📄 গায়ে হলুদ ও প্রাসঙ্গিক বিষয়
প্রশ্ন : আমি একজন বিত্তশালী ব্যক্তি। আমার কন্যাকে বিবাহ দিব। এজন্য আমি মনস্থ করেছি- ব্যাপক আলোকসজ্জা, সাময়িক পানির ঝরনা ও আলিশান গেট করে বিয়ে বাড়ি সজ্জিত করব। তাছাড়া আমার কন্যার মন প্রফুল্ল রাখার জন্য যদি শুধু মেয়েরা মিলে গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান করে তাহলে এগুলো ইসলামের দৃষ্টিতে জায়েয হবে কিনা? তাছাড়া আমি খুশি হয়ে যদি বিবাহের দিন একশত লোককে দাওয়াত করি, তাহলে এই খাবার তাদের জন্য জায়েয হবে কিনা? বিবাহের একদিন অথবা কয়েকদিন পর যদি দুলহাসহ প্রায় পঞ্চাশজন লোক খাওয়ার জন্য আসে এবং আসার সময় তারা সবজি, গোশত, মাছ ইত্যাদি অনেক জিনিস আনে; এসব খাবারকে আমাদের এলাকায় ফিরানি খানা বলে। এটা জায়েয হবে কিনা? দলিল-প্রমাণসহ সমাধান দিয়ে অবগত করাবেন।
জবাব : আমাদের সমাজে বিবাহ-শাদিতে যে গেট দেয়া, নানাভাবে সজ্জিত ও আলোকসজ্জা করা হয় তা নিম্নলিখিত কয়েকটি কারণে নিষেধ-
১. গেট ও আলোকসজ্জা বিবাহের প্রয়োজন বহির্ভূত। তাই অপ্রয়োজনীয় কাজে টাকা-পয়সা খরচ করাকে শরিয়তের পরিভাষায় ইসরাফ তথা অপচয় বলা হয়। অপচয় সম্পর্কে কুরআনুল কারিমে অবতীর্ণ হয়েছে- তোমরা অপব্যয় কর না। তিনি অপব্যয়কারীকে পছন্দ করেন না। [সূরা আরাফ: ৩১] কুরআন মাজিদে আরো ইরশাদ হয়েছে, নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। শয়তান স্বীয় পালনকর্তার প্রতি অভিশপ্ত, অকৃতজ্ঞ। (সূরা বনি ইসরাঈল: ২৭।
২. গেট দেয়া ও আলোকসজ্জা নিজের অহংকার প্রকাশ এবং লোক দেখানোর অন্তর্ভুক্ত। আর প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য হলো, বিবাহসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে গৌরবময় ও লোক দেখানো কাজ পরিহার করা।
৩. বিবাহ-শাদিতে গেট ও আলোকসজ্জা করার রীতি-নীতি বিজাতীয় কালচার। তাই তা মুসলামানেদের পরিহার করা উচিত। কেননা হাদিসে ইরশাদ হয়েছে- যে যেই সম্প্রদায়ের অনুসরণ করবে সে তাদের মধ্য থেকে গণ্য হবে। [আবু দাউদ: হাদিস নং ৪০০১]
গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানের উৎপত্তি হয়েছে প্রাচীন ভারতের হিন্দু সমাজ থেকে। সাধারণত গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানে বরের ভাবী, বোন ও অন্যান্য আত্মীয় এবং তার বান্ধবীরা হলুদ রঙের জামা, কাপড় ও শাড়ি পরে অপরূপা সেজে কনের পিত্রালয়ে গিয়ে থাকে। সেখানে তাকে প্রথা অনুযায়ী হলুদের পানি দ্বারা গোসল দিয়ে আবার সকলে প্রস্থান করে। তাদের সাথে 'গায়ে হলুদ' লেখা একটি কুলাও শোভা পেতে দেখা যায়। এমনকি এলাকাভেদে আরো নানা প্রথার প্রচলনও দেখা যায়। এসব কর্মকাণ্ডের অনুমোদন কোরআন হাদিসের কোথাও নেই। বরং এগুলো হিন্দুদের আবিষ্কৃত কিছু কুসংস্কার। তাই মুসলমানদের জন্য এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা আদৌ বৈধ নয়। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, যে যেই সম্প্রদায়ের অনুসরণ করবে, সে তাদের মধ্যে গণ্য হবে।
আপনি যে বিবাহের দিন বরপক্ষের একশ জনের খাওয়ার আয়োজন করতে চান এটিও আমাদের সমাজে বিবাহে প্রচলিত হিন্দুয়ানি কুসংস্কারের একটি। একে সমাজের পরিভাষায় বরযাত্রী ভোজন বলা হয়। হুজুরে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম (রা) ও উত্তম তিন সোনালি যুগের কোথাও বিবাহের দিন বরযাত্রীদের খাওয়া দাওয়া (বৈরাত) অর্থাৎ কনের বাড়িতে খাওয়া দাওয়ার কোনো নাম-চিহ্নও পাওয়া যায় না। এজন্য বরযাত্রী ভোজনের আয়োজন করা যাবে না। কেউ যদি খুশিমনে করে, তখনও এ খাবার আয়োজন বিবাহের দিন করা সমীচীন নয়। কারণ এটি বিজাতীয়দের প্রচলিত একটি প্রথা।
অতএব, আপনি নিজের খুশিতে বরপক্ষের একশজন বা কম-বেশ মানুষের খাবারের আয়োজন করতে চাইলে উক্ত কুসংস্কার থেকে বাঁচার জন্য এ আয়োজন বিয়ের দিন না করে বিয়ে অনুষ্ঠানের তিন চারদিন পর করতে পারেন।
আর বরপক্ষ আসার সময় যে সবজি, গোশত ও মাছ ইত্যাদি নিয়ে আসে, যাকে আপনাদের এলাকায় ফিরানি খানা বলে; এটিও একটি কুসংস্কার। এ কুসংস্কার সব জায়গাতে আছে। একেক জেলায় এ কুসংস্কারের নাম ভিন্ন ভিন্ন রয়েছে।
যাহোক, আপনি এ কুসংস্কার থেকে বাঁচার জন্য বরপক্ষকে আগেই বলে দিতে পারেন যে, ফিরানি খানা বিজাতীয়দের প্রচলিত একটি ক্ষতিকর প্রথা। তাই আমি আশা করি যে, আপনারা এ ধরনের কোনো খানা আমার বাড়িতে আনবেন না।
উল্লেখ্য যে, বিবাহের দিন বরপক্ষ হতে কনে উঠিয়ে নেয়ার জন্য বরসহ তার সঙ্গে তার পিতা, দাদা, চাচা, ভাইবোন ইত্যাদি যে পাঁচ-দশজন স্বাভাবিকভাবে এসে থাকেন, তাদের মেহমানদারি প্রথার অন্তর্ভুক্ত হবে না। [আবু দাউদ: হাদিস নং ৪০৩১, মিশকাতুল মাসাবীহ: ২৫৫, সুনানুন নাসায়ী: হাদিস নং ৫০২৩, ফাতাওয়া মাহমুদিয়া: ১৭/৪০৬, ৩৯৪, ৪৬২] সূত্র: মাসিক মঈনুল ইসলাম: মে ২০১৬।
📄 যৌবনের মৌবনে
প্রতিটি যুবক ও যুবতি তাদের যৌবনের নিরাপত্তা চায়। তারা তাদের শরীরকে সুস্থ রাখতে চায়। এই সুস্থ দেহ প্রশান্ত মন ও কর্মব্যস্ত সুখি জীবন মানব জীবনের জন্য আবশ্যক। কিন্তু এ প্রশান্তি কোন পথে রয়েছে তা আমরা অনেকে তালাশ করে পাই না। গবেষণায় দেখা গেছে যে, বিবাহের মধ্য দিয়ে মানবমনে যেই প্রশান্তি ও প্রফুল্ল আসে অন্য কোনোভাবে তা পাওয়া যায় না।
আমেরিকান ডাক্তারদের সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, বর্তমান পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী কুমারদের তুলনায় বিবাহিতরা অধিক সুস্থ থাকে।
গবেষণায় আরো জানা গেছে যে, বিবাহিত লোকদের নেশার প্রতি আগ্রহ খুব কম থাকে। তারা নিজেদের খাদ্যের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখে। এক সঙ্গী সকল ব্যাপারেই অপর সঙ্গীকে সহায়তা দেয়। তারা নিয়মিত ব্যায়াম করে।
এ ব্যাপারে মার্কিন স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীগণ উনিশ হাজার লোকের ওপর জরিপ চালানোর পর দেখা গেছে যে, অ্যাজমা থেকে মাথা ব্যথা পর্যন্ত প্রায় সকল রোগে কুমারদের তুলনায় বিবাহিতরা কম আক্রান্ত হয়ে থাকে।
বৃটিশ ম্যারেজ প্লাস ওয়ান ইউরোপ এবং আমেরিকায় ব্যাপক গবেষণা করার পর এ সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশ করেছে যে, বিবাহিত লোকেরা দীর্ঘ জীবনলাভ করে। তাদের স্বাস্থ্যও সুস্থ থাকে। তাদের ওপর মানসিক এবং শারীরিক রোগ খুব কম প্রভাব ফেলতে পারে। তারা দুর্দশাগ্রস্ত থাকে খুবই কম, আর্থিক দিক থেকে তারা থাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ। পক্ষান্তরে যারা কুমার জীবনযাপন করে অথবা বিধবা কিংবা তালাকপ্রাপ্তা হয় তাদের ব্যাপারটি এদের সম্পূর্ণ বিপরীত।
এ বিষয়ে ইউরোপ এবং আমেরিকায় চালানো এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, দাম্পত্য জীবনের পরাজয় অনেক মানসিক ও শারীরিক রোগের জন্ম দেয়। এ প্রসঙ্গে ফায়না এম সি আলাস্টারের বক্তব্য এই যে, শুধু ব্রিটেনেই প্রতি বছর ৩ লাখ ৪৬ হাজার প্রাপ্ত বয়স্ক তালাকপ্রাপ্ত হয় এবং প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার শিশু অবৈধ সম্পর্কের কারণে জন্মগ্রহণ করে। দাম্পত্য সম্পর্কের ঘাটতির কারণে বাস্তবজীবনে এরা সফলতা লাভ করতে ব্যর্থ হয়।
বিজ্ঞানীদের গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে যে, বিবাহের দ্বারা নিম্নোক্ত উপকারিতা পাওয়া যায়-
১. আনন্দঘন দাম্পত্য জীবন দৈনন্দিন পেরেশানি এবং দুশ্চিন্তার মাঝে ঢালের মতো ভূমিকা রাখে।
২. বিবাহিত লোকদের স্বাস্থ্য স্বাভাবিকভাবে অবিবাহিত লোকদের চেয়ে বেশি সুস্থ থাকে।
৩. বিবাহ মানুষকে অনেক খারাপ কাজ যেমন- মদপান, অবৈধ সম্পর্ক এবং সিগারেট পান থেকেও রক্ষা করে।
ব্রিটিশ চিকিৎসা বিজ্ঞানী এম সি আলাস্টার বলেন, দাম্পত্যজীবনে পরাজয় শারীরিক রোগ ছাড়াও অনেক মানসিক রোগ সৃষ্টির কারণ হতে পারে।
অনুসন্ধান রিপোর্ট অনুযায়ী ১৯৭৩ সালে ব্রিটেনের মানসিক রোগ হাসপাতালে প্রায় এক লক্ষ লোকের মধ্যে ২৫৭ জন বিবাহিত লোক চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়েছিল। অথচ তার বিপরীতে ৬৬৫ জন অবিবাহিত, ৭৫২ জন বিপত্নীক এবং ১৫৯৬ জন তালাকপ্রাপ্ত লোক হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়েছে। আর নারীদের মধ্যে ৪৩৩ জন বিবাহিতা, ৬২৩ জন অবিবাহিতা, ৬২০ জন বিধবা এবং ১৫৯৬ জন তালাকপ্রাপ্তা চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়েছে।
অনুসন্ধানে এও দেখা গেছে যে, অবিবাহিতদের মধ্যে হার্টের রোগের কারণে মৃত্যুহার বিবাহিতদের চেয়ে অনেক বেশি। তাছাড়া অবিবাহিত লোকেরা ক্যান্সার, আত্মহত্যা এবং আরো অন্যান্য প্রাণঘাতী রোগে বিবাহিত লোকদের তুলনায় অধিক আক্রান্ত হয়ে থাকে।
📄 স্বামীর কোলেই নারীর প্রকৃত প্রশান্তি
নারী যত উচ্চ মর্যাদাই অর্জন করুক না কেন! শিক্ষা ও জ্ঞানে যতই অগ্রগতি লাভ করুক এবং ধন-সম্পদ ও সুখ্যাতি যতই আয়ত্ত করুক- এতে তাদের প্রকৃত প্রত্যাশা পূরণ হবে না। তাদের মান-মর্যাদা, প্রসিদ্ধি, সুখ্যাতি, ধন-সম্পদ তাদের মনকে শান্ত করবে না; বরং বিবাহ ও স্বামীর সান্নিধ্যই কেবল দিতে পারে তাদেরকে অনাবিল শান্তি ও সুখ। এর মাধ্যমেই পূরণ হতে পারে তাদের প্রত্যাশার ডালি।
নারীরা তাদের জীবনে তখনই প্রকৃত শান্তি খুঁজে পায় যখন সে একজন সৎ ও আদর্শ স্ত্রী হতে পারে, সম্মানিত একজন মা হতে পারে এবং একটি বাড়ির পরিচালিকা হতে পারে। এক্ষেত্রে একজন সাধারণ নারী থেকে শুরু করে রানি, রাজকন্যা, অভিনেত্রী, বিশ্বসুন্দরীর মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। সকলের ক্ষেত্রেই একই কথা।
এ প্রসঙ্গে আমি নাম উল্লেখ না করে দু'জন নারীর উদাহরণ দিতে চাই। আমি তাদেরকে খুব ভালো করে চিনি ও জানি। তারা উচ্চশিক্ষিতা, ধনবতী ও সুসাহিত্যিক। স্বামীহারা হয়ে তারা প্রায় পাগল অবস্থায় বেঁচে আছেন। কয়েকদিন আগেও তাদের জীবন ছিল স্বাভাবিক। তাদের মুখে ছিল হাসি। আনন্দের সাম্পানে চড়ে খলখল করছিল তাদের জীবন। তাদের জীবন ছিল সুখে ভরপুর। এখন তাদের সবই আছে ভরা বেলুনের মতো। শুধু তাদের স্বামী নেই। এই একটি জিনিসের অভাবেই তাদের জীবন পানসা হয়ে আছে। তারা যেন বেঁচে থেকেও মৃতপ্রায়। এতে তাদের ভরা বেলুন চুপসে গেছে।
মূলত বিবাহ হচ্ছে প্রতিটি নারীর সর্বোচ্চ কামনা। এটিই তাদের মনের বাসনা। এটি দিয়েই মহান প্রভু তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। সে যদি পার্লামেন্টের সদস্যও হয়ে যায় কিংবা কোনো রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্টও হয়ে যায় তথাপি ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের মনের প্রকৃত বাসনা পূর্ণ হবে না, যতক্ষণ না বউ হয়ে স্বামীর ঘরে প্রবেশ করতে পারবে।
তাই স্বামীর কোলেই নারীর প্রকৃত প্রশান্তি নিহিত। একবার যদি কোনো মেয়ের জীবনে কলঙ্ক নেমে আসে এবং তার সমাজ যদি তা জেনে ফেলে; তবে কেউ তাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করবে না। এমনকি যেই পুরুষ তাকে নষ্ট করেছে সেও তাকে বিয়ে করে নিজের সংসার গড়তে রাজি হবে না। অথচ সে বিয়ের মিথ্যা ওয়াদা করে তার সতীত্ব ও সম্ভ্রম নষ্ট করেছে আর মনের চাহিদা পূরণ করে কেটে পড়েছে। উল্টো সে যখন বিয়ের মাধ্যমে কোনো নারীকে ঘরে তুলতে চাইবে তখন তাকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো সম্ভ্রান্ত, সম্মানিত, ভদ্র, সতী ও পবিত্র নারীকেই খুঁজবে।
একজন পুরুষ কখনই চাইবে না যে, তার স্ত্রী হোক একজন নষ্ট নারী। কোনোক্রমেই সে মেনে নিতে চাইবে না যে, নিজ ঘরের পরিচালিকা হোক একজন নিকৃষ্ট মহিলা। কোনো পুরুষই মেনে নিতে চায় না যে, তার সন্তানের মা হোক একজন ব্যভিচারিণী।
পুরুষরা নিজে ফাসেক ও পাপী হয়েও চাইবে তার স্ত্রীটি হোক ফুলের মতো পবিত্র। এমনকি যখন সে নিজের পাপ ইচ্ছা পূর্ণ করার জন্য পাপের বাজারে কোনো পাপিষ্ঠা নারীকে খুঁজে পাবে না এবং বিয়ে ছাড়া নিজের যৌনচাহিদা পূর্ণ করার কোনো রাস্তা খুঁজে পাবে না তখন সে ইসলামের সুন্নাত অনুযায়ী বিয়ের মাধ্যমে কাউকে নিজের স্ত্রী বানানোর সন্ধানে বের হবে। সে কোনো পতিতাকে বা নষ্ট মহিলাকে কখনোই ঘরের স্ত্রী বানাতে রাজি হবে না।
📄 যুবকের রঙিন চশমায় নারীর অবয়ব
সতেরো বছর বয়সে যে জিনিসটি কোনো যুবককে ঘুমুতে দেয় না, এই জিনিসটি ছোট বড় আরও অনেককেই ঘুমুতে দেয় না। এমনকি এ কামনার আগুন অনেকের আরামের ঘুম হারাম করে। অনেক ছাত্রকে অমনোযোগী করে পাঠে। অনেক শ্রমিক কাজ হারায়। অনেক ব্যবসায়ীর ব্যবসা লাটে ওঠে।
যে প্রেমের বর্ণনা কবিরা দিয়েছে, সাহিত্যিকরা কল্পনার রং মেখে যা উপস্থাপন করেছে, তা-ই প্রত্যেকের মাঝে বিরাজ করে। দুটো একই। পার্থক্য হলো, কেউ এ প্রেমকে গ্রহণ করে খোলামেলা নিরাভরণ। কথিত বুদ্ধিমানরা তা ঠিকই ধরতে পেরেছে। তাই তারা মানুষকে প্রতারিত করার জন্য বিষয়টিকে চকোলেটের মতো কাগজে মুড়িয়ে পরিবেশন করে। কেউ পান করে ঝরনায় মুখ দিয়ে, আর কেউ পান করে কারুকার্যমণ্ডিত সুন্দর গ্লাস দিয়ে।
যৌবনের চাহিদা মূলত কবিদের কবিতা, গজলের পঙ্ক্তি, ফটোগ্রাফারের ফটো, চিত্রশিল্পীর আলপনা আর গায়কের সুরের মতো। এখানে কামনা সুস্পষ্ট ও প্রকাশ্য। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, ওখানে প্রচ্ছন্ন ও অস্পষ্ট। মজার ব্যাপার হলো, সবচেয়ে মন্দ ব্যাধি হলো যা প্রচ্ছন্ন ও অস্পষ্ট। মানুষের সামনে যা রঙিন ফানুসের মতো তুলে ধরে অথচ এর ভিতরটায় থাকে গরল। যাকে 'কথা সত্য মতলব খারাপ' বলা যেতে পারে।
যুবক বয়সে এসে সবারই ভেতরে নিভে থাকা একটি জিনিস জ্বলে ওঠে। এ বয়সীরা এর উত্তাপ অনুভব করে হাড়ে হাড়ে। পৃথিবী হয়ে ওঠে তাদের কাছে অন্য পৃথিবী। মানুষ হয়ে যায় তাদের চোখে অন্য কিছু। তাদের চোখে একজন নারীকে রক্তে-মাংসে গড়া মানুষ মনে হয় না; হয় অপরূপা হুর।
একজন মানুষের যা বৈশিষ্ট্য থাকে প্রতিটি নারীর মাঝেও তা বিদ্যমান। একজন মানুষের যা দোষ আছে তা-ও আছে তার মাঝে। কিন্তু যুবকেরা সে নারীর মধ্যে দেখতে পায় এক ধরনের আশা। সে দেখতে পায় তার জীবনের সব আশাই যেন ঐ যুবতির মাঝে এসে ভিড় করেছে। তার মাঝেই যেন শাদা বলাকার মতো এসে উড়াউড়ি করছে সব স্বপ্নের চাওয়া পাওয়া। তার মাঝেই বাস্তব হয়ে দেখা দেয় মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা আশাগুলো। হ্যাঁ, যুবক যদি তার প্রত্যাশিত যুবতিকে শরিয়ত মোতাবেক বিয়ে করার প্রস্তাব দেয় তাহলে একবার তাকে দেখা বৈধ। যেমন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেছেন-
إِذَا خَطَبَ أَحَدُكُمْ امْرَأَةً فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِ أَنْ يَنْظُرَ إِلَيْهَا إِذَا كَانَ إِنَّمَا يَنْظُرُ إِلَيْهَا لِخِطْبَةٍ ، وَإِنْ كَانَتْ لَا تَعْلَمُ .
তোমাদের কেউ কোনো নারীর প্রতি বিয়ের প্রস্তাব প্রদানের পর তাকে দেখলে কোনো গুনাহ হবে না। [মুসনাদে আহমাদ।]
একজন যুবক নারীর মাঝে দেখতে পায় এক ধরনের আকাঙ্ক্ষা। যেখানে এসে মিলিত হয়েছে সব চাওয়া পাওয়া। তার সহজাত কল্পনায় নারীকে পরিয়ে দেয় এমন পোশাক, যা তার সব দোষ ঢেকে দেয়, দুর্বলতা আড়াল করে দেয়। সে তখন তাকে উন্মুক্ত করে সৌন্দর্য আর কল্যাণের প্রতিমারূপে।
প্রতিটি যুবক একজন নারীকে নিয়ে তা-ই করে, যা করে একজন কৃতার্থ পূজারী পাষাণ প্রতিমা নিয়ে। সে নিজ হাতে প্রতিমা গড়ে তারপর প্রভু ভেবে পূজা করে। মূর্তিপূজারীর কাছে পাথরের প্রভু আর প্রেমিকদের কাছে রমণী কল্পনার মূর্তি।
এসবই স্বাভাবিক এবং যৌক্তিক। কিন্তু যে জিনিসটা অস্বাভাবিক ও অযৌক্তিক তাহলো পনেরো-ষোলো বছর বয়সের একটি যুবককে কামনার এহেন তীব্র দহনে দগ্ধ হওয়ার পরও শিক্ষাব্যবস্থার অযৌক্তিক দীর্ঘসূত্রিতার কারণে বিশ-পঁচিশ বছর বয়স পর্যন্ত এভাবেই কামনার তীব্র দহনে দগ্ধ হতে হয়। এই বছরগুলোতে যৌবনে ভরপুর তরুণ বা তরুণী কী করবে? একজন যুবক যেমন তার কল্পনার যুবতি প্রতিমাকে নানা রঙে সাজায় তেমনি একজন তরুণীও তার কল্পনার পাখায় ভর করে উড়াউড়ি করে একজন স্মার্ট যুবকের সন্ধানে। সেও তার স্বপ্নের রাজকুমারের প্রতিমায় মনের মাধুরী মিশিয়ে আল্পনার প্রলেপ আঁটে। যুবক-যুবতিদের বিশ-পঁচিশ বছরগুলোই কামনা বাসনা আর দৈহিক অস্থিরতার চূড়ান্ত সময়।