📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 অনুসরণ ও একনিষ্ঠতা

📄 অনুসরণ ও একনিষ্ঠতা


উপরিউক্ত বিষয়গুলো যখন জানা হয়ে গেল, তখন জেনে রাখুন—বড়ো বড়ো দুটি ভিত্তি ব্যতীত কোনো ব্যক্তি إِيَّاكَ نَعْبُدُ “আমরা কেবল তোমারই দাসত্ব করি”—এর গুণে গুণান্বিত হতে পারে না:
১. রাসূলুল্লাহ-এর পূর্ণ অনুসরণ (مُتَابَعَةُ الرَّسُوْلِ) এবং ২. আল্লাহ তাআলার প্রতি একনিষ্ঠতা (الْإِخْلَاصُ لِلْمَعْبُودِ)।
এ দুটির মাধ্যমেই إِيَّاكَ نَعْبُدُ “আমরা কেবল তোমারই দাসত্ব করি”—এর বাস্তবায়ন হয়।
এই দুটি ভিত্তি অনুসারে মানুষ চার প্রকার—
প্রথম প্রকার: যারা আল্লাহ তাআলার প্রতি একনিষ্ঠ এবং আন্তরিকভাবে রাসূলুল্লাহ -এর অনুসরণকারী। প্রকৃতপক্ষে এরাই হলো إِيَّاكَ نَعْبُدُ-এর গুণে গুণান্বিত। তাদের সমস্ত আমল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, তাদের সমস্ত কথাবার্তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, তাদের দান-সদাকা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, কাউকে দেওয়া থেকে বিরত থাকাও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। তাদের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সমস্ত কাজকর্ম একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই পরিচালিত হয়, তারা নিজের আমলের মাধ্যমে মানুষের নিকট কোনো প্রতিদান, প্রশংসা, পদবি, সম্মান, ভালোবাসা বা তাদের নিন্দা থেকে বেঁচে থাকা কিছুই প্রত্যাশা করে না।
এমনিভাবে তাদের সব আমল ও ইবাদাত আল্লাহর হুকুম মোতাবিক হয়; আল্লাহ যা ভালোবাসেন এবং পছন্দ করেন সে অনুসারেই সাজানো তাদের প্রতিটি কাজ। আসলে আল্লাহ তাআলা তো কেবল সে আমলই কবুল করেন, যা তাঁর হুকুম মোতাবিক করা হয় এবং শুধু তাঁর উদ্দেশ্যেই করা হয়। আর এ কারণেই আল্লাহ তাআলা বান্দাকে জীবন ও মৃত্যু দান করে পরীক্ষা করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا "কাজের দিক দিয়ে তোমাদের মধ্যে কে উত্তম, তা পরীক্ষা করে দেখার জন্যই তিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন।”[২৪]
আর জমিনের ওপরে যা কিছু রয়েছে, তা তিনি সৌন্দর্যস্বরূপ বানিয়েছেন; যাতে বান্দাদের যাচাই করতে পারেন তাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে কে শ্রেষ্ঠ?
ফুযাইল ইবনু ইয়ায বলেছেন, 'উত্তম আমল হলো যা সবচেয়ে একনিষ্ঠ ও সবচেয়ে সঠিক।' সাথিসঙ্গীরা জিজ্ঞাসা করল, 'হে আবূ আলি, একনিষ্ঠ ও সঠিক আমল কী?' জবাবে তিনি বললেন, 'আমল যখন একনিষ্ঠ হয় আর সঠিক না হয়, তখন তা কবুল করা হয় না। আবার আমল যখন সঠিক হয় কিন্তু ইখলাসপূর্ণ বা একনিষ্ঠ না হয়, তখনও তা কবুল করা হয় না; যতক্ষণ-না একনিষ্ঠ ও সঠিক হয়। একনিষ্ঠ হওয়া মানে শুধু আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই হওয়া আর আমল সঠিক হবে তখন, যখন তা রাসূলুল্লাহ -এর সুন্নাহ অনুসারে করা হবে।'[২৫]
দ্বিতীয় প্রকার: যাদের না আছে ইখলাস আর না আছে সুন্নাহর অনুসরণ। তাদের কোনো আমলই শরীআত মোতাবিক হয় না, এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেও হয় না। যেমন: মানুষের চোখে ভালো সাজার জন্য যারা আমল করে, যারা লোক দেখানোর জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের মতাদর্শ ব্যতীত ভিন্ন কোনো আদর্শের কথা প্রচার করে। এরা হলো সৃষ্টিজগতের সবচেয়ে নিকৃষ্ট। আল্লাহ তাআলার নিকট এরা সবচেয়ে ঘৃণিত। তাদের জন্য এই আয়াতে পরিপূর্ণ অংশ রয়েছে-
لَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَفْرَحُوْنَ بِمَا أَتَوْا وَيُحِبُّونَ أَنْ يُحْمَدُوا بِمَا لَمْ يَفْعَلُوا فَلَا تَحْسَبَنَّهُمْ بِمَفَازَةٍ مِّنَ الْعَذَابِ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ “যারা নিজেদের কার্যকলাপে আনন্দিত এবং যে কাজ যথার্থই তারা নিজেরা করেনি সেজন্য প্রশংসা পেতে ভালোবাসে, তাদেরকে তোমরা আযাব থেকে সংরক্ষিত মনে কোরো না। বস্তুত তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি।” [২৬]
তারা যে সমস্ত বিদআত, গোমরাহি ও শিরকি আমল করে, তার জন্য আনন্দিত হয় আর তারা ইখলাস ও সুন্নাহর অনুসরণ করেছে বলে প্রশংসাও পেতে চায়।
তৃতীয় প্রকার: এই শ্রেণির ব্যক্তিরা তাদের আমলে মুখলিস বা একনিষ্ঠ থাকে; কিন্তু তাদের আমল হয় সুন্নাহ বহির্ভূত। যেমন: মূর্খ ইবাদাতগুজার ব্যক্তিরা; যাদেরকে ‘দুনিয়াবিমুখ’, ‘সুফি-দরবেশ’ বলে অভিহিত করা হয়। তাদের কেউ কেউ ধারণা করে জুমুআ-জামাআহ ছেড়ে নির্জনতা অবলম্বন করা আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম একটি মাধ্যম!
চতুর্থ প্রকার: যাদের আমল হয় সুন্নাহ মোতাবিক; কিন্তু তা হয় গাইরুল্লাহর জন্য। যেমন: রিয়াকারী ব্যক্তি, সেই ব্যক্তি যে জিহাদ করে বীরত্ব, সাহসিকতা ও আপন সম্প্রদায়কে রক্ষার উদ্দেশ্য, যে ব্যক্তি হাজ্জ করে এই উদ্দেশ্যে যে, লোকে তাকে হাজী বলবে ইত্যাদি।
এদের আমল বাহ্যিকভাবে সুন্দর ও নেক বলে মনে হয়। কিন্তু ভেতরগতভাবে ইখলাস থেকে শূন্য থাকে; ফলে তা কবুল করা হবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّيْنَ
“তাদেরকে তো এ ছাড়া আর কোনো হুকুম দেওয়া হয়নি যে, তারা নিজেদের দ্বীনকে একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত করে একনিষ্ঠভাবে কেবল তাঁরই ইবাদাত করবে।”[২৭]

টিকাঃ
[২৪] সূরা মুল্ক, ৬৭:২।
[২৫] ইবনু তাইমিয়্যা, মিনহাজুস সুন্নাহ, ৬/২১৭।
[২৬] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৮৮।
[২৭] সূরা বায়্যিনাহ, ৯৮: ৫।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 ইবাদাতের ভিত্তিভিত্তিসমূহ

📄 ইবাদাতের ভিত্তিভিত্তিসমূহ


إِيَّاكَ نَعْبُدُ-এর প্রতিষ্ঠা চারটি ভিত্তির ওপর। আর তা হলো: আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা কিছু ভালোবাসেন ও পছন্দ করেন, তা বাস্তবায়ন করা—
১. মুখের ভাষায়,
২. অন্তরের ভাষায়,
৩. অন্তরের আমল দ্বারা এবং
৪. অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল দ্বারা।
প্রকৃত দাসত্ব বা উবুদিয়্যাহ এই চারটি ভিত্তিকেই অন্তর্ভুক্ত করে। যারা এই চারটি বিষয়ের অধিকারী, তারাই প্রকৃত ইইয়াকা নাবুদু-এর গুণে গুণান্বিত।
অন্তরের ভাষায়: আল্লাহ তাআলা নিজের সত্তা, নাম, গুণাবলি, কাজকর্ম, তাঁর ফেরেশতা, তাঁর সাক্ষাৎ ইত্যাদি সম্পর্কে নবি ﷺ-এর মাধ্যমে যা কিছু জানিয়েছেন, তা অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করা।
মুখের ভাষায়: এই বিষয়গুলো সম্পর্কে অপরকে জানানো, এর প্রতি আহ্বান করা, এর বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললে তা প্রতিহত করা, বিদআতকে বাতিল হিসাবে প্রকাশ করা, আল্লাহ তাআলার স্মরণে নিমগ্ন থাকা, তাঁর আদেশ-নিষেধ মানুষের কাছে পৌঁছিয়ে দেওয়া ইত্যাদি।
অন্তরের আমলের দ্বারা: যেমন: আল্লাহ তাআলাকে ভালোবাসা, তাঁর ওপর ভরসা করা, তাঁর দিকে ধাবিত হওয়া, তাঁকে ভয় করা, তাঁর নিকটেই আশ্রয় গ্রহণ করা, সমস্ত আমলকে একমাত্র তাঁর সন্তুষ্টি লাভের আশাতেই সম্পন্ন করা, আল্লাহ তাআলার হুকুম মানতে গিয়ে এবং নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ থেকে বিরত থাকতে গিয়ে কষ্ট সহ্য করা, তাঁর ফায়সালা ও তাকদীরের ওপর সবর করা, তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা, তাঁর সন্তুষ্টির জন্যই কাউকে ভালোবাসা, তাঁর সন্তুষ্টির জন্যই কারও সাথে দুশমনি রাখা, তাঁর প্রতি বিনয়ী হওয়া, মুখাপেক্ষী থাকা, তাঁর ওপর আস্থা রাখা, নিশ্চিত হওয়াসহ অন্তরের এ রকম আরও অনেক আমল এর মধ্যে শামিল; যার গুরুত্ব অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমলের চেয়ে অনেক বেশি। অন্তরের পছন্দনীয় আমল আল্লাহ তাআলার নিকট বাহ্যিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের পছন্দনীয় আমলের চেয়ে বেশি প্রিয়। অন্তরের এই আমলগুলো ব্যতীত অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বাহ্যিক আমল উপকারশূন্য বা কম উপকারী।
অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমলের দ্বারা: যেমন: সালাত, জিহাদ, জুমুআ ও জামাআতের দিকে যাওয়া, অক্ষম ব্যক্তিকে সাহায্য করা, সৃষ্টিজগতের কল্যাণে এগিয়ে আসা ইত্যাদি।
সুতরাং إِيَّاكَ نَعْبُدُ এই চারটি বিষয়কেই আবশ্যক করে এবং এর স্বীকৃতি দেয়। আর وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ হলো এগুলো পালনে আল্লাহর সাহায্য ও তাওফীক প্রার্থনা করা। اِهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ এই দুটি বিষয়কেই বিস্তারিতভাবে শামিল করে। তা পালন করতে অনুপ্রেরণা জোগায়, সালিকীন বা আল্লাহ-অভিমুখীদের আল্লাহর পথে চলা অব্যাহত রাখে।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 إِيَّاكَ نَعْبُدُ মৃত্যু পর্যন্ত আবশ্যক

📄 إِيَّاكَ نَعْبُدُ মৃত্যু পর্যন্ত আবশ্যক


আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় রাসূল -কে বলেছেন, وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ
"এবং আপনার নিকট 'সুনিশ্চিত বিষয়' আসা পর্যন্ত আপনার রবের ইবাদাত করতে থাকুন।”[২৮]
জাহান্নামবাসীরা বলবে, وَكُنَّا نُكَذِّبُ بِيَوْمِ الدِّينِ حَتَّى أَتَانَا الْيَقِينُ
"আমরা বিচারের দিনকে মিথ্যা মনে করতাম। শেষ পর্যন্ত আমরা সে সুনিশ্চিত বিষয়ের মুখোমুখি হয়েছি।”[২৯]
মুফাস্সিরগণের ইজমা হয়েছে-এখানে 'সুনিশ্চিত বিষয়' বলতে মৃত্যুকে বোঝানো হয়েছে।
উসমান ইবনু মাযউন-এর মৃত্যুর ঘটনা সম্পর্কে 'সহীহ বুখারি'-র বর্ণনায় এসেছে, নবি বলেছেন,
أَمَّا عُثْمَانُ فَقَدْ جَاءَهُ الْيَقِينُ مِنْ رَّبِّهِ "আর উসমান; তার কাছে তো তার রবের পক্ষ থেকে 'সুনিশ্চিত বিষয়' এসে গেছে।" [৩০]। অর্থাৎ মৃত্যু ও মৃত্যু সম্পর্কিত বিষয়।
সুতরাং বান্দা যত দিন এই দুনিয়ার জীবনে রয়েছে ইবাদাত-বন্দেগি আর দাসত্ব থেকে তার নিষ্কৃতি নেই। বরং কবরের জীবনেও তার জন্য রয়েছে অন্য রকম এক দাসত্ব। কারণ সেখানে দুজন ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞাসা করবে, 'সে কার ইবাদাত করত? আল্লাহর রাসূল সম্পর্কে সে কী বলে?' ফেরেশতাদ্বয় তার কাছ থেকে এর উত্তর খুঁজবে।[৩১]
কিয়ামাতের ময়দানেও বান্দার জন্য এক প্রকারের দাসত্ব রয়েছে। আল্লাহ তাআলা সেদিন সমগ্র সৃষ্টিকে সাজদা করার আহ্বান করবেন। ফলে মুমিনরা সাজদায় পড়ে যাবে আর কাফির-মুনাফিকরা অবশিষ্ট থেকে যাবে, তারা সাজদা করতে পারবে না। অতঃপর যখন সবাই জান্নাত-জাহান্নামে চলে যাবে, তখন আর কোনো দাসত্ব ও দায়িত্ব থাকবে না। তখন জান্নাতবাসীদের দাসত্ব হবে তাসবীহ পাঠ; যা তাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের সাথে মিলানো থাকবে। এতে তারা কোনো ধরনের কষ্ট কিংবা ক্লান্তি অনুভব করবে না।
যে ব্যক্তি মনে করে যে, সে এমন মর্তবায় পৌঁছে গেছে, যেখানে দাসত্ব ও ইবাদাত-বন্দেগির আর কোনো প্রয়োজন নেই—তা হলে সে যিনদীক, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অস্বীকারকারী। সে এর দ্বারা আল্লাহ তাআলাকে অস্বীকার করার স্তরে পৌঁছে যায়। দ্বীন থেকে সে পুরাপুরি বের হয়ে যায়। আসলে বান্দা যখন উচ্চ কোনো মানযিলে পৌঁছে, তখন তার ইবাদাতের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়, তার ওপর আরও বড়ো দায়িত্ব এসে পড়ে; যা থেকে তার নিচের স্তরের ব্যক্তিরা মুক্ত থাকে। এ কারণেই আল্লাহর রাসূল -এর ওপর; বরং সমস্ত নবি-রাসূলের ওপর দায়িত্ব ছিল তাদের উম্মাতের চেয়ে অনেক বেশি ও বড়ো। নবি-রাসূলদের মধ্যে আবার যারা উলুল আযম বা দৃঢ়তার অধিকারী ছিলেন, তাদের দায়িত্ব ছিল আরও বেশি; তাদের তুলনায় যারা ছিল তাদের চেয়ে নিম্নস্তরের। এমনিভাবে ইলমের অধিকারী যারা ছিলেন, তাদের দায়িত্বও ছিল অনেক বড়ো, তাদের চেয়ে নিম্নস্তরের ব্যক্তিদের তুলনায়। প্রত্যেক ব্যক্তি তার মর্যাদা অনুসারে দায়িত্ব প্রাপ্ত হয়।

টিকাঃ
[২৮] সূরা হিজর, ১৫: ৯৯।
[২৯] সূরা মুদ্দাসসির, ৭৪: ৪৬-৪৭।
[৩০] বুখারি, ১২৪৩।
[৩১] দেখুন-বুখারি, ১৩৭৪; মুসলিম, ২৮৭১।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 দাসের প্রকারভেদ

📄 দাসের প্রকারভেদ


দাসত্ব দুই প্রকার: ১. সাধারণ দাসত্ব ও ২. বিশেষ দাসত্ব।
১. সাধারণ দাসত্ব (اَلْعُبُوْدِيَّةُ الْعَامَّةُ) : আল্লাহ তাআলার প্রতি সমস্ত আসমানবাসী ও জমিনবাসীর দাসত্ব; সৎ-অসৎ, মুমিন-কাফির সবাই এর অন্তর্ভুক্ত। এটি হলো আল্লাহ তাআলার ক্ষমতা ও জবরদস্তিমূলক দাসত্ব। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَقَالُوا اتَّخَذَ الرَّحْمَنُ وَلَدًا لَقَدْ جِئْتُمْ شَيْئًا إِذًا تَكَادُ السَّمَاوَاتُ يَتَفَطَّرْنَ مِنْهُ وَتَنْشَقُ الْأَرْضُ وَتَخِرُ الجِبَالُ هَدًّا أَنْ دَعَوْا لِلرَّحْمَنِ وَلَدًا وَمَا يَنبَغِي لِلرَّحْمَنِ أَنْ يَتَّخِذَ وَلَدًا إِنْ كُلُّ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ إِلَّا آتِي الرَّحْمَنِ عَبْدًا
“তারা বলে, দয়াময় আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন। মারাত্মক বাজে কথা, যা তোমরা তৈরি করে এনেছ। আকাশ ফেটে পড়ার, পৃথিবী বিদীর্ণ হবার এবং পাহাড় ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে—এজন্য যে, লোকেরা রহমানের জন্য সন্তান থাকার দাবি করেছে! কাউকে সন্তান গ্রহণ করা রহমানের জন্য শোভনীয় নয়। পৃথিবী ও আকাশমণ্ডলিতে যারা রয়েছে, সবাই তাঁর সামনে বান্দা হিসেবে উপস্থিত হবে।”[৩২]
সুতরাং মুমিন-কাফির সবাই এর অন্তর্ভুক্ত।
২. বিশেষ দাসত্ব (اَلْعُبُوْدِيَّةُ الْخَاصَّةُ) : এটি হলো আনুগত্য, মহাব্বত ও হুকুম পালনের দাসত্ব। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا عِبَادِ لَا خَوْفٌ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ وَلَا أَنْتُمْ تَحْزَنُونَ “হে আমার বান্দাগণ, আজ তোমাদের কোনো ভয় নেই এবং তোমরা দুঃখিতও হবে না।”[৩৩]
فَبَشِّرْ عِبَادِ الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ
"অতএব, সুসংবাদ দিন আমার বান্দাদের। যারা মনোনিবেশ সহকারে কথা শোনে, অতঃপর যা উত্তম, তার অনুসরণ করে।”[৩৪]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا
"রহমান-এর বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদের সাথে যখন মূর্খরা কথা বলতে থাকে, তখন তারা বলে, সালাম।"[৩৫]
সমগ্র সৃষ্টিই আল্লাহ তাআলার রুবুবিয়্যাতের বান্দা। আর আল্লাহর আনুগত্য ও বেলায়াতের অধিকারী বা নৈকট্যশীল ব্যক্তিরা হলো আল্লাহ তাআলার ইলাহিয়্যাতের বান্দা।
দাসত্ব )الْعُبُودِيَّة( দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার কারণ হলো এই শব্দের মূল অর্থ হচ্ছে-বিনয় ও নম্র হওয়া। আল্লাহর বন্ধুরা তাঁর প্রতি বিনয়ী ও নম্র হন স্বেচ্ছায় ও ইবাদাতের ভিত্তিতে। আর আল্লাহর শত্রুরা বিনয়ী হয় অনিচ্ছায় ও বাধ্য হয়ে।

টিকাঃ
[৩২] সূরা মারইয়ান, ১৯: ৮৮-৯৩।
[৩৩] সূরা যুখরুফ, ৪৩: ৬৮।
[৩৪] সূরা যুমার, ৩৯: ১৭-১৮।
[৩৫] সূরা ফুরকান, ২৫: ৬৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00