📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 সূরা ফাতিহা’র উচ্চতর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য

📄 সূরা ফাতিহা’র উচ্চতর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য


প্রথমে বুঝে নিতে হবে, এ সূরায় চারটি মৌলিক লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের কথা পূর্ণাঙ্গভাবে স্থান পেয়েছে:
১. সূরা ফাতিহায় তিনটি নামে মহান মা'বৃদের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে; (আল্লাহ তাআলার) আল-আসমাউল হুসনা ও উচ্চতর গুণসমূহের উৎস ও ভিত্তি হলো এ তিনটি নাম :
আল্লাহ, রব ও রহমান।
আর এ সূরার ভিত্তি রাখা হয়েছে ইলাহিয়্যাত, রুবুবিয়্যাত ও রহমতের ওপর।
إِيَّاكَ نَعْبُدُ “আমরা কেবল তোমার দাসত্ব করি”-এটি আল্লাহ তাআলার 'ইলাহিয়্যাত বা ইবাদাতসংক্রান্ত বিষয়াদির'-নির্দেশক।
وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ “আর তোমার কাছেই সাহায্য চাই”-এটি তাঁর 'রুবুবিয়্যাত বা পরিচালনাগত বিষয়াদির'-নির্দেশক।
الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ আর তাঁর কাছে সরল পথের নির্দেশনা চাওয়া-এটি 'রহমত'-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত।
)الْحَمْدُ( বা 'প্রশংসা'র ভেতরও এ তিনটি বিষয় রয়েছে: আল্লাহ তাআলা তাঁর ইলাহিয়্যাত, রুবুবিয়্যাত ও রহমত সবদিক দিয়েই প্রশংসিত। গুণকীর্তন ও মহিমা-প্রকাশ-এ দুটি হাম্দ বা প্রশংসাকে পূর্ণতা দেয়।
২. আখিরাতকে সাব্যস্ত করা, ভালো ও মন্দ কাজের ভিত্তিতে বান্দার আমলের প্রতিদান, সেদিন মহান রবের একক কর্তৃত্ব এবং তাঁর ইনসাফপূর্ণ বিচার-এসব বিষয়কেও সূরা ফাতিহা অন্তর্ভুক্ত করেছে। আর এ সবগুলোই রয়েছে مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ "প্রতিদান দিবসের মালিক" আয়াতটির অধীনে।
৩. এ সূরায় বেশ কয়েকটি দিক দিয়ে নুবুওয়াতের প্রমাণ পেশ করা হয়েছে:
ক) আল্লাহ তাআলা “মহাবিশ্বের অধিপতি" رَبُّ الْعَالَمِينَ, সুতরাং তাঁর বান্দাদের অনর্থক ও উদ্দেশ্যহীনভাবে ছেড়ে দেওয়া তাঁর শানের সঙ্গে মানানসই নয়। দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের জন্য কোন জিনিস উপকারী আর কোন জিনিস ক্ষতিকর- সেসবের পরিচয় বান্দাদের সামনে তুলে ধরবেন না, এমন চিন্তা লালন করা মানে (আল্লাহ তাআলার) রুবৃবিয়্যাতকে নাকচ করে দেওয়া এবং মহান রবের সঙ্গে এমন কিছু জুড়ে দেওয়া, যা তাঁর সঙ্গে একেবারে বেমানান। যারা এ কাজ করে, তারা আল্লাহকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে পারেনি।
খ) আল্লাহ তাআলার একটি নাম 'পরম করুণাময়' (الرَّحْمٰنِ)। তাঁর করুণা তাঁর বান্দাদের উদ্দেশ্যহীনভাবে ছেড়ে দিতে বাধা দেয়। কী করলে বান্দারা পূর্ণতার শিখরে পৌঁছাতে পারবে, তা তিনি বলবেন না-এমন ধারণাকেও 'করুণাময়' নাম বাধা দেয়। যে ব্যক্তি 'করুণাময়' শব্দটিকে যথাযথ অধিকার দেয়, সে জানে, বৃষ্টিবর্ষণ করা, তৃণলতা গজিয়ে তোলা ও বীজ থেকে চারা উদগত করা-এসব কাজের সঙ্গে 'রহমান' নামের যেটুকু সম্পর্ক, তার চেয়ে বেশি সম্পর্ক রাসূল পাঠানো ও কিতাব নাযিল করার সঙ্গে। দেহ ও বাহ্যিক সূরত সজীব রাখার জন্য আল্লাহর করুণা যেটুকু প্রয়োজন, কল্ব ও রূহকে সজীব রাখার জন্য আল্লাহর করুণার প্রয়োজন তার চেয়ে বহুগুণ বেশি। কিন্তু যাদের চোখে পর্দা পড়ে আছে, তারা 'করুণাময়' শব্দের মধ্যে জন্তু-জানোয়ারের প্রয়োজন মেটানোর বিষয়টিই দেখতে পায়, আর বুদ্ধিমান লোকেরা এর মধ্যে তার চেয়েও বেশিকিছু দেখতে পায়।
গ) এ সূরায় 'প্রতিদান দিবস' يَوْمِ الدِّينِ -এর কথা বলা হয়েছে। কারণ সেদিন বান্দাদের আমল অনুযায়ী পাওনা পরিশোধ করা হবে-ভালো কাজের জন্য তাদের পুরস্কার দেওয়া হবে আর অবাধ্যতা ও গুনাহের জন্য দেওয়া হবে শাস্তি। তবে, প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার আগ-পর্যন্ত কাউকে শাস্তি দেওয়া আল্লাহর শানে মানানসই নয়; প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয় রাসূল ও আসমানি কিতাব পাঠানোর মাধ্যমে; তাঁদের পাঠানোর পরই পুরস্কার ও শাস্তি অবধারিত হয়ে ওঠে; তাদের ভিত্তিতেই বিচারের দিন 'হাঁকিয়ে নেওয়ার ঘটনা' ঘটবে-ভালো লোকদের নেওয়া হবে জান্নাতে আর গুনাহগারদের নেওয়া হবে জাহান্নামে।
ঘ) আল্লাহ তাআলা বলেছেন, اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ "আমাদের সরল পথ দেখাও"। হিদায়াত বা পথ-দেখানো মানে পথের বিবরণ ও নির্দেশনা দেওয়া, তারপর (সেই পথে) চলার সামর্থ্য ও প্রয়োজনীয় সংকেত দেওয়া, আর শেষের এ দুটি হয়ে থাকে পথের বিবরণ ও নির্দেশনা দেওয়ার পর। পথের বিবরণ ও নির্দেশনা দেওয়া-এ দুটি কাজ কেবল আল্লাহর প্রেরিত রাসূলদের দ্বারাই সম্ভব। পথের বিবরণ, নির্দেশনা ও পরিচয়-এসবের পরে আসে পথচলার সামর্থ্যের বিষয়।
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে জানা যায়-আল্লাহর কাছে সরল পথের নির্দেশনা চাওয়া, বান্দার সব প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জরুরি। যারা বলে 'আমরা তো (কুরআনের মাধ্যমে) হিদায়াত পেয়ে গিয়েছি, আবার হিদায়াত চাইব কীভাবে?', তাদের এ প্রশ্ন অবান্তর। কারণ, আল্লাহর নাযিল-করা হকের ব্যাপারে আমরা যা জানি, তার চেয়ে আমাদের না-জানার পরিমাণ বহুগুণ বেশি। আমরা যা করতে চাই, পরিমাণে তার চেয়ে বেশি অথবা কম অথবা সমান হলো সেসব কাজ, যা আমরা তুচ্ছ মনে করে ও অলসতার কারণে করতে চাই না। কিছু কাজ আমরা করতে চাই, কিন্তু সামর্থ্যের অভাবে করতে পারি না, এমন ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এসব বিষয়ের পূর্ণ ও বিস্তারিত চিত্র আমাদের সামনে নেই; তাই আমরা কী পরিমাণ কাজ করতে পারছি না, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে আমাদের দরকার পরিপূর্ণ হিদায়াত। যে এসব বিষয় পরিপূর্ণভাবে হাসিল করতে পেরেছে, আল্লাহর কাছে তার হিদায়াত চাওয়ার উদ্দেশ্য হবে, সে যেন হিদায়াতের ওপর অবিরামভাবে অবিচল থাকতে পারে।
হিদায়াতের আরেকটি স্তর আছে, সেটি হলো এর সর্বশেষ স্তর। অর্থাৎ কিয়ামাতের দিন জান্নাতে যাওয়ার পথপ্রদর্শন। যে ব্যক্তি দুনিয়ায় আল্লাহর সরল পথের দিশা পায়-যে সরল পথ দিয়ে তিনি তাঁর রাসূলকে পাঠিয়েছেন আর কিতাব নাযিল করেছেন—, আখিরাতেও সে সরল পথের দিশা পাবে, যা তাকে জান্নাত ও পুরস্কার-গৃহে পৌঁছে দেবে। এ দুনিয়ায় আল্লাহর নির্ধারিত সরল পথের ওপর বান্দা যতটুকু অটল থাকবে, জাহান্নামের ওপর স্থাপিত পুলসিরাতের ওপর সে ততটুকুই অটল থাকতে পারবে; দুনিয়ায় সরল পথে যে গতিতে সে চলেছে, পুলসিরাতেও তার গতি থাকবে ততটুকু : তাদের মধ্যে কেউ পার হবে বিজলির গতিতে, কেউ চোখের পলকে, কেউ বাতাসের গতিতে, কেউ বাহনের গতিতে, কেউ দৌড়ে, কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ হামাগুড়ি দিয়ে, কেউ নতজানু হয়ে গায়ে অনেক আঁচড় লাগিয়ে, আবার কেউ নিক্ষিপ্ত হবে জাহান্নামে।
যে ব্যক্তি পুলসিরাতে তার গতি কেমন হবে তা দেখতে চায়, সে যেন এ দুনিয়ায় সীরাতে মুস্তাকীমের ওপর তার গতির দিকে তাকায়। কারণ সেখানে সে হুবহু একই গতি প্রাপ্ত হবে, যা হবে তার যথাযথ পাওনা:
هَلْ تُجْزَوْنَ إِلَّا مَا كُنتُمْ تَعْمَلُوْنَ ۞
“তোমরা যা করছিলে, (আজ) কেবল তারই পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া হবে।”[৬]
ঙ) সূরা ফাতিহায় (১) অনুগ্রহপ্রাপ্ত লোকদের কথা উল্লেখ করে তাদেরকে (২) গজবপ্রাপ্ত ও (৩) পথভ্রষ্ট দুটি দল থেকে আলাদা করা হয়েছে। সত্যকে জানা এবং সে অনুযায়ী আমল করা-এসবের ভিত্তিতে মানুষ এই তিনভাগে বিভক্ত। শারীআতের-আওতাধীন-মানুষ কখনো এ তিনশ্রেণির বাইরে যেতে পারে না। কারা অনুগ্রহপ্রাপ্ত, কারা গজবের শিকার আর কারা পথভ্রষ্ট-এসব বিষয় নুবুওয়াত ও রিসালাতকে অপরিহার্য করে তোলে (অর্থাৎ, রাসূল পাঠানো ছাড়া এসব বিষয় জানার কোনো সুযোগ নেই)।
৪. الصِّراط -- الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ শব্দটি একবচন; পাশাপাশি একে দুদিক দিয়ে সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে: প্রথমবার (শুরুতে) আলিফ-লাম লাগিয়ে, আর দ্বিতীয়বার আরেকটি শব্দের সঙ্গে সম্বন্ধ করার মাধ্যমে। ফলে বিষয়টি সুনির্দিষ্ট ও বিশেষায়িত হয়েছে, অর্থাৎ সিরাতে মুস্তাকীম একটিই।
বিপরীতদিকে, গজব ও ভ্রষ্টতার পথগুলোর ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা কখনো বহুবচন আবার কখনো একবচন ব্যবহার করেন; যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِهِ "এ হলো আমার-দেওয়া সিরাতে মুসতাকীম, তোমরা এ পথ অনুসরণ করো; অনেক পথ অনুসরণ করো না, তা হলে সেগুলো তোমাদেরকে আল্লাহর পথ থেকে অন্যদিকে নিয়ে যাবে।"
এ আয়াতে আল্লাহ নিজের পথ বোঝাতে ‘সিরাত’ ও ‘সাবীল’ একবচন ব্যবহার করেছেন, আর এর বিপরীত পথগুলোর ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন এর বহুবচন ‘সুবুল’।
ইবনু মাসউদ বলেন, ‘আল্লাহর রাসূল আমাদের সামনে একটি রেখা টেনে বললেন,
هُذَا سَبِيْلُ اللَّهِ "এটি আল্লাহর পথ।”
তারপর এর ডানে-বামে কয়েকটি রেখা টেনে বললেন, هُذِهِ سُبُلَ، عَلَى كُلِّ سَبِيلٍ شَيْطَانٌ يَدْعُو إِلَيْهِ “এ হলো অনেক পথ, প্রত্যেকটি পথে একজন করে শয়তান আছে, সে ওই পথের দিকে ডাকছে।”
এরপর নবি এ আয়াত পাঠ করেন: وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيْلِهِ ذُلِكُمْ وَصَّاكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ ) “এ হলো আমার-দেওয়া সিরাতে মুস্তাকীম, তোমরা এ পথ অনুসরণ করো; অনেক পথ অনুসরণ করো না, তা হলে সেগুলো তোমাদেরকে আল্লাহর পথ থেকে অন্যদিকে নিয়ে যাবে।” আল্লাহ তোমাদের এ নির্দেশ দিচ্ছেন, যাতে তোমরা তার নাফরমানি থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারো।" (সূরা আনআম, ৬ : ১৫৩) ৮।
এর কারণ হলো-আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছানোর রাস্তা মাত্র একটি। আর সেটি ওই রাস্তা, যা দিয়ে তিনি তাঁর রাসূলদের পাঠিয়েছেন, যার বিবরণ দিয়ে তিনি আসমানি কিতাবগুলো নাযিল করেছেন; এ রাস্তা ছাড়া কেউ তাঁর কাছে পৌঁছাতে পারবে না। মানুষ যদি অন্যসব রাস্তায় গিয়ে প্রত্যেকটি দরজায় কড়া নাড়ে, তারা দেখবে-একপর্যায়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছে, তাদের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে; ব্যতিক্রম কেবল এই একটি পথ, যা আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত, যা মানুষকে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছে দেয়।
সিরাতে মুস্তাকীম-সন্ধানী যেহেতু এমন এক বিষয়ের সন্ধানে নেমেছে, যা থেকে বেশিরভাগ মানুষ সরে যায়, সে যেহেতু এমন এক পথে চলতে চাচ্ছে, যে পথে বন্ধুর সংখ্যা খুবই কম ও দুর্লভ, আর প্রকৃতিগতভাবেই একাকিত্ব মানুষের কাছে অপছন্দের এবং বন্ধুর প্রতি থাকে তার গভীর মমত্ববোধ ও ঘনিষ্ঠতা, তাই আল্লাহ তাআলা এ পথের বন্ধুদের ব্যাপারে জানিয়ে দিয়েছেন :
وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَالرَّسُوْلَ فَأُولَبِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِّنَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ وَحَسُنَ أُولَبِكَ رَفِيقًا )
"যারা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করবে, তারা থাকবে সেসব লোকের সঙ্গে যাদের ওপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন, আর তারা হলেন নবি, সিদ্দীক, শহীদ ও নেককার বান্দাগণ; তারা অত্যন্ত চমৎকার বন্ধু।”[৯]
আল্লাহ তাআলা সিরাতে মুস্তাকীমকে সেসব বন্ধুর সঙ্গে সম্পৃক্ত করে দিয়েছেন, যারা এ পথের পথিক, যাদের ওপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন। যাতে করে যে ব্যক্তি হিদায়াত খুঁজে ফিরে আর সীরাতে মুসতাকীমের ওপর চলতে চায়, তার মন থেকে যেন নিজ জামানার স্বজাতীয় লোকদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার বেদনা দূর হয়ে যায়। এভাবে সে যেন বুঝতে পারে-এ পথে তার বন্ধু হলো সেসব লোক, যাদের ওপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন; ফলে এ পথ-থেকে-সরে-যাওয়া লোকদের বিরোধিতাকে সে মোটেই পরোয়া করবে না। কারণ সংখ্যায় তারা বেশি হলেও মর্যাদায় তারা খুবই নগণ্য। যেমন পূর্ববর্তী মনীষীদের কোনো একজন বলেছিলেন—‘সত্যপথে অটল থেকো, ওই পথের পথিক কম হলেও নিজেকে একা মনে কোরো না; আর মিথ্যার পথ থেকে দূরে থেকো, ধ্বংসের-পথে-পা-বাড়ানো লোকদের সংখ্যাধিক্য যেন তোমাকে ধোঁকায় না ফেলে’। সিরাতে মুস্তাকীমে চলতে গিয়ে কখনো যদি নিজেকে বড্ড একা মনে হয়, তা হলে তোমার-আগে-চলে-যাওয়া বন্ধুর দিকে তাকিয়ে তাদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা লালন কোরো, অন্যদের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রেখো, কারণ আল্লাহর সামনে তারা তোমার কোনো উপকারে আসবে না, তোমার সিরাতে মুস্তাকীমের ওপর চলা দেখে তারা যতই চিৎকার করুক, তাদের দিকে ভ্রুক্ষেপ কোরো না।
যেহেতু সিরাতে মুস্তাকীমের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে দিকনির্দেশনা চাওয়া হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য, আর তার সন্ধান পাওয়া হলো আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ দান, তাই আল্লাহ তাঁর বান্দাদের শিখিয়ে দিয়েছেন কীভাবে সেটি চাইতে হবে, তিনি তাদেরকে (সূরা ফাতিহার ১-৪ নং আয়াতে) এই নির্দেশনা দিয়েছেন যে, তারা যেন সিরাতে মুস্তাকীম চাওয়ার আগে তাঁর প্রশংসা-স্তুতি ও মহিমা বর্ণনা করে। এরপর তিনি (৫ নং আয়াতে) তাঁর তাওহীদ ও ইবাদাত পাওয়ার অধিকারের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর নাম ও গুণসমূহের ওসীলা এবং তাঁর ইবাদাতের ওসীলা—এ দুটি হলো বান্দার কাঙ্ক্ষিত মানযিলে পৌঁছার মাধ্যম। এ দুটি ওসীলা থাকলে, দুআ কবুল না হয়ে পারে না।

টিকাঃ
[৬] সূরা নাম্ল, ২৭ : ১০১।
[৭] সূরা আনআম, ৬: ১৫৩।
[৮] দারিনি, ২০২; ইবনু মাজাহ, ১১।
[৯] সূরা নিসা, ৪: ৬৯।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 সূরা ফাতিহায় তাওহীদ বা একত্ববাদ

📄 সূরা ফাতিহায় তাওহীদ বা একত্ববাদ


সূরা ফাতিহা তাওহীদ বা আল্লাহ তাআলার এককত্বের তিনটি প্রকারকেই শামিল করেছে; যার ওপর সমস্ত নবি ও রাসূল ﷺ একমত পোষণ করেছেন।
তাওহীদ দুই প্রকার:
প্রথম প্রকার হলো জ্ঞান ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে। এটিকে বলা হয় ‘জ্ঞানগত তাওহীদ’। কারণ ওহি ও আল্লাহ তাআলার সম্পর্কে জ্ঞান—এ দুটির সঙ্গেই জ্ঞানগত তাওহীদের সম্পর্ক রয়েছে।
দ্বিতীয় প্রকার হলো ইচ্ছা ও সংকল্পের ক্ষেত্রে। এটিকে বলা হয় ‘সংকল্পগত তাওহীদ’। ইচ্ছা ও সংকল্পের সাথে সম্পর্ক থাকার কারণেই এই নামকরণ।
সংকল্পগত তাওহীদ আবার দুই প্রকার: ১. রুবুবিয়্যাতের ক্ষেত্রে তাওহীদ এবং ২. ইলাহিয়্যাতের ক্ষেত্রে তাওহীদ।
এই হলো তাওহীদের মোট তিনটি প্রকার: ১. জ্ঞানগত তাওহীদ, ২. রুবুবিয়্যাতের ক্ষেত্রে তাওহীদ ও ৩. ইলাহিয়্যাতের ক্ষেত্রে তাওহীদ।
জ্ঞানগত তাওহীদের ভিত্তি হলো—আল্লাহ তাআলার জন্য পরিপূর্ণতার গুণাবলি সাব্যস্ত করা এবং আল্লাহ তাআলার সত্তাকে সমস্ত প্রকার দোষ, ত্রুটি ও উপমা থেকে পবিত্র ঘোষণা করা। এর ওপর প্রমাণ বহন করে দুটি বিষয়: একটি সংক্ষিপ্ত, আরেকটি বিস্তারিত।
সংক্ষিপ্তটি হলো আল্লাহ তাআলার জন্য হাম্দ বা প্রশংসা সাব্যস্ত করা।
আর বিস্তারিতটি হলো ১. ইলাহিয়‍্যাত, ২. রুবুবিয়‍্যাত, ৩. রহমত ও ৪. মালিকানা এই গুণসমূহের আলোচনা করা। এই চারটি গুণাবলির ওপরই আল্লাহ তাআলার নাম ও সিফাতের ভিত্তি।
হাম্দ বা প্রশংসা তাওহীদকে ধারণ করে। কারণ প্রশংসা করার অর্থ হলো : যার প্রশংসা করা হচ্ছে তার প্রতি ভালোবাসা, সন্তুষ্টি ও নম্রতা দেখিয়ে তার পরিপূর্ণ ও মহৎ গুণাবলির স্বীকৃতি দেওয়া। কারণ কারও উত্তম গুণাবলি অস্বীকার করে কেউ তার প্রশংসাকারী হতে পারে না। এমনিভাবে যে ব্যক্তি কারও প্রতি মহাব্বত, শ্রদ্ধা ও নম্রতা প্রদর্শন করে না, সেও তার প্রশংসাকারী হতে পারে না। যার উত্তম গুণাবলি যত বেশি হবে, তার প্রশংসাও তত পরিপূর্ণ হবে। আর যার ভালো গুণসমূহ কম হবে, তার প্রশংসাও সে অনুপাতে কমে যাবে।
আর এ কারণেই সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য; এমন প্রশংসা যা তিনি ব্যতীত আর কেউ গণনা করার সক্ষমতা রাখে না। কারণ আল্লাহ তাআলা সর্বোত্তন ও পরিপূর্ণ গুণাবলির একচ্ছত্র মালিক। আর এ কারণেই তাঁর সৃষ্টির মধ্যে কেউ তাঁর প্রশংসা গুণে শেষ করতে পারবে না। কেননা তাঁর পরিপূর্ণ ও মহৎ গুণাবলি তিনি ব্যতীত আর কেউ গণনা করতে সক্ষম নয়। আল্লাহ তাআলা কাফিরদের উপাস্যদের নিন্দা করেছেন এবং তাদের মন্দ বলেছেন; কারণ তারা পরিপূর্ণ গুণাবলির অধিকারী নয়। তিনি এই বলে তাদের দোষারোপ করেছেন যে, তারা শুনতে পারে না, দেখতে পারে না, কথা বলতে পারে না, কাউকে পথ দেখাতে পারে না, কারও উপকার করতে পারে না আবার কারও ক্ষতিও করতে পারে না।
সুতরাং আল্লাহর জন্য হাম্দ বা প্রশংসা সাব্যস্ত করার দ্বারা এটিই প্রমাণিত হয় যে, পরিপূর্ণ ও সর্বোত্তম নাম ও গুণাবলির ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা একক ও অদ্বিতীয়।
আল্লাহ, রব, রহমান, রহীম ও মালিক-এই পাঁচটি নাম পরিপূর্ণ গুণাবলি ও নামের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা যে একক, তার ওপর প্রমাণ বহন করে। এটি দুইটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত :
প্রথম ভিত্তি : আল্লাহ তাআলার নামসমূহ তাঁর পরিপূর্ণ গুণাবলির প্রমাণ বহন করে। নামগুলো গুণাবলি থেকেই উৎসারিত। এগুলো নামও আবার গুণও। এ কারণেই আল্লাহ তাআলার নামসমূহের বিশেষণ হুসনা (সুন্দর) দ্বারা করা হয়েছে। কারণ এটি যদি শুধুই অর্থহীন শব্দের ব্যাপার হতো, তা হলে তা হুসনা বা সুন্দর হতো না। এমনিভাবে তা প্রশংসা ও পরিপূর্ণতার ওপর দলীলও হতো না। (নামগুলো যদি শুধুই নাম হতো; সিফাত বা গুণের বিবেচনা করা না হতো,) তবে প্রতিশোধ ও রাগ-সংবলিত নামগুলো দয়া ও অনুগ্রহের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যেত; অথবা এর বিপরীতভাবেও ব্যবহার করার সুযোগ থাকত। তখন বলা যেত :
اللَّهُمَّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي، فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّكَ أَنْتَ الْمُنْتَقِمُ
'হে আল্লাহ, আমি আমার নফসের ওপর জুলুম করেছি, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি প্রতিশোধ গ্রহণকারী!' অথবা বলা যেত :
اللَّهُمَّ أَعْطِنِي، فَإِنَّكَ أَنْتَ الضَّارُّ الْمَانِعُ
'হে আল্লাহ, আমাকে দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি ক্ষতিসাধনকারী ও বাধাদানকারী!'
আল্লাহ তাআলার আল-আসমাউল হুসনা বা উত্তম নামসমূহ থেকে অর্থকে বাদ দেওয়া অনেক বড়ো ইলহাদ বা নাস্তিকতা। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا وَذَرُوا الَّذِينَ يُلْحِدُوْنَ فِي أَسْمَابِهِ سَيُجْزَوْنَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ )
"আর আল্লাহর জন্যই রয়েছে সব উত্তম নাম। কাজেই সে উত্তম নাম ধরেই তাঁকে ডাকো। আর তাদেরকে বর্জন করো, যারা তাঁর নামের ব্যাপারে বাঁকা পথে চলে। তারা নিজেদের কৃতকর্মের ফল শীঘ্রই পাবে।”।১০।
এমনিভাবে আল্লাহ তাআলার নামসমূহ যদি অর্থ ও গুণাবলির ওপর প্রমাণ বহন না করত, তা হলে সেগুলোর দ্বারা নিজেকে গুণান্বিত করা এবং সেগুলোর মূল ও উৎসসমূহের খবর দেওয়া বৈধ হতো না। অথচ আল্লাহ তাআলা সেগুলোর মূল সম্পর্কে জানিয়েছেন এবং নিজের জন্য তা সাব্যস্ত করেছেন। রাসূলুল্লাহ -ও আল্লাহ তাআলার জন্য গুণাবলি সাব্যস্ত করেছেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
إِنَّ اللهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ ۞ “আল্লাহ নিজেই রিয্‌কদাতা এবং মহাশক্তিধর ও পরাক্রমশালী।”[১]
সুতরাং জানা গেল, আল্লাহ তাআলার নামসমূহ থেকে একটি নাম হলো الْقَوِيُّ (মহাশক্তিধর)। আর তিনি শক্তির গুণে গুণান্বিত।
ইলহাদ বা ধর্মত্যাগ হলো নামগুলোকে অস্বীকার করা, অথবা এর অর্থকে অস্বীকার করা এবং নামগুলো গুণহীন ও বেকার মনে করা, অথবা এগুলোকে সত্য থেকে বিকৃত করা এবং মিথ্যা অপব্যাখ্যা করে হক থেকে বের করে দেওয়া, অথবা আল্লাহ তাআলার কোনো নামকে তাঁর কোনো সৃষ্টির জন্য প্রয়োগ করা; যেমন : ‘ইত্তিহাদ’-এর অধিকারীদের ইলহাদ। কারণ আল্লাহ তাআলার নামসমূহকে তারা সৃষ্টিজগতের ভালো-মন্দ সবার ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করে থাকে।
দ্বিতীয় ভিত্তি : আল্লাহ তাআলার নামসমূহের মধ্য থেকে একটি নাম যেমন তাঁর সত্তা ও গুণের ওপর সরাসরি প্রমাণ বহন করে, তেমনি তা আরও দুইটি বিষয়ের দিকেও ইঙ্গিত প্রদান করে—ইঙ্গিত প্রদান করার বিষয়টি হয় অধিনস্থতা ও আবশ্যকীয়তার ভিত্তিতে—একটি হলো শুধু গুণের ওপর ইঙ্গিত প্রদান করে, আরেকটি হলো গুণ ব্যতীত শুধু সত্তার ওপর ইঙ্গিত প্রদান করে। তবে এটি আবশ্যকীয়তার ভিত্তিতে ভিন্ন আরেকটি গুণের প্রতিও ইঙ্গিত করে। (উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার হবে,) যেমন : اَلسَّمِيعُ (সর্বশ্রোতা) নামটি ১. আল্লাহ তাআলার সত্তা এবং ‘শ্রবণ’ গুণের ওপর সরাসরি প্রমাণ বহন করে, এমনিভাবে ২. শুধু আল্লাহর সত্তার ওপরও প্রমাণ বহন করে। আবার সত্তা বাদ দিয়ে কেবল ৩. শ্রবণশক্তির প্রমাণও বহন করে। তাছাড়া এটি আল্লাহ তাআলা যে জীবিত (الحَيُّ) তার ওপরও প্রমাণ বহন করে। এখানে 'জীবন'-এর গুণটি সাব্যস্ত হয়েছে আবশ্যকীয়ভাবে। (কারণ যে শুনবে তার জীবন থাকা আবশ্যক।) এ রকমভাবে সমস্ত নাম ও গুণাবলির ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য।
তবে কোনো বস্তুর কী কী আবশ্যকীয় অনুষঙ্গ থাকতে পারে, তা বোঝা না-বোঝার ক্ষেত্রে মানুষে মানুষে বেশ পার্থক্য রয়েছে। (কেউ বোঝে, কেউ বোঝে না।) আর এখান থেকেই অধিকাংশ নাম, গুণ ও হুকুমের ক্ষেত্রে তাদের মাঝে মতপার্থক্য দেখা দেয়। কেননা যে ব্যক্তি জানে স্বেচ্ছায় কোনো কাজ করতে হলে অপরিহার্যভাবেই জীবনের প্রয়োজন, শোনা এবং দেখাও পরিপূর্ণ জীবনসত্তাকে আবশ্যক করে, এমনিভাবে এটাও জানে যে, সব ধরনের পরিপূর্ণতা ধারণের জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবন আবশ্যক, সেই ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার নাম, সিফাত ও কাজকর্ম সম্পর্কে অনেক কিছুই সাব্যস্ত করতে পারবে। অপরদিকে যে ব্যক্তি উপরিউক্ত বিষয়গুলো জানে না এবং জীবনের আবশ্যকীয় গুণাবলি সম্পর্কেও জ্ঞান রাখে না, সে নিশ্চিতভাবেই এগুলোকে অস্বীকার করবে। সব গুণাবলি সম্পর্কে এই একই কথা।
যখন এই দুটি ভিত্তি স্পষ্ট হয়ে গেল, তখন জেনে রাখুন, ১। নামটি উপরিউক্ত তিনটি পন্থায়ই সমস্ত উত্তম নাম ও মহৎ গুণাবলিকে সাব্যস্ত করে। কেননা 'আল্লাহ' নামটি সিফাতে ইলাহিয়্যাতের ওপর প্রমাণ বহন করে; যা তাঁর জন্য ইলাহিয়্যাতের সিফাতকে সাব্যস্ত করে এবং এর বিপরীত গুণাবলিকে প্রত্যাখ্যান করে।
আর ইলাহিয়্যাত সিফাতটি হলো সর্বদিক দিয়েই পূর্ণাঙ্গ একটি সিফাত। তুলনা-উপমা ও সব ধরনের দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা সমস্ত উত্তম নামসমূহকে এই নামের দিকে সম্পৃক্ত করেছেন। যেমন আল্লাহ বলেন, وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى "আর আল্লাহর জন্যই রয়েছে সব উত্তম নাম।”[১২]
বলা হয় 'আর-রহমান', 'আর-রহীম', 'আল-কুদ্দুস', 'আস-সালাম', 'আল-আযীয', 'আল-হাকীম'-এগুলো হলো 'আল্লাহ'র নামসমূহের অন্তর্ভুক্ত; তবে এ রকমটা বলা হয় না যে, 'আল্লাহ' হলো আর-রহমান বা আল-আযীযের নামসমূহের অন্তর্ভুক্ত। অন্যান্য আর কোনো নামের ক্ষেত্রেই এ রকম বলা হয় না।
সুতরাং জানা গেল, ‘আল্লাহ’ নামটি আল-আসমাউল হুসনার সমস্ত অর্থকেই আবশ্যক করে; সেগুলোর প্রতি এটি সংক্ষিপ্তভাবে দিকনির্দেশনা দান করে। আর আল-আসমাউল হুসনা হলো ইলাহিয়্যাতের গুণের বিস্তারিত ও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা। থেকেই ‘আল্লাহ’ নামের উৎপত্তি। ‘আল্লাহ’ নামটি ইলাহ্ ও উপাস্য হওয়ার প্রতি ইঙ্গিত প্রদান করে; সমগ্র সৃষ্টিজগৎকে মহাব্বত, শ্রদ্ধা ও বিনয়ের সাথে এবং সব ধরনের প্রয়োজন ও বিপদাপদে আশ্রয়স্থল হিসেবে তাঁকে ইলাহরূপে গ্রহণ করে নিতে উদ্বুদ্ধ করে। যা তাঁর পরিপূর্ণ রুবুবিয়্যাত ও রহমতকে আবশ্যক করে; আর এই দুটি গুণ পরিপূর্ণ মালিকানা ও প্রশংসাকে অন্তর্ভুক্ত করে। আল্লাহ তাআলার ইলাহিয়্যাত, রুবুবিয়্যাত, রহমানিয়্যাত, মিলকিয়্যাত এই গুণগুলো সমস্ত উত্তম সিফাতকে আবশ্যক করে। কারণ এই গুণগুলো সেই সত্তার জন্য সাব্যস্ত হওয়া অসম্ভব, যিনি জীবিত নন, শ্রোতা, দ্রষ্টা, শক্তিধর ও আদেশ-নিষেধকারী নন, কিংবা সর্বময় ক্ষমতার মালিক বা নিজের কাজকর্মে একমাত্র সিদ্ধান্ত-গ্রহণকারী নন।
সূরা ফাতিহায় হাম্দ বা প্রশংসার পরে আল্লাহ তাআলার নামগুলো উল্লেখ করার মাঝে এই দলীল রয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর ইলাহিয়্যাতে প্রশংসিত, রুবুবিয়্যাতে প্রশংসিত, রহমানিয়্যাতে প্রশংসিত এবং মিলকিয়্যাতেও প্রশংসিত। এমনিভাবে এই দলীলও রয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা প্রশংসিত ইলাহ্, প্রশংসিত রব, প্রশংসিত রহমান এবং প্রশংসিত মালিক। আর এসবের মাধ্যমে তিনি সমস্ত পরিপূর্ণতার অধিকারী।

টিকাঃ
[১০] সূরা আ'রাফ, ৭: ১৮০।
[১১] সূরা যারিয়াত, ৫১ : ৫৮।
[১২] সূরা আ'রাফ, ৭: ১৮০।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 সূরা ফাতিহায় দু‘টি আরোগ্য ধারণ করে

📄 সূরা ফাতিহায় দু‘টি আরোগ্য ধারণ করে


সূরা ফাতিহা দুইটি আরোগ্য ধারণ করে : ১. অন্তরের আরোগ্য (شِفَاءُ الْقُلُوْبِ) এবং ২. শরীরের আরোগ্য (شِفَاءُ الْأَبْدَانِ)
১. অন্তরের আরোগ্য (شِفَاءُ الْقُلُوْبِ) : এই সূরার মধ্যে অন্তরের সমস্ত রোগের পরিপূর্ণ সুস্থতা ও রোগমুক্তি রয়েছে। কেননা অন্তরের যত রোগব্যাধি রয়েছে তার ভিত্তি হলো দুইটি বিষয়ের ওপর- ১. ইলম সঠিক না হওয়া এবং ২. ইচ্ছা সঠিক না হওয়া।
আর এই দুটি বিষয় থেকে আরও মারাত্মক দুটি রোগের সৃষ্টি হয়- গোমরাহি ও ক্রোধ। গোমরাহি হলো ইলম সঠিক না হওয়ার ফল আর ক্রোধ হলো ইচ্ছা সঠিক না হওয়ার ফল। এই দুটি ব্যাধিই হলো অন্তরের সমস্ত রোগের উৎসমূল। সুতরাং সূরা ফাতিহায় উল্লেখিত সিরাতে মুস্তাকীমের হিদায়াত সকল প্রকার গোমরাহিজনিত রোগ থেকে আরোগ্য দান করে। আর এ কারণেই এই হিদায়াত প্রার্থনা করা প্রত্যেক বান্দার ওপর জরুরি ও আবশ্যক। প্রতিদিন প্রত্যেক সালাতে এই দুআ পাঠ করা বান্দার জন্য অবশ্যকরণীয়। এর তীব্র প্রয়োয়জনীয়তা থাকার কারণেই এই হুকুম দেওয়া হয়েছে। অন্য কোনো দুআ কখনো এই দুআর স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না।
অপরদিকে ইলম, মা'রিফাত, আমল ও অবস্থা অনুসারে إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ "আমরা কেবল তোমারই দাসত্ব করি, আর তোমার কাছেই সাহায্য চাই”-এই আয়াতের বাস্তবায়নে রয়েছে অন্তরের অনিষ্টতা এবং ইচ্ছা ও সংকল্পের ক্ষেত্রে সব ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতির সমাধান। কেননা ইচ্ছা সঠিক না হওয়ার সম্পর্ক হলো লক্ষ্য ও মাধ্যমের সাথে। আসলে যে ব্যক্তি আল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্ন, ধ্বংসশীল-অস্থায়ী কোনো উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের সন্ধানে লিপ্ত থাকে এবং তাতে পৌঁছানোর জন্য বিভিন্ন মাধ্যম অবলম্বন করে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, তার এই দুই প্রকারের ইচ্ছাই ভ্রান্ত।
এটিই হলো প্রতিটি মুশরিক ও প্রবৃত্তির অনুসারীদের অবস্থা, যাদের লক্ষ্য ও ইবাদাতের উদ্দেশ্য আল্লাহ ব্যতীত অন্যকিছু; তা ছাড়া তাদের আর কোনো উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য নেই। মূলকথা হলো লক্ষ্য ও মাধ্যম নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে এদের ইচ্ছা ও সংকল্প খারাপ হয়েছে। যেদিন তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ভুল বলে প্রমাণিত হবে; যার জন্য নিজের সবকিছু বিসর্জন দিয়েছে— সেদিন তারা সবচেয়ে বড়ো ক্ষতি ও ধ্বংসের মুখোমুখি হবে। এই সমস্ত ব্যক্তিরাই সেদিন সবচেয়ে বেশি আফসোস করতে থাকবে এবং লজ্জিত হবে। সেসময় সত্য সত্য হিসেবে আর মিথ্যা মিথ্যা হিসেবে প্রকাশিত হবে, তাদের সমস্ত মাধ্যম বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, তাদের নিশ্চিত বিশ্বাস হবে যে, সৌভাগ্য ও সফলতা থেকে তারা অনেক দূরে। এ বিষয়টি অনেক সময় দুনিয়াতেও প্রকাশ পেয়ে যায়। আর বেশ প্রকটভাবে প্রকাশ পায়, যখন দুনিয়া থেকে বিদায় নেয় এবং আল্লাহ-অভিমুখে যাত্রা করে। কবরজীবনে বিষয়টি তারা আরও সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করে। আর সবশেষে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের দিন সবকিছু পরিপূর্ণরূপে প্রকাশ পেয়ে যাবে; যখন সমস্ত রহস্য উন্মোচিত হবে, সত্যপন্থিরা সফল হবে আর বাতিলপন্থিরা হবে ক্ষতিগ্রস্ত। তারা সেদিন জানতে পারবে, তারা মিথ্যাবাদী ছিল, তারা ধোঁকাগ্রস্ত ও প্রতারণার শিকার ছিল। কিন্তু সেদিনকার এই জ্ঞান আর বিশ্বাস তাদের না কোনো কাজে আসবে আর না কোনো উপকার করবে।
এমনিভাবে যে ব্যক্তি সুউচ্চ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সন্ধান করে, কিন্তু সে জন্য সঠিক মাধ্যম অবলম্বন করে না; যা তাকে ওই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেবে; বরং এমন মাধ্যম গ্রহণ করে তার ধারণায় যা সঠিক, কিন্তু বাস্তবে তা সঠিক নয়; এই ব্যক্তির অবস্থাও উপরিউক্ত ব্যক্তি মতোই; দুজনের ইচ্ছাই ভ্রান্ত। এদের এই রোগের একটিই মাত্র ওষুধ রয়েছে আর তা হলো- إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ "আমরা কেবল তোমারই দাসত্ব করি, আর তোমার কাছেই সাহায্য চাই।”
কারণ إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর এই ওষুধটি ছয়টি উপকরণ নিয়ে গঠিত: ১. দাসত্ব হবে একমাত্র আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্যে, অন্য কারও উদ্দেশ্যে নয়;
২. তাঁর হুকুম ও শারীআ অনুযায়ীই হবে তাঁর দাসত্ব;
৩. প্রবৃত্তির অনুসরণে নয়:
৪. কোনো মানুষের দেওয়া মানদণ্ড, সিদ্ধান্ত, রীতিনীতি বা যুক্তি মেনেও নয়;
৫. আল্লাহ তাআলার দাসত্বের ক্ষেত্রে শুধু তাঁরই সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে;
৬. কেবল বান্দার নিজের শক্তি-সামর্থ্য দিয়ে বা অন্য কারও সাহায্য নিয়ে নয়।
এই হলো إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ-এর উপকরণসমূহ। সুতরাং রোগ সম্পর্কে অবগত, দয়ালু কোনো ডাক্তার যখন এই উপকরণগুলো ব্যবহার করতে বলবে আর রোগী তা ব্যবহারও করবে, তখন এর দ্বারা পরিপূর্ণ সুস্থতা ও আরোগ্য লাভ হবে। সুস্থতায় যদি ঘাটতি থাকে, তা হলে বুঝতে হবে ওষুধের সব উপকরণগুলো ব্যবহার করা হয়নি; হয়তো একটি, দুটি বা তারও অধিক উপকরণ বাদ পড়েছে।
এই স্তর অতিক্রম করার পর অন্তরে আরও বড়ো বড়ো দুটি রোগ এসে হাজির হয়। ব্যক্তি যদি এগুলো সম্পর্কে সচেতন না হয়, তা হলে নিশ্চিতভাবেই সেগুলো তাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। রোগ দুটি হলো : ১. রিয়া বা লোক-দেখানো-প্রবণতা এবং ২. অহংকার।
সুতরাং লোক-দেখানো-প্রবণতার ওষুধ হলো: إِيَّاكَ نَعْبُدُ "আমরা কেবল তোমারই দাসত্ব করি” আর অহংকারের ওষুধ হলো: وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ "আর আমরা কেবল তোমার কাছেই সাহায্য চাই”।
যখন إِيَّاكَ نَعْبُدُ-এর মাধ্যমে লোক-দেখানো-প্রবণতা, وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ-এর মাধ্যমে অহংকার ও গর্ব এবং اِهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ -এর মাধ্যমে মূর্খতা ও গোমরাহিজনিত রোগব্যাধি থেকে আরোগ্য লাভ করবে এবং সুস্থতার চাদর গায়ে জড়াবে, তখন তার ওপর আল্লাহ তাআলার নিয়ামাত পরিপূর্ণ হয়ে যাবে, সে পুরস্কারপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। সে গজবপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে না غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ যাদের ইচ্ছা ও সংকল্প খারাপ ছিল, যারা সত্য চিনে নেওয়ার পরও তা থেকে ফিরে গেছে। এবং সে পথভ্রষ্টদেরও অন্তর্ভুক্ত হবে না وَلَا الضَّالِّينَ যারা ছিল মূর্খ সম্প্রদায়; যারা সত্য সম্পর্কে জানতেও পারেনি এবং তা চিনতেও পারেনি।
এই দুটি আরোগ্যকে যে সূরা ধারণ করে সেটিই সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত যে, তার মাধ্যমে প্রত্যেক রোগ থেকে আরোগ্য কামনা করা হবে। সূরা ফাতিহা যখন সবচেয়ে বড়ো আরোগ্যকেই অন্তর্ভুক্ত করে, তখন ছোটো ছোটো আরোগ্যগুলোকে তো সহজেই অন্তর্ভুক্ত করবে। শীঘ্রই আমরা এ বিষয়ে আলোচনা করব, ইন শা আল্লাহ।
সুতরাং যে অন্তর আল্লাহর বাণী বুঝতে সক্ষম এবং তা গভীরভাবে উপলব্ধি করে, সে অন্তরের জন্য এই সূরার বিষয়বস্তু উপলব্ধি করার চেয়ে উত্তম কোনো শিফা বা রোগমুক্তি আর নেই।
২. শরীরের আরোগ্য (شِفَاءُ الْأَبْدَانِ) : 'সহীহ বুখারি'-তে এসেছে, আবূ সাঈদ খুদরি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'নবি -এর একদল সাহাবি কোনো এক সফরে যাত্রা করেন। তারা এক আরব গোত্রে পৌঁছে তাদের মেহমান হতে চাইলেন; কিন্তু তারা তাদের মেহমানদারি করতে অস্বীকার করল। পরে সে গোত্রের সরদার দংশিত হলো বিচ্ছু দ্বারা। লোকেরা তার (রোগমুক্তির) জন্য সব ধরনের চেষ্টা করল। কিন্তু কোনোকিছুতেই উপকার হলো না। তখন তাদের কেউ বলল, 'এই কাফেলার যারা এখানে অবতরণ করেছে তোমরা তাদের কাছে গেলে ভালো হতো। সম্ভবত, তাদের কারও কাছে কিছু থাকতে পারে।' ওরা তাদের কাছে গিয়ে বলল, 'ওহে মুসাফির, আমাদের সরদারকে বিচ্ছু দংশন করেছে, আমরা সব রকমের চেষ্টা করেছি, কিন্তু কিছুতেই উপকার হচ্ছে না। তোমাদের কারও কাছে কি কিছু আছে?'
সাহাবিদের মধ্যে একজন বললেন, 'হ্যাঁ, আল্লাহর কসম আমি ঝাড়ফুঁক করতে পারি! আমরা তোমাদের মেহমানদারি কামনা করেছিলাম, কিন্তু তোমরা আমাদের জন্য মেহমানদারি করোনি। কাজেই আমি তোমাদের ঝাড়ফুঁক করব না, যে পর্যন্ত-না তোমরা আমাদের জন্য পারিশ্রমিক নির্ধারণ করো।' তখন তারা এক পাল বকরি দেওয়ার শর্তে তাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হলো। তারপর তিনি সেখানে গিয়ে الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (সূরা ফাতিহা) পড়ে তার ওপর ফুঁ দিতে লাগলেন। ফলে সে (এমনভাবে সুস্থতা লাভ করল) যেন বন্ধন হতে মুক্ত হলো এবং সে এমনভাবে চলতে-ফিরতে লাগল যেন তার কোনো কষ্টই ছিল না। (বর্ণনাকারী বলেন,) তারপর তারা তাদের চুক্তিকৃত পারিশ্রমিক পুরোপুরি দিয়ে দিলো। সাহাবিদের কেউ কেউ বললেন, 'এগুলো বণ্টন করো।' কিন্তু যিনি ঝাড়ফুঁক করেছিলেন তিনি বললেন, 'এটা করব না, যে পর্যন্ত-না আমরা নবি -এর নিকট গিয়ে এই ঘটনা জানাই এবং দেখি তিনি আমাদের কী নির্দেশ দেন।' তারা আল্লাহর রাসূল -এর কাছে এসে ঘটনা বর্ণনা করলেন। নবি বললেন, 'তুমি কীভাবে জানলে যে, সূরা ফাতিহা একটি রুইয়া?' তারপর বললেন, 'তোমরা ঠিকই করেছ। বণ্টন করো এবং তোমাদের সাথে আমার জন্যও একটা অংশ রাখো।' এ বলে নবি হাসলেন। [১০]
এই হাদীসটি প্রমাণ করে যে, সূরা ফাতিহা পাঠের মাধ্যমেই সেই দংশিত ব্যক্তির ব্যথা সেরে গিয়েছিল। ফলে অন্য কোনো ওষুধের প্রয়োজন পড়েনি। কখনো কখনো সূরা ফাতিহা দ্বারা এমন এমন রোগ থেকেও আরোগ্য লাভ হয়; যেগুলো ওষুধ সেবনের মাধ্যমেও ভালো হয় না। এই ঘটনাটি ঘটেছে এমন জায়গায়, যা দুআ কবুলের স্থান নয়; হয়তো তারা অমুসলিম হওয়ার কারণে অথবা কৃপণ ও নীচ প্রকৃতির মানুষ হওয়ার কারণে। সুতরাং দুআ কবুলের স্থানে (তা প্রয়োগ করা) হলে, কেমন প্রতিক্রিয়া হবে বলে আপনার ধারণা?!

টিকাঃ
[১৩] বুখারি, ২২৭৬; মুসলিম, ২২০১।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 ইসলামি ও আমলিভাবে إِيَّاكَ نَعْبُدُ -এর স্তরসমূহ

📄 ইসলামি ও আমলিভাবে إِيَّاكَ نَعْبُدُ -এর স্তরসমূহ


দাসত্বের স্তর
ইলম ও আমল অনুসারে দাসত্বের অনেকগুলো স্তর রয়েছে।
দাসত্বের ইলমি স্তর হলো দুইটি: এক. আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে ইলম এবং দুই. আল্লাহ তাআলার দ্বীন সম্পর্কে ইলম।
এক. আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে ইলম আবার পাঁচটি স্তরে বিভক্ত: ১. আল্লাহর সত্তা সম্পর্কে ইলম, ২. আল্লাহর গুণাবলি সম্পর্কে ইলম, ৩. আল্লাহর কার্যাবলি সম্পর্কে ইলম, ৪. আল্লাহর নামসমূহ সম্পর্কে ইলম এবং ৫. আল্লাহকে এমন সব গুণাবলি থেকে মুক্ত রাখার ইলম, যা তাঁর অনুপযুক্ত।
দুই. আল্লাহর দ্বীন সম্পর্কে ইলমের আবার দুইটি স্তর রয়েছে : ১. দ্বীনের মধ্যে আল্লাহর আদেশসূচক বিষয়াবলি সম্পর্কে জ্ঞান রাখা। আর এটিই হলো সিরাতে মুস্তাকীম; যা ব্যক্তিকে আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছে দেয়।
২. দ্বীনের ছোটো ছোটো বিষয়গুলো সম্পর্কেও জ্ঞান রাখা। যা সাওয়াব ও আযাব এবং আল্লাহ তাআলার ফেরেশতা ও রাসূলদের সম্পর্কে জানাকেও অন্তর্ভুক্ত করে।
দাসত্বের আমলি স্তর আবার দুই প্রকার: এক. ডান দিকের লোকদের স্তর এবং দুই. নৈকট্যশীল অগ্রগামীদের স্তর।
এক. ডান দিকের লোকদের স্তর: ওয়াজিব আমলগুলো পালন করা এবং হারাম ও নিষিদ্ধ কাজকর্ম থেকে বেঁচে থাকা। তবে বৈধ বিষয়ে লিপ্ত হওয়া, কিছু অপছন্দনীয় কাজে জড়িয়ে পড়া এবং কিছু পছন্দনীয় কাজ পরিত্যাগ করাও এই স্তরের শামিল।
দুই. নৈকট্যশীল অগ্রগামীদের স্তর: ওয়াজিব ও মুস্তাহাব বিষয়গুলো পালন করা এবং হারাম ও অপছন্দনীয় বস্তুসমূহ থেকে বেঁচে থাকা। বৈধ হলেও আখিরাতে যে কথা বা কাজের কোনো উপকার পাওয়া যাবে না, সেগুলো থেকেও দূরে থাকা এবং ক্ষতির আশঙ্কা আছে এমন বস্তু থেকেও নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা।
এই স্তরের ব্যক্তিদের (অন্যতম একটি) বৈশিষ্ট্য হলো: দুনিয়াবি বৈধ বিষয়গুলোকেও উত্তম নিয়তের মাধ্যমে তারা সাওয়াব ও নৈকট্য লাভের বস্তুতে রূপান্তরিত করে নেয়। ফলে তাদের ক্ষেত্রে এমন কোনো আমল পাওয়া যাবে না যা শুধুই বৈধ; (লাভ-ক্ষতির) উভয় দিক সমান। বরং তাদের প্রতিটি আমলই পছন্দনীয় ও লাভজনক। তাদের চেয়ে নিম্নস্তরের ব্যক্তিরা অনেক মুবাহ বা বৈধ বিষয়কে বিভিন্ন ইবাদাতের কারণে ছেড়ে দেয়। কিন্তু এই স্তরের ব্যক্তিরা সেগুলোকেই ইবাদাতে রূপান্তরিত করে নেয়। এই দুই স্তরের ব্যক্তিদের জন্য এত বেশি মর্যাদা রয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা ছাড়া আর কেউ তার হিসাব রাখতে সক্ষম নয়।
দাসত্বের চাকা ১৫টি বিষয়ের সাথে চলমান থাকে; যে ব্যক্তি এই ১৫টি বিষয়কে পরিপূর্ণরূপে ধারণ করবে, তার দাসত্বের স্তরগুলোও পূর্ণতা পাবে।
১৫টি বিষয়ের বর্ণনা: অন্তর, জবান ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এই তিনটি ভাগে দাসত্ব বিভক্ত।
প্রত্যেকটির ওপর ভিন্ন ভিন্ন দাসত্ব রয়েছে।
আর দাসত্ব-কেন্দ্রিক হুকুম হলো পাঁচটি: ওয়াজিব, মুস্তাহাব, হারাম, মাকরূহ (অপছন্দনীয়) ও মুবাহ (বৈধ)। এই পাঁচটির প্রত্যেকটি আবার উপরিউক্ত অন্তর, জবান ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সাথে সম্পর্কিত। (আর এভাবে ৩০৫=১৫ প্রকার হয়।)
অন্তরের দাসত্ব (عُبُوْدِيَّةُ الْقَلْبِ) : অন্তরের ওয়াজিব দাসত্বের মধ্যে কিছু বিষয় রয়েছে সর্বসম্মতিক্রমে ওয়াজিব, আর কিছু বিষয় রয়েছে মতভেদপূর্ণ।
সর্বসম্মতিক্রমে ওয়াজিব বিষয়গুলো হলো: যেমন: ইখলাস, তাওয়াক্কুল, মহাব্বত, সবর, আল্লাহর দিকে ধাবমান হওয়া, আল্লাহর ভয়, আশা, দৃঢ় সত্যায়ন এবং ইবাদাতে নিয়ত করা; আর এটি হলো ইখলাসের চেয়ে অতিরিক্ত একটি বিষয়। কারণ (নিয়ত করা ও ইখলাস এক কথা নয়); ইখলাস হলো ইবাদাতের ক্ষেত্রে অন্য সকল সৃষ্টি থেকে আল্লাহকে আলাদা রাখা।
ইবাদাতে নিয়ত করার দুইটি স্তর রয়েছে-
১. আদত বা অভ্যাস থেকে ইবাদাতকে পৃথক করা এবং
২. বিভিন্ন প্রকার ইবাদাতকে একটি থেকে আরেকটি আলাদা করা।
এই তিনটি প্রকার (অর্থাৎ ইখলাস এবং নিয়তের দুটি স্তর) ওয়াজিব।
এমনিভাবে সিল্ক বা সত্যবাদিতাও ওয়াজিব। সত্যবাদিতা 'ও ইখলাসের মাঝে পার্থক্য হলো-নিশ্চিতভাবেই বান্দার (কাজের ক্ষেত্রে বিভিন্ন) উদ্দেশ্য (الْمَظْلُوبُ) ও দাবি (الرَّغْبُ) থাকে। ইখলাস হলো উদ্দেশ্যকে এক করা (অর্থাৎ একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যেই আমল করা) আর সত্যবাদিতা হলো দাবিকে এক করা (অর্থাৎ ভেতর-বাহিরের দাবি এক হওয়া)।
ইখলাস হলো উদ্দেশ্য বিভক্ত না হওয়া আর সত্যবাদিতা হলো দাবি বিভক্ত না হওয়া। সুতরাং সত্যবাদিতা হলো কঠোর পরিশ্রম করা আর ইখলাস হলো লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে এক রাখা।
উম্মাহ একমত পোষণ করেছে যে, মোটামুটিভাবে এই আমলগুলোই অন্তরের ওপর ওয়াজিব।
এমনিভাবে দাসত্বের ক্ষেত্রে আন্তরিক থাকা আবশ্যক। দ্বীনের ভিত্তিই এর ওপর। এর অর্থ হলো ইবাদাতকে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি মোতাবিক সর্বোত্তম পন্থায় আদায় করতে চেষ্টা করা। এর মূল বিষয়টি ওয়াজিব আর এতে পরিপূর্ণতা অর্জন করা হলো নৈকট্যশীল ব্যক্তিদের স্তর।
অনুরূপভাবে অন্তরের প্রতিটি ওয়াজিব আমলের ক্ষেত্রে দুইটি দিক রয়েছে : অপরিহার্যভাবে ওয়াজিব; যা আসহাবুল ইয়ামীন অর্থাৎ ডান দিকের লোকদের স্তর এবং আরেকটি হলো ওয়াজিব আদায়ের পর আরও পরিপূর্ণ করা, সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা; এটি হলো নৈকট্যশীল অগ্রগামী বান্দাদের স্তর; এটি মুস্তাহাব।
এমনিভাবে সবর বা ধৈর্য ধারণ করাও সর্বসম্মতিক্রমে অন্তরের ওয়াজিব আমল। ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল বলেন, 'আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজীদে ৯০ জায়গায় বা ৯০-এর চেয়ে কিছু বেশি জায়গায় সবরের কথা উল্লেখ করেছেন। এরও দুইটি দিক রয়েছে: ১. অপরিহার্যভাবে ওয়াজিব এবং ২. ওয়াজিব পালনের পর তা পরিপূর্ণ করা, যা মুস্তাহাব।
মতভেদপূর্ণ বিষয়গুলো হলো: যেমন: (সৃষ্টিগত বা তাকদীরি বিষয়ের ক্ষেত্রে) রিযা বা সন্তুষ্টি। কেননা এর ওয়াজিব হওয়ার ক্ষেত্রে ফুকাহায়ে কেরাম ও সূফিয়ায়ে কেরামের দুটি ভিন্ন ভিন্ন অভিমত রয়েছে।
যারা ওয়াজিব বলেছেন তাদের বক্তব্য হলো: আল্লাহ তাআলার কোনো বিধানে অসন্তুষ্ট হওয়া বা রাগান্বিত হওয়া হারাম। এর থেকে মুক্তি মেলে কেবল সন্তুষ্ট হওয়ার মাধ্যমেই। আর যা ছাড়া হারাম থেকে মুক্তি মেলে না, তা ওয়াজিব। সুতরাং রিযা বা সন্তুষ্ট হওয়াও ওয়াজিব।
আর যারা মুস্তাহাব বলেছেন তাদের বক্তব্য হলো: এ সম্পর্কে কুরআন-সুন্নাহর কোথাও কোনো আদেশসূচক বাণী আসেনি। তবে যারা সন্তুষ্ট থাকেন তাদের ব্যাপারে কুরআনে কেবল প্রশংসার বর্ণনা এসেছে; সন্তুষ্ট হওয়ার জন্য আদেশ করা হয়নি।
যারা ওয়াজিব বলেছেন তাদের খণ্ডনে তারা বলেন, 'কেবল সন্তুষ্ট হওয়ার দ্বারাই অসন্তুষ্টি বা রাগান্বিত অবস্থা থেকে মুক্তি মেলে'—এই কথাটি সঠিক নয়। কারণ ভাগ্য মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের অবস্থা তিন ধরনের: ১. রিয়া বা সন্তুষ্টি; এটি সর্বোচ্চ স্তরের, ২. অসন্তুষ্টি; এটি সর্বনিম্ন স্তরের এবং ৩. আপতিত বিষয়ে সন্তুষ্ট না হয়ে সবর করা; এটি মধ্যম স্তরের। সুতরাং সর্বোচ্চ স্তর অর্থাৎ সন্তুষ্টি হলো মুকাররাবীন বা নৈকট্যশীলদের জন্য। মধ্যম স্তরটি হলো সাধারণ নেককারদের জন্য আর সর্বনিম্ন স্তরটি হলো জালিম বা অত্যাচারীদের জন্য। অনেক মানুষ নিজের ভাগ্যের ওপর সবর করে জীবনযাপন করে; কিন্তু সেটি তাদের অসন্তুষ্ট বা রাগান্বিত করে না। তারা তাতে অসন্তুষ্টও নয়। সুতরাং বোঝা গেল সন্তুষ্টি বা রিযা হলো (রাগান্বিত হওয়া বা না হওয়া) থেকে আলাদা একটি বিষয়।
তাদের মধ্যকার এই মতভেদ কেবল সৃষ্টিগত বা তাকদীরি বিষয়ের ক্ষেত্রে। আল্লাহ তাআলাকে রব ও ইলাহ্ হিসেবে এবং দ্বীনি বিষয়ে সন্তুষ্ট থাকা সর্বসম্মতিক্রমে ফরজ। বরং এই প্রকার সন্তুষ্টি ব্যতীত কেউ মুসলিমই হতে পারে না। আল্লাহকে রব হিসেবে, ইসলামকে দ্বীন হিসেবে এবং মুহাম্মাদ ﷺ-কে রাসূল হিসেবে মানার ক্ষেত্রে সন্তুষ্ট হওয়া আবশ্যক।
মূলকথা: অন্তর হলো রাজা এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হলো এর প্রজা; এরা সবাই আল্লাহ তাআলার দাসত্ব যথাযথভাবে পালন করবে এবং তাতে অবিচল থাকবে।
অন্তরের ওপর যেগুলোকে হারাম করা হয়েছে—যেমন: অহংকার, রিয়া, আত্মগর্ব, হিংসা, গাফলত, নিফাক ইত্যাদি—তা দুই প্রকার: কুফর ও গুনাহ।
কুফর: যেমন: সন্দেহ-সংশয়, নিফাক, শির্ক এবং শিরকের সাথে সম্পর্কিত বিষয়াবলি।
অন্তরের গুনাহ আবার দুই প্রকার: কবীরা ও সগীরা।
আত্মিক কবীরা গুনাহ: যেমন: রিয়া বা লোক-দেখানো-প্রবণতা, আত্মগর্ব, অহংকার, দম্ভ, বড়াই, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া, আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিশ্চিন্ত হওয়া, মুসলমানদের দুঃখ-কষ্টে আনন্দ-উল্লাস করা, মুসলমানদের মাঝে অশ্লীলতা ছড়িয়ে যাক—এটা পছন্দ করা, আল্লাহ তাআলা অন্য মুসলিমদেরকে যে নিয়ামাত দান করেছেন সে কারণে তাদের হিংসা করা, তাদের থেকে তা নিঃশেষ হোক—এই কামনা করা, এবং এই রকম আরও আত্মিক কবীরা গুনাহসমূহ; যা ব্যভিচার, মদপান ও এই ধরনের প্রকাশ্য-কবীরা গুনাহ থেকেও বেশি জঘন্য ও মারাত্মক। এগুলো থেকে বেঁচে থাকা এবং তাওবা করা ব্যতীত অন্তর ও শরীরের কোনো সংশোধন নেই। কারণ এগুলোর মাধ্যমে অন্তর নষ্ট হয়ে যায়। আর অন্তর যখন নষ্ট হয়ে যায়, তখন শরীরও নষ্ট হয়ে যায়।
এই সমস্ত আত্মিক রোগব্যাধি ও বিপদাপদ সৃষ্টি হয় অন্তরের দাসত্ব সম্পর্কে না জানা এবং তা পালন করা থেকে বিরত থাকার কারণে। সুতরাং ইইয়াকা নাবুদু শরীরে বাস্তবায়ন করার আগে অন্তরে বাস্তবায়ন করা অধিক প্রয়োজন। যখন অন্তরের ইবাদাত ও দাসত্ব থেকে অমনোযোগী থাকা হবে এবং তা পালন করা থেকে বিরত থাকা হবে, তখন অন্তরে মন্দ ও খারাপ গুণাবলি এসে বাসা বাঁধবে। অন্তরের ইবাদাতগুলো পালনে যত অগ্রসর হবে, অন্তর থেকে মন্দ স্বভাব তত দূর হতে থাকবে।
এই সমস্ত বিষয়গুলো কখনো ছোটো আবার কখনো বড়ো বলে প্রতীয়মান হয়। এটি নির্ভর করে সেগুলোর শক্তি, কার্যক্ষমতা, গোপনীয়তা ও তীক্ষ্ণতার ওপর।
আত্মিক সগীরা গুনাহ: আত্মিক সগীরা গুনাহ হলো হারাম বস্তুসমূহে লিপ্ত হওয়ার আগ্রহ ও ইচ্ছা করা। কবীরা ও সগীরা গুনাহের ক্ষেত্রে আগ্রহকারীর অবস্থাভেদে আগ্রহ ও ইচ্ছার স্তরের তারতম্য রয়েছে। (আগ্রহ ও আগ্রহকারীর অবস্থাভেদে হুকুম ভিন্ন হয়।) যেমন: কুফর ও শিরকের প্রতি আগ্রহ কুফর। বিদআতের প্রতি আগ্রহ ফিস্ক। কবীরা গুনাহের প্রতি আগ্রহ দেখানোও গুনাহের কাজ। কেউ যদি এগুলোতে লিপ্ত হওয়ার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তা পরিত্যাগ করে, তা হলে তাকে সাওয়াব দেওয়া হবে। আর যদি নিজের সামর্থ্য ব্যয় করার পর তাতে ব্যর্থ হয়ে তা পরিত্যাগ করে, তা হলে সেই ব্যক্তি গুনাহের কাজ সম্পন্নকারী ব্যক্তির সমান শাস্তির উপযুক্ত হবে। কারণ সাওয়াব ও শাস্তির ক্ষেত্রে কাউকে তার আগ্রহের কারণে সেই ব্যক্তির স্থানে রাখা হয়, যে সরাসরি সেই কাজ করে; যদিও (দুনিয়াতে) শারীআতের হুকুম অনুযায়ী তাকে সেই ব্যক্তির স্থানে নামানো হবে না। এ কারণেই নবি ﷺ বলেছেন,
إِذَا الْتَقَى الْمُسْلِمَانِ بِسَيْفَيْهِمَا فَالْقَاتِلُ وَالْمَقْتُولُ فِي النَّارِ
“যখন দুজন মুসলিম তাদের তরবারি নিয়ে পরস্পর মুখোমুখি হবে, তখন হত্যাকারী এবং নিহত ব্যক্তি উভয়েই জাহান্নামে যাবে।”
সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, এ হত্যাকারীর বিষয়টি তো বুঝলাম, কিন্তু নিহত ব্যক্তির কী অপরাধ?’
নবি উত্তরে বললেন,
إِنَّهُ كَانَ حَرِيضًا عَلَى قَتْلِ صَاحِبِهِ
"সেও তার সাথিকে হত্যা করার জন্য আগ্রহী ছিল।” [৩৬]
নবিজি এখানে নিহত ব্যক্তিকে হত্যাকারী ব্যক্তির স্থানে রেখেছেন, তার জন্য একই হুকুম সাব্যস্ত করেছেন। কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তার আগ্রহকে। এটি কেবল সাওয়াবের ক্ষেত্রে, হুকুমের ক্ষেত্রে নয়। সাওয়াব ও শাস্তির ক্ষেত্রে এ রকম আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে।
ওপরের আলোচনার মাধ্যমে অন্তরের পছন্দনীয় ও বৈধ আমল সম্পর্কেও জানা হয়ে গেল। (অর্থাৎ হারাম ও গুনাহের কাজগুলো ব্যতীত অন্যান্য আমল বৈধ ও পছন্দনীয় প্রকারের শামিল।)
জবানের দাসত্ব: জবানসংশ্লিষ্ট পাঁচ প্রকার ইবাদাতের আলোচনা:
أَشْهَدُ أَنْ لَّا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ উচ্চারণ করা, জরুরি পরিমাণ কুরআন তিলাওয়াত করা-আর তা হলো যেটুকু পাঠ না করলে সালাত সহীহ হয় না—, সালাতে ওয়াজিব যিক্রগুলো পাঠ করা, যেগুলোর আদেশ নবি দিয়েছেন; যে রকমভাবে রুকূ-সাজদার তাসবীহ পাঠ করার আদেশ করা হয়েছে, রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ বলা, তাশাহহুদ পড়া এবং তাকবীর বলার আদেশ করা হয়েছে (-এগুলো হলো জবানের ওয়াজিব আমল)।
এমনিভাবে সালামের জবাব দেওয়াও ওয়াজিব। তবে সালাম দেওয়া ওয়াজিব কি না-সে ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে।
এমনিভাবে সৎ কাজের আদেশ করা, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা, মূর্খকে শেখানো, পথভ্রষ্টকে পথ দেখানো, নির্দিষ্ট বিষয়ে সত্য সাক্ষ্য দেওয়া এবং সত্য কথা বলা-এগুলোও জবানের ওয়াজিব আমল।
মুস্তাহাব : কুরআন তিলাওয়াত করা, সবসময় আল্লাহর যিক্র করা, উপকারী ইলম নিয়ে আলোচনা করা এবং এ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়সমূহ (জবানের মুস্তাহাব আমল।)
হারাম: আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ যা-কিছু অপছন্দ করেন ও ঘৃণা করেন তা নিয়ে কথা বলা। যেমন: এমন বিদআত নিয়ে আলোচনা করা, যা রাসূল ﷺ কর্তৃক আনীত দ্বীনের বিরোধী, আবার সেই বিদআতের দিকে আহ্বান করা, তা সুন্দর করে উপস্থাপন করা, তাকে শক্তিশালী করা ইত্যাদি। এমনিভাবে কাউকে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া, কোনো মুসলিমকে গালি-গালাজ করা, কথার মাধ্যমে কষ্ট দেওয়া, মিথ্যা বলা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া (-এগুলো হলো জবানের হারাম আমল)। আল্লাহ সম্পর্কে না জেনে কথা বলা-এটি হলো সবচেয়ে কঠিনতম হারাম।
মাকরূহ: যে বিষয়ে কথা পরিত্যাগ করাই উত্তম, সে বিষয়ে কথা বলা; যদিও তাতে কোনো শাস্তি নেই।
মুবাহ: সালাফগণ এই বিষয়ে ইখতিলাফ করেছেন যে, জবানের জন্য মুবাহ কোনো কথা আছে কি না, যার কোনো লাভও নেই আবার ক্ষতিও নেই-দুদিকেই সমান?
সঠিক অভিমত হলো: জবানের কোনো কথাই মুবাহ নয়; যার দুদিকই সমান। কথার মাধ্যমে হয়তো লাভ হবে নয়তো ক্ষতি। কারণ জবানের অবস্থা অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মতো নয়-মানুষ যখন সকাল করে, তখন তার সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিনীত হয়ে জিহ্বাকে বলে, 'তুমি (আমাদের ব্যাপারে) আল্লাহকে ভয় করো। আমরা তো তোমার সাথেই সম্পৃক্ত। তুমি যদি সোজা হয়ে চলো, তা হলে আমরাও সোজা হয়ে চলব। আর তুমি যদি বাঁকা পথে চলো, তা হলে আমরাও বাঁকা পথে চলব।'[৩৭] শুধু জিহ্বার (মন্দ) উপার্জনই মানুষকে অধিকহারে নিম্নমুখী করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে।[৩৮] জবান যা-ই উচ্চারণ করুক; তা হয়তো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টি মোতাবিক হবে, ফলে তা লাভজনক বলে বিবেচিত হবে; আর যদি এমন না হয়, তা হলে ক্ষতির আওতায় পড়ে যাবে।
আর জিহ্বা অন্যান্য সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নড়াচড়া করার বিপরীত। কারণ ব্যক্তি হয়তো তার শরীরের অন্যান্য অঙ্গ নাড়ানোর দ্বারা কোনো বৈধ বিষয়ে উপকার হাসিল করতে পারে; যার লাভ-ক্ষতির দুদিকই সমান। কেননা এর দ্বারা হয়তো সে আরাম বা উপকার পায়, যা তার জন্য বৈধ; আখিরাতেও যার ক্ষতিকর কোনো প্রভাব নেই। আর যে বিষয়ে উপকার নেই, সে বিষয়ে জিহ্বার নড়াচড়া, (অর্থাৎ কথা বলা) অবশ্যই তার জন্য ক্ষতিকর বলে সাব্যস্ত হয়। সুতরাং বিষয়টি নিয়ে ভাবুন।
অঙ্গপ্রত্যঙ্গের দাসত্ব: অঙ্গপ্রত্যঙ্গের পাঁচ প্রকার ইবাদাত বা দাসত্ব আবার পঁচিশ ভাগে বিভক্ত। কারণ মানুষের ইন্দ্রিয় পাঁচটি আর প্রতিটি ইন্দ্রিয়েরই পাঁচ প্রকার ইবাদাত রয়েছে। (এই হিসেবে পাঁচ-পাঁচে পঁচিশ প্রকার হয়।)
শ্রবণ বা শুনতে পাওয়ার সাথে সম্পর্কিত পাঁচ প্রকার ইবাদাত: ওয়াজিব শ্রবণ : আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ বান্দার জন্য যা শ্রবণ করা বাধ্যতামূলক করেছেন তা শোনা; যেমন: ইসলাম, ঈমান ও এ সংশ্লিষ্ট ফরজ বিষয়গুলো শোনা, সালাতে ইমাম সাহেব যখন উচ্চস্বরে কুরআন তিলাওয়াত করেন তা শোনা, (সঠিক অভিমত অনুসারে) জুমুআর খুতবা শোনা।
হারাম শ্রবণ: কুফর ও বিদআতসংক্রান্ত কোনো বিষয় শ্রবণ করা। তবে যদি তা শ্রবণ করার মাঝে কোনো উপকার থাকে, যেমন: তা প্রতিহত করা, কারও বিপক্ষে সাক্ষ্য দেওয়া ইত্যাদি তা হলে তা শ্রবণ করা দোষের কিছু নয়।
এমনিভাবে পরনারীর আওয়াজ ও স্বর শোনা; যা শোনার দ্বারা ফিতনায় পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কোনো প্রয়োজন থাকলে ভিন্ন কথা, যেমন: সাক্ষ্য দেওয়া, লেনদেন করা, ফতোয়া জিজ্ঞাসা করা, মামলা-মোকাদ্দমা করা, চিকিৎসা করা ইত্যাদি।
এমনিভাবে গানবাজনা শোনাও হারাম। তবে যদি এমন জায়গায় থাকে, যেখানে গানের আওয়াজ তার কানে আসে এবং সে শুনতে আগ্রহীও নয়, তা হলে সেখানে কান বন্ধ করে রাখা ওয়াজিব নয়।
মুস্তাহাব শ্রবণ : ইলমি আলোচনা শোনা, কুরআন তিলাওয়াত শোনা, আল্লাহর যিক্র শোনা এবং ফরজ নয় তবে আল্লাহ ভালোবাসেন, এমন সবকিছু শোনা মুস্তাহাব।
মাকরূহ শ্রবণ : মুস্তাহাবের বিপরীত। অর্থাৎ হারাম ছাড়া আল্লাহ যা কিছু অপছন্দ করেন এবং তার ওপর শাস্তি দেওয়ারও কোনো ওয়াদা করেননি, এমন বিষয়াদি শ্রবণ করা।
মুবাহ শ্রবণ : আর মুবাহ বা বৈধ বিষয়টি তো সুস্পষ্ট।
দেখার সাথে সম্পর্কিত পাঁচ প্রকার ইবাদাত: ওয়াজিব দর্শন: কুরআন মাজীদকে দেখা; যখন ওয়াজিব কোনো ইলম শেখার প্রয়োজন হয়, তখন ইলমি কিতাবপত্র দেখা; ব্যক্তি যখন খাওয়ার জন্য, খরচ করার জন্য, ব্যবহার করার জন্য বা অন্য কোনো প্রয়োজনে কোনোকিছুর প্রতি মুখাপেক্ষী হয়, তখন হালাল থেকে হারামকে পৃথক করার জন্য দেখা ইত্যাদি।
হারাম দর্শন: খাহেশাত ও চাহিদার সাথে পরনারীর প্রতি দৃষ্টি দেওয়া। এমনিভাবে খাহেশাত ছাড়াও প্রয়োজন ব্যতিরেকে তাদের দিকে তাকানো; তবে (জরুরি) প্রয়োজন হলে ভিন্ন কথা যেমন: প্রস্তাব-দানকারী, দরদামকারী, লেনদেনকারী, সাক্ষী, বিচারক, ডাক্তার, মাহরাম-এসব পুরুষদের জন্য দেখা বৈধ।
হারাম দৃষ্টির মধ্যে সতরের দিকে দৃষ্টি দেওয়াও শামিল; এটি দুই প্রকার: কাপড়ের ভেতরে থাকা সতর (অঙ্গপ্রত্যঙ্গের দিকে তাকানো) এবং দরজার ওপারে থাকা সতর (নারীদের দিকে তাকানো)।
মুস্তাহাব দর্শন: ইলম ও দ্বীনসংক্রান্ত বইপত্র দেখা; যেগুলো দেখার দ্বারা ঈমান-ইলম বৃদ্ধি পায়, কুরআন শরীফের দিকে তাকিয়ে থাকা, উলামায়ে কেরাম, নেককার ব্যক্তিগণ ও পিতামাতার চেহারার দিকে দৃষ্টি দেওয়া।
মাকরূহ দর্শন : অনর্থক দৃষ্টি দেওয়া; যার মধ্যে কোনো উপকার নেই। কারণ এর দ্বারা ঠিক সেরকম ক্ষতি হয়, যেরকম ক্ষতি হয় অনর্থক জিহ্বা চালানোর দ্বারা। একজন সালাফ বলেছেন, 'নেককার ব্যক্তিরা যেমন অনর্থক এদিক-সেদিক দৃষ্টি দেওয়াকে অপছন্দ করেন; ঠিক তেমনি এদিক-সেদিকের অনর্থক কথাবার্তা বলাকেও তারা অপছন্দ করেন। [৩৯]
মুবাহ দর্শন: যেসব বিষয়াদির প্রতি দৃষ্টি দেওয়াতে দুনিয়া-আখিরাতে কোনো ক্ষতি নেই এবং উপকারও নেই, তা দেখা।
স্বাদগ্রহণ করার সাথে সম্পর্কিত পাঁচ প্রকার ইবাদাত:
ওয়াজিব স্বাদগ্রহণ: জরুরি প্রয়োজন ও মৃত্যুর আশঙ্কা থাকলে খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করা, (এই অবস্থায়) যদি পানাহার না করে মৃত্যু বরণ করে, তা হলে সে গুনাহগার ও নিজেকে হত্যাকারী বলে সাব্যস্ত হবে।
মৃত্যু থেকে বেঁচে যাবে, এমন দৃঢ় বিশ্বাস থাকলে ওষুধ সেবন করা ওয়াজিব। এ ক্ষেত্রে এটিই বিশুদ্ধ মত।
হারাম স্বাদগ্রহণ: মদের স্বাদ নেওয়া, জীবননাশী বিষের স্বাদ নেওয়া, ওয়াজিব সাওম পালন করা অবস্থায় নিষিদ্ধ তিন বস্তু (খাবার, পানীয় ও স্ত্রী সহবাস)-এর স্বাদ নেওয়া।
মাকরূহ স্বাদগ্রহণ: যেমন: সন্দেহজনক বস্তুর স্বাদ নেওয়া, প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ করা, যে স্থানে দাওয়াত করা হয়নি হঠাৎ সেখানে গিয়ে খাবার খাওয়া, প্রতিযোগিতা করে যে খাবারের আয়োজন করা হয় তা খাওয়া, যে আপনাকে খুশি না হয়ে লজ্জায় পড়ে খাবার খাওয়ায়, তার সে খাবারের স্বাদ নেওয়া।
মুস্তাহাব স্বাদগ্রহণ : শারীআত অনুমোদিত যে খাবার আল্লাহর আনুগত্যে শক্তি জোগায়, তা গ্রহণ করা, মেহমানের সাথে খাওয়া; যাতে মেহমান খেতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে এবং তার প্রয়োজন মতো খেয়ে নেয়, যে দাওয়াতে সাড়া দেওয়া ওয়াজিব বা মুস্তাহাব, সেই দাওয়াতে খাবার গ্রহণ করা।
মুবাহ স্বাদগ্রহণ: যে খাবারে হারামের মিশ্রণ নেই বা কোনো গুনাহ নেই, সে খাবার গ্রহণ করা।
ঘ্রাণ নেওয়ার সাথে সম্পর্কিত পাঁচ প্রকার ইবাদাত:
ওয়াজিব ঘ্রাণ: যে ঘ্রাণ দ্বারা হালাল-হারামের মাঝে পার্থক্য করা যায়, সেই ঘ্রাণ গ্রহণ করা; যেমন: যখন ঘ্রাণের মাধ্যমে কোনো বস্তু সম্পর্কে বোঝা যায় যে, তা জীবননাশী বিষ নাকি অন্য কিছু? তার মধ্যে ক্ষতিকর কিছু আছে কি নেই? এমনিভাবে কোনো বস্তু কেনার সময় দাম বা দোষত্রুটি জানার জন্য ঘ্রাণ নেওয়া ইত্যাদি।
হারাম ঘ্রাণ: হাজ্জের ইহরাম অবস্থায় ঘ্রাণ নেওয়া, ছিনতাই করা ও চুরি করা সুগন্ধির ঘ্রাণ গ্রহণ করা। কোনো বেগানা নারীর সুগন্ধি থেকে ঘ্রাণ নেওয়া; (এটি হারাম হওয়ার কারণ হলো) পরবর্তী সময়ে ফিতনায় পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মুস্তাহাব ঘ্রাণ: যে ঘ্রাণ আল্লাহর আনুগত্য করতে সাহায্য করে, শক্তি জোগায়, অন্যান্য ইন্দ্রিয়কে তীক্ষ্ণ করে এবং নফসকে ইলম-আমলে উদ্দীপ্ত করে, তা গ্রহণ করা।
মাকরূহ ঘ্রাণ : জালিম, সংশয়বাদী, ফাসিক ও এই ধরনের ব্যক্তিদের সুগন্ধি থেকে ঘ্রাণ নেওয়া।
মুবাহ ঘ্রাণ: যার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবেও কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই, দ্বীনি কোনো উপকারও নেই এবং শারীআতের সাথে এর কোনো সম্পর্কও নেই-এমন বস্তুর ঘ্রাণ গ্রহণ করা।
স্পর্শ করার সাথে সম্পর্কিত পাঁচ প্রকার ইবাদাত:
ওয়াজিব স্পর্শ: যেমন: স্বামী-স্ত্রীর স্পর্শ; যখন সহবাস করা ওয়াজিব হয়। এমনিভাবে দাসীকে স্পর্শ করা; যখন এর মাধ্যমে তাকে পবিত্র রাখা ওয়াজিব হয়ে পড়ে।
হারাম স্পর্শ: পরনারীর কোনো অঙ্গ স্পর্শ করা।
মুস্তাহাব স্পর্শ: এমন স্পর্শ যার মাধ্যমে দৃষ্টি অবনত রাখা যায়, হারাম থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে এবং স্বামী-স্ত্রী উভয়েই পবিত্র থাকতে পারে।
মাকরূহ স্পর্শ : হাজ্জে ইহরাম অবস্থায় আনন্দ লাভের জন্য স্বামী-স্ত্রীর স্পর্শ করা, এমনিভাবে ই'তিকাফের সময় স্পর্শ করা।
গোসল-করানো-ব্যক্তি ব্যতীত মৃতব্যক্তিকে অন্য কারও স্পর্শ করাও মাকরূহ স্পর্শের শামিল। কারণ মৃত ব্যক্তির শরীর তখন জীবিত ব্যক্তির সতরের ন্যায় হয়ে যায়; তার সম্মানার্থে। আর এ কারণেই একটি অভিমত অনুযায়ী তার শরীরকে লোকচক্ষুর আড়ালে রাখা এবং তার পরিহিত কাপড়েই তাকে গোসল করানো মুস্তাহাব।
মুবাহ স্পর্শ: যে স্পর্শে কোনো প্রকার ক্ষতি ও দ্বীনি উপকারিতা নেই, তা স্পর্শ করা।
স্পর্শের উপরিউক্ত পাঁচটি স্তর হাতের দ্বারা ধরা, পায়ের দ্বারা চলা ইত্যাদির ওপরও প্রয়োগ হবে; যার উদাহরণ অস্পষ্ট নয়।

টিকাঃ
[৩৬] বুখারি, ৩১; মুসলিম, ২৮৮৮।
[৩৭] তিরমিযি, ২৪০৭; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ১১৯২৭।
[৩৮] তিরমিযি, ২৬২৬।
[৩৯] ইবনু কুদামা, আত-তাওয়্যাবীন, ১২৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00