📄 সময় উপযোগী উপহার দিন
প্রতিটি উপযোগী সময়ে 'মা'কে উপযুক্ত উপহার-উপঢৌকন দিন। তাঁর নিকট উপহারটি পেশ করুন পুরোপুরি বাধ্য ও বিনয়ীরূপে। উপযোগী সময় বলতে যেমন ধরুন- দুই ঈদের দিন, ছেলে-মেয়ের বিয়ের দিন, ছেলে-মেয়ের কোন বিষয়ে সফলতা অর্জন বা কৃতকার্য হওয়ার সময়, সফর বা ভ্রমণ থেকে ফিরে এসে, শীতকালের শুরুতে, গ্রীষ্মকালের শুরুতে, কোন রোগ থেকে সুস্থতা লাভের পর ইত্যাদি সময়গুলোতে।
যা যা দিতে পারেন
আপনি যদি একজন চাকরিজীবি হয়ে থাকেন তাহলে আপনার মাকে একটা স্বর্ণের নেকলেস বা চেইন বানিয়ে দিতে পারেন। আপনার মা যদি বোরকা পরে থাকেন তাহলে ভালো দেখে নতুন একটি বোরকা কিনে দিতে পারেন। প্রায় সব মায়েরাই হাতে বালা পরতে পছন্দ করেন। আপনার মাকেও এক জোড়া বালা বানিয়ে দিতে পারেন। কোনো শপিং মল থেকে ভালো একটা হ্যান্ডব্যাগ কিনে দিতে পারেন। শাড়ি বা প্রয়োজনীয় কোনো উপকরণও উপহার দিতে পারেন।
আরও অনেক বেশি ভালো হয় যদি আপনি মায়ের পছন্দের রেসিপিটি নিজ হাতে বানিয়ে মাকে খাওয়াতে পারেন। এর চেয়ে বেশি খুশি তিনি অন্য কিছু পেলেও হবেন না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার করার জন্যেও সন্তানকে আদেশ করেছেন। عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ جَاءَ رَجُلٌ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَنْ أَحَقُّ النَّاسِ بِحُسْنِ صَحَابَتِي قَالَ أُمُّكَ قَالَ ثُمَّ مَنْ قَالَ ثُمَّ أُمُّكَ قَالَ ثُمَّ مَنْ قَالَ ثُمَّ أُمُّكَ قَالَ ثُمَّ مَنْ قَالَ ثُمَّ أَبُوكَ. এক ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমার সদ্ব্যবহারের সবচেয়ে বেশি হকদার কে? নবীজী বললেন- তোমার মা; তোমার মা; তোমার মা। তারপর তোমার বাবা। [সহীহ বুখারী : ৫৯৭১]
যে সকল বিষয় শান্তি বয়ে আনে এবং দুশ্চিন্তা পেরেশানী ও দুঃখ-দুর্দশা দূরে করে, তার মধ্যে অন্যের প্রতি দয়া প্রদর্শন করা ও উপহার প্রদান করা অন্যতম। 'আমি তোমাদেরকে যে রিযিক দান করেছি, তা থেকে ব্যয় কর।' [সূরা বাকারা : ২৫৪] 'যেসব নারী-পুরুষ দান করে।' [সূরা আহযাব : ৩৫] 'যারা আল্লাহর রাস্তায় স্বীয় ধন-সম্পদ ব্যয় করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে এবং নিজেদের মনকে সুদৃঢ় করার জন্যে, তাদের উদাহরণ টিলায় অবস্থিত বাগানের ন্যায়, যাতে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়, অতঃপর তা দ্বিগুণ ফসল দান করে। যদি প্রবল বৃষ্টিপাত না-ও হয়, তবে হাল্কা বর্ষণই যথেষ্ট।' [সূরা বাকারা : ২৬৫] ‘তুমি একেবারে ব্যয়-কুণ্ঠ হয়ো না এবং একেবারে মুক্তহস্তও হয়ো না।’ [সূরা বানী ইসরাঈল : ২৯]
কৃপণ লোকের অবস্থা খুবই শোচনীয়। তারা সর্বদাই অশান্তিবোধ করে। তারা এতটাই সংকীর্ণমনা হয়ে থাকে যে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে যে নেয়ামত দান করেছেন, তাতেও তারা কৃপণতা করে। আল্লাহর রহমতের ভাগ নিতেও তারা ব্যয়কুণ্ঠ। তারা যদি জানতে পারত যে, মানুষকে দান করা কত ফযীলত ও সৌভাগ্যের বিষয়, তা হলে খুব দ্রুতই তারা তাতে প্রতিযোগিতা শুরু করে দিত। 'যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও, তবে তিনি তোমাদের জন্য তা দ্বিগুণ করে দিবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিবেন।' [সূরা তাগাবুন : ১৭] 'যাদেরকে অন্তরের কার্পণ্য থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলকাম।' [সূরা হাশ্র : ৯] 'আর আমি তাদেরকে যে রুজি দান করেছি, তা থেকে তারা ব্যয় করে।' [সূরা বাকারা : ৩]
এক কবি বলেছেন-
'আল্লাহ তাআলা যা কিছু দান করেছেন, তা থেকে খরচ কর। ধন-সম্পদ ধার দেওয়া বস্তু। তোমার জীবন একদিন শেষ হয়ে যাবে। ধন-সম্পদ পানির মতো। যদি তার গতিপথ রোধ করে দাও, তা হলে পানি নষ্ট হয়ে যাবে। আর যদি তাকে তার আপন গতি চলতে দাও, তা হলে তা নির্মল ও স্বচ্ছ থাকবে।'
বিখ্যাত দানবীর হাতেম তাঈ তার স্ত্রীকে প্রতিদিন বলতেন- 'মেহমানদের মেহমানদারীর জন্য অপেক্ষা কর। অপেক্ষা করে দেখ কোনো ক্ষুধার্ত-পিপাসার্ত মুসাফির আসে কি না।' তিনি আরও বলতেন- 'যখন তুমি খাবার প্রস্তুত কর, তখন একজন মেহমানও খুঁজে এনো। কেননা, আমি তা একাকী খাব না।' নীচের কবিতায় তিনি তার দর্শন ব্যক্ত করেছেন এভাবে- 'আমাকে এমন একজন দানশীল ব্যক্তি দেখাও, যিনি [দান করে অভাবে পড়ে না খেয়ে] সময়ের আগেই মারা গেছে। অথবা এমন একজন কৃপণ লোক দেখাও, যে [দান না করে, বরং ধন-সম্পদ জমা করে] চিরজীবী হয়েছে। তা হলে আমার অন্তর শান্তি পাবে।'
যার অন্তর তাকদীরের ফায়সালার প্রতি পরিপূর্ণ সন্তুষ্ট থাকবে, আল্লাহ তাআলা তার অন্তরকে শান্তি, নিরাপত্তা, অল্পেতুষ্টি ও ধনাঢ্যতা দিয়ে পরিপূর্ণ করে দিবেন; তার অন্তরকে স্বীয় মহব্বত, অনুরাগ ও তাওয়াক্কুলের জন্য একনিষ্ঠ করে দিবেন। পক্ষান্তরে যার অন্তর তাকদীরের ফায়সালার প্রতি অসন্তুষ্ট থাকবে, তার অন্তরকে সুখ, শান্তি, সৌভাগ্য ও সফলতার বিপরীতমুখী গুণাবলি দিয়ে ভরে দিবেন।
📄 একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দিন
মায়ের জন্য একটি ব্যাংক একাউন্ট খুলুন। সে একাউন্টে সকল ছেলে প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যায় টাকা রাখবে। যাতে করে এই নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকার মাধ্যমে মায়ের প্রয়োজনগুলো পুরা করা যায়, আবশ্যকীয় বস্তুসমূহ ব্যবস্থা করা যায়। যেন কোন প্রয়োজন পুরা করতে সন্তানদের থেকে টাকা চাইতে না হয়।
মা যদি কোন চাকরিজীবীও হন, তবুও তাঁর সেবার জন্য এ পদ্ধতিতে কাজ করা চাই। কেননা, মা এটা দেখতে পছন্দ করেন যে, তাঁর ঐ পরিমাণ টাকার প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও সন্তানেরা তাঁর খেদমতের জন্য কতটুকু ভূমিকা পালন করে।
📄 বয়সের প্রতি খেয়াল রেখে আচরণ করা চাই
'মা' কথাটি ছোট, কিন্তু এর পরিধি ব্যাপক ও বিস্তৃত। 'মা' ডাকের চেয়ে মধুর নাম পৃথিবীতে আর কিছুই নেই। মহান আল্লাহ তায়ালা 'মা' সৃষ্টি করেছেন বিশেষ গুণ ও সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মান দিয়ে। 'মা' হচ্ছেন একজন সন্তানের পৃথিবীতে আসার উৎস, অস্তিত্ব ও বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। 'মা' শব্দটির কোনো বিকল্প নেই একজন সন্তানের কাছে। সন্তান জন্ম নিয়েই সর্বপ্রথম পৃথিবীতে মাকে কাছে পায়। মায়ের মন তখন ভরে ওঠে অনাবিল আনন্দে ও শান্তিতে। 'মা' তাঁর আদর-স্নেহ, মায়া-মমতা ও ভালোবাসা দিয়ে বুকে জড়িয়ে নেন। 'মা' হচ্ছেন তিনি যিনি অন্য সবার স্থান পূরণ করতে পারেন, কিন্তু মায়ের স্থান কেউ পূরণ করতে পারে না। এজন্য বলা হয় সৃষ্টির সেরা উপহার 'মা'।
সন্তানদের জন্য সমীচীন হচ্ছে মায়ের জীবনে বয়সের বিভিন্ন স্তর বুঝতে চেষ্টা করা। বয়সের যে স্তরে যে ধরনের আচার-ব্যবহার তাঁর জন্য প্রয়োজন সে ধরনের আচার-ব্যবহার করা। কোন অবস্থাতেও তাঁকে কষ্ট না দেওয়া। মা-বাবাকে কষ্ট দেওয়া মারাত্মক গুনাহ। আল্লাহ তায়ালা মা-বাবার হকসমূহকে নিজের হকের অনুগামী করেছেন। তিনি বলেছেন, 'তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে তাঁকে ছাড়া অন্য কারো এবাদত করো না এবং মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার করো।' [সূরা ইসরা : ২৩] তিনি মা-বাবার শোকরকে নিজের শোকরের সাথে যুক্ত করেছেন। বলেছেন, 'আমার প্রতি ও তোমার মা-বাবার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। অবশেষে আমারই নিকট ফিরে আসতে হবে। [সূরা লুকমান : ১৪] মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার উভয় জাহানের কামিয়াবীর রাস্তা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'রিযিক বৃদ্ধি পেলে এবং হায়াত বৃদ্ধি পেলে যে খুশি, সে যেন রক্তের সম্পর্ক (যথাযথভাবে) বজায় রাখে। [সহীহ বুখারী : ৫৯৮৫] রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাশরের ময়দানে অবাধ্য সন্তানের পরিণতির কথা বয়ান করেছেন। আল্লাহ তায়ালা তার দিকে তাকাবেন না।
📄 কথা নির্বাচনে আগ্রহী হোন
মায়ের সাথে কথা বলার পূর্বে কোন কোন শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করবেন বা কোন কথাটা বলবেন, তা নির্বাচন করে নেওয়ার প্রতি আগ্রহী হোন। যাতে করে আপনার মুখ থেকে এমন কোন বাক্য বা কথা বের হয়ে না যায়, যা শুনে আপনার মা কষ্ট পান। কারণ, কুরআনে কারীমে উহ শব্দটি পর্যন্ত বলতে নিষেধ করা হয়েছে। সুতরাং এর চেয়ে জটিল কিছু বলে কিভাবে মা জননীকে কষ্ট দিবেন, বলেন? আয়াতে তাঁদেরকে উহ-ও বলবে না। এখানে উহ শব্দটি বলে এমন শব্দ বোঝানো হয়েছে, যদ্বারা বিরক্তি প্রকাশ পায়। এমনকি, তাঁদের কথা শুনে বিরক্তিবোধক দীর্ঘশ্বাস ছাড়াও এর অন্তর্ভুক্ত।
হযরত আলী রাযি. বর্ণিত এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, পীড়া দানের ক্ষেত্রে উহ বলার চাইতেও কম কোন স্তর থাকলে তাও অবশ্য উল্লেখ করা হত। (মোটকথা, যে কথায় মা সামান্য কষ্ট হয়, তাও নিষিদ্ধ।) বরং মার সাথে সম্প্রীতি ও ভালবাসার সাথে নম্র স্বরে কথা বলতে হবে। হযরত সাইদ ইবনে মুসাইয়্যিব বলেন, যেমন কোন গোলাম তার রূঢ় স্বভাবসম্পন্ন প্রভুর সাথে কথা বলে। তার সামনে নিজেকে অক্ষম ও হেয় করে পেশ করবে; যেমন গোলাম প্রভুর সামনে।