📄 এক বেনামি যুবতির আর্তি
আজ হতে ত্রিশ বছর আগে। এক যুবতি তার মনের আকুতি মিশিয়ে আমার কাছে কয়েকটি প্রশ্ন করে। বেনামি ঐ তরুণীর প্রশ্নের জবাবে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম। প্রবন্ধটি লেখার কয়েকদিনের মধ্যেই 'মাআন্নাস' নামে একটি বই প্রকাশিত হয়। তাতে প্রবন্ধটি সংযুক্ত করে দিই। প্রবন্ধটিতে বিবাহ ও আমাদের নারী সমাজ বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। যখন প্রবন্ধটি লিখি তখন মধ্যপ্রাচ্যে নানা দিক হতে নারীদের অবস্থা ছিল সকরুণ। তাই বইটি সেখানকার অধিবাসীদের জন্যে বেশ উপকারী হবে বলে আশা করছি।
বেনামি ঐ যুবতির পক্ষ থেকে আমার নামে ডাকে একটি পত্র আসে। চিঠিতে লেখা তার কিছু শব্দ ও বাক্য তার গুণ ও মানকে ক্ষুণ্ণ করেছে। পত্রে তিনি কিছু বিষয়ে অভিযোগ তুলেছেন। আর কিছু বিষয়ের প্রশংসাও করেছেন। তার কথার কিছু অংশ পাঠকের সুবিধার্থে তুলে ধরছি-
দেখুন আরব্য রমণীদের সংকীর্ণ জীবন ধারণ। পক্ষান্তরে পাশ্চাত্য রমণীদের সচ্ছল জীবনোপকরণ। এই নারীর বন্দি জীবন আর ওই নারীর স্বাধীন ভুবন।
বেনামি যুবতির লেখা এই অংশটি পড়ে আমি থমকে যাই। শব্দগুলো আমাকে মহাতাড়নায় ফেলে দেয়। আমাকে দংশন করে বাক্যগুলো। আমি ভাবনার সাগরে হারিয়ে যাই। এক সময় আমার খেই ফিরে। আমি যুবতির চিঠির উত্তর দেয়ার সংকল্প করে ফেলি।
আমার মন বলতে থাকে যে, আরে! এই যুবতি তো ভুল ধারণায় আছে। তাকে সত্য ও সোনালি সুন্দরের পথ দেখানোর দায়িত্ব তো এখন আমার। আমি যদি তার ভুল ধারণা ভেঙ্গে না দিই তাহলে নিশ্চয় আমাকে আল্লাহ তায়ালার দরবারে জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে। তাই আমি মনস্থির করি। যাতে তার ভুলগুলো শুধরে দিতে পারি।
মূলত তার চিঠির জবাবই এই প্রবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়।
আমি ভাবতে থাকি যে, এই বেনামি যুবতির মতো আরও অনেকেই হয়তো এমন ধারণা পোষণ করে থাকে। তারা স্বীকার করতে চায় না যে, এসব হচ্ছে কেবলই ধারণা।
এই ধারণা ও মন্তব্যের সর্বসুন্দর, অর্থবহ ও সংক্ষিপ্ত জবাব সম্পর্কে আমি আমার প্রখ্যাত উস্তাদ শায়খ বাহযাতুল বায়তারের একটি জিজ্ঞাসার জবাবকে তুলে ধরতে চাই। তিনি আমেরিকা নিবাসী এক রমণীর জিজ্ঞাসার প্রতিউত্তরে কথা প্রসঙ্গে আমাকে জানিয়েছেন। তিনি আমেরিকার এক সভায় আলোচনা করতে গিয়ে মুসলিম নারী সম্পর্কে কথা বলছিলেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, অর্থসম্পদে নারীদের নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা রয়েছে। এখানে কারও হাত নেই। এমনকি স্বামী, বাবা কেউ তার সম্পদে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।
উপরন্তু মহিলা দরিদ্র হলে যাবতীয় খরচাপাতি ও ব্যয়ভার তারাই গ্রহণ করবে। যদি তার বাবা-ভাই কেউ না থাকে, তাহলে যারাই তার উত্তরাধিকারী হতে পারবে তারা তার দায়ভার কাঁধে তুলে নেবে; যদিও সে চাচাতো ভাই-ই হয়। এভাবে ঐ পর্যন্ত তার দায়িত্বভার অন্যের হাতে সোপর্দ থাকবে- যতক্ষণ পর্যন্ত তার বিয়ে না হবে অথবা সে নিজে অর্থসম্পদ উপার্জন করতে না পারবে। বিয়ে করলে স্বামী তার দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেবে; যদিও স্ত্রী কোটিপতি হয়ে থাকে।
এভাবে ইসলাম ধর্মে নারীর মর্যাদা অতি উচ্চে রাখা হয়েছে।
আমার শায়খের কথায় প্রসিদ্ধ সাহিত্যশালার এক নারী দাঁড়িয়ে বললেন যে, যদি আপনাদের কাছে নারী এতই মর্যাদার হয়, তাহলে আমাদেরকেও আপনাদের ওখানে ছয় মাস রাখুন। এরপর হত্যা করে ফেলুন!
আমার শায়খ তো ভদ্রমহিলার কথা শুনে খুব আশ্চর্য বোধ করলেন। তিনি দরদের সাথে জিজ্ঞানুনেত্রে তার অবস্থা জানতে চাইলেন।
জবাবে মহিলা সবিস্তারে নিজের অবস্থা এবং সন্তানদের দুর্গতির কথা তুলে ধরল।
আমেরিকান ঐ মহিলা বাহ্যত নিজেকে স্বাধীনা ও সম্মানিতা হিসেবে প্রকাশ করে। অথচ সে বন্দিনি ও অপমানিতা। কারণ আমেরিকার লোকেরা নারীদের আনন্দ-আয়োজনে স্বাধীনতা দিয়ে রাখে। সেখানে সম্মান দেখায়। কিন্তু জীবনের বৃহদাংশে তাদেরকে অবহেলা করা হয়।
📄 প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের তরুণী
জনাবা, আপনারা পুরুষের মিষ্টি কথায় কান দেবেন না। কারণ কোনো পরপুরুষই প্রকৃতভাবে আপনার কল্যাণ চায় না। তারা আপনাকে কয়েকদিন ভোগ করে পরে টিস্যু পেপারের মতো ছুঁড়ে ফেলে দিবে।
মনে রাখবেন যেই পুরুষ নারীদের উত্ত্যক্ত করে এবং নারীর জন্যে অসৎ উদ্দেশ্যে অর্থ অপচয় করে, আমাদের কাছে সে পাপাচারী হিসেবে বিবেচিত। কারণ, কোনো পুরুষ একজন নারীকে অনেক চেষ্টা-তদবিরের পরই লাভ করতে পারে। প্রাচ্যের নারীরা আচ্ছাদিত থাকে। গর্হিত কাজ কাজ থেকে নিজেদের বিরত রাখে। এ কারণে তারা সম্মানের পাত্রী; মানুষের কামনার বস্তু নয়। পক্ষান্তরে পাশ্চাত্যের নারীরা জনসম্মুখে নিজেদের উপস্থাপন করে থাকে। ফলে তাদেরকে লাঞ্ছিত হতে হয়। কেননা, জগতের যা কিছু খোলা চত্বরে প্রকাশ করা হয়, তার দাম কমে যায়। একইভাবে যেসব নারী খোলামেলা চলাফেরা করে আপনারাই তাদের সম্পর্কে নিজের বিবেককে ঠাণ্ডা মাথায় একটু খাটিয়ে দেখুন। আপনারাই ভেবে দেখুন তো আপনাদের কাছে কোন নারীর মূল্যায়ন বেশি! যারা নিজেকে ঢেকে রাখে তাদের, নাকি যারা উদোম চলে তাদের?
তবে হ্যাঁ, যাদের বিবেক লোপ পেয়েছে, যাদের ওপর পাশবিকতা ভর করেছে, রুচিবোধ যাদের কাছ থেকে বিদেয় নিয়েছে, যাদের রঙিন চশমা তামাম পৃথিবীটাকেই নোংরা ও উলঙ্গ দেখে তাদের কাছে তো উদোম দেহটাই ভালো ঠাওর হবে! যাদের মধ্যে মনুষ্যত্ববোধ নেই, যারা মানুষের কাতারে পড়ে না, তাদের ব্যাপার তো আলাদা হওয়াটাই স্বাভাবিক!
📄 ডক্টর বন্ধুর তিক্ত সংলাপ
আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ডক্টর ইয়াহইয়া আল শামা। আজ থেকে তেত্রিশ বছর আগে তিনি প্যারিস থেকে অধ্যয়ন সমাপ্ত করেন। উচ্চতর ডিগ্রি লাভশেষে ফিরে এসে আমাকে তিনি একটি তথ্য দিয়েছিলেন। তাহলো, একবার তিনি প্রবাসে থাকাবস্থায় ভাড়া রুমের খোঁজে এক বাড়িতে গিয়েছিলেন। ঘরের বাইরে ছোট একটি বালিকা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল। তিনি ঘরের অধিবাসীদের জিজ্ঞেস করলেন, 'ওর কী হয়েছে?' জবাবে ঘরের লোকেরা বলল, ও আমাদেরই মেয়ে। কিন্তু বয়স হওয়ার কারণে আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এখন সে একাকী জীবনযাপন করবে।
আমার ঐ বন্ধু তাদেরকে বললেন, তো কাঁদছে কেন? জবাবে তারা জানাল যে, সে আমাদেরই একটি রুম ভাড়া চেয়েছিল। আমরা ওর কাছে ভাড়া দেইনি।
তিনি জানতে চাইলেন কী কারণে ভাড়া দিতে চাচ্ছেন না? জবাবে তারা বলল, সে ভাড়া বাবদ বিশ ফ্রাস্ক দিতে চেয়েছে। অথচ অন্যরা ত্রিশ ফ্রাস্ক দিয়েও ভাড়া নিতে রাজি। তাকে বিশ ফ্রাস্কে ভাড়া দিলে যে আমাদের দশ ফ্রাস্ক আয় কমে যায়।
সুপ্রিয় পাঠকমহল! অনেকের মন সবসময় থাকে সন্দেহপ্রবণ। তাই এমন কারো মনে আমার বর্ণিত এই ঘটনার প্রতি সন্দেহ জাগতে পারে। আমি তাদের অনুরোধ করব যে, ডক্টর ইয়াহইয়া আল শামা এখনও বেঁচে আছেন। আপনারা দয়া করে তাকে জিজ্ঞেস করুন। তিনি স্বচক্ষে দেখেছেন এবং নিজের কানে সেই কান্না শুনেছেন।
সত্যি বলতে কি! যারা ইউরোপ-আমেরিকা সফর করেছেন, তারা আমাদের কাছে এ জাতীয় আরও অনেক ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। সেখানে নারীরা পেটের দায়ে নিজেদেরকে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত করছে আর লাঞ্ছিত।
হচ্ছে। অহরহ আমরা এসব দৃশ্য দেখতে পাচ্ছি। সামান্য খাবারের জন্যে নিজেকে তারা বিলিয়ে দিতে এতটুকু ইতস্তত করে না। তার তুলনায় আমাদের নারীরাই অধিক সম্মানের সাথে আছেন।
আপনারা নিশ্চয় 'তাওফীক আল হাকীমে'র লেখাটি পড়ে থাকবেন। সেখানে চোখে আঙুল দিয়ে বোঝানো হয়েছে, একটি মেয়ে তার জীবনের দায়ে কী ধরনের কাজের জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করেছিল? মেয়েটি নিরুপায় হয়ে এক পর্যায়ে এক সুসাহিত্যিকের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু মেয়েটির দুর্বলতার সুযোগকে ষোলআনা কাজে লাগায় সেই লেখক। তিনি মেয়েটির সাথে স্ত্রীসুলভ আচরণ করতেন। তারপরও মেয়েটি বাধ্য হয়েছিল মুখ বুজে সব মেনে নিতে। কারণ মেয়েটির মূল চাহিদা ছিল শুধু দু'বেলার আহার, একটু থাকার ব্যবস্থা। কিন্তু ঐ লেখকই মেয়েটিকে স্বীয় জৈবিক চাহিদায় ব্যবহার করে পরবর্তীতে তাকে ধূর ধূর করে বাড়ি থেকে নিষ্ঠুরভাবে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন।
📄 লাভ ম্যারেজ
আমি আরবের এক কবির কথা বলছি। তখন তার টগবগে তারুণ্য উজিয়ে পড়ছিল। টইটম্বুর তারুণ্যের হেফাজতের ভাবনা তার অনেক কবিতা ও সাহিত্য রসে ভরে ওঠে। কিন্তু বিয়ে বলে কথা! ভাবলেই কি আর বিয়ে করা যায়? বিয়ের জন্য দরকার অনেক কিছু। আবার উপযুক্ত পাত্রীই বা পাবে কোথায়? এদিকে যৌবনের তরও সইছে না। তার যৌবন নদীতে যে ভরা জোয়ার। তিনি কবিতার ছন্দে খুঁজে পান নিজের ব্যতিক্রমিতা। তার রচিত সাহিত্যে ঝরে পড়তে থাকে অজানা রস, অচিন জাদু।
এরই মধ্যে তার কবিমনের সামনে বাঁকা চাঁদের মতোই উঁকি দেয় এক ছিপছিপে গড়নের যুবতি। এক মার্কেটে তার চোখে ধরা পড়ে সেই দুধে আলতা গণ্ডালোক। রক্তিম চেহারা। টসটসে ভরা যৌবন। তার কোমর দোলা হাঁটার মাঝে কবিতার ছন্দ খুঁজে পান কবি। ব্যাস! আর যান কোথায়! তিনি যুবতির প্রেমে পড়ে যান। কিন্তু আরব্য নারীরা যে ওপেন চলাফেরা করেন না। কী করে মনের ইচ্ছা পুরিয়ে দেখবেন তাকে? তিনি নানা ছুতো খুঁজতে থাকেন। মিছে কেনাকাটার অজুহাতে তরুণীর কাছে ঘেঁষার চেষ্টা চালান। কিছুটা সফলও হন।
আরব্য যুবক কবি মুহূর্তে দক্ষ কাস্টমার বনে যান। ঐ যুবতি যেই দোকানে প্রবেশ করে, কবি সাহেবও পৌঁছেন সেই দোকানে। কালো বোরকার আস্তিন হতে বেরিয়ে আসা রমণীর হাতের তালু আর কজি নজর কাড়ে তার। ব্যাস! এতটুকুতেই তার মাথায় চক্কর লেগে যায়। উদ্বেগ আর প্রেম-ভালোবাসায় হৃদয় হয়ে পড়ে অস্থির ও ব্যাকুল। সে তার প্রেমে পড়ে যায়। শুরু হয় ভালোবাসা। কিন্তু সেটি একতরফা ভালোবাসা। তবু তাতেই তার জবান দিয়ে ঝংকৃত হতে থাকে উচ্ছ্বসিত গীতছন্দ। কাব্যের ফুল ঝরতে থাকে দিনকয়েক।
যুবতি তার অভিভাবকসহ কেনাকাটা শেষ করে গাড়িতে চেপে বসে। কিন্তু তরুণ কবির কি আর হা করে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখার সময় আছে? তার যে আর তর সইছে না। ব্যাস, তিনিও একদেখাতেই প্রেমে পড়ে যাওয়া যুবতির বাসার ঠিকানা সংগ্রহের মানসে গাড়ি ফলো করে পেছনে পেছনে নিজ গাড়ি চালাতে থাকেন। অবশেষে অন্তত এই ধাপে তিনি সফল হন। চুপিসারে দূরে দাঁড়িয়ে বাসার ঠিকানা কালেকশন করেন।
এবার কবির নাওয়া খাওয়া বাদ যাওয়ার উপক্রম। কেমন যেন উন্মাদ ভাব তার দেহ জুড়ে। কাজকর্মে তার মন বসে না। কারণ অপরূপাকে যে তার চাই-ই চাই। কিন্তু এত সহজেই কি সোনার হরিণ বাগে আসে! তিনি তাকে পাওয়ার নানা ফন্দি আঁটতে থাকেন। কী হারিয়ে ফেলেছেন- এমন ভাব তার আপাদমস্তকে। তিনি মনের মুকুরে এক মহাসিংহাসন রচনা করেন ঐ যুবতির জন্য। গড়ে তোলেন অপরূপ তাজমহল!
'প্রচেষ্টা সাফল্য আনে পুণ্য আনে ধন' প্রবাদ যুবক কবির ক্ষেত্রে বাস্তব হয়ে ধরা দেয়। তিনি নিরাশার ছাই ঝেড়ে ফেলে আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাতে থাকেন। যুবতি যুবক কবির ভালোবাসার কথা না জানলেও কবি স্বপ্নের প্রেয়সীর ভালোবাসার জালে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন।
একপাক্ষিক ভালোবাসার জানা অজানা প্রাপ্তি অপ্রাপ্তিতে গত হয় তার দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর। একেকটি মুহূর্ত তার কাছে মনে হয় যেন একেক যুগ। এভাবেই পরিষ্কার হতে থাকে তার বেদনার নীল আকাশ। তিনি স্বপ্নে বীজ বুনেন লাভ ম্যারেজ তথা ভালোবেসে ঘর বাঁধার। কিন্তু কিভাবে পাঠাবেন বিয়ের প্রস্তাব! সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে তার আশার তরি তীরের দেখা পায়। তার নিরন্তর প্রচেষ্টা তাকে নিরাশ করেনি। সফলতা তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। ভালোবাসার আকাশ হতে সরে যেতে থাকে উড়ে বেড়ানো কালো মেঘগুলো। তার সামনে ভেসে ওঠে কুরআন মাজিদের চিরন্তন বাণী-
وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيمَا عَرَّضْتُمْ بِهِ مِنْ خِطْبَةِ النِّسَاءِ أَوْ أَكْنَنْتُمْ .
فِي أَنفُسِكُمْ ..... وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ غَفُورٌ حَلِيمٌ
আর যদি তোমরা আকার ইঙ্গিতে সে নারীকে বিবাহের পয়গাম দাও কিংবা নিজেদের মনে গোপন রাখ তবে তাতে তোমাদের কোনো পাপ নেই। আল্লাহ তায়ালা জানেন যে, তোমরা অবশ্যই সে নারীদের কথা উল্লেখ করবে। তোমাদের মনে যে কথা রয়েছে, আল্লাহ তায়ালার তা জানা আছে। কাজেই তাঁকে ভয় করতে থাক। আর জেনে রেখ, আল্লাহ তায়ালা ক্ষমাকারী ও ধৈর্যশীল। [বাকারা: ২৩৫]
কুরআন মাজিদের এ আয়াত যুবকের মনে শতগুণে সাহস বাড়িয়ে দেয়। এক পর্যায়ে তিনি সাহস করে প্রস্তাব পাঠান বিয়ের। কবি যুবতিকে তার মনের কথা খুলে বলেন।
কবি ছিলেন স্মার্ট চেহারার। শিক্ষাগত যোগ্যতাও সর্বোচ্চ ডিগ্রি। আর চলাফেরা, আদর্শ! মন্দ নয়। ফলে যুবতিরও মনে ধরে তাকে। তার ইচ্ছেনদীতে তরতরিয়ে জোয়ার আসে। তিনিও যেন এতদিন এমন একটি প্রস্তাবেরই অপেক্ষা করছিলেন। যুবতির ইচ্ছায় তার অভিভাবকগণ কবি পরিবারের খোঁজখবর নেন। অবশেষে সফল হয় 'লাভ ম্যারেজ'।
প্রিয় পাঠক! একবার ভেবে দেখেছেন কি যুবতিকে একবার দেখেই সাহিত্যজগতের কবি কেন তার প্রেমে মাতাল হয়ে গেলেন? এর কারণ হলো, আরবের রমণীরা মানুষের অগোচরে থাকে। মুক্তা যেমন লুকিয়ে লুকিয়ে নজরের আড়ালে থেকে দামি হয়, ঠিক তেমনি। বিপরীতে পাশ্চাত্যের নারীদের সমুদ্রতীরে, বাজারে-বন্দরে সবখানে দেখা যায়। ফলে তাদের পায়ের গোছা দেখেও মানুষ উত্তেজিত হয় না, হৃদয় দুলে ওঠে না। এতে তারা লজ্জাবোধও করে না। রমণীর পায়ের গোছা, চেয়ারের পায়া এবং ঘরের কাঠ সবই তাদের কাছে সমান হয়ে পড়েছে। ফলে তাদের সমাজে বৈবাহিক ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ে।
বৈবাহিক সম্পর্ক হলো স্থায়ী বন্ধন। এর মাধ্যমে একজন পুরুষ স্বাধীন-রুচিবোধের সাথে যুক্ত হয় এবং মানসিক চাহিদা পূরণে উদ্বুদ্ধ হয়ে থাকে। কিন্তু এ চাহিদা যদি ভিন্নপথে অর্জিত হয়, তাহলে আর বিবাহের মৌলিক প্রয়োজনীয়তা থাকল কোথায়?
সৌন্দর্য প্রদর্শন করা ও পর্দাহীনতা ইহুদিদের মজ্জাগত অভ্যাস। নারীর ফেতনা দ্বারা কোনো জাতিকে ধ্বংস করার ক্ষেত্রে ইহুদিদের ষড়যন্ত্র ও কৌশল সফলতার দাবিদার। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, অতীতে উলঙ্গ নারীরাই ছিল তাদের বিভিন্ন সংস্থা ও কার্যক্রমের বড় হাতিয়ার। ইহুদিরা এ বিষয়ে প্রাচীন ও অভিজ্ঞ। এ কারণেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেন-
فَاتَّقُوا الدُّنْيَا وَاتَّقُوا النِّسَاءَ، فَإِنَّ أَوَّلَ فِتْنَةِ بَنِي إِسْرَائِيلَ كَانَتْ فِي النساء.
তোমরা দুনিয়াকে ভয় কর এবং ভয় কর নারীকে। কারণ, বনি ইসরাইলের প্রথম ফেতনা ছিল নারীর ফেতনা। (মুসলিম শরীফ)
সিফরে আশিয়া কিতাবের তৃতীয় সংস্করণে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আল্লাহ তায়ালা ছিহয়ুন গোত্রের মেয়েদের সৌন্দর্য প্রদর্শনের কারণে শাস্তি প্রদান করেন।
পরিতাপের বিষয় হলো, পশ্চিমা নারীরা নিজেরাই নিজেদের সম্মান হারিয়ে ফেলেছে। এখন তাদের ভরণপোষণ পর্যন্ত দেয়ার মতো কেউ নেই। এ কারণে তারা বাধ্য হয়ে জীবনধারণের জন্যে কোনো না কোনো পেশা বেছে নিচ্ছে। কলকারখানার শ্রমিক হওয়া, হাটেবাজারে শ্রম দেয়া এবং রাস্তাঘাট ঝাড়ু দেয়াসহ সব ধরনের কাজে অবাধে অংশগ্রহণ করছে। ইউরোপের নারীরা টয়লেট পর্যন্ত পরিষ্কার করে দিচ্ছে।
ইউরোপে এমন অনেক তরুণী-যুবতি নারী আছে, যারা জুতা সেলাই করে, জুতা কালি করার বাক্স কাঁধে রাখে। এমনও কাউকে দেখা যায় যে, সে বই হাতে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে; ঠিক এরই মধ্যে কোনো সাহেব পা বাড়িয়ে দিলেন জুতা কালি করার জন্যে। ব্যাস! পাশ্চাত্য-কন্যা মাথা নিচু করে জুতা কালিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
ইউরোপের এই হলো সামাজিক ব্যবস্থা। অথচ ঠিক একই মুহূর্তে প্রাচ্যের নারীরা নিজ নিজ ঘরে স্বামীর পাশে স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপন করছে। আর তা দেখেই হিংসায় কলজে ফেটে মরে হায়েনা আর নির্লজ্জ পশুর মতো কিছু মানুষ নামের অমানুষ।
ইসলামের চিরন্তন বিধানের মধ্যেই রয়েছে নারীর মর্যাদা। এ বিধান মেনে নিলেই তাদের মধ্যে স্মার্টনেস খুঁজে পাওয়া যায়। এ বিধানের মধ্যেই নিহিত রয়েছে তাদের আসল মূল্য। যে নারী নিজের সৌন্দর্য লুকিয়ে রেখে চলে সে দামি সোনার মতোই অন্যের চোখে ধরা দেয়। আদর্শ যুবতির পেছনেই শিক্ষিত ও যোগ্য কবির ন্যায় হাজারো যোগ্য পুরুষ ঘুরঘুর করে থাকে। অনাদর্শ তরুণীকে টিস্যু পেপারের মতো ব্যবহারের পর ছুঁড়ে ফেলে দিলেও প্রকৃত আদর্শ নারীকে নিয়েই ঘর বাঁধতে চায় পুরুষরা। এসব যুবক একজন আদর্শ জীবনসঙ্গিনী খুঁজতে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ায়। তাদেরকে মর্যাদার আসনে রেখে তাদের সাথে 'লাভ ম্যারেজ'এ আবদ্ধ হওয়াকে নিজের জীবনের বড় পাওনা মনে করে থাকে।