📘 লাভ অফ আল্লাহ > 📄 একটু সামান্য আঘাত

📄 একটু সামান্য আঘাত


مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ. কেয়ামত দিবসের মালিক।

আল্লাহ তাআলা مَالِكِ শব্দটিকে কেন নির্বাচন করলেন? কারণ কেয়ামতের দিন প্রত্যেক ক্ষমতাবান সৃষ্টির সব ক্ষমতা খতম করে দিবেন আর পরিপূর্ণ ক্ষমতা শুধু তাঁরই হাতে হবে। এমনকি কাউকে তার জবান নড়াচড়া করার ক্ষমতাও দিবেন না। আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউ কারও জন্য সুপারিশও করতে পারবে না। যেমন আয়াতুল কুরসিতে বর্ণিত হয়েছে। এ শব্দটি দুই কেরাতে পড়া হয়- (১) مَالِكِ (মালিকানা) (২) ملك (স্বয়ংসম্পূর্ণ বাদশা) এ উভয় অর্থ ওই দিনে আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের পরিপূর্ণ ক্ষমতার বিষয় স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে।

يَوْمَ تَرَوْنَهَا تَذْهَلُ كُلُّ مُرْضِعَةٍ عَمَّا أَرْضَعَتْ وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى النَّاسَ سُكَارَى وَمَا هُمْ بِسُكَارَى وَلَكِنَّ عَذَابَ اللَّهِ شَدِيدٌ.
যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে, সেদিন প্রত্যেক স্তন্যধায়ী তার দুধের শিশুকে ভুলে যাবে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী গর্ভপাত করবে এবং মানুষকে তুমি দেখবে মাতাল; অথচ তারা মাতাল নয় বস্তুত, আল্লাহর আজাব বড় কঠিন।

يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ. وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ. وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ.
সেদিন মানুষ পলায়ন করবে তার ভাই, মাতা, পিতা, পত্নী ও সন্তানদের থেকে।

يَوْمَ نَطْوِي السَّمَاءَ كَطَيِّ السِّجِلِّ لِلْكُتُبِ.
সেদিন আমি আকাশকে গুটিয়ে নেব, যেমন গুটানো হয় লিখিত কাগজপত্র।

وَمَا قَدَرُوا اللهَ حَقَّ قَدْرِهِ وَالْأَرْضُ جَمِيعًا قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَالسَّمَاوَاتُ مَطْوِيَّاتُ بِيَمِينِهِ.
তারা আল্লাহকে যথার্থরূপে বোঝেনি কেয়ামতের দিন গোটা পৃথিবী থাকবে তাঁর হাতের মুঠোতে এবং আসমানসমূহ ভাঁজ করা অবস্থায় থাকবে তাঁর ডান হাতে।

وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَصَعِقَ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ.
আর যখন শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে, ফলে আসমান ও জমিনে যারা আছে সবাই বেহুঁশ হয়ে পড়ে যাবে। অতঃপর কে বাঁচবে? কেউ না। আমাদের রব বলবেন,
لِمَنِ الْمُلْكُ الْيَوْمَ. আজ কার রাজত্ব?
কোনো জবাব নেই। আজ রাজত্ব কার? সম্পূর্ণ নিশ্চুপ। তো আল্লাহ তাআলাই জবাব দিবেন এবং ঘোষণা করবেন,
لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ. এক আল্লাহর জন্য, যিনি মহা পরাক্রমশালী।
ثُمَّ نُفِخَ فِيهِ أُخْرَى فَإِذَا هُمْ قِيَامُ يَنْظُرُونَ.
দ্বিতীয়বার শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে, অতঃপর সকলে দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে।
وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا. আর আপনার পালনকর্তা ও সারি সারি ফেরেশতা উপস্থিত হবেন।

সূর্য মাথার নিকটে করা হবে, যখন একদিন হবে (৫০,০০০) পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান, তো আমরা ওই দিনের ভয়াবহতা থেকে কীভাবে মুক্তি পাবো? উত্তর সামনে আসছে।

টিকাঃ
৭. সুরা হজ: ১-২।
৮. সুরা আবাসা: ৩৪-৩৬।
৯. সুরা আম্বিয়া: ১০৪।
১০. সুরা যুমার: ৬৭।
১১. সুরা যুমার: ৬৮।
১২. সুরা গাফের: ১৬।
১৩. সুরা গাফের: ১৬।
১৪. সুরা যুমার: ৬৯।
১৫. সুরা ফাজর: ২২।

📘 লাভ অফ আল্লাহ > 📄 মুক্তির চাবি কাঠি

📄 মুক্তির চাবি কাঠি


إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ. আমরা আপনারই ইবাদত করি, আপনার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি।

যদি আমরা مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ এর মাঝে চিন্তা করতাম তো এক আয়াতই আমাদের অন্তরে কঠিন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতো! অনেক মানুষই নামাজ পড়ে, কিন্তু সে কী করছে সামান্যও চিন্তা করে না। উক্ত শব্দ তাদের অন্তরে পৌঁছে না। বরং এটাকে প্রথাগত কথার মতো সে মৌখিকভাবে শিখে নিয়েছে। أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا. তারা কি কুরআন সম্পর্কে গভীর চিন্তা করে না? না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?

বলা হয়েছে যারা গভীর চিন্তা করে এবং যার অন্তর নামাজে এমনভাবে বিনয়ের সাথে লেগে থাকে যেমন পানিতে মাছ, আর যাদের এরূপ হয় না তারা যেন পিঞ্জিরায় আবদ্ধ পাখি। অতএব নামাজ দ্বারা কীভাবে ওই দিনের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে পারবো? সামনের আয়াতেই এর জবাব রয়েছে, যা মূলত সুরা ফাতিহার সারমর্ম... কুরআনের এক মহান সুরা; সুরাতুল ফাতিহা-ই হচ্ছে পূর্ণ কুরআনের খোলাসা বা সারনির্যাস।

إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ প্রত্যেক নবি তাঁদের উম্মতকে মুক্তির একই চাবি দিয়েছেন,
أَنْ لَا تَعْبُدُوا إِلَّا اللَّهَ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ أَلِيمٍ.
যে আল্লাহ ছাড়া কারও ইবাদত করবে না, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের ব্যাপারে কঠিন আজাবের আশঙ্কা করি।

এখন বলুন, এ দুনিয়াতে আমাদের মূল উদ্দেশ্য কী হওয়া উচিত? শুধু আল্লাহর ইবাদত ছাড়া আর কিছু না। এজন্যই আমাদের সৃষ্টি। উক্ত উদ্দেশ্য হাসিল করার উপায় কী? দিলের ইখলাস! আমরা যা কিছু করি বা করবো শুধু আল্লাহর জন্য করবো আর কারও জন্য নয়। সদা তাঁর সন্তুষ্টির কামনায় থাকবো। কেননা ইখলাসবিহীন আপনি ওই মুসাফিরের মতো, যে পথের সম্বল হিসেবে কিছু বালু বেঁধে নিয়ে চলছে, যা শুধু একটি বোঝা ছাড়া কিছু নয়। শুধু আল্লাহকে নিজের আশ্রয়ের স্থল বানাও অন্য কাউকে নয়। কেননা অন্যরা যা করে বা চিন্তা করে সব অনর্থক। আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ না কোনো উপকার করতে পারে, না ক্ষতি।

আপনাকে যখনই জিজ্ঞাসা করা হবে এ আমল কেন করেছ? তখন উত্তর একটিই আসবে যে, আল্লাহর জন্য। আর যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, বাস্তবেই, নাকি অন্য কারও জন্য? তো কঠিনভাবে উত্তর আসবে অন্য কারও জন্য নয়।
قُلْ هَلْ نُنَبِّئُكُمْ بِالْأَخْسَرِينَ أَعْمَالًا . الَّذِينَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنْعًا.
বলুন আমি কি তোমাদেরকে সেসব লোকের সংবাদ দেবো, যারা কর্মের দিক দিয়ে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত। তারাই সে লোক, যাদের প্রচেষ্টা পার্থিব জীবনে বিভ্রান্ত হয় অথচ তারা মনে করে যে তারা সৎ কর্ম করছে।

আল্লাহর জন্য ইখলাস আপনার জীবনকে পরিবর্তন করে দেবে। এখন সময় এসেছে আমাদের নিয়তকে খালেস করার। সময় এসেছে আমাদের সন্তানদের শিখাবার যে, তুমি যে কাজই করবে তা এ জন্য যে, আল্লাহ যেন তা পছন্দ করেন! এবং যে কাজ থেকে বিরত থাকবে, তা এজন্য যে, আল্লাহ এতে অসন্তুষ্ট। তারা যেন এটা শিখে নেয় যে, তাকে পুরস্কার দান করবেন একমাত্র আল্লাহ। তিনি ছাড়া অন্য কেউ নয়। একথা সত্য যে, নিয়তের মাঝে পরিপূর্ণ ইখলাস সৃষ্টি করা সহজ নয়, কিন্তু অসম্ভবও নয়। কেননা আমাদের ওই জাদুময় কালেমা জানা আছে, যা ইখলাসের উৎস। অর্থাৎ, আমরা কেবলমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং তোমারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছি।

যদি আল্লাহ পাকের মদদ থাকে তবে এমন কোনো কাজ নেই যা আঞ্জাম দেয়া যাবে না, সবকিছুই তাঁর হাতে। চেয়ে নাও, তিনি দেবেন। তিনি কি এ কথা বলেননি যে, তোমরা সকলে পথভ্রষ্ট; তবে আমি যাকে হেদায়েত দেই।

إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ এটা ওই আয়াত, যার উপর আমাদের পূর্বসূরীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাঁদতেন। একদা তাদের একজন মক্কা শরিফে নামাজ পড়াচ্ছিলেন, তার বন্ধু সম্মুখে অগ্রসর হয়ে তাওয়াফ করলেন, যখন তিনি ফিরে আসলেন তখন দেখলেন তিনি এ আয়াতই পড়তেছেন আর বার বার কাঁদছেন। এমনকি সূর্য উদয় হয়ে গেল, আমরা তোমারই ইবাদত করি, তোমারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। আসুন এতে আরও চিন্তা করি, তাহলে ওই নেফাক অন্তর থেকে চলে যাবে, যা অজ্ঞাতসারে আমাদের অন্তরে লেগে আছে। এটি এক বিরাট দুআ, যা আপনি কখনো করেছেন!

اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ. আমাদেরকে সরল সঠিক পথ দেখান।

এখন আমরা সবচেয়ে মহান হেকমতপূর্ণ এবং ব্যাপক দুআ পর্যন্ত পৌঁছেছি। যা আমরা হয়তবা কখনো চেয়েছিলাম। যদি আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সরল পথের হেদায়াত করে থাকেন তাহলে বুঝে নাও যে, তিনি আমাদেরকে যেভাবে তাঁর হক আদায় হয়, সেভাবে ইবাদত করারও তাওফিক দিয়েছেন। (একটু স্মরণ করুন, পূর্ববর্তী আয়াতে আপনি কী চেয়েছিলেন? অর্থাৎ, আমরা আপনারই ইবাদত করি। আপনার কাছেই সাহায্য চাই।)

একটু চিন্তা করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়, যে সুরা ফাতিহা আমাদেরকে আল্লাহর দরবারে প্রয়োজনাদি চাওয়ার অতি উত্তম পদ্ধতি শিখিয়েছে। আমাদেরকে সহিহ তরিকায় দুআ করা শিখিয়েছে। যেন তিনি আমাদের কথা শোনেন ও আমাদেরকে দান করেন। আমরা তাঁর শান হিসেবে তাঁর আজমত ও বড়ত্ব বর্ণনা করি। তারপর আমাদের আবেদন পেশ করি। এখন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য যে পথের প্রয়োজন সেটা হলো সিরাতে মুস্তাকিম, ‘সরল সঠিক পথ’।

কিন্তু আল্লাহর সাহায্য ছাড়া এ পথে চলা খুবই মুশকিল। এ পথের কিছু বিশ্লেষণ আছে। যার কিছু আমরা জানি, আর কিছু জানি না (কোনটি হালাল, কোনটি হারাম, কোনটি সহিহ, কোনটি বাতিল?) আর যা আমরা জানি, না জানার তুলনায় অনেক কম। আমরা যা জানি তা হতে কিছু শরীর দ্বারা আদায় হয়, যেমন হজ, রোজা ইত্যাদি। আর কিছু শরীর দ্বারা আদায় হয় না। এগুলো থেকে কিছু আমরা আনন্দের সহিত আদায় করি, আর কিছু আদায় করতে নফসের খুব কষ্ট হয়, যেমন ফজর নামাজের জন্য জাগ্রত হওয়া ইত্যাদি।

সাথে সাথে উক্ত আমলগুলো আদায় করতে যে ইখলাসের প্রয়োজন, কখনো সে ইখলাস পরিপূর্ণভাবে পাওয়া যায়, আবার কখনো মোটেও পাওয়া যায় না। কখনো সে আমল পুরোপুরি সুন্নত তরিকায় আদায় হয়, আবার কখনো এতে ত্রুটিও হয়। আমরা যদি পূর্ববর্তী প্রয়োজনীয় বিষয়াদি পরিপূর্ণ করি, অর্থাৎ ইলম, ইখলাস, সুন্নাতে নববির গুরুত্ব ইত্যাদি, তবুও একটি বিষয়ের কমই থেকে যাবে। আর তা হলো এস্তেকামাত বা দৃঢ়তা। যেন প্রত্যেকবার তা ওইভাবে আদায় করা যায়। এখন বুঝে আসছে কি? আমরা সরল পথে চলার জন্য আল্লাহর হেদায়াতের প্রতি কেন মুহতাজ?

আপনি দেখেছেন কি, আমরা আল্লাহর হেদায়েত ছাড়া তা করতে পারবো না? আপনি কি বুঝেছেন এ দুআ কত ব্যাপক? আপনি তো জানেন صِرَاطَ দুটি। একটি এ দুনিয়াতে যার আলোচনা মাত্র করা হয়েছে, দ্বিতীয়টি আখেরাতে যা তরবারির চেয়ে ধাঁরালো, যা জাহান্নামের আগুনের উপর স্থাপিত। প্রত্যেক জান্নাতিকে তার উপর দিয়েই যেতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَإِنْ مِنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا كَانَ عَلَى رَبِّكَ حَتْمًا مَقْضِيًّا. ثُمَّ نُنَجِّي الَّذِينَ اتَّقَوْا وَنَذَرُ الظَّالِمِينَ فِيهَا جِثِيًّا.
তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে তথায় পৌঁছবে না। এটা আপনার পালনকর্তার অনিবার্য ফায়সালা। অতঃপর আমি পরহেজগারদের উদ্ধার করবো আর জালেমদেরকে সেখানে নতজানু অবস্থায় ছেড়ে দেবো।

আমরা যদি এ দুনিয়ার 'সিরাতে' মজবুত ও দৃঢ়তার সাথে চলতে পারি, তবে আখেরাতের উক্ত সিরাত সহজভাবে অতিক্রম করতে পারব। অর্থাৎ দ্বিতীয় সিরাত সরাসরি সম্পৃক্ত এ দুনিয়ার ইমান, ইখলাস ও আমলের সাথে। আমাদের ইমান, আমাদের নেক আমল আখেরাতে ঘোর অন্ধকারে উক্ত পুলসিরাতে আমাদের জন্য আলোর কাজ দিবে।
يَوْمَ تَرَى الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ يَسْعَى نُورُهُمْ بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَبِأَيْمَانِهِمْ.
যেদিন আপনি দেখবেন ইমানদার পুরুষ ও ইমানদার নারীদেরকে, তাদের সম্মুখভাগে ও ডানপার্শ্বে তাদের জ্যোতি ছুটাছুটি করবে।

তাই তার ইমান ও আমল অনুপাতে কিছু বিদ্যুতের ন্যায় অতিক্রম করে যাবে, কিছু উজ্জ্বল তারকার মতো, কিছু বাতাসের মতো, কিছু দ্রুতগামী ঘোড়ার মতো এবং কিছু দৌড়ে অতিক্রম করবে, আর কিছু হাত-পা দিয়ে হেঁচড়ে যাবে। বাকি সব জাহান্নামের অগ্নিতে নিক্ষিপ্ত হবে। সেখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ পাকের দরবারে আবেদন করবেন, হে আমার পালনকর্তা! তাদেরকে ক্ষমা করে দিন, হে আল্লাহ! তাদের ছেড়ে দিন। এ জীবনের 'সিরাত' আমাদেরকে আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছাবে, আর ওই জীবনের সিরাত আমাদেরকে জান্নাত পর্যন্ত পৌঁছাবে।

আপনি কি উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে, এ দুআ কতই না গুরুত্বপূর্ণ। اهْدِنَا الصِّরَاطَ الْمُسْتَقِيمَ আমাদের পূর্ণ অস্তিত্ব এর উপর সীমাবদ্ধ। উল্লিখিত বিষয়গুলো জানার পর যখন আপনি আমিন বলবেন, তখন এ আওয়াজ অন্তর হতে বের হবে, কেন হবে না? প্রকৃত বিষয় তো এটাই যে, প্রত্যেক দুআ কবুলের এটিই হলো শর্ত। তা হলো একাগ্রতার সাথে অন্তর থেকে বের হওয়া। আগ্রহহীন অন্তরের দুআ আল্লাহ শোনেন না।

সুরা ফাতিহার সমাপ্তি: صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ.
ওই লোকদের পথ, যাদের প্রতি আপনি করুণা করেছেন, তাদের পথ নয় যাদের প্রতি তোমার গোস্বা হচ্ছে এবং যারা পথভ্রষ্ট।

সুরা ফাতিহার সমাপ্তিতে তার শেষ আয়াতের সমপনী ব্যখ্যা উপস্থাপন করছি। 'সিরাত'-এর ব্যাখ্যার পর আলোচনা হয়েছে, উভয় জাহানে সফলতা লাভ করতে কীভাবে তার উপর দৃঢ় থাকার জন্য আল্লাহ পাকের দয়া ও হেদায়েতের প্রয়োজন। যেহেতু নেক লোকদের সাহচর্যের মাধ্যমে আমরা আমাদের আখলাক, স্বভাব এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ইমানের উপর বদ্ধমূল থাকতে পারি, তাই আল্লাহর কাছে দুআ করা হয়, তিনি যেন আমাদেরকে ওই পথ প্রদর্শন করেন, যাদের উপর তিনি করুণা ও দয়া করেছেন।

এই আয়াত আমাদের পূর্বে যারা চলে গেছেন সকল নেককার নারী-পুরুষদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন আম্বিয়া, সালেহিন, সাহাবা এবং সর্বশ্রেষ্ঠ নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও। উক্ত নেক লোকদের প্রচেষ্টা আমাদের জন্য সান্ত্বনার কারণ। এগুলো আমাদের বিপদাপদসমূহকে সহনশীল করে তোলে এবং এর দ্বারা এ ব্যাপারে আমাদের শক্তি ও সজীবতা লাভ হয় যে, ইনশাআল্লাহ আখেরাতে আমরা উক্ত নেক লোকদের সাথে থাকব।

غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ এরা এমন লোক, যারা ভালোভাবেই সত্য সম্পর্কে অবগত এবং কোনটা সঠিক কোনটা বাতিল তাও জানে। তারপরও গ্রহণ করা ও মেনে নেয়া থেকে দূরে থাকে। অর্থাৎ তারা জানে, কিন্তু অন্তরে গ্রহণ করে না। যেমন ওই সকল লোক, যারা জানে যে, নামাজ ফরজ, কিন্তু আদায় করে না। এরা ওই সমস্ত লোক, সত্য সম্পর্কে যাদের যদিও পুরোপুরি জ্ঞান নেই, কিন্তু তারা বুঝতেও চায় না। সুতরাং তারা ভুল পথেই চলতে থাকে। যেমন ওই সমস্ত লোক, যারা নামাজ পড়ে ঠিকই, কিন্তু অনাগ্রহের সাথে।

আপনি কি এবিষয়ে গভীর চিন্তা করেছেন যে, রহমত ও বরকত শব্দদ্বয় কেবল রাব্বুল ইজ্জতের সাথেই নির্দিষ্ট। أَنْعَمْتَ যাদের প্রতি তোমার অনুগ্রহ ও দয়া রয়েছে। তবে 'গজব' শব্দটি শুধু আল্লাহর সাথে সীমাবদ্ধ নয়। এরূপ এজন্য যে, যখন অনুগ্রহ ও দয়ার বিষয় আসে, তো তার দাতা একমাত্র আল্লাহ তাআলা, কিন্তু যখন গুনাহ প্রকাশ পায়, তখন শুধু আল্লাহ পাকের নয়, বরং অন্যান্য মাখলুকের গোস্বারও ভাগী হয়। যেমন- ফেরেশতা, আম্বিয়া এবং নেককার লোকদের।

পরিশেষে امিন এর অর্থ হে আল্লাহ! তুমি আমার দুআ কবুল করো। امিন এর মাধ্যমে আমরা যার হাতে আমাদের হেদায়েত ও পথ প্রদর্শন এবং মুক্তি নির্ভরশীল তাঁর দরবারে কাতর মিনতি করি। সুতরাং অন্তরের অন্তস্থল হতে আল্লাহর সামনে কাকুতি-মিনতি করো। ওই ব্যক্তির মতো, যাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে, আর সে নিহত ব্যক্তির পরিবারের কাছে অত্যন্ত কাতরভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করে। আপনার আওয়াজে ওই পরিমাণ উন্মাদনা ও উদ্দীপনা থাকা চাই এবং অন্তর এমন হওয়া চাই যে, সে ক্ষমা ভিক্ষা চাচ্ছে। অন্তরের গভীর থেকে আমিন বলার আরেক মজবুত কারণ এই যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, তোমাদের 'আমিন' যদি ফেরেশতাদের আমিনের সাথে মিলে যায় তো আল্লাহ তাআলা তোমাদের পেছনের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন।

একটু শুনুন! আল্লাহ তাআলা বলেন আমি সালাত (সুরা ফাতিহা)-কে আমার ও বান্দার মাঝে ভাগ করে নিয়েছি। আর আমার বান্দা যা চায় তা পাবে। আগামীতে আপনি যখন নামাজের জন্য দাঁড়াবেন এবং সুরা ফাতিহা পড়বেন তো প্রত্যেক আয়াতে ওয়াকফ করবেন, যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করতেন। কারণ সে মহান সত্তা আপনার সামনে তাঁর বরকতময় চেহারা নিয়ে উপস্থিত এবং আপনার প্রত্যেক আয়াতে জবাব দিচ্ছেন। ব্যস এটা কল্পনা করুন। কতই না গর্বের বিষয় ওই মহান সত্তার ক্ষুদ্র গোলাম হওয়ার মধ্যে।

টিকাঃ
১৬. সুরা মুহাম্মাদ: ২৪।
১৭. সুরা হুদ: ২৬।
১৮. সুরা কাহফ: ১০৩-৪।
১৯. সুরা মারয়াম: ৭১-৭২।
২০. সুরা হাদিদ: ১২।

📘 লাভ অফ আল্লাহ > 📄 অন্তর থেকে তেলাওয়াত করুন

📄 অন্তর থেকে তেলাওয়াত করুন


এখন আমরা আল-ফাতিহা শেষ করে কুরআন মজিদ তেলাওয়াত করছি। আপনি কি কখনো এ বিষয়ে চিন্তা করেছেন যে, আমরা দাঁড়ানো অবস্থায় কেন কুরআন শরিফ তেলাওয়াত করছি? নামাজের অন্য হালতে ফাতিহা বা কুরআন শরিফ তেলাওয়াত কেন করি না? যেমন রুকু, সেজদা কিংবা অন্য কোনো অবস্থায়?

দাঁড়ানোর অবস্থাটা প্রত্যেক মুসলমানের মর্যাদাপূর্ণ, গাম্ভীর্যপূর্ণ এবং আদবপূর্ণ। কুরআনের কালামও সবচেয়ে সম্মানি, গাম্ভীর্যপূর্ণ ও আদবপূর্ণ তাই তাকে সবচেয়ে মর্যাদাশীল ও আদবপূর্ণ অবস্থায় পড়া চাই। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, তাঁকে রুকু ও সিজদা অবস্থায় কুরআন শরিফ তেলাওয়াত করতে নিষেধ করা হয়েছে। কুরআন আল্লাহ পাকের কালাম, যা অত্যন্ত উঁচুমানের তাই তাকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে পাঠ করা অধিক শ্রেয়।

তবে জানি না, আমরা কতবার মনোযোগ ছাড়া, অনুভূতিহীন অবস্থায় এবং তার মর্যাদাপূর্ণ শব্দসমূহ বোঝা ছাড়া তেলাওয়াত করেছি? আমাদের মধ্যে অনেকেই এমন আছেন, যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, যা তেলাওয়াত করা হলো এতে আল্লাহ তাআলা কী কী নিষেধ করেছেন এবং কী কী আদেশ করেছেন? তো আমাদের পক্ষ থেকে এর কোনো সঠিক উত্তর আসবে না। আমাদের তো খেয়ালই থাকে না যে ইমাম সাহেব কী পড়ছেন। তিনি হয়তো জান্নাত-জাহান্নামের বিষয় পড়ছেন। আর আমরা চিন্তা করছি খানা-পিনার বিষয়। যদি কোনো শক্তিশালী বাদশার ঐতিহাসিক ইন্টারভিউ আমাদের থেকে নেয়া হয়, আমরা তাতে কত অধিক মনোযোগ দেবো? শুধু কান দিয়ে শুনব না, বরং অত্যন্ত মনোযোগের সাথে তাতে লেগে যাবো। কেন আমরা তাতে এত বেশি হারিয়ে যাবো? সম্ভবত তাঁর প্রত্যেকটি কথা স্মরণ রাখার চেষ্টা করবো। তবে যখন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা নামাজে আমাদের সাথে কথোপকথন শুরু করেন, তখন কেন এত অবহেলা?

আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا. এরা কুরআনে গভীর চিন্তা করে না, এদের অন্তরে তালা লেগে গেছে।

এ কথা আলোচনা করা হয়েছে যে, আমাদের মধ্যে যদি আন্তরিক একাগ্রতা না থাকে, তাহলে অন্তরে আল্লাহ পাকের বাণীর কোনো প্রতিক্রিয়া হবে না। মনে রেখ, এটা কোনো বড় বিষয় নয় যে, আমরা কুরআন পড়ি, বরং চূড়ান্ত উৎকর্ষতা হলো যে, আমরা কতটা একাগ্রতার সাথে পড়ি এবং উপদেশ গ্রহণ করি? একবার নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি আয়াত বার বার পাঠ করতে করতে, কেঁদে কেঁদে রাত কাটিয়ে দিয়েছেন। আয়াতটি হলো-
إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ.
আপনি যদি তাদেরকে শাস্তি দেন, তবে তারা আপনার বান্দা এবং যদি আপনি তাদেরকে ক্ষমা করেন তবে আপনিই পরাক্রান্ত, মহাবিজ্ঞ।

সুতরাং, আমাদের উচিত মনোযোগ সহকারে পড়া। এ বিষয় কল্পনা করে যে, আল্লাহ আমাদের সাথে কথা বলছেন, আর আমরাও আল্লাহর সাথে কথা বলছি। তবে, আমরা কীভাবে বুঝাবো যে, কোন আয়াতে কী ধরনের অনুভূতি গ্রহণ করা চাই? আল্লামা ইবনুল কায়্যিম রহ. আমাদেরকে এরূপ কিছু মৌলিক নিয়মনীতি বাতলে দিয়েছেন, যা আমাদেরকে পথ দেখাবে। যদিও আমরা উক্ত আয়াতের পূর্ণ তাফসির সম্পর্কে অবগত না হই। তিনি বলেন-
■ যদি কোনো আয়াত তোমাদের প্রতি আল্লাহ পাকের অনুগ্রহের বর্ণনা করে তাঁর নাম ও সিফাতের মাধ্যমে, তবে তোমাদের অন্তর মহব্বত দ্বারা পূর্ণ হয়ে যাওয়া চাই।
■ যদি কোনো আয়াত আল্লাহ পাকে রহমত, ক্ষমা এবং জান্নাতিদের আলোচনা করে, তবে তোমাদের অন্তর আনন্দ, প্রশান্তি এবং আশা-আকাঙ্ক্ষা দ্বারা ভরে যাওয়া চাই।
■ যদি কোনো আয়াত আল্লাহ পাকের গোস্বা, শাস্তি, ধ্বংসপ্রাপ্ত সম্প্রদায়ের আলোচনা করে, তবে তোমাদের অন্তর ভয় ও পেরেশানি দ্বারা ভরে যাওয়া উচিত।
■ সুতরাং আল্লাহর কালাম পড়ার সময় আমাদের অন্তরে সর্বদা মহব্বত, আশা এবং ভয়ের অবস্থা সৃষ্টি হওয়া চাই। কুরআন আমাদের জ্ঞানের চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে।

لَوْ أَنْزَلْنَا هَذَا الْقُرْآنَ عَلَى جَبَلٍ لَرَأَيْتَهُ خَاشِعًا مُتَصَدِّعًا مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ وَتِلْكَ الْأَمْثَالُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ.
যদি আমি এই কুরআন পাহাড়ের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি দেখতে যে, পাহাড় বিনীত হয়ে আল্লাহ তাআলার ভয়ে বিদীর্ণ হয়ে গেছে। আমি এসব দৃষ্টান্ত মানুষের জন্য বর্ণনা করি, যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে।

টিকাঃ
২১. সুরা মুহাম্মদ: ২৪।
২২. সুরাতুল মায়িদা: ১১৮।
২৩. সরা হাশর: ২১।

📘 লাভ অফ আল্লাহ > 📄 নিজের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন পূরণ করবো

📄 নিজের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন পূরণ করবো


আমি আমার কেরাত পূর্ণ করেছি। এখন কিছুক্ষণ থেমে আল্লাহু আকবার বলে রুকুতে যাবো। সুতরাং এখন সময় হচ্ছে এলোমেলো মনকে পুনরায় স্থির করার। মনে মনে কল্পনা করতে হবে যে, আমরা এখানে জমিনে নামাজের জন্য দাঁড়িয়েছি, আর আল্লাহ তাআলা আমাদরেকে সাত আসমানের উপর থেকে দেখছেন। তাই আমাদের নামাজ সুন্দর হওয়া চাই। বিশেষত রুকু, কেননা আল্লাহ তাআলা সুন্দর, সৌন্দর্যকে তিনি পছন্দ করেন। আজ আমাদের সাক্ষাত মহান আল্লাহ পাকের সাথে হবে। তাই আসুন আমাদের নামাজকে অধিক সুন্দর ও পরিপূর্ণ করি।

sُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ. আমার রব মহান (সকল দোষ থেকে) পবিত্র।

নিজের হাত দ্বারা হাঁটু ধরুন, আঙুলগুলো ফাঁকা থাকবে, পিঠ, মাথা, নিতম্ব বরাবর থাকবে। শরীরের প্রত্যেক জোড়া আপন স্থানে আসা পর্যন্ত এ অবস্থায় নিজেকে স্থির রাখবে। سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ এর মাঝে বিদ্যমান সত্তার প্রতি গভীর মনোযোগ দিবে। এটা আল্লাহ পাকের সাথে মহব্বত সৃষ্টির উপায়। তিনিই আমাদের রব, যিনি আমাদেরকে আপন দয়ায় বড় করেছেন, কাপড় পরিয়েছেন, খাইয়েছেন এবং সুস্থতা দান করেছেন। অন্তর থেকে বের করুন سُبْحَانَهُ অর্থাৎ ওই সত্তা, যিনি সকল দোষ-ত্রুটি থেকে পবিত্র।

সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম (سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ) এভাবে যখন দ্বিতীয় এবং তৃতীয়বার বলবে, তখন আপনার অন্তর মহব্বত ও একনিষ্ঠতায় ভরপুর হয়ে যাবে। তাঁর বড়ত্বকে অনুভব করুন, তাঁর সর্বময় ক্ষমতাকে স্মরণ করুন, হে প্রতিপালক! আমার সকল আশা-ভরসা তোমারই সাথে সম্পৃক্ত করছি।

আমরা অনেকে নামাজের এই অংশটুকু মেশিনের মতো দ্রুত আদায় করি। ফলে না কোনো অনুভূতি সৃষ্টি হয়, না আল্লাহর সাথে কোনো বন্ধন। যেমনটা হয়ে থাকে কেরাত ও সেজদায়। অথচ রুকু ইবাদতের বিশেষ অংশ। আমাদের রবের প্রতি আমাদের দাসত্বের প্রমাণ। যাতে রয়েছে উচ্চ পর্যায়ের অক্ষমতা ও নম্রতার অনুভূতি। ওই সময়ের আরবরা বিষয়টি জানতেন এবং তাদের মধ্যে অহংকারীরা এর কঠিন বিরোধিতা করত। এক ব্যক্তি নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আবেদনও করেছেন যে, সে রুকু না করে সরাসরি সেজদায় চলে যাবেন।

আমাদের প্রত্যেকেরই একটা ব্যক্তিগত খায়েশ থাকে, ইচ্ছা থাকে। কারও এ খায়েশ যে, সকলে আমাকে মহব্বত করবে। কারও কিছুক্ষণ একাকিত্ব হাসিল হওয়া। কারও খায়েশ সারা দিন কঠিন পরিশ্রমের পর যখন ঘরে যাবো, তখন সেখানে আমার জন্য কেউ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করবে। আবার কারও এ কামনা যে, সন্তানদের সাথে সময় কাটাবো এবং তাদেরকে আদর যত্ন করবো। কারও এ চাহিদা যে, সুন্দর সুন্দর উপাধি পাবো ইত্যাদি। যখন উক্ত মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয় না, তখন আমাদের মাঝে এক ধরনের হতাশার অবস্থা সৃষ্টি হয় এবং সারাদিন খারাপ হয়ে যায়। বারবার বিস্বাদময় কথা বলি ও মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, কিন্তু জানি না এরূপ কেন হচ্ছে। কারণ আজ আমাদের নিজস্ব আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি।

এক গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনে আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। যা আমাদের সকল প্রয়োজনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। উক্ত প্রয়োজন পূরণার্থে এক সময় মানুষ অনেক বস্তুর পূজা করত। যেমন- সূর্য, চাঁদ, প্রাণী, বানর, সাপ, বিজ্ঞান এমনকি আপন প্রবৃত্তিরও পূজা করত। সে জন্য তাদের শক্তি ও সম্পদ উজাড় করে দিত। এ উদ্দেশ্য পুরা হওয়া চাই, কিন্তু এ উদ্দেশ্য ওই পর্যন্ত পুরা হবার নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত সত্যিকার ইলাহের ইবাদত না করা হয়। আর নামাজ উক্ত উদ্দেশ্য পূরণে সক্ষম, যার মধ্যে রুকু হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ রুকন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং আমাদের পূর্বসূরী বুজুর্গগণ রুকুতে এত শান্তি ও মজা পেত যার কারণে তারা রুকুকে এত দীর্ঘ সময় ব্যয় করতেন, যেমন কিয়ামকে দীর্ঘ করে থাকেন। এক সাহাবি বলেন, আমি নামাজে সুরা ফাতিহার পর সুরা বাকারা, আলে ইমরান, সুরা নেসা তারপর সুরা মায়েদাও পড়েছি অথচ এ পর্যন্ত আমার নিকট আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাযি. রুকুতেই ছিলেন।

একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে নামাজে তাড়াহুড়া করতে দেখেন যে রুকু, সেজদা খুব দ্রুত করছে। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যদি এ ব্যক্তি এ অবস্থায় মারা যায় তবে তার মৃত্যু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দীনের উপর হবে না। তাই আমাদের রুকু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তরিকা মতো অত্যন্ত ধীরস্থিরতার সাথে আদায় হওয়া চাই। দুনিয়ার জীবন কষ্ট ক্লেশে ভরা যেখানে একদিন খুশির হাসি আরেক দিন দুঃখের কান্না। তার প্রয়োজনাদি ও ব্যস্ততা আমাদেরকে ক্লান্ত করে রাখে।

নামাজের চেয়ে বড় আর কোনো জিনিস আছে যা এ দুনিয়ার ক্লান্ত দূর করতে পারে? নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, ঠিক মতো রুকু আদায় করে না তার দৃষ্টান্ত ওই ব্যক্তির মতো যে অনেক কষ্ট করে এক দুইটি খেজুর খাবার জন্য পায় যা তার ক্ষুধা নিবারণ করতে পারে না। আসুন আমরা নিজেদের আরাম ও শান্তি রুকু ও সেজদায় তালাশ করি। আমরা দিনে ১৭ বার আল্লাহর দরবারে ঝুঁকি; পাশাপাশি সে অনুযায়ী আল্লাহর মহব্বতও বৃদ্ধি পাওয়া চাই। আর আপনি যখন তাঁকে মহব্বত করবেন তো তিনি এর চেয়েও অনেক বেশি আপনাকে মহব্বত করবেন। কেননা তিনি অত্যধিক দয়ালু ও দাতা। আর আপনার খালেক যখন আপনাকে মহব্বত করে তবে কে আপনাকে কষ্ট পৌঁছাবে?

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00