📄 আমি ঠিক তো জগৎ ঠিক
নীতিবাক্য আওড়ানো কিংবা অন্যকে উপদেশ দেয়ার মতো সহজ কাজ পৃথিবীতে কমই আছে। আমরা পুরুষরা নারীদের সমালোচনা করি। কিন্তু নিজের সমালোচনা কেউ করলে তা পছন্দ করি না। মূলত ইসলামি ফরজ বিধানগুলো নারী-পুরুষ সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই ইসলামের সুমহান আদর্শের হাতছানি। ইসলাম ধর্মে নারী ও পুরুষ উভয়ের ওপর ধর্মীয় বিধানাবলি পালনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। শারীরিক গঠন ও বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নারীর ক্ষেত্রে অবশ্যপালনীয় বিধানাবলি কোনো কোনো সময় শিথিলযোগ্য। এছাড়া সর্বদা নারী ও পুরুষ উভয়কেই ইসলামের নিময়কানুন মেনে চলতে হবে এমনটিই সত্য।
যদি কোনো নারী অথবা পুরুষ ওই বিধানাবলি লঙ্ঘন করে, তাহলে তাকে শাস্তিভোগ করতে হবে। যা স্পষ্ট করে কুরআন মাজিদে বলা হয়েছে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই বিধানাবলির ব্যাখ্যা একচোখা নীতিতে বিশ্লেষণ করে নারীর ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়। যা মোটেই সমীচীন নয়। নিজে ঠিক না হয়ে অন্যকে উপদেশবার্তা শোনানোকে কুরআন মাজিদে মুনাফিকের লক্ষণ বলা হয়েছে। আমি মনে করি, আমি ঠিক তো জগৎ ঠিক। তাই সর্বাগ্রে প্রয়োজন নিজের ভুল নিজে বোঝা।
ধর্মীয় গোঁড়ামি, অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের কারণে নারীদের পুরুষের চাপিয়ে দেয়া অনেক বিধানের যাঁতাকলে পিষ্ট হতে হয়। যদিও শরিয়তের ওই বিধানাবলি পুরুষের জন্যও প্রযোজ্য। ইসলামের এমনই একটি অবশ্য পালনীয় বিধান হলো পর্দা। যা নারী-পুরুষ উভয়ের ওপর আরোপিত
হয়েছে। কিন্তু যুগে যুগে এই পর্দাপ্রথা শুধু নারীর ওপর কঠোরভাবে আরোপের কারণেই তথাকথিত প্রগতিবাদীরা এ প্রথাকে নারীর জন্য কারাগার বলতে সুযোগ পেয়েছে।
এ কথা ঠিক যে, সমসাময়িককালে এ ব্যবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। তবে এ কথাও সত্য যে, আজও অবৈধ পর্দা প্রথার বেড়াজাল ছিন্ন করে ইসলামের অনুসারী সব নারী ইসলামের দেয়া স্বাধীনতার স্বাদ পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করতে পারেনি। আর আজো পুরুষের ওপর যে পর্দা ফরয করা হয়েছে, সে বিষয়টি অধিকাংশ পুরুষের অগোচরে রয়ে গেছে। ফলে অনেকে মনে করে থাকে যে, পর্দাপ্রথা শুধু নারীর জন্য; পুরুষের জন্য নয়। প্রকৃতপক্ষে এমন ধারণা ডাহা মিথ্যা ও সত্যের অপলাপ।
কুরআন মাজিদে নারীর পাশাপাশি পুরুষকেও পর্দা পালন করার জন্য কঠোরভাবে বলা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে- قَدْ أَنْزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيشًا وَلِبَاسُ التَّقْوَى
তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকার ও বেশভূষার জন্যে আমি পোশাক দিয়েছি। তাকওয়ার পোশাকই সর্বোৎকৃষ্ট। [সূরা আরাফ: ২৬]
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কঠোর নির্দেশদান করেছেন যে, কোনো নারী অথবা পুরুষ যেন কোনোভাবেই পর্দা লঙ্ঘন না করে। তিনি বলেন, যে আপন ভাইয়ের সতরের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে সে অভিশপ্ত। [জাসসাস: আহকামুল কুরআন)
এক্ষেত্রে শরিয়তের বিধান হলো, কোনো পুরুষ কোনো পুরুষের সামনে এবং কোনো নারী কোনো নারীর সামনেও উলঙ্গ হতে পারবে না। সিহাহ সিত্তাহ হাদিসগ্রন্থের অন্যতম মুসলিম শরিফে বলা হয়েছে যে, কোনো পুরুষ কোনো পুরুষকে এবং কোনো নারী কোনো নারীকে যেন উলঙ্গ অবস্থায় না দেখে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপরোক্ত বাণীটি দ্বারা এ বিষয় স্পষ্ট যে, শুধু পুরুষের সামনে নারী পর্দা করবে তা নয়; বরং নারীর সামনে পুরুষও পর্দা করবে।
উপরন্তু নারীর সামনে নারী এবং পুরুষের সামনে পুরুষের পর্দা করাও ধর্মীয় বিধানাবলির অন্তর্ভুক্ত। এসব নির্দেশনার পাশাপাশি পুরুষের জন্য স্পষ্টভাবে পর্দার কথা বলা হয়েছে। শারীরিক গঠন বিবেচনা করে এই নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। পুরুষের জন্য শরীরের নাভি ও হাঁটুর মধ্যবর্তী অংশ ঢেকে রাখার জন্য মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ প্রদান করেছেন।
হযরত আলী রা. থেকে বর্ণিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমরা নিজের উরু কাউকে দেখাবে না এবং কোনো জীবিত বা মৃত ব্যক্তির উরুর প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করো না। [তাফসিরে কবীর] উপরোক্ত নির্দেশগুলো সর্বজনীন নির্দেশ। এই নির্দেশ নারীর পাশাপাশি পুরুষের ক্ষেত্রেও সমানভাবে পালনীয়।
📄 চোখ যে মনের কথা বলে
চোখেরও ভাষা আছে। আজকের বিশ্বে চোখের ভাষার খুব কদর করা হয়। চোখের ভাষাটাই হলো দৃষ্টি। এই দৃষ্টি সকল অন্যায়ের মূল। দৃষ্টির মধ্যে এক জাদুকরি প্রভাব থাকে। বর্তমান বিজ্ঞানীগণ যে চোখের ভাষা বোঝার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠেছেন তা মূলত দৃষ্টিকে কেন্দ্র করেই। এই কিছুকাল আগেও কথিত আধুনিক পাশ্চাত্য মস্তিষ্কের চিন্তাধারা ছিল যে, কারো প্রতি তাকালে আর কী হবে? এটাতো শুধু দেখা, কোনো ভুল বা অন্যায় কাজ তো নয়! তাদের মতে, এতে ক্ষতির কিছুই নেই। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এখন বিজ্ঞান বলছে, দৃষ্টির প্রভাব মানবজীবনে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে-
قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا .. হে রাসূল! আপনি মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন। [সূরা নূর: ৩০] আরো ইরশাদ হয়েছে-
وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ .. ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশমান, তাছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে। তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, স্ত্রীলোক অধিকারভুক্ত বাঁদী, যৌনকামনামুক্ত পুরুষ ও বালক, যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ, তাদের ব্যতীত কারো কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তারা যেন তাদের গোপন সাজসজ্জা প্রকাশ করার জন্য জোরে পদচারণা না করে। মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর সামনে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও। [সূরা নূর: ৩১/
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- لَعَنَ اللَّهُ النَّاظِرَ وَالْمَنْظُورَ إِلَيْهِ. 'ঘুরে ঘুরে রূপদর্শনকারী পুরুষ আর রূপ প্রদর্শনকারী নারীদের প্রতি আল্লাহ তায়ালার লানত হোক।' [গাযযুল বাছার: ১৫ ৭.]
চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, দৃষ্টির মাঝে মানুষের এমন এক শক্তি থাকে যার দ্বারা অন্যের দেহের বড় ধরনের ক্ষতি পর্যন্ত করতে পারে এবং হয়েও থাকে। দৃষ্টি যে কোনো সুন্দর জিনিসকে অসুন্দরে পরিণত করতে পারে। বিশেষত নারীর ক্ষেত্রে কোনো পুরুষ যদি কোনো নারীর প্রতি ঐ সম্মোহনী শক্তির বলে তাকায় তাহলে ঐ নারীর রূপের যৌবন এমনকি দেহের ওপর পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে।
আমরা কি কখনো চিন্তা করে দেখেছি যে, কেউ যদি তার সামনে হঠাৎ একটি বাঘ দেখতে পায়, তাহলে তার দেহ ও প্রাণের মধ্যে কী অবস্থার সৃষ্টি হয়? আবার এটাও সত্য যে, কোনো সুস্বাদু খাবার দেখলে অটোমেটিক মনের মধ্যে এক ধরনের ভালো লাগা জাগ্রত হয়। এটি অবশ্যই দৃষ্টি ও নজরের প্রভাব বৈ আর কী হবে!
চোখ বা দৃষ্টির ফলেই সকল অপরাধ সংঘটিত হয়ে থকে। তাই দৃষ্টি হলো অপরাধের মাতৃসদন। ইসলাম নারীকে যেমন তার দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছে, তেমনি পুরুষকেও সতর্ক করেছে তার দৃষ্টি হেফাজত করতে।
এ কারণে পুরুষদের দৃষ্টি সংযত রাখার আদেশ করা হয়েছে। এটি নারীর ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। অপরিচিত নারীর রূপ ও সৌন্দর্য শোভা দর্শন করে আনন্দ উপভোগ করা পুরুষের জন্য অনাচার সৃষ্টিকারী। আর অনাচার বিপর্যয়ের সূচনা স্বাভাবিক ও প্রকৃতিগতভাবে দৃষ্টি বিনিময়ের মাধ্যমে হয়। এজন্য সর্বপ্রথম এই পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
ইসলামে নারী এবং পুরুষ উভয়ের দৃষ্টি হেফাজতের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ প্রসঙ্গে ইরশাদ করেছেন, চোখের দৃষ্টি ইবলিসের বিষাক্ত তীরসমূহের মধ্য হতে একটি তীর। [তাবারানী]
অন্য হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি দৃষ্টির হেফাজত করবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে এমন ঈমান দান করবেন, যার স্বাদ সে অন্তরে অনুভব করবে। [বুখারি শরীফ]
প্রশ্ন হতে পারে যে, চোখ খুলে দুনিয়ায় বসবাস করতে গেলে সব কিছুর ওপরেই দৃষ্টি পতিত হবে। আর কবির ভাষায় যদি কেউ বলে- 'তুমি সুন্দর! তাই চেয়ে থাকি, সে কি মোর অপরাধ!' বাস্তবিকপক্ষে উপরোক্ত উক্তি কবির দৃষ্টিতে কাব্যিক ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করলেও ইসলামের দৃষ্টিতে অপরাধ হিসেবে গণ্য। তবে হ্যাঁ, কারো মনে যদি এমন প্রশ্নের উদ্রেক হয় যে, বর্তমান বিশ্বে আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে ইসলামের এমন বিধান মেনে চলা সম্ভব নয়। অর্থাৎ কোনো পুরুষ কোনো পরনারীকে দেখবে না এবং কোনো নারী কোনো পরপুরুষকে দেখবে না, এটি অসম্ভব। কারণ পথেঘাটে চলতে-ফিরতে, চাকরি করতে নারী-পুরুষের সঙ্গে দেখা হবে, কথা হবে- এটাই স্বাভাবিক।
আমরাও উপরোক্ত ভদ্র মহোদয়দের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলতে চাই যে, ইসলাম এমনটিই চেয়েছে যে, নারীরা বন্দিজীবন থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করুক। তবে সেটা হতে হবে অবশ্যই পর্দা মেনে। অর্থাৎ পথেঘাটে চলতে ফিরতে নারীর ওপর পুরুষের অথবা পুরুষের ওপর নারীর দৃষ্টি পড়বে, এটাই স্বাভাবিক। তবে সেই দৃষ্টি বিনিময় বারবার ঘটা অস্বাভাবিক। যদি এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যে, কোনো নারীর ওপর হঠাৎ করে কোনো পুরুষের দৃষ্টি পড়ে যায়, তাহলে তিনি তাৎক্ষণিক দৃষ্টি সংযত করবেন এবং দ্বিতীয়বার দৃষ্টি নিক্ষেপ করবেন না। এ প্রসঙ্গে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেছেন, যে ব্যক্তি কোনো অপরিচিত নারীর প্রতি যৌন লোলুপ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, কেয়ামতের দিন তার চোখে উত্তপ্ত গলিত লৌহ ঢেলে দেয়া হবে। [ফাতহুল কাদীর]
ইসলাম গোঁড়ামির ধর্ম নয়। তাই একান্ত প্রয়োজনে পর্দার বিধান কিছু ক্ষেত্রে শিথিল করা হয়েছে। যেমন- ডাক্তার রোগীকে দেখার স্বার্থে শুধু তার মুখমণ্ডল নয়, প্রয়োজন হলে সতরও দেখতে পারবে। এছাড়া বিয়ে করার সময়, বৃদ্ধ, রুগ্ন ব্যক্তি ও বালকের জন্য পর্দা সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
মনে রাখবেন, যদি নারী-পুরুষ উভয়ই ইসলামের পর্দার বিধানাবলি যথাযথভাবে পালন করে তাহলে সর্বত্র নারী নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবে। আর পুরুষের ওপর অর্পিত পর্দার বিধানাবলি যদি পুরুষরা যথাযথভাবে মেনে চলে তাহলে নারীকে পর্দা প্রথার নামে ঘরে বন্দি করে রাখার প্রয়োজন হবে না। সত্যিকার অর্থে যদি এমনটি সম্ভব হয়, তাহলে সমাজে অনাচার-ব্যভিচার, বিশেষ করে বর্তমান সময়ে আলোচিত ইভটিজিংয়ের জন্য আলাদা কোনো আইন প্রণয়নের আবশ্যকতা থাকবে।
না। কারণ ইসলাম ধর্মের বিধান অনুসারে পুরুষ পথেঘাটে এবং কর্মক্ষেত্রে দৃষ্টি সংযত রেখে চলাফেরা করবে। এমনটি যদি প্রকৃতপক্ষে সম্ভব হয়, তাহলে নারী নিরাপদ থাকবে। বস্তুত পুরুষ যদি তার দৃষ্টি হেফাজত করে, তাহলে এ কথা অচিরেই সত্যি হয়ে উঠবে যে, পুরুষের পর্দায় নিরাপদ নারী। একথা অস্বীকার করার জো নেই যে, নারীদের পাশাপাশি পুরুষরাও পর্দা মেনে চলেছে।
ইসলাম ধর্মে নারী ও পুরুষ উভয়ের ওপর ধর্মীয় বিধানাবলি পালনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিশেষ করে ধর্মীয় গোঁড়ামি, অজ্ঞতা, কুসংস্কারের কারণে পুরুষের চাপিয়ে দেয়া অনেক বিধানাবলির যাঁতাকলে নারীদের পিষ্ট হতে হয়। যদিও শরিয়তের ওই বিধানাবলি পুরুষের জন্যও প্রযোজ্য। এমনই একটি অবশ্য পালনীয় ইসলামের বিধান হলো দৃষ্টির হেফাজত। যা নারী-পুরুষ উভয়ের ওপর আরোপিত হয়েছে।
অন্যদিকে আজো পুরুষের ওপর যে পর্দা ফরজ করা হয়েছে, সে বিষয়টি অনেক পুরুষের অগোচরে রয়ে গেছে। ফলে সমাজে অনাচার, ব্যভিচার ও যৌন হয়রানির মতো ভয়াবহ অপরাধ দিন দিন বেড়েই চলেছে। কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে- 'হে মানবসন্তান! আল্লাহ তায়ালা তোমাদের শরীর আবৃত করার জন্য পোশাক অবতীর্ণ করেছেন। এটি তোমাদের শোভাবর্ধক।' [আল আরাফ: ২৬]
এ আয়াতের মর্মানুযায়ী শরীর আবৃত করা প্রত্যেক নারী-পুরুষের জন্যই ফরজ করা হয়েছে।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কড়া নির্দেশদান করেছেন, কোনো নারী অথবা পুরুষ যেই হোন না কেন তিনি যেন কোনোভাবেই পর্দা লঙ্ঘন না করেন। তিনি বলেন, 'যে আপন ভাইয়ের সতরের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে সে অভিশপ্ত।'
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপরোক্ত বাণীটি দ্বারা এ বিষয়টি স্পষ্ট যে, শুধু পুরুষের সামনে নারী দৃষ্টির হেফাজত করবে, তা নয়; বরং নারীর সামনে পুরুষও দৃষ্টি হেফাজত করবে। উপরন্তু নারীর সামনে নারী এবং পুরুষের সামনে পুরুষ পর্দা করতে বাধ্য হবে।
কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে- 'যখন তোমাদের পুত্ররা সাবালক হবে, তখন অনুমতি সহকারে গৃহে প্রবেশ করা তাদের উচিত। যেমন তাদের পূর্ববর্তীরা অনুমতি সহকারে গৃহে প্রবেশ করত। [সূরা নূর: ৫৯]
অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে- হে ঈমানদাররা! গৃহস্বামীর অনুমতি ব্যতীত কারো গৃহে প্রবেশ করবে না এবং যখন প্রবেশ করবে তখন গৃহের অধিবাসীদের সালাম দাও। (সূরা নূর: ২৭]
বস্তুত গৃহের ভেতরে ও বাইরের মধ্যে একটা বাধা-নিষেধ স্থাপন করাই ওই আয়াতদ্বয়ের উদ্দেশ্য হলেও প্রকৃতপক্ষে ওই আয়াতদ্বয় দ্বারা পারিবারিক বলয়ে নারীকে পুরুষের দৃষ্টি থেকে নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আরেকটি কথা না বললেই নয় যে, এর মাধ্যমে পুরুষকে পর্দা করার কথা বলা হয়েছে।
এ কারণেই কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে- قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا ..
'হে নবী! আপনি মুমিন পুরুষদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনমিত রাখে এবং যৌন পবিত্রতা রক্ষা করে চলে। এটাই তাদের জন্য পবিত্রতম পন্থা। নিশ্চয় তারা যা কিছুই করে, আল্লাহ তৎসম্পর্কে পরিজ্ঞাত। [সূরা নূর: ৩০]
এ আয়াত দ্বারা পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে আল্লাহ পুরুষদের দৃষ্টি সংযত রাখার আদেশ করেছেন। এটা নারীর ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। আর পুরুষ যদি তার দৃষ্টি সংযত রাখে তাহলে নারী তেঁতুল নাকি মরিচ, সে বিষয়টি অনুভব করার সুযোগ একেবারেই থাকে না।
📄 সমান অধিকার
আল্লাহ তায়ালা নারী-পুরুষ সৃষ্টি করেছেন। প্রকৃতিগতভাবে প্রত্যেকের মধ্যেই এমন উপাদান যুক্ত করা হয়েছে। যার কারণে একজন অন্যজনের দিকে ঝুঁকে পড়ে, পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ বাড়ে। সুতরাং কেউই এমনকি পৃথিবীর সকল মানুষ মিলে চেষ্টা করলেও আল্লাহর সৃষ্টিতে কোনো পরিবর্তন আনয়ন করতে পারবে না। কখনোই নারী-পুরুষের ব্যবধান উঠিয়ে দিয়ে উভয়কে সমান করতে পারবে না এবং নারী-পুরুষের পরস্পরের দিকে আকর্ষণকে ঠেকাতে পারবে না।
যারা সভ্যতার নামে নারী-পুরুষের মধ্যকার ব্যবধান উঠিয়ে দিতে চায় এবং উভয় শ্রেণির জন্য সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে কর্মক্ষেত্রে মিশ্রিত হয়ে যাওয়ার আহ্বান জানায় তারা মিথ্যুক। তাদের মতলব খারাপ। কারণ
এর মাধ্যমে তারা নিজেদের মনের চাহিদা মেটাতে চায় এবং অন্যের স্ত্রী- কন্যাকে পাশে বসিয়ে নারীদের সৌন্দর্য উপভোগ করতে চায়। সেই সাথে আরো কিছু করার সুযোগ পেলে তাও করতে চায়। কিন্তু এ কথাটি এখনও তারা খোলাসা করে বলার সাহস পাচ্ছে না।
নারীদের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা, সভ্যতা ও উন্নয়নের যে সুর তুলছে তা নিছক সস্তা বুলি ছাড়া আর কিছু নয়। এ সমস্ত কথার পিছনে তাহজীব-তামাদ্দুন, সভ্যতা, উন্নতি অর্জন আদৌ তাদের উদ্দেশ্য নয়; বরং তা চরম ভাওতাবাজি।
সমঅধিকার দাবিদাররা যে মিথ্যুক তার আরেকটি কারণ হলো, যে ইউরোপ-আমেরিকাকে তারা নিজেদের আদর্শ মনে করে এবং যাদেরকে তারা সভ্যতা, সংস্কৃতি ও উন্নতির পথপ্রদর্শক মনে করে মূলত তারা প্রকৃত উপলব্ধি করতে পারেনি। তারা যেটিকে সভ্যতা ও সংস্কৃতি মনে করছে, তা মূলত সত্য ও সভ্যতা নয়; বরং সেটি হচ্ছে ইউরোপ-আমেরিকা থেকে আমদানিকৃত অশ্লীল সভ্যতা। তাদের ধারণায় নাচ, গান, বেহায়াপনা, উলঙ্গ-অর্ধউলঙ্গ হওয়া, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সহশিক্ষায় অংশ নেয়া, নারীদের খেলার মাঠে নামা এবং সমুদ্র সৈকতে গিয়ে বস্ত্রহীন হয়ে গোসল করাই সভ্যতা ও সংস্কৃতির মানদণ্ড। আর প্রাচ্যের দেশ তথা মুসলিমদের মসজিদ-মাদরাসা, মদিনা, দামেশক এবং আল-আজহার বিদ্যালয়সহ সকল ইসলামি প্রতিষ্ঠানে যে উন্নত চরিত্র, সুশিক্ষা, নারী- পুরুষের বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ পবিত্রতার প্রশিক্ষণ দেয়া হয় তাদের ধারণায় তা মুসলিমদের পশ্চাৎমুখী হওয়ার এবং সভ্যতাও সংস্কৃতির দিক থেকে পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ।
ইউরোপ-আমেরিকা থেকে ঘুরে আসা বা সেখানে বসবাসকারী অসংখ্য পরিবার নারী-পুরুষের খোলামেলা চলাফেরাতে সন্তুষ্ট নয় এবং এটি তাদেরকে শান্তি দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই আজ তারা বিকল্পের সন্ধানে ফিরছে।
সৃষ্টিগতভাবেই নারী ও পুরুষ এক নয়। তাদের প্রত্যেকের অবস্থান ও কর্মক্ষেত্র পৃথক। নারী ও পুরুষের কর্মক্ষেত্র প্রকৃতিগতভাবেই স্বতন্ত্র। তাই সকল ক্ষেত্রে তাদের সমান অধিকার নিয়ে চলা নিজেদের জন্যই কল্যাণকর নয়। প্রকৃতি মাতৃত্বের পবিত্র দায়িত্ব সম্পূর্ণ নারীর ওপর সোপর্দ করেছে। সেই সঙ্গে দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত স্থান কোথায়, তাও বাতলে দিয়েছে।
পক্ষান্তরে পিতৃত্বের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে পুরুষের ওপর। সেই সঙ্গে মাতৃত্বের মতো গুরুদায়িত্বের বিনিময়ে তাকে আর যেসব কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, তাও প্রকৃতি সুস্পষ্টরূপে নির্ধারণ করে দিয়েছে। উপরন্তু এ উভয় প্রকার দায়িত্ব পালনের জন্য নারী ও পুরুষের দৈহিক গঠন, শক্তি সামর্থ্য ও ঝোঁক প্রবণতায়ও বিশেষ পার্থক্য সৃষ্টি করা হয়েছে।
প্রকৃতি যাকে মাতৃত্বের জন্য সৃষ্টি করেছে, তাকে ধৈর্য, মায়া, মমতা, স্নেহ ভালোবাসা প্রভৃতি বিশেষ ধরনের গুণে গুণান্বিত করেছে। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, নারীর ভেতরে এসব গুণের সমন্বয় না হলে তার পক্ষে মানবশিশুর লালন পালন করা সম্ভবপর হতো না। বস্তুত মাতৃত্বের মহান দায়িত্ব যার ওপর অর্পণ করা হয়েছে, তার পক্ষে এমন কোনো কাজ করা সম্ভব নয়। যার জন্যে রুক্ষতা ও কঠোরতার প্রয়োজন। এ কাজ শুধু তার দ্বারাই সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হতে পারে, যাকে এর উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়েছে। সেই সঙ্গে পিতৃত্বের মতো কঠোর দায়িত্ব থেকেও তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
তথাকথিত নারী-স্বাধীনতার নামে নারীকে আজ যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে বিজ্ঞাপন-সামগ্রী এবং পর্নোগ্রাফীতে। আর এটি উসকে দিচ্ছে পর্দাহীনতাকে। পণ্যের বিজ্ঞাপনে নারী যেন আজ একটি অপরিহার্য বিষয়। পরিতাপের বিষয় হলো, আমাদের মন যা চায় আমরা তাই করে বসি। এক্ষেত্রে ইসলাম, কুরআন সুন্নাহর কী নির্দেশনা রয়েছে তা ভুলক্রমেও খুঁজে দেখি না। আর এ কারণেই আমাদের অধঃপতন দিন দিন ত্বরান্বিত হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেছেন-
لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يَكُونَ هَوَاهُ تَبْعًا لِمَا جِئْتُ بِهِ
তোমাদের মধ্যে কেউই ততক্ষণ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তার মন আমার উপস্থাপিত আদর্শের বশ্যতা ও অধীনতা স্বীকার করে নেবে।
কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে-
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا
আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো বিষয়ে নির্দেশ দিলে কোনো মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের অবকাশ থাকবে না। কেউ
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করলে সে স্পষ্টতই পথভ্রষ্ট হবে। [সূরা আহযাব : ৩৬/
যারা সমান অধিকারের নামে নারী ও পুরুষের এই প্রকৃতিগত পার্থক্যকে মিটিয়ে দিতে চায়, তাদের প্রতি বিশেষজ্ঞগণ অনুরোধ জানিয়েছেন যে, আপনারা এ পথে কোনো পদক্ষেপ নেয়ার আগে মনে করে নিন যে, এ যুগে পৃথিবীর আদতেই মাতৃত্বের কোনো প্রয়োজন নেই। একথা দৃঢ়তার সঙ্গেই বলা যায় যে, যদি কেউ এরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে, তাহলে আনবিক বোমার প্রয়োগ ছাড়া অল্প দিনের মধ্যেই মানবতার চূড়ান্ত সমাধি রচিত হবে।
পক্ষান্তরে যদি কেউ এরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে না পারেন এবং নারীকে তার মাতৃসুলভ দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সঙ্গে পুরুষের মতো রাজনীতি, ব্যবসায় বাণিজ্য, শিল্পকার্য, যুদ্ধ পরিচালনা ইত্যাদি ব্যাপারেও অংশগ্রহণ করতে বাধ্য করেন, তাহলে তার প্রতি নিঃসন্দেহে চরম অবিচার করা হবে।
নারীর ওপর প্রকৃতি যে দায়িত্ব ন্যস্ত করেছে, তা নিঃসন্দেহে মানবতার অর্ধেক সেবা। আর এই সেবাকার্য সে সাফল্যের সাথেই সাধন করে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে পুরুষের নিকট থেকে সে বিন্দুমাত্রও সহযোগিতা পাচ্ছে না। অথচ অবশিষ্ট অর্ধেকের অর্ধেক দায়িত্বও আবার আপনারা নারীর ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন। এর ফল এ দাঁড়াবে যে, নারীকে পালন করতে হবে মোট দায়িত্বের তিন চতুর্থাংশ এবং পুরুষের ওপর বর্তাবে মাত্র এক-চতুর্থাংশ। এটি কি সত্যিকারেই কোনো নারীর প্রতি সুবিচার ও বিবেকপ্রসূত?
নারীরা যেন এসবের কাছে অসহায়! তারা এ জুলুম অবিচারকে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ জুলুমের বোঝাকে স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নেয়ার জন্য লড়াই করছে। এর মূল কারণ হলো, তারা পুরুষদের কাছে যথার্থ সমাদর পাচ্ছে না। ঘর সংসার ও মাতৃত্বের মতো কঠিন দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা সত্ত্বেও আজ তারা সমাজে উপেক্ষিত, অপাংক্তেয়। সন্তানবতী ও গৃহিণী মেয়েদেরকে আজকের সমাজের কোথাও কোথাও ঘৃণা করা হয় এবং স্বামী ও সন্তান-সন্ততির এতো সেবাযত্ন করা সত্ত্বেও তাদের যথার্থ কদর করা হয় না। অথচ এসব কার্যে তাদের যে বিপুল ত্যাগ স্বীকার করতে হয় তা পুরুষদের সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, অর্থনৈতিক ও যুদ্ধবিগ্রহ সংক্রান্ত দায়িত্বের চাইতে কোনো অংশেই কম নয়।
মূলত নারী-পুরুষের সমান অধিকারের মধ্যে আর যাই হোক নারীর কল্যাণ নেই; বরং তাতে তার ঠকই বেশি। আজকের তথাকথিত প্রগতিবাদীরা বস্তুত নারীদের সমান অধিকারের স্লোগান দিয়ে তাদের প্রকৃত অধিকার খর্ব করতেই মরিয়া হয়ে ওঠেছে। তাই এ ব্যাপারে নারীদেরকে তাদের অধিকারের স্বার্থেই সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে।
📄 অপরূপার দীঘল কেশ
নারীর অন্যতম শোভা হলো কালো দীঘল কেশ। তাদের ঢেউ খেলানো চুল নিয়ে কবি-সাহিত্যিকরা অসংখ্য কবিতা, গল্প ও উপন্যাস লিখেছেন। কিন্তু অপরূপা নারীর সেই দীঘল কেশ যেন আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। আজ কথিত আধুনিকতার দাবিদাররা মেয়েদের চুলও পুরুষের মতো ছোট করে রাখতে প্ররোচিত করছে।
আজ হতে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুলের যত্ন নিতে বলেছেন। বর্ণিত আছে, একদা এক ব্যক্তি উসকো খুশকো চুল নিয়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এলেন। তখন নবীজি তাকে বললেন, তোমার কি চিড়ুনি নেই? [সুনানু আবি দাউদ]
এ থেকে বোঝা যায়, ইসলাম চুল আঁচড়িয়ে পরিপাটি রাখাকে উৎসাহিত করেছে। খোদ প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথায় তেল ব্যবহার করতেন এবং তা পরিপাটি করে রাখতেন। [শামায়েল]
ইসলাম নারীদের চুল লম্বা এবং পুরুষের চুল ছোট রাখতে উৎসাহিত করেছে। অথচ আজকের পরিবেশ তার বিপরীত। ইদানীং নারীরা চুল খাটো করে এবং ছেলেরা ফ্যাশনেবল লম্বা চুল রাখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে থাকে।
ইদানীং চুলের নানা ফ্যাশন লক্ষ্য করা যায়। এমনকি এতে যে ইসলামি ভদ্রতার প্রতীক রয়েছে, তা বোঝা মুশকিল হয়ে পড়ে। চুলের ফ্যাশন হাল আমলে আধুনিকতার দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, কিছু কিছু তরুণী আছে, যারা এমনভাবে চুলের ফ্যাশন করে, হঠাৎ দেখলে তাদেরকে ভিন্ন গ্রহের আজব কোনো প্রাণীর মতো মনে হয়।
চুলের এই ফ্যাশনে প্রতিদিনই নতুন নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে। যোগ হচ্ছে নতুন নতুন নাম। মনে হয় চুলের রাজ্যে ফ্যাশনের তাড়া খেয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটছে ফ্যাশনেবল তরুণীর দল। তারা স্থির করে বলতে পারছে না
কেমন চুল, কেমন স্টাইল তাদের কাম্য কিংবা পছন্দ। তারা ভুলে গেছে, তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি। পাশ্চাত্যের ভাড়া করা কালচার লালনেই তারা তৃপ্তির ঢেঁকুর গিলছে।
অভিশপ্ত ফ্যাশনের নির্মম শিকার এই সমাজে এখন নর-নারীর পার্থক্য পর্যন্ত হারিয়ে যাচ্ছে। কে ছেলে আর কে মেয়ে নির্ণয় করা হয়ে পড়েছে ভীষণ মুশকিল।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের সাদৃশ্য অবলম্বনকারী পুরুষদের প্রতি এবং পুরুষদের বেশধারী নারীদের প্রতি অভিসম্পাত করেছেন। (অর্থাৎ যারা বেশ-ভূষায় একে অপরের রূপ ধারণ করে, তাদের প্রতি অভিশাপ করেছেন)। [বুখারি, মা'আরিফুল হাদিস : ৬ষ্ঠ খণ্ড, ২৯৪ পৃ.]
এ কথা অনস্বীকার্য যে, নারীর সৌন্দর্য চুলে। কিন্তু ইদানিং দেখা যায় নারীরা চুল কেটে এতো ছোট করে ফেলে যে, এটা দেখে বোঝা যায় না যে, সে ছেলে নাকি মেয়ে। অথচ নারীর লম্বা চুল তার জন্য কত উপকারী তা যদি সে জানত তবে কখনো চুল কেটে ছোট করত না।
কানাডার ফিজিওথেরাপিস্ট স্যার জেমস সাগাম এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেন, মেয়েদের দীঘল কেশ তার ত্বক, দেহ, মস্তিষ্ক, শিরা-উপশিরার খিঁচুনি, মাথা ব্যথা, হাড়ের রোগের ব্যথা, দৃষ্টিশক্তি, শারীরিক দুর্বলতা ইত্যাদি থেকে অনেকাংশে রক্ষা করে।
কোনো মেয়ে যদি সবসময় তার চুলগুলো কেটে কান বরাবর রাখে তবে তার উল্লেখযোগ্য সমস্যাগুলো হতে পারে। আর দীঘল তথা লম্বা চুল এগুলো থেকে বাঁচিয়ে রাখে। কারণ এর ফলে মাথা বার বার আঁচড়ানো হয়, বেণী কাটা হয়, ফিতা তোলা হয়, আর মাথা আঁচড়ানোর দ্বারা এক প্রকার উষ্ণতা এবং শরীরে এনার্জি সৃষ্টি হয়। যা পশম বা চুলের মাধ্যমে শরীরের শিরাতন্ত্রীকে প্রাণবন্ত ও শক্তিশালী করে। এমন কি নিয়মিত চুল আঁচড়ালে চুল বৃদ্ধি পায় এবং ঘন হয়।
মাথার চুল আঁচড়ানোর আরেকটি হেকমত হলো, যদি চুল আঁচড়ানো না হয় তবে তাতে জীবাণু আটকে থাকে। যা চুলের বৃদ্ধি ব্যাহত করে। এক সময় তা ভয়াবহ রূপ নেয়। চুল না আঁচড়ালে উকুন বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। চুলের পরিচ্ছন্নতা রক্ষা খুবই জরুরি। মাথার ত্বকের অপরিচ্ছন্নতা থেকে রোগব্যাধির জন্ম হতে পারে এবং অন্যত্রও তা ছড়িয়ে যেতে পারে।
বিশেষত চুলের গোড়ায় যে খুশকি হয় তা চুল পড়ে যাওয়া এবং টাক পড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মাথার খুশকির কারণে আবার চোখেও রোগ হতে পারে। তাই মাথার পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে যত্নবান হওয়া উচিত।
নারীদের সৌন্দর্য লম্বা কেশের সাথে অধিক সম্পর্কিত। তাই ইসলামি জীবনব্যবস্থায় নারীদের চুল কমানো ও পশম কাটা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের গবেষণায় জানা যায় যে, যখন নারীদের এ চুল কেটে বা ছেঁটে ফেলা হয় বা বিশেষ হেয়ার বিন্যাস করা হয়, তখন নারী দেহে নানা রূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
আমেরিকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নারীদের চুল বৃদ্ধি তাদের সুস্থতা ও সবলতার জন্য অতীব জরুরি। কেননা তাদের চুল যত বৃদ্ধি পাবে, ততই তাদের ধৈর্য-সহনশীলতা, কমনীয়তা বৃদ্ধি পাবে। আর অসংখ্য রোগ-ব্যাধি থেকে নিরাপদ থাকবে তারা।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মহিলাদের জিন ও হরমোন আর পুরুষদের জিন ও হরমোনে আকাশ-জমিন পার্থক্য। এ কারণে পুরুষের চুল কাটা বা মুণ্ডানোর কাজ তাদের জন্য অনেক বেশি উপকারী। পক্ষান্তরে এর বিপরীতে ঐ নারী জাতি যাদের চুল কুদরতিভাবে লম্বা ও ঘন হয়, তারা যদি সে চুল কাটে, ছাঁটে বা মুণ্ডায়, তাহলে তাদের দেহে এমন ব্যাধি দেখা দেয়, যার বিবরণ ব্যাধির তালিকায় বিদ্যমান। এরূপ নারীরা দৈহিক রোগ-ব্যাধি যথা ডিপপ্রেসার, ফাস্টেশন, এনজাইটি ও আত্মহত্যার শিকার বেশি হয়।