📘 লাভ ম্যারেজ > 📄 এই প্রেম সেই প্রেম

📄 এই প্রেম সেই প্রেম


মিসরেরর বিখ্যাত পত্রিকা 'আল আইয়াম'। যুগ-সমস্যার নির্ভুল সমাধানের কারণে ইতোমধ্যেই এটি ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এ কারণে আল আইয়াম'র কাছে পাঠকের প্রত্যাশাও ব্যাপক। আল আইয়ামও কাউকে নিরাশ করে না। সংশ্লিষ্ট দায়িত্ববানরা অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে সময়োপযোগী সকল প্রশ্নের জবাব দিয়ে থাকেন। এ পত্রিকাটির প্রধান কর্ণধার এক যুগশ্রেষ্ঠ গবেষক। যিনি ইতোমধ্যেই সাধারণ জনগণের আস্থার প্রাণপুরুষে পরিণত হয়েছেন। তিনি শায়খ ড. আলী তানতাবী রহ.। তিনি আজ জীবিত নেই। কিন্তু তার সৃষ্টিকর্ম তাবৎ দুনিয়ার পথপ্রদর্শক হিসেবে আজো সমানভাবে সমাদৃত。
তার নিজের ভাষায়ই শুনুন-
আল আইয়াম কার্যালয়ে প্রতিদিন এমনসব ফতোয়া, জিজ্ঞাসা আর প্রশ্ন আসে যার দরুন ঝিমিয়ে পড়া মস্তিষ্ক সচকিত হয়ে ওঠে। অবসাদগ্রস্ত মেধা হয়ে ওঠে চঞ্চল। পাঠকের পক্ষ হতে আগত প্রশ্নগুলো লেখককে বাধ্য করে চিন্তা সক্রিয় করতে। বাধ্য করে কলম সঞ্চালন করতে। কারণ পাঠকের ভাবনার ফলাফল ও কলমের ফসলই যে ঝিমিয়ে পড়া জাতির প্রাণ!
প্রতিদিনের ধারাবাহিকতায় আমার হাতে যে প্রশ্নগুলো আসে সেগুলো আমি দেখার জন্য উদগ্রীব থাকি। আজো তার ব্যতিক্রম হলো না। হ্যাঁ, আমার অপেক্ষার অবসান ঘটল। আমার হাতে এলো একরাশ প্রশ্নের ডালি। প্রতিদিন আমি হাভাতের মতোই প্রশ্নগুলো গিলতে চেষ্টা করি। আজো তাই। হাতের নাগালে আজ যে প্রশ্নগুলো এসেছে তার মধ্যে প্রথমটি বিয়ে সংক্রান্ত。
প্রথম প্রশ্নটি হলো, বিবাহ কি শুধু প্রেমের ওপর নির্ভর করে সংঘটিত হওয়া সম্ভব? একই চিরকুটে লেখা দ্বিতীয় বিষয়টি ছিল, বিয়ের বয়স-সংক্রান্ত। দ্বিতীয় সেই প্রশ্নটি হলো, পুরুষের জন্য কখন বিয়ে করা উত্তম?
প্রশ্ন দুটি হাতে পেতেই আমার মনের মাঝে উত্তর উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিল। আমি উত্তরের মহাসমুদ্রে তলিয়ে যেতে থাকি। হাতড়াতে থাকি অতলান্ত। সিন্ধু সেচে মুক্তা আনার মতো আমার মনের রাডারে ধরা দেয় বেশ কিছু উত্তর। কিছু জবাব ছিল বেশ আশ্চর্যরকম。
ব্যক্তিগতভাবে আমি 'যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চল' নীতিতে বিশ্বাস করি না। একাকী জীবনকে আমি মনেপ্রাণে ঘৃণা করি। তবে হ্যাঁ, একাকিত্ব দূর করতে কারো সাথে তর্ক করা কিংবা তার মুখের ওপর উত্তর দেওয়াও আমি একদম পছন্দ করি না। যে মত আমি পোষণ করি, সে মতই কেবল ব্যক্ত করি। কেউ আমার ওপর নির্ভর করলে কিংবা আমার মতের অনুসরণ করলে তো ভালোই। পক্ষান্তরে কেউ আমার বিরোধিতা করলে, আমাকে না মানলে তার ব্যাপারে আমি জিজ্ঞাস্য নই। কারণ আমি তো তার বাধ্যতামূলক অভিভাবক নই যে, আমার কথা তাকে শুনতেই হবে!
এবার আমার উত্তর দেয়ার পালা। মনের হাঁড়িতে যেই উত্তরটি রান্না হচ্ছিল সেটিই উগড়ে দেয়ার নিরন্তরতা আমাকে কুঁড়ে খাচ্ছিল। তবে হ্যাঁ, প্রথম প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে আমি বুঝতে চাই যে, কোন প্রেম সম্পর্কে তোমরা জানতে চাচ্ছ?
মনে রেখ যে, আল্লাহ মানুষকে দুটি সহজাত বাসনা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। একটি হলো, নিজেকে টিকিয়ে রাখার বাসনা। আরেকটি হলো, স্বজাতিকে টিকিয়ে রাখার বাসনা।
প্রথম বাসনাটির দরুন ক্ষুধার তাড়না খাবার অনুসন্ধানে বাধ্য করে। যেন তৃপ্তি সহকারে আহারের মাধ্যমে নিজের মৃত্যু ঠেকাতে পারে।
দ্বিতীয় বাসনাটির দরুন কামনার দহন তাকে নারীর সান্নিধ্যে টেনে নিয়ে যায়। যেন বংশ বিস্তারের মাধ্যমে আপন প্রজাতির নির্মূল রোধ করতে পারে।
এবার তোমাদেরকে ভাবনার একটি ছোট্ট গলিতে নিয়ে যেতে চাই। সেটি হলো, ভেবে দেখ তো- কখনও তোমার জীবনে এমন হয়ে থাকবে যে, রেস্তোরাঁয় গিয়েছ। তোমার সামনে খাবার হাজির। পকেটে পয়সা-কড়িও আছে। ব্যাস! অর্ডার দিতেই খাবার হাজির হয়ে যাবে তোমার সামনে। এর বিনিময়ও অবশ্য আছে তোমার কাছে। তোমার সাধ্যের মধ্যে যত অর্ডার কর সবই তোমার জন্য বৈধ। এর কল্পনা করতে গিয়ে কিন্তু কখনও কেউ মাথা খাটাও না। এর জন্য অপেক্ষা করে কেউ নিজের দেহ-মন ক্লান্তও কর না।
আবার কখনও এমন হয় যে, পেটে ক্ষুধা আছে বটে; কিন্তু সময়মতো খাবার থাকে না। এ সময় যতই ক্ষুধার তিক্ততা ভোগ কর ততই তোমার কল্পনায় খাবারের স্বাদ বাড়তে থাকে। এ প্রসঙ্গে মনোবিজ্ঞানীরা বলে থাকেন যে, এভাবে দীর্ঘ সময় গেলে এ কল্পনা স্থায়ী হয়ে যায়। তখন তোমার কল্পনা তাতেই নিমজ্জিত হয়ে পড়বে। তোমার ঝোঁক থাকবে শুধু সে দিকেই। এই ঝোঁক সেদিক থেকে ফিরিয়ে আনা মহামুশকিল হয়ে দাঁড়ায়।
এবার শোন, যখন দেহে যৌনক্ষুধা থাকে আর বিপরীতলিঙ্গ থাকে অনুপস্থিত, তখন তা নিয়ে তোমার কল্পনা খাবার নিয়ে ক্ষুধার্তের কল্পনারই মতোই। এ জিনিসটিকেই আমরা বলি ভালোবাসা।
ক্ষুধার্ত ব্যক্তি যখন খাবার খোঁজে, তখন খাবারের রং আর ধরন নিয়ে ভাবে না। যৌনক্ষুধাটাও তেমন! এ ক্ষুধা পেয়ে বসলে ধনী-গরিব, কাঙাল-অনাথ, কালো-ধলা, জাত-মানের বাঁধ মানে না।
যৌনক্ষুধায় আক্রান্ত ব্যক্তির আগ্রহ কখনো নির্দিষ্ট কোনো নারীর ওপর স্থির হয়ে গেলে সারা পৃথিবী তখন সেই নারীর মাঝে সীমিত হয়ে যায়। সে তাকে দেখতে চায়, কথা বলতে চায়। সে কি নারীটিকে দেখে তৃপ্ত হয়? তোমার কি মনে হয়, সে কথা বলে তুষ্ট হবে?
না! সে তাকে ভোগ করার আগ পর্যন্ত তুষ্ট হতে পারে না। কারণ সে তো ক্ষুধার্তের মতোই। ক্ষুধার্ত ব্যক্তির পক্ষে কি খাবার দেখলে, খাবারের ঘ্রাণ নিলে, খাবার নিয়ে কবিতা আর ছন্দ গাঁথলে যথেষ্ট হয়? তাতে কি তার পেটের ক্ষুধা নিবারণ হয়?
হে আমার প্রাণস্পন্দন ছেলেরা! আল্লাহর শপথ, কখনোই না। সে শুধু সৌন্দর্য চায় না। সে কান আন্দোলিত করা কথা চায় না। সে তার চাবির জন্য চায় তালা। এ হলো আপন প্রজাতির প্রতি সহজাত বাসনা। এ বাসনা বংশ বিস্তার ছাড়া তৃপ্ত হয় না।
মনে রাখবে, প্রেম শুধু যৌন সম্পর্কের আগ্রহেরই নাম। কবিরা যতই প্রেমকে সুসজ্জিত ও অলংকৃত করে উপস্থাপন করুক- ভদ্র ও নিষ্কাম প্রেম হলো ফালতু কথা। এর সমাদর শুধু পাগল আর যুবকদের কাছে। যুবকরা তাদের মনের আবেগের লাগামটিকে টেনে ধরতে পারে না।
এটাই বাস্তবতা যে, কেউ অস্বীকার করলে প্রতিউত্তর সে নিজের কাছেই পেয়ে যাবে। এর বাস্তবতার সব প্রমাণ তাদের মনের গহীনেই লুকিয়ে আছে। অস্বীকার করার কোনো পথ নেই। এরপরও কি শুধু প্রেম বিবাহের ভিত্তি হতে পারে? না, পারে না।
মূলত প্রেম হলো মন-সংশ্লিষ্ট ক্ষুধার নাম। পেট যখন ক্ষুধায় চোঁ চোঁ করে, তখন ক্ষুধার্ত ব্যক্তি কি খাবার ভালো-মন্দের বাছ-বিচার করতে পারে? ক্ষুধা কি তার সামনে গুটিবসন্তে আক্রান্তকে সুসজ্জিত করে তোলে না? ফলে গুটিবসন্তে আক্রান্তের মাঝেই খাসা বকরির স্বাদ খুঁজে পায়। যখন ক্ষুধার তাড়না শেষে ফিরে আসে গুটিবসন্ত হয়ে; তখন সুস্পষ্ট হয়ে ধরা দেয় যে, সে তো ছিল ক্ষুধার কল্পনায় সৃষ্ট খাসা বকরি! তখন তার ভুল ভাঙ্গে। কিন্তু তখন ভুল তার কূল ফিরিয়ে দিতে পারে না।
প্রেমিকার বিষয়টিও এমনই। প্রেমের দরুন প্রেয়সীকে নিয়ে প্রেমিক গড়ে তোলে এক রঙিন পৃথিবী। সে গড়ে তোলে এক স্বপ্নের স্বর্গরাজ্য। সেই রাজ্যে বিচরণ করেই সে আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে যায়। শাদা বলাকার মতো উড়াউড়ি করে তার স্বপ্নগুলো। কল্পনার সোনালি গায়ে সে চড়ায় ঝলমলে পোশাক। ফলে প্রেয়সীকে দেখে সবচেয়ে সুন্দর মানবীরূপে।
কিন্তু হায়! প্রলুব্ধ করা সেই পোশাকাবৃতা প্রেয়সীকে বিয়ে করার পর একপর্যায়ে পোশাকটি যখন খুলে যায়, তখন আর বিবাহ বন্ধন থাকে না। কারণ, সে তো মেয়েটিকে বিয়ে করেনি; বিয়ে করেছে পোশাকটিকে। বিয়ে করেছে তার কল্পনা যে পোশাকটি মেয়ের গায়ে পরিয়েছিল তাকে।
বস্তুত যুবক-যুবতির প্রেম হলো, যৌনমিলনের আকাঙ্ক্ষা। এ আকাঙ্ক্ষা শেষ হলে তাদের প্রেমও শেষ হয়ে যায়। তখন প্রেমপাগল মজনুর হুঁশ ফিরে আসে। লায়লা তখন তার চোখে অন্য সাধারণ নারীর মতোই ধরা দেয়। পেট ভরে গেলে ক্ষুধার্ত ব্যক্তির খাবারের প্রতি যেমন কোনো আগ্রহ থাকে না তখন মেয়েটির প্রতিও আর কোনো আগ্রহ থাকে না।
প্রেম এক সাময়িক বন্ধন। যা প্রথম স্পর্শেই ছিন্ন হয়ে যায়। স্পর্শ বলে কী বোঝাচ্ছি আশা করি বুঝতে পেরেছ!
মনে রাখবে, বিবাহ হলো স্থায়ী সম্পর্ক। এর জন্য প্রয়োজন স্থায়ী বন্ধনের। যা স্পর্শের চেয়ে শক্ত ও দৃঢ়। দিন দিন তা আরও সুদৃঢ় ও মজবুত হবে। হবে প্রাচীরের ন্যায় মজবুত।
আমি বিভিন্ন দেশের সাহিত্য গভীরভাবে অধ্যয়ন করতে চেষ্টা করেছি। আমি প্রেমনির্ভর বিবাহ বিষয়ে বড় বড় সাহিত্যিকের অসংখ্য গল্প পড়েছি। এর সবগুলোর পরিণতি শুনলে হয়তো তোমরা আশ্চর্য হবে।
তোমাদের চোখ তো রঙের ফানুস! তাই আমার অভিজ্ঞতার কথাগুলো বিশ্বাস করবে কিনা, তা নিয়ে আমি সন্দিহান। সত্যি কথা হলো, এসব বিবাহের পরিণতি হলো বিবাদ ও বিচ্ছেদ।
তোমরা ওয়ার্দার, রাফায়েল, মাজদুলানী, বোল, ফারজিনী, ক্রাজিলা, জোসলান ও ভাঙ্গা ডানাদের বিরহ বেদনায় প্রতারিত হয়ো না। এসবই দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষিত আলোচনার একটি আগ্রহচিত্র। এসবের নায়করা যদি প্রেয়সীকে শুধু প্রেমের কারণে বিয়ে করত, তাহলে গল্পের সমাপ্তি ঘটত; তালাক দিয়ে শেষ করতে হতো না।
আমি বিশ্বাস করি যে, বিয়ের ভিত্তি শুধু প্রেমের ওপর হতে পারে না। কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে- اللهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلٌ ০
আল্লাহ সবকিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সবকিছুর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। (যুমার: ৬২) অতএব মানুষ ইচ্ছে করলেই সব কিছু পেতে পারে না। মানুষ তার হাত দিয়ে আকাশ ছুঁতে চায়। কিন্তু পারে কি? তবে হ্যাঁ, হতেও পারে। যদি বিশাল প্রাসাদের ভিত্তি স্থাপন করা যায় পানির প্রবাহে লবণের ওপর, তবেই সম্ভব বিবাহের ভিত্তি প্রেমের ওপর। কিন্তু তা সম্ভব নয়। আর এ কারণেই প্রেমনির্ভর বিবাহ সুখময় হওয়াও অসম্ভব।
বিবাহের ভিত্তি হলো, ভাবনা ও আচরণের মিলনের ওপর। বিবাহের ভিত্তি গড়ে ওঠে সামাজিক নিয়ম ও আর্থিক অবস্থার ওপর। এসবের পরে আসে আবেগ। বর কনে দেখবে, কনে বর দেখবে। অর্থাৎ মেয়ের অভিভাবক বা মুহাররামের উপস্থিতিতে ছেলে শুধু মেয়ের চেহারা আর হাত দেখবে। তালগোল পাকিয়ে ফেলা কথিত শায়খ বাকুরীর ফতোয়ার মতো নয়। মনে রাখবে যে, আল্লাহ মহান। তিনি আসমান ও জমিনের মালিক। কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে- لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ
তাঁর মর্যাদা হলো সমগ্র সৃষ্টি তাঁর দাসত্বে নিয়োজিত। সবাই তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। সবই তাঁর আয়ত্তাধীন এবং সব কিছুর ওপর তাঁর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত।
তাই যুবক-যুবতির মাঝে পারস্পরিক আকর্ষণ সৃষ্টির মালিকও তিনি। এরপর যদি আল্লাহ তায়ালা তাদের অন্তরে একে অপরের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করে দেন, তাহলে বিবাহের সঙ্গে সঙ্গে এ আকর্ষণ পরিণত হয় স্থির ও স্থায়ী ভালোবাসায়। আর যদি তাদের মাঝে অনাগ্রহ ও অনিচ্ছা জন্ম নেয়, তাহলে আল্লাহ তায়ালা একজনের কাছে আরেকজনের প্রয়োজন আর রাখবেন না। এই আকর্ষণকে আল্লাহ তায়ালাই মনোরম করে দেন। এতে বইতে থাকে
প্রশান্তির আবে হায়াত। এ আবে হায়াতে অবগাহন করে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে গড়ে ওঠে অনাবিল, অনিন্দ্য ও নির্মল প্রশান্তি।

📘 লাভ ম্যারেজ > 📄 আসল প্রেম নকল ভালোবাসা

📄 আসল প্রেম নকল ভালোবাসা


সমস্যা ও তা থেকে উত্তরণ নিয়েই মানুষের জীবন। জীবনে কখনো সমস্যায় পড়েনি- এমন মানুষের সংখ্যা পাওয়া খুবই মুশকিল। এমনকি পৃথিবীতে যত নবী-রাসূল এসেছেন, তারা প্রত্যেকেই তাদের জীবনে কোনো না কোনো সমস্যায় পতিত হয়েছেন। তাই বলা যায়, সমস্যা মানবজীবনের অন্যতম অনুসঙ্গ। তবে হ্যাঁ, সমস্যার ধরন ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। কিছু সমস্যা থেকে সহজেই উত্তরণ ঘটানো সম্ভব। আবার কিছু সমস্যার সমাধান জটিল ও দুরূহ।
বর্তমান সমাজের অন্যতম জটিল ও মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে বৈবাহিক সম্বন্ধ। উম্মাহর বাস্তব ও সামাজিক জীবনে এর জটিলতা প্রকটভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। চলমান এই জটিলতাকে এক কথায় বলা যায়- আমাদের আদুরে কন্যাদের বিয়ের বয়স হওয়ার পরও প্রস্তাব আসে না! রক্ষণশীল যুবকরা তাদের উপযোগী মেয়েদের খুঁজে পায় না! কিংবা তারা বিয়েই করতে চায় না!!
এই জটিলতার আকার ও ব্যাপ্তি একেকটি ভিন্ন ধরনের। আপনারা এই জটিলতার আকার ও ব্যাপ্তি একটু অনুভব করার চেষ্টা করুন। কিভাবে অনুভব করবেন তাও আমি বলে দিচ্ছি। তাহলো একটি কলম আর একটি খাতা নিন। এরপর মাথাটাকে একটু ঘুরান। মনে চাইলে চোখ বুজে ভাবতে থাকুন। যেসব পরিবারে অবিবাহিত কন্যারা রয়েছে এবং যেসব ঘরে অবিবাহিত যুবকরা রয়েছে, তাদের নামের তালিকা করুন। তাহলে দেখতে পাবেন আপনাদের পরিচিতদের মধ্য হতেই দশটি কন্যা ও দশটি যুবক বেরিয়ে আসবে।
পবিত্র কুরআনে সকল প্রকার অন্যায় কাজ হতে বিরত থাকতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে-
وَذَرُوا ظَاهِرَ الْإِثْمِ وَباطِنَهُ إِنَّ الَّذِينَ يَكْسِبُونَ الْإِثْمَ ...
তোমরা প্রকাশ্য গুনাহ থেকেও বেঁচে থাক, গোপন গুনাহ থেকেও বেঁচে থাক; নিঃসন্দেহে যারা কোনো গুনাহের কাজ করবে, তাদের কৃতকর্মের যথাযথ ফল তাদের প্রদান করা হবে। [আনআম : ১২০]
আমার আজকের আলোচনার বিষয় তিনটি। এই জটিলতার কারণ, ফলাফল নির্ধারণ ও এ থেকে উত্তরণের পথনির্দেশনা প্রদান।
বৈবাহিক জটিলতার ফলাফল খুবই মারাত্মক। এই নৈতিক বিপর্যয়ের অভিযোগ প্রাচ্যের ইসলামি দেশগুলোতে বসবাসরত প্রায় সব জনগণই করে থাকে। আমি স্পষ্টভাবে এ সম্পর্কে কিছু বলতে পারব না। কারণ। সরাসরি কারও সাথে এ নিয়ে কথা বলতে পারছি না।
আমার সামনে এ ধরনের কোনো লোকের উপস্থিতিও নেই। তাই তাদের রুচি, চেতনা, মানসিকতা ও মননশীলতা বোঝার উপায়ও নেই।
আমি রেডিও সেন্টারে বসে কথা বলছি। এখান থেকে বিভিন্ন প্রান্তে ইথারে ছড়িয়ে যাবে আমার কথা। কিন্তু আমার জানা নেই যে, কারা আমার কথা শুনছেন। হয়তো শ্রোতাদের মধ্যে যুবক ও যুবতি রয়েছে। হয়তো এমনও অনেকে রয়েছেন, যারা এ জাতীয় আলোচনা সরাসরি শুনতে অপছন্দ করেন।
এ কারণে শুধু এ কথা বলেই ক্ষান্ত হচ্ছি যে, আল্লাহ তায়ালা যা কিছু হারাম করেছেন, তার বিপরীতে আরেকটি বস্তু হালাল করেছেন। যেমন সুদ হারাম করেছেন পক্ষান্তরে ব্যবসায় হালাল করেছেন; যেনা হারাম করেছেন পক্ষান্তরে বিবাহকে করেছেন হালাল। সুতরাং যে ব্যক্তি নকল তথা হারাম প্রেম পরিহার করে আসল প্রেম তথা হালাল পথ বর্জন করবে তার জন্যে কার্যসিদ্ধি ও প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের হারাম পথটিই শয়তান খুলে দেয়।
বৈবাহিক সম্বন্ধের স্বল্পতার কারণে অবশ্যম্ভাবীরূপে যে ফল বেরিয়ে আসে, তা হলো বিপর্যয় ও বিশৃঙ্খলার আধিক্য। এই নৈতিক অধঃপতন থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো বিয়ে-প্রথার সহজায়ন। কিন্তু আমরা বৈবাহিকব্যবস্থাকে মারাত্মক জটিল করে থাকি। ফলে এর ইতিবাচক ফলাফল আমাদের হাতে ধরা দেয় না। আমরা আসল প্রেমের সাথে নকল ভালোবাসাকে গুলিয়ে ফেলি। ফলে কোনটি আসল আর কোনটি নকল ফানুস তার পার্থক্য করাই হয়ে পড়ে দুরূহ।

📘 লাভ ম্যারেজ > 📄 আই লাভ ইউ

📄 আই লাভ ইউ


দু'দিন আগের ঘটনা। আমাদের এক আত্মীয় যুবক আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল। দেখতে বেশ তাগড়া। তার দৈহিক গঠন ভালো। সুস্বাস্থ্যবান। নৈতিক চরিত্রের দিক থেকেও পিছিয়ে নেই। বয়স ত্রিশের কোটা ছুঁইছুঁই। তবে বেচারা এখনও বিয়ে করেননি।
কথা প্রসঙ্গে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আরে! তুমি বিয়ে করছ না কেন?
জবাবে সে যা বলল তাতে আমার টাসকি খাওয়ার মতো অবস্থা। সে জানাল যে, বিয়ের ব্যাপারে আমি আমার পরিচিতজনের অনেকের সাথেই আলাপ করেছি। ব্যাপারটি নিয়ে পরিচিত ছেলে-মেয়ে, বন্ধু-বান্ধব যার সাথেই কথা বলেছি, তারা সবাই আমাকে বৈবাহিক জীবনে অশান্তি, কলহ, ঝগড়া-বিবাদ, বউ-শাশুড়ির অমিল ইত্যাদির শত অভিযোগ শুনিয়েছে। শুধু তাই নয়, তারা নিজেদের সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে মতামত ব্যক্ত করেছে যে, বিয়ে না করাই ভালো ছিল। আমি তাদের কথায় বুঝলাম যে, এ যুগে বিয়ে করার অর্থ মাথাব্যথা ও হৃদরোগ সৃষ্টি করা ছাড়া আর কিছুই না। অতএব আমি নিজের কষ্টার্জিত অর্থে মনোবেদনা ও জীবনযন্ত্রণা কিনতে চাই না।
আমি আমার সেই আত্মীয় যুবককে বললাম, আরে! তোমার যে বন্ধুদের কাছে জিজ্ঞেস করেছ, তারা অবশ্যই মানুষ হবে নিশ্চয়?
জবাবে সে বলল, আরে! মানুষ না হলে কি আর নিজেদের দাম্পত্যজীবনের কষ্টটা বুঝতে পেরেছে?
আমি তাকে বললাম, তারা কষ্ট ও ব্যথায় আছে বলে সবারই কি একই দশা হবে?
জবাবে আমার আত্মীয় কাচুমাচু করতে লাগল।
আমি সুযোগ বুঝে তাকে বললাম, আচ্ছা! তুমি তাদের জিজ্ঞেস করলে! অথচ আমার কাছে জিজ্ঞেস করলে না কেন? যে ব্যক্তি পাঁচ-দশটি মজলিসে হাজির হয়ে বৈবাহিক বিবাদ মীমাংসা করে, এ সম্পর্কে অবশ্যই তার জ্ঞান মন্দ হওয়ার কথা নয়। তাই কাচারি এক জায়গায় রেখে অন্যত্র গিয়ে কান ডললে কি সমস্যার সমাধান হবে? বরং এটাতো অরণ্যে রোদন বৈ অন্য কিছু নয়!
আমার কথায় আমার আত্মীয়ের আত্মসম্মানে হালকা আঘাত লাগল। ব্যাপারটি আমি আঁচও করলাম।
আমি তাকে বললাম, শোন! আমি কোর্টে ত্রিশ হাজারেরও অধিক দম্পতির সমস্যার সমাধান করেছি। সেখানে স্বামী-স্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক কথাবার্তা শুনেছি। বহু লাভ ম্যারেজ সমস্যার সমাধান করেছি। তাছাড়া আমি ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে বিভিন্ন সমস্যা নিরসনে নিয়োজিত এক ব্যক্তি। একটা সময় এসব নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম। তখন লেখালেখিতে প্রবেশ করিনি। সে সময়ে বিধবাদের জন্যে প্রশিক্ষণশালা খুলেছিলাম। তাই আমার অভিজ্ঞতার ঝুলি।
একেবারে ঠুটো নয়। আশা করি আমার সম্পর্কে তোমারও তো কম-বেশ জানা আছে। তা সত্ত্বেও তুমি আমার সাথে পরামর্শ করলে না কেন?
জবাবে ত্রিশের কোটায় করাঘাতকারী যুবক বলল, আচ্ছা! আপনি কি দেখেন না, অধিকাংশ দম্পতির জীবনে সব সময় অশান্তি লেগে থাকে?
আমি তাকে বললাম যে, আমি তোমাকে প্রথমে দম্পতি-বিবাদের মূল রহস্য বোঝানোর চেষ্টা করব। বিবাদের কী অর্থ তাও বোঝা দরকার। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক মতানৈক্যকে বিবাদ বলা যাবে না। কারণ এটা সম্ভব নয় যে, জীবনের প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত শুধু আনন্দ করবে। লাইলি-মজনুর মতো প্রতিদিন প্রেমালাপ করাও সম্ভব নয়।
'তাহলে আর কি!'- যুবক জানতে চাইল।
জবাবে আমি বললাম, শোন! ভালোবাসার মিলন মানেই কি কেবল সে তোমাকে বলবে- 'আই লাভ ইউ!' তথা 'আমি তোমাকে ভালোবাসি'! আর তুমি তাকে বলবে- 'আই লাভ ইউ টু! তথা তোমাকেও আমি ভালোবাসি'? এভাবে যখন একই শব্দ বারবার বিনিময় হতে থাকবে? তখন তো এ শব্দের আর কোনো অর্থই থাকবে না। মনে রাখবে বর্তমান পৃথিবীর বহুল ব্যবহৃত শব্দ হলো এই 'আই লাভ ইউ'। কিন্তু ব্যবহারের আধিক্যে এটি এখন সবচেয়ে বেশি হওয়ায় এটি এখন মুখের বুলিতে পরিণত হয়েছে। এটি এখন কথার কথা। এখন যে শিশুটির মুখে কথা ফুটতে শুরু করে, সেও তার বড়দের মুখে শুনে 'আই লাভ ইউ' বলতে থাকে। আচ্ছা, দুই বছরের এই শিশুটি আই লাভ ইউ'র কী বোঝে?
মূলত ছোট বাচ্চারা এমনই ভাবে। যদি এই শব্দগুলোর মাঝেই লাইলি-মজনুর দাম্পত্য সীমাবদ্ধ থাকত তাহলে বিয়ের দ্বিতীয় মাসের শুরুতেই তাদের বাদানুবাদ লেগে যেত। তৃতীয় মাসে পাড়া-প্রতিবেশী সবাই শুনতে পেত। আর বছরের শেষ প্রান্তে এসে শরয়ী আদালতে বিচ্ছিন্নতার দাবি উঠত। তাহলে জগতের কোথাও এমন শূন্যসার বৈবাহিক জীবন সম্ভবপর হতো না। কেবল গল্প-উপন্যাসেই স্থান পেত।
যুবকটি বুঝতে শুরু করল। সে বলল, ব্যাপারটি তো এভাবে ভাবিনি!
আমি তাকে বলতে লাগলাম, স্বামী-স্ত্রী মাঝে-মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধ করতে পারে। একজন আলেমের পরিবারেও এ ধরনের বিবাদ হয়ে থাকে। এমনকি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘরেও এ জাতীয় মতভিন্নতা হতো। অথচ তাঁর পরিবার ছিল জগতের শ্রেষ্ঠ পরিবার।
যুবকটি যেন আমার কথাগুলোকে গো-গ্রাসে গিলতে লাগল।
আমিও সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে কসুর করিনি। আমি তাকে বললাম, আমার কথা বিশ্বাস না হলে সূরা তাহরীম পড়ে দেখুন। সাহাবায়ে কিরাম (রা.) তাঁদের স্ত্রীদের বিরুদ্ধে নবীজীর দরবারে অভিযোগ দায়ের করতেন।
'ব্যাপারটি একটু খুলে বলুন তো!'- যুবক আব্দার জানাল।
আমি উদাহরণ দিয়ে বললাম, এক ব্যক্তি হযরত ওমর (রা)-এর কাছে স্বীয় স্ত্রীর ব্যাপারে نালিশ নিয়ে হাজির হলেন। যখন তিনি দরজায় করাঘাত করলেন, তখন ঘরের ভেতর হযরত ওমরের স্ত্রীর উচ্চ আওয়াজ শুনতে পেলেন। আগন্তুক ব্যক্তি লক্ষ করলেন যে, হযরত ওমর নীরব আছেন। অথচ নেতৃস্থানীয় লোকেরা পর্যন্ত তাঁর নাম শুনে কেঁপে উঠত!
এরই মধ্যে লোকটি চলে যাচ্ছিল।
হযরত ওমর (রা) ঘর হতে বেরিয়ে এলেন। তিনি তাকে ডাক দিলেন। লোকটি ফিরে এসে জানাল যে, আমীরুল মুমিনীন! আমি আমার স্ত্রীর অসদাচরণের অভিযোগ করতে এসেছিলাম। কিন্তু এখন দেখি আপনিও আমার মতো ভুক্তভোগী!
জবাবে হযরত ওমর হেসে দিয়ে বললেন, এসব সহ্য করে নিতে হয়। কারণ আমার ওপর তারও অধিকার রয়েছে!
মনে রাখবেন, আল্লাহ তায়ালা একই আকৃতি দিয়ে দুটি মানুষকে সৃষ্টি করেননি। এমনকি যমজদেরও না। কখনও কখনও তাদেরকে একই রকম মনে হলেও তাদের মাঝে সূক্ষ্ম পার্থক্য বিদ্যমান থাকে। ঠিক তেমনি একই স্বভাব-চরিত্র দিয়েও মহান আল্লাহ কাউকে সৃষ্টি করেননি।
কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে-
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ ۗ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا
আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো নির্দেশ দিলে কোনো মুমিন পুরুষ ও নারীর জন্য নিজদের ব্যাপারে অন্য কিছু এখতিয়ার করার অধিকার থাকে না। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করল সে স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে। [সূরা আল-আহযাব: ৩৬]
যদি দু’জন বন্ধু, পার্টনার, শরিকদার, ব্যবসায়ী বা স্বামী-স্ত্রী চায় যে, তাদের মাঝে বিরোধ না হোক; তাহলে একজনকে অবশ্যই অন্যের মত মেনে নিজের ভেতর বিরোধিতা করতে হবে।
আপনি যদি রাস্তার ডান পাশে থাকেন আর আপনার বন্ধু থাকে বাম পাশে এবং দু’জনে মোসাফাহা করতে চান, তাহলে একজনকে রাস্তা পার হয়ে আসতে হবে। নতুবা হয় দু’জনেই দু’পাশ থেকে এগিয়ে এসে মাঝ রাস্তায় মিলিত হতে হবে।
মনে রাখবেন, প্রতিটি অংশীদারি কাজে একজন কর্তা থাকা জরুরি। বৈবাহিক জীবনে অবশ্যই কর্তা হবেন স্বামী। তাই যেকোনো ব্যাপারে তার মতের অগ্রাধিকার থাকবে। ছোটখাটো বিষয় হলে আলাদা কথা।
অন্য দিকে ঘর গোছানো, খাবার আয়োজন করা ইত্যাদি কাজে অবশ্যই স্ত্রীর মতামত অগ্রগণ্য থাকবে। কারণ, এটি তার অধিকার। সে অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর মতো তারও সাধারণ ও ব্যাপক অধিকার রয়েছে। এখন যদি স্ত্রী অপরিচিত হয়, ঘর-দুয়ার পরিষ্কার করে না রাখে অথবা ভালো রাঁধাবাড়া করতে না পারে তাহলে স্বামী এ ব্যাপারে তাকে সতর্ক করবে।
অনেক লোক আছে, যারা ঘরের সৌন্দর্য, মেঝের চাকচিক্য ও বারান্দার পরিচ্ছন্নতার প্রতি কোনো খেয়াল করে না। তারা চায়, স্ত্রী কেবল তাদের জীবনসঙ্গিনী হয়ে থাকবে। তাদের মতের অনুকূলে মত প্রকাশ করবে। যেখানে নিয়ে যাবে সেখানে যেতে প্রস্তুত থাকবে।
কিছু কিছু মহিলাও এমন আছে, যারা নোংরা জীবন যাপন করে। এখানে ওখানে জামাকাপড় পড়ে থাকে! বিছানাটা থাকে এলোমেলো! চেয়ারটা থাকে উপুড়ানো! রাতের থালাবাসন সকালেও ধোয়া হয় না! স্বামী কিছু বললেই চিঙ্গিয়ে উঠে বয়ান ছেড়ে দেয় যে, সেই সকাল থেকে কাজ করছি, কিছু দেখছ না! আবার সাজানো-গোছানো খাটে বসলেও চিৎকার মেরে বলে, ‘এইমাত্র ভাজ করলাম আর তুমি ওখানে বসে পড়লে!’
মূলত প্রকৃত জ্ঞানবান নারী সে, যে সবসময় স্বামীর সন্তুষ্টি তালাশে মগ্ন থাকে। কী করলে স্বামী খুশি হবেন, তা নিয়ে ভাবতে থাকে।
ঠিক পুরুষেরও উচিত স্ত্রীর মনোরঞ্জন করা। নিজের কর্তত্বের ধোঁকায় পড়ে তার সাথে অসদ্ব্যবহার না করা। নিজেকে পারস্য সম্রাট নওশেরওয়াঁ ভাবা ঠিক নয়।
ঐ মানুষ আদর্শ মানুষ নয়, যে কেবল আদেশ-নিষেধই চিনে। পক্ষান্তরে যা কিছু ভালো, তা শুধু নিজের জন্যে রাখে। প্রকৃত মানুষ তো হলো সে, যার ভালোটুকু থাকে পরের জন্যে আর মন্দটুকু রাখে নিজের জন্য। নিজের সুখটাকে অন্যের জন্য বিলিয়ে দিতে পারার মধ্যেই প্রকৃত ভালোবাসা নিহিত থাকে। এমন মনমানসিকতা পোষণকারীর মুখেই আসল শোভা পায়- 'আই লাভ ইউ'।

📘 লাভ ম্যারেজ > 📄 অন্যরকম যুবক-যুবতি

📄 অন্যরকম যুবক-যুবতি


দামেশকে একজন লোক ছিল। সে ছিল খুবই চালাক। সে আমারও পরিচিত ছিল। সবকিছুতে সে চতুর ও ঝটপট। আশ্চর্য ও দুর্লভ গল্প শুনিয়ে মানুষকে অবাক করে ফেলত সে। অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করে মানুষকে হতবাক করে দিত। মানুষ তার যেকোনো প্রোগ্রামে-আয়োজনে আনন্দের সাথে ছুটে আসত। সে যেখানে আছে সেখানে অন্য কারও কথা বলার সুযোগ থাকত না, অধিকারও না। তার অভিনব সব কাণ্ডকারখানা লোকজনকে হৃদয়ের গভীর থেকে হাসিয়ে তুলত।
কিন্তু এই লোকটিই স্বীয় পরিবারের সাথে ছিল ব্যতিক্রমী এক ব্যক্তি। ঘরের কারও সাথে তার কোনো হাসি-ঠাট্টা ছিল না। ঘরে যাওয়ার পর প্রয়োজন ছাড়া তার মুখ থেকে কথাও বের হতো না। সে ঘরে আসা মানেই এক বিপদের আগমন! সবাই আতঙ্কে থাকত তাকে নিয়ে। সবার সাথে কথার অনশন।
আমি ব্যক্তিগতভাবে আরেকজন লোক সম্পর্কে জানি। সে বিভিন্ন ভ্রমণে-বিনোদনে বের হলে একাই সবার খেদমত আঞ্জাম দেয়। বন্ধুরা সবাই তাঁবুতে থাকলে সে নিজেই বাজার থেকে গোশত, তরকারি, শাকসবজি নিয়ে আসে; আগুন জ্বালায়; সবার জন্যে খাবারের আয়োজন করে। একসাথে সবাই গল্পে মেতে থাকলে সে বন্ধুদের জন্যে আনন্দচিত্তে চা-কফি পরিবেশন করে। তাদের কারও কিছু প্রয়োজন হলে সে নিজেকে এগিয়ে দেয়। বন্ধুদের সেবায় নিজেকে পেশ করে।
কিন্তু নিজের বাড়িতে সে একজন অলস ব্যক্তি। পরিবারের ওপর সে শাসনের লাঠি ঘোরায়। অযথা তাদেরকে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত রাখে। এক গ্লাস পানিও নিজের হাতে ঢেলে পান করে না। বসার চেয়ার, ঘুমানোর কাঁথাটা পর্যন্ত তাকে এনে দিতে হয়। স্ত্রী-কন্যা সবাই যেন তার দাসী! যেন তারা তার কাজের বুয়া।
আরেক ব্যক্তিকে আমি চিনি। বন্ধুদের কাছে তার চেয়ে ভালো দ্বিতীয় কেউ নেই। তাদেরকে বিভিন্ন সময়ে হাদিয়া পাঠায়। উপহার-গিফট যেকোনো মুহূর্তে তাদের জন্যে প্রস্তুত থাকে। তাদের ছেড়ে নিজে একা কিছুই গ্রহণ করে না। অথচ এই লোকটি পরিবারের কাছে সুপরিচিত কৃপণ ব্যক্তি। পরিবারের সদস্যদের জন্য আবশ্যিক জিনিসপত্র এনে দিতেও তার কলজের পানি শুকিয়ে আসে।
এতক্ষণ কয়েকজন পরিচিত পুরুষের কথা বললাম। আমার পরিচিত ক'জন নারীর কথাও তাহলে বলে ফেলি।
আমি এমন কিছু নারীকেও চিনি। যাদেরকে অভ্যর্থনা বা আতিথেয়তায় রাখা হলে তাদের থেকে একটা শক্ত কথা, তীক্ষ্ণবাক্য কিছুই শোনা যাবে না। একটি মুহূর্তের জন্যেও তাদের মুখ হাসিমলিন হবে না। যে কোনো বদমেজাজি পুরুষও তাদের একটি হাসিতে সব ভুলে যাবে। তারা বাধ্য হয়ে বলবে, মাশাআল্লাহ! কী অপরূপ চাহনি! কত চমৎকার ব্যবহার! কেমন মধুময় কথাবার্তা!
কিন্তু যখনই ঐ নারীরা স্বামীর পাশে যায় তখন তাদের অবস্থা আর অবস্থায় থাকে না। স্বামীর পাশে এরা বড়ই পাষাণ। সব সময় মুখ মলিন করে রাখে; যেন আশি বছরের বৃদ্ধা! কথা বললে এমন বিরক্তি নিয়ে বলে, যেন ইংরেজদের লবণাক্ত পানি পান করেছে! তাকালে মনে হয় খেয়ে ফেলবে!
আমি দেখেছি যে, অধিকাংশ নারী যখন কোনো ট্যুরে বা বিনোদনে বের হয় অথবা বাড়িতে বান্ধবী বা আত্মীয়স্বজনের আগমন ঘটে, তখন তাদের একেকজন নববধূর সাজ নেয়। তখন তারা আগেভাগে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ সেরে ফেলে। সময় লাগিয়ে গোসল করে, চুলে শ্যাম্পু করে, সুন্দর সুন্দর জামা পরে, সুগন্ধি পারফিউমের বডি স্প্রে লাগায়, হাতে মেহেদি লাগায়, ক্রিম-আলতা-স্নো আরও কত কি ব্যবহার করে!
কিন্তু স্বামীর সামনে এরা থাকে এলোমেলো কেশে! তার সামনে আসে আধোয়া চেহারায়। স্বামীর কাছে এলে তাদের শরীর থেকে রসুন-পিঁয়াজের গন্ধ বেরুতে থাকে! মসলার গন্ধ থাকে গা জুড়ে।
অথচ স্ত্রীর ওপর স্বামীর হক সবচেয়ে বেশি। জ্ঞান-বুদ্ধি, দীন-ধর্ম সবকিছুই বলে যে, যদি সাজতে হয় তাহলে স্বামীর জন্যে সাজবে; অন্য মানুষের
জন্যে নয়। স্বামীর পাশে উত্তম কাপড়, সুগন্ধি লাগিয়ে, সুন্দর-সুন্দর বাক্যবিনিময়ে অবস্থান করবে। মৃদু হাসি, নম্র ব্যবহার সবকিছুই স্বামীর জন্যে জমিয়ে রাখবে।
একইভাবে যুক্তি ও নীতির দাবি হলো, স্বামীর কাছে নিজ পরিবারই সর্বাধিক সম্মান ও শ্রদ্ধার যোগ্য। তারাই সেবা ও হাদিয়া পাওয়ার উপযুক্ত। হাসি-কৌতুক, সহযোগিতা ও কল্যাণকামিতার সবচেয়ে বড় অংশ পরিবারের জন্যে বরাদ্দ রাখতে হবে। শুধুই অন্য মানুষের জন্যে নির্দিষ্ট হতে পারবে না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কিভাবে যে অবস্থার পরিবর্তন হলো! নিকটের লোক হলো অশ্রদ্ধার পাত্র! পক্ষান্তরে অপরিচিত হলো শ্রদ্ধার যোগ্য!
সম্মানিত পাঠক-পাঠিকা! এসবের মূল কারণগুলো আমি জানি।
এর মূল, প্রথম ও প্রধান কারণ হলো, কৃত্রিমতায় আমাদের সীমাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি। বাস্তব কথা হলো, আন্তরিকতা কৃত্রিমতাকে দূর করে দেয়। আর হাস্যকর কথা হচ্ছে, স্বামী-স্ত্রী নিজেদের ভেতরগত আচরণেও কৃত্রিমতার আশ্রয় নেয়।
তাই কৃত্রিমতা পরিহার করে স্বাভাবিক জীবন যাপন করা উচিৎ। একে অন্যের কাছে নিজের দোষ-গুণ সবই জানাতে পারে। প্রতিটি মানুষের একান্ত কিছু বিষয় আছে, যা সে অন্যের কাছে প্রকাশ করতে চায় না। এমনকি অতি নিকটজনের কাছেও না। আরবদের প্রবাদ হলো 'অধিক নৈকট্য, পর্দা অবিচ্ছেদ্য'।
তোমার চেহারাটা প্রিয়জনের সামনে রাখ। খুব কাছাকাছি হও; যেন তার ও তোমার মাঝে এক আঙুলের বেশি ফাঁকা না থাকে। তখন কিন্তু সে তোমাকে দেখতে পাবে না; বরং নাকের স্থানে দেখবে পাহাড়ের মতো কিছু একটা দাঁড়িয়ে আছে। অথবা সোজা করে তুমি দুটি রেখা টানো। এরপর সেখান থেকে সামান্য দূরে রেখাদুটির প্রতি দৃষ্টিপাত কর। দেখবে খুবই সোজা, কোনো বক্রতা নেই। কিন্তু যত কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করবে; (যদি পার অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে) তাহলে দেখতে পাবে, প্রতি বিন্দু পরপর সরল রেখাদুটো এদিক সেদিক বাঁকিয়ে আছে। একই অবস্থা মানুষের ক্ষেত্রেও।
আমার একজন খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। ত্রিশ বছর যাবৎ তার সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক। কোনোদিন আমি তার থেকে মন্দ কিছু দেখিনি। সব সময় আমার মতের অনুকূলে তাকে পেয়েছি। একবার তার সাথে কোথাও সফরে বের হলাম। জায়গা সীমিত থাকায় সফরের রাতে এক রুমে দু'জনের থাকতে
হলো। সেখানে তার খাওয়া-দাওয়া, অজু-নিদ্রা দেখে মনে হলো তার সাথে আমার নীতিগত অনেক বৈপরীত্য রয়েছে!
আশা করি এ আলোচনা থেকে স্বামী-স্ত্রী বেশ উপকৃত হবেন এবং যে সমস্ত যুবক-যুবতি এখনও বিয়ে করেনি, তারা বিয়েতে আগ্রহী হয়ে উঠবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00