📄 ইবাদাতের ভিত্তিভিত্তিসমূহ
إِيَّاكَ نَعْبُدُ-এর প্রতিষ্ঠা চারটি ভিত্তির ওপর। আর তা হলো: আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা কিছু ভালোবাসেন ও পছন্দ করেন, তা বাস্তবায়ন করা—
১. মুখের ভাষায়,
২. অন্তরের ভাষায়,
৩. অন্তরের আমল দ্বারা এবং
৪. অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল দ্বারা।
প্রকৃত দাসত্ব বা উবুদিয়্যাহ এই চারটি ভিত্তিকেই অন্তর্ভুক্ত করে। যারা এই চারটি বিষয়ের অধিকারী, তারাই প্রকৃত ইইয়াকা নাবুদু-এর গুণে গুণান্বিত।
অন্তরের ভাষায়: আল্লাহ তাআলা নিজের সত্তা, নাম, গুণাবলি, কাজকর্ম, তাঁর ফেরেশতা, তাঁর সাক্ষাৎ ইত্যাদি সম্পর্কে নবি ﷺ-এর মাধ্যমে যা কিছু জানিয়েছেন, তা অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করা।
মুখের ভাষায়: এই বিষয়গুলো সম্পর্কে অপরকে জানানো, এর প্রতি আহ্বান করা, এর বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললে তা প্রতিহত করা, বিদআতকে বাতিল হিসাবে প্রকাশ করা, আল্লাহ তাআলার স্মরণে নিমগ্ন থাকা, তাঁর আদেশ-নিষেধ মানুষের কাছে পৌঁছিয়ে দেওয়া ইত্যাদি।
অন্তরের আমলের দ্বারা: যেমন: আল্লাহ তাআলাকে ভালোবাসা, তাঁর ওপর ভরসা করা, তাঁর দিকে ধাবিত হওয়া, তাঁকে ভয় করা, তাঁর নিকটেই আশ্রয় গ্রহণ করা, সমস্ত আমলকে একমাত্র তাঁর সন্তুষ্টি লাভের আশাতেই সম্পন্ন করা, আল্লাহ তাআলার হুকুম মানতে গিয়ে এবং নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ থেকে বিরত থাকতে গিয়ে কষ্ট সহ্য করা, তাঁর ফায়সালা ও তাকদীরের ওপর সবর করা, তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা, তাঁর সন্তুষ্টির জন্যই কাউকে ভালোবাসা, তাঁর সন্তুষ্টির জন্যই কারও সাথে দুশমনি রাখা, তাঁর প্রতি বিনয়ী হওয়া, মুখাপেক্ষী থাকা, তাঁর ওপর আস্থা রাখা, নিশ্চিত হওয়াসহ অন্তরের এ রকম আরও অনেক আমল এর মধ্যে শামিল; যার গুরুত্ব অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমলের চেয়ে অনেক বেশি। অন্তরের পছন্দনীয় আমল আল্লাহ তাআলার নিকট বাহ্যিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের পছন্দনীয় আমলের চেয়ে বেশি প্রিয়। অন্তরের এই আমলগুলো ব্যতীত অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বাহ্যিক আমল উপকারশূন্য বা কম উপকারী।
অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমলের দ্বারা: যেমন: সালাত, জিহাদ, জুমুআ ও জামাআতের দিকে যাওয়া, অক্ষম ব্যক্তিকে সাহায্য করা, সৃষ্টিজগতের কল্যাণে এগিয়ে আসা ইত্যাদি।
সুতরাং إِيَّاكَ نَعْبُدُ এই চারটি বিষয়কেই আবশ্যক করে এবং এর স্বীকৃতি দেয়। আর وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ হলো এগুলো পালনে আল্লাহর সাহায্য ও তাওফীক প্রার্থনা করা। اِهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ এই দুটি বিষয়কেই বিস্তারিতভাবে শামিল করে। তা পালন করতে অনুপ্রেরণা জোগায়, সালিকীন বা আল্লাহ-অভিমুখীদের আল্লাহর পথে চলা অব্যাহত রাখে।
📄 إِيَّاكَ نَعْبُدُ মৃত্যু পর্যন্ত আবশ্যক
আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় রাসূল -কে বলেছেন, وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ
"এবং আপনার নিকট 'সুনিশ্চিত বিষয়' আসা পর্যন্ত আপনার রবের ইবাদাত করতে থাকুন।”[২৮]
জাহান্নামবাসীরা বলবে, وَكُنَّا نُكَذِّبُ بِيَوْمِ الدِّينِ حَتَّى أَتَانَا الْيَقِينُ
"আমরা বিচারের দিনকে মিথ্যা মনে করতাম। শেষ পর্যন্ত আমরা সে সুনিশ্চিত বিষয়ের মুখোমুখি হয়েছি।”[২৯]
মুফাস্সিরগণের ইজমা হয়েছে-এখানে 'সুনিশ্চিত বিষয়' বলতে মৃত্যুকে বোঝানো হয়েছে।
উসমান ইবনু মাযউন-এর মৃত্যুর ঘটনা সম্পর্কে 'সহীহ বুখারি'-র বর্ণনায় এসেছে, নবি বলেছেন,
أَمَّا عُثْمَانُ فَقَدْ جَاءَهُ الْيَقِينُ مِنْ رَّبِّهِ "আর উসমান; তার কাছে তো তার রবের পক্ষ থেকে 'সুনিশ্চিত বিষয়' এসে গেছে।" [৩০]। অর্থাৎ মৃত্যু ও মৃত্যু সম্পর্কিত বিষয়।
সুতরাং বান্দা যত দিন এই দুনিয়ার জীবনে রয়েছে ইবাদাত-বন্দেগি আর দাসত্ব থেকে তার নিষ্কৃতি নেই। বরং কবরের জীবনেও তার জন্য রয়েছে অন্য রকম এক দাসত্ব। কারণ সেখানে দুজন ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞাসা করবে, 'সে কার ইবাদাত করত? আল্লাহর রাসূল সম্পর্কে সে কী বলে?' ফেরেশতাদ্বয় তার কাছ থেকে এর উত্তর খুঁজবে।[৩১]
কিয়ামাতের ময়দানেও বান্দার জন্য এক প্রকারের দাসত্ব রয়েছে। আল্লাহ তাআলা সেদিন সমগ্র সৃষ্টিকে সাজদা করার আহ্বান করবেন। ফলে মুমিনরা সাজদায় পড়ে যাবে আর কাফির-মুনাফিকরা অবশিষ্ট থেকে যাবে, তারা সাজদা করতে পারবে না। অতঃপর যখন সবাই জান্নাত-জাহান্নামে চলে যাবে, তখন আর কোনো দাসত্ব ও দায়িত্ব থাকবে না। তখন জান্নাতবাসীদের দাসত্ব হবে তাসবীহ পাঠ; যা তাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের সাথে মিলানো থাকবে। এতে তারা কোনো ধরনের কষ্ট কিংবা ক্লান্তি অনুভব করবে না।
যে ব্যক্তি মনে করে যে, সে এমন মর্তবায় পৌঁছে গেছে, যেখানে দাসত্ব ও ইবাদাত-বন্দেগির আর কোনো প্রয়োজন নেই—তা হলে সে যিনদীক, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অস্বীকারকারী। সে এর দ্বারা আল্লাহ তাআলাকে অস্বীকার করার স্তরে পৌঁছে যায়। দ্বীন থেকে সে পুরাপুরি বের হয়ে যায়। আসলে বান্দা যখন উচ্চ কোনো মানযিলে পৌঁছে, তখন তার ইবাদাতের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়, তার ওপর আরও বড়ো দায়িত্ব এসে পড়ে; যা থেকে তার নিচের স্তরের ব্যক্তিরা মুক্ত থাকে। এ কারণেই আল্লাহর রাসূল -এর ওপর; বরং সমস্ত নবি-রাসূলের ওপর দায়িত্ব ছিল তাদের উম্মাতের চেয়ে অনেক বেশি ও বড়ো। নবি-রাসূলদের মধ্যে আবার যারা উলুল আযম বা দৃঢ়তার অধিকারী ছিলেন, তাদের দায়িত্ব ছিল আরও বেশি; তাদের তুলনায় যারা ছিল তাদের চেয়ে নিম্নস্তরের। এমনিভাবে ইলমের অধিকারী যারা ছিলেন, তাদের দায়িত্বও ছিল অনেক বড়ো, তাদের চেয়ে নিম্নস্তরের ব্যক্তিদের তুলনায়। প্রত্যেক ব্যক্তি তার মর্যাদা অনুসারে দায়িত্ব প্রাপ্ত হয়।
টিকাঃ
[২৮] সূরা হিজর, ১৫: ৯৯।
[২৯] সূরা মুদ্দাসসির, ৭৪: ৪৬-৪৭।
[৩০] বুখারি, ১২৪৩।
[৩১] দেখুন-বুখারি, ১৩৭৪; মুসলিম, ২৮৭১।
📄 দাসের প্রকারভেদ
দাসত্ব দুই প্রকার: ১. সাধারণ দাসত্ব ও ২. বিশেষ দাসত্ব।
১. সাধারণ দাসত্ব (اَلْعُبُوْدِيَّةُ الْعَامَّةُ) : আল্লাহ তাআলার প্রতি সমস্ত আসমানবাসী ও জমিনবাসীর দাসত্ব; সৎ-অসৎ, মুমিন-কাফির সবাই এর অন্তর্ভুক্ত। এটি হলো আল্লাহ তাআলার ক্ষমতা ও জবরদস্তিমূলক দাসত্ব। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَقَالُوا اتَّخَذَ الرَّحْمَنُ وَلَدًا لَقَدْ جِئْتُمْ شَيْئًا إِذًا تَكَادُ السَّمَاوَاتُ يَتَفَطَّرْنَ مِنْهُ وَتَنْشَقُ الْأَرْضُ وَتَخِرُ الجِبَالُ هَدًّا أَنْ دَعَوْا لِلرَّحْمَنِ وَلَدًا وَمَا يَنبَغِي لِلرَّحْمَنِ أَنْ يَتَّخِذَ وَلَدًا إِنْ كُلُّ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ إِلَّا آتِي الرَّحْمَنِ عَبْدًا
“তারা বলে, দয়াময় আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন। মারাত্মক বাজে কথা, যা তোমরা তৈরি করে এনেছ। আকাশ ফেটে পড়ার, পৃথিবী বিদীর্ণ হবার এবং পাহাড় ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে—এজন্য যে, লোকেরা রহমানের জন্য সন্তান থাকার দাবি করেছে! কাউকে সন্তান গ্রহণ করা রহমানের জন্য শোভনীয় নয়। পৃথিবী ও আকাশমণ্ডলিতে যারা রয়েছে, সবাই তাঁর সামনে বান্দা হিসেবে উপস্থিত হবে।”[৩২]
সুতরাং মুমিন-কাফির সবাই এর অন্তর্ভুক্ত।
২. বিশেষ দাসত্ব (اَلْعُبُوْدِيَّةُ الْخَاصَّةُ) : এটি হলো আনুগত্য, মহাব্বত ও হুকুম পালনের দাসত্ব। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا عِبَادِ لَا خَوْفٌ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ وَلَا أَنْتُمْ تَحْزَنُونَ “হে আমার বান্দাগণ, আজ তোমাদের কোনো ভয় নেই এবং তোমরা দুঃখিতও হবে না।”[৩৩]
فَبَشِّرْ عِبَادِ الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ
"অতএব, সুসংবাদ দিন আমার বান্দাদের। যারা মনোনিবেশ সহকারে কথা শোনে, অতঃপর যা উত্তম, তার অনুসরণ করে।”[৩৪]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا
"রহমান-এর বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদের সাথে যখন মূর্খরা কথা বলতে থাকে, তখন তারা বলে, সালাম।"[৩৫]
সমগ্র সৃষ্টিই আল্লাহ তাআলার রুবুবিয়্যাতের বান্দা। আর আল্লাহর আনুগত্য ও বেলায়াতের অধিকারী বা নৈকট্যশীল ব্যক্তিরা হলো আল্লাহ তাআলার ইলাহিয়্যাতের বান্দা।
দাসত্ব )الْعُبُودِيَّة( দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার কারণ হলো এই শব্দের মূল অর্থ হচ্ছে-বিনয় ও নম্র হওয়া। আল্লাহর বন্ধুরা তাঁর প্রতি বিনয়ী ও নম্র হন স্বেচ্ছায় ও ইবাদাতের ভিত্তিতে। আর আল্লাহর শত্রুরা বিনয়ী হয় অনিচ্ছায় ও বাধ্য হয়ে।
টিকাঃ
[৩২] সূরা মারইয়ান, ১৯: ৮৮-৯৩।
[৩৩] সূরা যুখরুফ, ৪৩: ৬৮।
[৩৪] সূরা যুমার, ৩৯: ১৭-১৮।
[৩৫] সূরা ফুরকান, ২৫: ৬৩।
📄 দাসের স্তর
ইলম ও আমল অনুসারে দাসত্বের অনেকগুলো স্তর রয়েছে।
দাসত্বের ইলমি স্তর হলো দুইটি: এক. আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে ইলম এবং দুই. আল্লাহ তাআলার দ্বীন সম্পর্কে ইলম।
এক. আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে ইলম আবার পাঁচটি স্তরে বিভক্ত: ১. আল্লাহর সত্তা সম্পর্কে ইলম, ২. আল্লাহর গুণাবলি সম্পর্কে ইলম, ৩. আল্লাহর কার্যাবলি সম্পর্কে ইলম, ৪. আল্লাহর নামসমূহ সম্পর্কে ইলম এবং ৫. আল্লাহকে এমন সব গুণাবলি থেকে মুক্ত রাখার ইলম, যা তাঁর অনুপযুক্ত।
দুই. আল্লাহর দ্বীন সম্পর্কে ইলমের আবার দুইটি স্তর রয়েছে : ১. দ্বীনের মধ্যে আল্লাহর আদেশসূচক বিষয়াবলি সম্পর্কে জ্ঞান রাখা। আর এটিই হলো সিরাতে মুস্তাকীম; যা ব্যক্তিকে আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছে দেয়।
২. দ্বীনের ছোটো ছোটো বিষয়গুলো সম্পর্কেও জ্ঞান রাখা। যা সাওয়াব ও আযাব এবং আল্লাহ তাআলার ফেরেশতা ও রাসূলদের সম্পর্কে জানাকেও অন্তর্ভুক্ত করে।
দাসত্বের আমলি স্তর আবার দুই প্রকার: এক. ডান দিকের লোকদের স্তর এবং দুই. নৈকট্যশীল অগ্রগামীদের স্তর।
এক. ডান দিকের লোকদের স্তর: ওয়াজিব আমলগুলো পালন করা এবং হারাম ও নিষিদ্ধ কাজকর্ম থেকে বেঁচে থাকা। তবে বৈধ বিষয়ে লিপ্ত হওয়া, কিছু অপছন্দনীয় কাজে জড়িয়ে পড়া এবং কিছু পছন্দনীয় কাজ পরিত্যাগ করাও এই স্তরের শামিল।
দুই. নৈকট্যশীল অগ্রগামীদের স্তর: ওয়াজিব ও মুস্তাহাব বিষয়গুলো পালন করা এবং হারাম ও অপছন্দনীয় বস্তুসমূহ থেকে বেঁচে থাকা। বৈধ হলেও আখিরাতে যে কথা বা কাজের কোনো উপকার পাওয়া যাবে না, সেগুলো থেকেও দূরে থাকা এবং ক্ষতির আশঙ্কা আছে এমন বস্তু থেকেও নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা।
এই স্তরের ব্যক্তিদের (অন্যতম একটি) বৈশিষ্ট্য হলো: দুনিয়াবি বৈধ বিষয়গুলোকেও উত্তম নিয়তের মাধ্যমে তারা সাওয়াব ও নৈকট্য লাভের বস্তুতে রূপান্তরিত করে নেয়। ফলে তাদের ক্ষেত্রে এমন কোনো আমল পাওয়া যাবে না যা শুধুই বৈধ; (লাভ-ক্ষতির) উভয় দিক সমান। বরং তাদের প্রতিটি আমলই পছন্দনীয় ও লাভজনক। তাদের চেয়ে নিম্নস্তরের ব্যক্তিরা অনেক মুবাহ বা বৈধ বিষয়কে বিভিন্ন ইবাদাতের কারণে ছেড়ে দেয়। কিন্তু এই স্তরের ব্যক্তিরা সেগুলোকেই ইবাদাতে রূপান্তরিত করে নেয়। এই দুই স্তরের ব্যক্তিদের জন্য এত বেশি মর্যাদা রয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা ছাড়া আর কেউ তার হিসাব রাখতে সক্ষম নয়।
দাসত্বের চাকা ১৫টি বিষয়ের সাথে চলমান থাকে; যে ব্যক্তি এই ১৫টি বিষয়কে পরিপূর্ণরূপে ধারণ করবে, তার দাসত্বের স্তরগুলোও পূর্ণতা পাবে।
১৫টি বিষয়ের বর্ণনা: অন্তর, জবান ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এই তিনটি ভাগে দাসত্ব বিভক্ত।
প্রত্যেকটির ওপর ভিন্ন ভিন্ন দাসত্ব রয়েছে।
আর দাসত্ব-কেন্দ্রিক হুকুম হলো পাঁচটি: ওয়াজিব, মুস্তাহাব, হারাম, মাকরূহ (অপছন্দনীয়) ও মুবাহ (বৈধ)। এই পাঁচটির প্রত্যেকটি আবার উপরিউক্ত অন্তর, জবান ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সাথে সম্পর্কিত। (আর এভাবে ৩০৫=১৫ প্রকার হয়।)
অন্তরের দাসত্ব (عُبُوْدِيَّةُ الْقَلْبِ) : অন্তরের ওয়াজিব দাসত্বের মধ্যে কিছু বিষয় রয়েছে সর্বসম্মতিক্রমে ওয়াজিব, আর কিছু বিষয় রয়েছে মতভেদপূর্ণ।
সর্বসম্মতিক্রমে ওয়াজিব বিষয়গুলো হলো: যেমন: ইখলাস, তাওয়াক্কুল, মহাব্বত, সবর, আল্লাহর দিকে ধাবমান হওয়া, আল্লাহর ভয়, আশা, দৃঢ় সত্যায়ন এবং ইবাদাতে নিয়ত করা; আর এটি হলো ইখলাসের চেয়ে অতিরিক্ত একটি বিষয়। কারণ (নিয়ত করা ও ইখলাস এক কথা নয়); ইখলাস হলো ইবাদাতের ক্ষেত্রে অন্য সকল সৃষ্টি থেকে আল্লাহকে আলাদা রাখা।
ইবাদাতে নিয়ত করার দুইটি স্তর রয়েছে-
১. আদত বা অভ্যাস থেকে ইবাদাতকে পৃথক করা এবং
২. বিভিন্ন প্রকার ইবাদাতকে একটি থেকে আরেকটি আলাদা করা।
এই তিনটি প্রকার (অর্থাৎ ইখলাস এবং নিয়তের দুটি স্তর) ওয়াজিব।
এমনিভাবে সিল্ক বা সত্যবাদিতাও ওয়াজিব। সত্যবাদিতা 'ও ইখলাসের মাঝে পার্থক্য হলো-নিশ্চিতভাবেই বান্দার (কাজের ক্ষেত্রে বিভিন্ন) উদ্দেশ্য (الْمَظْلُوبُ) ও দাবি (الرَّغْبُ) থাকে। ইখলাস হলো উদ্দেশ্যকে এক করা (অর্থাৎ একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যেই আমল করা) আর সত্যবাদিতা হলো দাবিকে এক করা (অর্থাৎ ভেতর-বাহিরের দাবি এক হওয়া)।
ইখলাস হলো উদ্দেশ্য বিভক্ত না হওয়া আর সত্যবাদিতা হলো দাবি বিভক্ত না হওয়া। সুতরাং সত্যবাদিতা হলো কঠোর পরিশ্রম করা আর ইখলাস হলো লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে এক রাখা।
উম্মাহ একমত পোষণ করেছে যে, মোটামুটিভাবে এই আমলগুলোই অন্তরের ওপর ওয়াজিব।
এমনিভাবে দাসত্বের ক্ষেত্রে আন্তরিক থাকা আবশ্যক। দ্বীনের ভিত্তিই এর ওপর। এর অর্থ হলো ইবাদাতকে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি মোতাবিক সর্বোত্তম পন্থায় আদায় করতে চেষ্টা করা। এর মূল বিষয়টি ওয়াজিব আর এতে পরিপূর্ণতা অর্জন করা হলো নৈকট্যশীল ব্যক্তিদের স্তর।
অনুরূপভাবে অন্তরের প্রতিটি ওয়াজিব আমলের ক্ষেত্রে দুইটি দিক রয়েছে : অপরিহার্যভাবে ওয়াজিব; যা আসহাবুল ইয়ামীন অর্থাৎ ডান দিকের লোকদের স্তর এবং আরেকটি হলো ওয়াজিব আদায়ের পর আরও পরিপূর্ণ করা, সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা; এটি হলো নৈকট্যশীল অগ্রগামী বান্দাদের স্তর; এটি মুস্তাহাব।
এমনিভাবে সবর বা ধৈর্য ধারণ করাও সর্বসম্মতিক্রমে অন্তরের ওয়াজিব আমল। ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল বলেন, 'আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজীদে ৯০ জায়গায় বা ৯০-এর চেয়ে কিছু বেশি জায়গায় সবরের কথা উল্লেখ করেছেন। এরও দুইটি দিক রয়েছে: ১. অপরিহার্যভাবে ওয়াজিব এবং ২. ওয়াজিব পালনের পর তা পরিপূর্ণ করা, যা মুস্তাহাব।
মতভেদপূর্ণ বিষয়গুলো হলো: যেমন: (সৃষ্টিগত বা তাকদীরি বিষয়ের ক্ষেত্রে) রিযা বা সন্তুষ্টি। কেননা এর ওয়াজিব হওয়ার ক্ষেত্রে ফুকাহায়ে কেরাম ও সূফিয়ায়ে কেরামের দুটি ভিন্ন ভিন্ন অভিমত রয়েছে।
যারা ওয়াজিব বলেছেন তাদের বক্তব্য হলো: আল্লাহ তাআলার কোনো বিধানে অসন্তুষ্ট হওয়া বা রাগান্বিত হওয়া হারাম। এর থেকে মুক্তি মেলে কেবল সন্তুষ্ট হওয়ার মাধ্যমেই। আর যা ছাড়া হারাম থেকে মুক্তি মেলে না, তা ওয়াজিব। সুতরাং রিযা বা সন্তুষ্ট হওয়াও ওয়াজিব।
আর যারা মুস্তাহাব বলেছেন তাদের বক্তব্য হলো: এ সম্পর্কে কুরআন-সুন্নাহর কোথাও কোনো আদেশসূচক বাণী আসেনি। তবে যারা সন্তুষ্ট থাকেন তাদের ব্যাপারে কুরআনে কেবল প্রশংসার বর্ণনা এসেছে; সন্তুষ্ট হওয়ার জন্য আদেশ করা হয়নি।
যারা ওয়াজিব বলেছেন তাদের খণ্ডনে তারা বলেন, 'কেবল সন্তুষ্ট হওয়ার দ্বারাই অসন্তুষ্টি বা রাগান্বিত অবস্থা থেকে মুক্তি মেলে'—এই কথাটি সঠিক নয়। কারণ ভাগ্য মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের অবস্থা তিন ধরনের: ১. রিয়া বা সন্তুষ্টি; এটি সর্বোচ্চ স্তরের, ২. অসন্তুষ্টি; এটি সর্বনিম্ন স্তরের এবং ৩. আপতিত বিষয়ে সন্তুষ্ট না হয়ে সবর করা; এটি মধ্যম স্তরের। সুতরাং সর্বোচ্চ স্তর অর্থাৎ সন্তুষ্টি হলো মুকাররাবীন বা নৈকট্যশীলদের জন্য। মধ্যম স্তরটি হলো সাধারণ নেককারদের জন্য আর সর্বনিম্ন স্তরটি হলো জালিম বা অত্যাচারীদের জন্য। অনেক মানুষ নিজের ভাগ্যের ওপর সবর করে জীবনযাপন করে; কিন্তু সেটি তাদের অসন্তুষ্ট বা রাগান্বিত করে না। তারা তাতে অসন্তুষ্টও নয়। সুতরাং বোঝা গেল সন্তুষ্টি বা রিযা হলো (রাগান্বিত হওয়া বা না হওয়া) থেকে আলাদা একটি বিষয়।
তাদের মধ্যকার এই মতভেদ কেবল সৃষ্টিগত বা তাকদীরি বিষয়ের ক্ষেত্রে। আল্লাহ তাআলাকে রব ও ইলাহ্ হিসেবে এবং দ্বীনি বিষয়ে সন্তুষ্ট থাকা সর্বসম্মতিক্রমে ফরজ। বরং এই প্রকার সন্তুষ্টি ব্যতীত কেউ মুসলিমই হতে পারে না। আল্লাহকে রব হিসেবে, ইসলামকে দ্বীন হিসেবে এবং মুহাম্মাদ ﷺ-কে রাসূল হিসেবে মানার ক্ষেত্রে সন্তুষ্ট হওয়া আবশ্যক।
মূলকথা: অন্তর হলো রাজা এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হলো এর প্রজা; এরা সবাই আল্লাহ তাআলার দাসত্ব যথাযথভাবে পালন করবে এবং তাতে অবিচল থাকবে।
অন্তরের ওপর যেগুলোকে হারাম করা হয়েছে—যেমন: অহংকার, রিয়া, আত্মগর্ব, হিংসা, গাফলত, নিফাক ইত্যাদি—তা দুই প্রকার: কুফর ও গুনাহ।
কুফর: যেমন: সন্দেহ-সংশয়, নিফাক, শির্ক এবং শিরকের সাথে সম্পর্কিত বিষয়াবলি।
অন্তরের গুনাহ আবার দুই প্রকার: কবীরা ও সগীরা।
আত্মিক কবীরা গুনাহ: যেমন: রিয়া বা লোক-দেখানো-প্রবণতা, আত্মগর্ব, অহংকার, দম্ভ, বড়াই, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া, আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিশ্চিন্ত হওয়া, মুসলমানদের দুঃখ-কষ্টে আনন্দ-উল্লাস করা, মুসলমানদের মাঝে অশ্লীলতা ছড়িয়ে যাক—এটা পছন্দ করা, আল্লাহ তাআলা অন্য মুসলিমদেরকে যে নিয়ামাত দান করেছেন সে কারণে তাদের হিংসা করা, তাদের থেকে তা নিঃশেষ হোক—এই কামনা করা, এবং এই রকম আরও আত্মিক কবীরা গুনাহসমূহ; যা ব্যভিচার, মদপান ও এই ধরনের প্রকাশ্য-কবীরা গুনাহ থেকেও বেশি জঘন্য ও মারাত্মক। এগুলো থেকে বেঁচে থাকা এবং তাওবা করা ব্যতীত অন্তর ও শরীরের কোনো সংশোধন নেই। কারণ এগুলোর মাধ্যমে অন্তর নষ্ট হয়ে যায়। আর অন্তর যখন নষ্ট হয়ে যায়, তখন শরীরও নষ্ট হয়ে যায়।
এই সমস্ত আত্মিক রোগব্যাধি ও বিপদাপদ সৃষ্টি হয় অন্তরের দাসত্ব সম্পর্কে না জানা এবং তা পালন করা থেকে বিরত থাকার কারণে। সুতরাং ইইয়াকা নাবুদু শরীরে বাস্তবায়ন করার আগে অন্তরে বাস্তবায়ন করা অধিক প্রয়োজন। যখন অন্তরের ইবাদাত ও দাসত্ব থেকে অমনোযোগী থাকা হবে এবং তা পালন করা থেকে বিরত থাকা হবে, তখন অন্তরে মন্দ ও খারাপ গুণাবলি এসে বাসা বাঁধবে। অন্তরের ইবাদাতগুলো পালনে যত অগ্রসর হবে, অন্তর থেকে মন্দ স্বভাব তত দূর হতে থাকবে।
এই সমস্ত বিষয়গুলো কখনো ছোটো আবার কখনো বড়ো বলে প্রতীয়মান হয়। এটি নির্ভর করে সেগুলোর শক্তি, কার্যক্ষমতা, গোপনীয়তা ও তীক্ষ্ণতার ওপর।
আত্মিক সগীরা গুনাহ: আত্মিক সগীরা গুনাহ হলো হারাম বস্তুসমূহে লিপ্ত হওয়ার আগ্রহ ও ইচ্ছা করা। কবীরা ও সগীরা গুনাহের ক্ষেত্রে আগ্রহকারীর অবস্থাভেদে আগ্রহ ও ইচ্ছার স্তরের তারতম্য রয়েছে। (আগ্রহ ও আগ্রহকারীর অবস্থাভেদে হুকুম ভিন্ন হয়।) যেমন: কুফর ও শিরকের প্রতি আগ্রহ কুফর। বিদআতের প্রতি আগ্রহ ফিস্ক। কবীরা গুনাহের প্রতি আগ্রহ দেখানোও গুনাহের কাজ। কেউ যদি এগুলোতে লিপ্ত হওয়ার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তা পরিত্যাগ করে, তা হলে তাকে সাওয়াব দেওয়া হবে। আর যদি নিজের সামর্থ্য ব্যয় করার পর তাতে ব্যর্থ হয়ে তা পরিত্যাগ করে, তা হলে সেই ব্যক্তি গুনাহের কাজ সম্পন্নকারী ব্যক্তির সমান শাস্তির উপযুক্ত হবে। কারণ সাওয়াব ও শাস্তির ক্ষেত্রে কাউকে তার আগ্রহের কারণে সেই ব্যক্তির স্থানে রাখা হয়, যে সরাসরি সেই কাজ করে; যদিও (দুনিয়াতে) শারীআতের হুকুম অনুযায়ী তাকে সেই ব্যক্তির স্থানে নামানো হবে না। এ কারণেই নবি ﷺ বলেছেন,
إِذَا الْتَقَى الْمُسْلِمَانِ بِسَيْفَيْهِمَا فَالْقَاتِلُ وَالْمَقْتُولُ فِي النَّارِ
“যখন দুজন মুসলিম তাদের তরবারি নিয়ে পরস্পর মুখোমুখি হবে, তখন হত্যাকারী এবং নিহত ব্যক্তি উভয়েই জাহান্নামে যাবে।”
সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, এ হত্যাকারীর বিষয়টি তো বুঝলাম, কিন্তু নিহত ব্যক্তির কী অপরাধ?’
নবি উত্তরে বললেন,
إِنَّهُ كَانَ حَرِيضًا عَلَى قَتْلِ صَاحِبِهِ
"সেও তার সাথিকে হত্যা করার জন্য আগ্রহী ছিল।” [৩৬]
নবিজি এখানে নিহত ব্যক্তিকে হত্যাকারী ব্যক্তির স্থানে রেখেছেন, তার জন্য একই হুকুম সাব্যস্ত করেছেন। কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তার আগ্রহকে। এটি কেবল সাওয়াবের ক্ষেত্রে, হুকুমের ক্ষেত্রে নয়। সাওয়াব ও শাস্তির ক্ষেত্রে এ রকম আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে।
ওপরের আলোচনার মাধ্যমে অন্তরের পছন্দনীয় ও বৈধ আমল সম্পর্কেও জানা হয়ে গেল। (অর্থাৎ হারাম ও গুনাহের কাজগুলো ব্যতীত অন্যান্য আমল বৈধ ও পছন্দনীয় প্রকারের শামিল।)
জবানের দাসত্ব: জবানসংশ্লিষ্ট পাঁচ প্রকার ইবাদাতের আলোচনা:
أَشْهَدُ أَنْ لَّا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ উচ্চারণ করা, জরুরি পরিমাণ কুরআন তিলাওয়াত করা-আর তা হলো যেটুকু পাঠ না করলে সালাত সহীহ হয় না—, সালাতে ওয়াজিব যিক্রগুলো পাঠ করা, যেগুলোর আদেশ নবি দিয়েছেন; যে রকমভাবে রুকূ-সাজদার তাসবীহ পাঠ করার আদেশ করা হয়েছে, রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ বলা, তাশাহহুদ পড়া এবং তাকবীর বলার আদেশ করা হয়েছে (-এগুলো হলো জবানের ওয়াজিব আমল)।
এমনিভাবে সালামের জবাব দেওয়াও ওয়াজিব। তবে সালাম দেওয়া ওয়াজিব কি না-সে ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে।
এমনিভাবে সৎ কাজের আদেশ করা, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা, মূর্খকে শেখানো, পথভ্রষ্টকে পথ দেখানো, নির্দিষ্ট বিষয়ে সত্য সাক্ষ্য দেওয়া এবং সত্য কথা বলা-এগুলোও জবানের ওয়াজিব আমল।
মুস্তাহাব : কুরআন তিলাওয়াত করা, সবসময় আল্লাহর যিক্র করা, উপকারী ইলম নিয়ে আলোচনা করা এবং এ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়সমূহ (জবানের মুস্তাহাব আমল।)
হারাম: আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ যা-কিছু অপছন্দ করেন ও ঘৃণা করেন তা নিয়ে কথা বলা। যেমন: এমন বিদআত নিয়ে আলোচনা করা, যা রাসূল ﷺ কর্তৃক আনীত দ্বীনের বিরোধী, আবার সেই বিদআতের দিকে আহ্বান করা, তা সুন্দর করে উপস্থাপন করা, তাকে শক্তিশালী করা ইত্যাদি। এমনিভাবে কাউকে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া, কোনো মুসলিমকে গালি-গালাজ করা, কথার মাধ্যমে কষ্ট দেওয়া, মিথ্যা বলা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া (-এগুলো হলো জবানের হারাম আমল)। আল্লাহ সম্পর্কে না জেনে কথা বলা-এটি হলো সবচেয়ে কঠিনতম হারাম।
মাকরূহ: যে বিষয়ে কথা পরিত্যাগ করাই উত্তম, সে বিষয়ে কথা বলা; যদিও তাতে কোনো শাস্তি নেই।
মুবাহ: সালাফগণ এই বিষয়ে ইখতিলাফ করেছেন যে, জবানের জন্য মুবাহ কোনো কথা আছে কি না, যার কোনো লাভও নেই আবার ক্ষতিও নেই-দুদিকেই সমান?
সঠিক অভিমত হলো: জবানের কোনো কথাই মুবাহ নয়; যার দুদিকই সমান। কথার মাধ্যমে হয়তো লাভ হবে নয়তো ক্ষতি। কারণ জবানের অবস্থা অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মতো নয়-মানুষ যখন সকাল করে, তখন তার সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিনীত হয়ে জিহ্বাকে বলে, 'তুমি (আমাদের ব্যাপারে) আল্লাহকে ভয় করো। আমরা তো তোমার সাথেই সম্পৃক্ত। তুমি যদি সোজা হয়ে চলো, তা হলে আমরাও সোজা হয়ে চলব। আর তুমি যদি বাঁকা পথে চলো, তা হলে আমরাও বাঁকা পথে চলব।'[৩৭] শুধু জিহ্বার (মন্দ) উপার্জনই মানুষকে অধিকহারে নিম্নমুখী করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে।[৩৮] জবান যা-ই উচ্চারণ করুক; তা হয়তো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টি মোতাবিক হবে, ফলে তা লাভজনক বলে বিবেচিত হবে; আর যদি এমন না হয়, তা হলে ক্ষতির আওতায় পড়ে যাবে।
আর জিহ্বা অন্যান্য সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নড়াচড়া করার বিপরীত। কারণ ব্যক্তি হয়তো তার শরীরের অন্যান্য অঙ্গ নাড়ানোর দ্বারা কোনো বৈধ বিষয়ে উপকার হাসিল করতে পারে; যার লাভ-ক্ষতির দুদিকই সমান। কেননা এর দ্বারা হয়তো সে আরাম বা উপকার পায়, যা তার জন্য বৈধ; আখিরাতেও যার ক্ষতিকর কোনো প্রভাব নেই। আর যে বিষয়ে উপকার নেই, সে বিষয়ে জিহ্বার নড়াচড়া, (অর্থাৎ কথা বলা) অবশ্যই তার জন্য ক্ষতিকর বলে সাব্যস্ত হয়। সুতরাং বিষয়টি নিয়ে ভাবুন।
অঙ্গপ্রত্যঙ্গের দাসত্ব: অঙ্গপ্রত্যঙ্গের পাঁচ প্রকার ইবাদাত বা দাসত্ব আবার পঁচিশ ভাগে বিভক্ত। কারণ মানুষের ইন্দ্রিয় পাঁচটি আর প্রতিটি ইন্দ্রিয়েরই পাঁচ প্রকার ইবাদাত রয়েছে। (এই হিসেবে পাঁচ-পাঁচে পঁচিশ প্রকার হয়।)
শ্রবণ বা শুনতে পাওয়ার সাথে সম্পর্কিত পাঁচ প্রকার ইবাদাত: ওয়াজিব শ্রবণ : আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ বান্দার জন্য যা শ্রবণ করা বাধ্যতামূলক করেছেন তা শোনা; যেমন: ইসলাম, ঈমান ও এ সংশ্লিষ্ট ফরজ বিষয়গুলো শোনা, সালাতে ইমাম সাহেব যখন উচ্চস্বরে কুরআন তিলাওয়াত করেন তা শোনা, (সঠিক অভিমত অনুসারে) জুমুআর খুতবা শোনা।
হারাম শ্রবণ: কুফর ও বিদআতসংক্রান্ত কোনো বিষয় শ্রবণ করা। তবে যদি তা শ্রবণ করার মাঝে কোনো উপকার থাকে, যেমন: তা প্রতিহত করা, কারও বিপক্ষে সাক্ষ্য দেওয়া ইত্যাদি তা হলে তা শ্রবণ করা দোষের কিছু নয়।
এমনিভাবে পরনারীর আওয়াজ ও স্বর শোনা; যা শোনার দ্বারা ফিতনায় পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কোনো প্রয়োজন থাকলে ভিন্ন কথা, যেমন: সাক্ষ্য দেওয়া, লেনদেন করা, ফতোয়া জিজ্ঞাসা করা, মামলা-মোকাদ্দমা করা, চিকিৎসা করা ইত্যাদি।
এমনিভাবে গানবাজনা শোনাও হারাম। তবে যদি এমন জায়গায় থাকে, যেখানে গানের আওয়াজ তার কানে আসে এবং সে শুনতে আগ্রহীও নয়, তা হলে সেখানে কান বন্ধ করে রাখা ওয়াজিব নয়।
মুস্তাহাব শ্রবণ : ইলমি আলোচনা শোনা, কুরআন তিলাওয়াত শোনা, আল্লাহর যিক্র শোনা এবং ফরজ নয় তবে আল্লাহ ভালোবাসেন, এমন সবকিছু শোনা মুস্তাহাব।
মাকরূহ শ্রবণ : মুস্তাহাবের বিপরীত। অর্থাৎ হারাম ছাড়া আল্লাহ যা কিছু অপছন্দ করেন এবং তার ওপর শাস্তি দেওয়ারও কোনো ওয়াদা করেননি, এমন বিষয়াদি শ্রবণ করা।
মুবাহ শ্রবণ : আর মুবাহ বা বৈধ বিষয়টি তো সুস্পষ্ট।
দেখার সাথে সম্পর্কিত পাঁচ প্রকার ইবাদাত: ওয়াজিব দর্শন: কুরআন মাজীদকে দেখা; যখন ওয়াজিব কোনো ইলম শেখার প্রয়োজন হয়, তখন ইলমি কিতাবপত্র দেখা; ব্যক্তি যখন খাওয়ার জন্য, খরচ করার জন্য, ব্যবহার করার জন্য বা অন্য কোনো প্রয়োজনে কোনোকিছুর প্রতি মুখাপেক্ষী হয়, তখন হালাল থেকে হারামকে পৃথক করার জন্য দেখা ইত্যাদি।
হারাম দর্শন: খাহেশাত ও চাহিদার সাথে পরনারীর প্রতি দৃষ্টি দেওয়া। এমনিভাবে খাহেশাত ছাড়াও প্রয়োজন ব্যতিরেকে তাদের দিকে তাকানো; তবে (জরুরি) প্রয়োজন হলে ভিন্ন কথা যেমন: প্রস্তাব-দানকারী, দরদামকারী, লেনদেনকারী, সাক্ষী, বিচারক, ডাক্তার, মাহরাম-এসব পুরুষদের জন্য দেখা বৈধ।
হারাম দৃষ্টির মধ্যে সতরের দিকে দৃষ্টি দেওয়াও শামিল; এটি দুই প্রকার: কাপড়ের ভেতরে থাকা সতর (অঙ্গপ্রত্যঙ্গের দিকে তাকানো) এবং দরজার ওপারে থাকা সতর (নারীদের দিকে তাকানো)।
মুস্তাহাব দর্শন: ইলম ও দ্বীনসংক্রান্ত বইপত্র দেখা; যেগুলো দেখার দ্বারা ঈমান-ইলম বৃদ্ধি পায়, কুরআন শরীফের দিকে তাকিয়ে থাকা, উলামায়ে কেরাম, নেককার ব্যক্তিগণ ও পিতামাতার চেহারার দিকে দৃষ্টি দেওয়া।
মাকরূহ দর্শন : অনর্থক দৃষ্টি দেওয়া; যার মধ্যে কোনো উপকার নেই। কারণ এর দ্বারা ঠিক সেরকম ক্ষতি হয়, যেরকম ক্ষতি হয় অনর্থক জিহ্বা চালানোর দ্বারা। একজন সালাফ বলেছেন, 'নেককার ব্যক্তিরা যেমন অনর্থক এদিক-সেদিক দৃষ্টি দেওয়াকে অপছন্দ করেন; ঠিক তেমনি এদিক-সেদিকের অনর্থক কথাবার্তা বলাকেও তারা অপছন্দ করেন। [৩৯]
মুবাহ দর্শন: যেসব বিষয়াদির প্রতি দৃষ্টি দেওয়াতে দুনিয়া-আখিরাতে কোনো ক্ষতি নেই এবং উপকারও নেই, তা দেখা।
স্বাদগ্রহণ করার সাথে সম্পর্কিত পাঁচ প্রকার ইবাদাত:
ওয়াজিব স্বাদগ্রহণ: জরুরি প্রয়োজন ও মৃত্যুর আশঙ্কা থাকলে খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করা, (এই অবস্থায়) যদি পানাহার না করে মৃত্যু বরণ করে, তা হলে সে গুনাহগার ও নিজেকে হত্যাকারী বলে সাব্যস্ত হবে।
মৃত্যু থেকে বেঁচে যাবে, এমন দৃঢ় বিশ্বাস থাকলে ওষুধ সেবন করা ওয়াজিব। এ ক্ষেত্রে এটিই বিশুদ্ধ মত।
হারাম স্বাদগ্রহণ: মদের স্বাদ নেওয়া, জীবননাশী বিষের স্বাদ নেওয়া, ওয়াজিব সাওম পালন করা অবস্থায় নিষিদ্ধ তিন বস্তু (খাবার, পানীয় ও স্ত্রী সহবাস)-এর স্বাদ নেওয়া।
মাকরূহ স্বাদগ্রহণ: যেমন: সন্দেহজনক বস্তুর স্বাদ নেওয়া, প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ করা, যে স্থানে দাওয়াত করা হয়নি হঠাৎ সেখানে গিয়ে খাবার খাওয়া, প্রতিযোগিতা করে যে খাবারের আয়োজন করা হয় তা খাওয়া, যে আপনাকে খুশি না হয়ে লজ্জায় পড়ে খাবার খাওয়ায়, তার সে খাবারের স্বাদ নেওয়া।
মুস্তাহাব স্বাদগ্রহণ : শারীআত অনুমোদিত যে খাবার আল্লাহর আনুগত্যে শক্তি জোগায়, তা গ্রহণ করা, মেহমানের সাথে খাওয়া; যাতে মেহমান খেতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে এবং তার প্রয়োজন মতো খেয়ে নেয়, যে দাওয়াতে সাড়া দেওয়া ওয়াজিব বা মুস্তাহাব, সেই দাওয়াতে খাবার গ্রহণ করা।
মুবাহ স্বাদগ্রহণ: যে খাবারে হারামের মিশ্রণ নেই বা কোনো গুনাহ নেই, সে খাবার গ্রহণ করা।
ঘ্রাণ নেওয়ার সাথে সম্পর্কিত পাঁচ প্রকার ইবাদাত:
ওয়াজিব ঘ্রাণ: যে ঘ্রাণ দ্বারা হালাল-হারামের মাঝে পার্থক্য করা যায়, সেই ঘ্রাণ গ্রহণ করা; যেমন: যখন ঘ্রাণের মাধ্যমে কোনো বস্তু সম্পর্কে বোঝা যায় যে, তা জীবননাশী বিষ নাকি অন্য কিছু? তার মধ্যে ক্ষতিকর কিছু আছে কি নেই? এমনিভাবে কোনো বস্তু কেনার সময় দাম বা দোষত্রুটি জানার জন্য ঘ্রাণ নেওয়া ইত্যাদি।
হারাম ঘ্রাণ: হাজ্জের ইহরাম অবস্থায় ঘ্রাণ নেওয়া, ছিনতাই করা ও চুরি করা সুগন্ধির ঘ্রাণ গ্রহণ করা। কোনো বেগানা নারীর সুগন্ধি থেকে ঘ্রাণ নেওয়া; (এটি হারাম হওয়ার কারণ হলো) পরবর্তী সময়ে ফিতনায় পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মুস্তাহাব ঘ্রাণ: যে ঘ্রাণ আল্লাহর আনুগত্য করতে সাহায্য করে, শক্তি জোগায়, অন্যান্য ইন্দ্রিয়কে তীক্ষ্ণ করে এবং নফসকে ইলম-আমলে উদ্দীপ্ত করে, তা গ্রহণ করা।
মাকরূহ ঘ্রাণ : জালিম, সংশয়বাদী, ফাসিক ও এই ধরনের ব্যক্তিদের সুগন্ধি থেকে ঘ্রাণ নেওয়া।
মুবাহ ঘ্রাণ: যার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবেও কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই, দ্বীনি কোনো উপকারও নেই এবং শারীআতের সাথে এর কোনো সম্পর্কও নেই-এমন বস্তুর ঘ্রাণ গ্রহণ করা।
স্পর্শ করার সাথে সম্পর্কিত পাঁচ প্রকার ইবাদাত:
ওয়াজিব স্পর্শ: যেমন: স্বামী-স্ত্রীর স্পর্শ; যখন সহবাস করা ওয়াজিব হয়। এমনিভাবে দাসীকে স্পর্শ করা; যখন এর মাধ্যমে তাকে পবিত্র রাখা ওয়াজিব হয়ে পড়ে।
হারাম স্পর্শ: পরনারীর কোনো অঙ্গ স্পর্শ করা।
মুস্তাহাব স্পর্শ: এমন স্পর্শ যার মাধ্যমে দৃষ্টি অবনত রাখা যায়, হারাম থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে এবং স্বামী-স্ত্রী উভয়েই পবিত্র থাকতে পারে।
মাকরূহ স্পর্শ : হাজ্জে ইহরাম অবস্থায় আনন্দ লাভের জন্য স্বামী-স্ত্রীর স্পর্শ করা, এমনিভাবে ই'তিকাফের সময় স্পর্শ করা।
গোসল-করানো-ব্যক্তি ব্যতীত মৃতব্যক্তিকে অন্য কারও স্পর্শ করাও মাকরূহ স্পর্শের শামিল। কারণ মৃত ব্যক্তির শরীর তখন জীবিত ব্যক্তির সতরের ন্যায় হয়ে যায়; তার সম্মানার্থে। আর এ কারণেই একটি অভিমত অনুযায়ী তার শরীরকে লোকচক্ষুর আড়ালে রাখা এবং তার পরিহিত কাপড়েই তাকে গোসল করানো মুস্তাহাব।
মুবাহ স্পর্শ: যে স্পর্শে কোনো প্রকার ক্ষতি ও দ্বীনি উপকারিতা নেই, তা স্পর্শ করা।
স্পর্শের উপরিউক্ত পাঁচটি স্তর হাতের দ্বারা ধরা, পায়ের দ্বারা চলা ইত্যাদির ওপরও প্রয়োগ হবে; যার উদাহরণ অস্পষ্ট নয়।
টিকাঃ
[৩৬] বুখারি, ৩১; মুসলিম, ২৮৮৮।
[৩৭] তিরমিযি, ২৪০৭; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ১১৯২৭।
[৩৮] তিরমিযি, ২৬২৬।
[৩৯] ইবনু কুদামা, আত-তাওয়্যাবীন, ১২৬।