📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 জাগরণ/সতর্কতা

📄 জাগরণ/সতর্কতা


দাসত্বের প্রথম মানযিল জাগ্রত হওয়া বা সতর্কতা অবলম্বন করা। এটি হলো গাফলতের ঘুম থেকে জেগে ওঠার জন্য অন্তরকে নাড়া দেওয়া। আল্লাহর শপথ! এই জেগে ওঠা কত-না উপকারী! কত-না মর্যাদাপূর্ণ বিষয়! আর আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে কত-না উত্তম সাহায্যকারী! যে ব্যক্তি এটা অনুভব করতে সক্ষম হবে—আল্লাহর শপথ!—সে সফলতার বিষয়াদি অনুভব করবে। অন্যথায় সে গাফলতের মোহে আচ্ছন্ন হয়ে থাকবে। যখন সে জেগে উঠবে, তখন উচ্চ মনোবল নিয়ে যাত্রা শুরু করবে প্রথম মানযিল-অভিমুখে। যখন সে অমনোযোগিতার চাদর ছেড়ে উঠে দাঁড়াবে এবং তার অন্তর সতর্কতা ও মনোযোগিতার আলোয় উদ্ভাসিত হবে, তখন তা আল্লাহর দেওয়া প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সব নিয়ামাতের প্রতি দৃষ্টি দিতে তাকে বাধ্য করবে। আর যখনই সে তার অন্তরকে জাগ্রত রাখবে এবং দৃষ্টিকে তীক্ষ্ণ করবে, তখনই সে নিয়ামাতের বিশালত্ব ও প্রাচুর্য দেখতে পাবে। সে তা গণনা করতে নিজের অপারগতা অনুভব করবে। তার সীমারেখা নির্ণয় করতে গিয়ে থেমে যাবে।
তার ওপর আল্লাহ তাআলার যে অনুগ্রহ, তা উপলব্ধি করার জন্য তার অন্তরকে ব্যস্ততা মুক্ত রাখবে; যখন সে দেখবে আল্লাহ তাআলার নিয়ামাত ও অনুগ্রহরাজি কোনো রকমের যোগ্যতা ও প্রার্থনা ছাড়াই সে পেয়ে যাচ্ছে, তখন তার অন্তরে এই নিশ্চিত বিশ্বাস জন্মাবে যে, এর প্রতিদান প্রদানে সে অক্ষম। এর প্রতিদান হলো যথাযথ শুকরিয়া আদায় করা।
আল্লাহর দেওয়া নিয়ামাতের প্রতি দৃষ্টিদান করা এবং (সেগুলোর শুকরিয়া আদায়ে) বান্দার অক্ষমতার অনুভূতি তার জন্য দাসত্বের গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয়কে আবশ্যক করবে-
১. অনুগ্রহদানকারী (আল্লাহ)র প্রতি ভালোবাসা এবং তাঁর স্মরণে নিবেদিত থাকা,
২. তাঁর প্রতি বিনয়ী, নম্র হওয়া ও নিজের এই ক্ষুদ্রতা অনুভব করা যে, তাঁর অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা আদায় করতে সে অক্ষম।
তারপর সে যে সমস্ত অন্যায়-অপকর্ম করেছে, সে দিকে নজর দেবে এবং জানতে পারবে সে অনেক বড়ো বিপদে রয়েছে, দাঁড়িয়ে আছে ধ্বংসের মুখে, আল্লাহ তাআলার শাস্তিতে গ্রেফতার হওয়ার উপক্রম। যখন সে নিজের অপরাধ সম্পর্কে অবগত হবে, তখন ইলম ও আমলের মাধ্যমে সে এর প্রতিকার করতে চেষ্টা করবে। গুনাহ ও পাপের শাস্তি থেকে পরিত্রাণ পেতে ক্ষমা প্রার্থনা ও অনুশোচনার দিকে বেশ মনোযোগী হয়ে উঠবে। পরিশোধন ও মুক্তির পথ খুঁজতে থাকবে। আসলে দুনিয়ার এই জীবনে মানুষ ৪টি বিষয়ের মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন ও পরিশোধন হতে পারে-
১. তাওবা, ২. ইস্তিগফার, ৩. এমন নেক আমল, যা গুনাহকে মিটিয়ে দেয় এবং ৪. গুনাহ ও পাপ দূরকারী বিপদ-মুসীবত।
এই ৪টি বিষয় যদি কাউকে পরিশোধন ও পরিশুদ্ধ করে, তা হলে সে ওই সব ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত হয়, ফেরেশতারা উত্তম অবস্থায় যাদের জান কবজ করে এবং জান্নাতের সুসংবাদ দেয়।
যদি এই ৪টি বিষয় তাকে পরিশুদ্ধ না করে, তা হলে বুঝতে হবে তার তাওবা খাঁটি ছিল না; খাঁটি তাওবা হলো ব্যাপকভাবে সব গুনাহ থেকে ফিরে আসার সত্য তাওবা; আর তার ইস্তিগফারও পরিপূর্ণ ও যথাযথ ছিল না; কারণ পরিপূর্ণ ইস্তিগফার হলো গুনাহকে পরিত্যাগ করার সাথে সাথে তার ওপর অনুতপ্ত হওয়া। এটিই হলো উপকারী ইস্তিগফার। এমনিভাবে তার নেক আমলগুলোও পরিমাণ ও মানের দিক দিয়ে অত উন্নত ছিল না যে, তা গুনাহকে মিটিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হবে। এমনিভাবে বিপদাপদও (হয়তো সে জন্য যথেষ্ট ছিল না।)
কবরজগতে ৩টি বিষয়ের মাধ্যমে বান্দাকে পরিশুদ্ধ করা হয়-
এক. তার ওপর ঈমানদারদের জানাযার সালাত আদায় করা এবং তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং তার ব্যাপারে সুপারিশ করার মাধ্যমে।
দুই. কবরের পরীক্ষা, পরীক্ষক ফেরেশতাদের ভয় দেখানো, চাপ দেওয়া, তিরস্কার করা ইত্যাদির মাধ্যমে।
তিন. তার মুসলিম ভাইয়েরা যে আমল (এর সাওয়াব) তার নিকট হাদিয়া পাঠায় সেগুলোর মাধ্যমে। যেমন: তার পক্ষ থেকে সদাকা করা, হাজ্জ করা, সিয়াম পালন করা, সালাত আদায় করা ইত্যাদি। দান-সদাকা ও দুআ যে মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছে-এ ব্যাপারে সবার ইজমা সংঘটিত হয়েছে।
এগুলোর মাধ্যমেও যদি বান্দা পরিপূর্ণ পরিশুদ্ধ না হয়, তা হলে কিয়ামাতের ময়দানে রব্বুল আলামীনের সামনে দাঁড়িয়ে ৪টি বিষয়ের মাধ্যমে তাকে পরিশুদ্ধ করা হবে:
১. কিয়ামাতের ভয়াবহতা, ২. পরিস্থিতির তীব্রতা, ৩. সুপারিশকারীদের সুপারিশ এবং ৪. আল্লাহ তাআলার ক্ষমার মাধ্যমে।
এই ৪টি বিষয় যদি তার জন্য যথেষ্ট না হয়, তা হলে তাকে অবশ্যই জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করতে হবে। এটি তার জন্য আল্লাহর রহমতস্বরূপ; যাতে করে সে নিজের পাপ-পঙ্কিলতা থেকে পরিশুদ্ধ হতে পারে এবং চিরস্থায়ী জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেতে পারে। সুতরাং (জাহান্নামের) আগুন তার জন্য পবিত্রকারী ও তার ময়লা-আবর্জনা পরিশোধনকারী হিসেবে কাজ করবে। সে আগুনে অবস্থান করবে তার পাপ ও গুনাহের কম-বেশির পরিমাণ অনুসারে। যখন গুনাহ ও পাপমুক্ত হয়ে যাবে, তখন তাকে আগুন থেকে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 চিন্তা-ফিকির

📄 চিন্তা-ফিকির


কেউ যখন গাফলতের ঘুম থেকে জাগ্রত হয়, তখন এই জাগরণই তার মাঝে চিন্তা-ফিকিরের সৃষ্টি করে। চিন্তা-ফিকির হলো অন্তরকে উদ্দেশ্যের প্রতি সজাগ রাখা, সেদিকে ধাবিত করা; যার ব্যাপারে পূর্বেই সে সংক্ষিপ্তভাবে প্রস্তুত ছিল; কিন্তু বিস্তারিত দিকনির্দেশনা এবং সে পর্যন্ত পৌঁছার পথ জানা ছিল না।
চিন্তা-ফিকির দুই প্রকার: ইলম ও মা'রিফাতের সাথে সম্পর্কিত এবং অনুসন্ধান ও ইচ্ছার সাথে সম্পর্কিত।
ইলম ও মা'রিফাতের সাথে সম্পর্কিত চিন্তা-ফিকির হলো-১. হক ও ২. বাতিল এবং ৩. বৈধ ও ৪. অবৈধের মাঝে পার্থক্য করার চিন্তা-ফিকির।
আর অনুসন্ধান ও ইচ্ছার সাথে সম্পর্কিত চিন্তা-ফিকির হলো-৫. উপকারী ও ৬. ক্ষতিকর বস্তুর মাঝে পার্থক্য করার চিন্তা-ফিকির। এই হলো মোট ৬ প্রকার। যার সপ্তম কোনো প্রকার নেই। আর এগুলোই হলো জ্ঞানী ও চিন্তাশীলদের ভাবনার ক্ষেত্র।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 দূরদর্শিতা

📄 দূরদর্শিতা


চিন্তা-ফিকির যদি সঠিক হয়, তা হলে তা ব্যক্তির মাঝে বাসীরাত বা দূরদর্শিতার সৃষ্টি করে। দূরদর্শিতা হলো অন্তরের একটি নূর; যার দ্বারা ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুতি, ভীতিপ্রদর্শন, জান্নাত, জাহান্নাম প্রত্যক্ষ করে। আল্লাহ তাআলা জান্নাতে তাঁর বন্ধুদের জন্য কী কী নিয়ামাত তৈরি করে রেখেছেন, আর জাহান্নামে তাঁর শত্রুদের জন্য কী কী শাস্তি মজুদ রেখেছেন, তাও সে দেখতে পায়। সে দেখতে পায় সমস্ত মানুষ কবর থেকে বের হয়ে আল্লাহর আহ্বানের দিকে ছুটছে, আসমানের সব ফেরেশতা নেমে এসে তাদের বেষ্টন করে রাখছে, আল্লাহ তাআলাও সামনে চলে এসেছেন, আর বিচার-ফায়সালা করার জন্য তাঁর কুরসি স্থাপন করা হয়েছে;
ফলে তাঁর আলোয় পুরো পৃথিবী আলোকিত হয়ে গেছে, সবার আমলনামা সামনে আনা হয়েছে, (সে দেখতে পায়) নবি-রাসূলগণ ও সাক্ষীদের হাজির করা হয়েছে, একদিকে দাঁড়িপাল্লা দাঁড় করানো হয়েছে; যা দিয়ে সবার আমলনামা মাপা হবে, বিবাদকারীরা এসে সমবেত হয়েছে, প্রত্যেক পাওনাদার তার দেনাদারকে ধরে রেখেছে, হাউজে কাওসার ও তার অসংখ্য পানপাত্র তার সামনে উদ্ভাসিত হয়েছে, সে অনেককেই পিপাসার্ত দেখতে পাচ্ছে কিন্তু, সেখান থেকে পান করছে মাত্র অল্পসংখ্যক কিছু মানুষ, অতিক্রম করার জন্য পুলসিরাত স্থাপন করা হয়েছে, মানুষকে সে দিকে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে, পুলসিরাতের নিচে জাহান্নামের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে, এর মধ্যে যারা গড়িয়ে পড়ছে তাদের সংখ্যা শত শতগুণ বেশি, যারা এর থেকে বেঁচে যাচ্ছে তাদের তুলনায়।
তার অন্তরে একটি চোখ উন্মুক্ত হয়; যার মাধ্যমে সে এই সব দৃশ্য দেখতে পায়। তার অন্তরে আখিরাতের প্রমাণসমূহের মধ্য থেকে একটি প্রমাণ নিযুক্ত থাকে (এবং এ কারণে একটি প্রভাব সৃষ্টি হয়), যা তাকে আখিরাতের স্থায়িত্ব এবং দুনিয়া তাড়াতাড়ি-ধ্বংস-হয়ে-যাওয়া দেখিয়ে দেয়।
দূরদর্শিতা বা বাসীরাতের তিনটি স্তর রয়েছে। যে ব্যক্তি এগুলোকে পরিপূর্ণ করবে, তার দূরদর্শিতাও পূর্ণতা পাবে।
এক. আল্লাহ তাআলার নাম ও গুণসমূহের ক্ষেত্রে দূরদর্শিতা : এটি হলো আল্লাহ তাআলা নিজের সম্পর্কে যে বর্ণনা দিয়েছেন আর তাঁর সম্পর্কে তাঁর রাসূল যে বর্ণনা দিয়েছেন-এ দুয়ের ব্যাপারে কোনো সংশয়-সন্দেহ আপনার ঈমানে কোনো প্রকার প্রভাব ফেলবে না। বরং এ বিষয়গুলোতে কোনো ধরনের সংশয় আপনার নিকট আল্লাহর অস্তিত্বে সংশয়-সন্দেহের মতোই কঠিন বলে মনে হবে। আর দূরদর্শী সম্প্রদায়ের কাছে এ দুটি বাতিল হওয়ার ক্ষেত্রে সমান।
এই দূরদর্শিতার ক্ষেত্রে মানুষে মানুষে যে পার্থক্য তার কারণ হলো-তাদের মধ্যে নববি দলীল-প্রমাণ জানা ও বোঝার ক্ষেত্রে এবং এ ব্যপারে সন্দেহ-সংশয় যে বিভ্রান্তিমূলক, তা উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে পার্থক্য হওয়া।
দুই. আদেশ-নিষেধের ক্ষেত্রে দূরদর্শিতা: আদেশ-নিষেধের ক্ষেত্রে দূরদর্শিতা হলো ব্যাখ্যা (জানতে চাওয়া), এবং নিজ চেষ্টার দ্বারা যেকোনো বিপরীতমুখী (সন্দেহ-সংশয়) দূর করা। এর ফলে বান্দার অন্তরে এমন কোনো সংশয় বাকি থাকে না, যা আল্লাহর আদেশ-নিষেধের ব্যাপারে বিরোধ সৃষ্টি করে, কোনো অবহেলা ও খাহেশাতও থাকে না, যা আদেশ-নিষেধ বাস্তবায়ন করা, তা মেনে চলা এবং গ্রহণ করাকে বাধা দেয়। আবার কারও এমন তাকলীদ বা অনুসরণও থাকে না, যা তাকে সরাসরি কুরআন-হাদীস থেকে হুকুম-আহকাম অন্বেষণ করার ক্ষেত্রে পরিশ্রম করা থেকে বিরত রাখে।
তিন. আল্লাহর প্রতিশ্রুতি ও ভীতিপ্রদর্শনের ক্ষেত্রে দূরদর্শিতা: আপনি প্রত্যক্ষ করবেন আল্লাহ তাআলাই সবকিছু পরিচালনা করছেন; বান্দা ভালো-মন্দ যা কিছু করছে, বতর্মানের-ভবিষ্যতের, দুনিয়া-আখিরাতের সবকিছুর পরিচালনা করছেন কেবল আল্লাহ তাআলা। এটি হলো তাঁর ইলাহিয়্যাত, রুবুবিয়্যাত, ইনসাফ ও হিকমতের দাবি। এ ক্ষেত্রে সংশয় মানে আল্লাহর ইলাহিয়্যাত ও রুবুবিয়্যাত সম্পর্কেই সংশয়; বরং এটি আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কেই সংশয়। কারণ এর বিপরীত বিষয় তাঁর জন্য অসম্ভব। আর এটিও তাঁর উপযুক্ত নয় যে, তিনি সৃষ্টিজগৎকে বেকার ও কর্মহীন করে রেখেছেন এবং এমনি এমনি ছেড়ে দিয়েছেন। এই ধারণা থেকে আল্লাহ অতি ঊর্ধ্বে।
সুতরাং আকল বা বুদ্ধির দ্বারা আল্লাহ তাআলার প্রতিদান দেওয়ার বিষয়টি উপলব্ধি করা, আল্লাহ তাআলা যে একক, অদ্বিতীয় তা উপলব্ধি করার মতোই। এ কারণেই সঠিক অভিমত হলো-আখিরাতের বিষয়টি আকল দ্বারাই জানা যায়, তবে এর বিস্তারিত বিবরণ এসেছে ওহীর মাধ্যমে।
দূরদর্শিতা বা বাসীরাতের দরুন ব্যক্তির অন্তরে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ঝরনা প্রবাহিত হয়; যা চেষ্টা-মেহনত করে বা অধ্যয়ন করে অর্জন করা সম্ভব নয়। এটি আল্লাহ তাআলার কিতাব ও দ্বীন বোঝার সেই উপলব্ধি, যা আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাকে দান করে থাকেন। এই দান হয় ব্যক্তির দূরদর্শিতার পরিমাণ অনুসারে।
এই দূরদর্শিতার কারণে ব্যক্তির অন্তর-ভূমিতে ফিরাসাতে সাদিকাহ বা সত্য অন্তর্দৃষ্টির সৃষ্টি হয়। এটি হলো একটি আলো; যা আল্লাহ তাআলা বান্দার অন্তরে ঢেলে দেন, ফলে সে এর দ্বারা হক-বাতিল ও সত্য-মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِلْمُتَوَسِّمِينَ "এতে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন লোকদের জন্য অনেক নিদর্শন রয়েছে।"[৪৩]
রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
اتَّقُوْا فِرَاسَةَ الْمُؤْمِنِ فَإِنَّهُ يَنْظُرُ بِنُوْرِ اللَّهَ "তোমরা মুমিনের অন্তর্দৃষ্টি থেকে বেঁচে থাকো। কারণ সে আল্লাহর নূরের সাহায্যে দেখে।"
এরপর নবি তিলাওয়াত করলেন,
إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِلْمُتَوَسِّمِينَ “এতে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন লোকদের জন্য অনেক নিদর্শন রয়েছে।” (সূরা হিজর, ১৫: ৭৫)[৪৪]
দূরদর্শিতার সবলতা ও দূরদর্শিতার দুর্বলতার ভিত্তিতে ফিরাসাত বা অন্তর্দৃষ্টির সৃষ্টি হয়। এটি দুই প্রকার:
১. মর্যাদাপূর্ণ সুউচ্চ অন্তর্দৃষ্টি; এটি কেবল মুমিনদের জন্যই খাছ।
২. সস্তা ও নিম্নমুখী অন্তর্দৃষ্টি; যা মুমিন ও কাফির সবার মধ্যেই পাওয়া যায়। এটি হলো সাধনাকারী, ক্ষুধার্ত, নিদ্রাহীন, নির্জনতা অবলম্বনকারী, সব রকমের ব্যস্ততা থেকে নিজের অন্তরকে মুক্ত রেখে রিয়াযত-মুজাহাদা বা পরিশ্রমকারী ব্যক্তির অন্তর্দৃষ্টি। এই সমস্ত ব্যক্তিরা বস্তুসমূহের আকার-আকৃতির ব্যাপারে অবগত হতে পারে, হয়তো নিম্নস্তরের অদৃশ্য কিছু সংবাদও তারা দিতে পারে; কিন্তু এগুলোর মাধ্যমে তাদের নফসের কোনো পরিপূর্ণতা ও বিশুদ্ধতা আসে না, তাদের ঈমান ও মা'রিফাতেরও কোনো বৃদ্ধি ঘটে না।
আর সত্যবাদী এবং আল্লাহ ও তাঁর আদেশ সম্পর্কে যারা জ্ঞানী, তাদের অন্তর্দৃষ্টি হলো-রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পথ-পদ্ধতি সম্পর্কে জানা, নিজের নফসের দোষত্রুটি, মুসলমানদের পথে চলার ক্ষেত্রে আমলের কী কী প্রতিবন্ধকতা ও বিপদ সামনে আসে ইত্যাদি সম্পর্কে অবগত হওয়া।
এটি হলো সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ফিরাসাত ও বাসীরাত এবং বান্দার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে সবচেয়ে বেশি উপকারী।

টিকাঃ
[৪৩] সূরা হিজর, ১৫: ৭৫।
[৪৪] তিরমিযি, ৩১২৭।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 সুদৃঢ় সংকল্প

📄 সুদৃঢ় সংকল্প


ব্যক্তি যখন জাগ্রত হবে এবং দূরদর্শিতা অর্জন করবে, তখন তার মধ্যে ইচ্ছা ও সত্যসংকল্পের সৃষ্টি হবে। সে নিজের ইচ্ছা ও নিয়তকে আল্লাহ তাআলার দিকে সফরের জন্য দৃঢ় করে নেবে। সে জানতে পারবে এবং তার ইয়াকীন হয়ে যাবে যে, আল্লাহ ছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই। ফলে সে আখিরাতের দিনের জন্য সফরের উপকরণ ও পাথেয় জোগাড় করতে সচেষ্ট হবে। আর সফরের প্রতিবন্ধকতা, বিপদাপদ যেগুলো তাকে সফরে বের হতে বাধা প্রদান করবে, সেগুলো থেকে মুক্ত হতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে।
যখন তার এই ইচ্ছা-সংকল্প মজবুত হয়ে যায়, তখন তা দৃঢ়তায় (الْعَزْمُ) রূপ নেয় এবং তা তাকে আল্লাহ তাআলার ওপর তাওয়াক্কুল ও ভরসা করে সফর শুরু করতে বাধ্য করে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ
"অতঃপর যখন আপনি (কোনো কাজের) স্থিরসংকল্প করে ফেলেন, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করুন।"[৪২]
আযম বা দৃঢ় সংকল্প হলো কাজের সাথে সম্পর্কিত মজবুত ইচ্ছা। এ কারণেই বলা হয়, দৃঢ় সংকল্প হলো উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য বাস্তবে সশরীরে কাজ শুরু করা।
তবে সঠিক কথা হলো দৃঢ় সংকল্প থেকেই বাস্তবে কাজ শুরু করার অনুপ্রেরণা সৃষ্টি হয়; হুবহু কাজ শুরু করা নয়। কিন্তু যেহেতু কোনো ব্যবধান ছাড়াই এ দুটি একসাথে মিলিত; তাই মনে হয় কাজ শুরু করাটাই হলো আযম বা দৃঢ় সংকল্প। অথচ তা হলো মূলকাজ শুরু করার তীব্র ও শক্তিশালী ইচ্ছা।
সুদৃঢ় সংকল্প (الْعَزْمُ) দুই প্রকার:
১. পথ চলতে শুরু করার সময় মুরীদ বা আল্লাহকে-চিনতে-ইচ্ছুক ব্যক্তির মজবুত ইচ্ছা; এটি হলো শুরুর অবস্থা।
২. পথ-চলা অবস্থায় শেষ পর্যন্ত অটল-অবিচল থাকার দৃঢ় ইচ্ছা। এটি প্রথমটির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটি মাকামসমূহের মধ্যে একটি মাকাম। অচিরেই আমরা যথাস্থানে তা বর্ণনা করব, ইন শা আল্লাহ।
এই মানযিলে পথিকের প্রয়োজন হয় এটা জানার যে, কী আদায় করা তার ওপর ওয়াজিব আর কী অর্জন করা তার দায়িত্ব। যাতে সে যা দরকার, তা অর্জন করতে পারে আর যা আদায় করা তার ওপর ওয়াজিব, তাও আদায় করতে পারে। এটাই হলো নিজেকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা বা মুহাসাবা। এই মানযিলটির অবস্থান ক্রমানুসারে তাওবার পূর্বে। কারণ যখন সে জানতে পারবে তার জন্য কী মর্যাদা অপেক্ষা করছে এবং কী কী হক ও দায়িত্ব তার ওপর রয়েছে, তখন সে সেই দায়িত্ব ও হকগুলো আদায় করার চেষ্টা করবে এবং দোষত্রুটি থেকে বের হতে চাইবে—আর এর নামই তাওবা।

টিকাঃ
[৪২] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৫৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00