📄 যে চিঠির প্রত্যেক লাইন থেকে অশ্রু ঝরে
মানুষের কাছে সবচেয়ে বিরক্তিকর বিষয় হচ্ছে কথার পুনরাবৃত্তি। এ বিষয়ে একাধিকবার আলোচনা করেছি। কিন্তু কী করব, আমি যে বাধ্য হয়েছি আবারও এ নিয়ে লিখতে এবং বলতে!
মূলত একটি পত্র আমাকে বাধ্য করেছে চর্বিত চর্বণে। ডাকে পত্রটি নাম-ঠিকানা বিহীন আমার হাতে পৌছে। কাগজের পাতায় প্রেরকের জীবনবিবরণ উল্লিখিত হয়েছে। মনে হচ্ছিল, তার লেখা প্রতিটি লাইন থেকে অশ্রু ঝরছে। যেন তার দগ্ধ হৃদয় থেকে ধূমায়িত বায়ু বেরিয়ে আসছে।
নাম-ঠিকানা উল্লেখবিহীন ঐ চিঠির প্রেরক লিখেছেন যে, তিনি একজন আত্মগোপনকারী সৎলোক। দীনের বিধান যথাসাধ্যভাবে পালন করে যাচ্ছেন। তার একটিমাত্র কন্যা দিন দিন অন্যায়ের পথে পা বাড়িয়ে চলেছে। এখন পর্দা করাও ছেড়ে দিয়েছে। অসভ্যদের সাথে সম্পর্ক রয়েছে তার। একটি দুষ্ট মেয়ে যতটুকু পৌঁছুতে পারে, ততটুকুও সে অতিক্রম করে ফেলেছে।
তার বর্ণনামতে এসবের কারণ হচ্ছে প্রথমত প্রাথমিক বিদ্যালয়। দ্বিতীয়ত বিশ্ববিদ্যালয়। চিঠিতে তিনি স্কুল ও স্কুল-কলেজে পড়ুয়াদের ইচ্ছেমতো গালিগালাজ করে ধোলাই দিয়েছেন। যারা এই সমাজব্যবস্থার গোড়াপত্তন করেছেন, তিনি তাদের একেবারে পত্রের শেষ পর্যন্ত তাদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন।
আমি তার পত্রটি নিয়ে বেশ ভাবতে থাকি। অনেক ভেবেচিন্তে তার পত্রের জবাব লিখতে বসি। তাকে লিখে পাঠালাম যে, আমি জানি আপনি খুবই ব্যথিত। কিন্তু এ মুহূর্তে আমি কী করতে পারি? আরও আগে আমার কাছে লিখে পাঠালেন না কেন? যখন সে কিছুটা আপনার নিয়ন্ত্রণে ছিল অন্তত তখন আমাকে লিখে পাঠালে একটা ব্যবস্থা হয়তো করতে চেষ্টা করতাম।
আমি লিখলাম যে, ভাই। এখন আপনার জন্যে কী করব বলুন! ফেতনার আগুন ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে; প্রবল বন্যায় সব সয়লাব হয়ে গেছে; যা ধ্বংস হওয়ার সবই ধ্বংস হয়েছে; যা ডুববার, সবকিছুই ডুবে গেছে।
যদি রোগী মারা যাওয়ার পর ডাক্তারকে ডাকা হয় তাহলে ডাক্তার কী করতে পারবে? ভাই! আমি আপনার জন্যে কেবল শোক প্রকাশ এবং আল্লাহর কাছে এই মুসিবতে আপনার ধৈর্য প্রার্থনা করতে পারব।
তবে হ্যাঁ, আমি তার সহায়তায় ব্যর্থ হলেও অন্যের সাহায্যে এগিয়ে আসতে পিছপা হব না। যদি আমার লজ্জা না থাকত এবং লোকটির ক্ষত দাগে ব্যথা বৃদ্ধির আশঙ্কা না হতো তাহলে বলতাম যে, এ পর্যন্ত গড়িয়েছে আপনারাই কারণে।
সম্মানিত বাবা! সম্মানিত মাতা! এসব হয়েছে এবং হচ্ছে আপনাদেরই কারণে। আপনারাই সর্বপ্রথম লানত ও অভিশাপ পাওয়ার উপযুক্ত।
যদি আপনি (বাবা ও মা) ঘর ও কন্যার দায়িত্বে থাকেন, তাহলে আপনারা নিজের আনন্দ আর ইচ্ছা পূরণকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। সন্তানদের প্রতি আপনাদের অবহেলাই তাদেরকে এ পথে নিয়ে এসেছে। মনে রাখবেন আপনার সন্তান একদিনেই কিন্তু এ পর্যায়ে যায়নি। এজন্য দীর্ঘদিন লেগেছে। এ দিনগুলোতে আপনার করণীয় কিছু কি ছিল না? বাড়ির কাজ এবং আপনার কাপড় সেলাই, সিনেমা দেখা, বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাফেরা : সবই কি আপনার ঠিক ছিল না? আর এসব করতে গিয়েই তারা অবহেলায় অযত্নে বড় হয়েছে।
আমি অবশ্য আপনার ন্যায়ই মনোভাব পোষণ করি। তাহলো, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার স্কুল-কলেজ ও সামাজিক ব্যবস্থাপনাকে আমি ভালো বলছি না। পিতা, শিক্ষক, সন্তান, আইনপ্রণেতা সবাই নিজ নিজ কর্মের কারণে জিজ্ঞাসিত হবে। এরা সর্বশেষ যে প্রশ্নের সম্মুখীন হবে, তাহলো এই কন্যা, যে তাদের কারণে ধ্বংসের পথে অগ্রসর হয়েছে তার সম্পর্কে।
আল্লাহ তায়ালা প্রবৃত্তির তাড়না মানুষের অন্তরে বপন করে দিয়েছেন। এর জন্যে নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থাও স্থাপন করেছেন। অন্যায় রোধ করার জন্যে বিভিন্ন বাধা-উপবাধা সৃষ্টি করেছেন। এসব ডিঙ্গিয়ে যদি অন্যায়ের সয়লাব হয়, তাহলে ধ্বংস তো হবেই।
দেখুন, নদীর ধর্ম হলো প্রবাহিত হওয়া। আপনি তাকে যতই বাধা দিবেন, সে তার প্রবহমানতা বহাল রাখতে প্রয়োজনে অন্যদিকে মোড় নিবে। নদীর প্রবাহিত হওয়ার নির্দিষ্ট পথ রয়েছে। স্বাভাবিক অবস্থায় নির্ধারিত পথেই নদী বয়ে চলে। কিন্তু বেড়ি বাঁধের কারণে নদীপ্রবাহ ব্যাহত হলে অন্য পথেই পানি প্রবাহিত হয়ে বাড়িঘর, ক্ষেত-ফসল সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তেমনি খোদাপ্রদত্ত জীবনের স্বাভাবিক গতি হচ্ছে বৈবাহিক সম্বন্ধ। পক্ষান্তরে অসৎ পথে কার্যসিদ্ধি হচ্ছে ফেতনা ও পাপাচার।
যদি দ্বিতীয় পথ অবলম্বন করা হয়, তাহলে আল্লাহর নির্ধারিত নিয়মের বিরুদ্ধাচারণ করে প্রাকৃতিক গতি থামিয়ে দেয়া হয়। ফলে সীমানা ডিঙ্গিয়ে বন্যা আসার প্রহর গুণার প্রতীক্ষা ছাড়া আর কিইবা থাকতে পারে!
📄 ধাঁধার জাল
আমরা যুবতিদেরকে নানা ছুঁতা দেখাই। তাদেরকে বলি যে, এই বয়সে বিবাহ দরকার নেই! আরেকটু পেকে নাও! তাদেরকে এই যুক্তিও দেখাই যে, এখনকার যুবকরা কেউ ভালো নেই। তারা বিয়ের বিতৃষ্ণা ভাব নিয়ে হারাম পন্থায় কার্যরত।
অন্যদিকে যুবকদের বলি যে, বিয়ে খুব কঠিন বিষয়। মেয়ের ভরণপোষণ, কয়েকদিন পর বালবাচ্চা হলে আরো ঝামেলা; সামাজিকতা ও শ্বশুরপক্ষের আত্মীয়স্বজন- আরো কত কী! আমরা তার সামনে তুলে ধরি শত ধাঁধার ছড়ানো জাল। অথচ হারাম পথ খুবই সহজ। এর জন্যে শত আহ্বায়ক ও উদ্দীপক রয়েছে। ফলে বৈবাহিক সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। গুনাহের আধিক্য ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কন্যারা যাঁতাকলে পিষ্ট এবং ল্যাম্পট্যের ছায়ায় অবলার মতো বলি হচ্ছে।
একজন যুবক প্রথমে কোনো যুবতির সাথে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করে। উভয়ের মাঝে যৌনসম্ভোগ উদ্যাপিত হয়। তারা অন্যায় কাজে একসাথে শরিক থাকে। কিন্তু একটা সময়ে স্বার্থ ফুরিয়ে এলে কিংবা যৌনস্বাদ নেয়া শেষ হলে যুবক আস্তে করে কেটে পড়ে। নিজেকে পূতপবিত্র রাখার ভাব জাহির করে।
তখন যুবতি হয়ে পড়ে একা। সে তার চোখের সামনের সব অন্ধকার দেখে। সব অপরাধের বোঝা তার কাঁধে চেপে বসে। গুনাহর ফল গর্ভে ধারণ করে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায়। ওদিকে যুবক তখন তওবা করে। সমাজের লোক তার তওবা মেনেও নেয়। তার অপরাধের কথা ভুলে যায়।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক সত্য হলো, আমাদের সমাজে যুবতির তওবা সমাজে গৃহীত হয় না। চিরকালের জন্যে সে অভিশপ্ত হয়ে পড়ে। আবার এই যুবকটিকেই বিয়ে করতে বললে সে অন্তত তার ভোগের মেয়েটিকে এড়িয়ে চলে। সে মনে করে যে, যার স্বাদ নেয়া হয়ে গেছে, তার মাঝে আমার জন্য আর কী স্বাদ বাকি আছে! সে তখন নতুন স্বাদের নেশায় মাতাল। সে তখন চায় নয়া স্বাদ।
কিন্তু তখন এই যুবতি কী করবে? তার জন্যে যে বিবাহ নিষিদ্ধ! অপরাধ বৈধ। কামনা-বাসনা উদ্দীপ্ত। এ পথে অন্তরায় উত্তেজিত।
আপনারা হয়তো বলবেন যে, আমরাই কি বিবাহ নিষিদ্ধ করেছি?
আমি বলব, হ্যাঁ! আপনারাই এ পথে বাধা সৃষ্টি করেছেন। তবে শক্তি প্রয়োগ করে নয়; বরং কাজের মাধ্যমে।
গবেষণায় দেখা গেছে যে, পনেরো বছর বয়সে যুবক-যুবতিদের মাঝে কামনা-বাসনার সঞ্চার হয়। ইসলামি শরিয়তের নির্দেশনা এ গবেষণার কাছাকাছি। মূলত শরিয়তের দৃষ্টিতে ছেলে বালেগ তথা প্রাপ্তবয়স্ক হয় চৌদ্দ বছর বয়সে আর মেয়েরা নয় পেরুলেই তাদের মধ্যে মা হবার যোগ্যতা চলে আসে। এটি বিজ্ঞানসম্মত গবেষণা। গবেষণার প্রতিবেদন হলো, এ পনেরো বছর থেকে পঁচিশ বছর পর্যন্ত প্রায় দশ বছর যৌবনজোয়ার থাকে। কিন্তু এ সময়ে কি তারা বিয়ে করতে পারে? কিভাবে পারবে? শিক্ষাব্যবস্থাপনা তাদের এ বছরগুলোতে ক্লাসের পাঠ অধ্যয়নে বসে থাকতে বাধ্য করে। এরপর ডক্টরেট অর্জনের জন্যে ইউরোপ-আমেরিকা সফর করলে বয়স ত্রিশের কোটায় গিয়ে হামাগুড়ি দেয়!
তাহলে বলুন, কিভাবে তারা বিয়ে করতে সমর্থ হবে?
বিয়ে-শাদির ব্যাপারে ফিকির করলে শত চিন্তা মাথায় এসে ঘুরপাক খেতে থাকে। কোথায় পাবে বিয়ের অর্থ? সে একজন উচ্চ বংশের লোক। তার জন্যে দামি জামাকাপড় প্রয়োজন! কিন্তু পয়সা কোথায়? এভাবে ধনসম্পদ উপার্জন করে চল্লিশের দিকে বিয়ের কথা ভাবা যায়। অথচ এ সময়ে তার ঔরসজাত ছেলের বয়স হওয়ারই কথা ছিল বিশ বছর।
একটি বিষয় ভেবে দেখুন তো, অর্থসম্পদ হাতে এলেও কি ছেলেমেয়ের বাবারা বিয়েতে সম্মতি দান করেন? করেন না; বরং তাদের সামনে নানা ধাঁধার জাল বিস্তার করে দীর্ঘসূত্রিতার অবতারণা ঘটাতেই তারা বেশি পারঙ্গমতা প্রদর্শন করেন। অন্যদিকে ছেলের চারিত্রিক অধঃপতনের ব্যাপারে যদি কোনো নালিশ আসে তখন তা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বলে দেয় যে, 'এই বয়সে একটু আধটু দুষ্টুমি করেই থাকে। ও কিছু না! বয়স বাড়লে ঠিক হয়ে যাবে!'
📄 নাটের গুরু কে
আরেক দৃষ্টিকোণ থেকে মেয়েদের বাবারাই হলেন যত সমস্যার মূল হোতা। তারাই আসল নাটের গুরু! তারা মেয়ের জন্যে বৈধ পথ ছাড়া সব পথই সহজ করে রাখেন। তাদেরকে সাজসজ্জা দিয়ে পর্দাহীনভাবে রাস্তায় নামিয়ে দেন। শাসনের লাঠি শিথিল করে দেন। ভালো কোনো পাত্রের সন্ধান এলে তাদের সাথে এমন আচরণ দেখান, যেন প্রবল প্রতাপে ইসরাইলে মার্কিন হামলা করে বসল! কোনো স্থান থেকে প্রস্তাব আসলে অযথা টালবাহানা শুরু করে দেন। ভারী দেনমোহর ও অনুষ্ঠানের বোঝা ছেলের কাঁধে চাপিয়ে দেন। তারা অবলীলায় ভুলে যান আল্লাহ তায়ালার বিধান ও নির্দেশ। অথচ কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে-
فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا فِطْرَةَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ
তুমি একনিষ্ঠ হয়ে দীনের জন্য নিজকে প্রতিষ্ঠিত রাখ আল্লাহর প্রকৃতির ওপর। যে প্রকৃতির ওপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই। এটিই প্রতিষ্ঠিত দীন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না। [সূরা রুম : ৩০]
মূলত আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক মানুষকে সরল সহজ করে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু অভিভাবকদের তালে পড়ে কিংবা পরিবেশের ফাঁদে পড়ে মানুষ দীন শরিয়ত ভুলে যেতে বাধ্য হয়। তাই এর জন্য দায়ী ব্যক্তিকেই আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেছেন-
كُلُّ مَوْلُودِ يُؤْلَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ فَأَبْوَاهُ يُهَوِدَانِهِ أَوْ يُنَصِّرَانِهِ أَوْ يُمَحِّسَانِهِ.
প্রত্যেক নবজাত শিশু ফিতরাত তথা ইসলাম বা স্রষ্টাকে চেনার ও তাকে মেনে চলার যোগ্যতার ওপরই ভূমিষ্ঠ হয়। কিন্তু তার পিতা-মাতা বা ইসলামবিরোধী পরিবেশে লালন-পালন করার মাধ্যমে তাকে ইহুদি, খ্রিস্টান ও অগ্নিপূজকে পরিণত করে।
মেয়ের অভিভাবকের অযথা আব্দার শুনে এক পর্যায়ের ছেলেপক্ষ বিরক্ত হয়ে পরাজয় মেনে নেয়। কখনোবা সে ধৈর্যের সাথে এসব রুসুমাতের মোকাবিলা করে। এই কালো দিবসের জন্যে ছেলে তার জীবনের সঞ্চিত সব পয়সা ঢেলে দেয়। আর বৈবাহিক জীবনে পদার্পণ করে খালি হাতে। ফলে প্রথম দিন হতেই শুরু হয়ে যায় ঝগড়া-বিবাদ।
কোনো সংসারে তর্ক-বিবাদের সূচনা হওয়ার অর্থ হলো যাবতীয় শান্তি ও কল্যাণের বিলুপ্তি ঘটা। কারণ তর্কবিতর্কের হাত ধরেই বৈবাহিক জীবনে কিংবা সংসারে প্রবেশ করে অশান্তির বিষধর সাপ।
অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, ছেলের দীনদারি, চারিত্রিক উৎকর্ষ ও নীতি-নৈতিকতার প্রতি সবিশেষ দৃষ্টি রাখতে। তিনি আদেশ দিয়েছেন বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা যথাসম্ভব সহজ পন্থায় সেরে নিতে। কিন্তু আমরা আদর্শ সমাজ সংস্কারক বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ ভুলে গিয়ে চলছি নিজের ইচ্ছায়। ইচ্ছাটাকে কেউ কেউ شরিয়ত কিংবা দীনের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তাই বলব, আমরাই সকল নাটের গুরু!
📄 পবিত্রতার প্রাচীরে মিসাইল হামলা
নারী পরম সম্মানিতা। ইসলাম তাদেরকে মাতৃত্বের আসন প্রদান করেছে। তাদের পদতলে সন্তানের বেহেশত ঘোষণা করেছে। তাই আদর্শ সন্তান ও আদর্শ নাগরিক গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন নারীর সতীত্ব রক্ষা করা। কিন্তু আমরাই নারীর সতীত্ব রক্ষার প্রাচীরটি নড়বড়ে করে দিয়েছি। তাতে আমরাই চালিয়েছি মিসাইল হামলা।
অনেক সাধারণ মানুষের বক্তব্য হলো, আজকের আধুনিক যুগে কি এভাবে বিবাহ সম্পাদন সম্ভব?
তাদের জিজ্ঞাসার সহজ জবাব হলো, হ্যাঁ! অবশ্যই সম্ভব। আমি এভাবেই করেছি। আমার পাঁচটি মেয়ে রয়েছে। তাদের জন্যে যখন কেউ প্রস্তাব নিয়ে এসেছে তখন আমি ছেলের আচার আচরণ ও ধর্মভীরুতা লক্ষ করেছি। তাতে সন্তুষ্ট হলেই বলে দিয়েছি, ঠিক আছে দেনমোহর নির্ধারণ করে বিয়ের কাজ সম্পন্ন করুন। আমি সাধারণ প্রথা-রুসুমাতের ধার ধারিনি। মহিলাদের কথা বলার সুযোগও দেইনি; বরং শরিয়তের নির্দেশনা মোতাবেক সব কিছু সম্পাদিত হয়েছে। সাথে সাথে বিবেক-বুদ্ধি ও পরামর্শকেও কাজে লাগিয়েছি। আমার আয়োজনের কারণে আমিও লজ্জিত হইনি, আমার মেয়েদেরও লজ্জিত করিনি।
আমরা কিভাবে নারীর সতীত্বের দেয়াল নড়বড়ে করেছি কিংবা কোনো ক্ষেত্রে তা গুঁড়িয়ে ধ্বংস করেছি তা বোঝা খুব সহজ। আমাদের মিসাইল হামলায়ই যে নারীর পবিত্রতার দেয়ালে ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়েছে তা তলিয়ে
দেখার মাথা খাটাতে চাই না। উল্টো যত দোষ নন্দঘোষের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতেই যেন স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।
এ ব্যাপারে কয়েকটি অপ্রিয় সত্য কথা বলতে চাই। তাহলো-
১. খোলামেলা চলাফেরা: অনেক বাবা আছেন, যারা মেয়েদের খোলামেলা পথে ছেড়ে দেন। পথচারী সবাই তাদের প্রতি ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকে; এমনকি গাধা-কুকুরও! কেউ বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলে এবং শরিয়তসম্মত পন্থায় মেয়ে দেখতে চাইলে তারা নানা আয়োজনে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন এবং চেঁচিয়ে ওঠেন পর্দা! দীনদারি! রুসুমাত! ইত্যাদি নিয়ে।
আমরা যুবকদের সামনে শরিয়তসম্মত বিবাহের পথে অন্তরায় তৈরি করে রেখেছি। পক্ষান্তরে তাদের সামনে শরিয়ত-নিষিদ্ধ সমস্ত বন্ধন খুলে দিয়েছি। শরিয়ত পর্দা ও পবিত্রতার বিধান আরোপ করেছে। অথচ আমরা আমাদের সন্তানকে সেই আলো থেকে বঞ্চিত করেছি। ফলে তারা বলে যে, আমরা পর্দাপ্রথায় ফিরে আসব? বন্দি জীবনে আবদ্ধ হব? এভাবে পবিত্রতার প্রধান প্রাচীরটি মিসাইল হামলার শিকার হয়ে ধসে পড়ে!
২. অবাধ মেলামেশা: শরিয়ত নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা হারাম করেছে। ইসলাম ঘোষণা দিয়েছে যে, নির্জনে ছেলেমেয়ে একত্র হলে তাদের তৃতীয় সহচর হয়ে থাকে শয়তান।
নারীবাদীদের সামনে এসব শরিয়তি কথা বলতে গেলে তারা অবলীলায় এর জবাবে বলে যে, এ কেমন আচরণ? নারীর প্রতি এ কেমন তুচ্ছ মনোভাব? তাদেরকে কেন ইসলাম বিশ্বাস করতে চায় না? কেন নারীকে স্বাধীনতাবঞ্চিত করা হবে? কথিত নারীবাদীরা উল্টো অভিযোগের ডালি সাজিয়ে বসেন যে, আপনারাই তো হলেন নারীবিদ্বেষী!
আমরা বলি, আল্লাহর কসম! আমরা নারীবিদ্বেষী নই। আমরা বরং নারীহিতৈষী: তাদের সংরক্ষক। আমরা সমাজ ও পুরুষের জুলুম থেকে তাদের উদ্ধার করতে চাই। কিন্তু তারা আমাদের কথায় বিশ্বাস করেনি। আমাদের কর্মপন্থা বাস্তবায়নও করেনি।
মূলত কথিত নারীবাদীরাই নারীদেরকে প্রতারিত করেছে। তারাই একা একা বাইরে নামিয়ে দিয়েছে। তারা ডাক্তারের সামনে মুহাররাম ছাড়া কাপড় খুলে দিচ্ছে। বিচারালয়ে মকদ্দমার জন্যে দেহ উন্মোচন করে ফেলছে। এভাবে হাটে-ঘাটে, বন্দরে-কন্দরে, কলেজে-ভার্সিটিতে, সফরে-বাড়িতে এবং পার্কে ও নদীর পাড়ে তাদের দেহ প্রসাধনীর মতো খুলে দিয়েছে।
কথিত প্রগতিবাদীরা আরো বলে বেড়ায় যে, এটাই আধুনিকতা। মূলত এখানেও আদর্শকে পরাজিত করেছে কথিত ধ্বজাধারীরা। এভাবে তারা পবিত্রতার দ্বিতীয় প্রাচীরটিও ভেঙে ফেলেছে।
৩. লজ্জাবোধের তিরোধান: যুবক-যুবতির পবিত্রতা রক্ষার তৃতীয় প্রাচীর হলো লজ্জা। বর্তমানে অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। লম্পট যুবকও অপরাধ করে বুক ফুলিয়ে গর্ব করে। বন্ধুদের কাছে হেসে, তামাশা করে অপরাধের কাহিনী শোনায়। তবে জিজ্ঞেস করা হলে অস্বীকার করে। এ সমস্ত ঘটনা এখন অহরহ ঘটছে। পাঠকবৃন্দ বিভিন্নজনের লেখায় এবং পত্র-পত্রিকায় অনেক ভয়াবহ বর্ণনাও পড়ে থাকবেন। তবে আফসোসের বিষয় হলো, এগুলো এতটাই ফলাও করে প্রচার করা হয় যে, এখন আর অপরাধ মনে হয় না। নির্লজ্জভাবে কলমে তোলা হয়, সংবাদপত্রে ছাপা হয় এবং টেলিভিশনে প্রচার হয়। এভাবে তৃতীয় প্রাচীরটিতেও শক্ত মিসাইল হামলা হওয়ায় তা হুড়মুড় করে পড়ে গেল।
৪. রোগের নির্ভয়তা: যুবক-যুবতিদের অন্যতম পবিত্রতা রক্ষাবাঁধ ছিল রোগের ভয়। অধুনা কিছু চিকিৎসক উচ্চৈঃস্বরে আওয়াজ তুলছেন যে, পাপাচারীরা! তোমাদের ভয় নেই। কারণ, আমাদের কাছে এর প্রতিষেধক ব্যবস্থা রয়েছে। তোমরা অবৈধ উপায়ে যে কোনো রোগ সৃষ্টি কর না কেন, আমরা প্রতিহত করব। আমরা আছি তোমাদের পাশে। ইদানীং যুবক-যুবতিদের অবৈধ যৌন চাহিদা চরিতার্থ করার সাময়িক কনডম, চব্বিশ ঘণ্টা কিংবা এক সপ্তাহের মধ্যে নির্দিষ্ট পিল বাজারজাত হয়েছে। সুতরাং নো রিস্ক! অন্যদিকে অবৈধ যৌনমিলনে সংক্রমিত মরণব্যাধি এইডস-এর প্রতিষেধকও ইতিমধ্যে নারীবাদীদের কুশলে আবিষ্কার হয়ে গেছে। অতএব তোমরা এগিয়ে যাও অবলীলায়!
ব্যাস! যুবক-যুবতিরা বিড়ালের শুঁটকির ডোলে পড়ার মতো অগ্রসর হতে থাকল। এক পর্যায়ে চতুর্থ রক্ষাবাঁধটিও মিসাইল হামলায় খানখান হয়ে ভেঙে পড়ল।
৫. প্রশাসনিক শৈথিল্য: পবিত্রতার পঞ্চম রক্ষাপ্রাচীরটি ছিল প্রশাসনের ভয়। একসময় রাষ্ট্র সৎকাজের নির্দেশ দিত এবং অন্যায় কাজে বাধা দিত। কিন্তু কালের আবর্তনে সব পাল্টে গেছে। শান্তিবিধি ফ্রান্স থেকে ধার নেয়া হয়েছে। যারা পাপাচারের কারণে সাত বছরে জার্মানের কাছে তিনবারই পরাজিত হয়েছিল। ফলে আমাদের সংবিধানে অবৈধ যৌনতা একরকম বৈধতা পেয়ে গেল। ব্যভিচারিণীর বিরুদ্ধে স্বামী ছাড়া অন্যের অভিযোগ
বাতিল করা হলো। মা-ছেলে, বাবা-মেয়ের যৌনাচারের শাস্তি সাধারণ চুরি থেকেও লঘু করা হলো!
কী আর করা! আমরা নীরবে বসে রইলাম। ওলামা-সুলাহা, মুফতি-নবাব, বিচারক সবাই নীরবতা অবলম্বন করলেন। ফলে পঞ্চম বাঁধটিও মিসাইল হামলা হওয়ায় সৃষ্ট বানের পানির তোড়ে ধসে গেল।
৬. ধর্মীয় অনুশাসনের অনুপস্থিতি: পবিত্রতার সবচেয়ে শক্তিশালী ও রক্ষণশীল প্রাচীর ছিল আল্লাহর ভয় ও জাহান্নামের ভয়। কিন্তু আমরা নতুন প্রজন্মকে দীনি শিক্ষা থেকে দূরে সরিয়েছি। আল্লাহ ও জাহান্নামের ভয়মুক্ত মনমানসিকতা গড়ে দিয়েছি। ফলে একজন যুবক মুসলিম হয়েও মসজিদের পথ চেনে না; খ্রিস্টান হয়েও খুঁজে পায় না গির্জার পথ।
মূলত যুবক-যুবতিদের পবিত্রতার এটিই ছিল সর্বাধিক মজবুত ভিত। কিন্তু তা-ও ধসে গেল। আমাদের অতি আধুনিক দাবিদার প্রগতিবাদীরা যুবতিদের মাঝে ঘোষণা দিল: যাও! বেরিয়ে পড়। ব্যাস, তারা পথে নেমে পড়ল। রাস্তায় এমনভাবে চলাফেরা শুরু করল যে, আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে নিজের ঘরে বাবার সামনেও একজন নারী এ পোশাকে আসতে লজ্জা পেত। এভাবে আমরাই সন্তানদের পবিত্রতার দেয়ালে মিসাইল হামলা করে তা ধসিয়ে দিয়েছি।