📘 লাভ ম্যারেজ > 📄 বিবাহেচ্ছুক এক যুবকের নীল কষ্ট

📄 বিবাহেচ্ছুক এক যুবকের নীল কষ্ট


প্রতিদিন অসংখ্য পত্র এসে আমার হাতে জমা হয়। কোনোটি দেশি কোনোটি বিদেশি। তবে দেশি চিঠিই বেশি। আজো তার ব্যতিক্রম নয়। আজকের চিঠিগুলোর মধ্যে আমার সামনে এ মুহূর্তে দুটি পত্র রয়েছে। একটি লিখেছেন জনৈক যুবক চাকরিজীবী। অপরটি লিখেছেন একজন যুবতি।
প্রথম চিঠিটিতে আমাদের দেশের বড় বড় সামাজিক জটিলতার মধ্য হতে বিশেষ একটি সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। দৃষ্টি আকর্ষণকৃত এ বিষয়টি কোনো মতবিরোধ ছাড়াই সবচেয়ে জটিল একটি বিষয়।
দ্বিতীয় চিঠিতে এই জটিলতা নিরসনের সমাধান সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। চাইলে একদিনেই পত্র দুটির জবাব দিতে পারতাম। কিন্তু না! আমি পত্রদ্বয় নিয়ে ভাবতে সময় নিই। তবে পত্র দুটি কোথেকে এসেছে, তা পাঠক মহলকে জানানো থেকে নিবৃত্ত রইলাম। বিশেষ কারণে সেখানকার কোনো নাম ও শিরোনাম আমি উল্লেখ করলাম না।
প্রথম চিঠিটির লেখক লিখেছেন, তিনি একজন সাধারণ চাকরিজীবী। তিনি মাসিক দুইশত 'লিরা' ভাতা পেয়ে থাকেন। ভদ্র বংশের লোক। সুন্দর গঠন
ও অবয়বের অধিকারী। তিনি চান বিয়ের মাধ্যমে নিজেকে হেফাজত করতে এবং পরিবার ও বংশধারা অব্যাহত রাখতে। এ উদ্দেশ্যে তিনি এক মেয়েকে প্রস্তাব করলেন। যথারীতি মেয়েপক্ষ ছেলের খোঁজখবর নিতে এলো। তারা ছেলের শারীরিক গঠন ও দীনদারির ব্যাপারে সন্তোষ প্রকাশ করল। তবে আপত্তি জানাল যে বিষয়টিতে তাহলো ছেলে সামান্য বেতনে চাকরি করে। কী আর করা! স্বল্প বেতনের চাকরিজীবী সেখান থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হলেন।
এবার আরেকটি মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। যেহেতু আগেরবার ধকল খেয়েছেন তাই তিনি এবার আগেভাগেই মেয়েপক্ষকে বুঝিয়ে বললেন যে, তিনি অল্প বেতনে চাকরি করেন।
জবাবে তারা বলল, বেতন? এটা কোনো ব্যাপারই না! এটা আর কী? এটা কি বেচাকেনা যে, ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করতে হবে? আমরা ধনসম্পদের বিবেচনা করি না।
ব্যাস! এতে তিনি খুশি হয়ে বললেন, এখানেই তো সৌন্দর্য!
যুবকের চোখের তারাগুলো আনন্দে নেচে ওঠলো। তিনি মনে মনে যেমন চেয়েছিলেন তেমনই পেতে যাচ্ছেন। এ খুশির আবহে বিষয়টি শেষ প্রান্তে এসেছিল প্রায়। কিন্তু শেষমেষ কনেপক্ষেরই দূরসম্পর্কের কোনো আত্মীয় তাদের কান ভারী করলো যে, টাকা পয়সা ছাড়া এখন চলে না। অবশেষে রণেভঙ্গ।
কিন্তু যেহেতু আলোচনা শেষ ধাপে চলে এসেছে, সেহেতু কিভাবে নিষেধ করবে তাও তাদের কাছে ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়াল। অবশেষে তারা কারো মাধ্যমে জানিয়ে দিল যে, ছেলে দেখতে তেমন সুন্দর নয়। অথচ তিনি সুন্দর। (পত্রের লেখক নিজের ব্যাপারে সৌন্দর্যের সাক্ষ্য দিয়েছেন; আমি নই। আমি তাকে দেখিওনি। তার চেহারা সম্পর্কে জানিও না।)
এবার তৃতীয় আরেক জায়গায় প্রস্তাব পাঠালেন বেচারা। তাদেরকে প্রথমেই জানিয়ে দিলেন যে, আমরা কোনো ধরনের জটিলতা, শর্তারোপ, অনুষ্ঠান-আয়োজন কিছুই করতে পারব না। আমি নিম্নপদস্থ চাকরিজীবী। মাসিক বেতন সিরীয় দুইশত লিরা মাত্র। আর আমার দেহ! এ তো আপনাদের সামনেই উপস্থিত। তারা বলল, আমরা আপনার গঠন ও বেতনে সন্তুষ্ট। আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি।
পাত্রীপক্ষের স্বাগত জানানোয় এবার সহজেই যুবকের চোখের তারা নেচে ওঠল না। কারণ আগে বারদুয়েক যেই ধকল খেয়েছেন এখন আবার কোন ধকল আসে তারই অপেক্ষায় তিনি।
হ্যাঁ, যেমনটি ভেবেছিলেন তেমনটিই হলো। মেয়েপক্ষ কাচুমাচু করে বলল যে, মেয়ের বড় বোনের দেনমোহর ছিল চার হাজার। আমরা ছোট মেয়ের মোহর তার কম নির্ধারণ করতে পারি না। তিনি চার হাজার লিরার কথা শুনে বললেন, আসসালামু আলাইকুম!
এবার চতুর্থ মেয়ের পালা। একবার যুবকের মনে চায় বিয়েই করবে না। আবার তার মনের মাঝে উঁকি দেয় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অমীয় বাণী- 'যে আমার সুন্নাত বিবাহ হতে নিজেকে গুটিয়ে রাখে সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।'
কী আর করা! এ পথে যে তাকে হাঁটতেই হবে। এবার তিনি চতুর্থ মেয়েপক্ষকে প্রস্তাব পাঠান। মেয়েপক্ষকে আগেভাগেই বলে দিলেন, আমার বেতন এত। আমার দেহ এমন। এক হাজার লিরা থেকে বেশি দেনমোহর দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
জবাবে মেয়েপক্ষ বলল, আমরা মেনে নিলাম।
যথারীতি কথাবার্তা, আলোচনা প্রায় শেষ। যাওয়ার আগে তারা বলে গেলেন যে, আমাদের মেয়ে আপনার কাছে থাকবে। তার সুখ-দুঃখ দেখা আপনারই দায়িত্ব। তাই তার জন্যে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেবেন। আর শোয়ার রুমটা আসবাবপত্রে সজ্জিত করবেন। এতটুকুই যথেষ্ট।
মেয়েপক্ষের এ আব্দারে বেচারার কলজে মোচড় দিয়ে ওঠল। কারণ এই আবেদন যে পূর্বের দেনমোহর অপেক্ষা ভারী! অগত্যা তিনি সেখান থেকেও পালিয়ে আসা ছাড়া গত্যন্তর পেলেন না।
সর্বশেষ পঞ্চম এক মেয়েকে প্রস্তাব পাঠালেন। এ স্থানেও সবকিছু খুলে খুলে বর্ণনা করলেন। তারাও সম্মতি জানাল। মেয়ে সূরা ফাতিহা পাঠ করল। তিনি টাকা-পয়সা জমা করলেন।
বিয়ের আয়োজন চূড়ান্ত পর্যায়ে।
কিন্তু শেষ প্রান্তে এসে মেয়েপক্ষ সব গুঁড়িয়ে দিল। কারণ, ছেলের মা ছিলেন গ্রাম্য মহিলা। তিনি নাকি এক মহাঅপরাধ (?) করে বসেছেন। অনুষ্ঠানের নিয়মনীতি, শোভা-সৌন্দর্য, আধুনিক ভদ্রতা সম্পর্কে তার নাকি ন্যূনতম ধারণা নেই। তিনি নাকি অলিমা অনুষ্ঠানে খেতে বসে গোশত
কাটার চামচ দিয়ে তরমুজ খেয়েছিলেন। তরকারির ঝোল আর পাতলা ডাল নাকি জোরে জোরে আওয়াজ করে চুমুক দিয়ে খাচ্ছিলেন। আপেলের খোসা ছাড়াচ্ছিলেন আর ফলটা হাতে ধরে রেখেছিলেন। প্রশ্নকর্তা হয়তো গ্রাম্য এই মায়ের আরেকটি অপরাধের কথা উল্লেখ করতে ভুলে গেছেন। তাহলো, যখনই তিনি খাবার চিবুচ্ছিলেন, তখন তার থুতনি নড়ে উঠছিল! হায় নিয়তি! হায় সভ্যতা!
পরিশেষে বেচারা বিয়ের চিন্তাই ছেড়ে দিলেন। নারীর প্রতি বিতৃষ্ণা সৃষ্টি হলো তার। তিনি এই লেখার ইতি টেনেছেন নারী ও তাদের বাবাদেরকে কিছু গরম ও প্রতিশোধমূলক গালি দিয়ে।
সত্যিই আমাদের আত্মশুদ্ধির বড় প্রয়োজন। আমরা আত্মশুদ্ধ হলে এমন আহাম্মকি কায়-কারবারের দিকে ধাবিত হতাম না। কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنفُسَكُمْ لا يَضُرُّكُمْ مَنْ ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ إِلَى اللَّهِ مَرْجِعُكُمْ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ
হে মুমিনগণ! আত্মসংশোধন করাই তোমাদের কর্তব্য তোমরা যদি সৎপথে পরিচালিত হও। তবে যে পথভ্রষ্ট হয়েছে সে তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহর প্রতিই তোমাদের সকলের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর তোমরা যা করতে তিনি সে সম্বন্ধে তোমাদেরকে অবহিত করেন। [সূরা মায়িদা : ১০৫)
আজ আফসোসের সাথে বলতে হয়, আমিও একজন বাবা। আমারও মেয়ে আছে। এই যুবকের নীলকষ্ট মাখা ভর্ৎসনার ছিটে যে আমার গায়েও এসে পড়েছে! কারণ আমি যে এই সমাজেরই একজন! আমি কি এড়িয়ে যেতে পারব সমাজের এই নোংরা খেলা?

📘 লাভ ম্যারেজ > 📄 বিবাহযোগ্য এক যুবতির করুণ আর্তনাদ

📄 বিবাহযোগ্য এক যুবতির করুণ আর্তনাদ


এবার আসি দ্বিতীয় চিঠি প্রসঙ্গে।
আগেই বলেছি দ্বিতীয় চিঠিটির লেখিকা এক যুবতি। তিনি চিঠিতে যা উল্লেখ করেছেন, তাতে তার বুকে জমা করুণ আর্তনাদই ফুটে ওঠেছে। কিন্তু তিনি 'যে অসহায়! তার যে কিছু করার নেই। মুখ বুজে যৌবনা দেহকে তিলে তিলে হারাতে বসেছেন তিনি। তিনি লিখেছেন যে, তিনি যে পরিবারে
জন্মগ্রহণ করেছেন সেই পরিবারে তারা তিন বোন। তিনি সেই তিন বোনের একজন। বড়ভাইয়ের বাসায় একসাথে তারা সবাই থাকেন। বড়ভাই তাদেরকে আদুরে চোখে দেখেন। বাবার মতোই তিনি তাদের সকল আব্দার রক্ষা করে চলেন। তিনি তাদের জন্যে খরচের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের কমতি করেন না। মায়াঘেরা এক স্বর্গোদ্যান তাদের পরিবার।
কিন্তু বিপত্তি সব অন্য জায়গায়। যখনই কোনো বোনের বিয়ের জন্য কোথাও থেকে প্রস্তাব আসে, ঐ ভাই মহোদয় নানা অজুহাতে তা প্রত্যাখ্যান করে দেন। প্রস্তাবিত পাত্র সম্পর্কে বড়ভাই ভাবেন যে, এই লোকটি কৃপণ স্বভাবের হবে হয়তো। তার কাছে বিয়ে দিলে আমারে আদুরে বোনের কষ্ট হবে! কখনো ভাবেন যে, ওই লোকটা মূর্খ, বকলম। অথচ তিনি বড় জ্ঞানী। সে তার উপযোগী হয় কিভাবে? কোনো ব্যাপারে মাসয়ালার প্রয়োজন হলে সমাধান হবে কীরূপে?
যুবতির বড়ভাই কখনো ভাবেন যে, অমুক ভদ্রলোকের পরিবারের সদস্যসংখ্যা অনেক বেশি। তাদের মা, বোন, ভাইয়ের বৌ সবাই জীবিত আছেন। এ কারণে তিনি আশঙ্কা করেন যে, তারা সবাই মিলে বোনের ওপর জুলুম করবে!
কখনো এমন কেউ প্রস্তাব নিয়ে আসেন যে, তার মাঝে কোনো দোষ খুঁজে পান না। অগত্যা বেচারাকে প্রথমে দেনমোহরের বোঝা, তারপর আরও দায়দায়িত্ব চাপিয়ে দেন। এভাবে তারা তিন বোন জীবনের দীর্ঘ সময় পার করেছেন কুমারী অবস্থায়।
এই হলো পৃথক দুটি পত্রের ভেতরের কথা।

📘 লাভ ম্যারেজ > 📄 যুবক-যুবতিদের উচ্ছন্নে যেতে দায়ী কে

📄 যুবক-যুবতিদের উচ্ছন্নে যেতে দায়ী কে


সুপ্রিয় পাঠক-পাঠিকা! আজ আমাদের সামাজিক জীবনের সবচেয়ে সংকটপূর্ণ একটি সমস্যা আলোচনা করব। তাহলো, ঘরে ঘরে সেয়ানা যুবতি-কন্যারা বিয়ের অপেক্ষায় প্রহর গুণছে। অন্যদিকে অবিবাহিত যুবকরা চিন্তায় বিভোর হয়ে আছে। তারা বিয়ের পথ খুঁজছে। অলিগলি ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু এই দু'দলের মাঝে বিশাল অন্তরায় সৃষ্টি হয়ে আছে। যে অন্তরায় তাদেরকে হালাল মিলনের পথে বাধা দিচ্ছে। পক্ষান্তরে তাদের সামনে রঙিন অবয়বে ধরা দিচ্ছে যেনা আর ব্যভিচারের ময়লা পথ। অথচ কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে-
তোমরা ব্যভিচারের ধারে কাছেও যেও না, নিঃসন্দেহে এ হচ্ছে একটি অশ্লীল কাজ এবং নিকৃষ্ট পথ। (বনি ইসরাঈল: ৩২/
আমি বলি যে, এই যুবক-যুবতিদের তারুণ্যদীপ্ত জীবনকে বৈধ পথ বিসর্জন দিয়ে অবৈধ পন্থায় কাজে লাগাবার পেছনে অনেকাংশে আমাদের অভিভাবক দায়ী। আর এ কারণেই যুবক-যুবতিরা জৈবিক চাহিদা মিটাতে নানা পন্থা অবলম্বন করে থাকে। কারণ সেখানে কোনো বাধা-বিপত্তির ধার তাদের ধারতে হয় না।
যুবক-যুবতিদের উচ্ছন্নে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বেশি দায়ী হচ্ছেন সম্মানিত বাবারা। ক্ষমা করবেন। আমি সব বাবাকে উদ্দেশ্য করছি না; বরং যারা এখনও উপলব্ধি করতে পারছেন না যে, জগতে বর্তমানে ধ্বংসকারী প্রলয়ঙ্করী ঝড়ো হাওয়া বয়ে চলছে। যে বাতাস চরিত্র, নীতি-নৈতিকতা, ইজ্জত-আবরু সবকিছু ধুলিসাৎ করে দিচ্ছে। এর কোনো প্রতিষেধক নেই। মুক্তির কোনো উপায়ও নেই। একটিমাত্র পথ খোলা। সেটি হচ্ছে বিয়ের দরজা।
মনে রাখবেন, যে ব্যক্তি বিয়ে-শাদিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় অথবা এ পথে শর্তারোপের মাধ্যমে জটিলতা সৃষ্টি করে কিংবা সহজভাবে কার্যসম্পাদন করতে পেরেও সহজায়ন করে না; তিনি এই মহাসঙ্কটের অন্যতম নায়ক। তিনি জটিলতা সৃষ্টির অন্যতম ভূমিকা পালনকারী।
অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত যে, পাত্র-পাত্রী উভয়পক্ষে অসুবিধা থাকলেও মেয়ের দিকে অসুবিধার মাত্রাটা একটু বেশি। কারণ, যুবক অপরাধ করে খালাস হয়ে যায়। কিন্তু যুবতি অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত ভোগ করে। তাছাড়া আমাদের সমাজব্যবস্থাও যুবকদের ক্ষমা করে দেয়। তাদের ক্ষেত্রে বলে, আরে! একটা যুবক মানুষ। কিছু একটা দোষ না হয় করেছে। তওবাও তো করেছে! কিন্তু মেয়ের বেলায় ক্ষমার এই দৃষ্টিটা দেয়া হয় না। তাকে চিরঅপরাধী হিসেবেই দেখা হয়। তাকে মনে করা হয় অলুক্ষণে। তাকে ভাবা হয় নষ্টা-পাপীষ্ঠা!
হ্যাঁ, মেয়ের বাবা যদি বিচক্ষণ হন, তাহলে কন্যার বিয়ের ব্যাপারে জলদি কাজ আঞ্জাম দিয়ে থাকেন। এই অর্থে নয় যে, মেয়েকে বাজারে উপস্থাপন কিংবা প্রথমবার যে প্রস্তাব দেয়, তার হাতেই সোপর্দ করেন। বরং তার
জন্যে শরিয়তসম্মত পথের অনুসন্ধানে মগ্ন থাকেন। ছেলের দীনদারি, চরিত্র ও নীতির সবিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেন।
দীনদারি ও নীতি-নৈতিকতা পছন্দ হলে দ্বিতীয় পর্যায়ে ছেলের পরিবার তাদের আচার-আচরণ এবং চিন্তাচেতনায় দৃষ্টি দেন। যদি ছেলে ও তার পরিবারের উপযোগী হয়, অর্থসম্পদে এবং বংশগত দিক থেকে কাছাকাছি হয়, সেই সাথে মেয়ে বাবার ঘরে যেভাবে লালিত হয়েছে স্বামীর বাড়িতেও সেভাবে জীবনযাপন করতে পারবে বলে বিশ্বাস হয় তাহলে বাবা এবার কবুল করে নেন।

📘 লাভ ম্যারেজ > 📄 কুসংস্কারের ছোবলে বিক্ষত পবিত্র বিবাহ

📄 কুসংস্কারের ছোবলে বিক্ষত পবিত্র বিবাহ


আমাদের সমাজে বিবাহ উপলক্ষে নানা আয়োজন প্রচলিত। এসব কুসংস্কারের বিষাক্ত ছোবলে বিবাহের মতো পবিত্র ইবাদত আজ ক্ষতবিক্ষত। যেন এই আয়োজনের দায়ভার দেনমোহরের চেয়েও বেশি! এই কুসংস্কার কখনও ছেলেকে কখনও মেয়ের বাবাকে কখনও আবার উভয়কে ঝাঁজিয়ে তোলে। এক্ষেত্রে আমার দৃষ্টিভঙ্গি হলো, বিয়ের অনুষ্ঠান অবশ্যই হবে। কারণ, এটি সুন্নাত। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। তাহলো, কাপড়চোপড় আর পোশাক-পরিচ্ছেদ।
আমি এক স্যুট পোশাক পরে বিশটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছি। অথচ একজন মা তার দ্বিতীয় মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে প্রথম মেয়ের বিয়ের কাপড় পরে যেতে রাজি হন না। তাদের মনের মাঝে উঁকি দেয়- হায়রে আমার পোড়া কপাল! আমি দুর্ভাগা মা! আমাকে এক কাপড়ে দু'বার দেখলে মানুষ কী ভাববে?
একই অবস্থা বোনের, চাচীর, চাচাত বোনের এবং প্রতিটি মেয়ের। তারা সবাই নিজেদের স্বামীকে অনুষ্ঠানের জন্যে নতুন কাপড় কেনার জন্যে চাপ প্রয়োগ করে। মূলত এমন একটি অনুষ্ঠান চল্লিশটি পরিবারের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। কখনও তাদের মাঝে এমন বিরূপ ভাব সৃষ্টি করে ফেলে যে, সাংসারিক জীবনে ফাটল ধরে যায়। যা আর জোড়া লাগে না। এর খেসারত দিতে হয় বছর বছর ধরে।
এই তো গেল একটি দিক।
বিবাহের দ্বিতীয় কুসংস্কার হলো ফুলশয্যা সাজানো।
আমি একটি বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পর্কে জানি। সেখানে একেক আইটেমের ফুলের দাম এক হাজার লিরা। এমন কয়েক প্রকারের ফুল! গোলাপ, জবা, পলাশ, জবা, ডালিয়া, সূর্যমুখী আরো কতো কী! আপনারা কি উপলব্ধি করতে পারছেন যে, সেখানকার অবস্থা কেমন হয়েছিল? ফুলগুলোতে স্থান সংকুলান হচ্ছিল না। থরে থরে সাজানো, ছড়ানো ছিটানো ছিল। পরে এগুলো সরাতে ট্রাক ভাড়া করা হয়েছিল! হাজার হাজার লিরা ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া হলো! অথচ শহরে হাজারো পরিবার একটি লিরার জন্যে পথ চেয়ে থাকে তীর্থের কাকের মতো।
তৃতীয় কারণ জামাকাপড় রাখার বক্স। একটি বক্সের দাম কম করে হলেও পাঁচ থেকে সাত পিয়াস্টার। কোনোটির মূল্য পাঁচ লিরা পর্যন্ত হয়ে থাকে। তাহলে ভাবুন, সাধারণ পর্যায়ের একটি বিয়ে অনুষ্ঠানে কী পরিমাণ পয়সা খরচ হয় শুধু এই বক্সের পেছনে?
এখানে কেবল মধ্যবিত্ত পরিবারের খরচপাতি ও আয়োজন নিয়ে আলোচনা করলাম। উচ্চবিত্তদের বিয়ে-শাদিতে, অন্যায়-অশ্লীল কাজে সম্পদের যে অপচয়, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আল্লাহই ভালো জানেন।
বিষয়টি যদি এখানেই ক্ষ্যান্ত হতো তবে আর কথা ছিল না। কিন্তু ঘটনা এই অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ নয়।
এছাড়াও চতুর্থ আপদ হিসেবে রয়েছে বৌ-ভাত, চুক্তিকৃত হাদিয়া। এটিই সর্বশেষ আপদ। এসব পেয়ে আপনি বেশ খুশি হবেন। এ সময়ে এত হাদিয়া পাবেন, যেগুলো আপনার কোনোই প্রয়োজন নেই। আমন্ত্রিতরা চেয়ার, ডাইনিং টেবিল, খাট-সোফা ও বিভিন্ন ফার্নিচার দিয়ে ঘর ভরে দেবে। অথচ আপনার বাড়ির রুম মাত্র চারটা। এসব রাখারও জায়গা হয় না।
কিন্তু এ পর্যন্তই কি শেষ? না। এখানেই শেষ নয়। যদি আপনি এগুলো বিক্রি করতে চান, তাহলে মানুষ আপনাকে 'ছোটলোক' বলবে। তাহলে কী করবেন এসব দিয়ে? এরপর সাথে সাথে আপনার থেকে এই ঋণ পরিশোধের তাগাদা আসবে। যারা হাদিয়া দিল, তাদেরও তো আনন্দ-আয়োজন হবে। তখন! আপনি ভাববেন, অমুকের মেয়ের বিয়ে। তার বাড়িতে আনন্দ-উল্লাস চলছে। সমাজের সঙ্গতি রেখে তার বাড়িতে না গেলে কি প্রেসটিজ রক্ষা হয়? তিনি আমাদের মেয়ের বিয়েতে উচ্চমূল্যের জাপানি গিফট দিয়েছিলেন। আমি যদি তার চেয়ে বেশি দামের না দিই তাহলে সমাজ ব্যাপারটি কেমন ভাববে?
আপনি হয়তো বলবেন যে, আরে! আমি কি অমুকের কাছে এই দামি জিনিসটি চেয়েছিলাম? ওটা আমাদের কিইবা কাজে এসেছে? বরং ধুলা জমে মেয়ের বাড়িতে পড়ে আছে। ভাগ্যিস! আমাদের এখানে নেই। যদি আমার বাড়িতে থাকত, তাহলে সব সময় ভয়ে-ভয়ে বুক দুরুদুরু করত, কখন জানি খাদেমা ভেঙে ফেলে অথবা বাচ্চারা ছুড়ে মারে!
কিন্তু স্ত্রী বলবে, আপনি যা-ই বলুন, কিছু একটা তাদের দিতে হবে। না হয় মানুষ কী বলবে! মান-ইজ্জত সবই যাবে!
এভাবে আপনাকে উৎপীড়ন করতে থাকবে। কান দুটো ভারী করে তুলবে। এক পর্যায়ে আপনি মেনে নিতে বাধ্য হবেন। সারেন্ডারের শাদা নিশান উড়িয়ে দেবেন এবং বলবেন, নাও! পরিবারের খাদ্যের পয়সা। মানুষের জন্যে কিনে এনো! এভাবে মেয়ের মায়েরা স্বামীদের ওপর নির্যাতন করে থাকেন এবং এসব অপসংস্কৃতি প্রচারে সহায় করে যান। এটাই বিয়ের ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টির অন্যতম কারণ।
আমরা যদি এ ধরনের বড় বড় আয়োজন বর্জন করে নিকটাত্মীয়দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে পারতাম এবং দামি-দামি বস্তুসামগ্রী উপঢৌকন দেয়া থেকে বিরত থাকতে পারতাম। যেমন শাহি পালঙ্ক, যা সারা জীবনে চার-
পাঁচবারের বেশি ব্যবহার হয় না। মূলত এসব কীর্তি কলাপের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের কাছে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হতে প্রদত্ত আমানতেরই খেয়ানত করছি। যার জবাবদিহি অবশ্যই আমাদেরকে করতে হবে।
কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে- يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ
হে ঈমানদারগণ! খেয়ানত কর না আল্লাহর সাথে ও রাসূলের সাথে এবং খেয়ানত কর না নিজেদের পারস্পরিক আমানতে জেনেশুনে। [আনফাল: ২৭]
একটি পালঙ্কের মূল্য কমপক্ষে একশ লিরা তো হবেই। আর সর্বোচ্চটির 'মূল্য' থেকে আল্লাহর পানাহ! যদি এসব পরিহার করতে পারি, তাহলে বর-কনের অতিরিক্ত পোশাক ও সাজসরঞ্জামেরও প্রয়োজন হবে না।
দেখুন, বিয়ের কাপড় মাত্র একদিন পরিধান করে আলমিরায় ফেলে রাখা হয়। যেমন করে কঙ্কাল সাইন্সের কলেজে ঝুলিয়ে রাখা হয়। তাহলে কী প্রয়োজন মাত্র কয়েক দিনের জন্যে এত মূল্য দিয়ে জামাকাপড় ক্রয় করার? কারও থেকে ভাড়াও তো নেয়া যায়! ওহহো ভাড়া নেয়া! তাতে যে মান-ইজ্জত বলতে আর কিছুই রইল না! এতে যে জাত-কুল উভয়ই পাংচার হবে!
তাই আমাদের দেখা উচিৎ, এ সমস্ত খরচাপাতির মধ্যে কোনটি বর-কনের পারিবারিক জীবনে প্রয়োজন। দেখা দরকার তারা কোন কোন বস্তুর মূল্য পরিশোধে সমর্থ। যেসব জিনিসের ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যই থাকে মানুষের মাঝে আকর্ষণ সৃষ্টি করা- যেমন বাসরের কাপড়, ফুলশয্যা সজ্জায়ন, পালঙ্ক উপহার, ফুলের তোড়া স্যুটবক্স- এগুলো পরিহার করতে হবে।
আমাদের প্রত্যেকেই চান মানুষ তাকে ভালো বলুক, সামান্য প্রশংসা করুক। কিন্তু এক হাজার লিরা ব্যয় করে প্রশংসাবাক্য 'মাশাআল্লাহ' শোনা একেবারেই নির্বুদ্ধিতা। কারণ, এর মূল্য নিতান্তই কম এবং এর আবেদন বড়জোর কয়েক ঘণ্টা মাত্র। এ কয়েক ঘণ্টার মাশাআল্লাহ কিংবা মারহাবা অথবা ধন্যবাদ শব্দ শোনার জন্য এত বিপুল পরিমাণ অর্থ শ্রাদ্ধের কোনো মানে হয় না। অন্তত বিবেকবান মানুষ এমনটি করতে পারে না।
উপসংহারে বলব, প্রথম পত্রটির লেখায় কিছুটা অতিরঞ্জন রয়েছে। কারণ যদি তিনি নিজের উপযোগী এমন কাউকে প্রস্তাব দিতেন, যারা পূর্ব থেকেই তার সম্পর্কে জানে-চেনে, তাহলে প্রস্তাব খুশিমনে মেনে নিত। তাহলে আর
তারা তার দৈহিক গঠন, অর্থসম্পদ ও পিতামাতার ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ পেত না।
আর দ্বিতীয় পত্রটির লেখিকার বিষয়টি সৎ ও যোগ্য ছেলের সন্ধান পাওয়ার পর কাজীর কাছে পেশ করেছি। কাজী সাহেব ছেলের সততা ও দিয়ানতদারির ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে বিয়ের কার্য সম্পন্ন করেছেন। যদিও মেয়ের অভিভাবক কোনো জামাইর প্রতি খুব একটা রাজি ছিল না।
সম্মানিত পাঠকবৃন্দ! আমরা বিয়েসংক্রান্ত যে সমস্ত জটিলতার কথা উল্লেখ করলাম, এর থেকে উত্তরণের সহজ পথ হলো বৈবাহিক সম্বন্ধ সহজতর করা। আমি মনে করি, যে লোক বিয়ের জন্যে চেষ্টা চালায় এবং পূর্ণতার জন্যে পথ অন্বেষণে থাকে, অবশ্যই সে নেক ও কল্যাণ প্রচেষ্টায় রত। সে দেশ ও দীনের সেবায় আত্মনিয়োজিতদের অন্তর্ভুক্ত।
এ পর্যায়ে যাদের কাছে মেয়ে আছে তাদের বলি, ভালো পাত্রের প্রস্তাব এলে ফিরিয়ে দেবেন না। যুবকদেরও বলি, আপনারা দ্রুত বিয়ে করে ফেলুন। কারণ, ফরজসমূহ আদায় এবং হারাম থেকে বিরত থাকার পর বিবাহ থেকে উত্তম কোনো নেক আমল আপনারা করতে পারেন না। এর মাধ্যমে চরিত্র ও দীন উভয়ই রক্ষা পাবে।
হে শহরের গুণীজন! হে সংস্কারকর্মের দাঈগণ! হে কলমের অধিপতিরা! হে মিম্বরে খোতবাদানকারী সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ! বিবাহকে আপনারা কাজের প্রথম ও প্রধান স্থানে রাখুন। আল্লাহ অবশ্যই প্রচেষ্টাকারীদের তাওফীক দান করেন এবং অধিক প্রতিদানের ফয়সলা করবেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00