📄 আই লাভ ইউ
দু'দিন আগের ঘটনা। আমাদের এক আত্মীয় যুবক আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল। দেখতে বেশ তাগড়া। তার দৈহিক গঠন ভালো। সুস্বাস্থ্যবান। নৈতিক চরিত্রের দিক থেকেও পিছিয়ে নেই। বয়স ত্রিশের কোটা ছুঁইছুঁই। তবে বেচারা এখনও বিয়ে করেননি।
কথা প্রসঙ্গে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আরে! তুমি বিয়ে করছ না কেন?
জবাবে সে যা বলল তাতে আমার টাসকি খাওয়ার মতো অবস্থা। সে জানাল যে, বিয়ের ব্যাপারে আমি আমার পরিচিতজনের অনেকের সাথেই আলাপ করেছি। ব্যাপারটি নিয়ে পরিচিত ছেলে-মেয়ে, বন্ধু-বান্ধব যার সাথেই কথা বলেছি, তারা সবাই আমাকে বৈবাহিক জীবনে অশান্তি, কলহ, ঝগড়া-বিবাদ, বউ-শাশুড়ির অমিল ইত্যাদির শত অভিযোগ শুনিয়েছে। শুধু তাই নয়, তারা নিজেদের সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে মতামত ব্যক্ত করেছে যে, বিয়ে না করাই ভালো ছিল। আমি তাদের কথায় বুঝলাম যে, এ যুগে বিয়ে করার অর্থ মাথাব্যথা ও হৃদরোগ সৃষ্টি করা ছাড়া আর কিছুই না। অতএব আমি নিজের কষ্টার্জিত অর্থে মনোবেদনা ও জীবনযন্ত্রণা কিনতে চাই না।
আমি আমার সেই আত্মীয় যুবককে বললাম, আরে! তোমার যে বন্ধুদের কাছে জিজ্ঞেস করেছ, তারা অবশ্যই মানুষ হবে নিশ্চয়?
জবাবে সে বলল, আরে! মানুষ না হলে কি আর নিজেদের দাম্পত্যজীবনের কষ্টটা বুঝতে পেরেছে?
আমি তাকে বললাম, তারা কষ্ট ও ব্যথায় আছে বলে সবারই কি একই দশা হবে?
জবাবে আমার আত্মীয় কাচুমাচু করতে লাগল।
আমি সুযোগ বুঝে তাকে বললাম, আচ্ছা! তুমি তাদের জিজ্ঞেস করলে! অথচ আমার কাছে জিজ্ঞেস করলে না কেন? যে ব্যক্তি পাঁচ-দশটি মজলিসে হাজির হয়ে বৈবাহিক বিবাদ মীমাংসা করে, এ সম্পর্কে অবশ্যই তার জ্ঞান মন্দ হওয়ার কথা নয়। তাই কাচারি এক জায়গায় রেখে অন্যত্র গিয়ে কান ডললে কি সমস্যার সমাধান হবে? বরং এটাতো অরণ্যে রোদন বৈ অন্য কিছু নয়!
আমার কথায় আমার আত্মীয়ের আত্মসম্মানে হালকা আঘাত লাগল। ব্যাপারটি আমি আঁচও করলাম।
আমি তাকে বললাম, শোন! আমি কোর্টে ত্রিশ হাজারেরও অধিক দম্পতির সমস্যার সমাধান করেছি। সেখানে স্বামী-স্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক কথাবার্তা শুনেছি। বহু লাভ ম্যারেজ সমস্যার সমাধান করেছি। তাছাড়া আমি ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে বিভিন্ন সমস্যা নিরসনে নিয়োজিত এক ব্যক্তি। একটা সময় এসব নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম। তখন লেখালেখিতে প্রবেশ করিনি। সে সময়ে বিধবাদের জন্যে প্রশিক্ষণশালা খুলেছিলাম। তাই আমার অভিজ্ঞতার ঝুলি।
একেবারে ঠুটো নয়। আশা করি আমার সম্পর্কে তোমারও তো কম-বেশ জানা আছে। তা সত্ত্বেও তুমি আমার সাথে পরামর্শ করলে না কেন?
জবাবে ত্রিশের কোটায় করাঘাতকারী যুবক বলল, আচ্ছা! আপনি কি দেখেন না, অধিকাংশ দম্পতির জীবনে সব সময় অশান্তি লেগে থাকে?
আমি তাকে বললাম যে, আমি তোমাকে প্রথমে দম্পতি-বিবাদের মূল রহস্য বোঝানোর চেষ্টা করব। বিবাদের কী অর্থ তাও বোঝা দরকার। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক মতানৈক্যকে বিবাদ বলা যাবে না। কারণ এটা সম্ভব নয় যে, জীবনের প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত শুধু আনন্দ করবে। লাইলি-মজনুর মতো প্রতিদিন প্রেমালাপ করাও সম্ভব নয়।
'তাহলে আর কি!'- যুবক জানতে চাইল।
জবাবে আমি বললাম, শোন! ভালোবাসার মিলন মানেই কি কেবল সে তোমাকে বলবে- 'আই লাভ ইউ!' তথা 'আমি তোমাকে ভালোবাসি'! আর তুমি তাকে বলবে- 'আই লাভ ইউ টু! তথা তোমাকেও আমি ভালোবাসি'? এভাবে যখন একই শব্দ বারবার বিনিময় হতে থাকবে? তখন তো এ শব্দের আর কোনো অর্থই থাকবে না। মনে রাখবে বর্তমান পৃথিবীর বহুল ব্যবহৃত শব্দ হলো এই 'আই লাভ ইউ'। কিন্তু ব্যবহারের আধিক্যে এটি এখন সবচেয়ে বেশি হওয়ায় এটি এখন মুখের বুলিতে পরিণত হয়েছে। এটি এখন কথার কথা। এখন যে শিশুটির মুখে কথা ফুটতে শুরু করে, সেও তার বড়দের মুখে শুনে 'আই লাভ ইউ' বলতে থাকে। আচ্ছা, দুই বছরের এই শিশুটি আই লাভ ইউ'র কী বোঝে?
মূলত ছোট বাচ্চারা এমনই ভাবে। যদি এই শব্দগুলোর মাঝেই লাইলি-মজনুর দাম্পত্য সীমাবদ্ধ থাকত তাহলে বিয়ের দ্বিতীয় মাসের শুরুতেই তাদের বাদানুবাদ লেগে যেত। তৃতীয় মাসে পাড়া-প্রতিবেশী সবাই শুনতে পেত। আর বছরের শেষ প্রান্তে এসে শরয়ী আদালতে বিচ্ছিন্নতার দাবি উঠত। তাহলে জগতের কোথাও এমন শূন্যসার বৈবাহিক জীবন সম্ভবপর হতো না। কেবল গল্প-উপন্যাসেই স্থান পেত।
যুবকটি বুঝতে শুরু করল। সে বলল, ব্যাপারটি তো এভাবে ভাবিনি!
আমি তাকে বলতে লাগলাম, স্বামী-স্ত্রী মাঝে-মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধ করতে পারে। একজন আলেমের পরিবারেও এ ধরনের বিবাদ হয়ে থাকে। এমনকি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘরেও এ জাতীয় মতভিন্নতা হতো। অথচ তাঁর পরিবার ছিল জগতের শ্রেষ্ঠ পরিবার।
যুবকটি যেন আমার কথাগুলোকে গো-গ্রাসে গিলতে লাগল।
আমিও সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে কসুর করিনি। আমি তাকে বললাম, আমার কথা বিশ্বাস না হলে সূরা তাহরীম পড়ে দেখুন। সাহাবায়ে কিরাম (রা.) তাঁদের স্ত্রীদের বিরুদ্ধে নবীজীর দরবারে অভিযোগ দায়ের করতেন।
'ব্যাপারটি একটু খুলে বলুন তো!'- যুবক আব্দার জানাল।
আমি উদাহরণ দিয়ে বললাম, এক ব্যক্তি হযরত ওমর (রা)-এর কাছে স্বীয় স্ত্রীর ব্যাপারে نালিশ নিয়ে হাজির হলেন। যখন তিনি দরজায় করাঘাত করলেন, তখন ঘরের ভেতর হযরত ওমরের স্ত্রীর উচ্চ আওয়াজ শুনতে পেলেন। আগন্তুক ব্যক্তি লক্ষ করলেন যে, হযরত ওমর নীরব আছেন। অথচ নেতৃস্থানীয় লোকেরা পর্যন্ত তাঁর নাম শুনে কেঁপে উঠত!
এরই মধ্যে লোকটি চলে যাচ্ছিল।
হযরত ওমর (রা) ঘর হতে বেরিয়ে এলেন। তিনি তাকে ডাক দিলেন। লোকটি ফিরে এসে জানাল যে, আমীরুল মুমিনীন! আমি আমার স্ত্রীর অসদাচরণের অভিযোগ করতে এসেছিলাম। কিন্তু এখন দেখি আপনিও আমার মতো ভুক্তভোগী!
জবাবে হযরত ওমর হেসে দিয়ে বললেন, এসব সহ্য করে নিতে হয়। কারণ আমার ওপর তারও অধিকার রয়েছে!
মনে রাখবেন, আল্লাহ তায়ালা একই আকৃতি দিয়ে দুটি মানুষকে সৃষ্টি করেননি। এমনকি যমজদেরও না। কখনও কখনও তাদেরকে একই রকম মনে হলেও তাদের মাঝে সূক্ষ্ম পার্থক্য বিদ্যমান থাকে। ঠিক তেমনি একই স্বভাব-চরিত্র দিয়েও মহান আল্লাহ কাউকে সৃষ্টি করেননি।
কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে-
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ ۗ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا
আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো নির্দেশ দিলে কোনো মুমিন পুরুষ ও নারীর জন্য নিজদের ব্যাপারে অন্য কিছু এখতিয়ার করার অধিকার থাকে না। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করল সে স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে। [সূরা আল-আহযাব: ৩৬]
যদি দু’জন বন্ধু, পার্টনার, শরিকদার, ব্যবসায়ী বা স্বামী-স্ত্রী চায় যে, তাদের মাঝে বিরোধ না হোক; তাহলে একজনকে অবশ্যই অন্যের মত মেনে নিজের ভেতর বিরোধিতা করতে হবে।
আপনি যদি রাস্তার ডান পাশে থাকেন আর আপনার বন্ধু থাকে বাম পাশে এবং দু’জনে মোসাফাহা করতে চান, তাহলে একজনকে রাস্তা পার হয়ে আসতে হবে। নতুবা হয় দু’জনেই দু’পাশ থেকে এগিয়ে এসে মাঝ রাস্তায় মিলিত হতে হবে।
মনে রাখবেন, প্রতিটি অংশীদারি কাজে একজন কর্তা থাকা জরুরি। বৈবাহিক জীবনে অবশ্যই কর্তা হবেন স্বামী। তাই যেকোনো ব্যাপারে তার মতের অগ্রাধিকার থাকবে। ছোটখাটো বিষয় হলে আলাদা কথা।
অন্য দিকে ঘর গোছানো, খাবার আয়োজন করা ইত্যাদি কাজে অবশ্যই স্ত্রীর মতামত অগ্রগণ্য থাকবে। কারণ, এটি তার অধিকার। সে অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর মতো তারও সাধারণ ও ব্যাপক অধিকার রয়েছে। এখন যদি স্ত্রী অপরিচিত হয়, ঘর-দুয়ার পরিষ্কার করে না রাখে অথবা ভালো রাঁধাবাড়া করতে না পারে তাহলে স্বামী এ ব্যাপারে তাকে সতর্ক করবে।
অনেক লোক আছে, যারা ঘরের সৌন্দর্য, মেঝের চাকচিক্য ও বারান্দার পরিচ্ছন্নতার প্রতি কোনো খেয়াল করে না। তারা চায়, স্ত্রী কেবল তাদের জীবনসঙ্গিনী হয়ে থাকবে। তাদের মতের অনুকূলে মত প্রকাশ করবে। যেখানে নিয়ে যাবে সেখানে যেতে প্রস্তুত থাকবে।
কিছু কিছু মহিলাও এমন আছে, যারা নোংরা জীবন যাপন করে। এখানে ওখানে জামাকাপড় পড়ে থাকে! বিছানাটা থাকে এলোমেলো! চেয়ারটা থাকে উপুড়ানো! রাতের থালাবাসন সকালেও ধোয়া হয় না! স্বামী কিছু বললেই চিঙ্গিয়ে উঠে বয়ান ছেড়ে দেয় যে, সেই সকাল থেকে কাজ করছি, কিছু দেখছ না! আবার সাজানো-গোছানো খাটে বসলেও চিৎকার মেরে বলে, ‘এইমাত্র ভাজ করলাম আর তুমি ওখানে বসে পড়লে!’
মূলত প্রকৃত জ্ঞানবান নারী সে, যে সবসময় স্বামীর সন্তুষ্টি তালাশে মগ্ন থাকে। কী করলে স্বামী খুশি হবেন, তা নিয়ে ভাবতে থাকে।
ঠিক পুরুষেরও উচিত স্ত্রীর মনোরঞ্জন করা। নিজের কর্তত্বের ধোঁকায় পড়ে তার সাথে অসদ্ব্যবহার না করা। নিজেকে পারস্য সম্রাট নওশেরওয়াঁ ভাবা ঠিক নয়।
ঐ মানুষ আদর্শ মানুষ নয়, যে কেবল আদেশ-নিষেধই চিনে। পক্ষান্তরে যা কিছু ভালো, তা শুধু নিজের জন্যে রাখে। প্রকৃত মানুষ তো হলো সে, যার ভালোটুকু থাকে পরের জন্যে আর মন্দটুকু রাখে নিজের জন্য। নিজের সুখটাকে অন্যের জন্য বিলিয়ে দিতে পারার মধ্যেই প্রকৃত ভালোবাসা নিহিত থাকে। এমন মনমানসিকতা পোষণকারীর মুখেই আসল শোভা পায়- 'আই লাভ ইউ'।
📄 অন্যরকম যুবক-যুবতি
দামেশকে একজন লোক ছিল। সে ছিল খুবই চালাক। সে আমারও পরিচিত ছিল। সবকিছুতে সে চতুর ও ঝটপট। আশ্চর্য ও দুর্লভ গল্প শুনিয়ে মানুষকে অবাক করে ফেলত সে। অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করে মানুষকে হতবাক করে দিত। মানুষ তার যেকোনো প্রোগ্রামে-আয়োজনে আনন্দের সাথে ছুটে আসত। সে যেখানে আছে সেখানে অন্য কারও কথা বলার সুযোগ থাকত না, অধিকারও না। তার অভিনব সব কাণ্ডকারখানা লোকজনকে হৃদয়ের গভীর থেকে হাসিয়ে তুলত।
কিন্তু এই লোকটিই স্বীয় পরিবারের সাথে ছিল ব্যতিক্রমী এক ব্যক্তি। ঘরের কারও সাথে তার কোনো হাসি-ঠাট্টা ছিল না। ঘরে যাওয়ার পর প্রয়োজন ছাড়া তার মুখ থেকে কথাও বের হতো না। সে ঘরে আসা মানেই এক বিপদের আগমন! সবাই আতঙ্কে থাকত তাকে নিয়ে। সবার সাথে কথার অনশন।
আমি ব্যক্তিগতভাবে আরেকজন লোক সম্পর্কে জানি। সে বিভিন্ন ভ্রমণে-বিনোদনে বের হলে একাই সবার খেদমত আঞ্জাম দেয়। বন্ধুরা সবাই তাঁবুতে থাকলে সে নিজেই বাজার থেকে গোশত, তরকারি, শাকসবজি নিয়ে আসে; আগুন জ্বালায়; সবার জন্যে খাবারের আয়োজন করে। একসাথে সবাই গল্পে মেতে থাকলে সে বন্ধুদের জন্যে আনন্দচিত্তে চা-কফি পরিবেশন করে। তাদের কারও কিছু প্রয়োজন হলে সে নিজেকে এগিয়ে দেয়। বন্ধুদের সেবায় নিজেকে পেশ করে।
কিন্তু নিজের বাড়িতে সে একজন অলস ব্যক্তি। পরিবারের ওপর সে শাসনের লাঠি ঘোরায়। অযথা তাদেরকে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত রাখে। এক গ্লাস পানিও নিজের হাতে ঢেলে পান করে না। বসার চেয়ার, ঘুমানোর কাঁথাটা পর্যন্ত তাকে এনে দিতে হয়। স্ত্রী-কন্যা সবাই যেন তার দাসী! যেন তারা তার কাজের বুয়া।
আরেক ব্যক্তিকে আমি চিনি। বন্ধুদের কাছে তার চেয়ে ভালো দ্বিতীয় কেউ নেই। তাদেরকে বিভিন্ন সময়ে হাদিয়া পাঠায়। উপহার-গিফট যেকোনো মুহূর্তে তাদের জন্যে প্রস্তুত থাকে। তাদের ছেড়ে নিজে একা কিছুই গ্রহণ করে না। অথচ এই লোকটি পরিবারের কাছে সুপরিচিত কৃপণ ব্যক্তি। পরিবারের সদস্যদের জন্য আবশ্যিক জিনিসপত্র এনে দিতেও তার কলজের পানি শুকিয়ে আসে।
এতক্ষণ কয়েকজন পরিচিত পুরুষের কথা বললাম। আমার পরিচিত ক'জন নারীর কথাও তাহলে বলে ফেলি।
আমি এমন কিছু নারীকেও চিনি। যাদেরকে অভ্যর্থনা বা আতিথেয়তায় রাখা হলে তাদের থেকে একটা শক্ত কথা, তীক্ষ্ণবাক্য কিছুই শোনা যাবে না। একটি মুহূর্তের জন্যেও তাদের মুখ হাসিমলিন হবে না। যে কোনো বদমেজাজি পুরুষও তাদের একটি হাসিতে সব ভুলে যাবে। তারা বাধ্য হয়ে বলবে, মাশাআল্লাহ! কী অপরূপ চাহনি! কত চমৎকার ব্যবহার! কেমন মধুময় কথাবার্তা!
কিন্তু যখনই ঐ নারীরা স্বামীর পাশে যায় তখন তাদের অবস্থা আর অবস্থায় থাকে না। স্বামীর পাশে এরা বড়ই পাষাণ। সব সময় মুখ মলিন করে রাখে; যেন আশি বছরের বৃদ্ধা! কথা বললে এমন বিরক্তি নিয়ে বলে, যেন ইংরেজদের লবণাক্ত পানি পান করেছে! তাকালে মনে হয় খেয়ে ফেলবে!
আমি দেখেছি যে, অধিকাংশ নারী যখন কোনো ট্যুরে বা বিনোদনে বের হয় অথবা বাড়িতে বান্ধবী বা আত্মীয়স্বজনের আগমন ঘটে, তখন তাদের একেকজন নববধূর সাজ নেয়। তখন তারা আগেভাগে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ সেরে ফেলে। সময় লাগিয়ে গোসল করে, চুলে শ্যাম্পু করে, সুন্দর সুন্দর জামা পরে, সুগন্ধি পারফিউমের বডি স্প্রে লাগায়, হাতে মেহেদি লাগায়, ক্রিম-আলতা-স্নো আরও কত কি ব্যবহার করে!
কিন্তু স্বামীর সামনে এরা থাকে এলোমেলো কেশে! তার সামনে আসে আধোয়া চেহারায়। স্বামীর কাছে এলে তাদের শরীর থেকে রসুন-পিঁয়াজের গন্ধ বেরুতে থাকে! মসলার গন্ধ থাকে গা জুড়ে।
অথচ স্ত্রীর ওপর স্বামীর হক সবচেয়ে বেশি। জ্ঞান-বুদ্ধি, দীন-ধর্ম সবকিছুই বলে যে, যদি সাজতে হয় তাহলে স্বামীর জন্যে সাজবে; অন্য মানুষের
জন্যে নয়। স্বামীর পাশে উত্তম কাপড়, সুগন্ধি লাগিয়ে, সুন্দর-সুন্দর বাক্যবিনিময়ে অবস্থান করবে। মৃদু হাসি, নম্র ব্যবহার সবকিছুই স্বামীর জন্যে জমিয়ে রাখবে।
একইভাবে যুক্তি ও নীতির দাবি হলো, স্বামীর কাছে নিজ পরিবারই সর্বাধিক সম্মান ও শ্রদ্ধার যোগ্য। তারাই সেবা ও হাদিয়া পাওয়ার উপযুক্ত। হাসি-কৌতুক, সহযোগিতা ও কল্যাণকামিতার সবচেয়ে বড় অংশ পরিবারের জন্যে বরাদ্দ রাখতে হবে। শুধুই অন্য মানুষের জন্যে নির্দিষ্ট হতে পারবে না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কিভাবে যে অবস্থার পরিবর্তন হলো! নিকটের লোক হলো অশ্রদ্ধার পাত্র! পক্ষান্তরে অপরিচিত হলো শ্রদ্ধার যোগ্য!
সম্মানিত পাঠক-পাঠিকা! এসবের মূল কারণগুলো আমি জানি।
এর মূল, প্রথম ও প্রধান কারণ হলো, কৃত্রিমতায় আমাদের সীমাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি। বাস্তব কথা হলো, আন্তরিকতা কৃত্রিমতাকে দূর করে দেয়। আর হাস্যকর কথা হচ্ছে, স্বামী-স্ত্রী নিজেদের ভেতরগত আচরণেও কৃত্রিমতার আশ্রয় নেয়।
তাই কৃত্রিমতা পরিহার করে স্বাভাবিক জীবন যাপন করা উচিৎ। একে অন্যের কাছে নিজের দোষ-গুণ সবই জানাতে পারে। প্রতিটি মানুষের একান্ত কিছু বিষয় আছে, যা সে অন্যের কাছে প্রকাশ করতে চায় না। এমনকি অতি নিকটজনের কাছেও না। আরবদের প্রবাদ হলো 'অধিক নৈকট্য, পর্দা অবিচ্ছেদ্য'।
তোমার চেহারাটা প্রিয়জনের সামনে রাখ। খুব কাছাকাছি হও; যেন তার ও তোমার মাঝে এক আঙুলের বেশি ফাঁকা না থাকে। তখন কিন্তু সে তোমাকে দেখতে পাবে না; বরং নাকের স্থানে দেখবে পাহাড়ের মতো কিছু একটা দাঁড়িয়ে আছে। অথবা সোজা করে তুমি দুটি রেখা টানো। এরপর সেখান থেকে সামান্য দূরে রেখাদুটির প্রতি দৃষ্টিপাত কর। দেখবে খুবই সোজা, কোনো বক্রতা নেই। কিন্তু যত কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করবে; (যদি পার অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে) তাহলে দেখতে পাবে, প্রতি বিন্দু পরপর সরল রেখাদুটো এদিক সেদিক বাঁকিয়ে আছে। একই অবস্থা মানুষের ক্ষেত্রেও।
আমার একজন খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। ত্রিশ বছর যাবৎ তার সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক। কোনোদিন আমি তার থেকে মন্দ কিছু দেখিনি। সব সময় আমার মতের অনুকূলে তাকে পেয়েছি। একবার তার সাথে কোথাও সফরে বের হলাম। জায়গা সীমিত থাকায় সফরের রাতে এক রুমে দু'জনের থাকতে
হলো। সেখানে তার খাওয়া-দাওয়া, অজু-নিদ্রা দেখে মনে হলো তার সাথে আমার নীতিগত অনেক বৈপরীত্য রয়েছে!
আশা করি এ আলোচনা থেকে স্বামী-স্ত্রী বেশ উপকৃত হবেন এবং যে সমস্ত যুবক-যুবতি এখনও বিয়ে করেনি, তারা বিয়েতে আগ্রহী হয়ে উঠবে।
📄 এক বেনামি যুবতির আর্তি
আজ হতে ত্রিশ বছর আগে। এক যুবতি তার মনের আকুতি মিশিয়ে আমার কাছে কয়েকটি প্রশ্ন করে। বেনামি ঐ তরুণীর প্রশ্নের জবাবে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম। প্রবন্ধটি লেখার কয়েকদিনের মধ্যেই 'মাআন্নাস' নামে একটি বই প্রকাশিত হয়। তাতে প্রবন্ধটি সংযুক্ত করে দিই। প্রবন্ধটিতে বিবাহ ও আমাদের নারী সমাজ বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। যখন প্রবন্ধটি লিখি তখন মধ্যপ্রাচ্যে নানা দিক হতে নারীদের অবস্থা ছিল সকরুণ। তাই বইটি সেখানকার অধিবাসীদের জন্যে বেশ উপকারী হবে বলে আশা করছি।
বেনামি ঐ যুবতির পক্ষ থেকে আমার নামে ডাকে একটি পত্র আসে। চিঠিতে লেখা তার কিছু শব্দ ও বাক্য তার গুণ ও মানকে ক্ষুণ্ণ করেছে। পত্রে তিনি কিছু বিষয়ে অভিযোগ তুলেছেন। আর কিছু বিষয়ের প্রশংসাও করেছেন। তার কথার কিছু অংশ পাঠকের সুবিধার্থে তুলে ধরছি-
দেখুন আরব্য রমণীদের সংকীর্ণ জীবন ধারণ। পক্ষান্তরে পাশ্চাত্য রমণীদের সচ্ছল জীবনোপকরণ। এই নারীর বন্দি জীবন আর ওই নারীর স্বাধীন ভুবন।
বেনামি যুবতির লেখা এই অংশটি পড়ে আমি থমকে যাই। শব্দগুলো আমাকে মহাতাড়নায় ফেলে দেয়। আমাকে দংশন করে বাক্যগুলো। আমি ভাবনার সাগরে হারিয়ে যাই। এক সময় আমার খেই ফিরে। আমি যুবতির চিঠির উত্তর দেয়ার সংকল্প করে ফেলি।
আমার মন বলতে থাকে যে, আরে! এই যুবতি তো ভুল ধারণায় আছে। তাকে সত্য ও সোনালি সুন্দরের পথ দেখানোর দায়িত্ব তো এখন আমার। আমি যদি তার ভুল ধারণা ভেঙ্গে না দিই তাহলে নিশ্চয় আমাকে আল্লাহ তায়ালার দরবারে জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে। তাই আমি মনস্থির করি। যাতে তার ভুলগুলো শুধরে দিতে পারি।
মূলত তার চিঠির জবাবই এই প্রবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়।
আমি ভাবতে থাকি যে, এই বেনামি যুবতির মতো আরও অনেকেই হয়তো এমন ধারণা পোষণ করে থাকে। তারা স্বীকার করতে চায় না যে, এসব হচ্ছে কেবলই ধারণা।
এই ধারণা ও মন্তব্যের সর্বসুন্দর, অর্থবহ ও সংক্ষিপ্ত জবাব সম্পর্কে আমি আমার প্রখ্যাত উস্তাদ শায়খ বাহযাতুল বায়তারের একটি জিজ্ঞাসার জবাবকে তুলে ধরতে চাই। তিনি আমেরিকা নিবাসী এক রমণীর জিজ্ঞাসার প্রতিউত্তরে কথা প্রসঙ্গে আমাকে জানিয়েছেন। তিনি আমেরিকার এক সভায় আলোচনা করতে গিয়ে মুসলিম নারী সম্পর্কে কথা বলছিলেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, অর্থসম্পদে নারীদের নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা রয়েছে। এখানে কারও হাত নেই। এমনকি স্বামী, বাবা কেউ তার সম্পদে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।
উপরন্তু মহিলা দরিদ্র হলে যাবতীয় খরচাপাতি ও ব্যয়ভার তারাই গ্রহণ করবে। যদি তার বাবা-ভাই কেউ না থাকে, তাহলে যারাই তার উত্তরাধিকারী হতে পারবে তারা তার দায়ভার কাঁধে তুলে নেবে; যদিও সে চাচাতো ভাই-ই হয়। এভাবে ঐ পর্যন্ত তার দায়িত্বভার অন্যের হাতে সোপর্দ থাকবে- যতক্ষণ পর্যন্ত তার বিয়ে না হবে অথবা সে নিজে অর্থসম্পদ উপার্জন করতে না পারবে। বিয়ে করলে স্বামী তার দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেবে; যদিও স্ত্রী কোটিপতি হয়ে থাকে।
এভাবে ইসলাম ধর্মে নারীর মর্যাদা অতি উচ্চে রাখা হয়েছে।
আমার শায়খের কথায় প্রসিদ্ধ সাহিত্যশালার এক নারী দাঁড়িয়ে বললেন যে, যদি আপনাদের কাছে নারী এতই মর্যাদার হয়, তাহলে আমাদেরকেও আপনাদের ওখানে ছয় মাস রাখুন। এরপর হত্যা করে ফেলুন!
আমার শায়খ তো ভদ্রমহিলার কথা শুনে খুব আশ্চর্য বোধ করলেন। তিনি দরদের সাথে জিজ্ঞানুনেত্রে তার অবস্থা জানতে চাইলেন।
জবাবে মহিলা সবিস্তারে নিজের অবস্থা এবং সন্তানদের দুর্গতির কথা তুলে ধরল।
আমেরিকান ঐ মহিলা বাহ্যত নিজেকে স্বাধীনা ও সম্মানিতা হিসেবে প্রকাশ করে। অথচ সে বন্দিনি ও অপমানিতা। কারণ আমেরিকার লোকেরা নারীদের আনন্দ-আয়োজনে স্বাধীনতা দিয়ে রাখে। সেখানে সম্মান দেখায়। কিন্তু জীবনের বৃহদাংশে তাদেরকে অবহেলা করা হয়।
📄 প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের তরুণী
জনাবা, আপনারা পুরুষের মিষ্টি কথায় কান দেবেন না। কারণ কোনো পরপুরুষই প্রকৃতভাবে আপনার কল্যাণ চায় না। তারা আপনাকে কয়েকদিন ভোগ করে পরে টিস্যু পেপারের মতো ছুঁড়ে ফেলে দিবে।
মনে রাখবেন যেই পুরুষ নারীদের উত্ত্যক্ত করে এবং নারীর জন্যে অসৎ উদ্দেশ্যে অর্থ অপচয় করে, আমাদের কাছে সে পাপাচারী হিসেবে বিবেচিত। কারণ, কোনো পুরুষ একজন নারীকে অনেক চেষ্টা-তদবিরের পরই লাভ করতে পারে। প্রাচ্যের নারীরা আচ্ছাদিত থাকে। গর্হিত কাজ কাজ থেকে নিজেদের বিরত রাখে। এ কারণে তারা সম্মানের পাত্রী; মানুষের কামনার বস্তু নয়। পক্ষান্তরে পাশ্চাত্যের নারীরা জনসম্মুখে নিজেদের উপস্থাপন করে থাকে। ফলে তাদেরকে লাঞ্ছিত হতে হয়। কেননা, জগতের যা কিছু খোলা চত্বরে প্রকাশ করা হয়, তার দাম কমে যায়। একইভাবে যেসব নারী খোলামেলা চলাফেরা করে আপনারাই তাদের সম্পর্কে নিজের বিবেককে ঠাণ্ডা মাথায় একটু খাটিয়ে দেখুন। আপনারাই ভেবে দেখুন তো আপনাদের কাছে কোন নারীর মূল্যায়ন বেশি! যারা নিজেকে ঢেকে রাখে তাদের, নাকি যারা উদোম চলে তাদের?
তবে হ্যাঁ, যাদের বিবেক লোপ পেয়েছে, যাদের ওপর পাশবিকতা ভর করেছে, রুচিবোধ যাদের কাছ থেকে বিদেয় নিয়েছে, যাদের রঙিন চশমা তামাম পৃথিবীটাকেই নোংরা ও উলঙ্গ দেখে তাদের কাছে তো উদোম দেহটাই ভালো ঠাওর হবে! যাদের মধ্যে মনুষ্যত্ববোধ নেই, যারা মানুষের কাতারে পড়ে না, তাদের ব্যাপার তো আলাদা হওয়াটাই স্বাভাবিক!