📄 ইবাদাতকে সাহায্য প্রার্থনার আগে উল্লেখ করার কারণ
সূরা ফাতিহায় ইবাদাত বা إِيَّاكَ نَعْبُدُ-কে সাহায্য প্রার্থনা করা বা وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আগে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি মূলত উপকরণ ও মাধ্যমের আগে উদ্দেশ্যকে উল্লেখ করা। কারণ বান্দাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্যই হলো ইবাদাত; ইবাদাত করার কারণেই তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর ইস্তিআনা বা সাহায্য প্রার্থনা করা হলো ইবাদাত ঠিকমতো আদায় করার মাধ্যম।
আরেকটি কারণ- إِيَّاكَ نَعْبُدُ-এর সম্পর্ক হলো আল্লাহ তাআলার ইলাহিয়্যাত এবং 'আল্লাহ' নামের সাথে। অন্যদিকে وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর সম্পর্ক হলো রুবুবিয়্যাত এবং তাঁর 'রব' নামের সাথে। এ কারণেই إِيَّاكَ نَعْبُدُ কে وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর পূর্বে আনা হয়েছে; যেভাবে সূরার শুরুতে 'আল্লাহ' নামকে 'রব' নামের আগে আনা হয়েছে।
আরেকটি কারণ- إِيَّاكَ نَعْبُدُ হচ্ছে আল্লাহর অংশ। সূরার প্রথমাংশের আলোচনার সাথে এই বর্ণনা সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। যেহেতু প্রথমে আল্লাহর প্রশংসামূলক আলোচনা করা হয়েছে। তাই ইবাদাতকে আগে উল্লেখ করা হয়েছে। আর وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ হচ্ছে বান্দার অংশ। এর পরেও বান্দার অংশই আলোচনা করা হয়েছে— اِهْدِنَا الصِّرَاطَ المُستقيم থেকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত। এই মিল থাকার কারণে وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -কেও পরে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরেকটি কারণ—সাহায্য প্রার্থনা করা হলো ইবাদাতেরই একটি অংশ। কিন্তু ইবাদাত করা মানেই সাহায্য প্রার্থনা করা নয়। আবার সাহায্য প্রার্থনা হলো আল্লাহ কাছ থেকে চাওয়া আর ইবাদাত হলো আল্লাহর প্রতিই নিবেদন। এ কারণেই ইবাদাতকে ইস্তিআনা বা সাহায্য প্রার্থনার পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরেকটি কারণ—ইবাদাত কেবল মুখলিস বা একনিষ্ঠ বান্দাদের থেকেই হয়। আর ইস্তিআনা বা সাহায্য প্রার্থনা মুখলিস, গাইরে মুখলিস সবার থেকেই প্রকাশ পায়।
আরেকটি কারণ—ইবাদাত হলো আল্লাহ তাআলার হক; যা তিনি আপনার ওপর আবশ্যক করেছেন। আর ইস্তিআনা হলো ইবাদাতের জন্য শক্তি প্রার্থনা করা। এটি আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহের বর্ণনা; যার দ্বারা তিনি আপনার ওপর অনুগ্রহ করবেন। আর তাঁর হক আদায় করা তাঁর কাছে অনুগ্রহ চাওয়ার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এই সমস্ত কারণ জানার দ্বারাই ইবাদাতকে ইস্তিআনা বা সাহায্য প্রার্থনা করার আগে উল্লেখ করার রহস্য উন্মোচিত হয়।
📄 إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর পূর্বে উল্লেখ করার হেকমত
نَعْبُدُ এবং نَسْتَعِينُ এর পূর্বে এ (কেবল আপনার) এই কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—আল্লাহ তাআলার সাথে উত্তম শিষ্টাচার, বান্দা তার নিজের কাজ (দাসত্ব ও সাহায্য প্রার্থনা)-এর আগে আল্লাহ তাআলার নাম উল্লেখ করবে। এর মধ্যে আল্লাহর দিকে বান্দার পরিপূর্ণ মনোযোগ ও তীব্র প্রয়োজনীয়তার প্রতিও ইঙ্গিত রয়েছে। এটি হাস্র বা সীমাবদ্ধতার ফায়দা দেয় অর্থাৎ 'আমরা অন্য কারও দাসত্ব করি না; আমরা কেবল আপনারই দাসত্ব করি' এমনিভাবে 'আমরা আর কারও নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি না; আমরা শুধু আপনারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি'- إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ দ্বারা এই অর্থই বোঝায়। এটি সাহিত্যের ক্ষেত্রে উঁচু মাপের একটি অলংকার; যা আরবি সাহিত্যবোধসম্পন্ন ব্যক্তিমাত্রই অনুধাবন করতে পারেন। আপনি নিম্নে বর্ণিত দুটি আয়াত নিয়ে চিন্তা-ফিকির করুন—
وَإِيَّايَ فَارْهَبُوْنِ “আর কেবল আমাকেই ভয় করো।”[১৮]
وَإِيَّايَ فَاتَّقُوْنِ “আর একমাত্র আমার পাকড়াও থেকে নিজেদের বাঁচাও।”[১৯]
এই দুটি আয়াতে থাকার কারণে অর্থের মধ্যে সীমাবদ্ধতা এসেছে অর্থাৎ 'আমাকে ব্যতীত আর কাউকে ভয় করো না' এবং 'আমার পাকড়াও ছাড়া আর কারও পাকড়াও থেকে নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করো না'। এমনিভাবে إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর ক্ষেত্রেও একই কথা। অর্থাৎ 'আপনাকে ব্যতীত আমরা আর কারও ইবাদাত করি না আর আপনার নিকট ছাড়া আর কারও নিকট সাহায্য প্রার্থনাও করি না'—এই অর্থ প্রদান করে। প্রতিটি সুস্থ বোধসম্পন্ন ব্যক্তিই রচনার এই ঢং থেকে এর সীমিত করার বিষয়টি উপলব্ধি করতে সক্ষম।
টিকাঃ
[১৮] সূরা বাকারা, ২:৪০।
[১৯] সূরা বাকারা, ২:৪১।
📄 ইবাদাত ও সাহায্য প্রার্থনা অনুসারে মানুষের প্রকারভেদ
যখন ইবাদাত ও সাহায্য প্রার্থনা সম্পর্কে জানা হয়ে গেল, তখন জেনে রাখুন এই দুটির বিবেচনায় মানুষ চার প্রকার—
প্রথম প্রকার: সবচেয়ে উত্তম ও সম্মানিত; যারা ইবাদাত ও সাহায্য প্রার্থনার ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার প্রতি একনিষ্ঠ। তাদের মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হলো আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করা এবং এ ক্ষেত্রে আল্লাহর সাহায্য কামনা করা; যাতে আল্লাহ তাদেরকে তা যথাযথভাবে পালন করার তাওফিক দান করেন। এ কারনেই বান্দা আল্লাহর নিকট যা কিছু চায় তার মধ্যে সর্বোত্তম হলো, আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির বিষয়ে সাহায্য প্রার্থনা করা। আর এই বিষয়টিই নবি তাঁর প্রিয় সাহাবি মুআয ইবনু জাবাল -কে শিখিয়েছিলেন। নবি তাকে বলেছিলেন, “হে মুআয, আল্লাহর শপথ! অবশ্যই আমি তোমাকে ভালোবাসি, আমি তোমাকে ওসিয়ত করছি, তুমি প্রত্যেক সালাতের পর এই দুআটি পাঠ করা কখনো ছাড়বে না- اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ، وَشُكْرِكَ، وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ হে আল্লাহ, আপনার যিক্, আপনার শোকর এবং আপনার উত্তম ইবাদাত পালনে আমাকে সাহায্য করুন।” [২০]
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা বলেছেন, 'আমি সবচেয়ে উপকারী দুআ সম্পর্কে চিন্তা-ফিকির করে যা পেয়েছি তা হলো—আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির বিষয়সমূহে সাহায্য প্রার্থনা করা। অতঃপর সূরা ফাতিহায় (এর দলীল হিসেবে) পেয়ে গেলাম- إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ [২১]
দ্বিতীয় প্রকার : (এই প্রকারের ব্যক্তিরা হলেন প্রথম প্রকারের সম্পূর্ণ বিপরীত।) এরা আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করা থেকে ও তাঁর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা থেকে বিরত থাকে। ফলে তাদের না থাকে কোনো ইবাদাত আর না থাকে কোনো ইস্তিআনাত। বরং তাদের কেউ আল্লাহর নিকট সাহায্য চাইলে, তা চায় কেবল তাদের খাহেশাত ও চাহিদা পূরণের জন্য; আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ও হক পালনের জন্য নয়। আসলে আসমান-জমিনের সবাই আল্লাহ তাআলার কাছে সাহায্য চায়; আল্লাহর ওলি, আল্লাহর শত্রু সবাই চায় আর তিনি সবারকে দান করেন। আল্লাহ তাআলার নিকট সৃষ্টিজগতের সবচেয়ে নিকৃষ্ট হলো, তাঁর দুশমন ইবলীস (লাআনাহুল্লাহ)। এ সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলার নিকট সে একটি প্রার্থনা করেছিল আর আল্লাহ তাকে সেটা দানও করেছিলেন। কিন্তু সেই চাওয়া যেহেতু আল্লাহ তাআলার খুশি ও সন্তুষ্টির ক্ষেত্রে ছিল না, তাই সেটা তার দুর্ভাগ্যকে আরও বৃদ্ধি করেছে এবং আল্লাহ থেকে তাকে আরও দূরে নিক্ষেপ করেছে।
বুদ্ধিমান ব্যক্তিদের নিজের ব্যাপারে এবং অন্যের ব্যাপারে এই বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করা উচিত। আর এটিও জেনে রাখা উচিত যে, কারও ডাকে আল্লাহর সাড়া দেওয়া তার কারামাত ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ বহন করে না। বরং বান্দা যখন আল্লাহর নিকট তার প্রয়োজন প্রার্থনা করে, তখন আল্লাহ তাআলা (তাঁর মহত্ত্বের কারণে) তাকে তা দিয়ে দেন। অথচ সেই বস্তুর মধ্যেই সে বান্দার ধ্বংস ও দুর্ভাগ্য নিহিত রয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাকে সেটি দেওয়ার অর্থ হলো, সে আল্লাহর নিকট অপমানিত ও লাঞ্ছিত এবং সে আল্লাহর দৃষ্টি থেকে দূরে রয়েছে। অনেক সময় আল্লাহ তাআলা ব্যক্তির চাওয়ামতো বস্তু দান করেন না। এটি হয় আল্লাহর নিকট সে ভালোবাসার ও সম্মানের অধিকারী বলে। ফলে তিনি তাকে তা দেওয়া থেকে বিরত থাকেন—তাকে হেফাজত করা, সুরক্ষা করা ও অনিষ্ট থেকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে; কৃপণতা করে নয়। সেই ব্যক্তির সাথেই তিনি এ রকম করে থাকেন, যার ব্যাপারে তিনি সম্মান, ভালোবাসা ও কল্যাণের ইচ্ছা করেন। আল্লাহ তাআলা এভাবে বান্দার প্রতি অনুগ্রহ করেন আর মূর্খতার দরুন বান্দা ভাবে যে, আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন না এবং তার ডাকে সাড়া দেন না। সে যখন দেখে অন্যদের প্রয়োজন পূরণ হচ্ছে আর তার প্রয়োজন পূরণ হচ্ছে না, তখন সে আল্লাহ সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ করে থাকে।
সুতরাং আল্লাহ তাআলার নিকট নির্দিষ্ট কোনো বস্তু প্রার্থনা করা থেকে কঠোরভাবে বেঁচে থাকুন; যার কল্যাণ ও উত্তম পরিণতি সম্পর্কে আপনার জানা নেই। যখন আপনার কোনো নির্দিষ্ট বস্তুর প্রয়োজন হবে, তখন তা আল্লাহ তাআলার ইলমের সাথে সম্পর্কযুক্ত করে প্রার্থনা করবেন (যে, যদি সেই বস্তুর মধ্যে আপনার জন্য কল্যাণ নিহিত থাকে, তা হলে যেন তিনি তা আপনাকে দান করেন।) আর প্রার্থনা করার পূর্বে ইস্তিখারা করবেন। ইস্তিখারা যেন আবার প্রজ্ঞাহীন কেবল মৌখিক কথা না হয়; বরং ইস্তিখারা করবেন সেই ব্যক্তির ইস্তিখারার মতো, যে তার প্রার্থিত বস্তুর উপকারিতা-অপকারিতা সম্পর্কে কিছুই জানে না, তা অর্জন করার সামর্থ্যও রাখে না, সে ব্যাপারে বিস্তারিত জানার পথও পায় না, যে নিজের লাভ-ক্ষতি করার সক্ষমতা রাখে না; বরং যদি সে ক্ষেত্রে তাকে তার নিজের প্রতিই ন্যস্ত করা হয়, তা হলে সে পরিপূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যাবে এবং তার সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাবে।
তৃতীয় প্রকার: যারা আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করে, কিন্তু তাঁর নিকট কোনো সাহায্য প্রার্থনা করে না। এই প্রকারের ব্যক্তিগণ দুই শ্রেণিতে বিভক্ত-
১. কাদারিয়্যা; যারা বলে—আল্লাহ তাআলা বান্দাদের সব ধরনের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিয়ে তাদেরকে সব ধরনের ক্ষমতা দান করেছেন। ফলে বান্দার কোনো কাজে সাহায্য করা এখন আর আল্লাহ তাআলার ক্ষমতায় নেই। (তাকদীরের ক্ষমতা এখন বান্দার হাতে।) কারণ আল্লাহ তাআলা তো নিরাপদ মাধ্যম সৃষ্টি করে দিয়ে, পথ চিনিয়ে, নবি-রাসূল প্রেরণ করে এবং কাজ করার সক্ষমতা দান করে বান্দাকে সাহায্য করেছেন। সুতরাং এর পরে আর সাহায্য চাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং সাহায্য করার ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা তাঁর বন্ধু ও শত্রুদের মাঝে সমতা রক্ষা করেছেন। ফলে দুদলকেই সমান সাহায্য করেছেন। কিন্তু তাঁর বন্ধু বা ওলিরা নিজেদের জন্য ঈমানের পথ বেছে নিয়েছে। আর তাঁর দুশমনরা নিজের জন্য পছন্দ করে নিয়েছে কুফরের পথ। বিষয়টি এমন নয় যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর বন্ধুদের জন্য অতিরিক্ত তাওফীক দান করেছেন, যার কারণে তারা ঈমান এনেছে। আর তিনি তাঁর শত্রুদের বিশেষ কিছু দিয়ে লাঞ্ছিত করেছেন, যার ফলে তারা কুফর অবলম্বন করেছেন।
এই শ্রেণির ব্যক্তিদের ইবাদাতের অংশ অনেক কম। আর সাহায্য প্রার্থনার বিষয়টি তো তাদের সাথে নেই-ই। তারা নিজেদের প্রতিই ন্যস্ত। (তাকদীর বলে কিছুই নেই তাদের কাছে।) তাওহীদ ও ইস্তিআনার পথ তাদের জন্য বন্ধ। আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস বলেছেন, 'তাকদীরের ওপর বিশ্বাস হলো তাওহীদের মূল। সুতরাং যে ব্যক্তি ঈমান আনে, কিন্তু তাকদীরকে অস্বীকার করে; তার এই অস্বীকার করা তার তাওহীদকে ভেঙে দেয়। [২৩]
২. এই শ্রেণির ব্যক্তিরা ইবাদাত-বন্দেগি করে; কিন্তু তাদের তাওয়াক্কুল ও সাহায্য প্রার্থনা করার বিষয়টি অনেক কম। তাকদীরের সাথে উপায়-উপকরণের যে সম্পৃক্ততা, তার প্রতি তাদের অন্তর প্রসারিত হয় না।
ফলে তাদের অন্তর্দৃষ্টি বাহ্যিক বস্তুতেই আটকে থাকে, আল্লাহর দিকে ধাবিত হয় না, কারণ থেকে প্রকৃত কার্যকারকের দিকে তাদের অন্তর ফেরে না, মাধ্যম থেকে মূল পর্যন্ত তারা যেতে পারে না। এ কারণে তাদের দৃঢ়তা ও ইচ্ছাশক্তি দুর্বল ও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। পরিণতিতে وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর থেকে তাদের অংশ হ্রাস পায়। তাওয়াক্কুল ও ইস্তিআনাতের মাধ্যমে তারা ইবাদাতের স্বাদ পায় না। যদিও তারা ওজীফা ও তাসবীহ-তাহলীলের মাধ্যমে এর কিছু স্বাদ অনুভব করে থাকে।
এই সমস্ত ব্যক্তিরা তাদের তাওয়াক্কুল ও সাহায্য চাওয়া অনুপাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাওফীক, কর্তৃত্ব ও প্রভাব পেয়ে থাকে। ঠিক তেমনি তাদের তাওয়াক্কুল ও সাহায্য চাওয়ার ঘাটতি অনুযায়ী তাদের জন্য জোটে অপমান, লাঞ্ছনা, দুর্বলতা ও অক্ষমতা। আল্লাহ তাআলা যদি পাহাড়কে আপন স্থান থেকে সরিয়ে দেওয়ার হুকুম দিত; আর বান্দা আল্লাহর ওপর যথাযথ ও পরিপূর্ণ তাওয়াক্কুল করে কাজে নেমে পড়ত; তা হলে অবশ্যই সে পাহাড়কে তার আপন স্থান হতে সরিয়ে দিতে পারত!
এখন যদি আপনি প্রশ্ন করেন তাওয়াক্কুল এবং সাহায্য চাওয়ার অর্থ কী?
উত্তরে বলব, এটি অন্তরের একটি অবস্থা; যা সৃষ্টি হয় আল্লাহ তাআলার সম্পর্কে বান্দার সঠিক জ্ঞান অর্জন করার মাধ্যমে; অর্থাৎ সবকিছু সৃষ্টি করা, পরিচালনা করা, উপকার ও ক্ষতি পৌঁছানো, কাউকে দেওয়া ও না-দেওয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা যে একক, অদ্বিতীয় ও অমুখাপেক্ষী এর ওপর ঈমান আনার মাধ্যমে। এমনিভাবে এই বিশ্বাসের মাধ্যমেও এই অবস্থার সৃষ্টি হয় যে, তিনি যা চান, তা-ই করেন; যদিও মানুষ না চায়, আর তিনি যা চান না, তা কখনো হয় না; যদিও মানুষ তা করতে চায়। এই সমস্ত বিষয়গুলোই ব্যক্তির মনে আল্লাহর ওপর ভরসা, আস্থা, নিশ্চিন্ততা ও নির্ভরতা সৃষ্টি করে।
চতুর্থ প্রকার: এই প্রকারের ব্যক্তিরা দেখে যে, আল্লাহ তাআলাই লাভ-ক্ষতির একচ্ছত্র মালিক, তিনি যা চান, তা-ই সংঘটিত হয় আর তিনি যা চান না, তা কখনো বাস্তবায়িত হয় না। ফলে তারা তাদের দুনিয়াবি স্বার্থের বেলায়, যেমন: ধনসম্পদ, কর্তৃত্ব, রাজত্ব, পদবি, সম্মান ইত্যাদির ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার ওপর নির্ভর করে, তাঁর নিকটই সেগুলোর প্রার্থনা করে এবং এর জন্য চেষ্টা-মেহনত করে। কিন্তু আল্লাহ কী পছন্দ করেন, কী ভালোবাসেন, কী অপছন্দ করেন আর কী ঘৃণা করেন সেগুলোর ব্যাপারে কোনো পরোয়া করে না, কোনো খবর রাখে না। সুতরাং কেউ যদি তার দুনিয়াবি সফলতা দেখে এটা প্রমাণ করে যে, আল্লাহ সেই ব্যক্তিকে ভালোবাসেন, পছন্দ করেন, তার ওপর তিনি সন্তুষ্ট, সেই ব্যক্তি আল্লাহর নৈকট্যশীল ওলিদের অন্তর্ভুক্ত; তা হলে সে সবচেয়ে বড়ো মূর্খ; আল্লাহ ও তাঁর দ্বীন সম্পর্কে অতি অজ্ঞ, যে পার্থক্য করতে পারে না, কোন বিষয়গুলো আল্লাহ পছন্দ করেন, কোন বিষয়গুলোতে তিনি সন্তুষ্ট; কোন বিষয়গুলো তিনি অপছন্দ করেন আর কোন বিষয়গুলো তাঁকে রাগান্তিত করে তোলে।
টিকাঃ
[২০] আবূ দাউদ, ১৫২২; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ২২১১৯।
[২১] ইবনু তাইমিয়্যা, আল-মুসতাদরাক ওয়া, ১/১৭৫।
[২২] আল্লাহ তাআলার নিকট ইস্তিখারা করার অর্থ হলো—নিজের জন্য কোনো একটি বিষয় নির্বাচন করার ক্ষেত্রে আল্লাহর সাহায্য চাওয়া, তাঁর কাছে তা পেশ করা; যাতে বান্দা কল্যাণকর বস্তুর অধিকারী হয়, ক্ষতিকর বস্তু থেকে রক্ষা পায়। ইস্তিখারা করার বিশেষ পদ্ধতি ও বিশেষ দুআ রয়েছে। অনুসন্ধানী পাঠক 'বান্দার ডাকে আল্লাহর সাড়া' বইটি থেকে সাহায্য নিন।
[২৩] আবদুল্লাহ ইবনু আহমাদ, আস-সুন্না