📄 তাওবাই হলো প্রথম ও শেষ মানযিল
(জীবনের) শুরুতে, মাঝে এবং শেষে (যে মানযিল প্রয়োজন) তা হচ্ছে তাওবার মানযিল। সুতরাং আল্লাহর-পথের-পথিক কখনো তাওবা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। সে মৃত্যু পর্যন্ত এর মধ্যেই থাকে। যদি অন্য মানযিলে যায়, তবে তাওবাকে সাথে নিয়েই যায়, তাওবা হলো তার সবসময়ের সঙ্গী। এটিই বান্দার পথের শুরু, এটিই শেষ। (জীবনের) শুরুর সময়ের ন্যায় শেষ পর্যায়েও তাওবার প্রয়োজন হয় তীব্রভাবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, وَتُوْبُوْا إِلَى اللهِ جَمِيْعًا اَيُّهَ الْمُؤْمِنُوْنَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ )) “হে মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর নিকট তাওবা করো, আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে।”[৪৯]
এটি সূরা নূরের একটি আয়াত। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টির সেরা মুমিন বান্দাদের সম্বোধন করে বলেছেন যে, তারা যেন তাঁর নিকট তাওবা করে। অথচ তারা ঈমান এনেছে, কাফিরদের দেওয়া অনেক কষ্ট ও অত্যাচার সহ্য করেছে, তাঁর পথে হিজরত করেছে এবং তাঁর শত্রুদের বিরুদ্ধে জানমাল দিয়ে জিহাদ করেছে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা সফলতাকে তাওবার সাথে সম্পৃক্ত করেছেন; যেমন উপকরণকে উদ্দেশ্যের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়। আল্লাহ তাআলা এখানে لَعَلَّ (আশা করা যায়) শব্দটি ব্যবহার করেছেন—এটি বুঝানোর জন্য যে, তোমরা যখন তাওবা করবে, তখন তোমাদের সফলতার আশা করা যায়। সুতরাং কেবল তাওবাকারী ব্যক্তিই সফলতার আশা করতে পারে, অন্য কেউ নয়। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন।
টিকাঃ
[৪৯] সূরা নূর, ২৪:৩১।
📄 তাওবা এবং সূরা ফাতিহা
আল্লাহ তাআলা বলেন, وَمَنْ لَّمْ يَتُبْ فَأُولَبِكَ هُمُ الظَّالِمُوْنَ “যারা তাওবা করে না তারাই জালিম বা অত্যাচারী।”[৫০]
আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন: ১. তাওবাকারী ও ২. জালিম; এখানে তৃতীয় কোনো শ্রেণি নেই। যারা তাওবা করে না তাদেরকে তিনি জালিম বলেছেন। আসলে তার চেয়ে জালিম আর কেউ নেই। কারণ সে তার রব সম্পর্কে, রবের হক সম্পর্কে, নফসের দোষত্রুটি সম্পর্কে এবং তার আমলের কমতি ও বিপদাপদ সম্পর্কে অজ্ঞ।
'সহীহ মুসলিম'-এ এসেছে, নবি বলেছেন, يَا أَيُّهَا النَّاسُ تُوْبُوا إِلَى اللَّهِ فَإِنِّي أَتُوْبُ فِي الْيَوْمِ إِلَيْهِ مِائَةَ مَرَّةٍ “ওহে লোকসকল, তোমরা আল্লাহর নিকট তাওবা করো। আমি তো আল্লাহর নিকট প্রতিদিন একশ বার তাওবা করি।”[৫১]
যেহেতু তাওবা হলো আল্লাহর দিকে ফিরে আসা এবং গজবপ্রাপ্ত ও পথভ্রষ্টদের পথ থেকে বেঁচে থাকা; আর এটি কেবল সিরাতে মুস্তাকীমের দিকে আল্লাহ তাআলার হিদায়াত প্রদানের মাধ্যমেই অর্জিত হয়; আর আল্লাহর হিদায়াত পাওয়া যাবে কেবল তাঁর সাহায্য ও তাওহীদের দ্বারা। সেই বিবেচনায় সূরা ফাতিহা সবচেয়ে সুন্দর পদ্ধতিতে এবং সর্বোত্তম বিন্যাসে তাওবাকে অন্তর্ভুক্ত করে। যে ব্যক্তি প্রত্যক্ষ, জ্ঞানগত ও প্রজ্ঞাগতভাবে সূরা ফাতিহাকে পরিপূর্ণ হক প্রদান করবে, সে জানতে পারবে যে, খাঁটি তাওবা করা ছাড়া ইবাদাতের দিক থেকে সূরা ফাতিহার অধ্যয়ন বিশুদ্ধ (ও উপকারী) হয় না। কেননা গুনাহ সম্পর্কে গাফিল থেকে, গুনাহের ওপর অটল থেকে সিরাতে মুস্তাকীমের পরিপূর্ণ হিদায়াত পাওয়া সম্ভব নয়। কারণ প্রথমত মূর্খতা হলো হিদায়াতের প্রজ্ঞার বিপরীত। দ্বিতীয়ত মূর্খতা ব্যক্তির ইচ্ছা ও ইরাদাকে বিলুপ্ত করে দেয়; এর দরুন হিদায়াতের পথে চলার সংকল্প ও ইচ্ছা তার জন্মায় না। আর এই কারণে তাওবা কেবল তখনই গ্রহণযোগ্য হবে, যখন ব্যক্তি তার গুনাহ সম্পর্কে জানবে, গুনাহকে স্বীকার করবে এবং এর সব ধরনের ক্ষতিকর পরিণতি থেকে বাঁচার পথ খুঁজবে।
টিকাঃ
[৫০] সূরা হুজুরাত, ৪৭: ১১।
[৫১] মুসলিম, ২৭০২।
📄 তাওবার শর্তসমূহ
গুনাহে লিপ্ত হয়ে মুমিন কখনো পরিপূর্ণ স্বাদ ও আনন্দ পেতে পারে না, এর দ্বারা সে কখনো পরিতৃপ্ত হতে পারে না। বরং যখন সে গুনাহে জড়িয়ে যায়, তখনো তার অন্তরে পেরেশানি ও অস্থিরতা বিরাজ করে। কিন্তু নফস ও কুপ্রবৃত্তির খাহেশাত আর চাহিদা তাকে (গুনাহে জড়ানোর) পেরেশানি থেকে ভুলিয়ে দেয়, (ফলে সে গুনাহ করতে থাকে।) অন্তর যখন এই পেরেশানি ও অস্থিরতা থেকে শূন্য হয় এবং গুনাহ ও পাপাচারের দরুন তার আনন্দ-খুশি বেড়ে যায়, তখন সে যেন তার ঈমানের খবর নেয় এবং সে যেন তার অন্তরের মৃত্যুর জন্য কান্নাকাটি করে; কেননা তার অন্তর যদি জীবিত থাকত, তা হলে অবশ্যই গুনাহে লিপ্ত হওয়ার বিষয়টি তাকে পেরেশান ও অস্থির করে তুলত, সে চিন্তিত হয়ে পড়ত। অথচ অন্তর কিছুই টের পায় না। আসলে আঘাতের দরুন মৃত ব্যক্তি কোনো ব্যথা অনুভব করে না।
গুনাহের এই বেপরোয়া অবস্থা থেকে অল্পসংখ্যক মানুষই পথ খুঁজে পায় কিংবা এ ব্যাপারে সতর্ক হয়। এটি অত্যন্ত ভয়ংকর একটি ক্ষেত্র। তিনটি বিষয় দ্বারা যদি এর প্রতিকার না করা হয়, তা হলে এটি ব্যক্তিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। বিষয় তিনটি হলো: ১. তাওবার পূর্বেই মৃত্যু এসে যাওয়ার ভয় করা, ২. আল্লাহর আদেশের বিরোধিতা করে আল্লাহর যে নিয়ামাত হারিয়েছে, তার জন্য অনুশোচনা করা এবং ৩. গুনাহের কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা।
সুতরাং তাওবার হাকীকত হলো— ১. অতীতে যা হয়েছে তার জন্য অনুতপ্ত হওয়া, ২. বর্তমানে তাৎক্ষণিকভাবে তা থেকে বিরত থাকা এবং ৩. ভবিষ্যতে তাতে লিপ্ত না হওয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা।
আর এই তিনটি বিষয় সেই সময় একত্রিত হয়, যখন খাঁটি তাওবা সংঘটিত হয়। কেননা সেই সময় ব্যক্তি অনুতপ্ত হয়, গুনাহ থেকে বিরত থাকে এবং গুনাহে না জড়ানোর দৃঢ় সংকল্প করে। ফলে যে দাসত্বের জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে, সে তার দিকে ফিরে আসে। এই ফিরে আসাটাই হলো প্রকৃত তাওবা। এই বিষয়টি যেহেতু ওই তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাই সেগুলোকে তাওবার শর্ত সাব্যস্ত করা হয়েছে।
অনুতপ্ত হওয়া ছাড়া তাওবা সংঘটিত হয় না। কারণ যে ব্যক্তি গুনাহ ও মন্দ বিষয়ে লিপ্ত হয়েও কোনো অনুশোচনা করে না; সেটাই এর দলীল যে, সে তাতে সন্তুষ্ট এবং অনড়। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে, "অনুতপ্ত হওয়াই হলো তাওবা।”[৫২]
আর গুনাহ থেকে তাৎক্ষণিক বিরত থাকার বিষয়টিও জরুরি। কারণ গুনাহে লিপ্ত থাকা অবস্থায় তাওবা করা অসম্ভব।
গুনাহের ওপর অটল থাকা ভিন্ন আরেকটি গুনাহ। গুনাহের ক্ষতিপূরণে সচেষ্ট না হয়ে বসে থাকার মানে হলো ধারাবাহিকভাবে গুনাহে লিপ্ত থাকা, এর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা এবং এতে নিশ্চিন্ত থাকা। আর এটি হলো ধ্বংসের আলামত।
এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর বিষয় হলো : আরশের ওপর থেকে আল্লাহ তাআলা দেখছেন এই বিশ্বাস রাখা সত্ত্বেও প্রকাশ্যে গুনাহে লিপ্ত হওয়া। সুতরাং কেউ যদি এই বিশ্বাস রাখে যে, আল্লাহ তাকে দেখছেন, তা সত্ত্বেও প্রকাশ্য গুনাহে পা বাড়ায়; তা হলে তো তা অত্যন্ত মারাত্মক বিষয়। আর আল্লাহ তাকে দেখছেন, তিনি সবকিছু অবগত আছেন—এই বিশ্বাস যদি না রাখে; তা হলে তো তা কুফর। এবং ইসলাম থেকে পরিপূর্ণভাবে বের হয়ে যাওয়া। এই দুইটির মধ্যেই গুনাহ করার বিষয়টি আবর্তিত হয়।
এ কারনেই তাওবা বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য একটি শর্ত হলো: এই বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ্ তাকে সবসময় দেখছেন, তার সমস্ত বিষয়াদি সম্পর্কে তিনি অবগত আছেন এবং গুনাহে লিপ্ত হওয়ার সময়ও তিনি তার দিকে সরাসরি তাকিয়ে থাকেন। কারন তাওবা সহীহ হয় কেবল মুসলিম থেকেই। তবে হ্যাঁ, যে ব্যক্তি পূর্বে আল্লাহকে অস্বীকার করার সাথে সাথে আল্লাহ যে তাকে দেখছেন এটাও অস্বীকার করত, তার তাওবাও সহীহ হবে; তার তাওবা হবে ইসলামে প্রবেশ করা এবং আল্লাহ তা’আলাকে তাঁর গুণাবলিসহ স্বীকার করে নেয়া।
টিকাঃ
[৫২] আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৩৫৬৭; ইবনু মাজাহ, ৪২৫২।
📄 মাকবুল তাওবার কিছু আলামত
আল্লাহ্ তা’আলার নিকট গ্রহণ যোগ্য বিশুদ্ধ তাওবার কিছু আলামত বা নিদর্শন রয়েছে:
এক. তাওবা করার পরের অবস্থা, তাওবা করার আগের অবস্থার চেয়ে উত্তম হবে।
দুই. সবসময় ভয় করবে, আল্লাহ্ তা’আলার পাকড়াও থেকে সে নিজেকে কখনো নিরাপদ মনে করবে না। আসলে তার ভয় ও আশঙ্কা ততক্ষণ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত-না মৃত্যুর ফেরেশতাদের নিকট সে এই সুসংবাদ শোনে-
أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالجَنَّةِ الَّتِي كُنتُمْ تُوعَدُونَ )
“তোমরা ভীত হয়ো না, দুঃখ করো না এবং সেই জান্নাতের সুসংবাদ শুনে খুশি হও, যার প্রতিশ্রুতি তোমাদের দেওয়া হয়েছে।”[৫৩]
সুতরাং ভয়ভীতির আশঙ্কা কেবল তখনই দূর হবে, এর আগে নয়।
তিন. অনুতাপ, অনুশোচনা আর ভয়ে অন্তর চৌচির হয়ে যাওয়া। এই অবস্থার সৃষ্টি হয় অপরাধের ছোটো-বড়ো বিবেচনায়। এটি হলো ইবনু উয়াইনা -এর ব্যাখ্যা। তিনি আল্লাহ্ তা’আলার এই আয়াত থেকে তা গ্রহণ করেছেন-
إِلَّا أَنْ تَقَطَّعَ قُلُوبُهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ )
“যে পর্যন্ত-না তাদের অন্তরগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, মহাবিজ্ঞ।" [৫৪]
ইবনু উয়াইনা বলেন, 'অর্থাৎ যে পর্যন্ত-না তাদের অন্তরগুলো তাওবার দ্বারা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।'[৫৫] এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, মহাশাস্তির চরম ভয় অন্তরকে চৌচির করে দেয়। আর এটিই হলো অন্তরকে ছিন্নভিন্ন করা। প্রকৃত তাওবা একেই বলে। কারণ নিজের অপকর্মের দরুন আফসোস ও অনুশোচনা এবং এর খারাপ পরিণতির ভয়, তার অন্তরকে টুকরো টুকরো করে দেয়। যে ব্যক্তির অন্তর দুনিয়ার জীবনে গুনাহের অনুতাপে চৌচির হবে না, আখিরাতে যখন প্রকৃত অবস্থা প্রকাশিত হবে, আনুগত্যশীল বান্দাদের পুরস্কার আর অবাধ্য-পাপীদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে, তখন ঠিকই তার অন্তর চৌচির হয়ে যাবে। আসলে অন্তর ছিন্নভিন্ন ও চৌচির হবেই; হয়তো দুনিয়াতে নয়তো আখিরাতে।
বিশুদ্ধ তাওবার একটি বিশেষ দিক হলো: তাওবার দ্বারা অন্তরে বিশেষ ভাঙনের সৃষ্টি হয়; যার ব্যথা-বেদনা আর কোনোকিছুর সাথেই মেলে না। গুনাহগার আর পাপী ব্যক্তিরই এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়। এটি ক্ষুধা-তৃষ্ণা, পরিশ্রম-সাধনা কিংবা খাঁটি ভালোবাসার মাধ্যমেও অর্জন করা যায় না। এ সবগুলো থেকে ভিন্ন একটি বিষয় এটি। রবের সামনে অন্তরকে পরিপূর্ণভাবে ভেঙে ফেলা; যার ব্যাপ্তি চতুর্দিকে ছড়ানো। এটি আল্লাহর সামনে তাকে অত্যন্ত বিনয়ী, লাঞ্ছিত, অপদস্থ করে নিক্ষেপ করে। যেমন, গুরুতর অপরাধে অপরাধী কোনো গোলাম, যে তার মনিব থেকে পালিয়ে গেছে। অতঃপর তাকে ধরা হয়েছে এবং তাকে তার মনিবের সামনে উপস্থিত করা হয়েছে। তাকে উদ্ধার করার মতো কেউ নেই, আবার মনিব ছাড়া তার কোনো উপায়ও নেই, তার থেকে পালাবার কোনো পথও নেই। সে জানে, তার জীবন-সৌভাগ্য-সফলতা-মুক্তি সবই রয়েছে কেবল মনিবের সন্তুষ্টির মধ্যে। সে এ-ও জানে যে, তার সব রকমের পাপাচার সম্পর্কে তার মনিব খুব ভালোভাবে অবগত। এর সাথে সাথে মনিবের প্রতি তার ভালোবাসা ও তীব্র প্রয়োজনও বিদ্যমান থাকে, এবং সে খুব ভালো করেই জানে, তার নিজের দুর্বলতা ও অসহায়ত্ব আর তার মনিবের বিপুল ক্ষমতা ও শক্তি।
সুতরাং এই সমস্ত অবস্থা থেকে সৃষ্টি হয় ভাঙন, বিনম্রতা ও অপদস্থতা; যা তার জন্য কত-না উপকারী! এ রকম অবস্থা নিয়ে যে ফিরে আসে, সে কত-না অধিক প্রতিদানের উপযুক্ত! এর দ্বারা ক্ষতিপূরণ করা কত-না মহান! এর মাধ্যমে গোলাম তার মনিবের কত-না নৈকট্য হাসিল করে! তার মনিবের নিকট এই বিনম্রতা, অপদস্থতা, রোনাজারি, তার সামনে নিজেকে সমর্পণ করার চেয়ে পছন্দনীয় আর কিছু নেই।
আল্লাহর শপথ! এই অবস্থায় তার এই কথা কতই-না মধুর-
أَسْأَلُكَ بِعِرِّكَ وَذُلَّى لَكَ إِلَّا رَحِمْتَنِي. أَسْأَلُكَ بِقُوَّتِكَ وَضُعْفِي، وَبِغِنَاكَ عَنِّي وَفَقْرِى إِلَيْكَ. هَذِهِ نَاصِيَتِي الْكَاذِبَةُ الخَاطِئَةُ بَيْنَ يَدَيْكَ. عَبِيدُكَ سِوَايَ كَثِيرٌ، وَلَيْسَ لِي سَيِّدٌ سِوَاكَ. لَا مَلْجَأَ وَلَا مَنْجى مِنْكَ إِلَّا إِلَيْكَ. أَسْأَلُكَ مَسْأَلَةَ الْمِسْكِينِ، وَأَبْتَهِلُ إِلَيْكَ ابْتِهَالَ الخَاضِعِ الدَّلِيلِ، وَأَدْعُوكَ دُعَاءَ الخَابِفِ الضَّرِيْرِ، سُؤَالَ مَنْ خَضَعَتْ لَكَ رَقَبَتُهُ، وَرَغِمَ لَكَ أَنْفُهُ، وَفَاضَتْ لَكَ عَيْنَاهُ، وَذَلَّ لَكَ قَلْبُهُ
'আমি আপনার ইজ্জত ও আপনার প্রতি আমার অপদস্থতার দোহাই দিয়ে কেবল এই প্রার্থনাই করছি যে, আপনি আমার ওপর দয়া করুন। আমি আপনার কাছে চাচ্ছি আপনার ক্ষমতা ও আমার দুর্বলতার ওসীলায়, আমার থেকে আপনার অমুখাপেক্ষিতা ও আপনার প্রতি আমার মুখাপেক্ষিতার ওসীলায়, আমার এই মিথ্যা, ভুলে-ভরা কপাল আপনার কবজায়, আমাকে বাদে আপনার অসংখ্য বান্দা রয়েছে, কিন্তু আপনি ছাড়া আমার আর কোনো মালিক নেই, আপনি ব্যতীত আপনার কাছ থেকে মুক্তি ও আশ্রয় পাবার আর কোনো জায়গা নেই। আমি আপনার নিকট মিসকীন ও অসহায়ের ন্যায় ভিক্ষা চাচ্ছি, বিনয়ী ও অপদস্থ ব্যক্তির মতো আমি আপনার দিকে ধাবিত হচ্ছি, আমি আপনাকে ডাকছি ভীত ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির মতো এবং সেই ব্যক্তির চাওয়ার মতো আমি আপনার নিকট চাচ্ছি; যে নিজের ঘাড়কে আপনার সামনে নত করে দিয়েছে, আপন নাককে যে ধূলি ধূসরিত করেছে, আপনার কাছে যার দুচোখ অঝোর ধারায় অশ্রু ছেড়ে দিয়েছে এবং যে নিজের অন্তরকে কেবল আপনার জন্যই বিনীত করেছে।'
এই অবস্থা এবং এর অনুরূপ অন্যান্য অবস্থা হলো আল্লাহর কাছে মাকবুল বা গ্রহণযোগ্য তাওবার প্রভাব। সুতরাং যে ব্যক্তি তার অন্তরে এ রকম অবস্থা পাবে না, সে যেন নিজের তাওবাকে ত্রুটিযুক্ত মনে করে এবং তা সংশোধন করার প্রতি মনোযোগী হয়। প্রকৃতপক্ষে খাঁটি তাওবা বেশ কঠিন, কিন্তু মুখের কথায় ও উচ্চারণে কত-না সহজ! সত্যবাদী ব্যক্তি খাঁটি ও সত্য তাওবা অর্জনের চেয়ে কঠিন কোনোকিছুর জন্য পরিশ্রম করেনি। গুনাহ থেকে বাঁচার আর নেককাজ করার শক্তি কেবল আল্লাহ তাআলারই দান।
টিকাঃ
[৫৩] সূরা ফুসিলাত, ৪১: ৩০।
[৫৪] সূরা তাওবা, ৯: ১১০।
[৫৫] ইবনু আবী হাতিম, তাফসীর, ৬/১৮৮৬।