📘 লাভ ম্যারেজ > 📄 বোরকার মুণ্ডপাত

📄 বোরকার মুণ্ডপাত


একটি বিষয় আজ সমাজদেহকে বিষিয়ে তুলছে। তাহলো, সারা পৃথিবীর সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমাদের মিডিয়াগুলোও তো বর্ণবাদের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ। রোজ পেপারে গুরুত্বের সঙ্গে বর্ণবাদী ঘটনার বিবরণে একে অপরাধ হিসেবে তুলে ধরা হয়। তথাপি তারা আবার কিভাবে বর্ণবাদী আচরণ করে ইসলাম অনুশীলনকারীদের প্রতি? সন্দেহ নেই যে, ইসলামি পোশাকের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গিও এক ধরনের বর্ণবাদী মানসিকতার পরিচায়ক। কেউ যদি উল্টো যুক্তি দিয়ে বলে যে, তারা নিজেরা যে সাধারণ পোশাক পরেন, দুনিয়ার সব অপরাধী আর সন্ত্রাসী বদমাশই তো সে পোশাকে শোভিত হয়।
তাই বলে কি প্যান্ট-শার্ট পরা দেখলেই তাকে কেউ বলতে পারে সন্ত্রাসী, দুষ্কৃতকারী? বিশ্বসন্ত্রাসী আমেরিকা আর ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী ফুলপ্যান্ট আর টি শার্ট বা কোর্ট-টাই পরেন বলে আমি কি এ পোশাকে কাউকে দেখলেই বলতে পারি যে, এই হিটলার, মুসোলিনি? কখনো না। তাহলে বোরকাপরা কোনো নারীকে কিংবা অপরাধ সংঘটনের জন্যই বোরকাপরা পুরুষকে কাব্যাঘাত না করে কেন মুণ্ডপাত করা হবে বোরকার? এ এক অবিচারই বটে।
তবে বোরকাপরা বোনদেরও মনে রাখতে হবে যে, ইসলামবিরোধী মিডিয়াগুলো সব সময় এসব খারাপ দৃষ্টান্ত লুফে নেয়ার অপেক্ষায় থাকে। তারা টুপি-দাড়ি বা বোরকাপরা মানুষের কোনো দোষ পেলে দায়ী ব্যক্তির অপরাধের সমালোচনা না করে এই পোশাকের বিরুদ্ধে ওঠেপড়ে লেগে যায়। আসলে এই ছুতোয় তারা নিজেদের ইসলাম না মানার কুবাসনা চরিতার্থ করে। নিজের ধর্মহীনতাকে জায়েয করার ব্যর্থ চেষ্টা চালায় ষোলকলা পাকাপোক্ত করে।
বোরকার প্রমাণ দিতে গিয়ে বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেছেন-
كَالرِّدَاءِ وَالثَّيَابِ يَعْنِي عَلَى مَا كان يتعاطاه نِسَاءُ الْعَرَبِ مِنَ الْمِقْنَعَةِ الَّتِي تُجَلِّلُ ثِيَابَهَا وَمَا يَبْدُو مِنْ أَسَافِلِ الثَّيَابِ. فَلَا حَرَج عليها فيه لأن هذا لا يمكنها إخفاؤه
চাদর ও কাপড়। আরবের নারীগণ যে বড় চাদরে তাদের পরনের কাপড় ঢেকে বের হতেন এবং কাপড়ের নিচের অংশ, যা চলার সময় চাদরের নিচ দিয়ে প্রকাশিত হয়ে যেত, তা যেহেতু ঢেকে রাখা সম্ভব নয় সেহেতু এতে কোনো দোষ নেই। [ইবনে কাসীর: ৬/৪১]
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর বিন আস রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-
رَأَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى ثَوْبَيْنِ مُعَصْفَرَيْنِ فَقَالَ إِنَّ هَذِهِ مِنْ ثِيَابِ الْكُفَّارِ فَلَا تَلْبَسْهَا
একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার গায়ে জাফরান ব্যবহৃত একজোড়া কাপড় দেখে বললেন, 'এসব হলো কাফেরদের পোশাক। তাই তুমি তা পরিধান করো না।' [মুসলিম: ৫৫৫৫]
সমাজদেহ থেকে এই অভিযোগ ও সমালোচনার মূলোৎপাটন জরুরি। সেজন্য বোরকাপরা নারীদের প্রয়োজন দায়িত্বশীল আচরণ। কারণ প্রকৃত বোরকাবৃতা মা বোনেরা কিছুতেই নিজের মর্যাদা ও সম্মানের কথা ভুলতে পারেন না। তাদের জানতে হবে কোন কাজটি তাদের সম্মানের সঙ্গে যায় আর কোনটি যায় না। শুধু সামাজিকতা রক্ষায় কিংবা বাবা-মা'র পীড়াপীড়িতে নয়, সকল নারীকে বোরকা পরতে তথা শালীন পোশাক পরতে হবে আল্লাহর হুকুম সম্পর্কে জেনে এবং বিধানটিকে বুঝে। বুঝতে হবে যে, আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ বোরকা নয়; তাঁর নির্দেশ হলো পর্দা রক্ষা করা। তাই প্রয়োজন আপাদমস্তক নিজেকে ঢেকে ফেলা এবং বেগানা পুরুষের সংশ্রব থেকে যথাসাধ্য দূরত্ব বজায় রাখা। মনে রাখতে হবে যে, পরিবারের নিরাপদ ছায়াই নারীর ঠিকানা।
ইদানীং এ বিষয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে মাঝেমধ্যেই বিতর্ক তোলা হচ্ছে। আসলে এ বিষয়টি স্বতন্ত্র আলোচনার দাবি রাখে। তবে হ্যাঁ, এ জন্য অভিভাবকদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। সন্তানকে আর সব শিক্ষার পাশাপাশি ইসলামের মৌলিক শিক্ষাও দিতে হবে। পর্দা এবং ইসলামের শিষ্টাচার শেখাতে হবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে। পাশাপাশি তাদের জন্য পরিবারে নিশ্চিত করতে হবে ইসলামি অনুশাসন এবং সঠিক গৃহশিক্ষার। নিজের কষ্টে উপার্জিত অর্থ দিয়ে কলিজার টুকরো মেয়েকে বিধর্মী পোশাক কিংবা পুরুষদের বেশ কিনে দেবেন না। সন্তানকে বানাবেন না আল্লাহর রাসূলের অভিশাপের ভাগিদার। দায়িত্বশীল হিসেবে নিজেকেও বানাবেন না অপরাধী।

📘 লাভ ম্যারেজ > 📄 চাঁদ কপালে তিলক রেখা

📄 চাঁদ কপালে তিলক রেখা


কপালে তিলক পরাটা কোনো কোনো নারী ফ্যাশন মনে করে থাকে। বিশেষত যুবতি, তরুণীদের মাঝে এর প্রকোপ অধিক হারে লক্ষ্য করা যায়। এ কথা সন্দেহাতীতভাবেই বলা চলে যে, কপালে সিঁদুর বা তিলক পরা বিধর্মী বিবাহিত নারীর সংস্কৃতি বা প্রতীক। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, অনেক মুসলমান নারীর মধ্যেও কপালে তিলক পরার ব্যাধি আছে। তারা ভেবে থাকে যে, কপালে তিলক না দিলে জাতে ওঠা যায় না। এটা যেন গর্বের প্রতীক তাদের।
আজকাল নানা রঙের তিলক বাজারে পাওয়া যায়। মেয়েদের গায়ের শাড়ি কিংবা অন্যান্য পোশাকের সাথে ম্যাচিং (Maiching) করে তারপর তিলক
ব্যবহার করে। অথচ এটা বেদীনদের ধর্মীয় রীতির অনুসরণ। সে কারণে এটা সম্পূর্ণ হারাম।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ যে ব্যক্তি যে জাতির অনুকরণ করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচিত হবে।
কথিত রূপপূজারী ফ্যাশনবাদী নারীদের মনে সংশয় জাগে, এই চাঁদনিমুখে কারো কুদৃষ্টি পড়বে না তো! তাই তারা 'বদ-নজর' থেকে রক্ষার জন্যে চেহারায় একখানা 'তিলকচিহ্ন' বসিয়ে দেয়। এই তিলক চিহ্নের নামই 'বিউটি স্পট'। এই তিলকচিহ্ন নাকি সৌন্দর্যকে আরো কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। বাহ! কী চমৎকার আয়োজন। সৌন্দর্যও বাড়াল আবার কুদৃষ্টিকেও প্রতিহত করল।
পরিতাপের বিষয় হলো, আমরা কি ঘুণাক্ষরেও ভেবে দেখেছি যে, এই কি মুসলিম নারীর জীবন? তুচ্ছ এই দু'দিনের পান্থশালা! যেসব মুসলিম নারী দিবানিশি সৌন্দর্যচর্চায় নিমজ্জিত- তারা যেন মনেই করতে পারে না যে, নামাজ-রোযাও তার কাজ। তারা ভেবেই দেখে না যে, তাকে এই জীবন ও অর্পিত কর্তব্য সম্পর্কে একদা জবাবদিহি করতে হবে হরফে হরফে।
তাছাড়া যারা সৌন্দর্যের তিলক এঁকে পথে-প্রান্তরে, পার্কে, মার্কেটে ঘুরে বেড়ায় আর তাদের প্রতি হাজার বছরের রূপতৃষ্ণা নিয়ে তাকিয়ে থাকে রূপপাগল যে পুরুষের দল; তাদের উভয় শ্রেণি সম্পর্কে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভিশাপ করেছেন এভাবে- لَعَنَ اللَّهُ النَّاظِرَ وَالْمَنْظُورَ إِلَيْهِ 'ঘুরে ঘুরে রূপদর্শনকারী পুরুষ আর রূপ প্রদর্শনকারী নারীদের প্রতি আল্লাহ তায়ালার লানত হোক।' (গাযযুল বাছার : ১৫ পৃ.।
আমেরিকার এক বিখ্যাত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ তার দীর্ঘজীবনের গবেষণায় বলেন, যে কোনো কেমিক্যাল জাতীয় রং শরীরের জন্য ক্ষতিকর। বিশেষত স্পর্শকাতর কোনো স্থানে যদি এ জাতীয় রঙের ব্যবহার হয় তবে এর শরীরে চর্ম জাতীয় রোগ বাসা বাঁধে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে ক্যান্সারের মতো বড় ধরনের রোগও হয়ে থাকে।
মেয়েরা কপালে সাধারণত যে তিলক ব্যবহার করে থাকে তা অনেক কেমিক্যালযুক্ত বিভিন্ন রঙের মিশ্রণ। আর কপাল হলো মুখের একটা অংশ এবং মুখ হলো শরীরের সবচেয়ে স্পর্শকাতর স্থান। এটি নারীর সৌন্দর্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু। সুতরাং কেউ যদি কপালে সর্বদা তিলক ব্যবহার করে আর এটি যদি তার ত্বকের সাথে এগজাস্ট না হয় তবে এলার্জিসহ যে কোনো চর্ম রোগ দেখা দিতে পারে। এমনকি ক্যান্সারের মতো ভয়াবহ রোগও তার মুখে, কপালে বাসা বাঁধতে পারে।
বিশেষত ৮ থেকে ২৫ বছর বয়সের মেয়েদের ক্ষেত্রে এটি বেশি আশঙ্কা হয়ে থাকে। আমাদের উচিত যথাসম্ভব এ জাতীয় কেমিক্যাল শরীরে ব্যবহার থেকে বেঁচে থাকার যথাসাধ্য চেষ্টা করা।

📘 লাভ ম্যারেজ > 📄 আমি ঠিক তো জগৎ ঠিক

📄 আমি ঠিক তো জগৎ ঠিক


নীতিবাক্য আওড়ানো কিংবা অন্যকে উপদেশ দেয়ার মতো সহজ কাজ পৃথিবীতে কমই আছে। আমরা পুরুষরা নারীদের সমালোচনা করি। কিন্তু নিজের সমালোচনা কেউ করলে তা পছন্দ করি না। মূলত ইসলামি ফরজ বিধানগুলো নারী-পুরুষ সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই ইসলামের সুমহান আদর্শের হাতছানি। ইসলাম ধর্মে নারী ও পুরুষ উভয়ের ওপর ধর্মীয় বিধানাবলি পালনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। শারীরিক গঠন ও বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নারীর ক্ষেত্রে অবশ্যপালনীয় বিধানাবলি কোনো কোনো সময় শিথিলযোগ্য। এছাড়া সর্বদা নারী ও পুরুষ উভয়কেই ইসলামের নিময়কানুন মেনে চলতে হবে এমনটিই সত্য।
যদি কোনো নারী অথবা পুরুষ ওই বিধানাবলি লঙ্ঘন করে, তাহলে তাকে শাস্তিভোগ করতে হবে। যা স্পষ্ট করে কুরআন মাজিদে বলা হয়েছে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই বিধানাবলির ব্যাখ্যা একচোখা নীতিতে বিশ্লেষণ করে নারীর ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়। যা মোটেই সমীচীন নয়। নিজে ঠিক না হয়ে অন্যকে উপদেশবার্তা শোনানোকে কুরআন মাজিদে মুনাফিকের লক্ষণ বলা হয়েছে। আমি মনে করি, আমি ঠিক তো জগৎ ঠিক। তাই সর্বাগ্রে প্রয়োজন নিজের ভুল নিজে বোঝা।
ধর্মীয় গোঁড়ামি, অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের কারণে নারীদের পুরুষের চাপিয়ে দেয়া অনেক বিধানের যাঁতাকলে পিষ্ট হতে হয়। যদিও শরিয়তের ওই বিধানাবলি পুরুষের জন্যও প্রযোজ্য। ইসলামের এমনই একটি অবশ্য পালনীয় বিধান হলো পর্দা। যা নারী-পুরুষ উভয়ের ওপর আরোপিত
হয়েছে। কিন্তু যুগে যুগে এই পর্দাপ্রথা শুধু নারীর ওপর কঠোরভাবে আরোপের কারণেই তথাকথিত প্রগতিবাদীরা এ প্রথাকে নারীর জন্য কারাগার বলতে সুযোগ পেয়েছে।
এ কথা ঠিক যে, সমসাময়িককালে এ ব্যবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। তবে এ কথাও সত্য যে, আজও অবৈধ পর্দা প্রথার বেড়াজাল ছিন্ন করে ইসলামের অনুসারী সব নারী ইসলামের দেয়া স্বাধীনতার স্বাদ পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করতে পারেনি। আর আজো পুরুষের ওপর যে পর্দা ফরয করা হয়েছে, সে বিষয়টি অধিকাংশ পুরুষের অগোচরে রয়ে গেছে। ফলে অনেকে মনে করে থাকে যে, পর্দাপ্রথা শুধু নারীর জন্য; পুরুষের জন্য নয়। প্রকৃতপক্ষে এমন ধারণা ডাহা মিথ্যা ও সত্যের অপলাপ।
কুরআন মাজিদে নারীর পাশাপাশি পুরুষকেও পর্দা পালন করার জন্য কঠোরভাবে বলা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে- قَدْ أَنْزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيشًا وَلِبَاسُ التَّقْوَى
তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকার ও বেশভূষার জন্যে আমি পোশাক দিয়েছি। তাকওয়ার পোশাকই সর্বোৎকৃষ্ট। [সূরা আরাফ: ২৬]
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কঠোর নির্দেশদান করেছেন যে, কোনো নারী অথবা পুরুষ যেন কোনোভাবেই পর্দা লঙ্ঘন না করে। তিনি বলেন, যে আপন ভাইয়ের সতরের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে সে অভিশপ্ত। [জাসসাস: আহকামুল কুরআন)
এক্ষেত্রে শরিয়তের বিধান হলো, কোনো পুরুষ কোনো পুরুষের সামনে এবং কোনো নারী কোনো নারীর সামনেও উলঙ্গ হতে পারবে না। সিহাহ সিত্তাহ হাদিসগ্রন্থের অন্যতম মুসলিম শরিফে বলা হয়েছে যে, কোনো পুরুষ কোনো পুরুষকে এবং কোনো নারী কোনো নারীকে যেন উলঙ্গ অবস্থায় না দেখে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপরোক্ত বাণীটি দ্বারা এ বিষয় স্পষ্ট যে, শুধু পুরুষের সামনে নারী পর্দা করবে তা নয়; বরং নারীর সামনে পুরুষও পর্দা করবে।
উপরন্তু নারীর সামনে নারী এবং পুরুষের সামনে পুরুষের পর্দা করাও ধর্মীয় বিধানাবলির অন্তর্ভুক্ত। এসব নির্দেশনার পাশাপাশি পুরুষের জন্য স্পষ্টভাবে পর্দার কথা বলা হয়েছে। শারীরিক গঠন বিবেচনা করে এই নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। পুরুষের জন্য শরীরের নাভি ও হাঁটুর মধ্যবর্তী অংশ ঢেকে রাখার জন্য মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ প্রদান করেছেন।
হযরত আলী রা. থেকে বর্ণিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমরা নিজের উরু কাউকে দেখাবে না এবং কোনো জীবিত বা মৃত ব্যক্তির উরুর প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করো না। [তাফসিরে কবীর] উপরোক্ত নির্দেশগুলো সর্বজনীন নির্দেশ। এই নির্দেশ নারীর পাশাপাশি পুরুষের ক্ষেত্রেও সমানভাবে পালনীয়।

📘 লাভ ম্যারেজ > 📄 চোখ যে মনের কথা বলে

📄 চোখ যে মনের কথা বলে


চোখেরও ভাষা আছে। আজকের বিশ্বে চোখের ভাষার খুব কদর করা হয়। চোখের ভাষাটাই হলো দৃষ্টি। এই দৃষ্টি সকল অন্যায়ের মূল। দৃষ্টির মধ্যে এক জাদুকরি প্রভাব থাকে। বর্তমান বিজ্ঞানীগণ যে চোখের ভাষা বোঝার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠেছেন তা মূলত দৃষ্টিকে কেন্দ্র করেই। এই কিছুকাল আগেও কথিত আধুনিক পাশ্চাত্য মস্তিষ্কের চিন্তাধারা ছিল যে, কারো প্রতি তাকালে আর কী হবে? এটাতো শুধু দেখা, কোনো ভুল বা অন্যায় কাজ তো নয়! তাদের মতে, এতে ক্ষতির কিছুই নেই। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এখন বিজ্ঞান বলছে, দৃষ্টির প্রভাব মানবজীবনে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে-
قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا .. হে রাসূল! আপনি মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন। [সূরা নূর: ৩০] আরো ইরশাদ হয়েছে-
وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ .. ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশমান, তাছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে। তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, স্ত্রীলোক অধিকারভুক্ত বাঁদী, যৌনকামনামুক্ত পুরুষ ও বালক, যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ, তাদের ব্যতীত কারো কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তারা যেন তাদের গোপন সাজসজ্জা প্রকাশ করার জন্য জোরে পদচারণা না করে। মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর সামনে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও। [সূরা নূর: ৩১/
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- لَعَنَ اللَّهُ النَّاظِرَ وَالْمَنْظُورَ إِلَيْهِ. 'ঘুরে ঘুরে রূপদর্শনকারী পুরুষ আর রূপ প্রদর্শনকারী নারীদের প্রতি আল্লাহ তায়ালার লানত হোক।' [গাযযুল বাছার: ১৫ ৭.]
চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, দৃষ্টির মাঝে মানুষের এমন এক শক্তি থাকে যার দ্বারা অন্যের দেহের বড় ধরনের ক্ষতি পর্যন্ত করতে পারে এবং হয়েও থাকে। দৃষ্টি যে কোনো সুন্দর জিনিসকে অসুন্দরে পরিণত করতে পারে। বিশেষত নারীর ক্ষেত্রে কোনো পুরুষ যদি কোনো নারীর প্রতি ঐ সম্মোহনী শক্তির বলে তাকায় তাহলে ঐ নারীর রূপের যৌবন এমনকি দেহের ওপর পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে।
আমরা কি কখনো চিন্তা করে দেখেছি যে, কেউ যদি তার সামনে হঠাৎ একটি বাঘ দেখতে পায়, তাহলে তার দেহ ও প্রাণের মধ্যে কী অবস্থার সৃষ্টি হয়? আবার এটাও সত্য যে, কোনো সুস্বাদু খাবার দেখলে অটোমেটিক মনের মধ্যে এক ধরনের ভালো লাগা জাগ্রত হয়। এটি অবশ্যই দৃষ্টি ও নজরের প্রভাব বৈ আর কী হবে!
চোখ বা দৃষ্টির ফলেই সকল অপরাধ সংঘটিত হয়ে থকে। তাই দৃষ্টি হলো অপরাধের মাতৃসদন। ইসলাম নারীকে যেমন তার দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছে, তেমনি পুরুষকেও সতর্ক করেছে তার দৃষ্টি হেফাজত করতে।
এ কারণে পুরুষদের দৃষ্টি সংযত রাখার আদেশ করা হয়েছে। এটি নারীর ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। অপরিচিত নারীর রূপ ও সৌন্দর্য শোভা দর্শন করে আনন্দ উপভোগ করা পুরুষের জন্য অনাচার সৃষ্টিকারী। আর অনাচার বিপর্যয়ের সূচনা স্বাভাবিক ও প্রকৃতিগতভাবে দৃষ্টি বিনিময়ের মাধ্যমে হয়। এজন্য সর্বপ্রথম এই পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
ইসলামে নারী এবং পুরুষ উভয়ের দৃষ্টি হেফাজতের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ প্রসঙ্গে ইরশাদ করেছেন, চোখের দৃষ্টি ইবলিসের বিষাক্ত তীরসমূহের মধ্য হতে একটি তীর। [তাবারানী]
অন্য হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি দৃষ্টির হেফাজত করবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে এমন ঈমান দান করবেন, যার স্বাদ সে অন্তরে অনুভব করবে। [বুখারি শরীফ]
প্রশ্ন হতে পারে যে, চোখ খুলে দুনিয়ায় বসবাস করতে গেলে সব কিছুর ওপরেই দৃষ্টি পতিত হবে। আর কবির ভাষায় যদি কেউ বলে- 'তুমি সুন্দর! তাই চেয়ে থাকি, সে কি মোর অপরাধ!' বাস্তবিকপক্ষে উপরোক্ত উক্তি কবির দৃষ্টিতে কাব্যিক ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করলেও ইসলামের দৃষ্টিতে অপরাধ হিসেবে গণ্য। তবে হ্যাঁ, কারো মনে যদি এমন প্রশ্নের উদ্রেক হয় যে, বর্তমান বিশ্বে আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে ইসলামের এমন বিধান মেনে চলা সম্ভব নয়। অর্থাৎ কোনো পুরুষ কোনো পরনারীকে দেখবে না এবং কোনো নারী কোনো পরপুরুষকে দেখবে না, এটি অসম্ভব। কারণ পথেঘাটে চলতে-ফিরতে, চাকরি করতে নারী-পুরুষের সঙ্গে দেখা হবে, কথা হবে- এটাই স্বাভাবিক।
আমরাও উপরোক্ত ভদ্র মহোদয়দের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলতে চাই যে, ইসলাম এমনটিই চেয়েছে যে, নারীরা বন্দিজীবন থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করুক। তবে সেটা হতে হবে অবশ্যই পর্দা মেনে। অর্থাৎ পথেঘাটে চলতে ফিরতে নারীর ওপর পুরুষের অথবা পুরুষের ওপর নারীর দৃষ্টি পড়বে, এটাই স্বাভাবিক। তবে সেই দৃষ্টি বিনিময় বারবার ঘটা অস্বাভাবিক। যদি এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যে, কোনো নারীর ওপর হঠাৎ করে কোনো পুরুষের দৃষ্টি পড়ে যায়, তাহলে তিনি তাৎক্ষণিক দৃষ্টি সংযত করবেন এবং দ্বিতীয়বার দৃষ্টি নিক্ষেপ করবেন না। এ প্রসঙ্গে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেছেন, যে ব্যক্তি কোনো অপরিচিত নারীর প্রতি যৌন লোলুপ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, কেয়ামতের দিন তার চোখে উত্তপ্ত গলিত লৌহ ঢেলে দেয়া হবে। [ফাতহুল কাদীর]
ইসলাম গোঁড়ামির ধর্ম নয়। তাই একান্ত প্রয়োজনে পর্দার বিধান কিছু ক্ষেত্রে শিথিল করা হয়েছে। যেমন- ডাক্তার রোগীকে দেখার স্বার্থে শুধু তার মুখমণ্ডল নয়, প্রয়োজন হলে সতরও দেখতে পারবে। এছাড়া বিয়ে করার সময়, বৃদ্ধ, রুগ্ন ব্যক্তি ও বালকের জন্য পর্দা সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
মনে রাখবেন, যদি নারী-পুরুষ উভয়ই ইসলামের পর্দার বিধানাবলি যথাযথভাবে পালন করে তাহলে সর্বত্র নারী নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবে। আর পুরুষের ওপর অর্পিত পর্দার বিধানাবলি যদি পুরুষরা যথাযথভাবে মেনে চলে তাহলে নারীকে পর্দা প্রথার নামে ঘরে বন্দি করে রাখার প্রয়োজন হবে না। সত্যিকার অর্থে যদি এমনটি সম্ভব হয়, তাহলে সমাজে অনাচার-ব্যভিচার, বিশেষ করে বর্তমান সময়ে আলোচিত ইভটিজিংয়ের জন্য আলাদা কোনো আইন প্রণয়নের আবশ্যকতা থাকবে।
না। কারণ ইসলাম ধর্মের বিধান অনুসারে পুরুষ পথেঘাটে এবং কর্মক্ষেত্রে দৃষ্টি সংযত রেখে চলাফেরা করবে। এমনটি যদি প্রকৃতপক্ষে সম্ভব হয়, তাহলে নারী নিরাপদ থাকবে। বস্তুত পুরুষ যদি তার দৃষ্টি হেফাজত করে, তাহলে এ কথা অচিরেই সত্যি হয়ে উঠবে যে, পুরুষের পর্দায় নিরাপদ নারী। একথা অস্বীকার করার জো নেই যে, নারীদের পাশাপাশি পুরুষরাও পর্দা মেনে চলেছে।
ইসলাম ধর্মে নারী ও পুরুষ উভয়ের ওপর ধর্মীয় বিধানাবলি পালনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিশেষ করে ধর্মীয় গোঁড়ামি, অজ্ঞতা, কুসংস্কারের কারণে পুরুষের চাপিয়ে দেয়া অনেক বিধানাবলির যাঁতাকলে নারীদের পিষ্ট হতে হয়। যদিও শরিয়তের ওই বিধানাবলি পুরুষের জন্যও প্রযোজ্য। এমনই একটি অবশ্য পালনীয় ইসলামের বিধান হলো দৃষ্টির হেফাজত। যা নারী-পুরুষ উভয়ের ওপর আরোপিত হয়েছে।
অন্যদিকে আজো পুরুষের ওপর যে পর্দা ফরজ করা হয়েছে, সে বিষয়টি অনেক পুরুষের অগোচরে রয়ে গেছে। ফলে সমাজে অনাচার, ব্যভিচার ও যৌন হয়রানির মতো ভয়াবহ অপরাধ দিন দিন বেড়েই চলেছে। কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে- 'হে মানবসন্তান! আল্লাহ তায়ালা তোমাদের শরীর আবৃত করার জন্য পোশাক অবতীর্ণ করেছেন। এটি তোমাদের শোভাবর্ধক।' [আল আরাফ: ২৬]
এ আয়াতের মর্মানুযায়ী শরীর আবৃত করা প্রত্যেক নারী-পুরুষের জন্যই ফরজ করা হয়েছে।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কড়া নির্দেশদান করেছেন, কোনো নারী অথবা পুরুষ যেই হোন না কেন তিনি যেন কোনোভাবেই পর্দা লঙ্ঘন না করেন। তিনি বলেন, 'যে আপন ভাইয়ের সতরের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে সে অভিশপ্ত।'
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপরোক্ত বাণীটি দ্বারা এ বিষয়টি স্পষ্ট যে, শুধু পুরুষের সামনে নারী দৃষ্টির হেফাজত করবে, তা নয়; বরং নারীর সামনে পুরুষও দৃষ্টি হেফাজত করবে। উপরন্তু নারীর সামনে নারী এবং পুরুষের সামনে পুরুষ পর্দা করতে বাধ্য হবে।
কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে- 'যখন তোমাদের পুত্ররা সাবালক হবে, তখন অনুমতি সহকারে গৃহে প্রবেশ করা তাদের উচিত। যেমন তাদের পূর্ববর্তীরা অনুমতি সহকারে গৃহে প্রবেশ করত। [সূরা নূর: ৫৯]
অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে- হে ঈমানদাররা! গৃহস্বামীর অনুমতি ব্যতীত কারো গৃহে প্রবেশ করবে না এবং যখন প্রবেশ করবে তখন গৃহের অধিবাসীদের সালাম দাও। (সূরা নূর: ২৭]
বস্তুত গৃহের ভেতরে ও বাইরের মধ্যে একটা বাধা-নিষেধ স্থাপন করাই ওই আয়াতদ্বয়ের উদ্দেশ্য হলেও প্রকৃতপক্ষে ওই আয়াতদ্বয় দ্বারা পারিবারিক বলয়ে নারীকে পুরুষের দৃষ্টি থেকে নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আরেকটি কথা না বললেই নয় যে, এর মাধ্যমে পুরুষকে পর্দা করার কথা বলা হয়েছে।
এ কারণেই কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে- قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا ..
'হে নবী! আপনি মুমিন পুরুষদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনমিত রাখে এবং যৌন পবিত্রতা রক্ষা করে চলে। এটাই তাদের জন্য পবিত্রতম পন্থা। নিশ্চয় তারা যা কিছুই করে, আল্লাহ তৎসম্পর্কে পরিজ্ঞাত। [সূরা নূর: ৩০]
এ আয়াত দ্বারা পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে আল্লাহ পুরুষদের দৃষ্টি সংযত রাখার আদেশ করেছেন। এটা নারীর ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। আর পুরুষ যদি তার দৃষ্টি সংযত রাখে তাহলে নারী তেঁতুল নাকি মরিচ, সে বিষয়টি অনুভব করার সুযোগ একেবারেই থাকে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00