📄 সুস্থ বিবাহের প্রতিবন্ধকতাসমূহ
প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় সুস্থ বিবাহ সম্বন্ধে জটিলতা সৃষ্টির বেশ কিছু কারণ রয়েছে। সামাজিক নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত আমাদের সমাজদেহ। নিচে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সামাজিক প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরা হলো-
১. তথাকথিত শিক্ষাব্যবস্থা:
বিবাহোত্তর নানা জটিলতার অন্যতম সামাজিক ব্যাধি হলো বর্তমান তথাকথিত আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা। বর্তমানে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা মানুষের আল্লাহপ্রদত্ত স্বভাবগুণ ও আত্মিক চাহিদা এবং বস্তু ও বাস্তবতার সম্পূর্ণ বিপরীত।
আল্লাহ তায়ালা যুবক ও যুবতির মধ্যে যৌনপ্রবৃত্তির উপকরণ রেখে দিয়েছেন। তিনি এই সুপ্ত শক্তির প্রকাশের জন্যে পনেরো ও এর কাছাকাছি বয়স নির্ধারণ করেছেন। একথা অনস্বীকার্য যে, মানুষ সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ তায়ালা। সুতরাং মানুষের চাহিদা ও সেই চাহিদার সময় সম্পর্কে তিনিই সম্যক অবহিত। সেই প্রেক্ষিতেই ইসলাম যুবক-যুবতির যৌনপ্রবৃত্তি প্রকাশের বয়স নির্ধারণ করেছে পনেরো-ষোলো বছর। যখন কোনো ছেলে অথবা মেয়ে এ বয়সে উপনীত হয়, তখন নিজের ভেতর এক অজানা তাড়না অনুভব করে। এতদিন যা ঘুমন্ত ও অচেতন ছিল, এ সময়ে তা জাগ্রত ও সচেতন হয়ে পড়ে। কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে- وَأَنكِحُوا الْأَيَامَى مِنْكُمْ وَالصَّالِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ إِنْ يَكُونُوا فُقَرَاءَ يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ )
তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন, তাদের বিবাহ সম্পাদন করে দাও এবং তোমাদের দাস ও দাসীদের মধ্যে যারা সৎকর্মপরায়ণ, তাদেরও। তারা যদি নিঃস্ব হয়, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে সচ্ছল করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। (সূরা নূর: ৩২]
দুর্ভাগ্যজনক সত্য হলো, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যুবক-যুবতিদের পঁচিশ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানে থাকতে বাধ্য করে। একটি শিশু জাতিসংঘের নিয়ম মোতাবেক স্বভাবত সাত বছর বয়সে স্কুলে ভর্তি হয়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বারো বছর পড়াশোনা করে। তখন তার বয়স উনিশে পৌছে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে চার থেকে সাত বছর অধ্যয়ন করে। এ সময়ে তার বয়স হয় তেইশ থেকে ছাব্বিশ। পরে অনেকে ডিগ্রি অর্জনের জন্যে ইউরোপ-আমেরিকায় গমন করে। সেখানে আরও তিন-চার বছর সময় ব্যয় হয়। ফলে দেখা যায়, শিক্ষাজীবন পাড়ি দিতেই ত্রিশ বছর শেষ!
স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে যে, এই দশ-পনেরো বছর কিভাবে একজন তারুণ্য উদ্দীপ্ত যুবক-যুবতি সততার সঙ্গে কাটাতে পারে? যখন তার ভরা যৌবনে কামনা-বাসনার পূর্ণ জোয়ার, শিরা-উপশিরায় যখন তার প্রবৃত্তির তাড়না,
সেই সাথে তার ওঠাবসা-চলাফেরা আবেগপূর্ণ সহপাঠীদের সাথে! তার সাথে যদি পাশ্চাত্যে সফর করা যোগ হয়ে থাকে, তাহলে তো ভালোবাসার সাগরেই হাবুডুবু খেয়ে একাকার। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, আমাদের কথিত আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা আর ইসলামি নির্দেশের মাঝে ফারাক অনেক।
আমার এ আলোচনা প্রবৃত্তিবিষয়ক নয়। আমি জানাতে চাচ্ছি না, এই সময়ে তারা কী করে? বরং আমার আলোচ্য বিষয় হলো, বিবাহ কিভাবে বাধ্যতামূলক ও অপরিহার্য।
ত্রিশ বছরের আগে যুবক-যুবতিরা বাবার খেয়ে লালিত-পালিত হয়। এ সময়ে নিজের কায়-কারবার কিছুই নেই। একেবারেই হতদরিদ্র! এরপর যখন বিয়ের বয়স (?) হয়, তখন আয়-উপার্জন করতে আরও পাঁচ বছর চলে যায়। ফলে তখন কারো কারো বয়স এসে দাঁড়ায় پঁয়ত্রিশে।
মূলত এসব কল্যাণকর পথ হতে শয়তান মানুষকে বিরত রাখে। তাই নীতিবান মানুষের জন্য উচিত হলো এসব অন্যায় কাজ হতে নিজেকে বিরত রাখা। কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে-
وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَنْ ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا
কখনো এমন কোনো ব্যক্তির কথামতো চল না, যার অন্তঃকরণকে আমি আমার স্মরণ থেকে গাফেল করে দিয়েছি। আর যে ব্যক্তি নিজের প্রবৃত্তির গোলামি করতে শুরু করেছে এবং যার কার্যকলাপ সীমানা লঙ্ঘন করেছে সে (শয়তানের) পথেও চল না। [সূরা কাহাফ: ২৮]
ভালোভাবে হিসেব নিলে দেখা যাবে যে, আমাদের সমাজে এ ধরনের যুবকের অভাব নেই। এক পর্যায়ে দেখা যায়, তারা আর বিয়ে-শাদি করে না। কারণ, তাদের কাছে ঐ সময়টাতে বিয়ে করা এক ধরনের ঝামেলা বলে মনে হয়। সেই সাথে প্রবৃত্তি-চাহিদাও অনেকাংশে কমে যায়। যৌবনেও ভাটা নামে ততদিনে।
এ কারণে আমার গবেষণা মতে, বৈবাহিক জটিলতার অন্যতম সামাজিক ব্যাধি হলো প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা। গত কয়েক যুগ আগেও যখন বড় বড় এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছিল না, তখন সাধারণ যুবকশ্রেণি ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত থাকত। বিশ বছরে পা রাখলে তাদের দু-একটা দোকান থাকত এবং তারা বেশ সম্পদের অধিকারী হয়ে যেত। একদিকে হতো খাঁটি ব্যবসায়ী, অন্যদিকে স্বামী, বাবা ও পরিবারের কর্তা। আর মেয়েদের চৌদ্দ বছর হলে বিয়ে-শাদি দেয়া হতো।
কিন্তু আজকের প্রেক্ষিত সম্পূর্ণ ভিন্ন। আজ চৌদ্দকে দ্বিগুণ করে আটাশ বছরেও দেখা যায় মেয়েদের বিয়ের পিঁড়িতে বসানোর কোনো পেরেশানি অভিভাবকের মাঝে দেখা যায় না। এসবই আমাদের প্রচলিত আধুনিক (?) শিক্ষাব্যবস্থার ফসল।
২. বিয়ে-শাদিতে প্রচলিত কুসংস্কার ও সামাজিক প্রথা : বৈবাহিক জটিলতার আরেক সামাজিক ব্যাধি হলো আমাদের সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার ও সামাজিক কুপ্রথা। মূলত সমাজদেহে ঘাপটি মেরে বসে থাকা এই কুপ্রথাগুলো একসাথে ছেলে ও মেয়ে উভয়ের পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। এ প্রথা কারও জন্যে কোনো কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। আমাদের সমাজে বিবাহ উপলক্ষে নানা আয়োজন-অনুষ্ঠান করা হয় শুধু মানুষের সামনে নিজেকে বড় দেখানোর উদ্দেশ্যে। অনেক আয়োজন হয়ে থাকে অন্যায়-অপচয়ে গর্হিত প্রতিযোগিতা প্রদর্শনের জন্যে। যেমন অধিক পরিমাণে দেনমোহর নির্ধারণ, দামি-দামি উপহারসামগ্রী ও সজ্জা সরবরাহ করা।
বিভিন্ন কারণে আমাকে নানা জায়গায় যেতে হয়েছে। মোটামুটি বিশ্বের বহু দেশ ভ্রমণ করার সুযোগ আমার হয়েছে। বিশেষত কথিত উন্নত দেশ দাবিদার সবগুলো দেশই আমি ভ্রমণ করেছি। সে সময়গুলোতে আমি বহু বিলাসবহুল বাড়িতে গমন করেছি। অধিকাংশ বাড়িই পেয়েছি বিলাসসামগ্রীতে ভরপুর। এখানে-ওখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে এলোমেলোভাবে পড়ে থাকতে দেখেছি নানা সামগ্রী। আমি আক্ষেপের সাথে এও দেখেছি যে, রুচি ও সৌন্দর্যের কোনো চর্চাই করা হয়নি সেগুলোতে। অথচ আমরা যাদের অনুকরণে এ সমস্ত বস্তুর আয়োজন করি, তারা আমাদের মতো অপচয়-অপব্যয়ে পয়সা খরচ করে না। যা প্রয়োজন তা-ই সংগ্রহে রাখে।
আমি বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করে একটি বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছি যে, সেসব দেশের মানুষ বিনা প্রয়োজনে কিছু করেন না। কখনও সাজসজ্জার প্রয়োজন হলে মূল্যবান জিনিস দিয়ে ঘরবাড়ি সাজায়। রুচি ও চাহিদামতো সবকিছুর আয়োজন করে। স্মৃতি-স্মারক কিছু হয়তো উপহার দেয়। শুধু দামি আর মোটা হলেই হলো না। তাদের কাছে আপনারা অব্যবহৃত জিনিসপত্র দেখতে পাবেন না। সারি সারি গ্লাস, চিনামাটির পাত্র, বোল-বাটি, সুগন্ধির কৌটা দিয়ে ঘর ঠাসা করা তাদের অভ্যাস নয়। তারা সব সময় ধাতুর চেয়ে রুচির মূল্য বেশি দিয়ে থাকে।
আমাদের দেশে বিবাহকে কেন্দ্র করে যেই ধারাবাহিক অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়ে থাকে বিদেশবৈভবে এসবের কোনো বালাই নেই।
যেমন আমাদের অনুষ্ঠানমালার ধারাবাহিক আয়োজন- প্রথমে মেয়ে দেখা, তারপর আংটি পরানো, পোশাক পরানো, বিয়ে পরানো, বৌ-ভাত, সপ্তম দিন উদ্যাপন, পরিচিতিমূলক অনুষ্ঠান, প্রতিটি আয়োজনে অন্ততপক্ষে একশ প্রকারের বোঝা বহন করতে হয়। এসবের বালাই খুব একটা নেই তাদের কাছে। মূলত আমাদের দেশের প্রচলিত এসব অনুষ্ঠানে হৃদয়হীন কিছু মানুষের সমাগম করানো হয়। যাদের প্রকৃত অর্থেই না আছে কোনো ধরনের সহমর্মিতা, না আছে স্নেহ-মমতা। শুধু ভুঁড়িভোজই তাদের আসল উদ্দেশ্য।
এ সমস্ত আয়োজন পাত্র-পাত্রী উভয়ের জন্যে একটা বোঝা। এগুলো একটা আপদ। এগুলো তাদের জীবনে সংকট সৃষ্টি করে দেয়। নীরবে কুড়ে খায় তাদের কলিজা। কী বিশ্রী কথা যে, ইদানীং বিভিন্ন জায়গায় আধুনিকতার নামে নারীদের থাকে কাপড়-প্রদান অনুষ্ঠান। বর-কনের হয় পোশাক বিনিময়। আবার পরস্পরের প্রদত্ত পোশাক নিয়ে চলে খুঁত বের করা। এসব বেলেল্লাপনা ও ভদ্রতা বর্জিত প্রথা ইসলামের নির্মল জমিনে নেই। এসবই আমাদের কথিত সামাজিকতা ও লৌকিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
তাছাড়া কথিত সভ্যতার আবরণে অন্যান্য নির্ধারিত 'হাদিয়া' ও 'উপঢৌকন'-এর নামে যৌতুকের লীলাখেলা তো আছেই। কখনও উভয় পক্ষের চুক্তিমতো নির্দিষ্ট মূল্যের উপহারকে বাধ্য করা হয়। প্রস্তাবকারী সাধারণ দেনমোহরের থেকে বেশির দায়িত্বও নিয়ে থাকে। কন্যার পিতাও মান রক্ষার্থে উপঢৌকনের মাত্রা বাড়াতে সম্মত হয়।
শুধু এখানেই শেষ নয়, সামাজিকতা ও লৌকিকতার শ্রাদ্ধ করতে সাথে সাথে যাদের দাওয়াত করা হয়, তাদের ওপরও সৃষ্টি হয় প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ অঘোষিতভাবে বাধ্যতামূলক করা হয়। ফলে ছেলেমেয়ে ও স্ত্রীকে নতুন পোশাক এবং বর-কনের জন্যে 'হাদিয়া'র যোগান দিতে ভিন্ন পরিবারেও ব্যাপক কৃত্রিম চাপ সৃষ্টি হয়। যা অনেকের মুখ বুজে সয়ে যাওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না।
আমি এক সময় ইন্দোনেশিয়ার 'জাওয়া' দীপে ছিলাম। তখন সেখানকার অধিকাংশ যুবককেই বিবাহিত পেয়েছিলাম। তাদের সাথে বিবাহের রীতিনীতি সম্পর্কে কথা বলে জানতে পারলাম যে, তাদের দেশে এটা
একেবারেই সহজ ও স্বাভাবিক। আমি আমাদের দেশের বিবাহ-প্রথার কঠিনতা এবং আনুষ্ঠানিকতার বাধ্যবাধকতার বিষয়টি তাদের জানালাম। আরো বললাম যে, এই পরিস্থিতির কারণে বৈধ পন্থায় বিয়ে করার চেয়ে অবৈধভাবে যৌনমিলন সহজসাধ্য হয়ে গেছে। একথা বলছিলাম আর মনে মনে লজ্জিত হচ্ছিলাম।
আমাদের অভিভাবকরা এই অশুভ দিকটা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অমনোযোগী। একদিকে তারা সন্তানদের চরিত্রের ব্যাপারে তেমন যত্নশীল নন। অপরদিকে বিয়ের বিষয়টাও উপেক্ষার দৃষ্টিতে দেখে থাকেন। শুধু তাই না, আমাদের অভিভাবকরা বিয়েপ্রার্থীর সামনে নানা অজুহাতে ও ছলে-বলে শত কাঁটা ও বাধার প্রাচীর দাঁড় করিয়ে রাখেন। এসবই আমাদের কথিত সামাজিক কুপ্রথা ও কুসংস্কার। যা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে সন্তানদের সোনালি ভবিষ্যৎ অমানিশার অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে।
৩. ধর্মীয় বিধান অমান্য করা:
বিবাহের পথে তৃতীয় সামাজিক ব্যাধি হলো, অধিকাংশ বিয়েতে ধর্মীয় বিধান মানা তো হয়ই না; উল্টো বর্জন করা হয়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিবাহের ধর্মীয় নিয়ম সম্পর্কেই অনেকে ওয়াকিবহাল নয়। তারা এর নিয়ম-পদ্ধতিই জানে না। স্বামী যেমন জানে না স্ত্রীর হক কী এবং নিজের দায়দায়িত্ব কী! ঠিক তেমনি স্ত্রীও বোঝে না স্বামীর হক কী এবং নিজের কর্তব্যই বা কী? ফলে কেউ কারও হক যথাযথভাবে আদায় করে না। একে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয় মতবিরোধ ও মতানৈক্য। জন্ম নেয় ঝগড়া ও বাদানুবাদ। এভাবে দাম্পত্যজীবন হয়ে ওঠে বিষাদময়। মামলা, তালাক এবং পরিশেষে বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়ায়।
৪. চারিত্রিক অধঃপতন:
বৈবাহিক জটিলতার চতুর্থ সামাজিক ব্যাধি হলো চারিত্রিক অধঃপতন ও নৈতিকতার অবনতি। এটা মূলত বিয়ের পথে বাধা সৃষ্টির কারণেই তৈরি হয়েছে। সমস্যাটা চক্রাকারে আবর্তিত। অর্থাৎ চারিত্রিক অধঃপতনের কারণেই আবার বিয়ের পথে বাধার সৃষ্টি হয়েছে। যেমন এক কবি বলেছেন-
চক্রাবর্তন সমস্যা এসেছে আমার মাঝে আর যাকে ভালোবাসি, তার মাঝে। যদি আমার বার্ধক্য না হতো, তাহলে সে বিরূপ হতো না। সে বিরূপ না হলে আমার চুলে শুভ্রতা ছেয়ে যেত না।
বিয়ে যে কারণে প্রয়োজন সে প্রয়োজন পূরণ এখনকার যুবকদের হাতের নাগালে। সামাজিক প্রথা যে যুবককে বিয়ে থেকে বিরত রাখছে, সে বিয়ের প্রয়োজন ভিন্ন পথে সেরে নিচ্ছে। এভাবে সে নৈতিক বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছে। সহজভাবে যৌনক্ষুধা নিবারণের ফলে বিয়ের প্রতি ধীরে ধীরে আকর্ষণ কমে যাচ্ছে। কারণ তার ভাবনায় থাকে- বিয়ে মানে বিশাল আয়োজন, অন্যের দায়িত্ব গ্রহণ, টাকা-পয়সার ব্যাপক ছড়াছড়ি ইত্যাদি। এর চেয়ে ভালো হলো সহজেই কাজ সেরে নেয়া। যা চাওয়ার তা যখন সহজেই পাওয়া যায়, তাহলে আর এত ঝামেলার মুখোমুখি হওয়ার কী দরকার!
মনে রাখবে, বৈবাহিক জটিলতা এবং গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যভিচার কিংবা পতিতাবৃত্তির জটিলতা এক সূত্রে গাঁথা। একটা বাদ দিয়ে আরেকটার সমাধান সম্ভব নয়। আমাদের সমাজের পরতে পরতে এ সমস্যা ঘাপটি মেরে বসে আছে। যতদিন পর্যন্ত এ সমস্যার সমাধান করা না যাবে, ততদিন হাজারো শান্তিচুক্তি করেও শান্তির সুবাতাস পাওয়া অসম্ভবই বটে।
৫. বিবাহের সংস্থান না হওয়া: সুস্থ বিবাহের পথে পঞ্চম বাধাটি আমি এ লেখার শুরুতে ইঙ্গিত দিয়েছি। শুরুতে যে বিষয়ের সাথে পরিচিত করিয়েছি, তার ফলাফলই এ সমস্যা সমাধানের মোক্ষম উপায়। আমি সেখানে বলেছিলাম, বৈবাহিক জটিলতা সৃষ্টির অন্যতম কারণ হলো হাজার হাজার অবিবাহিত নারী ও পুরুষের বিদ্যমানতা।
যুবকদের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণি ও স্তর রয়েছে। ধনী-গরিব, ভদ্র-মূর্খ, ফাসেক-মুত্তাকি, মেধাবী-দুর্বল প্রভৃতি।
মেয়েদের মাঝেও স্তরবিন্যাস রয়েছে। তাই কোনো যুবক যখন বিয়ে করতে চায়, তার জন্যে উচিৎ হলো, মেধা-মননশীলতা, গুণ ও বৈশিষ্ট্যে নিজের মতো কাউকে প্রস্তাব দেয়া, যেন চিন্তাচেতনায় সামাজিক ও বাস্তব জীবনের সর্বাংশে একজন নারী তার সহকর্মী ও সহযোগী হতে পারে।
বৈবাহিক জীবনে যখন এ ধরনের স্বভাবগত ভিন্নতা ও বৈপরীত্য থাকে, তখন কর্তব্য হলো, প্রতিটি এলাকায় একদল সংস্কারক লোক থাকা। তারা মানুষের কাছে এই সমস্যাগুলো তুলে ধরবেন এবং সংশোধনের চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।
সারকথা হলো, সারা দেশে বৈবাহিক জটিলতা বিদ্যমান। এই জটিলতা নৈতিক ও চারিত্রিক বিপর্যয়ের সাথে সম্পৃক্ত। একটিকে বাদ দিয়ে আরেকটির সংশোধন সম্ভব নয়। এসবের মূলে রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থা। এরপর দেনমোহর নির্ধারণ, হাদিয়া-উপঢৌকন ও আনুষ্ঠানিক কুসংস্কারের সয়লাব।
তাছাড়া স্বামী-স্ত্রী শরয়ী আহকাম উপেক্ষা করে থাকে। ফলে যেখানে তাদের মাঝে মিল-মহব্বত হওয়ার কথা ছিল, সেখানে বিরোধ ও মনোমালিন্য হয়ে থাকে। বাবা-মা ও অভিভাবকদের রেখে নিজেরাই সব সম্পন্ন করে ফেলে। আবার কখনো এমন মেয়েদের বেছে নেয়া হয়, যারা বিবেচনায় ছেলের উপযোগী নয়। তারা কেবল গুণের পরিবর্তে সৌন্দর্যকে, দীনের বদলে সম্পদকে এবং চরিত্র ও নৈতিকতা না দেখে প্রেম-ভালোবাসাকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে। ফলে সমস্যার জাল ফসকা হওয়া অপেক্ষা দিন দিন ঠাসা হতে থাকে। পরিশেষে এর হাত ধরে অনুপ্রবেশ করে মনকষাকষি, হাতাহাতি, রেষারেষি, মামলা-মকদ্দমা, আত্মহত্যা, খুনখারাবি প্রভৃতি।
📄 বিবাহেচ্ছুক এক যুবকের নীল কষ্ট
প্রতিদিন অসংখ্য পত্র এসে আমার হাতে জমা হয়। কোনোটি দেশি কোনোটি বিদেশি। তবে দেশি চিঠিই বেশি। আজো তার ব্যতিক্রম নয়। আজকের চিঠিগুলোর মধ্যে আমার সামনে এ মুহূর্তে দুটি পত্র রয়েছে। একটি লিখেছেন জনৈক যুবক চাকরিজীবী। অপরটি লিখেছেন একজন যুবতি।
প্রথম চিঠিটিতে আমাদের দেশের বড় বড় সামাজিক জটিলতার মধ্য হতে বিশেষ একটি সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। দৃষ্টি আকর্ষণকৃত এ বিষয়টি কোনো মতবিরোধ ছাড়াই সবচেয়ে জটিল একটি বিষয়।
দ্বিতীয় চিঠিতে এই জটিলতা নিরসনের সমাধান সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। চাইলে একদিনেই পত্র দুটির জবাব দিতে পারতাম। কিন্তু না! আমি পত্রদ্বয় নিয়ে ভাবতে সময় নিই। তবে পত্র দুটি কোথেকে এসেছে, তা পাঠক মহলকে জানানো থেকে নিবৃত্ত রইলাম। বিশেষ কারণে সেখানকার কোনো নাম ও শিরোনাম আমি উল্লেখ করলাম না।
প্রথম চিঠিটির লেখক লিখেছেন, তিনি একজন সাধারণ চাকরিজীবী। তিনি মাসিক দুইশত 'লিরা' ভাতা পেয়ে থাকেন। ভদ্র বংশের লোক। সুন্দর গঠন
ও অবয়বের অধিকারী। তিনি চান বিয়ের মাধ্যমে নিজেকে হেফাজত করতে এবং পরিবার ও বংশধারা অব্যাহত রাখতে। এ উদ্দেশ্যে তিনি এক মেয়েকে প্রস্তাব করলেন। যথারীতি মেয়েপক্ষ ছেলের খোঁজখবর নিতে এলো। তারা ছেলের শারীরিক গঠন ও দীনদারির ব্যাপারে সন্তোষ প্রকাশ করল। তবে আপত্তি জানাল যে বিষয়টিতে তাহলো ছেলে সামান্য বেতনে চাকরি করে। কী আর করা! স্বল্প বেতনের চাকরিজীবী সেখান থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হলেন।
এবার আরেকটি মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। যেহেতু আগেরবার ধকল খেয়েছেন তাই তিনি এবার আগেভাগেই মেয়েপক্ষকে বুঝিয়ে বললেন যে, তিনি অল্প বেতনে চাকরি করেন।
জবাবে তারা বলল, বেতন? এটা কোনো ব্যাপারই না! এটা আর কী? এটা কি বেচাকেনা যে, ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করতে হবে? আমরা ধনসম্পদের বিবেচনা করি না।
ব্যাস! এতে তিনি খুশি হয়ে বললেন, এখানেই তো সৌন্দর্য!
যুবকের চোখের তারাগুলো আনন্দে নেচে ওঠলো। তিনি মনে মনে যেমন চেয়েছিলেন তেমনই পেতে যাচ্ছেন। এ খুশির আবহে বিষয়টি শেষ প্রান্তে এসেছিল প্রায়। কিন্তু শেষমেষ কনেপক্ষেরই দূরসম্পর্কের কোনো আত্মীয় তাদের কান ভারী করলো যে, টাকা পয়সা ছাড়া এখন চলে না। অবশেষে রণেভঙ্গ।
কিন্তু যেহেতু আলোচনা শেষ ধাপে চলে এসেছে, সেহেতু কিভাবে নিষেধ করবে তাও তাদের কাছে ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়াল। অবশেষে তারা কারো মাধ্যমে জানিয়ে দিল যে, ছেলে দেখতে তেমন সুন্দর নয়। অথচ তিনি সুন্দর। (পত্রের লেখক নিজের ব্যাপারে সৌন্দর্যের সাক্ষ্য দিয়েছেন; আমি নই। আমি তাকে দেখিওনি। তার চেহারা সম্পর্কে জানিও না।)
এবার তৃতীয় আরেক জায়গায় প্রস্তাব পাঠালেন বেচারা। তাদেরকে প্রথমেই জানিয়ে দিলেন যে, আমরা কোনো ধরনের জটিলতা, শর্তারোপ, অনুষ্ঠান-আয়োজন কিছুই করতে পারব না। আমি নিম্নপদস্থ চাকরিজীবী। মাসিক বেতন সিরীয় দুইশত লিরা মাত্র। আর আমার দেহ! এ তো আপনাদের সামনেই উপস্থিত। তারা বলল, আমরা আপনার গঠন ও বেতনে সন্তুষ্ট। আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি।
পাত্রীপক্ষের স্বাগত জানানোয় এবার সহজেই যুবকের চোখের তারা নেচে ওঠল না। কারণ আগে বারদুয়েক যেই ধকল খেয়েছেন এখন আবার কোন ধকল আসে তারই অপেক্ষায় তিনি।
হ্যাঁ, যেমনটি ভেবেছিলেন তেমনটিই হলো। মেয়েপক্ষ কাচুমাচু করে বলল যে, মেয়ের বড় বোনের দেনমোহর ছিল চার হাজার। আমরা ছোট মেয়ের মোহর তার কম নির্ধারণ করতে পারি না। তিনি চার হাজার লিরার কথা শুনে বললেন, আসসালামু আলাইকুম!
এবার চতুর্থ মেয়ের পালা। একবার যুবকের মনে চায় বিয়েই করবে না। আবার তার মনের মাঝে উঁকি দেয় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অমীয় বাণী- 'যে আমার সুন্নাত বিবাহ হতে নিজেকে গুটিয়ে রাখে সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।'
কী আর করা! এ পথে যে তাকে হাঁটতেই হবে। এবার তিনি চতুর্থ মেয়েপক্ষকে প্রস্তাব পাঠান। মেয়েপক্ষকে আগেভাগেই বলে দিলেন, আমার বেতন এত। আমার দেহ এমন। এক হাজার লিরা থেকে বেশি দেনমোহর দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
জবাবে মেয়েপক্ষ বলল, আমরা মেনে নিলাম।
যথারীতি কথাবার্তা, আলোচনা প্রায় শেষ। যাওয়ার আগে তারা বলে গেলেন যে, আমাদের মেয়ে আপনার কাছে থাকবে। তার সুখ-দুঃখ দেখা আপনারই দায়িত্ব। তাই তার জন্যে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেবেন। আর শোয়ার রুমটা আসবাবপত্রে সজ্জিত করবেন। এতটুকুই যথেষ্ট।
মেয়েপক্ষের এ আব্দারে বেচারার কলজে মোচড় দিয়ে ওঠল। কারণ এই আবেদন যে পূর্বের দেনমোহর অপেক্ষা ভারী! অগত্যা তিনি সেখান থেকেও পালিয়ে আসা ছাড়া গত্যন্তর পেলেন না।
সর্বশেষ পঞ্চম এক মেয়েকে প্রস্তাব পাঠালেন। এ স্থানেও সবকিছু খুলে খুলে বর্ণনা করলেন। তারাও সম্মতি জানাল। মেয়ে সূরা ফাতিহা পাঠ করল। তিনি টাকা-পয়সা জমা করলেন।
বিয়ের আয়োজন চূড়ান্ত পর্যায়ে।
কিন্তু শেষ প্রান্তে এসে মেয়েপক্ষ সব গুঁড়িয়ে দিল। কারণ, ছেলের মা ছিলেন গ্রাম্য মহিলা। তিনি নাকি এক মহাঅপরাধ (?) করে বসেছেন। অনুষ্ঠানের নিয়মনীতি, শোভা-সৌন্দর্য, আধুনিক ভদ্রতা সম্পর্কে তার নাকি ন্যূনতম ধারণা নেই। তিনি নাকি অলিমা অনুষ্ঠানে খেতে বসে গোশত
কাটার চামচ দিয়ে তরমুজ খেয়েছিলেন। তরকারির ঝোল আর পাতলা ডাল নাকি জোরে জোরে আওয়াজ করে চুমুক দিয়ে খাচ্ছিলেন। আপেলের খোসা ছাড়াচ্ছিলেন আর ফলটা হাতে ধরে রেখেছিলেন। প্রশ্নকর্তা হয়তো গ্রাম্য এই মায়ের আরেকটি অপরাধের কথা উল্লেখ করতে ভুলে গেছেন। তাহলো, যখনই তিনি খাবার চিবুচ্ছিলেন, তখন তার থুতনি নড়ে উঠছিল! হায় নিয়তি! হায় সভ্যতা!
পরিশেষে বেচারা বিয়ের চিন্তাই ছেড়ে দিলেন। নারীর প্রতি বিতৃষ্ণা সৃষ্টি হলো তার। তিনি এই লেখার ইতি টেনেছেন নারী ও তাদের বাবাদেরকে কিছু গরম ও প্রতিশোধমূলক গালি দিয়ে।
সত্যিই আমাদের আত্মশুদ্ধির বড় প্রয়োজন। আমরা আত্মশুদ্ধ হলে এমন আহাম্মকি কায়-কারবারের দিকে ধাবিত হতাম না। কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنفُسَكُمْ لا يَضُرُّكُمْ مَنْ ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ إِلَى اللَّهِ مَرْجِعُكُمْ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ
হে মুমিনগণ! আত্মসংশোধন করাই তোমাদের কর্তব্য তোমরা যদি সৎপথে পরিচালিত হও। তবে যে পথভ্রষ্ট হয়েছে সে তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহর প্রতিই তোমাদের সকলের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর তোমরা যা করতে তিনি সে সম্বন্ধে তোমাদেরকে অবহিত করেন। [সূরা মায়িদা : ১০৫)
আজ আফসোসের সাথে বলতে হয়, আমিও একজন বাবা। আমারও মেয়ে আছে। এই যুবকের নীলকষ্ট মাখা ভর্ৎসনার ছিটে যে আমার গায়েও এসে পড়েছে! কারণ আমি যে এই সমাজেরই একজন! আমি কি এড়িয়ে যেতে পারব সমাজের এই নোংরা খেলা?
📄 বিবাহযোগ্য এক যুবতির করুণ আর্তনাদ
এবার আসি দ্বিতীয় চিঠি প্রসঙ্গে।
আগেই বলেছি দ্বিতীয় চিঠিটির লেখিকা এক যুবতি। তিনি চিঠিতে যা উল্লেখ করেছেন, তাতে তার বুকে জমা করুণ আর্তনাদই ফুটে ওঠেছে। কিন্তু তিনি 'যে অসহায়! তার যে কিছু করার নেই। মুখ বুজে যৌবনা দেহকে তিলে তিলে হারাতে বসেছেন তিনি। তিনি লিখেছেন যে, তিনি যে পরিবারে
জন্মগ্রহণ করেছেন সেই পরিবারে তারা তিন বোন। তিনি সেই তিন বোনের একজন। বড়ভাইয়ের বাসায় একসাথে তারা সবাই থাকেন। বড়ভাই তাদেরকে আদুরে চোখে দেখেন। বাবার মতোই তিনি তাদের সকল আব্দার রক্ষা করে চলেন। তিনি তাদের জন্যে খরচের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের কমতি করেন না। মায়াঘেরা এক স্বর্গোদ্যান তাদের পরিবার।
কিন্তু বিপত্তি সব অন্য জায়গায়। যখনই কোনো বোনের বিয়ের জন্য কোথাও থেকে প্রস্তাব আসে, ঐ ভাই মহোদয় নানা অজুহাতে তা প্রত্যাখ্যান করে দেন। প্রস্তাবিত পাত্র সম্পর্কে বড়ভাই ভাবেন যে, এই লোকটি কৃপণ স্বভাবের হবে হয়তো। তার কাছে বিয়ে দিলে আমারে আদুরে বোনের কষ্ট হবে! কখনো ভাবেন যে, ওই লোকটা মূর্খ, বকলম। অথচ তিনি বড় জ্ঞানী। সে তার উপযোগী হয় কিভাবে? কোনো ব্যাপারে মাসয়ালার প্রয়োজন হলে সমাধান হবে কীরূপে?
যুবতির বড়ভাই কখনো ভাবেন যে, অমুক ভদ্রলোকের পরিবারের সদস্যসংখ্যা অনেক বেশি। তাদের মা, বোন, ভাইয়ের বৌ সবাই জীবিত আছেন। এ কারণে তিনি আশঙ্কা করেন যে, তারা সবাই মিলে বোনের ওপর জুলুম করবে!
কখনো এমন কেউ প্রস্তাব নিয়ে আসেন যে, তার মাঝে কোনো দোষ খুঁজে পান না। অগত্যা বেচারাকে প্রথমে দেনমোহরের বোঝা, তারপর আরও দায়দায়িত্ব চাপিয়ে দেন। এভাবে তারা তিন বোন জীবনের দীর্ঘ সময় পার করেছেন কুমারী অবস্থায়।
এই হলো পৃথক দুটি পত্রের ভেতরের কথা।
📄 যুবক-যুবতিদের উচ্ছন্নে যেতে দায়ী কে
সুপ্রিয় পাঠক-পাঠিকা! আজ আমাদের সামাজিক জীবনের সবচেয়ে সংকটপূর্ণ একটি সমস্যা আলোচনা করব। তাহলো, ঘরে ঘরে সেয়ানা যুবতি-কন্যারা বিয়ের অপেক্ষায় প্রহর গুণছে। অন্যদিকে অবিবাহিত যুবকরা চিন্তায় বিভোর হয়ে আছে। তারা বিয়ের পথ খুঁজছে। অলিগলি ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু এই দু'দলের মাঝে বিশাল অন্তরায় সৃষ্টি হয়ে আছে। যে অন্তরায় তাদেরকে হালাল মিলনের পথে বাধা দিচ্ছে। পক্ষান্তরে তাদের সামনে রঙিন অবয়বে ধরা দিচ্ছে যেনা আর ব্যভিচারের ময়লা পথ। অথচ কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে-
তোমরা ব্যভিচারের ধারে কাছেও যেও না, নিঃসন্দেহে এ হচ্ছে একটি অশ্লীল কাজ এবং নিকৃষ্ট পথ। (বনি ইসরাঈল: ৩২/
আমি বলি যে, এই যুবক-যুবতিদের তারুণ্যদীপ্ত জীবনকে বৈধ পথ বিসর্জন দিয়ে অবৈধ পন্থায় কাজে লাগাবার পেছনে অনেকাংশে আমাদের অভিভাবক দায়ী। আর এ কারণেই যুবক-যুবতিরা জৈবিক চাহিদা মিটাতে নানা পন্থা অবলম্বন করে থাকে। কারণ সেখানে কোনো বাধা-বিপত্তির ধার তাদের ধারতে হয় না।
যুবক-যুবতিদের উচ্ছন্নে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বেশি দায়ী হচ্ছেন সম্মানিত বাবারা। ক্ষমা করবেন। আমি সব বাবাকে উদ্দেশ্য করছি না; বরং যারা এখনও উপলব্ধি করতে পারছেন না যে, জগতে বর্তমানে ধ্বংসকারী প্রলয়ঙ্করী ঝড়ো হাওয়া বয়ে চলছে। যে বাতাস চরিত্র, নীতি-নৈতিকতা, ইজ্জত-আবরু সবকিছু ধুলিসাৎ করে দিচ্ছে। এর কোনো প্রতিষেধক নেই। মুক্তির কোনো উপায়ও নেই। একটিমাত্র পথ খোলা। সেটি হচ্ছে বিয়ের দরজা।
মনে রাখবেন, যে ব্যক্তি বিয়ে-শাদিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় অথবা এ পথে শর্তারোপের মাধ্যমে জটিলতা সৃষ্টি করে কিংবা সহজভাবে কার্যসম্পাদন করতে পেরেও সহজায়ন করে না; তিনি এই মহাসঙ্কটের অন্যতম নায়ক। তিনি জটিলতা সৃষ্টির অন্যতম ভূমিকা পালনকারী।
অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত যে, পাত্র-পাত্রী উভয়পক্ষে অসুবিধা থাকলেও মেয়ের দিকে অসুবিধার মাত্রাটা একটু বেশি। কারণ, যুবক অপরাধ করে খালাস হয়ে যায়। কিন্তু যুবতি অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত ভোগ করে। তাছাড়া আমাদের সমাজব্যবস্থাও যুবকদের ক্ষমা করে দেয়। তাদের ক্ষেত্রে বলে, আরে! একটা যুবক মানুষ। কিছু একটা দোষ না হয় করেছে। তওবাও তো করেছে! কিন্তু মেয়ের বেলায় ক্ষমার এই দৃষ্টিটা দেয়া হয় না। তাকে চিরঅপরাধী হিসেবেই দেখা হয়। তাকে মনে করা হয় অলুক্ষণে। তাকে ভাবা হয় নষ্টা-পাপীষ্ঠা!
হ্যাঁ, মেয়ের বাবা যদি বিচক্ষণ হন, তাহলে কন্যার বিয়ের ব্যাপারে জলদি কাজ আঞ্জাম দিয়ে থাকেন। এই অর্থে নয় যে, মেয়েকে বাজারে উপস্থাপন কিংবা প্রথমবার যে প্রস্তাব দেয়, তার হাতেই সোপর্দ করেন। বরং তার
জন্যে শরিয়তসম্মত পথের অনুসন্ধানে মগ্ন থাকেন। ছেলের দীনদারি, চরিত্র ও নীতির সবিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেন।
দীনদারি ও নীতি-নৈতিকতা পছন্দ হলে দ্বিতীয় পর্যায়ে ছেলের পরিবার তাদের আচার-আচরণ এবং চিন্তাচেতনায় দৃষ্টি দেন। যদি ছেলে ও তার পরিবারের উপযোগী হয়, অর্থসম্পদে এবং বংশগত দিক থেকে কাছাকাছি হয়, সেই সাথে মেয়ে বাবার ঘরে যেভাবে লালিত হয়েছে স্বামীর বাড়িতেও সেভাবে জীবনযাপন করতে পারবে বলে বিশ্বাস হয় তাহলে বাবা এবার কবুল করে নেন।