📘 মা কে খুশী করার ১৫০ উপায় 📄 পূর্ণ মনোযোগ ও গুরুত্ব স্থাপন করুন

📄 পূর্ণ মনোযোগ ও গুরুত্ব স্থাপন করুন


মা যখন অসুস্থ হন, তখন আপনার সকল সফর বিলম্ব করুন। সব বন্ধন ও যোগাযোগ বাতিল করুন। শুধু মায়ের প্রতি আপনা পূর্ণ মনোযোগ ও গুরুত্ব স্থাপন করুন।

📘 মা কে খুশী করার ১৫০ উপায় 📄 শেষ আরয

📄 শেষ আরয


প্রিয় ভাইয়েরা! জীবনযাত্রায় মায়ের বেলায় লক্ষণীয় এই একশত পঞ্চাশটি পয়েন্ট। এগুলো নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করুন, যাচাই-বাছাই করুন। তারপর যে ক'টি আপনার জন্য সুসঙ্গত মনে হয়, সে ক'টি আপনি মায়ের সাথে আপনার আচার-ব্যবহার ও লেনদেনের ক্ষেত্রে মিলিয়ে নিন।

আমাদের মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ বিষয়ে আমাদের আদর্শ। যে ব্যক্তি তাঁর জীবনচরিতের পাতা উল্টাতে থাকবেন, তিনি স্বীকার করতে বাধ্য হবেন যে, উন্নত আচার-ব্যবহার প্রয়োগে নবীজী অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। তিনি সবাইকে সম্মান করতেন; গুরুত্ব দিতেন; তাদের সাথে একমত হতেন বা তাদেরকে একমত করতেন; সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলতেন। যার সাথেই নবীজীর কথা হত, সে মনে করত নবীজী তাঁকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। ফলে সেও নবীজীকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসত।

জ্ঞানে-গুণে, মেধা ও প্রতিভায় প্রসিদ্ধ চারজন আরব মনীষার অন্যতম ছিলেন আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আন্‌হু। নিজ গোত্রের নেতা ছিলেন তিনি। ইসলাম গ্রহণের পর যখনই তাঁর সাথে কোন রাস্তায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাক্ষাৎ হত, তখনই তিনি নবীজীর চেহারায় সজীবতা, আনন্দ ও ভালোবাসার নিদর্শন দেখতে পেতেন। যখনই তিনি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোন মাহফিলে শরীক হয়েছেন, তখনই তিনি ইজ্জত, একরাম ও সৌভাগ্যের অভিনন্দন পেয়েছেন। নবীজী তাঁকে সবসময় তাঁর সবচেয়ে প্রিয় নামটি ধরে ডাকতেন।

এই নিপুণ আচরণ, এই অপরিসীম গুরুত্ব, সবসময়ের এই অনুমপম মুচকি হাসির কারণে আমরের ধারণা হয়েছিল, নবীজী হয়তো তাঁকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। তিনি এই বিষয়ে একটু নিশ্চিত হতে চাইলেন। এজন্য তিনি একদিন নবীজীর কাছে এলেন। বসলেন তাঁর কাছে। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রসুলাল্লাহ! আপনার কাছে সবচেয়ে প্রিয় কে? নবীজী জওয়াব দিলেন- আয়েশা। আমর বললেন, না; ইয়া রসুলাল্লাহ! পুরুষদের মধ্য থেকে। আপনার পরিবার নিয়ে প্রশ্ন করিনি। নবীজী বললেন- আয়েশার বাবা। আমর বললেন, তারপর কে? নবীজী বললেন- তারপর উমর ইবনে খাত্তাব। আমর আবার জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কে? নবীজী তখন ইসলাম গ্রহণ ও দীনের জন্য ত্যাগ স্বীকারের বিচারে অগ্রবর্তী কয়েক জনের নাম বলা শুরু করলেন, অমুক; তারপর অমুক...। আমর বলেন, আমি কথা শুনে নীরব হয়ে গেলাম। তার কারণ, নবীজী যদি আমার নাম তালিকার শেষে নিয়ে যান।

দেখুন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আখলাকী নৈপুণ্য প্রয়োগ করে কীভাবে আমরের হৃদয় আচ্ছন্ন করেছেন। নবীজী মানুষকে তাদের মর্যাদা বুঝে সম্মান করতেন। মানুষের জন্য তিনি জরুরী কাজ মুলতবী করে দিতেন। তাদের প্রতি নবীজীর অন্তরে কতটা ভালোবাসা ও সম্মান আছে, সে কথা যাতে তারা উপলব্ধি করতে পারে।

অনেকে মনে করে, মানুষের বিশেষ স্বভাব, যার উপর তারা বড় হয়, যার উপর তাদেরকে অন্যরা চেনে এবং যার উপর ভিত্তি করে তাদের ব্যাপারে অন্যদের কল্পকাঠামো তৈরী হয়, সেটা তাদের জন্য আবশ্যক, এবং সেটা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। ফলে তারা এই স্বভাবের কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং এর উপরই সন্তুষ্ট থাকে। একেবারে সেভাই, যেভাবে আত্মসমর্পণ করতে হয় দেহের উচ্চতা ও গায়ের রঙের কাছে, যেগুলো কখনও বদলানো যায় না।

অবশ্য যারা সচেতন, তারা মনে করেন, স্বভাব পরিবর্তন করা পোশাক পরিবর্তন করার চেয়েও সহজতর। তার কারণ, আমাদের স্বভাবচরিত্র পড়ে যাওয়া দুধের মত নয় যে, তা আর একত্র করা যাবে না। স্বভাব-চরিত্রের বাগডোর তো আমাদের হাতেই। আমরা বরং বিশেষ কিছু পন্থা অবলম্বন করে শুধু মানুষের স্বভাব নয়, তাদের বিবেক পর্যন্ত বদলে দিতে পারি।

ইবনে হাযম তার 'তাওকুল হামামা' নামক গ্রন্থে লিখেছেন, স্পেনে এক প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী ছিল। একবার তার সাথে অন্য চার জন ব্যবসায়ীর বিবাদ সৃষ্টি হয়েছিল। হিংসার বশবর্তী হয়ে তারা নিল সিদ্ধান্ত নিল যে, যেকোন মূল্যে তাকে উচিত শিক্ষা দিবে। একদিন সকালে লোকটি সাদা জামা গায়ে দিয়ে এবং সাদা পাগড়ি মাথায় জড়িয়ে দোকানের উদ্দেশে রওয়ানা হল। সেই চারজন থেকে একজনের সাথে রাস্তায় দেখা হল তার। প্রথমে সে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাল। তারপর পাগড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, এই হলুদ পাগড়িতে আপনাকে চমৎকার মানিয়েছে। ব্যবসায়ী বলল, অন্ধ হয়েছ? এটা তো সাদা পাগড়ি। লোকটি বলল, না; এটি হলুদ। হলুদ, তবে অনেক সুন্দর। ব্যবসায়ী কোন পরওয়া করল না। তাকে ছেড়ে সামনে এগিয়ে চলল। কয়েক কদম এগিয়ে যাওয়ার পরই দেখা হল সেই চারজন থেকে আরেক জনের সাথে। সেও তাকে আগে অভ্যর্থনা জানাল। তারপর পাগড়ির দিকে নজর দিয়ে বলল, আজ আপনাকে খুব সুন্দর লাগছে। লেবাস খুব পরেছেন খুব জুতসই। বিশেষত আপনার এই সবুজ পাগড়িটা। ব্যবসায়ী বলল, আরে ভাই! পাগড়ি তো সাদা। লোকটি বলল, না; জনাব! সবুজ। ব্যবসায়ী বলল, নারে ভাই! সাদা। এখন আমার পথ ছাড়ো; আমাকে যেতে দাও। বেচারা ব্যবসায়ী বিড়বির করতে করতে এগিয়ে চলল। পাগড়িটি সাদা, একথা নিশ্চিত হওয়ার জন্য কাঁধের উপর পড়ে থাকা পাগড়ির শিমলা বারবার দেখল। দোকানে গিয়ে পৌঁছার পর তালা খুলতে লাগল সে। ইতোমধ্যে এসে উপস্থিত হল তৃতীয় জন। সে বলল, বাহ! কতই না সুন্দর আজকের সকাল! বিশেষত আপনার লেবাস ভারী চমৎকার। তবে আপনার এই নীল পাগড়িটা আপনার সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যবসায়ী রং পরখ করার জন্য একবার পাগড়ির দিকে দেখল। তারপর চোখ ডলে দৃঢ়তার সাথে বলল, আরে ভাই! আমার পাগড়ি সাদা; সাদা। লোকটি বলল, না; আসলেই নীল। তবে দুঃচিন্তার কারণ নেই; অনেক সুন্দর লাগছে। একথা বলে সে সালাম করে চলে গেল। তবে ব্যবসায়ী নিশ্চুপ থাকতে পারল না। সে চেঁচিয়ে বলতে লাগল, না, না; আমার পাগড়ি সাদা; আমার পাগড়ি সাদা। সে বার বার পাগড়ির দিকে দেখতে লাগল। নাড়তে থাকল পাগড়ির কোণা ধরে। সে দোকানে একটু বসল; কিন্তু পাগড়ি থেকে নিজের দৃষ্টি ফেরাতে পারল না। এরই মধ্যে চতুর্থ জন দোকানে এসে প্রবেশ করল। সে বলল, স্বাগতম! মা-শা আল্লাহ। এই লাল পাগড়িটি আপনি কোত্থেকে খরিদ করেছেন? এবার ব্যবসায়ী চিৎকার দিয়ে বলল, আমার পাগড়ি তো নীল। না; লাল। না; সবুজ। না; না; সাদা। না; বরং নীল... কালো। এরপর সে হাসল। তারপর আবার চিৎকার দিল। এরপর কাঁদতে লাগল এবং বাইরের দিকে দৌড় দিল।

ইবনে হাযম বলেন, আমি পরবর্তীতে এই লোকটিকে স্পেনের রাস্তায় রাস্তায় পাগল হয়ে ঘুরতে দেখেছি। শিশু-কিশোররা তাকে দেখলে কাঁকর ছুঁড়ে মারত।

দেখুন, কীভাবে এই লোকগুলো তাদের দক্ষতা ও চাতুর্য কাজে লাগিয়ে লোকটির স্বাভাবিক কাজের গতি বদলে দিল; বরং তার দেমাগ বিকৃত করে পাগল বানিয়ে দিল। তা হলে আপনি কেন পারবেন না লেখাপড়া থেকে অর্জিত এবং কুরআন-হাদীসের আলো থেকে প্রাপ্ত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে জীবন সফল করতে? আপনাকে পরামর্শ দিব, সাফল্যের জন্য নৈপুণ্য ও দক্ষতার সমন্বয় করুন। এখন আপনি যদি বলেন, পারি না। তা হলে আমি বলব, চেষ্টা করে দেখুন। আপনি যদি বলেন, এসব পথপন্থা আমি জানি না। তা হলে আমি বলব, শিখে নিন। আমাদের মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস শোনেননি- إِنَّمَا الْعِلْمُ بِالتَّعَلُّمِ، وَالْحِلْمُ بِالتَّحَلُّمِ. ইলম হাসিল হয় শিক্ষার মাধ্যমে; আর ধৈর্য হাসিল হয় অবলম্বনের মাধ্যমে।

পরিশেষে আল্লাহ তাআলার নিকট আবেদন করব, তিনি যেন আমাদেরকে মায়ের সেবা-যত্ন ও তার সাথে সদ্ব্যবহার করার তাওফীক দান করেন এবং আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি ও বাড়াবাড়ি ক্ষমা করেন। আমীন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px