📄 অন্তর থেকে তেলাওয়াত করুন
এখন আমরা আল-ফাতিহা শেষ করে কুরআন মজিদ তেলাওয়াত করছি। আপনি কি কখনো এ বিষয়ে চিন্তা করেছেন যে, আমরা দাঁড়ানো অবস্থায় কেন কুরআন শরিফ তেলাওয়াত করছি? নামাজের অন্য হালতে ফাতিহা বা কুরআন শরিফ তেলাওয়াত কেন করি না? যেমন রুকু, সেজদা কিংবা অন্য কোনো অবস্থায়?
দাঁড়ানোর অবস্থাটা প্রত্যেক মুসলমানের মর্যাদাপূর্ণ, গাম্ভীর্যপূর্ণ এবং আদবপূর্ণ। কুরআনের কালামও সবচেয়ে সম্মানি, গাম্ভীর্যপূর্ণ ও আদবপূর্ণ তাই তাকে সবচেয়ে মর্যাদাশীল ও আদবপূর্ণ অবস্থায় পড়া চাই। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, তাঁকে রুকু ও সিজদা অবস্থায় কুরআন শরিফ তেলাওয়াত করতে নিষেধ করা হয়েছে। কুরআন আল্লাহ পাকের কালাম, যা অত্যন্ত উঁচুমানের তাই তাকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে পাঠ করা অধিক শ্রেয়।
তবে জানি না, আমরা কতবার মনোযোগ ছাড়া, অনুভূতিহীন অবস্থায় এবং তার মর্যাদাপূর্ণ শব্দসমূহ বোঝা ছাড়া তেলাওয়াত করেছি? আমাদের মধ্যে অনেকেই এমন আছেন, যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, যা তেলাওয়াত করা হলো এতে আল্লাহ তাআলা কী কী নিষেধ করেছেন এবং কী কী আদেশ করেছেন? তো আমাদের পক্ষ থেকে এর কোনো সঠিক উত্তর আসবে না। আমাদের তো খেয়ালই থাকে না যে ইমাম সাহেব কী পড়ছেন। তিনি হয়তো জান্নাত-জাহান্নামের বিষয় পড়ছেন। আর আমরা চিন্তা করছি খানা-পিনার বিষয়। যদি কোনো শক্তিশালী বাদশার ঐতিহাসিক ইন্টারভিউ আমাদের থেকে নেয়া হয়, আমরা তাতে কত অধিক মনোযোগ দেবো? শুধু কান দিয়ে শুনব না, বরং অত্যন্ত মনোযোগের সাথে তাতে লেগে যাবো। কেন আমরা তাতে এত বেশি হারিয়ে যাবো? সম্ভবত তাঁর প্রত্যেকটি কথা স্মরণ রাখার চেষ্টা করবো। তবে যখন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা নামাজে আমাদের সাথে কথোপকথন শুরু করেন, তখন কেন এত অবহেলা?
আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا. এরা কুরআনে গভীর চিন্তা করে না, এদের অন্তরে তালা লেগে গেছে।
এ কথা আলোচনা করা হয়েছে যে, আমাদের মধ্যে যদি আন্তরিক একাগ্রতা না থাকে, তাহলে অন্তরে আল্লাহ পাকের বাণীর কোনো প্রতিক্রিয়া হবে না। মনে রেখ, এটা কোনো বড় বিষয় নয় যে, আমরা কুরআন পড়ি, বরং চূড়ান্ত উৎকর্ষতা হলো যে, আমরা কতটা একাগ্রতার সাথে পড়ি এবং উপদেশ গ্রহণ করি? একবার নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি আয়াত বার বার পাঠ করতে করতে, কেঁদে কেঁদে রাত কাটিয়ে দিয়েছেন। আয়াতটি হলো-
إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ.
আপনি যদি তাদেরকে শাস্তি দেন, তবে তারা আপনার বান্দা এবং যদি আপনি তাদেরকে ক্ষমা করেন তবে আপনিই পরাক্রান্ত, মহাবিজ্ঞ।
সুতরাং, আমাদের উচিত মনোযোগ সহকারে পড়া। এ বিষয় কল্পনা করে যে, আল্লাহ আমাদের সাথে কথা বলছেন, আর আমরাও আল্লাহর সাথে কথা বলছি। তবে, আমরা কীভাবে বুঝাবো যে, কোন আয়াতে কী ধরনের অনুভূতি গ্রহণ করা চাই? আল্লামা ইবনুল কায়্যিম রহ. আমাদেরকে এরূপ কিছু মৌলিক নিয়মনীতি বাতলে দিয়েছেন, যা আমাদেরকে পথ দেখাবে। যদিও আমরা উক্ত আয়াতের পূর্ণ তাফসির সম্পর্কে অবগত না হই। তিনি বলেন-
■ যদি কোনো আয়াত তোমাদের প্রতি আল্লাহ পাকের অনুগ্রহের বর্ণনা করে তাঁর নাম ও সিফাতের মাধ্যমে, তবে তোমাদের অন্তর মহব্বত দ্বারা পূর্ণ হয়ে যাওয়া চাই।
■ যদি কোনো আয়াত আল্লাহ পাকে রহমত, ক্ষমা এবং জান্নাতিদের আলোচনা করে, তবে তোমাদের অন্তর আনন্দ, প্রশান্তি এবং আশা-আকাঙ্ক্ষা দ্বারা ভরে যাওয়া চাই।
■ যদি কোনো আয়াত আল্লাহ পাকের গোস্বা, শাস্তি, ধ্বংসপ্রাপ্ত সম্প্রদায়ের আলোচনা করে, তবে তোমাদের অন্তর ভয় ও পেরেশানি দ্বারা ভরে যাওয়া উচিত।
■ সুতরাং আল্লাহর কালাম পড়ার সময় আমাদের অন্তরে সর্বদা মহব্বত, আশা এবং ভয়ের অবস্থা সৃষ্টি হওয়া চাই। কুরআন আমাদের জ্ঞানের চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে।
لَوْ أَنْزَلْنَا هَذَا الْقُرْآنَ عَلَى جَبَلٍ لَرَأَيْتَهُ خَاشِعًا مُتَصَدِّعًا مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ وَتِلْكَ الْأَمْثَالُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ.
যদি আমি এই কুরআন পাহাড়ের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি দেখতে যে, পাহাড় বিনীত হয়ে আল্লাহ তাআলার ভয়ে বিদীর্ণ হয়ে গেছে। আমি এসব দৃষ্টান্ত মানুষের জন্য বর্ণনা করি, যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে।
টিকাঃ
২১. সুরা মুহাম্মদ: ২৪।
২২. সুরাতুল মায়িদা: ১১৮।
২৩. সরা হাশর: ২১।
📄 নিজের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন পূরণ করবো
আমি আমার কেরাত পূর্ণ করেছি। এখন কিছুক্ষণ থেমে আল্লাহু আকবার বলে রুকুতে যাবো। সুতরাং এখন সময় হচ্ছে এলোমেলো মনকে পুনরায় স্থির করার। মনে মনে কল্পনা করতে হবে যে, আমরা এখানে জমিনে নামাজের জন্য দাঁড়িয়েছি, আর আল্লাহ তাআলা আমাদরেকে সাত আসমানের উপর থেকে দেখছেন। তাই আমাদের নামাজ সুন্দর হওয়া চাই। বিশেষত রুকু, কেননা আল্লাহ তাআলা সুন্দর, সৌন্দর্যকে তিনি পছন্দ করেন। আজ আমাদের সাক্ষাত মহান আল্লাহ পাকের সাথে হবে। তাই আসুন আমাদের নামাজকে অধিক সুন্দর ও পরিপূর্ণ করি।
sُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ. আমার রব মহান (সকল দোষ থেকে) পবিত্র।
নিজের হাত দ্বারা হাঁটু ধরুন, আঙুলগুলো ফাঁকা থাকবে, পিঠ, মাথা, নিতম্ব বরাবর থাকবে। শরীরের প্রত্যেক জোড়া আপন স্থানে আসা পর্যন্ত এ অবস্থায় নিজেকে স্থির রাখবে। سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ এর মাঝে বিদ্যমান সত্তার প্রতি গভীর মনোযোগ দিবে। এটা আল্লাহ পাকের সাথে মহব্বত সৃষ্টির উপায়। তিনিই আমাদের রব, যিনি আমাদেরকে আপন দয়ায় বড় করেছেন, কাপড় পরিয়েছেন, খাইয়েছেন এবং সুস্থতা দান করেছেন। অন্তর থেকে বের করুন سُبْحَانَهُ অর্থাৎ ওই সত্তা, যিনি সকল দোষ-ত্রুটি থেকে পবিত্র।
সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম (سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ) এভাবে যখন দ্বিতীয় এবং তৃতীয়বার বলবে, তখন আপনার অন্তর মহব্বত ও একনিষ্ঠতায় ভরপুর হয়ে যাবে। তাঁর বড়ত্বকে অনুভব করুন, তাঁর সর্বময় ক্ষমতাকে স্মরণ করুন, হে প্রতিপালক! আমার সকল আশা-ভরসা তোমারই সাথে সম্পৃক্ত করছি।
আমরা অনেকে নামাজের এই অংশটুকু মেশিনের মতো দ্রুত আদায় করি। ফলে না কোনো অনুভূতি সৃষ্টি হয়, না আল্লাহর সাথে কোনো বন্ধন। যেমনটা হয়ে থাকে কেরাত ও সেজদায়। অথচ রুকু ইবাদতের বিশেষ অংশ। আমাদের রবের প্রতি আমাদের দাসত্বের প্রমাণ। যাতে রয়েছে উচ্চ পর্যায়ের অক্ষমতা ও নম্রতার অনুভূতি। ওই সময়ের আরবরা বিষয়টি জানতেন এবং তাদের মধ্যে অহংকারীরা এর কঠিন বিরোধিতা করত। এক ব্যক্তি নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আবেদনও করেছেন যে, সে রুকু না করে সরাসরি সেজদায় চলে যাবেন।
আমাদের প্রত্যেকেরই একটা ব্যক্তিগত খায়েশ থাকে, ইচ্ছা থাকে। কারও এ খায়েশ যে, সকলে আমাকে মহব্বত করবে। কারও কিছুক্ষণ একাকিত্ব হাসিল হওয়া। কারও খায়েশ সারা দিন কঠিন পরিশ্রমের পর যখন ঘরে যাবো, তখন সেখানে আমার জন্য কেউ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করবে। আবার কারও এ কামনা যে, সন্তানদের সাথে সময় কাটাবো এবং তাদেরকে আদর যত্ন করবো। কারও এ চাহিদা যে, সুন্দর সুন্দর উপাধি পাবো ইত্যাদি। যখন উক্ত মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয় না, তখন আমাদের মাঝে এক ধরনের হতাশার অবস্থা সৃষ্টি হয় এবং সারাদিন খারাপ হয়ে যায়। বারবার বিস্বাদময় কথা বলি ও মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, কিন্তু জানি না এরূপ কেন হচ্ছে। কারণ আজ আমাদের নিজস্ব আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি।
এক গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনে আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। যা আমাদের সকল প্রয়োজনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। উক্ত প্রয়োজন পূরণার্থে এক সময় মানুষ অনেক বস্তুর পূজা করত। যেমন- সূর্য, চাঁদ, প্রাণী, বানর, সাপ, বিজ্ঞান এমনকি আপন প্রবৃত্তিরও পূজা করত। সে জন্য তাদের শক্তি ও সম্পদ উজাড় করে দিত। এ উদ্দেশ্য পুরা হওয়া চাই, কিন্তু এ উদ্দেশ্য ওই পর্যন্ত পুরা হবার নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত সত্যিকার ইলাহের ইবাদত না করা হয়। আর নামাজ উক্ত উদ্দেশ্য পূরণে সক্ষম, যার মধ্যে রুকু হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ রুকন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং আমাদের পূর্বসূরী বুজুর্গগণ রুকুতে এত শান্তি ও মজা পেত যার কারণে তারা রুকুকে এত দীর্ঘ সময় ব্যয় করতেন, যেমন কিয়ামকে দীর্ঘ করে থাকেন। এক সাহাবি বলেন, আমি নামাজে সুরা ফাতিহার পর সুরা বাকারা, আলে ইমরান, সুরা নেসা তারপর সুরা মায়েদাও পড়েছি অথচ এ পর্যন্ত আমার নিকট আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাযি. রুকুতেই ছিলেন।
একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে নামাজে তাড়াহুড়া করতে দেখেন যে রুকু, সেজদা খুব দ্রুত করছে। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যদি এ ব্যক্তি এ অবস্থায় মারা যায় তবে তার মৃত্যু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দীনের উপর হবে না। তাই আমাদের রুকু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তরিকা মতো অত্যন্ত ধীরস্থিরতার সাথে আদায় হওয়া চাই। দুনিয়ার জীবন কষ্ট ক্লেশে ভরা যেখানে একদিন খুশির হাসি আরেক দিন দুঃখের কান্না। তার প্রয়োজনাদি ও ব্যস্ততা আমাদেরকে ক্লান্ত করে রাখে।
নামাজের চেয়ে বড় আর কোনো জিনিস আছে যা এ দুনিয়ার ক্লান্ত দূর করতে পারে? নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, ঠিক মতো রুকু আদায় করে না তার দৃষ্টান্ত ওই ব্যক্তির মতো যে অনেক কষ্ট করে এক দুইটি খেজুর খাবার জন্য পায় যা তার ক্ষুধা নিবারণ করতে পারে না। আসুন আমরা নিজেদের আরাম ও শান্তি রুকু ও সেজদায় তালাশ করি। আমরা দিনে ১৭ বার আল্লাহর দরবারে ঝুঁকি; পাশাপাশি সে অনুযায়ী আল্লাহর মহব্বতও বৃদ্ধি পাওয়া চাই। আর আপনি যখন তাঁকে মহব্বত করবেন তো তিনি এর চেয়েও অনেক বেশি আপনাকে মহব্বত করবেন। কেননা তিনি অত্যধিক দয়ালু ও দাতা। আর আপনার খালেক যখন আপনাকে মহব্বত করে তবে কে আপনাকে কষ্ট পৌঁছাবে?
📄 নামাজের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভের প্রস্তুতি
আমরা নামাজের সবচেয়ে সৌন্দর্যপূর্ণ মুহূর্ত রুকু অতিক্রম করেছি। রুকু হলো সেজদার অগ্রদূত। আনুগত্যের এক পদ্ধতি হতে আরেক পদ্ধতির দিকে প্রত্যাবর্তন। আনুগত্যের দিক থেকে যা সবচেয়ে পরিপূর্ণ। তবে আমরা সেজদায় যাওয়ার আগে নামাজের আরেক সুন্দর অবস্থায় প্রবেশ করি; তা হলো রুকু থেকে দাঁড়িয়ে স্থির হওয়া। নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ ওই ব্যক্তির নামাজের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন না, যে সেজদায় যাওয়ার পূর্বে সোজা হয়ে দাঁড়ায় না। তাই যে স্থিরতা ও প্রশান্তি আমরা নামাজের অন্যান্য অবস্থায় গ্রহণ করি, এখানেও তা করতে হবে। দেহের অঙ্গ ও জোড়াসমূহ যথাস্থানে আসতে দিতে হবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনটাই করতে বলেছেন। তিনি ইরশাদ করেন, সবচেয়ে নিকৃষ্ট চোর হলো, যে তার নামাজে চুরি করে (অর্থাৎ তাড়াহুড়া করে আদায় করে)। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রুকুর পর ওই পরিমাণ দাঁড়াতেন, যে পরিমাণ রুকুতে দেরি করতেন।
سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ. আল্লাহ তাআলা শুনেছেন, যে তাঁর প্রশংসা করেছে।
এবার যখন দাঁড়াই তো আল্লাহু আকবার না বলে سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ বলি কেন? স্মরণ করুন, আমি কী বলেছিলাম? আপন মালিকের সামনে যাওয়ার প্রত্যেক দুআ তার সঠিক পদ্ধতি ও তারতিব অনুযায়ী হওয়া চাই; যার শুরুতে প্রশংসা ও বড়ত্বে বর্ণনা থাকা চাই, স্মরণ এসেছে? যে ভাবে সুরাতুল ফাতিহায় صِرَاطَ الْمُسْتَقِيمِ এর দুআ চাওয়ার পূর্বে প্রশংসা করা হয়েছিল। এখানেও তদ্রূপ করা চাই। যেহেতু এখন আমরা নামাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ সেজদার দিকে অগ্রসর হচ্ছি, যেখানে আমরা আল্লাহ পাকের অধিক নিকটবর্তী হতে পারব। আর যখন সবচেয়ে বেশি দুআ কবুল হয়। তাই سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ আমাদেরকে এ বিষয়ে ইঙ্গিত করে যে, দুআর পূর্বে আল্লাহ পাকের প্রশংসা বর্ণনা করো। অতঃপর রুকু থেকে দাঁড়ানোর পর উক্ত ইঙ্গিতে বলি-
رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ. حَمْداً كَثِيراً طَيِّباً مُبَارَكاً فِيهِ.
হে আমাদের প্রতিপালক! তোমার জন্যই সকল প্রশংসা, সর্বাধিক ও উত্তম প্রশংসা, যাতে বরকত রয়েছে।
আমরা আমাদের প্রশংসার শুরু رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ -এর দ্বারা করছি, যার অর্থ হে আমাদের প্রতিপালক! সর্বপ্রকার প্রশংসা তোমারই জন্য। আমরা সামনে حَمْداً كَثِيراً طَيِّباً مُبَارَكاً فِيهِ -ও বাড়াতে পারি। একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজ পড়াচ্ছিলেন, যখন হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ তখন হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবাদের একজন উপরোক্ত বাক্য حَمْداً كَثِيراً طَيِّباً مُبَارَكاً ফিয়ে ফিয়ে বৃদ্ধি করলেন। যখন নামাজ শেষ হলো, তো হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের প্রতি মনোযোগী হয়ে বললেন, তোমাদের মধ্য হতে এ শব্দগুলো কে বলছিলে? তিনি উত্তর দিলেন, আমি বলেছিলাম হে রাসুল! নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমি দেখেছি যে ত্রিশের কাছাকাছি ফেরেশতা তার সওয়াব লেখার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লেগে গেছেন।
আমরা একটু অগ্রসর হয়ে উপরোক্ত দুআও পড়তে পারি-
মিল্লাস সামাওয়াতি ওয়া মিল্লাল আরদ্বি ওয়া মিল্লা মা বাইনাহুমা ওয়া মিল্লা মা শিইতা মিন শাইয়িন বাদু (مِلْءَ السَّمَوَاتِ وَمِلْءَ الْأَرْضِ وَمِلْءَ مَا بَيْنَهُمَا وَمِلْءَ مَا شِئْتَ مِنْ شَيْءٍ بَعْدُ.)
প্রশংসা যা আসমান ভরে দেয়, জমিন ভরে দেয় এবং এ উভয়ের মাঝে প্রত্যেক বস্তুকে ভরে দেয় এবং প্রত্যেক ওই বস্তুকে, যা আপনি চান।
এ দুআতে مَا شِئْتَ مِنْ شَيْءٍ بَعْدُ 'যা আপনি চান'-এর দ্বারা উদ্দেশ্য ওই সকল মাখলুকাত যা আমাদের চিন্তার ঊর্ধ্বে যেমন আরশ, কুরসি ইত্যাদি অথবা যে বিষয়ে জ্ঞান এখনো আমাদের হয়নি। উক্ত শব্দসমূহ দ্বারা আমরা আমাদের খালেকের তুলনায় আমাদের স্বল্পজ্ঞানের স্বীকৃতি দিচ্ছি। নামাজে আলাদা শব্দে বিভিন্ন দুআ আমাদের মনোযোগ নিবদ্ধ করতে সাহায্য করে। আসুন আমরা 'হামদ' বর্ণনা করি এবং করতেই থাকি। তবুও আল্লাহ তাআলার প্রশংসার হক আদায় করতে পারব না। কেউ তাঁর প্রশংসার হক আদায় করতে পারবে না এবং তাঁর তারিফের পূর্ণ জ্ঞান কারও নেই একজন ছাড়া। আপনি কি জানেন তিনি কে? তিনি হলেন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা, যিনি আপন শান অনুযায়ী হক আদায় করে নিজের প্রশংসা করতে পারেন। আল্লাহ তাআলার এমন অনেক গুণাবলী রয়েছে, যার জ্ঞান কোনো মাখলুক বা মানুষের নেই। শুধু আল্লাহ পাকেরই রয়েছে। তার বড়ত্ব আমাদের বিবেক-বুদ্ধির অনেক ঊর্ধ্বে।
টিকাঃ
২৪. মুআত্তা মালেক: ২/২৯৫।
২৫. আবু দাউদ: ১/১২৯।
📄 প্রকৃত আনন্দ কীভাবে অর্জিত হবে
আমরা আমাদের রুকু পূর্ণ করে দাঁড়িয়েছি। এখন আমরা নামাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুকন আদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছি। এ রুকন আমাদের নামাজের আকর্ষণীয় সমাপ্তি। পূর্বের সব রুকন এ রুকন পর্যন্ত পৌঁছার মাধ্যম ছিল। সমাপ্তির মূল লক্ষ্য সেজদা। সেজদার কী অর্থ? আমাদের অধিকাংশই বছরের পর বছর ধরে মেশিনের ন্যায় দ্রুত সেজদা আদায় করি। তাই তার প্রকৃত ফলাফল হতে অজ্ঞ রয়ে গেছি। নামাজের কোনো রুকন আদায়ে আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত মজা পাবো না, যতক্ষণ না ইখলাসের সাথে আদায় করব। সেজদা আপন খালেকের দরবারে দাসত্বের বড় প্রমাণ। যা পূর্বে আলোচনা হয়েছে। এটা এরূপ যে, আমরা আপন রবকে জিজ্ঞাসা করছি, হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমার কাছে কী চান? আমরা আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু আপনাকে দিচ্ছি, আমি নিজের সবচেয়ে দামি ও সম্মানী বস্তু আপন চেহারাকে সবচেয়ে নিচু স্থানে রেখে দিয়েছি। হে প্রতিপালক! শুধু আপনার জন্য আমার সবকিছু বিসর্জন দিচ্ছি।
সেজদা, প্রকৃত আনন্দ ও প্রশান্তি লাভের এক সূক্ষ্ম ভেদ। তা কীভাবে? একটু ভাবুন, সীমাহীন আনন্দের স্থান হলো জান্নাত, তা কোথায়? সাত আকাশের উপর, আল্লাহ পাকের নিকট। জাহান্নাম যেটা অনেক মসিবতের স্থান, তা কোথায়? সম্পূর্ণ নিচে আল্লাহ তাআলা হতে অনেক দূরে। জান্নাতের দরজা বদকারের জন্য কখনো খোলা হবে না। সবচেয়ে উচ্চ মর্যাদার জান্নাত কোনটি? যা সর্বোচ্চ শান্তির স্থান। উক্ত স্থানকে الفردوس الأعلى বলা হয়। যা আম্বিয়ায়ে কেরামের স্থান। যার ছাদ আল্লাহ পাকের আরশ। এটা জান্নাতের সবচেয়ে উঁচু স্থান, আল্লাহ পাকের খুব কাছেও। সহজ কথা হলো ওখানে অবস্থানকারীরা স্বয়ং আল্লাহ তাআলার পড়শী।
এখন একটু চিন্তা করুন, নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কায় সবচেয়ে বেশি কঠিন সময় অতিক্রম করেন, যেখানে সীমাহীন চিন্তা ও অক্ষমতা অনুভব করছিলেন, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁকে কীভাবে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন এবং তাঁর উৎসাহ বৃদ্ধি করেছেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে নিজের কাছে ডাকলেন এবং উক্ত মুহূর্তগুলো সর্বদার জন্য নির্দিষ্ট করে দিলেন। মেরাজের রাত্রিতে তিনি তাঁর রবের এত নিকট পৌঁছলেন, যা কোনো মানুষের জন্য সম্ভব নয়। আজও যখন কোনো বস্তু, কোনো শব্দ বা কোনো আমল খুশির কারণ হয়, তবে এ দুআ শেখানো হয়, সকল ভালো শব্দ ও ভালো আমল তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন করে তিনিই সর্বোচ্চ।
সুতরাং প্রকৃত শান্তি কোথায়? তা উপরে আল্লাহ তাআলার কাছে। তার নিয়ম এরূপ যে, যত বেশি আল্লাহ তাআলার নৈকট্যশীল হবে তার আধ্যাত্মিক শক্তিও ওইরূপ বৃদ্ধি পাবে। শান্তিও বৃদ্ধি পেতে থাকবে। আমরা এ শান্তির উচ্চ মর্যাদা কীভাবে লাভ করব? আমাদেরকে উপরওয়ালার নিকটবর্তী হতে হবে। আমরা এটা কীভাবে করতে পারব? নিজেকে তাঁর সামনে ছোট করে। এ হাদিস একটু স্মরণ করুন- যে আল্লাহর সামনে নিজেকে ছোট করবে আল্লাহ তাকে উচ্চ মর্যাদা দান করবেন। তার আনন্দ বৃদ্ধি করবেন। এ হাদিসটিও একটু চিন্তা করুন- বান্দা আপন রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী হন সেজদার অবস্থায়। আল্লাহ তাআলা সুরাতুল আলাকের শেষে বলেন, সেজদা করো, আল্লাহর নিকটবর্তী হও।
আপনার কি বুঝে এসেছে যে, আপনি সারাজীবন কী করেছেন? আপনার প্রতিটি সেজদায় আপনার রবের নিকটবর্তী হওয়ার চেষ্টা করুন। আপনার দেহ তো জমিনে পড়ে থাকে, কিন্তু রূহ রবের কাছে উপরে উঠছে। যেন রবের নিকটবর্তী হওয়া যায়। নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, বেশি বেশি সেজদা করো, কেননা কোনো মুসলমান যখনই সেজদা করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন এবং তার একটি গুনাহ মাফ করেন। এমনকি সে উচ্চ মর্যাদা লাভ করে ফেলে। অর্থাৎ জান্নাতুল ফেরদাউস লাভ করে। যাকে আল্লাহর আরশ বেষ্টন করে আছে। যা আমাদের প্রিয় নবি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্থান।
একটি প্রমাণ দেখুন। একদা রবি বিন কাআব রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওজুর পানি আনলেন। তখন হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, কিছু চাও, উত্তরে রবি রাযি. বললেন, আমি জান্নাতে আপনার সাথী হতে চাই। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অন্য কিছু চাও। রবি রাযি. বললেন, আমি শুধু এটাই চাই। তখন হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বেশি বেশি সেজদা করে আমাকে সাহায্য করো। এখন বুঝুন যে, আপনি আপনার ইমানি মর্যাদা উঁচু হতে উচ্চতর করার জন্য আপন সত্তাকে সর্বনিম্নে আনা আবশ্যক। আর আপনার দেহ যখন সেজদা করে, তখন এ বিষয়ের কল্পনা করবেন যে, আমার মনও তার সাথে জড়িয়ে আছে। এই সেজদা ওই সত্তার দরবারে করা হচ্ছে, যিনি আরশে সমাসীন আছেন। দৈনিক দুনিয়ায় সকল কার্যাদি আঞ্জাম দেন, যার সামনে আমাদের ভালো মন্দ সকল কর্ম পেশ হয়। তাঁর কাছে প্রত্যেকেরই প্রয়োজন আছে, কিন্তু তাঁর কারও নিকট কোনো প্রয়োজন নেই। যিনি সর্বদা কাউকে সাহায্য করেন, কারও ভগ্ন হৃদয়ে জোড়া লাগান, কোনো দুর্বলকে শক্তিশালী করেন, কারও গুনাহ মাফ করেন। যিনি জীবন দান করেন, মৃত্যুও দান করেন, যাকে চান হেদায়াত দেন, যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন। কারও প্রতি দয়ার বৃষ্টি বর্ষণ করেন, আবার কাউকে পূর্ণ বঞ্চিতও করেন। কাউকে সম্মান দান করেন, কাউকে লাঞ্ছিত করেন। কারও জন্য শান্তি ও নিরাপত্তার সামান তৈরি করেন, আবার কারও থেকে তা ছিনিয়ে নিয়ে যান। আপনি যখন সেজদা করেন, তখন এ বিষয়গুলো মনে রাখা আবশ্যকীয়, তাহলে অন্তর আলোকিত হবে।
sِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِمْ مِنْ أَثَرِ السُّجُودِ.
(অধিক) সেজদার কারণে তাদের কপালে চিহ্ন পড়ে যায়।
এটা আল্লাহ পাকের দয়া ও নুরের চিহ্ন। যার মধ্যে বিনয়, নম্রতা, আরাম, শান্তির প্রতিচ্ছবি বিদ্যমান রয়েছে। যা আর অন্য কোনোভাবে হাসেল করা যায় না। সেজদা নামাজের বিশেষ একটি রোকন, সেজদা অত্যন্ত দামি বস্তু।
■ জানা নাই যে তা কত পেরেশানি ও বিপদাপদ দূর করে। কতই না জটিল ও কঠিন বিপদাপদ তার দ্বারা সমাধান হয়েছে। কত হাজার প্রয়োজন সেজদার দ্বারা পূরণ করেছে। কত অশ্রুসিক্ত দুআ সেজদার মাধ্যমে কবুল করেছেন।
নিজের সত্তাকে ফরশ (বিছানা) এর নিকটবর্তী করো, তাহলে আরশওয়ালার নিকটবর্তী হয়ে যাবে। আপন দেহ, অন্তর এবং আত্মার সাথে সেজদা করো, তাহলে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় নেয়ামত উপলব্ধি হবে, এ দুনিয়ার প্রকৃত শান্তি হাসেল হবে।
টিকাঃ
২৬. সুরা ফাতাহ: ২৯।