার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: আল্লাহ তাআলার নাফরমানি থেকে দূরে থাকা, আল্লাহ তাআলাকে ভয় করা, তাঁর আদেশসমূহ পালন করা এবং নিষেধগুলো থেকে বেঁচে থাকা। এর ফলে বান্দা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত নূরের ভিত্তিতে আল্লাহর আনুগত্য করতে থাকে এবং তাঁর নিকট প্রতিদানের আশা করে। এমনিভাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত নূরের ভিত্তিতে অবাধ্যতা ও নাফরমানি পরিত্যাগ করে, তাঁর শাস্তির ভয় করে এবং এর মাধ্যমে ইবাদাত ও আনুগত্যের গৌরব করে না। আসলে ইবাদাত ও তাওবার মাঝে প্রকাশ্য ও গোপন অহংকার আছে। সুতরাং গর্ব-অহংকার করা তার উদ্দেশ্য হয় না। যদিও সে জানে যে, তাওবা ও ইবাদাতের মাধ্যমে তা অর্জিত হয়। যে ব্যক্তি সম্মান অর্জনের জন্য ও গর্ব-অহংকার করার জন্য তাওবা করে, তার তাওবা বেশ ত্রুটিপূর্ণ।
একটি হাদীসে এসেছে, "আল্লাহ তাআলা তাঁর নবিদের মধ্য থেকে একজন নবির নিকট ওহি পাঠিয়েছেন যে, 'আপনি অমুক দুনিয়াবিমুখ বান্দাকে বলুন, 'তোমার দুনিয়াবিমুখতার দ্বারা তো তুমি নিজেরই আরাম-আয়েশকে ত্বরান্বিত করলে। আবার আমার দিকে ধাবিত হয়ে তো তুমি তোমার জন্যই ইজ্জত-সম্মান অর্জন করে নিলে। তা হলে আমার জন্য তুমি কী আমল করলে?' যাহিদ ব্যক্তি বলল, 'হে আমার রব, এগুলোর পরেও কী আমার ওপর আপনার কোনো হক রয়েছে?' আল্লাহ বললেন, 'তুমি কি আমার সন্তুষ্টির জন্য আমার কোনো বন্ধুকে ভালোবেসেছিলে কিংবা আমার সন্তুষ্টির আশায় আমার কোনো শত্রুকে শত্রু হিসেবে নিয়েছিলে? ৫।
অর্থাৎ শান্তি ও সম্মান তোমার অংশ। আর দুনিয়াবিমুখতা ও ইবাদাত-বন্দেগির দ্বারা তুমি তা অর্জনও করে নিয়েছ। কিন্তু আমার হক আদায়ের বিষয়টি কোথায়, আর তা হলো আমার সন্তুষ্টির জন্য বন্ধুত্ব করা এবং আমার সন্তুষ্টির জন্য শত্রুতা করা? আসলে ইলম ও অবস্থার দিক দিয়ে আদেশ-নিষেধের ক্ষেত্রে নিজের অংশ ও রবের অংশ পৃথক করাই কাম্য।
অনেক সাদিক বা সত্যবাদী এমন রয়েছে, যারা কেবল নিজের অংশ অন্বেষণেই ব্যস্ত থাকে। নিজের অংশ ও রবের অংশের মাঝে পার্থক্য করে কেবল তারাই, তাদের মধ্যে যারা বিচক্ষণ। সত্যবাদীদের মধ্যে তাদের সংখ্যা খুবই অল্প; যেমন মানুষের মধ্যে সত্যবাদীদের সংখ্যা অনেক কম।
প্রকাশ্য-কবীরা গুনাহ ও পাপাচার থেকে বেঁচে থাকে এমন অনেক মানুষ আছে, যারা ঠিক সেই রকম (আত্মিক) অনেক কবীরা গুনাহ বা সেগুলোর চেয়ে বড়ো অথবা তার চেয়ে কম বিভিন্ন গুনাহে লিপ্ত। অথচ তাদের অন্তরে এই ধারণাও আসে না যে, তা গুনাহ, এর থেকে তাওবা করা প্রয়োজন। কিন্তু কবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিদের তারা ঠিকই ঘৃণা করে, তুচ্ছ ভাবে। তাদের অবস্থা দেখে মনে হয় তাদের আনুগত্য-ইবাদাতের ক্ষমতা ও অনুগ্রহ সমগ্র সৃষ্টির ওপর ছড়ানো। তাদের ভেতরগত চাহিদা হলো সবাই তাদের নেককাজের জন্য তাদের সম্মান করুক; এটি এমন এক চাহিদা যা কারও নিকট গোপন থাকে না। এমনিভাবে এ সংশ্লিষ্ট আরও অনেক বিষয়ে তারা আচ্ছন্ন; যা আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে ঘৃণিত, তারা তাঁর দরজা থেকে প্রকাশ্যে কবীরা গুনাহকারীদের চেয়েও বেশি দূরে। আল্লাহ তাআলা যদি কাউকে কবীরা গুনাহে লিপ্ত করান, যার মাধ্যমে বান্দা নিজের নফসকে ভেঙে ফেলে, অনুশোচনায় দগ্ধ হয়, নিজের মর্যাদা ও পরিচয় উপলব্ধি করে, নিজেকে বিনয়ী করে এবং ইবাদাতের অহংকার থেকে বের হয়—তা হলে এটি তার জন্য রহমতস্বরূপ। যেমন আল্লাহ তাআলা যখন কবীরা গুনাহকারীদের পরিশোধন করেন খাঁটি তাওবা ও তাঁর প্রতি তাদের অন্তর ধাবিত করার মাধ্যমে, তখন তা তাদের জন্য রহমতস্বরূপ হয়। সুতরাং এর বিপরীত হলে দুদলই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
টিকাঃ
[৫৬] সুয়ূতি, আল-জামিউস সগীর, ৪৯২৪, দঈফ।
📄 বান্দাকে গুনাহ করতে ছেড়ে দেওয়ার রহস্য
জেনে রাখুন, বিচক্ষণ ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি থেকে যখন কোনো গুনাহ সংঘটিত হয়ে যায়, তখন কয়েকটি বিষয়ের প্রতি তার দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে—
১. আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুতি ও ভীতিপ্রদর্শনের দিকে সে দৃষ্টি দেয়। ফলে এটি তার মাঝে ভয় সৃষ্টি করে; যা তাকে তাওবা করতে উদ্বুদ্ধ করে।
২. তার প্রতি আল্লাহ তাআলার কী আদেশ ও নিষেধ রয়েছে সেদিকে সে দৃষ্টি দেয়। ফলে তার কৃতকাজটি যে গুনাহ তার স্বীকৃতি দেওয়ার প্রবণতা তার মধ্যে তৈরি করে এবং সে যে গুনাহ করেছে তা স্বীকার করে নেয়।
৩. সে এদিকেও দৃষ্টি ফেরায় যে, আল্লাহ তাআলা তাকে গুনাহের কাজটি করার অবকাশ দিয়েছেন এবং এর মাঝের সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে দিয়েছেন। তিনি ইচ্ছা করলে তাকে এর থেকে নিরাপদ রাখতে পারতেন, আবার গুনাহ করার মাঝে ও তার মাঝে বাধাও সৃষ্টি করে দিতে পারতেন। এই দৃষ্টিভঙ্গির ফলে সে আল্লাহ তাআলার সত্তা, নামসমূহ, গুণাবলি, হিকমত, রহমত, মাগফিরাত, ক্ষমা, সহনশীলতা ও দয়া সম্পর্কে বিভিন্ন প্রকার প্রজ্ঞা ও মা'রিফাত জানতে পারবে। আল্লাহ সম্পর্কে এই প্রজ্ঞা ও মা'রিফাত তাঁর নামসমূহের প্রতি দাসত্বকে আবশ্যক করবে; যা এই পরিস্থিতি ব্যতীত কখনো হাসিল হতো না। সে আরও জানতে পারবে আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি ও আদেশ, প্রতিদান, প্রতিশ্রুতি ও ভীতিপ্রদর্শনের সাথে তাঁর নাম ও গুণাবলির সম্পর্ক কী এবং বাস্তবে সেগুলো আল্লাহ তাআলার নাম ও গুণাবলিরই বৈশিষ্ট্য ও প্রভাব। নিশ্চিতভাবেই আল্লাহ তাআলার প্রতিটি নাম ও গুণের প্রভাব ও কার্যক্ষমতা রয়েছে।
তার এই দর্শন তাকে মা'রিফাত, ঈমান, তাকদীর ও হিকমতের রহস্য সম্পর্কে অনেকগুলো মনোরম বাগানের সন্ধান দেবে; যার বর্ণনা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। (এরপরও কিছু উল্লেখ করা হলো-)
• এর মাধ্যমে বান্দা ফায়সালার ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার শক্তিমত্তা সম্পর্কে জানতে পারবে। মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তাআলা যা ইচ্ছা করেন তা-ই সংঘটিত করেন; তিনি পরিপূর্ণ ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হওয়ায় বান্দার ওপর নিজ হুকুম বাস্তবায়ন করে থাকেন।
যখন বান্দা তার মনিবের শক্তি ও ক্ষমতা সম্পর্কে জানতে পারবে এবং অন্তর দিয়ে তা অবলোকন করবে, তখন গুনাহের লাঞ্ছনা থেকে বাঁচতে আল্লাহর প্রতিই মনোযোগী হবে; যা তার জন্য অতি উত্তম ও উপকারী। কারণ তখন (চিন্তা-ভাবনার ক্ষেত্রে) সে নিজের নফসের সাথে নয়, স্বয়ং আল্লাহর সাথে অবস্থান করে।
ফায়সালা করার ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার ক্ষমতা ও শক্তির পরিচয় পাওয়ার মধ্যে এটাও শামিল: ব্যক্তি জানতে পারবে যে, তাকে পরিচালিত করা হয়, তার সম্পর্কে আল্লাহর সব সিদ্ধান্ত মেনে নিতে সে বাধ্য, তার কপাল রয়েছে অপরের হাতে, সে নিজে নিজে কোনোকিছু থেকে বাঁচতে পারে না; তিনি তাকে না বাঁচালে এবং তাঁর সাহায্য ব্যতীত কিছুই করার ক্ষমতা তার নেই। সে প্রশংসার প্রতিদান দানকারী, মহাপরাক্রমশালী এক সত্তার কবজায় লাঞ্ছিত ও তুচ্ছ।
• সে আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ সম্পর্কে জানতে পারবে যে, গুনাহে লিপ্ত হওয়া অবস্থায় তিনি তা ঢেকে রেখেছেন। পরিপূর্ণভাবে অবগত থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রকাশ করে দেননি। তিনি যদি চাইতেন, তা হলে সবার সামনে তাকে অপদস্থ ও লাঞ্ছিত করতে পারতেন; ফলে সবাই তার থেকে দূরে থাকত। এটা আল্লাহ তাআলার অনেক বড়ো মেহেরবানি ও দয়া। এ কারণেই আল্লাহ তাআলার একটি নাম السٹر 'পরম দানশীল'। বান্দার থেকে আল্লাহ তাআলা পরিপূর্ণ অমুখাপেক্ষী হওয়া সত্ত্বেও বান্দার প্রতি তিনি এই দান ও অনুগ্রহ করেছেন। অথচ বান্দা তাঁর প্রতি পরিপূর্ণভাবে মুখাপেক্ষী। এই কারণে বান্দা এই অনুগ্রহের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখতে এবং আল্লাহর এই মেহেরবানি, করুণা ও দয়া প্রত্যক্ষ করতেই ব্যস্ত হয়ে পড়বে। ফলে গুনাহের নীচতা থেকে বেরিয়ে এবং তা ভুলে গিয়ে আল্লাহ তাআলার সাথে অবস্থান করবে। আর এটি গুনাহ নিয়ে ব্যস্ত থাকা ও এর লাঞ্ছনার দিকে দৃষ্টিপাত করার চেয়ে বেশি উপকারী ও লাভজনক।
• সে এটাও প্রত্যক্ষ করবে যে, গুনাহ ও পাপে লিপ্ত থাকার কারণেও আল্লাহ তাকে শাস্তি না দিয়ে ধৈর্য ধরে আছেন। তিনি যদি চাইতেন, তা হলে গুনাহের শাস্তি দ্রুতই দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তাড়াহুড়ো না করে সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছেন।
এই বিষয়টি বান্দাকে আল্লাহ তাআলার حليم 'পরম সহিষ্ণু' নামের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে, আল্লাহর ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার গুণ সম্পর্কে তাকে অবগত করাবে এবং এই নামের প্রতি ভক্তি ও দাসত্বের মনোভাব তৈরি করবে।
• সে এটাও জানবে, আল্লাহ তাআলা তাকে যে ক্ষমা করে দিয়েছেন, তা হলো তাঁর অফুরন্ত দয়ার একটি অংশ। কারণ ক্ষমা করা আল্লাহ তাআলার অনেক বড়ো একটি অনুগ্রহ ও দয়া। অন্যথায় আল্লাহ যদি আপনাকে পাকড়াও করেন, তা হলেও তিনি ইনসাফকারী ও প্রশংসিত। ক্ষমা করা কেবল তার দয়া ও মেহেরবানি; আপনার কোনো হকের কারণে তিনি ক্ষমা করতে বাধ্য; বিষয়টি এমন নয়।
• এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বান্দার বিনয়, বশ্যতা, নম্রতা, অপদস্থতা ও তাঁর সামনে রোনাজারি করাকে বাড়িয়ে দেন। কারণ মানুষের নফস এইসব ক্ষেত্রে রুবুবিয়্যাতের সমকক্ষ হতে চায়। যদি সে ক্ষমতা পেত, তা হলে নিশ্চয়ই ফিরআউনের মতো কথা বলত। ফিরআউন ক্ষমতা পেয়েছিল বলে সে তা প্রকাশ করেছিল আর অন্যরা ক্ষমতা-শক্তি পায়নি, তাই তা গোপন রেখেছে। এই সমকক্ষতার প্রত্যাশা করা থেকে মুক্তি দেবে দাসত্বের বিনম্রতা ও অপদস্থতা। এর চারটি স্তর রয়েছে—
প্রথম স্তর: পুরা সৃষ্টিজগৎই এর অন্তর্ভুক্ত। আর তা হলো আল্লাহ তাআলার প্রতি মুখাপেক্ষিতার অপদস্থতা। সমস্ত আসমানবাসী ও জমিনবাসী তাঁর দিকে মুখাপেক্ষী ও অভাবী। আর তিনি একাই সবার থেকে অমুখাপেক্ষী। আসমান ও জমিনের প্রত্যেকেই তাঁর নিকট চায়; কিন্তু তিনি কারও কাছেই চান না।
দ্বিতীয় স্তর: ইবাদাত ও দাসত্বের বিনম্রতা। এটা হলো ইখতিয়ার বা পছন্দ করার বিনম্রতা। এটি কেবল অনুগত বান্দাদের সাথেই খাছ। আর ইবাদাত বা দাসত্বের রহস্য এখানেই নিহিত রয়েছে।
তৃতীয় স্তর: মহাব্বতের বিনয় ও নমনীয়তা। আসলে মহাব্বতকারী তার মাহবুব বা প্রিয় মানুষের প্রতি সত্তাগতভাবেই বিনয়ী ও দুর্বল থাকে। মহাব্বতের অনুপাতে এর কমবেশ হয়। প্রিয় মানুষের প্রতি নম্রতার ওপরই মহাব্বতের ভিত্তি স্থাপিত।
চতুর্থ স্তর: পাপাচার ও অপরাধের দরুন নম্রতা ও অপদস্থতা।
সুতরাং এই চারটি স্তর যখন একত্রিত হয়, তখন আল্লাহর জন্য নম্রতা ও বশ্যতা পরিপূর্ণতা লাভ করে। কেননা তখন ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ভয়ভীতি, মহাব্বত, ইনাবাত, আনুগত্য ও মুখাপেক্ষিতার কারণে আরও বেশি অপদস্থতা স্বীকার করে নেয়।
• আল্লাহ তাআলার নামসমূহের মাঝে যে প্রভাব রয়েছে, তা তার সংশ্লিষ্ট বিষয়াদিকে দাবি করে। যেমন পরিপূর্ণ উপকরণ লক্ষ্য অর্জন হওয়াকে দাবি করে। (বিষয়টি উদাহরণের মাধ্যমে সুস্পষ্ট হবে।) যেমন : السَّمِيعُ (সর্বশ্রোতা) ও الْبَصِيرُ (সর্বদ্রষ্টা) আল্লাহ তাআলার এই নাম দুটি দাবি করে শোনার ও দেখার বস্তুসমূহকে। এমনিভাবে الرَّزَّاقُ (রিয্কদানকারী) নামটি রিস্ক দেওয়া মতো কাউকে দাবি করে; الرَّحِيمُ (পরম দয়ালু) নামটি দয়া করা যায় এমন কাউকে দাবি করে। অনুরূপভাবে الْغَفُورُ (অতি ক্ষমাপরায়ণ), الْعَفُوٌّ (পরম ক্ষমাশীল), اَوَّابُ (তাওবা কবুলকারী), الْحَلِيمُ (পরম সহিষ্ণু) এই নামগুলো এমন কাউকে দাবি করে যাকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন, যার তাওবা কবুল করবেন এবং যার প্রতি তিনি সহনশীল হবেন। এই নামগুলো গুণহীন ও অকেজো হওয়া অসম্ভব। কারণ এগুলো হলো সর্বোত্তম নাম ও পরিপূর্ণতার গুণাবলি, সম্মান ও বড়োত্বের বৈশিষ্ট্যাবলি, প্রজ্ঞা, করুণা ও দানশীলতার কার্যক্রম। সুতরাং নিশ্চিতভাবেই সেগুলোর প্রভাব দুনিয়াতে প্রকাশ পাবে। আর এর প্রতি ইঙ্গিত প্রদান করেছেন আল্লাহ সম্পর্কে সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী—আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ ﷺ। তিনি বলেছেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْ لَمْ تُذْنِبُوا لَذَهَبَ اللهُ بِكُمْ وَلَجَاءَ بِقَوْمٍ يُذْنِبُونَ فَيَسْتَغْفِرُوْنَ اللَّهَ فَيَغْفِرُ لَهُمْ
“সেই সত্তার শপথ! যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তোমরা যদি গুনাহ না করতে, তা হলে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তোমাদেরকে সরিয়ে দিয়ে এমন সম্প্রদায় নিয়ে আসতেন যারা গুনাহ করত, অতঃপর ক্ষমা চাইত আর তিনি তাদের ক্ষমা করে দিতেন।”[৫৭]
• আরেকটি হিকমাহ হলো: সবচেয়ে বড়ো রহস্য—যা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না, যার কথা কেউ ইশারা-ইঙ্গিতেও বলার সাহস দেখায় না, এ দিকে ঈমানের আহ্বানকারীও প্রকাশ্যে আহ্বান করে না। বরং বিশেষ বান্দাদের অন্তর তা প্রত্যক্ষ করে; ফলে রবের প্রতি তাদের মা'রিফাত ও মহাব্বত, নিশ্চিন্ততা ও তাঁর প্রতি আগ্রহ, তাঁর অবিরাম স্মরণ, তাঁর দয়া, করুণা, অনুগ্রহ ও মেহেরবানির উপলব্ধি, দাসত্ব ও প্রভুত্ব সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান ও প্রজ্ঞা আরও বেড়ে যায়; আর তা হলো যা 'সহীহ বুখারি' ও 'সহীহ মুসলিম'-এ বর্ণিত আনাস ইবনু মালিক-এর হাদীস থেকে প্রমাণিত হয়। আনাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'নবি বলেছেন,
اللَّهُ أَشَدُّ فَرَحًا بِتَوْبَةِ عَبْدِهِ حِيْنَ يَتُوْبُ إِلَيْهِ مِنْ أَحَدِكُمْ كَانَ عَلَى رَاحِلَتِهِ بِأَرْضِ فَلَاةٍ فَانْفَلَتَتْ مِنْهُ وَعَلَيْهَا طَعَامُهُ وَشَرَابُهُ فَأَيْسَ مِنْهَا فَأَتَى شَجَرَةً فَاضْطَجَعَ فِي ظِلِّهَا قَدْ أَيْسَ مِنْ رَاحِلَتِهِ فَبَيْنَا هُوَ كَذَلِكَ إِذَا هُوَ بِهَا قَائِمَةً عِنْدَهُ فَأَخَذَ بِخِطَامِهَا ثُمَّ قَالَ مِنْ شِدَّةِ الْفَرَحِ اللَّهُمَّ أَنْتَ عَبْدِي وَأَنَا رَبُّكَ . أَخْطَأَ مِنْ شِدَّةِ الْفَرَحِ
"বান্দা যখন আল্লাহ তাআলার কাছে তাওবা করে, তখন আল্লাহ তার তাওবার কারণে ওই লোকের চেয়েও বেশি আনন্দিত হন, যে মরুভূমিতে তার বাহনে চড়ে আরোহন করছিল। অতঃপর বাহনটি তার নিকট হতে পালিয়ে গেল। আর সেই বাহনের ওপরই ছিল তার খাদ্য ও পানীয়। একসময় বাহনটি পাওয়ার ব্যাপারে সে আশা ছেড়ে দিলো। এরপর নিরাশ মনে একটি গাছের নিচে এসে গাছের ছায়ায় শুয়ে পড়ল। সে সেভাবেই সেখানে পড়ে থাকে; এমতাবস্থায় হঠাৎ বাহন জন্তুটি তার কাছে এসে দাঁড়ায়। ফলে দ্রুতই সে তার লাগাম ধরে ফেলে। এরপর আনন্দের আতিশয্যে বলে ওঠে, 'হে আল্লাহ, তুমি আমার বান্দা আর আমিই তোমার রব!' আনন্দ ও খুশির তীব্রতায় সে এমন ভুল করে বসে!”[৫৮]
টিকাঃ
[৫৭] মুসলিম, ২৭৪৯।
[৫৮] বুখারি, ৬৩০৯; মুসলিম, ২৭৪৭।