📄 কার উসিলায় শিন্নি খাও
জীবন বাগানের শোভা নারী। তারা আমাদের পুষ্পকানন। নারীবিহীন জীবন খা খা মরূদ্যান। ইসলাম এ ফুলকে দিয়েছে অভূতপূর্ব মর্যাদা। ধর্মসমূহের মধ্যে ইসলামই একমাত্র ধর্ম যা নারীদের অবস্থার উন্নতি সাধন করেছে। কারণ ইসলামপূর্ব যুগে আরবে অনেক ধর্ম প্রচলিত ছিল বটে; তখনকার সময়ে নারীদের অবস্থা খুব শোচনীয় ছিল। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, যে ইসলাম নারীকে এত মর্যাদায় সমাসীন করল, সেই ইসলামের বিরুদ্ধেই তথাকথিত নারীবাদীরা নাক ছিটকায়। যেই ইসলাম তাদেরকে বেঁচে থাকার অধিকার দিল, যে ইসলাম দিল তাদের সার্বিক নিরাপত্তা, সেই ইসলামের
কথায় তারা কপাল কুঁচকায়। তাই বলতে বাধ্য হই- 'কার উসিলায় শিন্নি খাও গো নারী!'
একমাত্র ইসলামই যে নারীকে প্রকৃত মর্যাদার আসন দিয়েছে তা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন বিশ্বের অনেক বিখ্যাত মনীষী। একই সাথে তারা এও স্বীকার করে নিয়েছেন যে, অন্য কোনো ধর্মই নারীকে মর্যাদা দেয়নি; উল্টো তাদের অধিকার খর্ব করেছে।
গ্রিসের বিখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী ডাঃ গোসতাওলী চান। তিনি লিখেছেন, "গ্রিসে সাধারণত নারীদেরকে নিম্ন মর্যাদাসম্পন্ন সৃষ্টি মনে করা হতো। গার্হস্থ্য কাজকর্ম ও বংশ বৃদ্ধিই ছিল তার কাজ। কোনো নারীর গর্ভে অস্বাভাবিক সন্তান জন্ম নিলে ঐ নারীকে হত্যা করে ফেলা হতো।" তিনি আরো লিখেছেন যে, আগের যুগে নারীদের সাথে কী পরিমাণ কঠোরতা করা হতো, তা তাদের তৈরি আইনের ভাষায় পাঠ করুন- “তুফান, মৃত্যু, জাহান্নাম, বিষ ও বিষধর সাপ কোনো কিছুই এ পরিমাণ ক্ষতিকর নয়, যতটা ক্ষকিকর নারী। কিন্তু ইসলামই নারীকে প্রকৃত মর্যাদা দিয়েছে।"
বাইবেলেও ঠিক অনুরূপ লেখা আছে "নারী মৃত্যুর চেয়েও বেশি তিক্ত।"
বাইবেলের 'তৌরাতের নসীহতনামা' অধ্যায়ে লিখা আছে- খোদার প্রিয় ব্যক্তিরা নিজেকে নারী থেকে দূরে রাখবে। আমি হাজারো মানুষের মাঝে শুধু একজনকে (পুরুষ) প্রিয়তম পেয়েছি। কিন্তু জগতের সমগ্র নারীদের মধ্যে একজনকেও এমন পাইনি, যে খোদার প্রিয়। [তমদ্দুনে আরব: পৃ. ৩৭৬]
বিশিষ্ট ইউরোপিয়ান লেখক প্রফেসর ডিএস মারগুলিউল ইসলাম ও ইসলাম প্রবর্তক নবীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পোষণ, অপবাদ আরোপ, অভিযোগ উত্থাপন ও নিন্দাবাদের কোনো সুযোগকে কাজে লাগাতে ভুল করেননি। তিনি প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনীগ্রন্থ 'লাইফ অব মুহাম্মদ' রচনা করেন।
এতে মনগড়া অভিযোগের প্রাচুর্যতা থাকা সত্ত্বেও এক জায়গায় লিখেন- "অজ্ঞানতার যুগে আরবগণ ছাড়াও ইহুদি, খ্রিস্টান কেউই কোনোদিন এটা কল্পনা করেনি যে, নারীরাও ইজ্জত, সম্মান ও ধন-সম্পদের অধিকারিণী হতে পারে।"
এই ধর্মগুলো নারীদেরকে তো অনুমতি দেয়নি যে, নারীরা কোনো জীবিকা অবলম্বন করে স্বাচ্ছন্দ্যে দিন কাটাবে। ঐ সমস্ত ধর্ম, কৃষ্টি ও সমাজে একেকজন নারী ছিল একেকজন ক্রীতদাসী। অবশেষে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে নারীকে স্বাধীনতা, স্বকীয়তা ও স্বনির্ভরতা দান করেছেন।
বিশিষ্ট বিদ্বান মানসিউরিফলের ভাষ্য হলো- "ইসলামের নবীর যুগের দিকে মনোনিবেশ করলে মনে হয়, তিনিই নারীর জন্য কল্যাণকর বিধি-বিধান প্রণয়ন করেন, অন্য কেউ করেননি। নারীর ওপর তাঁর অনুগ্রহ অনেক। কুরআনে নারীর অধিকার সম্পর্কিত অনেক উচ্চাঙ্গের আয়াত আছে।
নারীর অধিকারের আদর্শ মানদণ্ডের ধারক আইউর মান্যম 'দি লাইফ অব মুহাম্মদ' গ্রন্থে লিখেন- এ কথা কে অস্বীকার করতে পারে যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা আরবদের জীবন এবং এর প্রথম বিষয় হলো- ইতোপূর্বে নারীদের যে সম্মান ছিল না, তা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষায় তারা পেয়েছে। দেহ ব্যবসা, সাময়িক বিবাহ, অবাধ মেলামেশা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। ইতিপূর্বে বাঁদীরা মনিবের শুধু ভোগ্যপণ্য হিসেবে পরিগণিত হতো। ইসলাম তাদেরকে অধিকার প্রদান করেছে, মনিবকে তাদের প্রতি সদয় হতে বলেছে।
ডব্লিউ কিশ তার The expansion of Islam গ্রন্থে লিখেন- "ইসলামই সর্বপ্রথম নারী সমাজকে মানবাধিকার প্রদান করেছে এবং তাদেরকে তালাকের অধিকার দিয়েছে।"
ডব্লিউ লাইটার তার Mohammadanism is religious systems of The world গ্রন্থে লিখেন- "মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীকে যে সম্মানের আসনে আসীন করেছেন তা পাশ্চাত্য সমাজ ও অন্যান্য ধর্মে ছিল না।"
প্রফেসর রাম কৃষ্ণ রাও কয়েক বছর পূর্বে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনীর ওপর "ইসলামের পয়গম্বর মোহাম্মদ" নামে একটি বই রচনা করেন। এতে ইসলাম ও আধুনিক সভ্যতা পর্যালোচনা করার পর তিনি লিখেন, "ইসলাম নারীকে পুরুষের দাসত্ব করা থেকে মুক্তি দিয়েছে। ইসলাম শিক্ষা দেয়, মানুষ যেন পূর্বপুরুষের পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত থাকে। পুরুষ-নারী একই মৌল উপাদান থেকে সৃষ্ট। উভয়ের একই রকম আত্মা এবং মানসিক ও চারিত্রিক যোগ্যতা সমান হয়ে থাকে।"
তিনি আরো লিখেন, “আরবের এ শিকড় গাঁড়া রীতি ছিল যে, বর্শা ও তলোয়ার ব্যবহার করতে সক্ষমরা একমাত্র উত্তরাধিকারী হতে পারবে। কিন্তু ইসলাম দুর্বল-অসহায় লোকদের পক্ষাবলম্বন করেছে। নারীকে পিতা-মাতার
উত্তরাধিকারিণী সাব্যস্ত করেছে। কয়েক শত বছর পূর্বে ইসলাম নারীকে সম্পদের মালিকানার অধিকার দিয়েছে। তার ১৩ শত বছর অতীত হওয়ার পর ১৮৮১ ইংরেজিতে গণতন্ত্রের জনক ইংল্যান্ড ইসলামের সে নীতি আঁকড়ে ধরেছে এবং সে নীতিকে 'বিবাহিত নারীর আইন' নামকরণ করে নিজেদের আইনের অন্তর্ভুক্ত করেছে। পয়গাম্বরে ইসলাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক দিন পূর্বেই ঘোষণা করেছেন যে, "নারী পুরুষের অর্ধাংশ পাবে, নারীর অধিকার পবিত্র, তা থেকে নারী যেন বঞ্চিত না হয়', সে দিকে লক্ষ্য রাখবে।"
বিশিষ্ট খ্রিস্টান লেখিকা মিসেস এ্যানী বেসেন্ট তার রচিত The life and teaching of Mohammad গ্রন্থে 'ইসলামে নারীর মর্যাদা ও অধিকার' সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে এক জায়গায় লিখেন, "স্মরণ রেখ, ইসলামি বিধান- যার কিয়দাংশ ইংল্যান্ডেও চালু হয়েছে। যা নিশ্চয় সম্পূর্ণ ন্যায়ানুগ ও যুক্তিযুক্ত। সম্পত্তি ও তালাক সম্পর্কিত ইসলামি বিধি পশ্চিমা থেকে অনেক অগ্রগণ্য। আমরা আজকে যেগুলোকে নারী অধিকারের নীতি মনে করি তার তুলনায় ইসলামি নীতি নারীদের অধিকার অনেক ব্যাপকতর করেছে।"
'দি রিলিজিয়ন হিস্ট্রি অব দ্যা ওয়ার্ল্ড'-এর লেখক জেএম রবার্টস ইসলামে নারীর অধিকার সম্পর্কে লিখেছেন- "ইসলামের আগমন অনেক দিক বিবেচনায় বিপ্লবাত্মক। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায়, ইসলাম মালিকানা অর্জনে আইনগতভাবে নারীর অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করেছে। অথচ এ অধিকার খ্রিস্টীয় উনিশ শতক পর্যন্ত ইউরোপীয়ান অধিকাংশ রাষ্ট্রে বিদ্যমান ছিল না। ইসলামে গোলামেরও অধিকার ছিল। ঈমানদার লোকদের মাঝে কোনো শ্রেণিভেদ ছিল না। আর না ছিল কোনো জন্মগত বিভেদ। এই বিপ্লবের মূলে ছিল এমন কিছু ধর্মীয় নীতিমালা, যার ভিতরে সবকিছুই নিহিত রয়েছে।'
মোটকথা, ইসলামই নারীকে বেঁচে থাকার প্রকৃত স্বাধীনতা দিয়েছে। ইসলাম পুরুষকে নারীর অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকতে জোর তাগিদ দিয়েছে। তারপরও আজকের কথিত নারীবাদীরা ইসলামের নাম শুনলে মুখ ভেংচি কাটে। তাই তাদের উদ্দেশ্যে বলতে বাধ্য হই হে নারী! কার উসিলায় শিন্নি খাও চিনলা না!
📄 অবক্ষয়ের টর্নেডো
সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ে চারপাশ বিষিয়ে ওঠছে। ক্রমেই এ অবক্ষয় মহামারি আকার ধারণ করছে। এ অবক্ষয়ের টর্নেডোতে সব লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ছে। তাই এ অবক্ষয়রোধে সকলের আন্তরিকতাপূর্ণ অংশগ্রহণ জরুরি। প্রথমে এই রোগ শনাক্ত করতে এমন চিকিৎসকের কাছে গমন করা প্রয়োজন যার এ বিষয়ে দক্ষতা, পারঙ্গমতা ও অভিজ্ঞতা। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে রোগ শনাক্ত হলেও সত্যিকারের চিকিৎসক কিংবা প্রকৃত চিকিৎসা লাভ করা সম্ভব হয় না। ফলে আমাদেরকে রোগ নিয়েই চলাফেরা করতে হয়।
সত্যিকারের রোগ প্রতিরোধের জন্য সত্যিকারের দুনিয়াবিমুখ আলেমে দীনের কাছে গমন করা জরুরি। তাদের পরামর্শ শুনুন। আর সেই মতে চলুন। আচ্ছা! বলুন তো, এই যে গণহারে পরীক্ষাগুলো হয়, এতে দীনের লেশমাত্র আছে কি?
আমার যুক্তি হলো, যে প্রশিক্ষক মসজিদে থাকেন, মানুষের হৃদয় দখল করে আছেন এবং কথা ও কাজে তাদের মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছেন, তাদের কাছে কোনো পরীক্ষা নির্দেশক নেই, সফলতা-ব্যর্থতা নেই। তারপরও তিনি এসব করতে পেরেছেন, অজেয়কে জয় করে নিয়েছেন।
আমার কথা থেকে একথা ভাবার মোটেই অবকাশ নেই যে, আমি দীনি প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের বিরোধী। কখনও নয়; বরং আমি তার জোরালো পক্ষপাতী। উপরন্তু আমি এখানেই বেশি সময় ব্যয়ের কথা বলি। আমরা যদি অন্যায়-অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলি, বিয়ে প্রথার সহজায়ন করি; অথচ আত্মিক উন্নতি সাধন এবং দীনি দায়িত্ববোধ অর্জন করতে না পারি, তাহলে এসব আমাদের কোনো কাজে আসবে না।
তাই জীবনের সকল ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহর ভয়ই হলো সর্বোচ্চ ও সর্বাধিক কার্যকর শক্তি। যদি এই শক্তি অর্জিত না হয়, তাহলে নীতি-নৈতিকতা, চারিত্রিক উৎকর্ষ এবং সাংবিধানিক আইন- কোনো কিছু দিয়েই এর ক্ষতি পূরণ করা যাবে না।
কারণ, নীতি অটুট থাকে পুলিশের উপস্থিতি পর্যন্ত। একই সাথে চরিত্র বহাল থাকে মানুষের দৃষ্টির সম্মুখ পর্যন্ত। এখন কেউ যদি মানুষ ও পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে পারে, তাহলে সাথে সাথে নীতি ও চরিত্র দুটোই অবনতি।
ঘটবে অবশ্যম্ভাবীরূপে। এটিই বাস্তবতা। কিন্তু তার মধ্যে যদি আল্লাহ তায়ালার ভয় থাকে তাহলে তার দ্বারা গোচরে কিংবা অগোচরে কোনোভাবেই অপরাধ সংঘটিত হওয়া সম্ভব নয়। তাই জীবনপথের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো আল্লাহর ভয়।
মানুষের সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য হলো, তারা লাভ সামনে রেখে কাজ করে। জগতে এমন কেউ আছে কি, যে প্রচণ্ড ক্ষুধা পেটে চেপে জীবনের একমাত্র সম্বল দুটি পয়সা মানুষের অগোচরে লুকিয়ে রাখবে এবং না খেয়ে সময় পার করতে থাকবে?
আপনারাই বলুন তো, কে এমন ব্যক্তি?
হ্যাঁ, তিনি হলেন মুমিন ব্যক্তি। তিনিই সত্যিকারের মুমিন ব্যক্তি। তিনিই এমন করতে পারেন; বরং এর চেয়ে বেশিও করতে পারেন।
কারণ তিনি বিশ্বাস করেন যে, পরকালে মহান আল্লাহ এক পয়সার বিনিময়ে বহুগুণ বাড়িয়ে দিবেন এবং জগতের সাধারণ ক্ষুধার তিক্ততাকে পরলোকের অসাধারণ মিষ্টতায় পরিণত করে দিবেন।
সত্যিকারের মুমিন ব্যক্তির মাঝে সবসময় আল্লাহ তায়ালার ভয় বিরাজমান থাকে। ফলে তার দ্বারা কোনো লজ্জাহীন কাজ করা সম্ভব হয় না। লজ্জাশীলতাকে মানুষের ধর্মগত নৈতিক স্বভাব ও আখলাক স্বীকৃতি দিয়ে এ মর্মে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা দিয়েছেন- إِنَّ لِكُلِّ دِيْنٍ خُلُقًا وَ خُلُقُ الْإِسْلَامِ الْحَيَاءُ.
প্রত্যেক দীনেরই একটি নৈতিক স্বভাব ও আখলাক রয়েছে। আর ইসলামের সেই আখলাক বা নৈতিক চরিত্রটি হচ্ছে লজ্জাশীলতা।
এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন- الْحَيَاءُ مِنَ الْإِيْمَانِ وَالْإِيْمَانُ فِي الْجَنَّةِ.
লজ্জাশীলতা হচ্ছে ঈমানের অঙ্গ আর ঈমানের ঠিকানা হচ্ছে জান্নাত।
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে- الْحَيَاءُ وَالْإِيْمَانُ قَرْنَا جَمِيعًا .
লজ্জাবোধ ও ঈমান হচ্ছে এক সাথে মিলিত ভূস্বরূপ। একটির অবর্তমানে অপরটির বিয়োগ অনিবার্য।
তাই যে মুমিন একমাত্র আল্লাহকে ভয় করেন তিনি সবসময় অশ্লীলতাকে লজ্জা করে কল্যাণের কাজে নিয়োজিত এবং অকল্যাণ থেকে বিরত থাকেন। চাই একাধিক হোক বা মানুষের সাথে হোক। কারণ, তিনি বিশ্বাস রাখেন যে, আল্লাহ তার সাথে আছেন, তিনি সর্বদা তাকে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে, ভালো-মন্দ যা কিছুই করা হোক না কেন, এগুলোর কোনোটিই বৃথা যাবে না; বরং আল্লাহর কাছে অচিরেই এসবের প্রতিদান মজুদ পাবেন। আর তার সব সাধনা যেই উপলক্ষকে কেন্দ্র করে, তাহলো মাওলার দীদার। প্রেমিক যেমন তার প্রেয়সী কিংবা প্রেমাস্পদের জন্য চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করেন, প্রকৃত আল্লাহপ্রেমিক আশিকও মাওলার সাক্ষাৎলাভের আশায় সব করে থাকেন।
তাই এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, সামাজিক অবক্ষয় কিংবা নৈতিক অবক্ষয়ের টর্নেডো রোধের একমাত্র মাধ্যম হলো আল্লাহভীতি।
📄 লিভ টুগেদার
অন্যায়ের দাবানলে পুড়ছে চারদিক। এ আগ্নেয়গিরির লাভা নীতিনৈতিকতা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ভস্ম করে দিচ্ছে। এর স্বীকার হচ্ছে গোটা দেশ ও জাতি। পাশাপাশি এর হাত ধরে ভাঙন ধরছে পরিবারে। ছড়িয়ে পড়ছে গৃহবিবাদ।
ইদানীং লিভ টুগেদারের প্রবণতা আমাদের সমাজে প্রকট আকার ধারণ করছে। বিবাহের পূর্বেই প্রস্তাবিত বর-কনের যৌন চাহিদা পূরণকে এককথায় লিভ টুগেদার বলা হয়ে থাকে। মূলত এসবই আমাদের সমাজের জন্য এক ভয়াবহ বার্তা বয়ে বেড়াচ্ছে। পর্দাহীনতার ক্রমান্বয়ে এ অপরিণামদর্শিতা আমাদের আধুনিক মহলে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে ওঠছে। লিভ টুগেদার ধর্ষণের প্রকোপ মাত্রাতিরিক্ত হারে বৃদ্ধি ঘটায়। ধর্ষণের প্রকৃত সংখ্যা জানা সহজ নয়। অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগী এ বিষয়ে রিপোর্ট করে না। ফলে যে সংখ্যা পাওয়া যায়, বাস্তবে তা অনেক বেশি ঘটে। এ পর্যায়ে লিভ টুগেদারের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছি।
ব্রিটিশ পুলিশের মতে, ১৯৮৪ সালে এক বছরে ব্রিটেনে ২০ হাজারের অধিক নিগ্রহ এবং দেড় হাজার লিভ টুগেদার ধর্ষণের ঘটনা রেকর্ড করা হয়। The London Rape Crisis Center-এর মতে, ব্রিটেনে প্রতিবছর অন্তত পাঁচ থেকে ছয় হাজার ধর্ষণের ঘটনা রেকর্ড হয়ে থাকে। আর প্রকৃত সংখ্যা তার চাইতেও বেশি। উক্ত সংস্থার মতে, "If we accept the
highest figures, we may say that, on average, one rape occurs every hour in England." মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি সবচাইতে ভয়াবহ। এখানে বিশ্বের সর্বাধিক সংখ্যক ধর্ষণের ঘটনা ঘটে থাকে। সে সংখ্যা জার্মানির সংখ্যার চাইতে চারগুণ, ব্রিটেনের চাইতে ১৮ গুণ আর জাপানের চাইতে প্রায় বিশগুণ বেশি।
সবচাইতে উদ্বেগজনক এবং বাস্তবতা এই যে, ৭৫% ভাগ ধর্ষণের ঘটনাই ঘটে থাকে পূর্ব-পরিচিতের দ্বারা। আর ১৬% নিকট-আত্মীয় বা বন্ধুর দ্বারা। যাকে লিভ টুগেদারের সংজ্ঞায় ফেলে থাকেন বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী।
National Council for Civil Liberties নামক সংস্থার মতে, ৩৮% ক্ষেত্রে পুরুষ তার অফিসিয়াল ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব প্রয়োগ করে নারীকে ধর্ষণ করে থাকে। আর ৮৮% মহিলা কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হয়ে থাকেন। এই হলো তথাকথিত উন্নত ও নারী-স্বাধীনতার দাবিদার দেশগুলোর অবস্থা।
বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে বিবাহপূর্ব সহবাস এবং 'Live Together' -এর প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৬০ সালে জন্মগ্রহণকারী ব্রিটেনের নারীদের প্রায় অর্ধেক প্রাক-বিবাহ সহবাসের অভিজ্ঞতা অর্জন করে। এর পক্ষে তাদের যুক্তি ছিল যে, এর ফলে নর-নারী একে অপরকে ভালোভাবে জানতে পারে এবং এর পর বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলে তা স্থায়িত্ব লাভ করে থাকে। কিন্তু বাস্তবতা তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ইংল্যাণ্ডেই সর্বাধিক বিবাহ-বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটে থাকে। ১৯৮৩ সালে যুক্তরাজ্যে যেখানে এক লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটে। ১৯৯৪ সালে তার সংখ্যা দাঁড়ায় এক লক্ষ پঁয়ষট্টি হাজারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭০ সালে বিবাহ-বিচ্ছেদের সংখ্যা ছিল ৭ লক্ষ ৮ হাজার, আর ১৯৯০ সালে তা দাঁড়ায় ১১ লক্ষ ৭৫ হাজারে। পক্ষান্তরে বিবাহের হারে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পরিবর্তন হয়নি।
আজকের বিশ্বের কুমারী মাতৃত্বের অন্যতম কারণ হলো পর্দাহীনতা। পশ্চিমা-বিশ্বের তথাকথিত 'নারী স্বাধীনতা'র আরেক অভিশাপ হলো কুমারী মাতৃত্ব।
ব্রিটেনে এক জরিপে দেখা যায় যে, ১৯৮২ সালে যেখানে কুমারী-মাতার সংখ্যা ছিল ৯০ হাজার, ১৯৯২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লক্ষ ১৫ হাজারে।
১৯৯২ সালে জন্ম নেয়া শিশুদের ৩১% ছিল অবিবাহিতা মাতার সন্তান। এই অবিবাহিতা বা কুমারী-মাতাদের মধ্যে আড়াই হাজারের বয়স ১৫ বছরের নিচে। বৈধ বিবাহের মাধ্যমে জন্ম নেয়া শিশুর তুলনায় অবৈধ শিশুর জন্মের হারও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অপরদিকে অবৈধভাবে জন্ম নেয়া শিশুর দায়ভার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বর্তাচ্ছে কুমারী-মাতা বা একক-মাতৃত্বের (single mother) ওপর। নারীর ওপর কুমারী-মাতৃত্বের এই দায়ভার পশ্চিমা-বিশ্বে নারী-নিপীড়নের এক নিষ্ঠুর উদাহরণ।
এতক্ষণ পর্যন্ত তথাকথিত নারী স্বাধীনতার নামে প্রচলিত লিভ টুগেদারের পশ্চিমা জগতের ঘুণেধরা সমাজের একটি ভয়ঙ্কর চিত্র তুলে ধরা হলো। বাস্তবচিত্র তার চাইতেও আরো অনেক বেশি ভয়াবহ। অর্থনৈতিক চাকচিক্য আর প্রযুক্তিগত উন্নতির আড়ালে তথাকথিত 'আধুনিক' বিশ্বের সমাজ ও পারিবারিক ব্যবস্থায় আজ ধস নেমেছে। নারী-স্বাধীনতা ও ব্যক্তি-স্বাধীনতার নামে নারী আজ পদে পদে লাঞ্ছিত ও নিগৃহীত হচ্ছে, ব্যবহৃত হচ্ছে ভোগের সামগ্রী হিসেবে। এ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ও জীবন নির্ধারণের সঠিক ও পূর্ণ অনুসরণ এবং পর্দা বিধানকে গ্রহণ করা।
উল্লিখিত সবগুলো পরিণামই ইহলৌকিক পরিণাম। জরিপগুলোকে সুস্থ বিবেক ও মানসিকতা নিয়ে বিবেচনা করলে একটিমাত্র কারণই খুঁজে পাওয়া যায়। আর সেটি হলো, পর্দাহীনতার বিস্তৃতি। যদি আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদেরকে তাদের সম্ভ্রম হেফাজতের শিক্ষা দিতাম কিংবা তা রক্ষার ব্যবস্থা করতাম তাহলে আমাদের দেশকে ক্রমেই নরকের কাছে পৌছার চিত্র দেখতে হতো না। কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে-
قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَرِ هِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ হে নবী! আপনি মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে। [সূরা নূর: ৩১]
পরীক্ষামূলকভাবে এবং নিজস্বভাবে সেসব এলাকা বা ব্যক্তিত্ব ইসলামের আলোয় আলোকিত হয়ে পর্দার বিধানকে গ্রহণ করেছেন, তারাই রক্ষা পেয়েছেন এই ভয়াবহতা থেকে।
এছাড়াও পর্দার বিধান লঙ্ঘন করার কারণে রয়েছে পারলৌকিক পরিণাম। আর এই ইহলৌকিক পরিণামের একটি শেষ বা সীমান্ত রয়েছে। কিন্তু পারলৌকিক পরিণাম বা শাস্তির কোনো শেষ বা সীমান্ত নেই। সুতরাং একটি সুস্থ বিবেক এবং একটি সুস্থ কিয়াস বা চিন্তাশক্তির বিবেচনায় পর্দা অপরিহার্য একটি বিধান প্রমাণিত।
📄 যৌনরোগের ঔষধ কী
যৌন রোগের ভয়াবহতার কথা বহুবার বলেছি। এর থেকে বেঁচে থাকার জন্য বহু টিপসও বলেছি। কিন্তু সত্যিকারার্থে যৌন রোগের ঔষধ কী? হ্যাঁ সেটিই বলছি। ঔষধ হচ্ছে আল্লাহর বিধান ও প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে ফিরে আসা। আল্লাহ কোনো কিছু হারাম করলে এর স্থলে অন্য একটা কিছু হালাল করে দেন। যেমন- আল্লাহ সুদ হারাম করেছেন; এর স্থলে ব্যবসায়ে কে করেছেন হালাল। যেনা হারাম করেছেন; বিপরীতে বিবাহকে করেছেন হালাল। সুতরাং এ রোগের প্রকৃত ঔষধ হলো বিয়ে করা।
বিয়েই একমাত্র সংশোধনের পথ। আমি ইসলামি সংস্থাগুলোর কাছে সুপারিশ করছি, তারা যেন এমন একটি আলাদা বিভাগ চালু করে যেখান থেকে যুবকদের বিবাহের প্রতি উৎসাহিত করা হবে। যেখান থেকে বিয়ে তাদের জন্য সহজ করে দেয়া হবে। উপযুক্ত পাত্র-পাত্রীর সন্ধান দিবে। গরিব হলে ঋণ দিবে। এ প্রস্তাবনা অনেক বিস্তারিত। কেউ এটি বাস্তবায়ন করতে চাইলে আমি আরও ব্যাখ্যা করে দিব।
যৌনতার বিবরণ বাস্তবতার চেয়ে বেশি মনে প্রভাব ফেলে। যদি গান, গল্প, চিত্রশিল্প না থাকত, না থাকত নারীদের রমণীয় করে উপস্থাপন ও ভালোবাসার রঙ-বেরঙের বর্ণনা! তাহলে যারা যুবক আছে তারা শারীরিক সম্পর্কের তীব্রতা এখন যা অনুভব করছ এর দশ ভাগের এক ভাগও অনুভব করতে না। শারীরিক সম্পর্কটা আসলে চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিষয়ের মতোই। কিন্তু কাজটা অনেকটা নোংরা ধরনের। এজন্যই আল্লাহ তায়ালা এ সম্পর্কের মধ্যে নেশা সৃষ্টি করে দিয়েছেন; যা মানুষকে অস্থির, অন্ধ ও বধির করে তোলে। ফলে মানুষ এতে নোংরা কিছু খুঁজে পায় না। এ নেশাটাই হলো কামনা, প্রবৃত্তি ও যৌন চাহিদা।
কেউ যদি মাথার ঘিলু খাটিয়ে ভাবে কিন্তু হাড়ের ঘিলু দিয়ে না ভাবে, তাহলে বিষয়টি তার কাছে আমি যা বলেছি তা-ই মনে হবে। এই সুড়সুড়ি প্রদায়ক বস্তুগুলো তখনই কাজ করে এবং তিক্ত ফল দেয় যখন খারাপ সঙ্গী মিলে। যে অশ্লীল পথ দেখায়। পৌঁছে দেয় অশ্লীলতার দুয়ারে। অশ্লীলতা
যেন পূর্ণ প্রস্তুত একটি গাড়ি। এক্ষেত্রে বন্ধুবান্ধবরা স্টার্টের কাজ করে। গাড়ি যত শক্তিশালী আর প্রস্তুত হোক না কেন স্টার্ট ছাড়া কোনো কাজ করে না।
যদি বিয়ে করা সম্ভব না হয়, যদি অশ্লীলতা অপছন্দ হয় তাহলে আত্মউন্নয়ন ছাড়া উপায় নেই। আমি এ বিষয়টি মনোবিজ্ঞানের পরিভাষা দিয়ে বোঝাতে চাচ্ছি না। এজন্য একটি উদাহরণ দিই-
আগুনে উথলানো কেটলি অনেকেই দেখে থাকবে। যদি এর মুখ মজবুত করে বন্ধ করে দেয়া হয় আর নিচে জ্বাল দেয়া হয়, তাহলে এতে বিস্ফোরণ ঘটবে। আর যদি নিচে ছিদ্র করে দেয়া হয় তাহলে পানি পড়ে যাবে। কেটলি পুড়ে যাবে। পক্ষান্তরে একটু গভীরভাবে তাকালে দেখা যাবে যে, এই বাষ্পেরই সঠিক ব্যবহার করে করে কল-কারখানা চলে, ট্রেন চলে, আরও অনেক বিস্ময়কর কাজ হয়।
প্রথম প্রকারের উপমা হলো, যে কামনাকে জোরপূর্বক দমিয়ে রাখে আবার কামনা নিয়ে ভাবনায় বিভোর থাকে। আর দ্বিতীয় প্রকারের উপমা হলো, যে কামনা পূরণে ভ্রান্ত পথ অবলম্বন করে চাহিদা পূরণের জন্য নিষিদ্ধ জায়গায় গমন করে। তৃতীয় প্রকারের উপমা হলো, আত্মউন্নয়নকারী।
আত্মউন্নয়ন হলো নিজেকে আত্মিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও দৈহিক পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রফুল্ল রাখা। যার মাধ্যমে পুঞ্জীভূত এ শক্তি নিঃশেষ হবে। খোদামুখিতা, ইবাদত-বন্দেগী ও কর্মব্যস্ততা এ আবদ্ধ শক্তিকে কাজে লাগাবে। মনে যা কল্পনা আসে তা গজল, গল্প ও কবিতায় তুলে ধরলে অবস্থার অনেকটাই উন্নতি হবে। দৈহিক পরিশ্রম খেলাধুলাও এক্ষেত্রে অনেক কার্যকর।
মানুষ নিজেকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। নিজের ওপর কাউকে বেশি প্রাধান্য দেয় না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশস্ত কাঁধ, সুদৃঢ় বুক আর পেশীবহুল হাত দেখলে যে কোনো নারীদেহের চোখে তা ভালো লাগবে। এর জন্য এত সুন্দর দেহ, পেশী ও শক্তি বলি দেবে না। কালো কিংবা নীল চোখের জন্য হাড্ডিসার কঙ্কালে পরিণত হতে চাইবে না। তাই বিবাহই এ রোগের একমাত্র ওষুধ। এটাই পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা। বিয়ে সম্ভব না হলে আত্মউন্নয়ন। এটা সাময়িক সমাধান। কিন্তু বেশ শক্তিশালী ও উপকারী। এতে ক্ষতির লেשমাত্রও নেই। নেই কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।