📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 সুদৃঢ় সংকল্প

📄 সুদৃঢ় সংকল্প


ব্যক্তি যখন জাগ্রত হবে এবং দূরদর্শিতা অর্জন করবে, তখন তার মধ্যে ইচ্ছা ও সত্যসংকল্পের সৃষ্টি হবে। সে নিজের ইচ্ছা ও নিয়তকে আল্লাহ তাআলার দিকে সফরের জন্য দৃঢ় করে নেবে। সে জানতে পারবে এবং তার ইয়াকীন হয়ে যাবে যে, আল্লাহ ছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই। ফলে সে আখিরাতের দিনের জন্য সফরের উপকরণ ও পাথেয় জোগাড় করতে সচেষ্ট হবে। আর সফরের প্রতিবন্ধকতা, বিপদাপদ যেগুলো তাকে সফরে বের হতে বাধা প্রদান করবে, সেগুলো থেকে মুক্ত হতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে।
যখন তার এই ইচ্ছা-সংকল্প মজবুত হয়ে যায়, তখন তা দৃঢ়তায় (الْعَزْمُ) রূপ নেয় এবং তা তাকে আল্লাহ তাআলার ওপর তাওয়াক্কুল ও ভরসা করে সফর শুরু করতে বাধ্য করে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ
"অতঃপর যখন আপনি (কোনো কাজের) স্থিরসংকল্প করে ফেলেন, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করুন।"[৪২]
আযম বা দৃঢ় সংকল্প হলো কাজের সাথে সম্পর্কিত মজবুত ইচ্ছা। এ কারণেই বলা হয়, দৃঢ় সংকল্প হলো উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য বাস্তবে সশরীরে কাজ শুরু করা।
তবে সঠিক কথা হলো দৃঢ় সংকল্প থেকেই বাস্তবে কাজ শুরু করার অনুপ্রেরণা সৃষ্টি হয়; হুবহু কাজ শুরু করা নয়। কিন্তু যেহেতু কোনো ব্যবধান ছাড়াই এ দুটি একসাথে মিলিত; তাই মনে হয় কাজ শুরু করাটাই হলো আযম বা দৃঢ় সংকল্প। অথচ তা হলো মূলকাজ শুরু করার তীব্র ও শক্তিশালী ইচ্ছা।
সুদৃঢ় সংকল্প (الْعَزْمُ) দুই প্রকার:
১. পথ চলতে শুরু করার সময় মুরীদ বা আল্লাহকে-চিনতে-ইচ্ছুক ব্যক্তির মজবুত ইচ্ছা; এটি হলো শুরুর অবস্থা।
২. পথ-চলা অবস্থায় শেষ পর্যন্ত অটল-অবিচল থাকার দৃঢ় ইচ্ছা। এটি প্রথমটির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটি মাকামসমূহের মধ্যে একটি মাকাম। অচিরেই আমরা যথাস্থানে তা বর্ণনা করব, ইন শা আল্লাহ।
এই মানযিলে পথিকের প্রয়োজন হয় এটা জানার যে, কী আদায় করা তার ওপর ওয়াজিব আর কী অর্জন করা তার দায়িত্ব। যাতে সে যা দরকার, তা অর্জন করতে পারে আর যা আদায় করা তার ওপর ওয়াজিব, তাও আদায় করতে পারে। এটাই হলো নিজেকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা বা মুহাসাবা। এই মানযিলটির অবস্থান ক্রমানুসারে তাওবার পূর্বে। কারণ যখন সে জানতে পারবে তার জন্য কী মর্যাদা অপেক্ষা করছে এবং কী কী হক ও দায়িত্ব তার ওপর রয়েছে, তখন সে সেই দায়িত্ব ও হকগুলো আদায় করার চেষ্টা করবে এবং দোষত্রুটি থেকে বের হতে চাইবে—আর এর নামই তাওবা।

টিকাঃ
[৪২] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৫৯।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 মুহাসাবা ও সফরের সূচনা

📄 মুহাসাবা ও সফরের সূচনা


আমরা إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ-এর চারটি মানযিল—১. জাগরণ/সতর্কতা, ২. চিন্তা-ফিকির, ৩. দূরদর্শিতা এবং ৪. সুদৃঢ় সংকল্প—সম্পর্কে আলোচনা করেছি।
এই চারটি মানযিল হলো অন্যান্য সমস্ত মানযিলের জন্য ভিত্তিস্বরূপ। আল্লাহ-অভিমুখে সফরের সমস্ত মানযil এর ওপরই প্রতিষ্ঠিত। আর নিশ্চিতভাবেই এগুলোতে অবতরণ করা ব্যতীত আল্লাহর দিকে সফর করার কল্পনাও করা যায় না। সেই সফর আমাদের সশরীরে করা কোনো ভ্রমণের মতোই। কারণ নিজ দেশে অবস্থানকারী কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত অন্য দেশে ভ্রমণ করতে পারে না, যতক্ষণ-না সে ভ্রমণসংক্রান্ত অমনোযোগিতা ও গাফলত থেকে জেগে ওঠে; এরপর ভ্রমণের ব্যাপারে দৃষ্টি দেয় যে, এর মধ্যে কী লাভ ও উপকার রয়েছে; এরপর সফরের জন্য উপাদান ও পাথেয় জোগাড়ে চিন্তা-ফিকির করে; এরপর দৃঢ় ইচ্ছা ও সংকল্প করে। দৃঢ় ইচ্ছা ও সংকল্প যখন করে, তখন সে মুহাসাবার মানযিলে স্থানান্তরিত হয়। মুহাসাবা হলো—তার প্রয়োজন কী আর তার ওপর কী হক ও দায়িত্ব তা পার্থক্য করা। যাতে সে প্রয়োয়জনীয় জিনিসগুলো সাথে নিতে পারে আর হক ও দায়িত্বগুলো আদায় করে যেতে পারে। কারণ সে এমন মুসাফির যে আর কখনো ফিরবে না।
সালিক বা আল্লাহর-পথের-পথিক মুহাসাবার মানযিল থেকে তাওবার মানযিলে অবতরণ করে। কারণ সে যখন নিজের নফসের হিসাব নেয়, তখন সে জানতে পারে তার ওপর কী হক ও দায়িত্ব রয়েছে; ফলে সে সেখান থেকে বের হতে চেষ্টা করে, কারও হক নষ্ট করলে তার হক আদায় করার জন্য তার নিকট পৌঁছে যায়। আর এটিই হলো প্রকৃত তাওবা। সুতরাং তাওবার মানযিলের আগে মুহাসাবা বা নিজের হিসাব নেওয়ার মানযিল হওয়াই যথাযথ।
আবার মুহাসাবাকে তাওবার পরে আনারও একটি কারণ রয়েছে। আর তা হলো মুহাসাবা করা তখনই সম্ভব হয়, যখন তাওবা সহীহ হয়। (সুতরাং আগে তাওবা পরে মুহাসাবা।)
তবে সঠিক অভিমত হলো তাওবা আসলে দুটি মুহাসাবার মধ্যবর্তী একটি মানযিল। একটি মুহাসাবা তাওবার পূর্বে; যা জোরালোভাবে তাওবা করতে উদ্বুদ্ধ করে। আর একটি মুহাসাবা হলো তাওবার পরে; যা তাওবাকে সংরক্ষণের দাবি করে। সুতরাং তাওবা দুই মুহাসাবা দ্বারা পরিবেষ্টিত। মুহাসাবা বা নিজের হিসাব নেওয়ার বিষয়টি আল্লাহ তাআলার এই বাণী দ্বারা প্রমাণিত—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنظُرْ نَفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর নাফরমানি থেকে বেঁচে থাকো। আর প্রত্যেকেই যেন লক্ষ রাখে যে, আগামীকালের জন্য সে কী পাঠিয়েছে।”[৪৬]
এখানে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে হুকুম দিয়েছেন, সে যেন আখিরাতের জন্য কী পাঠিয়েছে তার প্রতি লক্ষ রাখে। আর এটি নিজের মুহাসাবা বা হিসাব নেওয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে যে, যা প্রেরণ করছে তা নিয়ে আল্লাহ তাআলার সাথে সাক্ষাৎ করা যাবে কি না বা তা বিশুদ্ধ হচ্ছে কি না?
এই চিন্তাভাবনা বা হিসাব নেওয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে, যাতে ব্যক্তি আখিরাতের জন্য পরিপূর্ণ প্রস্তুতি নিতে পারে, যাতে সে আল্লাহর আযাব থেকে বেঁচে যেতে পারে এবং আল্লাহর নিকট নিজের চেহারা উজ্জ্বল করতে পারে।
উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বলেছেন,
حَاسِبُوا أَنْفُسَكُمْ قَبْلَ أَنْ تُحَاسَبُوا وَتَزَيَّنُوا لِلْعَرْضِ الْأَكْبَرِ وَإِنَّمَا يَحِفُ الْحِسَابُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَى مَنْ حَاسَبَ نَفْسَهُ فِي الدُّنْيَا
“তোমাদের হিসাব নেওয়ার আগেই তোমরা নিজেদের হিসাব নাও এবং মহাসমাবেশের জন্য নিজেকে সুসজ্জিত করো। কিয়ামাতের দিন সেই ব্যক্তির হিসাব অত্যন্ত হালকা ও সহজ হবে, যে দুনিয়াতেই নিজের হিসাব নিতে থাকে।”[৪৭]
একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহাসাবা বা আত্মসমালোচনা হলো—নিজের ভালো আমল ও খারাপ আমলের মাঝে তুলনা করা। এই তুলনা করার দ্বারা আপনি জানতে পারবেন মানে ও পরিমাণে কোন দিকটি বেশি ও অগ্রগামী।
তখন আপনার সামনে প্রকৃত তারতম্য সুস্পষ্ট হয়ে যাবে; আপনি বুঝতে পারবেন যে, আল্লাহ তাআলার ক্ষমা ও করুণা ছাড়া তাঁর আযাব ও বিপদ থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই।
মুহাসাবা নির্ভর করে হিকমতের নূরের ওপর। এটি হলো সেই নূর, যার দ্বারা আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলগণের অনুসারীদের অন্তরকে আলোকিত করে দেন। আর এর অনুপাতেই আপনি প্রকৃত পার্থক্য উপলব্ধি করতে পারবেন এবং মুহাসাবায় আত্মনিয়োগ করতে পারবেন।
কোনো একজন মা'রিফাতপ্রাপ্ত আল্লাহওয়ালা ব্যক্তি বলেছেন, 'আপনি যখন আল্লাহ তাআলার জন্য আপনার নফস ও আমলের ব্যাপারে সন্তুষ্ট হন, তখন মনে রাখবেন, এতে সন্তুষ্ট হওয়ার কিছু নেই। আসলে যে ব্যক্তি জানে, তার নফস হলো সমস্ত মন্দ ও খারাপ বিষয়ের আশ্রয়স্থল এবং ক্ষতিকর বিষয়সমূহ তার আমলকে লক্ষ্যস্থল বানায় (যেন তার আমল ত্রুটিযুক্ত হয়), সেই ব্যক্তি কীভাবে আল্লাহর জন্য নিজের নফস ও আমলের ব্যাপারে সন্তুষ্ট হতে পারে?'
শাইখ আবূ ইয়াযীদ-এর মেধা আল্লাহরই দান; তিনি কত চমৎকারই-না বলেছেন, 'যে ব্যক্তি নিজেকে পরিপূর্ণ দাসত্বে বিলিয়ে দেয়; সে তার কাজকর্মকে দেখে রিয়ার চোখে, তার অবস্থাকে দেখে অভিযোগের চোখে এবং তার কথাবার্তাকে দেখে সমালোচকের চোখে। যখনই আপনার অন্তরে কোনো কামনা বড়ো হয়ে দেখা দেয়, তখনই আপনার কাছে আপনার নফসের দাবি ছোটো হয়ে আসে; তা অর্জনে আপনি যে অর্থ ব্যয় করেন, তা সামান্য মনে হয়। আর যখনই আপনি রুবুবিয়্যাত ও দাসত্বের প্রকৃত অবস্থা প্রত্যক্ষ করবেন, আল্লাহর সম্পর্কে ও নিজের সম্পর্কে অবগত হবেন, এবং আপনার সামনে এটা স্পষ্ট হবে যে, আপনি যে সম্বল সংগ্রহ করেছেন, তা আল্লাহ তাআলার জন্য উপযুক্ত নয়; যদিও আপনি মানব ও জিনজাতির সমস্ত আমল নিয়ে উপস্থিত হন-তখনই আপনি আপনার শেষ পরিণতি নিয়ে আতঙ্কিত থাকবেন, ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে উঠবেন। আর এটা উপলব্ধি করবেন যে, আল্লাহ তাআলা কেবল নিজ দয়া, অনুগ্রহ ও করুণায় তা কবুল করেন এবং এর ওপর সাওয়াবও দেন নিজ দয়া, অনুগ্রহ ও করুণায়।' [৪৮]
যখন মুহাসাবার মাকাম সঠিক হয় এবং আল্লাহর-পথের-পথিক যখন এই মানযিলে অবতরণ করে, তখন সে এখান থেকে অগ্রসর হয় তাওবার মানযিলে।

টিকাঃ
[৪৬] সূরা হাশর, ৫৯: ১৮।
[৪৭] তিরমিযি, ২৪৫৯।
[৪৮] ইয়াফিয়ি, মিরআতুল জিনান, ৩/৩৫৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00